ভারতে জাতপাত : কৃৎকৌশল, উৎপত্তি ও বিকাশ 

বি আর আম্বেদকর

(ভাষান্তর : অঙ্গিরাপ্রিয়া নন্দী) 

[১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ৯ মে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিদ্যার এক আলোচনাচক্রে ড. বি আর আম্বেদকর নিম্নলিখিত রচনাটি (Castes in India : Its mechanism, genesis and development) পাঠ করেন। এই রচনায় তিনি বিবাহের মতন সামাজিক অনুষ্ঠানের নানা দিক তুলে ধরেছেন। বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে ব্রাহ্মণরা কেবলমাত্র তাঁদের বর্ণের মধ্যে বিয়েকে আবদ্ধ রেখে বাকিদেরও বাধ্য করেছেন নিজ বর্ণে বিয়ে সম্পন্ন করতে যা আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, আরও বৃহত্তর পরিসরে, জাতিভেদপ্রথাকেই বলবৎ রাখতে সাহায্য করেছে।] 

বলতে দ্বিধা নেই যে, আমাদের মধ্যে অনেকেই মানব সভ্যতার পূর্ণতর রূপদানে ধাতব বস্তুর প্রকটতা লক্ষ করেছেন, কিন্তু মানব প্রতিষ্ঠানের গঠনের প্রকটতাও যে সমাজে বিরাজমান তা মাত্র কয়েকজনেরই নজরে এসেছে। মানবজাতির প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রদর্শন বিষয়টি একটু অদ্ভুতই বটে, কেউ কেউ একে পাগলামিও বলতে পারেন, কিন্তু যদি জাতিবিদ্যার ছাত্র হিসাবে দেখি, আমার মনে হয় এই নবতম আবিষ্কার সম্পর্কে আপনারা কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করবেন না। কারণ বিষয়টি সেরকম নয়।

আমার বিশ্বাস আপনারা সবাই কোনও-না-কোনও ঐতিহাসিক স্থানের ধ্বংসস্তূপ দর্শন করেছেন। এই যেমন পথপ্রদর্শকের সাবলীল কণ্ঠে উৎসাহের সঙ্গে শুনে গেছেন পম্পেই-এর ধ্বংসস্তূপের ইতিহাস। আমার মতে জাতিবিদ্যার ছাত্র হিসাবে, আমার কাজ বেশ খানিকটা ওই পথপ্রদর্শকের মতো। তার পূর্বসূরিদের মতোই সে নৈর্ব্যক্তিকভাবে তুলে ধরেছে সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে এবং তার সৃষ্টি ও কর্মপ্রণালী সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়েছে।

এই সেমিনারে বেশিরভাগ সহকর্মী ছাত্রছাত্রীরা যে আদিম বনাম আধুনিক সমাজ নিয়ে চিন্তিত, তা তাঁরা খু্বই দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের মত পোষণ করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নানা দিক সহজেই উন্মোচিত করে। এবার আমার পালা। এই সন্ধ্যায় আপনাদের যতটা সম্ভব মনোরঞ্জন করা যায় ‘ভারতে জাতপাত : কৃৎকৌশল উৎপত্তি ও বিকাশ’ সম্পর্কিত আলোচনার মাধ্যমে।

আশা করি আর মনে করিয়ে দিতে হবে না যে, যে বিষয় নিয়ে আমাকে আলোচনা করতে হবে তা অত্যন্ত জটিল। আমার চেয়ে যাঁরা সংবেদনশীল এবং কলমেও বেশ দক্ষ তাঁরা জাতপাতের রহস্য উদ্ঘাটনে এর আগেও সচেষ্ট হয়েছেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই বিষয়টা অবর্ণিতই থেকে গেছে, ‘অবোধগম্য’ নয়। জাতপাতের মতো এক প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জটিলতা সম্পর্কে আমি বেশ কিছুটা পরিচিত, কিন্তু এতটাও নিরাশাবাদী নই যে জাতপাত-কে অবোধগম্য বলব, কারণ আমি বিশ্বাস করি এটি যথেষ্ট বোধগম্য। তত্ত্বগতভাবে এবং কার্যগতভাবে, উভয় দিক থেকেই জাতপাত একটি বড়ো সমস্যা। কার্যগত দিক থেকে এটা এমন একটা প্রতিষ্ঠান যার ভবিষ্যৎ মারাত্মক। এটা একটা স্থানীয় সমস্যা কিন্তু এর মধ্যেই সমস্ত অমঙ্গলের সম্ভাবনা সুপ্ত আছে। কারণ “যতদিন ভারতে জাতপাত টিকে আছে, হিন্দুরা অপর কোনও জাতের সঙ্গে অন্তর্বিবাহ এবং সামাজিক মেলামেশা করবে না বললেই চলে। এবং যদি হিন্দুরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিযান করে ভারতীয় জাতব্যবস্থা একটি বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।” তত্ত্বগতভাবে বলতে গেলে এই বিষয়টা অনেক বড়ো বড়ো পণ্ডিতকে দ্বন্দ্বে ফেলেছে যাঁরা এর সৃষ্টির উৎস খুঁজেছেন। এবং আমি সার্বিকভাবে এই সমস্যার পর্যালোচনা করতে পারব না। আমার মনে হয় স্থান-কাল ব্যাপ্তি, সূক্ষ্মবিচারবুদ্ধি ব্যতিরেকে সবকিছুই আলোচনাকে ব্যর্থ করে তুলবে যদি না আমি সুস্পষ্ট বিন্যাসে বিষয়টিকে বিন্যস্ত করতে পারি। বিন্যাসটি হল — সৃষ্টিতত্ত্ব, কার্যপ্রণালী এবং জাত ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ। আমি খুব কঠোর ভাবে এই পদ্ধতি অনুসরণ করব এবং বাড়তি কোনও বিষয়ে আলোকপাত করব একমাত্র যখন আমার তত্ত্বের কোনও যুক্তিকে সমর্থন করার বা বোধগম্য করে তোলার প্রয়োজন পড়বে।

এবার বিষয়টা নিয়ে বিশদে আলোচনা করা যাক। বহুল পরিচিত জাতিবিদদের মতে ভারতের জনসংখ্যা আর্য, দ্রাবিড়, মঙ্গোলিয়ান, সাইথিয়াদের সংমিশ্রণ। এই সমস্ত মানব সম্প্রদায় বহু বছর আগে যখন উপজাতি ছিল তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন সংস্কৃতি বহন করে ভারতবর্ষে এনেছেন। তাঁরা প্রত্যেকে একে অপরের পূর্বসূরিদের সঙ্গে একপ্রকার লড়াই করেই এই দেশে পদার্পণ করেছেন এবং যতটা পারা যায় জায়গা দখল করে তারপর প্রতিবেশী হিসেবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করেছেন। পারস্পরিক মেলামেশা এবং নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁরা একটি সর্বজনীন সংস্কৃতি উদ্ভূত করেছেন যা তাঁদের স্বাতন্ত্র্য সংস্কৃতিকে প্রতিস্থাপন করেছে। এটা ধরে নেওয়া যেতেই পারে যে ভারতবর্ষের সর্বত্র বিভিন্ন জনজাতির সার্বিক মেলামেশা হয়নি। একজন ভ্রমণকারীর চোখে পূর্ব ভারতের মানুষের শারীরিক গঠন, গায়ের রং পশ্চিমের মানুষের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে আলাদা। ঠিক যেরকমটা দেখা যায় দক্ষিণ ভারতের মানুষের সঙ্গে উত্তর ভারতের মানুষের। কিন্তু কোনও মানুষের সমসত্ত্বতার মূল ভিত্তি কখনও সংমিশ্রণ নয়। জাতিগতভাবে বলতে গেলে সব মানুষই ভিন্নধর্মী। সমসত্ত্বতার মূলে আছে সাংস্কৃতিক ঐক্য। এটাকে সত্যি বলে ধরে নিলে বলতে সাহস হয় যে, এমন কোনও দেশ নেই যা ভারতীয় উপদ্বীপকে সাংস্কৃতিক অখণ্ডতার বিচারে পাল্লা দিতে পারে। ভারতের কেবল ভৌগোলিক অখণ্ডতা নয়, বরং সার্বিকভাবে আরও গভীরতর ও ভিত্তিগত ঐক্য আছে। সন্দেহাতীত ভাবে তা সাংস্কৃতিক ঐক্য, যা ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু আবার এই সমসত্ত্বতার কারণেই বর্ণ একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যার ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত কষ্টকর। যদি হিন্দুসমাজ কেবলমাত্র পারস্পরিক স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর যুক্তরাষ্ট্র হত বিষয়টি অনেক সহজ হত। কিন্তু জাতপাত হল সেই গোষ্ঠীরই বিভিন্ন অংশে বিভাজন যে গোষ্ঠী ইতিপূর্বেই সমজাতিক হিসাবে বিরাজমান, এবং জাতপাতের সৃষ্টিতত্ত্বের পর্যালোচনাই হল এই বিভাজননীতির পর্যালোচনা। 

আমাদের মতো করে তদন্ত শুরু করার আগে এটা নিজেদের পক্ষে ভালো হবে আমরা যদি জাতপাতের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করি। এক্ষেত্রে আমি জাতিবিদ্যার অধ্যয়নকারীদের জাতিবর্ণ সম্পর্কিত সংজ্ঞা তুলে ধরব : 

(১) ফরাসি পণ্ডিত মিস্টার সেনার্ট বর্ণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এইভাবে — “একটি রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠান, তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে চূড়ান্তভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত, নির্দিষ্ট কিছু চিরাচরিত এবং স্বতন্ত্র গোষ্ঠী সমন্বিত যার প্রধান এবং মন্ত্রীপরিষদ আছ; যারা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সমাবেশে মিলিত হয় এবং নির্দিষ্ট কিছু উৎসবে একত্রে যোগদান করে, যারা পেশাগত দিক থেকে এক, যার সঙ্গে বিশেষ করে বিবাহের, খাদ্যের এবং আনুষ্ঠানিক শুচিতার প্রশ্নের সম্পর্ক আছে, এবং নিজেদের সদস্যদের বিচারব্যবস্থা দ্বারা শাসন করে, যেটা সময় বিশেষে বদলে যায়, কিন্তু যেটা সফল হয় সম্প্রদায়ের প্রধানকে গুরুত্ব দিয়ে অন্যকে নির্দিষ্ট কিছু শাস্তিপ্রদানের মাধ্যমে এবং সর্বোপরি গোষ্ঠী থেকে বহিষ্কার করে যা প্রত্যাহার করা অসাধ্য।” 

মিস্টার নেসফিল্ড বর্ণের সংজ্ঞা দিয়েছেন — “সম্প্রদায়ের এক গোষ্ঠী যারা অন্য গোষ্ঠীর সঙ্গে  যেকোনও যোগাযোগ বর্জন করে চলে এবং নিজেদের গোষ্ঠীর লোক ছাড়া অন্য কোনও বর্গে অন্তর্বিবাহ করে না, খাবার ভাগ করে নেয় না, জলস্পর্শ করে না।” 

স্যার এইচ রিসলের মতে — “বর্ণকে কয়েকটি পরিবার বা কয়েকগুচ্ছ পরিবারের সমষ্টি ধরা যেতে পারে, যারা একই নাম বা পদবি বহন করে এবং যা সাধারণত তাদের নির্দিষ্ট পেশার সঙ্গে যুক্ত, যারা দাবি করে যে তারা একই পৌরাণিক, মানবিক অথবা ঐশ্বরিক পূর্বপুরুষের বংশধর, এবং মুক্তকণ্ঠে এও স্বীকার করে যে তারা একই পেশায় নিযুক্ত এবং তাঁদের দ্বারাই গণ্য হয় যাঁরা মতামত দিতে পারদর্শী। এর ফলে একটি সমজাতিকমন্ডলী গড়ে ওঠে।”

ডক্টর কেটকারের মতে বর্ণের সংজ্ঞা হল — “একটা সামাজিক গোষ্ঠী যার দুটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে —

(ক) সদস্যবর্গ তাঁদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে যাঁরা সদস্যদের থেকেই জন্মলাভ করেছে এবং সেই সকল মানুষদেরই অন্তর্ভুক্ত করবে যাঁরা তাঁদের থেকে জন্মাবে।

(খ) অনিবার্য সামাজিক আইন কর্তৃক সেই সকল সদস্যরা নিষিদ্ধ যাঁরা তাঁদের বর্গের বাইরে বিয়ে করেছে।”

আমাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য এই সমস্ত সংজ্ঞাগুলি পুনর্মূল্যায়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি স্বতন্ত্রভাবে সংজ্ঞাগুলি দেখি তাহলে এটা লক্ষ করা যাবে যে, তিনজন লেখকের সংজ্ঞাই হয় খুব বেশি, নয় তো খুব কম মূল বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে, কোনোটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ বা সঠিক নয়। প্রত্যেকেই জাতিভেদ প্রথার কার্যপ্রণালীর মূলে পৌঁছাতে পারেননি। তাঁরা বর্ণকে একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী হিসেবে এবং জাতিভেদ প্রথার সঙ্গে সম্পর্কিত হিসাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন, গোষ্ঠীর মধ্যের অংশ হিসেবে নয়। আর এখানেই তারা ভুলটা করেছেন। যদিও সামগ্রিক ভাবে দেখতে গেলে তাঁদের সব সংজ্ঞাই একে অপরের পরিপূরক, অন্যের সংজ্ঞায় যে বিষয় অস্পষ্ট আরেকজনের সংজ্ঞায় সেটাতেই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আমি সেই বিষয়গুলো  সমালোচনার ক্ষেত্রে তুলে ধরব এবং মূল্যায়ন করব যা তাঁদের প্রত্যেকের বর্ণের সংজ্ঞাতে বর্ণের  বিশেষত্ব রূপে গণ্য করা হয়েছে।

মিস্টার সেনার্টকে দিয়েই শুরু করা যাক। তিনি বর্ণের গুণগত বৈশিষ্ট্য হিসাবে অশুচিতার ধারণাকে রেখেছেন। এই প্রসঙ্গে বলতে গেলে বেশ নিরাপদেই বলা যাবে যে, এটা বর্ণের সেরকম কোনও বিশেষত্বই নয়। এটা একটা বিশুদ্ধতার বিশ্বাসের ব্যাপার, যার উদ্ভাবন হয়েছে যাজকীয় আচারবিচারে। ফলত, বর্ণের সঙ্গে এর যে আবশ্যিক যোগাযোগ আছে তা অস্বীকার করা হবে বর্ণভেদ প্রথা চালু রেখেই। বর্ণভেদ প্রথার সঙ্গে অশুচিতার ধারণাকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কেবলমাত্র এই কারণেই যে, যে বর্ণ সর্বোচ্চ পদমর্যাদা ভোগ করে তা হল ব্রাহ্মণ বর্ণ, যেখানে আমরা জানি যে, ব্রাহ্মণ এবং শুচিতার একটা পুরানো সম্পর্ক আছে। তাই আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, অশুচিতার ধারণা বর্ণের গুণগত বৈশিষ্ট্য হতে পারে কেবলমাত্র যদি বর্ণের ধর্মীয় রং থাকে। 

মি. নেসফিল্ড তাঁর মতো করে বলেছেন যে, বর্ণপ্রথার একটি বৈশিষ্ট্য হল সে নিজের বর্ণের বাইরে অন্য কোনও বর্ণের মানুষের সঙ্গে মেশে না বা খাবারও খায় না। এই যুক্তিতে নতুনত্ব থাকলেও, আমাদের বলতেই হবে যে মি. নেসফিল্ড কার্যকারণের ফলাফল সঠিকভাবে নিরূপণ করতে পারেননি। বর্ণ নিজেই একটা স্বয়ংসংবদ্ধ একক, যা স্বাভাবিকভাবেই অন্য সামাজিক মেলামেশার, যেমন অন্য গোষ্ঠীসদস্যদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলস্বরূপ এই বহিরাগতদের সঙ্গে খাবার ভাগ না করে খাওয়ার ব্যাপারটা কোনও ইতিবাচক বিধি নিষেধ নয়, কারণ বর্ণপ্রথার স্বাভাবিক ফলই হল বহিষ্করণ। নিঃসন্দেহে এই খাবার ভাগ না করে খাওয়ার ব্যাপারটা মনে করা হয় যে, ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞামূলক নির্দেশের জন্য হয়েছে, যা আসলে বহিষ্করণের জন্যই ঘটেছে। স্যার এইচ রিস্লের সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই কারণ তিনি বর্ণ সম্পর্কে নতুন কোনও দিক উন্মোচিত করেননি।

এখন আমরা ডক্টর কেটকার-এর বর্ণ সম্পর্কিত সংজ্ঞার দিকে মন দেব। ডক্টর কেটকার বরং বর্ণ বিষয়ে অনেক স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। শুধু  সাবলীলতাই নয় বর্ণ বিষয়ে তাঁর পাঠ অত্যন্ত মুক্তমনা এবং তীক্ষ্ণবুদ্ধি সম্পন্ন। তাঁর সংজ্ঞা যথেষ্ট বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ তিনি বর্ণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন বর্ণপ্রথার অনুষঙ্গে। এবং, কেবলমাত্র সেই বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপরে দৃক্পাত করেছেন যা বর্ণকে টিকিয়ে রাখার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। আর অন্য সমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলোকে আলাদা করে সরিয়ে রেখেছেন যা একেবারেই হয় গৌণ নয় অমৌলিক। কেটকার প্রদত্ত সংজ্ঞা যতই সহজ সাবলীল হোক-না-কেন তবুও বলতে হয় যে এখানে একটু হলেও ধাঁধা আছে। তিনি বর্ণের দুই বৈশিষ্ট্য হিসেবে অসবর্ণ বিবাহে বিধিনিষেধকরণ এবং স্বতোৎপাদিত সদস্যপদের কথা বলেছেন। আমি ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি যে এটা আসলে একই বিষয়ের দুটো দিক যা আদতে একই, এবং দুটো আলাদা আলাদা বিষয় নয় যেমনটা ডক্টর কেটকার মনে করেছেন। যদি তুমি অসবর্ণ বিবাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ কর তাহলে তার ফল হবে যে তুমি তাদেরকেই একটা সদস্যবর্গে সীমাবদ্ধ করে রাখবে যাঁরা একই গোষ্ঠীতে জন্মেছে। এইভাবে  দুটো বিষয় হয়ে ওঠে একই মুদ্রার  এপিঠ-ওপিঠ। 

বর্ণের বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের এই তুল্যমূল্য পর্যালোচনা করে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, অসবর্ণ বিবাহের অনুপস্থিতি কিংবা এর ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞাকরণ, সংক্ষেপে বললে, অন্তর্বিবাহই হল বর্ণের মূল এবং একমাত্র সারবস্তু। কেবলমাত্র এভাবেই বর্ণকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। কিন্তু কেউ কেউ আবার এই সংজ্ঞাকে দুর্বোধ্য নরবিজ্ঞানের যুক্তির ভিত্তিতে নস্যাৎ করতে পারে। তার কারণ এমন অনেক গোষ্ঠী বিরাজমান আছে যারা অন্তর্বিবাহ করেও বর্ণপ্রথায় সমস্যার উদ্রেক করে না। সাধারণভাবে দেখতে গেলে এটা সত্যি। কারণ অন্তর্বিবাহ সম্পন্নকারী বর্গসমূহ সাংস্কৃতিক দিক থেকে পৃথক। স্থানীয় এলাকায় তাঁরা আস্তানা গেড়েছেন কিছুটা উৎখাত হয়ে এসেই। পরস্পরের সঙ্গে এঁদের যে-কোনও লেনদেন নেই তাও প্রকৃত বাস্তব। আত্মপক্ষ সমর্থনের উদাহরণ হিসেবে দেওয়া যেতেই পারে নিগ্রো এবং শ্বেতবর্ণ এবং অন্যান্য উপজাতির কথা যাদেরকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে একত্রে আমেরিকান ভারতীয় নামে ডাকা হয়। কিন্তু আমাদের গুলিয়ে ফেললে চলবে না যে ভারতবর্ষের পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা, যেরকমটা আগেই উল্লেখ করেছি ভারতবর্ষে মানুষজন সার্বিকভাবেই সমজাতিক। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জনজাতি, যারা নির্দিষ্ট কিছু এলাকা দখল করে আছে তারা সবাই কমবেশি একে অপরের সঙ্গে মিলে মিশে আছে এবং তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐক্যও বর্তমান — আর এটাই সমজাতিক জনগণের একমাত্র মানদণ্ড। এই সমসত্ত্বতাকে ভিত্তি করে বর্ণপ্রথা চারিত্রিক দিক থেকে একটা নতুন করে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, অন্তর্বৈবাহিক সমাজমণ্ডলী বা উপজাতিমণ্ডলীতে সমসত্ত্বতা সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। ভারতবর্ষে বর্ণপ্রথা বলপূর্বক জনগণকে কয়েকটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীতে ভাগ করে দিয়েছে এবং এক-কে অপরের সঙ্গে মিশতে দেয়নি (অন্তর্বিবাহের প্রথার মাধ্যমে)। সুতরাং অন্তর্বিবাহই হল বর্ণর একমাত্র স্বাতন্ত্র্যসূচক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যদি আমরা অন্তর্বিবাহ কীভাবে বজায় রাখা হয় সেটা দেখাতে সফল হই তাহলে আমরা বাস্তবিক এটা বোঝাতেও সক্ষম হব যে বর্ণের সৃষ্টিতত্ত্ব কী এবং তার কার্যনির্বাহী পন্থাই বা কীরকম! 

এটা হয়তো আপনাদের পক্ষে অনুমান করা খুব একটা সহজ হবে না, কেন আমি জাতিভেদ প্রথার রহস্যের চাবিকাঠি হিসেবে অন্তর্বিবাহকে বেছে নিয়েছি। আপনাদেরকে খুব বেশি ভাবাব না। আমি আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি দিচ্ছি।

এটা বলা বাহুল্য হবে না যে, এই মুহূর্তে ভারতীয় সমাজের মতো আর কোনও সভ্য সমাজ তার অতীতকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে। ভারতবর্ষের ধর্ম অপরিহার্যভাবে মৌলিক থেকে গেছে এবং সময় ও সভ্যতার অগ্রগতি সত্ত্বেও উপজাতীয় রীতিনীতিগুলি আজও তার আদিরূপেই সামাজিক কার্য সম্পাদন করে চলেছে। এই আদিম রীতিনীতি যা আজও টিকে আছে তাদের মধ্যে একটি হল অসবর্ণ বিবাহ প্রথা যার প্রতি আমি বিশেষ করে মনোযোগ দেওয়ার দাবি রাখছি। আদিম যুগে অসবর্ণ বিবাহ এমনই একটি বহুল পরিচিত ঘটনা ছিল যে তা আর আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। ইতিহাস যত সাবালক হয়েছে অসবর্ণ বিবাহের ব্যাপকতা তত কমে গেছে। একমাত্র রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে সামাজিক ভাবে নিষিদ্ধ ছিল, আর কোনও ক্ষেত্রে নয়। কিন্তু ভারতবাসীর জন্য এমনকি আজকের যুগেও অসবর্ণ বিবাহ আইন একটি ইতিবাচক অনুশাসন। যদিও গোষ্ঠী বলে আর কিছু নেই তবুও ভারতীয় সমাজে গোষ্ঠী প্রথার আদিম স্রোত বয়ে চলেছে। আর এটা বিবাহ সম্পর্কিত আইনের দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে। এই আইন অসবর্ণ বিবাহ নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যেখানে কেবল নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে শুধু নিষিদ্ধই নয় সগোত্রে বিবাহ অপবিত্র বলে মনে করা হয়।

আপনাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ভারতবর্ষের মানুষের কাছে অন্তর্বিবাহ অপরিচিত ছিল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন গোত্রে অসবর্ণ বিবাহ চালু ছিল ঠিক যেমনটি টটেমিক উপজাতির সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর অসবর্ণ বিয়ে বজায় ছিল। ভারতবর্ষের মানুষের কাছে অসবর্ণ বিবাহ একটা ধর্মবিশ্বাসের মতো ছিল এবং কেউ এটাকে লঙ্ঘন করতে সাহস পেত না। এমনকি বর্ণের মধ্যে অন্তর্বিবাহ চালু থাকলেও অসবর্ণ বিবাহ এবং অন্তর্বিবাহ আইন লঙ্ঘন করার মধ্যে অসবর্ণ বিবাহ আইন লঙ্ঘন করার শাস্তি ছিল আরও বেশি মারাত্মক। তাহলে বুঝতে পারছেন, অসবর্ণ বিবাহ রীতি অনুযায়ী বর্ণপ্রথা থাকতে পারে না। কারণ অসবর্ণ বিবাহ মানেই সংমিশ্রণ। কিন্তু আমাদের জাতিভেদ প্রথা আছে। সুতরাং ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে কথা বলতে গেলে শেষপর্যন্ত এটা বলতেই হয় যে, বর্ণ প্রথার সৃষ্টির মূলে আছে অসবর্ণ বিবাহের ওপর অন্তর্বিবাহকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া। যাই হোক সত্যিকারের অসবর্ণ জনজাতির মধ্যে অন্তর্বিবাহ (যা বর্ণপ্রথার সৃষ্টির সমান) বজায় রাখা একটি গভীর সমস্যা। আর ঠিক কী উপায়ে অসবর্ণে বিবাহের বিরুদ্ধে অন্তর্বিবাহ টিকে ছিল তা পর্যালোচনা করলেই আমরা আমাদের সমস্যার সমাধানের আশা রাখতে পারি। 

অতএব, বলা যায়, অসবর্ণ বিবাহের ওপর অন্তর্বিবাহ-কে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার ফলেই বর্ণপ্রথার উদ্ভাবন হয়েছে। কিন্তু এটা আদৌ এত সহজ ব্যাপার নয়। একটা কল্পিত দলের কথাই ধরা যাক যারা নিজেরা একটি বর্ণ তৈরি করতে চায় এবং বিশ্লেষণ করা যাক কী উপায় তারা অবলম্বন করবে অন্তর্বিবাহকে বজায় রাখার জন্য? যদি একটি দল নিজেদেরকে অন্তর্বিবাহে আটকে রাখতে চায় তাহলে বহিরাগতদের সঙ্গে অসবর্ণে বিয়ের বিরুদ্ধে যে নিয়মনিষ্ঠ অনুশাসন তা বৃথা যাবে,  বিশেষ করে যদি সমস্ত বৈবাহিক সম্পর্কে অন্তর্বিবাহের ভূমিকার পূর্বে অসবর্ণে বিবাহের নিয়ম বলবৎ থাকে। পুনরায়, সব দলের মধ্যেই একে অপরের সঙ্গে মেলামেশার একটা প্রবণতা থাকে এবং এভাবেই একটা সমজাতিক সমাজ গড়ে ওঠে। কিন্তু যদি বর্ণ গঠনের উদ্দেশ্যে মানুষের এই স্বাভাবিক প্রবণতাকে বাঁধ দিয়ে রাখতেই হয়, তাহলে একটা গণ্ডি টানার অবশ্যই প্রয়োজন পড়ে, যে গণ্ডির বাইরে মানুষ বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না।

তা সত্ত্বেও, বহিরাগতদের সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ করেও ভেতরে সমস্যা রয়েই যায়, যার সহজ কোনও সমাধান নেই। খোলাখুলি ভাবে বলতে গেলে বলতে হয় যে একটা গোষ্ঠীতে দুটি লিঙ্গের মানুষ কমবেশি চারিয়ে আছে আর সাধারণভাবে বলতে গেলে যারা সমবয়সী তাদের মধ্যে একটা সমতা বজায় আছে। কিন্তু প্রকৃত সমাজে এই সমতা কখনোই বাস্তবায়িত হয় না। একই সঙ্গে বলতে হয় যে, যে দল নিজেদেরই একটা বর্ণ তৈরি করতে চাইছে তাদের মূল লক্ষ্যই হয়ে উঠবে পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের মধ্যে সমতা রক্ষা করা, নচেৎ অন্তর্বিবাহ বেশিদিন টিকবে না। অন্যভাবে বলতে গেলে অন্তর্বিবাহকে যদি টিকিয়ে রাখতেই হয় তাহলে দাম্পত্য অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায় দলের সদস্যরা গণ্ডির বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো জীবনযাপন করবে। কিন্তু দাম্পত্য অধিকার বলবৎ করা হলে দুটি বিবাহযোগ্য লিঙ্গের মানুষের মধ্যে আঙ্কিক দিক থেকে সমতা বজায় রাখা আবশ্যিক, যদি তারা নিজেদের একটা বর্ণ তৈরি করতে চায়। এই বাধ্যতামূলক অন্তর্বিবাহ তখনই অটুট থাকবে যখন লিঙ্গ সাম্য বজায় থাকবে। লিঙ্গবৈষম্য এলেই অন্তর্বিবাহ আর বজায় রাখা সম্ভব হবে না।

বর্ণ সমস্যা এক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে কিয়দ্দুর সচেষ্ট হয়। প্রকৃতির ওপর যদি ছেড়ে দিই তাহলে দুটি লিঙ্গের মধ্যে যে সমতা প্রয়োজন তা তখনই বাস্তবায়িত হবে যখন একজন দম্পতি একই সঙ্গে মারা যাবে। কিন্তু এটা একটা বিরল ঘটনা। স্ত্রীর আগে স্বামী মারা যেতে পারেন এবং এভাবে তৈরি হয় উদ্বৃত্ত মহিলা যাকে নিষ্পত্তি করতেই হবে, নয়তো সেই মহিলা অসবর্ণ বিবাহ করার মধ্যে দিয়ে অন্তর্বিবাহএর নিয়ম লঙ্ঘন করবেন। ঠিক একইভাবে স্ত্রী আগে মারা যেতে পারেন এবং তার স্বামী নিজে উদ্বৃত্ত পুরুষ হিসেবে থেকে যেতে পারেন যাঁকে দল সমবেদনা জানাতে পারে স্বজন বিয়োগের জন্য। আর এই বাড়তি পুরুষেরও একটা সমাধান করতে হবে নয়তো সেও বর্ণের বাইরে গিয়ে বিয়ে করে অন্তর্বিবাহের নিয়ম লঙ্ঘন করবেন। যদি না দেখভাল করা হয়, তাহলে বাড়তি পুরুষ এবং বাড়তি মহিলা প্রস্তাবিত গণ্ডির মধ্যে তাঁদের যোগ্য সঙ্গী না-পেয়ে বর্ণপ্রথার মধ্যে একটা সমস্যা সৃষ্টি করবেন। আর যদি তাঁদের নিজেদের ওপরও ব্যাপারটা ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলেও তাঁরা সঙ্গী পায় না শুধুমাত্র এই কারণে যে, সেই বর্ণে যথেষ্ট যুগল  নেই বলে। আর তখনই তাঁরা সীমা লঙ্ঘন করে তাঁদের নিজেদের বর্ণের বাইরে গিয়ে বিয়ে করবে এবং যে সন্তান উৎপাদিত হবে সে বর্ণের কাছে বহিরাগত হিসেবে থেকে যাবে। 

এবার দেখা যাক এই উদ্বৃত্ত পুরুষ এবং উদ্বৃত্ত মহিলাকে আমাদের সেই কল্পিত দলটি কীভাবে সামলায়। আমরা প্রথমেই উদ্বৃত্ত মহিলার বিষয়টায় আসব। বর্ণের মধ্যে অন্তর্বিবাহকে টিকিয়ে রাখতে গেলে এইধরনের মহিলার বিষয়ে দুটো ভিন্ন উপায়ে মীমাংসা করতে হবে। প্রথমত, তাঁকে জীবিত অবস্থায় তাঁর মৃত স্বামীর চিতায় উঠিয়ে পুড়িয়ে দিতে হবে এবং মুক্তি দিতে হবে। কিন্তু লিঙ্গবৈষম্যের সমস্যা দূরীকরণে এটা খুব একটা কার্যকর হবে না। কিছু ক্ষেত্রে কাজ হলেও হতে পারে কিন্তু সবক্ষেত্রে নয়। ফলত, প্রত্যেক উদ্বৃত্ত মহিলাকে এইভাবে বহিষ্কার করা যাবে না। কারণ এটা সহজ সমাধান হলেও বাস্তবায়িত করা খুবই কঠিন। এভাবে উদ্বৃত্ত মহিলাকে (=বিধবাকে) যদি বহিষ্কার না করা হয় তাহলে তিনি দলে থেকে যান। কিন্তু তাঁর জীবনের প্রতিটি চলার ক্ষেত্রে উভয় সংকট রয়ে যায়। তিনি নিজের বর্ণের বাইরে গিয়ে বিয়ে করলে অন্তর্বিবাহের নিয়ম লঙ্ঘিত হয়। তিনি নিজের বর্ণের মধ্যেও বিয়ে করতে পারেন, কিন্তু তাতে সেই বিয়ের ওপর হস্তক্ষেপ হতে পারে, যা হয়তো নববধূর জন্য তোলা ছিল। তাই যে-কোনও উপায়ে তিনি সমাজের কাছে একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ান, এবং তাই তার একটা সুরাহা করতে হবে যদি না তাঁকে তাঁর মৃত স্বামীর সঙ্গে একই চিতায় পোড়ানো হয়। 

দ্বিতীয় প্রতিকারটি হল সেই মহিলার বাকি জীবনে বৈধব্য আরোপ করা। সার্বিকভাবে দেখতে গেলে বৈধব্য আরোপ করার চাইতে চিতায় পুড়িয়ে দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ সমাধান। উদ্বৃত্ত মহিলার জীবনে যে তিনটি সমস্যা জড়িয়ে আছে পুড়িয়ে মারলে তার সবকটি নির্মূল হয়ে যাবে। মরে গিয়ে সে আর পুনর্বিবাহের সমস্যা তৈরি করবে না তা সে বর্ণের মধ্যেই হোক বা বাইরেই হোক। কিন্তু পুড়িয়ে মারার চাইতে বাধ্যতামূলক বৈধব্য অনেক বেশি উচ্চমানের কারণ এটা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। পাশাপাশি, তুলনামূলকভাবে এটা অনেক বেশি মানবিক কারণ পুড়িয়ে মারা বা পুনর্বিবাহের মত কু-প্রথার বিরুদ্ধে বৈধব্য একটা রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে। কিন্তু একই সঙ্গে এটা গোষ্ঠীর নীতিকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। নিঃসন্দেহে যেহেতু সেই মহিলাকে বাধ্য হয়ে বৈধব্য মেনে নিতে হয় এবং ভবিষ্যতের বৈধ স্ত্রী হওয়ার স্বাভাবিক অধিকার থেকে তাঁকে বঞ্চিত হতে হয়, তাই তাঁর অনৈতিক আচরণ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। কিন্তু এমন নয় যে এর কোনও আশু সমাধান নেই। সমাজে সেই মহিলার এমনই হাল করে রাখা হয় যে যাতে তিনি কোনোভাবেই প্রলোভনের সামগ্রী না হয়ে ওঠে। 

যে গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে বর্ণ তৈরি করতে চায় তাদের উদ্বৃত্ত মহিলাকে নিয়ে যত না সমস্যা তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর সমস্যা উদ্বৃত্ত পুরুষ (=বিপত্নীক)-কে নিয়ে। আদি অনন্তকাল ধরে সমাজে মহিলাদের তুলনায় পুরুষরাই কর্তৃত্ব ফলিয়ে এসেছে। প্রত্যেক গোষ্ঠীতে পুরুষরাই প্রধান হয় এবং স্ত্রীর তুলনায় সর্বোচ্চ আসন পেয়ে থাকে। নারীর ওপর পুরুষের এই যে চিরাচরিত কর্তৃত্ব তার প্রভাবেই পুরুষের ইচ্ছাই সবসময় মান্যতা পেয়ে থাকে। অপরদিকে, মহিলারা সর্বপ্রকার সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় পরিসরে খুব সহজেই অন্যায় অবিচারের শিকার হয়েছেন। কিন্তু, পুরুষরা আইনরচয়িতা হিসাবে সবসময় আইনের ঊর্ধ্বে থেকে গেছেন। আর এরকমই যখন ব্যাপারটা দাঁড়ায়, তখন একই বর্ণে একজন উদ্বৃত্ত মহিলার প্রতি আপনারা যে আচরণ করেন, সেই একই আচরণ একজন উদ্বৃত্ত পুরুষের প্রতি করতে পারবেন না। 

মৃত স্ত্রীর সঙ্গে জীবন্ত স্বামীকে পুড়িয়ে মারার দৃশ্য দু-দিক থেকে অস্বস্তিকর। প্রথমত, এটা করাই যাবে না কেবলমাত্র তিনি পুরুষ বলে। দ্বিতীয়ত, যদি করা হয়ও, একটা বর্ণ তার একজন বলিষ্ঠ আত্মাকে হারাবে। তাহলে তাঁর (সেই পুরুষের) বিষয়টা নির্ঝঞ্ঝাটে মীমাংসা করার জন্য আর মাত্র দুটো সমাধানের পথই খোলা থাকে। আমি নির্ঝঞ্ঝাটে কথাটা বললাম, কারণ পুরুষ গোষ্ঠীর কাছে একটা বড়ো সম্পদ। 

তিনি (পুরুষ) যেমন গোষ্ঠীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেরকম অন্তর্বিবাহ টিকিয়ে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ, এবং এমন একটা সমাধান বের করতে হবে যাতে দু-দিকই বজায় থাকে। এই পরিস্থিতিতে, তাঁকে বাধ্য করা হয় অথবা, আমার মনে হয়, প্ররোচিত করা হয় বাকি জীবন বিধবাদের মতোই বিপত্নীক হিসাবে কাটিয়ে দিতে। এই সমাধানটা খুব একটা গোলমেলে নয়, কারণ কোনও রকম বাধ্যবাধকতা ছাড়াও কেউ কেউ নিজে থেকে ইচ্ছুক থাকে স্ব-আরোপিত কৌমার্য পালন করতে, অথবা আরোও এক ধাপ এগিয়ে বললে, পৃথিবীর মায়া, সুখ ত্যাগ করতে। কিন্ত, মানবপ্রকৃতি যেমন তাতে আশা করা যায় না যে এই সমাধান বাস্তবায়িত করা সম্ভব। অপরদিকে, ঠিক যেরকমটা হওয়ারই ছিল, যদি গোষ্ঠীর কার্যকলাপে উদ্বৃত্ত পুরুষ সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসাবে থাকে তাহলে গোষ্ঠীর নীতির পথে তিনি কাঁটা হিসাবে থেকে যান। যদি অন্যভাবে দেখি ব্যাপারটা, তাহলে দেখা যায় যে বর্ণপ্রথা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কৌমার্যধারণ (যদিও ক্ষেত্রবিশেষে সফল হয়) খুব একটা কার্যকরী পন্থা নয়। যদি কেউ একনিষ্ঠভাবে সাত্ত্বিক থাকতে পারেন এবং পার্থিব সুখভোগ থেকে বিরত থাকতে পারেন, তাহলে তিনি অন্তর্বিবাহ বা বর্ণপ্রথা সংরক্ষণে কোনও বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না। যতক্ষণ তাঁর বর্ণ পার্থিব সমৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত ততক্ষণ সেই কঠোর তপস্বী অগ্নিদগ্ধের মতোই পবিত্র। একটা সম্প্রদায়কে বীর্যবান হিসাবে গড়ে তুলতে গেলে একটা বর্ণকে যথেষ্ট বড়ো হতে হবে এবং তার জন্য বর্ণকে নির্দিষ্ট সাংখ্যিক শক্তি অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। আর সেই আশাতেই বুক বাঁধতে গিয়ে কৌমার্যকে মান্যতা দেওয়া হবে ক্ষয়িষ্ণুতাকে রক্তপাতের মাধ্যমে নিরাময় করার সমান।

গোষ্ঠীর উদ্বৃত্ত পুরুষের ওপর কৌমার্যকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া তাত্ত্বিকভাবে এবং কার্যগতভাবে উভয়দিক থেকেই ব্যর্থ হয়। বর্ণকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই তাঁকে গৃহস্থ (যে পরিবার গড়ে তোলে) করে রাখা হয়। আর এই গৃহস্থ একটি সংস্কৃত পারিভাষিক শব্দ। কিন্তু সমস্যা হল বর্ণের ভিতর থেকে তাঁর (উদ্বৃত্ত পুরুষের) জন্য স্ত্রী প্রদান করা। শুরুতেই এটা সম্ভব নয় কারণ একটা বর্ণে একজন মহিলা প্রতি একজন পুরুষ সমান অনুপাতে থাকে এবং এঁদের দুজনেরই দুবার দুবার বিয়ে করার সুযোগ থাকে না। একটা স্বয়ংবদ্ধ বর্ণে কয়েকজন বিবাহযোগ্য পুরুষের জন্য সেই পরিমাণ বিবাহযোগ্য মহিলাই থাকে। এই পরিস্থিতিতে উদ্বৃত্ত পুরুষকে গোষ্ঠীতে আটকে রাখার জন্য অবিবাহযোগ্যা মেয়েকেই পাত্রী হিসেবে দিতে হবে। আর  উদ্বৃত্ত পুরুষের ক্ষেত্রে এটাই হয়তো সব থেকে ভালো সম্ভাব্য সমাধান। এভাবেই তাঁকে বর্ণের মধ্যে আটকে রাখা হয়। এই পদ্ধতিতেই উদ্বৃত্ত পুরুষ জোগানের মাধ্যমে সামগ্রিক পুরুষ সংখ্যার ঘাটতি কমানো হয়। আর এভাবেই অন্তর্বিবাহ এবং বর্ণপ্রথার নীতি  রক্ষা করা হয়। 

এবার দেখা যাক কোন্ চারটি উপায়ে দুটি লিঙ্গের মধ্যে যে সংখ্যাগত বৈষম্য আছে তা কত সুন্দর ভাবে বজায় রাখা হয়। যথা — 

১) মৃত স্বামীর সঙ্গে বিধবাকে পুড়িয়ে মারা।

২) বাধ্যতামূলক বৈধব্য — পুড়িয়ে মারারই ক্ষুদ্র সংস্করণ।

৩) বিপত্নীকের ওপর জোর করে কৌমার্য চাপিয়ে দেওয়া।

৪) অবিবাহযোগ্যা মেয়ের সঙ্গে তাঁর (বিপত্নীকের) বিয়ে দিয়ে দেওয়া। 

যদিও আমি আগেই বলেছি সতীদাহ বা বিধবাকে পুড়িয়ে মারার বা বিপত্নীকের ওপর কৌমার্য আরোপ করা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে পথের কাঁটা হয়ে উঠবে অন্তর্বিবাহকে রক্ষা করতে গেলে। কারণ এগুলো প্রত্যেকটাই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই হাতিয়ারগুলো যখন শক্তি হিসাবে প্রযুক্ত হয় তখন তারা সমাপ্তি ঘোষণা করে। তাহলে সেই সমাপ্তি কী যা এই পদ্ধতিগুলোকে তৈরি করে? এরাই অন্তর্বিবাহ চালু করে এবং এগিয়ে নিয়ে যায।  বর্ণের বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রসঙ্গে আমাদের যে বিশ্লেষণ, সেই অনুযায়ী বর্ণ এবং অন্তর্বিবাহ একটাই বিষয় এবং একই বিষয়। তাই এই নিয়মগুলো টিকে থাকা অর্থেই বর্ণপ্রথা টিকে থাকা। কারণ বর্ণ প্রথার মাধ্যমে এই নিয়মকানুনগুলো বজায় থাকে। 

আমার মতে, বর্ণপ্রথায় এটাই হল বর্ণের সাধারণ কার্যনির্বাহী পন্থা। এবার হিন্দু সমাজের বর্ণের বিভিন্ন ভাগগুলোর বদলে তাদের কার্যনির্বাহী পন্থা সম্পর্কে জানা যাক। প্রথমেই উল্লেখ করে নেওয়া ভালো যে, যে-ই অতীতকে খুঁড়তে যাবে তাকেই চোরাগর্তে পড়তে হবে এবং কে না জানে বর্ণপ্রথা ভারতের একটি বহু প্রাচীন প্রতিষ্ঠান। এটা বিশেষ করে সত্যি, যেখানে কোনও বিশ্বাসযোগ্য বা লিখিত তথ্য নেই। অথবা জনসাধারণ, যেমন হিন্দুরা, এতটাই দৃঢ়মনস্থ যে, তাঁদের কাছে ইতিহাস লিখতে যাওয়া মূর্খামির নামান্তর। কারণ তাঁদের কাছে পৃথিবীটাই ভ্রম মাত্র। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলি টিকে আছে যদিও বহুবছর ধরে তার নথিভুক্তিকরণ হয়নি। অথচ প্রথা এবং রীতিনীতি জীবাশ্মের মতো যার নিজস্ব একটা ইতিহাস আছে। এটাই যদি সত্যি হয় তাহলে আমাদের কাজকে পুরস্কৃত করা হবে যখন আমরা সেই সমাধানের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করব, যে সমাধানের পথ হিন্দুরা খুঁজে বার করেছে উদ্বৃত্ত পুরুষ ও উদ্বৃত্ত মহিলার জন্য। হিন্দুসমাজ পত্নী হত্যার তিনটে অনন্য প্রথার কথা উপস্থাপন করেছে যা বাস্তবায়িত করা, একজন মামুলি পর্যবেক্ষকের চোখেও জটিল — 

ক) মৃত স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় বিধবাকে পুড়িয়ে মারা বা সতীদাহ করা।

খ) বলপূর্বক বৈধব্য যার দ্বারা বিধবাকে পুনর্বিবাহ করার অনুমতি দেওয়া হয় না।

গ) বালিকা বিবাহ। 

উপরন্তু বিপত্নীকের সন্ন্যাসগ্রহণের প্রতি আসক্তির বিষয়টাও কেউ কেউ খেয়াল করতে পারেন, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এটা তাঁর মানসিক স্থিতাবস্থার প্রতিফলন হতে পারে।

যতদূর আমি জানি আজকের যুগেও এই প্রথাগুলোর উৎস সম্পর্কে কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। প্রথাগুলো কেন মেনে চলা হত তার অনেক দর্শন আছে। কিন্তু এই প্রথার উৎস এবং অস্তিত্বের কারণ সম্পর্কে কোনও দার্শনিক ব্যাখ্যা নেই।  সতীদাহ প্রথাকে সম্মান জানানো হত (c.f. A.K. Coomaraswamy, “Sati : A Defence of the Eastern Woman” in the British Sociological Review, vol vi, 1913)। কারণ এই প্রথাকে “স্বামী এবং স্ত্রীর শরীর ও আত্মার মিলন” এর প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হত। সতীদাহকে সমাধিস্থলের ঊর্ধ্বে গিয়ে ভক্তি প্রদর্শন হিসাবেও পরিগণিত করা হত। কারণ এর মাধ্যমে প্রকাশিত হত আদর্শ পত্নীত্ব। যার খুব সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন উমা। উমা বলেছেন, “গুরুর প্রতি নিবেদনই হল একজন মহিলার কর্তব্যপরায়ণতা, এটাই তাঁর শাশ্বত স্বর্গ এবং ‘ও মহেশ্বর’ ”, মানবদরদি কান্নায় তিনি এও বলেছেন যে, “তুমি যদি আমার সাথে সন্তুষ্ট না হও তাহলে আমার আর স্বর্গ চাই না।” আমি জানিনা বাধ্যতামূলক বৈধব্যকে কেন পুজো করা হয়। আমার সঙ্গে এমন কারোর দেখা হয়নি যে বৈধব্যের উচ্চ প্রশংসা করে, যদিও দেখি কেউ কেউ বৈধব্য মেনে চলেন। বাল্যবিবাহ সম্পর্কে ডঃ কেটকার যে প্রশংসাত্মক বিবৃতি দিয়েছেন তা পেশ করা হল : “একজন সত্যিকারের বিশ্বস্ত পুরুষ বা নারী যার সাথে মিলিত হয়েছে সে ব্যতীত অন্য কোনও নারী বা পুরুষের প্রতি আসক্ত বোধ করবে না। এই ধরনের চারিত্রিক শুদ্ধতা কেবল বিয়ের পর নয় বিয়ের আগেও বাধ্যতামূলক। কারণ এটাই একমাত্র যথার্থ সতীত্বের আদর্শ। যে পুরুষের সাথে তার (অবিবাহিত মেয়ের) বিয়ে হতে চলেছে তাকে ব্যতীত অন্য কারোর প্রতি ভালোবাসা জন্মালে সেই অবিবাহিত মেয়েকে শুদ্ধ বলে পরিগণিত করা হবে না। যেহেতু সেই মেয়েটি জানে না কার সাথে তার বিয়ে হতে চলেছে, তাই বিয়ের আগে কোনও পুরুষের প্রতিই তার প্রেম অনুভব করা চলবে না। যদি সে করে তাহলে সেটা পাপ। তাই কোনও মেয়ের মধ্যে যৌন সচেতনতা জাগরিত হওয়ার আগে এটা জেনে নেওয়া ভালো যে, কাকে (কোন্ পুরুষকে) সে (মেয়েটি) ভালবাসবে। আর তাই বাল্যবিবাহ।”

এই আড়ম্বরপূর্ণ এবং আনকোরা কু-তর্কগুলো ইঙ্গিত দেয় কেন এই প্রতিষ্ঠানগুলো মান্যতা পেয়েছে কিন্তু এরা কখনোই বলে না যে কেন এগুলো অনুশীলিত হয়েছে। আমার নিজের ব্যাখ্যা হল যে এরা মান্যতা পেয়েছে কেবলমাত্র এরা অনুশীলিত হয়েছে বলেই। অষ্টাদশ শতাব্দীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ সম্পর্কে যিনি একটু হলেও পরিচিত তিনি আমার বক্তব্যকে সমর্থন করবেন। সর্বকালীন এই গতিবিধিটাই সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং পরবর্তীকালে একে নৈতিক সমর্থন জানাতে একে কেন্দ্র করেই অনেক দর্শন গড়ে ওঠে। 

আমি বলতে চাইছি যে এই প্রথাগুলো এতটাই উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে, যে সেটাই প্রমাণ করে এই প্রথাগুলোর প্রভাব বিস্তারের জন্য এই ধরনের চাটুকারিতার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। প্রথাগুলোর বাড়বাড়ন্ত হল কেন সেই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলব বর্ণপ্রথার কাঠামো গঠনে এই প্রথাগুলোর প্রয়োজন ছিল। আর এই প্রথাগুলি এতটাই জঘন্য এবং নৈতিক বোধের কাছে বিরক্তিকর ছিল যে এদেরকে শ্রুতিমধুর ও জনপ্রিয় করে তোলার জন্য দর্শনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এই আচার-বিচার যদিও আদর্শ হিসাবে উপস্থাপন করা হত, আসলে তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হত। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে এর প্রভাব কী হত। কেউ কেউ বেশ নিরাপদেই বলতে পারেন, কার্যসাধনের জন্য হাতিয়ারগুলোকে আদর্শায়িত করার প্রয়োজন পড়েছিল। সেই বিশেষ ক্ষেত্রে বলতেই হয় যে, আদর্শায়িত করা হয়েছিল বলেই ওই হাতিয়ারের কার্যক্ষমতা আরও বেড়ে গিয়েছিল। কার্যনির্বাহী পন্থাকে চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়ার মধ্যে ক্ষতি কিছু নেই যতক্ষণ না তা মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে রাখে। কিন্তু এই কার্যনির্বাহী পন্থাগুলো প্রকৃত চরিত্রকে বর্জন করে চলে না। আপনারা এমন একটা আইন পাশ করতেই পারেন যেখানে সব বিড়ালই কুকুর। যেরকম আপনি এই প্রথাকে চূড়ান্ত বলে ধরে নিচ্ছেন। কিন্তু আপনি আর  এই প্রথার চরিত্রকে বদলাতে পারবেন না, যেরকমটা আপনি বিড়ালকে কুকুরে রূপান্তরিত করতে পারবেন না। ফলস্বরূপ আমি এটা বলতেই পারি যে, তা সে চূড়ান্ত হিসাবেই পরিগণিত হোক বা কার্যনির্বাহী পন্থা হিসেবে, সতীদাহ প্রথা, বাধ্যতামূলক বৈধব্য এবং বাল্যবিবাহের মতো তিনটি প্রথা প্রাথমিকভাবে উদ্ভূত হয়েছিল একটা বর্ণে উদ্বৃত্ত পুরুষ ও উদ্বৃত্ত মহিলাকে নিয়ে যে সমস্যা তার  সমাধানে এবং অন্তর্বিবাহ সংরক্ষণে। এই প্রথা ব্যতীত কঠোরভাবে অন্তর্বিবাহের নিয়ম রক্ষা করা যাবে না, আর অন্তর্বিবাহ ছাড়া বর্ণ একটি ছলনা মাত্র। 

ভারতবর্ষে জাতপাত কীভাবে টিকে আছে এবং বর্ণ সৃষ্টির কার্যপ্রণালীগুলো সম্পর্কে ব্যাখ্যা করার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা যে প্রশ্নের উত্থান হয়, তা হল বর্ণের সৃষ্টিতত্ত্ব। সৃষ্টি কীভাবে হল — সেই প্রশ্ন সবসময়ই বিভ্রান্তিমূলক এবং যখন সেটা একটি বর্ণ সম্পর্কিত হয়, তখন তা উপেক্ষিতই থেকে যায়। কেউ কেউ দেখেও না দেখার ভান করেছে, কেউ সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছে, কেউ আবার এটা ভেবে হতভম্ব হয়ে গিয়েছে যে  জাতপাত এর উৎস বলে কিছু থাকতে পারে! এবং পরামর্শ দিয়েছে এই বলে, “যদি ‘উৎস’ শব্দটার প্রতি আমরা আমাদের ভালোলাগা কাটিয়ে উঠতে না পারি তাহলে আমাদের বহুবচন ব্যবহার করা উচিত নয়, যথা — ‘বর্ণের উৎস সমূহ’।” ভারতবর্ষের জাতপাতের উৎস নিয়ে আমি মোটেই অবাক নই। কারণ আমি পূর্বেই প্রতিস্থাপন করেছি যে, বর্ণের একমাত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হল অন্তর্বিবাহ। আমি যখন বলি বর্ণের উৎসের কথা, তখন আমি আসলে বোঝাতে চাই অন্তর্বিবাহের কার্যপ্রণালীর উৎসের কথা। 

বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তৃতায় ব্যক্তিমানুষ সম্পর্কে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ধারণাকে ভীষণভাবে জনপ্রিয় করে তোলা হয়েছে। আমি তো বলব জনসাধারণের অধিগম্য করে তোলা হয়েছে। এবং সেটাই হল সবথেকে বড় প্রতারণা।  ব্যক্তি মানুষ যে সমাজ গড়ে তোলে সেটা একটা নগণ্য ব্যাপার, সমাজ সবসময়ই শ্রেণি দ্বারা গঠিত হয়। শ্রেণি-সংঘাত তত্ত্বের কথা এখানে জাহির করা অতিরঞ্জন হলেও হতে পারে, কিন্তু এটা ঘটনা যে একটা সমাজে নির্দিষ্ট কতগুলো শ্রেণির অস্তিত্ব আছে। তাদের ভিত্তি আলাদা হতেই পারে। সেটা অর্থনৈতিক, অথবা বৌদ্ধিক অথবা সামাজিক হতেই পারে। কিন্তু সমাজে একজন ব্যক্তি সবসময় কোনও-না-কোনও  শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এটা বিশ্বজনীন ঘটনা এবং আদি হিন্দুসমাজও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। বিষয়টা যদি মাথায় রাখি তাহলে বর্ণের সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে আমাদের যে পাঠ, তা অনেক সহজতর হবে। আমাদের শুধু বিবেচনায় রাখতে হবে এই প্রশ্ন — শ্রেণি কি ছিল, যে নিজেকেই বর্ণ হিসেবে তৈরি করেছে? কেননা, শ্রেণি এবং বর্ণ দুটোই পাশের বাড়ির প্রতিবেশী। একমাত্র সময় এদেরকে আলাদা করেছে। বর্ণ হল স্বয়ংবদ্ধ  শ্রেণি। 

বর্ণের উৎপত্তি বিষয়ক আমাদের যে পাঠ তা নিশ্চয়ই আরও একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে — প্রশ্নটা হল শ্রেণি কি নিজেই নিজের চারিদিকে বেড়ি পরিয়ে রাখে? প্রশ্নটা শুনে মনে হতে পারে তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু এটাই প্রাসঙ্গিক। এই প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে আমরা বিশদে জানতে পারব সারা ভারতবর্ষব্যাপী কীভাবে বর্ণের উত্থান হল এবং এর ক্রমবিকাশের রহস্যটাই বা কী? দুর্ভাগ্যবশত এই প্রশ্নের সরাসরি কোনও উত্তর দেওয়া আমার ক্ষমতায় কুলোবে না। আমি কেবল পরোক্ষভাবেই এর উত্তর দিতে পারি। একটু আগেই আমি বলেছি, হিন্দু সমাজে অনেক প্রথা প্রচলিত ছিল। কারণ এটাই তাদের প্রভাব বিস্তারে সার্বজনীনতা প্রকাশ করে। একমাত্র একটি বর্ণই এই কঠোর নিয়মগুলো পালন করতে সক্ষম হয়েছে — ব্রাহ্মণ বর্ণ, যারা হিন্দু সমাজে ক্রমোচ্চ শ্রেণিবিভাগে সর্বোচ্চ আসন দখল করে থাকে। অব্রাহ্মণ বর্ণগুলোয় তাঁদের প্রভাব বিস্তার প্রকৃতি-প্রত্যয়গত। এদিকে অ-ব্রাহ্মণ বর্ণের ক্রিয়াকর্ম না খুব কঠোর, না তা সম্পূর্ণ। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা কিন্তু খাঁটি পর্যবেক্ষণের মূল ভিত্তি হতে পারে। অব্রাহ্মণ বর্ণগুলোর মধ্যে এই প্রথার প্রাদুর্ভাব যদি প্রকৃতি-প্রত্যয়গত হয়ে থাকে, যা খুবই সহজে দেখানো যায়, তাহলে বর্ণপ্রথার জনক কোন্ শ্রেণি তা প্রমাণ করার জন্য আর কোনও তর্কবিতর্কের প্রয়োজন হবে না। কেন ব্রাহ্মণ শ্রেণিকে একটা বর্ণে আবদ্ধ করে নিতে হল তা আলাদা প্রশ্ন, যা নিয়ে পরে কখনও আলোচনা করা যাবে। কিন্তু সমস্ত প্রাচীন সভ্যতায় ব্রাহ্মণ শ্রেণি সর্বোচ্চ আসন লাভ করে এসেছে এবং কঠোর রীতিনীতি পালন করে এসেছে। এই দুই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, ব্রাহ্মণরাই এই ‘অপ্রাকৃতিক’ প্রতিষ্ঠানের জনক যা অপ্রাকৃতিক উপায়ে গড়ে তোলা এবং বজায় রাখা হয়েছে। 

এবার আমি আমার রচনার তৃতীয় অংশে আসব। এখানে আমি আলোচনা করেছি যে কীভাবে সারা ভারতবর্ষব্যাপী জাতিভেদ প্রথার উত্থান এবং তার প্রভাব বিস্তৃত হল। যে প্রশ্নের উত্তর  আমাকে দিতে হবে তা হল : দেশের অব্রাহ্মণ জনজাতির মধ্যে জাতিভেদ প্রথা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল? বর্ণের সৃষ্টিতত্ত্বের চেয়ে সারা ভারতবর্ষব্যাপী বর্ণের প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নই বেশি করে ঘুরপাক খেয়েছে। তার প্রধান কারণ, আমার যা মনে হয়, বর্ণপ্রথার প্রভাব বিস্তার এবং উৎপত্তি বিষয়ক যে দুটো প্রশ্ন আছে তা কখনও আলাদা করা হয়নি। পণ্ডিতদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা আছে, ভারতের নিরীহ জনগণের ওপর বর্ণপ্রথা কে কোনও আইনপ্রণেতা স্বর্গীয় বিধান হিসেবে চাপিয়ে দিয়ে গেছেন, অথবা কোনও সামাজিক নিয়মেই তা বেড়ে উঠেছে। 

প্রথমে ভারতবর্ষের আইন প্রণেতার কথায় আসব। প্রত্যেক দেশেই আইন রচয়িতা থাকেন, যিনি জরুরি অবস্থায় ‘অবতার’ রূপে দেখা দেন এবং বিপথগামী জনতাকে সঠিক রাস্তায় ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর থাকেন। সেই উদ্দেশ্যেই ন্যায় বিচার ও নৈতিকতার আইন তৈরি করেন। মনু, ভারতের আইনকর্তা, (যদি তাঁর অস্তিত্ব থাকে) নিঃসন্দেহে একজন উদ্ধত ব্যক্তি। মনু-ই বর্ণপ্রথার আইন রচনা করেছেন — এই গল্পটাকে যদি মান্যতা দিতে হয়, তাহলে বলতেই হয় তিনি একজন দুঃসাহসী ব্যক্তি। আর যে মানবজাতি মনুর দেওয়া বিধানকে স্বীকৃতি দিয়েছে সেই মানবজাতি আমাদের পরিচিত মানবজাতির চেয়ে কিছুটা আলাদাই হবে। এটা বলা বাহুল্য হবে না যে, মনু নিজের দেওয়া বিধানের ঊর্ধ্বে নিজেই উঠতে পারেননি। কারণ সেই শ্রেণি কি আদৌ কোনও শ্রেণি যারা মানুষের কলমের খোঁচায় অন্য শ্রেণিকে পাশবিক শ্রেণিতে রূপান্তরিত করে এবং অন্য শ্রেণিকে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর জন্য অপর শ্রেণিকে কষ্ট দেয়! যদি না তিনি স্বৈরাচারী হন তাহলে কোনও জনজাতির সঙ্গে সে এমন করতে পারেন না। এটা কল্পনা করা যায় না যে, তিনি কোন্ অনৈতিক উপায়ে পৃষ্ঠপোষকতা জারি রাখেন, অবশ্য প্রতিষ্ঠানের দিকে চোখ রাখলেই তা সহজে বোঝা যাবে। মনে হতে পারে যে মনুর প্রতি আমি একটু কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করছি, কিন্তু আমি নিশ্চিত যে আমার এত ক্ষমতা নেই যে মনুর ভূতকে আমি তাড়াতে পারব। সে অশরীরী আত্মার মতো বেঁচে আছেন। আমার মনে হয় আরও বহু দিন বেঁচে থাকবেন। যে কথাটা আমি জোর দিয়ে বলতে চাইছি সেটা হল — বর্ণপ্রথা মনু রচনা করে যাননি এবং তিনি করতেও পারেন না। মনু আসার বহু পূর্বেই বর্ণ বিদ্যমান ছিল। মনু কেবল এর পৃষ্ঠপোষক মাত্র। এ বিষয়ে অনেকেই দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এটা নিশ্চিত, হিন্দু সমাজের বর্তমান আইন মনু বলবৎ করেননি, করতে পারেন না। জাতি ধর্ম সম্পর্কে উপদেশ দেওয়া এবং প্রচলিত বর্ণপ্রথার রীতিনীতিগুলোকে লিপিবদ্ধ করার মধ্য দিয়ে মনুর কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। জাতিভেদ প্রথার উত্থান ও পরিব্যাপ্তি এতটাই অতিকায় কাজ যে একা কোনও ব্যক্তি বা একটা শ্রেণির ক্ষমতাতে কুলাবে না তা সম্পন্ন করার। ব্রাহ্মণরা যে বর্ণ সৃষ্টি করেছে এই তত্ত্বের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি খাটে। মনু সম্পর্কে যা বললাম তারপর মনে হয় না আমার আর কিছু বলার থাকতে পারে। শুধু এটুকুই বলব যে একা কারোর ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়াটা সঠিক চিন্তা ভাবনা নয় এবং এর অভিপ্রায় বিদ্বেষপূর্ণ। ব্রাহ্মণরা অনেক দোষের ভাগিদার কিন্তু অব্রাহ্মণ জনজাতির ওপর বর্ণপ্রথা চাপিয়ে দেওয়াটা তাদের এক্তিয়ারের বাইরে। ভাসাভাসা দার্শনিক চিন্তার ওপর ভর করে তাঁরা তাঁদের কার্যপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন কিন্তু নিশ্চিতভাবে তাঁরা তাঁদের গণ্ডির বাইরে তাঁদের  পরিলেখকে ঠেলে দেননি। নিজের মতো করে সমাজকে গড়েপিটে নাও! আহা কী গৌরবময়! কী কঠিন! কেউ কেউ আনন্দ উপভোগ করতে পারেন এবং এর  উন্নতি সাধনে উচ্চ প্রশংসা করতে পারেন, কিন্তু তারপর আর বেশিদূর উন্নতিবিধান করতে পারেন না। রক্ষণশীল হিন্দুদের মধ্যে স্থির বিশ্বাস আছে যে হিন্দু সমাজ জাতিভেদ প্রথার কাঠামোয় গড়ে উঠেছে। সচেতনভাবে এই সংঘটি শাস্ত্র দ্বারা সৃষ্ট। শুধু এই বিশ্বাসই অটুট নয় বরং এই যুক্তিও মানা হয় যে, এই প্রথা ভালো না হয়ে পারে না, কারণ এই প্রথা শাস্ত্র দ্বারা স্বীকৃত, আর শাস্ত্র কখনও ভুল হতে পারে না। এই মনোভাবের বিপরীত মনোভাব আমি প্রদর্শন করছি। তবে এই কারণে নয় যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর ধর্মীয় শুদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে বলে, না সেইসব সমাজসংস্কারকদের সমর্থনে যাঁরা এর বিরুদ্ধে ধর্মোপদেশ দিয়েছেন। ধর্মোপদেশ বর্ণপ্রথা গড়ে তোলেনি, বিনাশও করেনি। আমার উদ্দেশ্য হল সেই দৃষ্টিভঙ্গির ভুলটা দেখিয়ে দেওয়া, যে দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে ধর্মীয় পবিত্রতায় উন্নীত করা হয়েছে।  

ভারতবর্ষে বর্ণপ্রথা কীভাবে প্রভাব বিস্তার করল সেই রহস্যের সমাধান কিন্তু মহামানবতত্ত্ব থেকে পাওয়া যায় না। পাশ্চাত্য পণ্ডিতরা, যাঁরা হয়তো ব্যক্তিপূজায় খুব একটা বিশ্বাসী নন, এর অন্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, যে-যে মূল বিষয়কে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন বর্ণ গঠিত হয়েছে সেগুলি হল : ১) পেশা ২) উপজাতীয় গোষ্ঠীর বিদ্যমানতা ৩) নব ধারণার উন্মেষ ৪) সংকর প্রজনন এবং ৫) পরিযান (migration)। 

এখন প্রশ্ন করা যেতেই পারে যে এই মূল বিষয় গুলি অন্য সমাজে কি বিদ্যমান ছিল না? এবং এটা ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র সূচক কিনা! যদি তা কেবল ভারতেরই স্বতন্ত্রসূচক নয়, বিশ্বজনীন হয়, তাহলে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে তারা ‘বর্ণ’ গঠন করেননি কেন? তার কারণ কি এই যে, সেই প্রান্তগুলো বেদভূমির চেয়ে অনেক বেশি পবিত্র, নাকি অধ্যাপক মশাইরা ভুল করছেন? আমার মনে হয় শেষেরটাই সঠিক।

বিভিন্ন লেখকরা তাঁদের তত্ত্বের জন্য, যে তত্ত্ব উপরিউক্ত এক বা একাধিক মূল বিষয়ের ওপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে আছে, উচ্চ প্রশংসার দাবি করছেন। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে দুঃখের সঙ্গে বলতেই হবে যে, ওই বিষয়গুলি উদাহরণ মাত্র, তার বেশি কিছু নয়।  ম্যাথু আর্নল্ড যাকে বলেছেন “খালি কলসির আওয়াজ বেশি।”

বর্ণ সম্পর্কে এ রকমই নানান ভাসাভাসা তত্ত্ব পেশ করেছেন স্যার দেনজিল ইব্বেটসন, মিস্টার নেসফিল্ড, মিস্টার সেনাট এবং স্যার এইচ রিসলে। তাঁদের সমালোচনা করতে গেলে বলতে হয়, তাঁরা ক্ষুদ্র নীতির ছদ্মবেশী রূপ, যে ক্ষুদ্র নীতিতে আপ্তবাক্যকে সত্যি বলে ধরে নেওয়া হয়। মিস্টার নেসফিল্ডের কথাই ধরা যাক, তিনি বলেছেন, “একমাত্র ক্রিয়াকলাপের ওপর ভিত্তি করে ভারতে বর্ণপ্রথা গড়ে উঠেছে।” তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া ভাল, উপরিউক্ত বক্তব্য পেশ করে তিনি আমাদের চিন্তা ভাবনার পরিসরকে খুব একটা প্রসারিত করতে পারেননি, কারণ তিনি আদপে বলতে চেয়েছেন যে ভারতে জাতপাত একটি পেশাগত এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যা আসলে খুবই মামুলি আবিষ্কার। মিস্টার নেসফিল্ড থেকে আমাদের জানতে ইচ্ছে হয় কেন একটা পেশাগত দল পেশাগত বর্ণে পরিণত হল? মিস্টার নেসফিল্ডের তত্ত্ব খুবই সাধারণ মাপের না হলে আমি আনন্দের সঙ্গে অন্যান্য জাতিবিদদের তত্ত্বসমূহ সবিস্তারে আলোচনা করতাম।

বর্ণপ্রথা সম্পর্কে সমাজে অনেক প্রচলিত তত্ত্ব আছে। যেমন, কিছু তত্ত্ব বলে বিভাজন নীতির নিরিখে বর্ণপ্রথা একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, ঠিক যেমনটা হার্বাট স্পেন্সার তাঁর বিবর্ধনতত্ত্ব সম্পর্কে বলেছেন। আবার কিছু তত্ত্বে রক্ষণশীল কৈফিয়ৎদানকারীদের ভাষাশৈলী প্রয়োগ করে বর্ণপ্রথাকে একটি প্রতিষ্ঠানের গঠনগত তারতম্যের মতোই প্রাকৃতিক ঘটনা হিসাবে দেখানো হয়েছে। আবার কেউ ব্যাখ্যা করেছেন যে, সুপ্রজনন বিদ্যা নীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য বর্ণপ্রথা ছিল একটা প্রয়াস মাত্র। কিন্তু সবাই ভুল রাস্তায় হেঁটেছিলেন। তার কারণ, তাঁরা বর্ণপ্রথাকে অনিবার্য ঘটনা হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। অথবা ভেবে নিয়েছিলেন যে নিরীহ অসহায় জনজাতির ওপর বর্ণপ্রথার নিয়মকানুন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত তত্ত্বের সমালোচনা না থামিয়ে, এই বিষয়ে আমার কী ব্যক্তিগত মত তা এখন আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরব। প্রথমেই স্মরণ করিয়ে দেওয়া ভালো অন্য সমাজের মতোই হিন্দু সমাজও শ্রেণি দ্বারাই নির্মিত হয়েছিল — 

১) ব্রাহ্মণ বা যজমান শ্রেণি

২) ক্ষত্রিয় বা সামরিক শ্রেণি

৩) বৈশ্য বা বণিক শ্রেণি

৪) শূদ্র বা কারিগর এবং দাস শ্রেণি

যে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে তা হল, বর্ণপ্রথা মূলত শ্রেণিতন্ত্র ছিল, যেখানে একজন ব্যক্তিমানুষ যোগ্যতা অর্জন করলেই তার শ্রেণি বদলাতে পারে, এবং তদনুরূপভাবে শ্রেণিসমূহ তাদের ব্যক্তিবর্গ বদলাতে পারে। হিন্দুদের ইতিহাসে একটা সময়ে যজমান শ্রেণি সমাজের আর বাকি শ্রেণিদের থেকে নিজেদের আলাদা করে এবং রুদ্ধদ্বারনীতি অবলম্বন করে নিজেরাই একটা বর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। সমাজের অন্যান্য শ্রেণিরা শ্রম বিভাজন নীতির বশবর্তী হয়ে ছোটো-বড়ো নানান বর্গে ভাগ হয়ে গেছেন। বৈশ্য এবং শূদ্র শ্রেণি তাঁদের রক্তবীজে রূপদান করেছেন সমাজে অন্যান্য বর্ণ। এদিকে, সামরিক পেশায় খুব একটা শাখা-প্রশাখা নেই, তাই হয়তো ক্ষত্রিয় শ্রেণি সৈনিক ও প্রশাসক হিসেবে আলাদা হয়ে গিয়েছে। 

সমাজের এই উপবিভাগ ব্যাপারটা পুরোপুরি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এই উপবিভাগের অস্বাভাবিক দিকটা হল, এটা শ্রেণিতন্ত্রের মুক্তদ্বার নীতিকে অস্বীকার করেছে এবং একটি স্বয়ংবদ্ধ বর্গে পরিণত হয়েছে। একেই আমরা বর্ণ নামে চিনি। এখন প্রশ্ন হল তারা কি বাধ্য হয়েছে স্বয়ংবদ্ধ হতে এবং অন্তর্বিবাহ পালন করতে, নাকি তারা নিজেদের গরজেই স্বয়ংবদ্ধ হয়ে গিয়েছে? আমার মতে এর দু-রকম উত্তরই আছে : কেউ কেউ নিজেরাই দরজা বন্ধ করে দিয়ে স্বয়ংবদ্ধ হয়ে গেছে। অন্যরা দেখেছে দরজা আগে থেকে বন্ধ ছিল যেখানে তারা প্রবেশ করতে পারবে না। একটা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আর একটা অভ্যাসবলে কৃত। দুটি একে অপরের পরিপূরক। সার্বিকভাবে বর্ণ গঠনের বিষয় ব্যাখ্যা করার জন্য দুয়েরই প্রয়োজন। 

প্রথমে আমি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় আসব। এই প্রসঙ্গে যে প্রশ্নের উত্তর আমাদের দিতে হবে তা হল : কেন এই উপবিভাগগুলি বা শ্রেণিসমূহকে, যেগুলোকে আপনারা শ্রমনির্ভর, ধর্মীয় ইত্যাদি বলে থাকেন, তাদের স্বয়ংবদ্ধ হতে হল ও অন্তর্বিবাহ পালন করতে হল? আমার উত্তর হল — ব্রাহ্মণরা স্বয়ংবদ্ধ বলে। হিন্দু সমাজে সবর্ণ বিবাহ বা রুদ্ধদ্বারনীতি প্রচলিত ছিল। আর যেহেতু ব্রাহ্মণ্য বর্ণ সবর্ণবিবাহ চালু করেছিল, তাই সমস্ত অব্রাহ্মণ শ্রেণি বা উপবিভাগ সেই প্রথা সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ করেছিল এবং ফল স্বরূপ নিজেরাই অন্তর্বিবাহে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনুকরণের সংক্রমণে সংক্রামিত হয়ে এই সমস্ত উপবিভাগগুলি বিভাজননীতিতে অগ্রসর হয়েছিল এবং শেষপর্যন্ত নিজেদের শ্রেণিকে বর্ণে রূপান্তরিত করেছিল। মানবমনেই আছে অনুকরণের তীব্র প্রবণতা। আর এই অনুকরণের প্রবণতা থেকেই যে ভারতে বিভিন্ন বর্ণ গঠিত হয়েছে তা আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এর শিকড় এতটাই গভীরে প্রোথিত আছে যে, ওয়াল্টার বাগেহট তর্ক করেছেন — “অনুকরণকে কোনও সচেতন বা স্বতঃপ্রবৃত্ত প্রক্রিয়া হিসাবে আমাদের ভাবা উচিত নয়। অপরদিকে আমাদের মনের অবচেতন স্তরের এত গভীরে এটা চারিয়ে গেছে যে, যতক্ষণ না সচেতনভাবে ভাবা হয় ততক্ষণ এর অস্তিত্ব আলাদা করে অনুভবই করা যায় না। আমাদের চরিত্রে যে অনুকরণ করার প্রবণতা আছে তার প্রধান ক্ষেত্রই হল আমাদের বিশ্বাস। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমরা এটা ওটা বিশ্বাস করি। আর বিশ্বাস করি বলেই অনুকরণ করি। এই প্রবণতা আমাদের মনের দুর্বোধ্য স্তরে সুপ্ত আছে। যে বিশ্বাসশীলতার মধ্যে অনুকরণ প্রবণতা আছে তার মধ্যে আর সন্দেহ থাকতে পারে না।” গ্যাব্রিয়েল টার্ডে  অনুকরণের তিনটি নিয়মের কথা বলেছেন এবং অনুকরণ করার প্রবণতাকে বৈজ্ঞানিক পাঠের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনটে অনুকরণ নীতির মধ্যে একটি নীতি হল : অধস্তনরা সবসময় তাদের ঊর্ধ্বতনকে অনুকরণ করে। অথবা তাঁর (টার্ডের) উদ্ধৃতি তুলে ধরা যাক — “সুযোগ পেলেই অভিজাতরা সবসময় এবং সর্বত্রই তাঁদের নেতা, রাজা বা শাসনকর্তাকে অনুকরণ করে এবং অনুরূপভাবে জনসাধারণ সুযোগ পেলেই অভিজাতদের নকল করে।” (Laws of Imitation, tr. by E.C. Parsons, 2nd Edition, p.217)।  টার্ডের আরেকটি অনুকরণ নীতি হল : দূরত্ব অনুপাতে অনুকরণের ব্যাপ্তি বিপরীত দিকে পরিবর্তিত হয়। তাঁর নিজের ভাষায় — “সবচেয়ে নিকটস্থের মধ্যে যে সর্বোচ্চ ঊর্ধ্বতন, তাঁকে অনুকরণ করা হয়।” এমনকি মডেলের উদাহরণের যে প্রভাব, তা দূরত্বের বিপরীত দিকে এবং শ্রেষ্ঠত্বের দিকে ফলপ্রদ হয়েছে। এখানে দূরত্ব বলতে বুঝতে হবে সামাজিক দূরত্ব। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে, যদি আমাদের সেই ব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকত এবং তাঁকে অনুকরণ করার সবরকম সুযোগ থাকত, তাহলে স্থানিক ব্যবধান একটা অপরিচিত বিষয় হত। (সবচেয়ে কম ব্যবধানে) নিকটস্থ ব্যক্তিকে অনুকরণ করার যে নীতি, সেই নীতিই বুঝিয়ে দেয় দৃষ্টান্তের প্রভাব বিস্তারের চরিত্রকে, যে দৃষ্টান্ত সমাজের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরা (ব্রাহ্মণ) স্থাপন করেছেন।  

আমার মতে কিছু বর্ণ অনুকরণের দ্বারা নির্মিত। এই তত্ত্ব প্রমাণ করার সবথেকে ভালো উপায় হল এটা খুঁজে বার করা যে, অনুকরণের দ্বারা বর্ণ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলি সমাজে আজও বিদ্যমান আছে কিনা। বিশেষজ্ঞের মানদণ্ডে অনুকরণ এর জন্য শর্তগুলি হল — 

১) যাঁর থেকে অনুকরণ করা হচ্ছে তিনি যেন বর্গের মধ্যে পদমর্যাদালাভকারী হন।

২) সদস্যদের নিজেদের মধ্যে নিয়মিত এবং বহুবিধ যোগাযোগ থাকা। 

ভারতে যে এই শর্তগুলি উপস্থিত ছিল তা নিয়ে খুব কমই সন্দেহ আছে। ব্রাহ্মণরা আধিদৈবিক এবং উপদেবতাসম। ব্রাহ্মণরা একটা ছাঁচ তৈরি করে নিয়েছিলেন এবং বাকিদের সেই ছাঁচে গড়ে নিয়েছিলেন। তাঁর পদমর্যাদা ছিল প্রশ্নাতীত। যা কিছু ভালো ও কল্যাণকর তা তাঁদের থেকেই উৎসারিত। ধর্মগ্রন্থ দ্বারা উপাসিত এবং যাজকবৃন্দ দ্বারা পূজিত হয়ে এই ধরনের কোনও সত্তা কি কখনও দুর্বল মানব জাতির ওপর নিজেদের ব্যক্তিত্বের মায়াজাল বিস্তার করতে ব্যর্থ হতে পারে? যদি গল্পটা সত্যিই হয়, কেন তাঁকে সৃষ্টির চূড়ান্ত রূপ বলে ধরে নেওয়া হবে? এই ধরনের জীব শুধু অনুকৃত নয় তার চেয়ে আরও আরও বেশি কিছু হওয়ার দাবি রাখে, যদি তিনি অন্তর্বিবাহের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকেন তাহলে বাকিদেরও কি তাঁকে অনুসরণ করা উচিত নয়? ক্ষণস্থায়ী মানবজাতি! অস্থিরমতি গৃহপরিচারিকাই হোন বা রাশভারি দার্শনিক হোন, যাঁর মধ্যে এই অনুকরণের বীজ অঙ্গীভূত আছে, তিনি সফলতা অর্জন করেন। এটা আর অন্যভাবে হতে পারে না। অনুকরণ করা খুবই সহজ, উদ্ভাবন করা কঠিন। 

বর্ণ গঠনে অনুকরণ কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে হলে উদীয়মানকাল অবধি বর্ণপ্রথার প্রতি অব্রাহ্মণ শ্রেণির কী মনোভাব বুঝতে হবে। পুকুরে যেভাবে কচুরিপানা ভাসে, সেভাবে ঘটনাচক্রে হিন্দু মনে এই প্রথাগুলো কোনও রকম অবলম্বন ছাড়াই শুধু বিশ্বাসের বশে গেঁথে গেছে। একটা উপায়, কেবলমাত্র একটা উপায়ে হিন্দুসমাজে বর্ণের পদমর্যাদার তারতম্য হতে পারে। সেটা হল কীভাবে সতীদাহ, বাধ্যতামূলক বৈধব্য এবং বাল্যবিবাহ প্রথাকে মেনে চলা হয়, তার নিরিখে। যে ব্যবধান (টার্ডের শব্দে আমি বলছি) বর্ণকে আলাদা করে, সরাসরি সেই ব্যবধানের নিরিখেই প্রথার প্রতিপালন পরিবর্তিত হয়। ক্রমোচ্চ শ্রেণিবিভাগে ব্রাহ্মণ বর্ণের পরেই যে বর্ণগুলো আছে তারা এই তিনটে প্রথাকে অনুসরণ করেছে, কঠোরভাবে প্রতিপালনেও জোর দিয়েছে। তারপরে যে বর্ণ আছে তারা বাধ্যতামূলক বৈধব্য এবং বাল্যবিবাহকে অনুসরণ করেছে এবং অন্যান্য বর্ণরা কেবল বাল্যবিবাহ প্রথা চালু রেখেছে। সবচেয়ে শেষে যারা আছে তারা কেবল বর্ণপ্রথার নীতি অনুসরণ করেছে। আমার মতে এই অসম্পূর্ণ অনুকরণ খানিকটা ‘ব্যবধানের’ কারণে, খানিকটা হয়েছে প্রথার নৃশংসতার জন্যে। এই ঘটনা পুরোদস্তুর টার্ডের আইনের দৃষ্টান্ত। 

ভারতবর্ষে বর্ণ গঠনের সার্বিক প্রক্রিয়া যে আসলে নিম্নবর্গের মানুষের দ্বারা উচ্চবর্ণ মানুষের অনুকরণের নামান্তরমাত্র তা আর বলার অবকাশ রাখে না। এই সন্ধিক্ষণে আমি আমার পূর্বসিদ্ধান্তের সমর্থনে ফিরে যাব, যা  আপনাদের কাছে খুবই আকস্মিক বা অসমর্থনযোগ্য বলে মনে হতে পারে। আমি বলেছিলাম, এই তিনটে প্রথাকে সামনে রেখেই ব্রাহ্মণ শ্রেণি বর্ণপ্রথার কাঠামোকে গড়ে তুলেছিল। অন্যান্য শ্রেণিতে তাদের অস্তিত্ব প্রকৃতি-প্রত্যয়গত ছিল বলেই আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম। অব্রাহ্মণ বর্ণের মধ্যে এই প্রথাগুলির বিস্তারলাভের পেছনে অনুকরণের ভূমিকা ছিল। কিন্তু এই প্রথাগুলি যে হাতিয়ার হিসেবে বা আদর্শ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল সে বিষয়ে অনুকরণকারীরা সচেতন ছিল না। এই প্রথার প্রতিপালনও সিদ্ধান্তমূলক ছিল। তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে সমাজে এমন কোনও উচ্চমানের প্রভাবশালী মৌলবর্ণ ছিল যারা বাকিদের কাছে নিজেদেরকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু দিব্যতান্ত্রিক সমাজে ঈশ্বরসেবক ছাড়া আর কাঁরাই বা আদর্শ হতে পারেন?

যারা দুর্বল চিত্তে দরজা বন্ধ করে রেখে দিয়েছিল তাদের গল্প এখানেই শেষ। এবার দেখা যাক কীভাবে অন্যান্যরা বাকিদের দ্বারা বিতাড়িত হওয়ার ফলে নিজেরা একটি গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে গেছে। আর এটাকেই আমি বর্ণ গঠনের যান্ত্রিক পদ্ধতি বলি। এটা যান্ত্রিক, কারণ তা অবশ্যম্ভাবী। এই বিষয়ে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মতো এই ব্যাখ্যা পূর্বসূরিরা নজর এড়িয়ে গিয়েছেন।  কারণ তাঁরা বর্ণকে একটা স্বতন্ত্র একক হিসেবে দেখেছেন, বর্ণপ্রথার অভ্যন্তরীণ একক হিসেবে নয়। অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য এবং দূরদৃষ্টির অভাবের ফলে যদি বিষয়বস্তুকে যথার্থভাবে বোঝা না যায় এবং তার সঠিক ব্যাখ্যাও না পাওয়া যায়, তাহলে তার ফল মারাত্মক হতে পারে। একটা মন্তব্যের মাধ্যমে আমি আমার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করব। এই মন্তব্য আমি আপনাদের মগজে প্রবিষ্ট করতে অনুরোধ করব। মন্তব্যটি এরকম : “বর্ণের একবচন একটি অবাস্তবতা, একমাত্র বহুবচনে বর্ণ টিকে আছে।” এককভাবে বর্ণ বলে কিছু হয় না, যা হয় তা হল বর্ণসমূহ। বিশদে বুঝিয়ে বলছি। যখন ব্রাহ্মণরা নিজেদের বর্ণ তৈরি করেছিলেন, তার দরুনই তাঁরা অব্রাহ্মন বর্ণ তৈরি করেছিলেন। অথবা, আমার মতো করে বললে বলতে হয়, যখন ব্রাহ্মণরা নিজেদের একটা গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রেখেছিলেন, তখন তাঁরা বাকিদের সেই গণ্ডির বাইরে বের করে দিয়েছিলেন। আরও একটা উদাহরণ দিয়ে আমি আমার যুক্তিকে স্পষ্ট করব। ভারতবর্ষের বিভিন্ন সম্প্রদায় তাঁদের ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি আনুগত্যের জন্য সেই নামে পরিচিত হয়। যেমন — হিন্দু, মহামেডান, ইহুদি, খ্রিস্টান এবং পারসি। এখন হিন্দুদের কথা বাদ দিলে, বাকি সম্প্রদায়গুলো কিন্তু নিজেদের মধ্যে অ-বর্ণ সম্প্রদায় (‘non-caste communities’)। কিন্তু একে অপরের নিরিখে তারা বর্ণ। আবার যদি প্রথমেই চারটে সম্প্রদায় নিজেদের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে, তাহলে পারসিরা প্রত্যক্ষভাবেই গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে যায়, কিন্তু পরোক্ষে আর একটা গণ্ডির মধ্যে প্রবেশ করে। প্রতীকীভাবে বলতে গেলে ‘ক’ বিভাগ যদি সবর্ণে বিয়ে করে তাহলে ‘খ’ বিভাগকে প্রবল পারিপার্শ্বিক চাপে সবর্ণেই বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। 

এবার হিন্দুসমাজের ক্ষেত্রেও যদি একই যুক্তি প্রয়োগ করি, তাহলে আপনারা বর্ণের আর একটা ঐক্যনাশক বৈশিষ্ট্য দেখতে পারবেন বর্ণপ্রথার অভ্যন্তরীণ দ্বিচারিতার জন্য। বর্ণের যে নীতিগত, ধর্মগত এবং সামাজিক ব্যাধি আছে তা যদি কেউ লঙ্ঘন করেন বা বিরোধিতা করেন তাহলে বর্ণ তাকে বরদাস্ত করবে না। বিরূপ মনোভাবাপন্ন সদস্যরা বর্ণ থেকে বিতাড়িত হয়ে বিপদে পড়ে যান। অন্য বর্ণে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিকল্প পথও তাদের জন্য খোলা না-থাকায় তাঁদেরকে ব্যাপারটা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিতে হয়। বর্ণের নিয়মাবলি অপ্রতিরোধ্য এবং তারা অপরাধের মধ্যে তুল্যমূল্য বাছবিচার করার জন্য অপেক্ষা করে না। পরিবর্তন (অপরাধ) যে রকমই হোক না কেন, সব পরিবর্তনের (অপরাধের) শাস্তি একই।  

নব্য চিন্তাধারায় একটা নতুন বর্ণ সৃষ্টি হয়, কারণ পুরোনোরা তাকে বরদাস্ত করবে না। যাঁকে সম্মানের সঙ্গে গুরু বলে ডাকা হয় সেই বিধ্বংসী চিন্তকের দশা অবৈধ প্রেমে লিপ্ত পাপীদের মতো হয়। গুরুরা ধর্মীয় ছাঁচে বর্ণ তৈরি করে, আর পাপীরা মিশ্রবর্ণ তৈরি করে। বর্ণপ্রথায় পাপীদের কোনও ক্ষমা নেই। কেননা তাঁরা বিধি লঙ্ঘন করার মতো দু:সাহস দেখিয়েছে। এর শাস্তি হল বর্গ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা। তবে এর ফলে আবার নতুন বর্ণ সৃষ্টি হয়। হিন্দুরা যে সমাজচ্যুতদের নিয়ে আলাদা একটা বর্ণ সৃষ্টি করতে প্ররোচনা দেয়, তা কোনও অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব নয়। পক্ষান্তরে, বেশিরভাগ সময়েই তাঁরা সদিচ্ছায় কোনও-না-কোনও বর্ণের অন্তর্ভুক্ত হতে চায়। কিন্তু বর্ণ স্বয়ংবদ্ধ একক, এবং বেশ ষড়যন্ত্র করেই তারা বহিষ্কৃতদের ভিন্ন বর্ণ গঠনে বাধ্য করে। এই যে কঠিন, দুর্দম পরিস্থিতিটা তৈরি করা হয় তার যুক্তিটা ক্ষমাহীন। এই শক্তির বশংবদ হয়ে কিছু হতভাগ্য ব্যক্তিবর্গ নিজেদের স্বয়ংবদ্ধ হিসাবে আবিষ্কার করে। আসলে অন্যরা স্বয়ংবদ্ধ হতে গিয়ে তাঁদেরকেও স্বয়ংবদ্ধ করে তোলে। ফলস্বরূপ, নতুন ব্যক্তিবর্গসমূহ আইনের প্যাঁচে পরে ক্রমাগত বৃহৎসংখ্যক বর্ণে রূপান্তরিত হতে থাকে। ভারতের বর্ণগঠনের প্রণালী সম্পর্কে এই দ্বিতীয় গল্পটাই বলা হয়েছে।

এবার আমার তত্ত্বের মূল বিষয়গুলোকে সংক্ষেপে সেরে নেওয়া যাক। আমার মতে জাতিবিদ্যার ছাত্ররা বেশ কয়েকটা জায়গাতেই ভুল করেছেন যা তাঁদের তদন্তকেও ভুল পথে নিয়ে গিয়েছে। জাতিভেদপ্রথা গঠনে গাত্রবর্ণের ভূমিকার ওপর ইউরোপ মহাদেশের জাতিবিদ্যার ছাত্ররা অযথাই গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যেহেতু তারা নিজেরাও বর্ণবিদ্বেষী তাই তারা ভেবে নিয়েছেন যে জাতিভেদপ্রথার মূলেও আছে বর্ণবৈষম্য। কিন্তু সত্য থেকে কেউ-ই দূরে থাকতে পারবে না। ড. কেটকার দৃঢ়তার সঙ্গে সঠিক কথাই বলছেন — “আর্যজাতির অন্তর্ভুক্ত হোক কিংবা দ্রাবিড়জাতির অন্তর্ভুক্ত হোক, সব রাজপুত্রই আর্য। একটা উপজাতি বা পরিবার জাতিগতভাবে আর্য না দ্রাবিড় সেই প্রশ্ন কখনও ভারতবাসীর মাথা ব্যথার কারণ হয়নি, যতক্ষণ না বিদেশী পণ্ডিতরা এসে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।” অনেক আগে থেকেই গাত্রবর্ণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পুনরায় তাঁরা ভুল করে কিছু বর্ণনাকে ব্যাখ্যা হিসাবে ধরে নিয়েছেন এবং তর্ক করছেন যেন সেগুলোই সৃষ্টিতত্ত্ব। এটা সত্যি যে, বর্ণ পেশাগত, ধর্মগত ছিল; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তারা বর্ণ সৃষ্টির মূলে ছিল। আমাদের এখনও খুঁজে বার করতে হবে, কেন এই পেশাগত বর্গসমূহ বর্ণে রূপান্তরিত হয়েছিল? এই প্রশ্নটা এখনও কেউ তোলেননি এবং শেষ অবধি বর্ণকে খুবই হালকাভাবে নিয়েছেন। যেন বর্ণ হাওয়ায় তৈরি হয়ে এসেছে। বিপরীতদিকে, বর্ণ, যেমনটা আমি ব্যাখ্যা দিয়েছি, টিকিয়ে রাখা বেশ দুঃসাধ্য একটা কাজ, কারণ এর মধ্যে মারাত্মক জটিলতা আছে। একথা সত্য যে বর্ণ টিকেই আছে বিশ্বাসের ওপর। কিন্তু বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি হিসাবে রাখার আগে, প্রতিষ্ঠানকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং চিরস্থায়ী হতে হবে। আমি যেভাবে বর্ণপ্রথার সমস্যাকে বুঝেছি তাতে মূলত চারটি বিষয় আছে — 

১) হিন্দু জনজাতি বিভিন্ন বর্ণের সংমিশ্রণে গড়ে উঠলেও তাদের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক ঐক্য আছে।

২) বর্ণ হল বৃহৎ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে বিভিন্ন অংশে বিভাজন।

৩) প্রথমে, অর্থাৎ শুরুর দিকে, একটাই বর্ণ ছিল।

৪) অনুকরণ ও বহিষ্করণের মাধ্যমে শ্রেণি বর্ণে রূপান্তরিত হয়েছে।

আজকের ভারতবর্ষে বর্ণপ্রথার সমস্যা নিয়ে নানান বিষয়ের আগ্রহ দেখা দিয়েছে। যেমন, ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে যাতে করে এই অপ্রাকৃতিক প্রতিষ্ঠানটা লোপ পেয়ে যায়। সমাজসংস্কারের এই প্রচেষ্টাগুলো বর্ণের সৃষ্টিবিষয়ক বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে তোলে। বিতর্কটি হল — বর্ণপ্রথা সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিদের সচেতন নির্দেশে হয়েছে নাকি বিশেষ পরিস্থিতিতে মনুষ্য সমাজের অজানতেই বেড়ে গেছে! যাঁরা দ্বিতীয় মতকে সমর্থন করবেন তাঁরা আমার রচনার মূল জায়গাটা ধরতে পারবেন। ব্যবহারিক দিক থেকে এর গুরুত্ব থাকার পরও, বর্ণ ব্যাপারটাই সব দিক থেকে সমস্যাজর্জরিত। বর্ণের তাত্ত্বিক ভিত্তি সম্পর্কে আমার আগ্রহই আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হতে। আর এই সিদ্ধান্তগুলো দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলেই সমর্থন পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু আমি এতটাও উদ্ধত নই যে, আপন সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেব। বড়ো জোর ভাবতে পারি বর্ণবিষয়ক আলোচনায় আমি কিছুটা অবদান রাখলাম মাত্র। আমার শুধু মনে হয়েছিল গাড়িটাকে ভুল রাস্তায় চালানো হয়েছে। আমার রচনার মূল লক্ষ্যই হল তদন্তের সঠিক রাস্তাকে চিনিয়ে দেওয়া এবং জুতসই সত্যে উপনীত হওয়া। কেউ যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে বিষয়টি আলোচনা করেন তাহলে আমাদের অবশ্যই তাঁকে  বাধা দিতে হবে। বিজ্ঞানের পরিসর থেকে ভাবাবেগকে সরাতে হবে। নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে যে-কোনও বিষয়কে বিচার করতে হবে। আমার মতাদর্শকে কেউ ইতিবাচকভাবে খণ্ডন করলে আমি যেমন আনন্দ লাভ করব, তেমনি খুশি হব পণ্ডিতদের বিস্তারিত বক্তৃতা সত্ত্বেও এই বিষয়ের ওপর যুক্তিসঙ্গত মতভেদ চিরকাল বিতর্কমূলক হয়ে রয়ে গেলে। উপসংহারে বলি, যেমন আমি বর্ণ সম্পর্কিত তত্ত্বকে পেশ করতে উদ্গ্রীব, সমানভাবে আমি একে ত্যাগ করতেও পারি যদি কখনও এই তত্ত্ব অচল হয়ে যায়।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান