সিঙ্ঘু সীমান্তে আমার লেনিন

সুশান্ত পাল

লেনিনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় নামে। অবুঝ বয়সে। ছবি দেখিনি। উদ্বাস্তু আন্দোলনের নেতা আমার জেঠুকে আড়ালে সবাই ওই নামে ডাকত। ধুতি পাঞ্জাবি চশমায় লেনিন যাচ্ছেন। ব্যঞ্জনসংগতিতে অবশ্য লেলিন। হরিজন পাড়ায় ছুটছেন। পাড়ার সংঘে বসছেন। পাট্টা বিলিতে হাত লাগাচ্ছেন। দাঁড়িয়ে থেকে পাকা ড্রেন তৈরির তদারকি করছেন। সুঠাম চেহারায় হুঙ্কার ছাড়ছেন। বাড়িতে ফিরে বৈষ্ণবী মায়ের পাশে বসে ছোটো শিশুটি হয়ে উঠছেন। যে মায়ের হাত ধরে ৫১-তে ভিটেমাটি ছেড়ে খেদানো বাঙালের পরিচয়ে নতুন মানচিত্রে প্রবেশ করেছেন।

লেনিনের প্রথম ছবি দেখি ক্লাস ফোরে। বেতাল টেনিদা ফেলুদা লেনিনের সহাবস্থান। সোভিয়েত দেশ থেকে আগত প্রগতি প্রকাশন মস্কোর সচিত্র গল্পমালায়। বইয়ের নাম স্ফুলিঙ্গ থেকে অগ্নিশিখা বোধহয়। রঙচঙে লেনিন। লেনিন কথা বলছেন, সভা করছেন, হাত তুলে বক্তৃতা করছেন, মাথায় কী রকম যেন টুপি পরে মিছিল করছেন, টেবিলে বসে মনোযোগে লিখছেন পড়ছেন, সেনাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন— কত কী যে করছেন। কত কত নতুন শব্দ— জার, বলশেভিক, মেনশেভিক, বিপ্লব। চমকে উঠেছিলাম পাতায় পাতায় পতাকার উপস্থিতি দেখে। এমনই লাল রঙের, কোনায় কাস্তে-হাতুড়ি-তারা খচিত পতাকা জেঠুর কাঁধেও দেখেছি। মনে আছে, বই পড়ে কেন জানি না, ইটের টুকরোয় বাড়ির দেয়ালে এবড়ো খেবড়ো কাস্তে হাতুড়ি তারার দাগ কেটেছিলাম। আর পুজোর স্টল থেকে লেনিন জেঠুর কিনে দেওয়া গোর্কির ‘মা’; মনে হয়েছিল লেনিনের দেশের মাতঙ্গিনী।

ভুলে যাইনি ১৯৯০ সালের কথা। আমি তখন নবম শ্রেণি। ইতিহাস ছুঁয়ে থাকতে ইডেন গার্ডেন্সে। চোখের সামনে জীবন্ত ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় পতাকা,ভারতের তেরঙার সঙ্গে স্থান করে নিয়েছে লেনিনের লাল পতাকা। মঞ্চে উপবিষ্ট অনেক অনেক নেতার মধ্যে কে যেন নেলসনের অদম্য মানসিকতার পরিচয়ে বলেছিলেন— এক পা এগিয়ে দু পা পিছোতে হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। এ তো পশ্চাদপসারণের রণনীতি! ধাঁধার উত্তর খুঁজতে বন্ধুর মামার শরণাপন্ন হলাম। তাঁর ওপর আমার দাবি কোনো অংশে কম নয়। হাংরি নামে যে দল হয়, তাঁরা যে কবিতা গল্প লেখেন, ওঁর কাছে প্রথম শুনেছি, পড়েছি। জেনেছি— হাংরি কবি তথা প্রাবন্ধিক শ্রী শৈলেশ্বর ঘোষ আমার স্কুলের বাংলা শিক্ষক। স্যার কোনো দিন জানাননি, আমরা জানতাম না, তাঁর কবি পরিচয়। তবে প্রতিদিন ক্লাস রুমে পাঠ পেয়েছি বিচিত্র জীবনদৃষ্টি অনুধাবনের। প্রশ্নের উত্তরে মোহন মামা কাঠের শেল্ফ থেকে দুটো বই নামিয়ে হাতে দিলেন। আশ্চর্য, ওই এক পা এগিয়ে দু পা পিছিয়ে বাক্যাংশ, একটি গ্রন্থের শিরোনাম। অপর বই, ‘কী করিতে হইবে’। উভয় প্রচ্ছদে লেনিনের ছবি। লেখক লেনিন।

কলেজে এলাম। শুনলাম ‘নাম তার ছিল জন হেনরি’। খোলা আকাশের নীচে মাটিতে বসে, প্রজেক্টরের আলোপথে টাঙানো সাদা পর্দা হয়ে পৌঁছে গিয়েছি লেনিনের দেশে, সের্গেই মিখাইলোভিচ আইজেনস্টাইনের হাত ধরে। চলচ্চিত্রের বিপ্লবী সম্ভাবনা উপলব্ধি করে লেনিন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সাহায্যের হাত। গড়ে উঠেছিল ‘ওডেসা ফিল্ম স্টুডিও’। দেখলাম STRIKE, OCTOBER, BATTLESHIP POTEMKIN। গোগ্রাসে পড়ছি ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’, গোগোল, মায়কোভস্কি। সর্বত্র লেনিন। কখন যে তিনি হয়ে উঠেছেন, কমরেড লেনিন। আঠারোয় তখন, ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন’। সেই শ্রাবণেই বন্ধুরা মিলে প্রকাশ করলাম ‘ভাবনা’। সমবেত লেখালেখির মুদ্রণের প্রথম প্রয়াস। কৃতজ্ঞতা লেনিন। আমার দেশে তখন মন্দির মসজিদে মানুষ দিশেহারা, উন্মাদ। পেরেস্ত্রৈকা গ্লাসনস্তের হাওয়া এসে পৌঁছেছে। খবর আসছিল মাতৃভূমি রাশিয়ায় লেনিন দূর হটো স্লোগান উঠেছে। পূর্ব-ইউরোপে আমেরিকায় মূর্তিমান শয়তান। মূর্তি দর্শনও পাপ। নিশ্চিহ্ন করো লেনিন। পারলে লেনিন বিজড়িত স্মৃতি দখল করো।

লেনিন তবু নিঃশেষ হলেন না। চিন, ভিয়েতনাম, চে ফিদেলের কিউবায়, নেরুদার চিলি, মার্কেজের লাতিন আমেরিকা কলম্বিয়া ব্রাজিল  ভেনেজুয়েলায়, নিকারাগুয়ায় দন কিহোতের বেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কমরেড। আমার দেশের প্রাদেশিক সরকারে, গণ আন্দোলনে, শ্রমিকের অধিকারে কৃষকের দাবিসনদে। আমি লেনিন খুঁজে ফিরি ‘শঙ্খচিল’-এ, বটুক দার গানে, সলিলের সুরে ক্যয়ারের কোরাসে, সমুদ্র পাড়ের বেলা ফন্টে, বব মার্লিতে কতক বোঝা না বোঝায়। অজিতেশ, উৎপল দত্তের মাঠ ঘাটের নাটকে। সাইকেল মিছিল, আলতা লেখা পোস্টার ব্রিগেডের জনজোয়ারে। মুষ্টিবদ্ধ ইনক্লাব গর্জনে। তফশিলি বর্গাদারের সঙ্গে আমি হাঁটছি— “একটু পা চালিয়ে” কমরেড। ব্রিগেড পাশের গঙ্গায় তখন ভলগার প্রতিমান। ছোট বকুলপুরের দিবাকর আন্না, হারানের বউ ময়নার মা, বাবুরি বর্মনের মা অহল্যা মা, কৃষক নেতা ভুবন, মণিকৃষ্ণ সেন, রহমান, জামসেদ আলি পাশাপাশি হাঁটছেন। আছেন একাত্তরের রাগী মৃণাল।

এ দিকে বাবা, কলিন কাকু, সুবল কাকু স্নান খাওয়া ভুলে লাল হলুদ সবুজ কাগজের সিজন টিকিট পুশ সেল করে চলেছেন। দু দিন যাত্রা পালার আসর। প্রথম দিন ‘ওগো বিষ্ণুপ্রিয়া’। দ্বিতীয় দিনে ‘লেনিন’। বাঙালি শান্তিগোপাল হয়ে উঠেছেন ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন। কাঠের পাটাতনে হাঁটছেন, হাসছেন। শেষে জিতছেন। মাঠ জুড়ে ইন্টারন্যাশনাল। অপরিচিত শব্দ কথায় কোরাস উঠেছে। সংঘের মাঠ তখন বলশেভিক আস্তানা।

তারপর পৃথিবী বিশ্বগ্রাম। ছোটো হতে হতে মশারির ভেতর প্রবেশ করেছে। বদলাচ্ছে সময়। মানতে শিখছি চারপাশ। বিনয় এসেছে বসন্তে। ৬ ফুটের মানুষটি কিন্তু খুঁজে চলেছেন। অন্তহীন তাঁর অন্বেষণ। পদ্মা গঙ্গার সীমানা হারিয়ে হারিয়ে যাওয়া দেশ মানুষ বটবৃক্ষ। স্পর্ধায় লেনিনকে নামিয়ে এনেছেন আদিবাসী উপান্তে। লেনিন আগুন ঘিরে নাচছেন। মাদলের তালে তালে ভদকা ভুলে মহুয়ায় মেতেছেন ভ্লাদিমির। শিল্পে সেলুলয়েডে মানুষ সম্পর্কে উদাসীনতা তাঁর কাছে ঘৃণার। মানুষ তাঁর কাছে সম্ভাবনার বারুদ। বিস্ফোরণ ঘটাতে চাইছেন। যুক্তি তক্কে confused হয়ে পড়ছেন, তবু মানুষের মধ্যে অনন্ত প্রত্যক্ষ করতে চাইছেন। স্বেচ্ছাচার অসাম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগাতে চাইছেন। নিজেও জেগে উঠলেন। গ্রাম বাংলার পথে প্রান্তরে খেতে খুঁজে পেলেন তাঁর লেনিন। হাজির করলেন ‘আমার লেনিন’। তিনি ঋত্বিক ঘটক। ওঁর যন্ত্রণা সংশয় স্বপ্নবিশ্ব থেকে নিস্তার পেলাম না কিছুতেই। সময় ডিঙিয়ে চলে আসেন বারবার।

দেখে ফেললাম GOOD BYE, LENIN! পৃথিবীময় Sony— TV, Playstation; স্যাটেলাইট ফোন, আঙ্কেল গ্যাট, বিশ্ব ব্যাঙ্ক। প্রতীক্ষা শুক্রবার গভীর রাতের ছবির। Hoffmen-এ জাতে উঠেছি, পাতে পড়েছে মুচমুচে কুড়কুড়ে বাহারের স্ন্যাক্স। সাদ্দামে লাদেনে, বুশ পুতিন মনমোহনে লেনিন বোধহয় পুনর্বার হারিয়ে গেলেন! বিশ্বায়িত পরিসরে সাবালক আমাদের দেখা শোনায় লেনিন অনুপস্থিত থাকলেন। দেখলাম তাঁকে নিঃশেষের প্রতীক্ষায় Taurus-এর বরফ শীতলে। সকুরভের বিষাদে জড়িয়ে লেনিন। খোঁয়ারি সময়ে আমি চিলেকোঠার সেপাই।

মেনে নিতে শিখেছি অনেক। রাজার হরেক রকম খেয়াল জানাতে অজান্তে মেনে নিয়েছি। দু পা পিছিয়েছি আর পিছিয়েছি। লেনিন তো এখন ঘুমোচ্ছেন। সময় স্থিতির অনুকূল। এ বেলায় নিজের পানে চাও। মাথায় মাথায় ঘরে ঘরোয়ায় সমাজতন্ত্র সমাধানের বিপ্লবী অঙ্ক তো রইল। ঘুমাও লেনিন, ঘুমাও। পরম নিশ্চিতি তবু জুটল কই? খবর আসে ভেনেজুয়েলায়, হাভানায়, গ্রিসে, ওয়ালস্ট্রিটে মৃত লেনিনকে দেখা গেছে। কারা যেন ঝুলি থেকে আবার খোয়াবনামা বের করেছে। যাদবপুরে হায়দ্রাবাদে রাজধানী অদূরে ছন্নছাড়া একদল লেনিন বুকে সমুদ্রস্নানে নেমেছে। জঙ্গলে, URBAN-এ, পৃথিবীর আনাচে কানাচে লেনিনের ভূত দেখা গেছে। খবর পাই হাড্ডিসার মানুষেরা বেপরোয়া। লেনিন সঙ্গে খুঁজে চলেছেন অস্ত্র। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খিজির অবশ্য হাতের স্ক্র-ড্রাইভারকে অস্ত্র করে নিয়েছে। জনগণতন্ত্রে আস্থাবান আমি ভাবছি শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা। লেনিনকে দেখা গেছে নিয়মগিরি পর্বতে, নদীবাঁধে, হাইরোডে— ক্ষুধার্ত মানুষের সঙ্গে লেনিন হাঁটছেন খালি পায়ে। নাসিকে পুনায় ফসলের দাম চেয়ে হাঁটছেন চাষার সঙ্গে। কখনো ব্যাঙ্গালুরুতে, আবার কখনও এক SEZ থেকে অপর শিল্পপার্কে তরুণ তরুণী শ্রমিকের সঙ্গে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে। শোনা যায় লেনিনের ইন্ধনে এখনো শ্রমিক হরতাল ডাকেন। মুক্তমনা ব্লগ লেখেন। সানফ্রান্সিসকোয় অবিচল দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি কার্বন নির্গমন হ্রাসের দাবিতে, রাবার বুলেট জলকামানের প্রতিপক্ষে।

আধুনিকোত্তর দার্শনিকগণ লেনিনের প্রচ্ছায়ায় আমতা আমতা করেন, পাথরের কবরে কি তবে শায়িত নন লেনিন? না হলে, আইভান, চ্যাং, কালো কাফ্রি সোরেন শবরের সঙ্গে সাংহাইতে আখকলে শালবনে কীসের পরামর্শ করছেন?

খবর আসে। শুনি দেখি আর চিলেকোঠায় সেঁধিয়ে থাকি। টেকা বাঁচা ঘুমানোয় অভ্যস্ত হতে হতে এসে গেল সামাজিক দূরত্বের বছর। বুভুক্ষায় অখাদ্যে অস্বাস্থ্যে মৃত্যুর শ্রেণিকরণে সংযোজিত হল নতুন বর্গ কোভিড-19। ভীতসন্ত্রস্ত গৃহবন্দি পৃথিবীর মাঝে এসে দাঁড়ালেন লেনিন। যূথ জীবনের প্রয়োজন বোঝাতে চাইছেন পুনরায়। মস্ত এক ধাপ্পাকে চেনাচ্ছেন। ঠাটেবাটে সম্প্রসারিত হয়েছে খোঁয়াড়গুলো। স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধ বিমানের সংখ্যা বেড়েছে। খাদ্য-শিক্ষা-স্বাস্থ্য সুরক্ষা আত্মসমর্পিত বাজার সরকারে। অসহায় যন্ত্রণায় দেখছি অ-সঙ্কুলান শয্যায়, এমনকি শুধুমাত্র অক্সিজেনের অভাবে লাখো লাখো নাগরিকের মৃত্যু। লকডাউনের ফাঁসিকাঠে চড়ানো কোটি কোটি গরিবের ক্ষুধা। তবু মৃত্যু পরিকীর্ণ এই সময়ে বাজারের ক্রীতদাসের নির্লজ্জ দালালি চলছেই। কর্পোরেট প্রভুর রসনা তৃপ্তিতে ভেট এল থালি সাজিয়ে নদী অরণ্য ভূগর্ভস্থ সঞ্চিত সম্পদে। শ্রমিকের এযাবৎ অর্জিত অধিকার রাষ্ট্রের অনুশাসনে পিষ্ট হল। ভগবান গোলযোগ সইতে পারেন না। তিনি ক্রীতদাস পছন্দ করেন। কোনো দাবি চলবে না। পোষ্য মনুষ্যেতরের ভক্তি তাঁর বেজায় পছন্দ। কিন্তু, সাধ আর বাস্তবের মাঝে ক্ষেত্রবিশেষে দাঁড়িয়ে পড়েন ‘পুঁজি’ হাতে লেনিন। তারই প্ররোচনায় বিদ্যুৎখুঁটি ওপড়ানো হচ্ছে যত্রতত্র। রাস্তায় নামছে RURBAN NAXAL।

দমন আসছে চণ্ডবেগে। ক্রীড়নক শাসক বাজিকর প্রভুর  সঙ্গে যোগসাজশে ফসল লোটার পরিকল্পনা করেছে। দাদনের ঝুলি নিয়ে মাটি কাড়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। ভুলে যায়, কৃষকের আছে কমরেড লেনিন। তেভাগায় তেলেঙ্গানায় নানকারে তাঁরা লাল নিশানে, ধারালো কাস্তে হাতে রুখে দাঁড়িয়েছেন। শাসকের পল্টন পিছু হটেছে ভাত জমির লড়াইতে। সত্তরে বাংলার মাঠে মাঠে লোকায়ত লেনিনদের দেখেছি। জমির বুকে লাঙলকরের আধিপত্য কায়েম করতে সে কী তুমুল লড়াই! বেপরোয়া ঋত্বিক ভূমিহীনের স্পর্ধিত প্রতিরোধে খুঁজে পেয়েছেন তাঁর লেনিন। লাল নিশানের আধিপত্য কায়েম করছেন। যৌথ খামার থেকে চাল বন্টন করছেন। সাক্ষী, সেনা পোশাকে স্মিতহাস্যে কমরেড লেনিন।

কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সংযোজিত হল ২০২০-র শীতে সিঙ্ঘু সীমান্তে। সমবেত হতে শুরু করলেন হাজার হাজার কৃষক। সিপাহি সান্ত্রির ব্যারিকেড, জলকামান তথা মৃত্যু সূচক হিমাঙ্কের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে সরকারি কালা কানুনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন কৃষক। তরুণের হুংকার রণিত হল “ইয়ে ইনকিলাব হ্যায়”। লাঠি, টিয়ার গ্যাসে, ‘মাওবাদী’ ‘খলিস্তানি জঙ্গি’ তকমায় আক্রমণ ধেয়ে এলে সিঙ্ঘু কুণ্ডরি টিকলি ধাসা গাজিপুর সীমান্ত মুখরিত হল চাচা অজিত সিংহের আহ্বানে— “পাগড়ি সামাল জাঠ্”। লাখে লাখে কৃষক চলে এসেছেন, সংহতি জানাচ্ছেন— হেই সামালো ধান হো ……কাস্তেটায় দাও শাণ হো…..। ঋণচক্র, খরা, আত্মনাশের ভবিতব্যের বিরুদ্ধে লং মার্চ করেছেন ইতোপূর্বে। এবারের লড়াই আরও জোরদার। ধনপতি পালদের  উদগ্র লালসা থেকে জমি রক্ষার লড়াই। ফসলের দামের লড়াই। ফসল ফলানোর স্বাধীনতার লড়াই। জমি আমার ফসল আমার। লড়াই শস্যের গণবণ্টনের। সাকার ব্রত নিয়ে পথে নেমেছে কৃষক। সাম্রাজ্যবাদের মূলোৎপাটনে জালিয়ানওয়ালাবাগে সাকায় সমবেত হয়েছিলেন স্বাধীনতাকামী ভারতীয়। একশো বছর পরে আজ আবার স্বৈরাচারী একনায়কের বিরুদ্ধে সাকার ডাক এসেছে। প্রাণ যায় যাক্। গলন সিং তোমর, ভীম সিংহ, জগবীর সিং, শামশের, যশনদীপদের আত্মবলিদানের অনুপ্রাণনায় আগুন বুকে রাত জাগেন কিষান কিষানি। বিনিদ্র লেনিন।

পতিসর গ্রাম পরিদর্শনে আসা রথীন্দ্রনাথকে এক চাষি অনুযোগ করে বলেছিলেন, “বাবুমশায়, স্বদেশী ছোঁড়ারা দেশের উন্নতি নিয়ে লম্বা-চওড়া বক্তৃতা দেয় শুধু। আসল কাজের বেলা কারও টিকিটুকু দেখবার জো নেই। হ্যাঁ, লেনিনের মতো একজন লোক দেশে জন্মাত, দেখতেন সব ঠিক হয়ে যেত।” ভারতীয় সমাজবাস্তবতা, চাষির বাস্তব এখনও অপরিবর্তিত। তবে, এবার আর শুধুই লেনিনের অপেক্ষায় হা-হুতাশ করা নয়। ভিটেমাটি ফসলের জীবনপণ সংগ্রামে শামিল হয়ে কৃষককুল ভারতের ইতিহাসে বিদ্রোহের এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিচ্ছেন। দৃপ্ত শপথে উদ্দীপ্ত জনকল্লোল— “জান কবুল আর মান কবুল… আর দেব না…আর দেব না….রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো….।” চর্ব্য চূষ্যে বেশ রসেবশে ঘরে বসে থাকা নাগরিক আমার কাছে ডাক এসেছে অন্নদাতার। আমার লেনিনের। “একটু পা চালিয়ে ভাই …”।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান