“পরিচয় না দিলে করিতে নারি পার।”
কুলবধূবেশী দেবী অন্নপূর্ণা, যাঁকে স্মরণ করে ভবসংসারে সবাই পারাপার করে, তাঁকেও আপন পরিচয় জ্ঞাপন করতে হয়েছিল নিছক মাঝি ঈশ্বরী পাটনির কাছে — “ঈশ্বরীরে পরিচয় করেন ঈশ্বরী। / বুঝহ ঈশ্বরী আমি পরিচয় করি।।” এ পরিচয় জানানোয় ছিল ছলনা। ছদ্মতা। ব্যাজস্তুতি অলংকারের প্রয়োগে পরিচয়ের দ্বিবিধ তাৎপর্য। একটি সাধারণ, অন্তরালে ছিল ব্যঞ্জনাময় অ-সাধারণ। পরিচয় জানিয়ে তবে দেবী গাঙিনি নদীর অপর তটে পৌঁছেছিলেন। পরিচয় তাই আবশ্যক। দেব-দেবীও পূজিত পূজিতা হন পরিচয়ের ভিত্তিতে। নাম পরিচয় প্রতিষ্ঠায় মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীদের ছলাকলার খবর ছড়িয়ে আছে কাব্য কবিতায়। পৌরাণিক দেবতাদের একচ্ছত্র প্রতিপত্তিতে অপাঙক্তেয় ‘চ্যাংমুড়ি কানি’ দেবী মনসা তো সবাহন আক্রমণ শানিয়েছেন চম্পক নগরে চাঁদ সদাগরের ঘরে। পুত্রহারা সনকার মাতৃহৃদয়ের আর্তক্রন্দন বিগলিত করতে পারেনি পরিচয় প্রতিষ্ঠায় উন্মত্ত মনসাকে। ভয়ে ভক্তি আদায় করে উচ্চবর্গীয় সমাজে নিজ মাহাত্ম্য ঘোষণা করেছেন। মানুষের ক্ষেত্রে যাকে বলে জাতে ওঠা। তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর আছে সমার্থক, ভিন্নার্থক অষ্টোত্তর শতনাম। মন্ত্র তন্ত্র। একেশ্বর রূপে অর্চিত সর্বশক্তিমান তাঁদেরও আছে স্ব-নাম বংশ-পরিচয়। নাম ছাড়া নামগান অচল।
দৈব অস্তিত্বে পরিচয় ওতপ্রোত হলে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন সহজেই অনুমেয়। সামাজিক রূপে তাকে জানিয়ে দিতে হয় তার নাম ধাম বংশ পেশার বিবিধ খবর। নামধাম অভিব্যক্ত করে লিঙ্গ বর্ণ ধর্ম জাতির অবস্থান। পেশার সংবাদ জানিয়ে দেয় আমাদের শ্রেণিপরিচয়। দেবতা তিনি দেবতা-ই, পরিচয় একমাত্রিক। মানুষ সে শুধুই মানুষ — এ অভিজ্ঞান মানুষ নিজেই স্বীকার করে না। তারা নিজেরাই তৈরি করেছে পরিচয়ের নানা থাক। নানা রং। রংবেরং হয়ে থাকে-থাকে ক্রমাগত ঘুরপাক খায় মানুষ। নাম তার একটি পরিচিতি বহুমাত্রিক। বৈচিত্রের তুলনায় বহুর সংঘাত সেখানে প্রবল।
মানুষের পরিচয় তার অসম্মতিতেই গড়ে ওঠে প্রাথমিক পর্যায়ে। তার জন্ম যেহেতু তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তাই তার পছন্দের পরোয়া না-করে তার লিঙ্গ নির্মাণ হয়ে যায়। নাম তার ব্যাকরণে নির্দিষ্ট লিঙ্গ নির্ধারিত। ব্যতিক্রমে উভলিঙ্গ বাচক, ক্লীবলিঙ্গ সূচক। এই পরিচয়টি অবশ্য পরবর্তীতে নিজের ইচ্ছে মতন হলফনামায় গড়েপিটে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু, বংশপরিচয়? চোদ্দোগুষ্টি বাপ-মা পদবি? অপরিবর্তনীয়। অথচ, ওই পদবি সমাজের বুকে জাত বর্ণের হদিস দেয়। নীচু উঁচুর তকমা সেঁটে দেয় আজীবন। পরিবারের ধর্ম যোগ করে আর এক চিহ্ন। সেই চিহ্নের ওপর ভিত্তি করে স্থান নির্দিষ্ট হয় সংখ্যার লঘুত্বে অথবা গুরুত্বে। গায়ের রং চোখের মণি দৈর্ঘ্য-প্রস্থ — সবকিছুই উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত। এমনকি যিনি জন্মেছেন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন পরিচয়ে। জন্মলব্ধ পরিচয় তাই মানুষের প্রথম পরিচয়। থাকবন্দি সেই পরিচয়াবলি থেকে নিস্তার নেই আমাদের।
সংকট কখন? পরিবার সমাজ নির্ধারিত নির্ণীত পরিচয়ে হেসেখেলে জীবন কেটে গেলে সমস্যার কিছু ছিল না। কিন্তু প্রচলিত সমাজতন্ত্রে তো সে হওয়ার জো নেই। এখানে সবাই সমান অধিকারে মানুষের মর্যাদায় বেঁচে থাকতে পারে না। নিজেদের অক্ষমতার জন্য নয়। সামাজিক প্রথা রীতি, বৃহত্তর রাজনীতি অর্থনীতি পক্ষাবলম্বন করে সবিশেষ পরিচিতিভুক্ত শ্রেণির। রইল যারা, তারা বর্ণজাতি ধর্মে শতধা বিভক্ত শুধুই প্রজা। ভাত কাপড় আশ্রয় নেই। শিক্ষা চাকরি স্বাস্থ্য — সবেতেই উচ্চবর্গীয় পরিচয়ের দাপট। সাংবিধানিক রাজনৈতিক সমতার ভাষ্য অর্থনৈতিক বাস্তবে পরিহাস হয়ে ওঠে। প্রতীয়মান হয় সব মানুষ সমান নয়, সব পরিচয় সমানাধিকার লাভ করে না। সমাজ রাষ্ট্রের বিমূর্ত নিরপেক্ষ চারিত্রিকতা তখন প্রকাশ্য। আবহমান অস্পৃশ্যতা বিদ্বেষ থেকে হীনম্মন্যতার গ্লানি, বঞ্চনা প্রতারণা থেকে সংক্ষোভ, ক্ষুধার্ত বর্তমান — পরস্পর সব মিলে সামাজিকের আলম্বহীনতা তীব্র করে। ঘরে বাইরে দেহমনে সামগ্রিক অস্তিত্বে আধিপত্যকামী কর্তৃত্ব বিপন্ন করে খোপে আটক মানুষের জীবন। সংকট মুক্তির পথ তাই নতুন পরিচয় নির্মাণ, যুগপৎ ব্যক্তি-সমষ্টি ও সমাজের। রাষ্ট্রের।
এখানেই আছে স্বোপার্জনের প্রশ্ন। যে অভিজ্ঞান আমার সম্মতিতে ইচ্ছায় ভালোলাগায় রক্ত জল ঘামে প্রতিষ্ঠা পাবে। বংশানুক্রমিক বর্ণজাতির চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে নয়, উৎপাদনের উপায়ের দখলিস্বত্বে নয়। কিন্তু কবে কে স্বেচ্ছায় ছেড়েছে অধিপতির কুরশি, সম্পদের মালিকানা। অতএব, নির্মাণের মূলে আছে সংকট, পথ আছে সংঘর্ষে। নতুন পরিচয় গঠনে সংঘাত অবশ্যম্ভাবী।
আপনি এমএসসি পড়বেন? আপনার পিতা খেতমজুর। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় বাড়িতে অবিবাহিত দুটো বোন। পরিবারের স্বার্থত্যাগে আর চেয়েচিন্তে স্কলারশিপের যোগফলে ভর্তি হলেন। জেদ অদম্য। গ্রাম ছেড়ে শহরের কলেজ হস্টেলে। প্রথম দিনেই বুঝে গেছেন আপনি সহপাঠীদের চোখে আলাদা। সংরক্ষণের তকমায় আপনার ডাকনাম তখন ‘সোনার চাঁদ’। আপনার ভাষা ঠিক রাঢ়ি বাংলা নয়। ক্লাসের শেষে ঘুরে বেড়ান একা একা পুরাতন কলকাতার অবশেষ অলিগলিতে। আপনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অর্জনের। ফিরে যাবেন গ্রামে নতুন প্রতিষ্ঠায় অসম লড়াই জিতে।
আপনি ঠিক সোজা নন। লিঙ্গ পরিচয়ে অপর। বাইরের বেশ পুরুষের, নামটিও। তবে চলনে বলনে কেমন যেন মেয়েলিপনা। বাবা মা মুখ দেখাতে পারেন না। একটা নাচের স্কুল খুলেছেন সম্প্রতি। ভালোবাসেন আর-এক মানুষকে। লড়াই চলছে।
আপনি মতুয়া। আমি মুসলমান। তোমরা মাকু আমরা ফেকু। দাগিয়ে দেওয়া চলছে। অথচ আপনি দেখছেন অপার বাংলার স্বপ্ন, আমার চলাচল বোধিগয়া থেকে মিশর। স্বপ্ন হারালে চলবে না কিন্তু আমাদের।
আপনি ঋত্বিক, সুবর্ণরেখার পাড় ধরে নিজেকে খুঁজছেন। আপনি জীবনানন্দ, সবার মাঝে থেকেও একলা হয়ে পড়েছেন। অথবা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, দেহ প্রবাসে মন পড়ে আছে পিতৃভূমিতে। অনিকেত আধুনিকের উদ্দালক আরুণি নামে কোনও পিতা নেই। অস্তিত্বের সারাৎসারের প্রশ্নে যিনি নির্দ্বিধায় বলবেন — “তুমিই তিনি”। রক্তক্ষরণ চলতে থাকে।
সুতরাং জন্মগত পরিচয় ও অর্জনের পরিচয়ের ঘাতবিস্তার জীবনযাপন, অস্তিত্বের সঙ্গেই অবিচ্ছিন্ন। তার সংকট সংঘর্ষ নির্মাণ মানুষের বেঁচে থাকা, কীভাবে বাঁচবে তারা — তার দ্বান্দ্বিক ইতিহাস।
ঈশ্বরী পাটনির সময় বদলেছে। প্রাক্আর্য অথবা রাজারাজড়ার প্রাচীন মধ্যযুগ অতিক্রান্ত। সে-সময় পেশাবৃত্তি বর্ণজাতের অপরিবর্তনীয় অনুশাসনে আবদ্ধ মানুষ নিজেকে ‘যন্ত্র’ মনে করে চালক পালক ‘যন্ত্রী’-র প্রতি দেহ-মন-প্রাণ সমর্পণ করেছিলেন। জগৎকে সত্য অথবা মিথ্যা, অভাবকে অলঙ্ঘনীয় মনে করে মেনে নিয়েছিলেন সব। ‘জিব দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনি’ বিশ্বাসে আশা রাখতেন একদিন ঠিক ‘সন্তানকে দুধে ভাতে’ রাখতে সোনার সেঁউতি হাতে আবির্ভূতা হবেন দেবী অন্নপূর্ণা। পরিচয়ের তাড়না নয় জীবন ধারণের তাগিদ ছিল বড়ো।
কিন্তু আমাদের আছে অস্তিত্বের নানা থাক। পরিচিতির বহু জটিল খোপ। ক্ষোভ। আইডেন্টিটি ক্রাইসিস। সত্তার সংকট। এই স-চেতনা প্রণোদিত করে প্রশ্ন উত্থাপনের — কেন? মূল জট কোথায়? ইতিহাস রাজনীতি অর্থনীতি সংস্কৃতি তন্নতন্ন করে খুঁজে, দেখতে হয় সামগ্রিকের খুঁটিনাটি। ব্যক্তির গহন, সমুদায়ের বিধান। লক্ষ্য — বিবিধ পরিচিতির সহাবস্থান। সব রং লাগুক জীবনে। যতশত বর্ণ ধর্ম মতের সম্মেলন ঘটুক সমাজমানসে। অভীষ্ট — মানুষের সমান অধিকার। নিজের ইচ্ছায় বাঁচা। অনুষ্টুপ ছন্দে দেবদেবীগণ এখন আর বর প্রদান করতে মর্ত্যে অবতরণ করেন না। নিজেদের কথা নিজেদেরই বলতে হবে। গড়ে তুলতে হবে প্রভিন্ন পরিচয়ের ঐক্য।
প্রকাশ হল পরিচিতি। তাদের তোমার আমার আপনাদের। আমাদের।
অভিক্ষেপ
মৃন্ময় কঙ্ক চয়ন সৌম্য সুশান্ত সঞ্জীব শুভাশিস এবং আপনারা