কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর
মতুয়া ধর্মাদর্শের প্রবক্তা হরিচাঁদ ঠাকুরের (পিতৃ-পদবি বিশ্বাস) জন্ম ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে, পূর্ববাংলার ফরিদপুর জেলার এক নিভৃত পল্লি সফলাডাঙ্গায় সম্পন্ন নমঃশূদ্র পরিবারে। কৃষিকাজের সঙ্গে তাঁদের ছিল পারিবারিক ব্যবসাও। পিতা যশোবন্ত ছিলেন নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব। বাড়িতে বৈষ্ণব ভক্তদের আনাগোনা লেগেই থাকত। ওই অঞ্চল ছিল জমিদার সূর্য নারায়ণ মজুমদারের অধীন। জমিদারির অষ্টম কিস্তির টাকা মেটাতে অপারগ হয়ে বিশ্বাস পরিবারের কাছ থেকে জমিদার টাকা ধার নেন। পরবর্তীকালে ধারের টাকা শোধ না করে নানা প্রকার অত্যাচার নামিয়ে এনে তাঁদের ভিটেছাড়া করেন। হরিচাঁদ মা ও চার ভাইকে সঙ্গে নিয়ে সে গ্রাম ত্যাগ করে ওড়াকান্দী চলে আসেন। পরবর্তী কালে এই ওড়াকান্দী-ই হরিচাঁদ ঠাকুরের কর্মভূমি হিসাবে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। মতুয়া ভক্তদের কাছে পায় তীর্থের মর্যাদা। হরিচাঁদ পান ‘পতিত পাবন’ অভিধা।
মতুয়া ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনার শুরুতে ‘মতুয়া’ শব্দটি নিয়ে দু-একটি কথা বলা আবশ্যক। সূচনাকাল থেকে মতুয়া সম্পর্কে অন্যদের ধারণার ইতিবৃত্তটিও জানা প্রয়োজন। ‘মতুয়া’ কি অভিধান বহির্ভূত শব্দ? প্রশ্নটি অনেকেরই মনে উঁকি মারে এই কারণে যে, এখনও অবধি প্রচলিত কোনও বাংলা অভিধানে এই শব্দটির উল্লেখ নেই। তাহলে শব্দটি এল কোথা হতে? উনিশ শতকেই কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে কি এই শব্দটির সৃষ্টি হয়েছিল? মানুষের খেয়ালে গড়া এটা কি নিছকই এক নতুন শব্দ যার কোনও ব্যুৎপত্তি নেই? নাকি এই শব্দ ছিল অধুনালুপ্ত দেশীয় কোনও ভাষায়, যার ব্যাবহারিক সূত্র আমরা হারিয়ে ফেলেছি? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে, মতুয়া ধর্মগ্রন্থে মতুয়ার যে সংজ্ঞা আমরা পাই, তার বাইরে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের একটি উক্তিতেও শব্দটির উল্লেখ বর্তমান। উভয় ক্ষেত্রেই অবশ্য সে সুচিহ্নিত তার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে।
মতুয়ার আদি গ্রন্থ শ্রীশ্রী হরিলীলামৃতের সাক্ষ্য অনুযায়ী, হরিচাঁদ ঠাকুরের ভক্তরা নামে প্রেমে মত্ত হয়ে ধর্মের প্রচলিত রীতিনীতি কিছুই মানেন না, তাই সামাজিকগণ তাঁদের ‘মতো’ বা ‘মতুয়া’ অভিধা প্রদান করে।
“মেতে যায় হরি বলে ভঙ্গী ক’ব কত। হরি বলে মেতে থাকে ও বেটারা মতো।।” (পৃষ্ঠা : ৯৪)
শুধু হরি নামে মেতে থাকাটা বিরল কিছু নয়। স্বয়ং শ্রীচৈতন্যদেব পারিষদদের নিয়ে নাম সংকীর্তনে মত্ত হয়ে যেতেন। একালেও বৈষ্ণবদের আমরা কৃষ্ণনামে বিভোর হয়ে যেতে দেখি। তবে তাদের কাউকেই মতুয়া অভিধা প্রদান করা হয়নি। তাহলে মতুয়াদের ক্ষেত্রে এমন স্বতন্ত্র অভিধার প্রয়োজন পড়ল কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে আবার চোখ রাখতে হবে লীলামৃতের পাতায়। মতুয়াদের সম্পর্কে ব্রাহ্মণ্য ধর্মানুসারীদের অভিমত —
“বেদ-বিধি নাহি মানে না মানে ব্রাহ্মণ। নিশ্চয় করিতে হবে এ দলে শাসন।।
গ্রামবাসী বহিরঙ্গ নমঃশূদ্রে কয়। হরিদাস ভক্তগণে বাদ দিতে হয়।।
গো-ব্রাহ্মণে ভক্তিবাদী যত লোক ছিল। ভক্তদলে মতো’ বলে বাদে ফেলে দিল।।”
এতক্ষণে মতুয়া অভিধার কারণ আমাদের সামনে উপস্থিত। শুধু ঈশ্বরের নামে মত্ত হলেই তো হবে না, গো-ব্রাহ্মণে যাদের ভক্তি নেই, বেদ-বিধি মানতে যারা অস্বীকার করে, তাদের ‘অপর’ বলে দাগিয়ে না দিয়ে উপায় কী? সে কালে তাই তাদের বর্জন করার চেষ্টা হয়েছে। বেদ-বিধি যে কলিতে অচল এ অভিমত ঠাকুর রামকৃষ্ণও ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু দেবতা ও ব্রাহ্মণকে অমান্য করার কথা তিনি বলেননি। তাই পরমহংস দেবকে সমস্যায় পড়তে হয়নি। কিন্তু রামকৃষ্ণদেবের প্রায় আড়াই দশক পূর্বে আবির্ভূত হয়ে বেদ-বিধি-সহ ব্রাহ্মণ-পুরুত সব কিছুকে অপ্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করেছিলেন হরিচাঁদ ঠাকুর (১৮১২-১৮৭৮)। রসিক ধর্মের আড়ালে ব্যভিচারে লিপ্ত, কিম্বা আচারসর্বস্ব বৈষ্ণব ধর্মকেও তিনি গ্রহণ যোগ্য মনে করেননি। হরিচাঁদ ঠাকুরের অনুগামী তথা মতুয়াদের ধর্মবিশ্বাস, ধর্মীয় আচরণ, রীতি-নীতি অমান্য করার দুঃসাহস, প্রচলিত প্রথা ও ধর্মীয় অচলায়তনে বন্দি মানুষদের কাছে একটা যে প্রবল ঝঞ্ঝার মতো এসে উপস্থিত হয়েছিল এতে কোনও সন্দেহ নেই। তাই প্রথমে তারা প্রতিরোধের দেয়াল গড়ে তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু, মতুয়া স্রোতের তীব্র তরঙ্গে সব বাধা ভেসে গিয়েছিল অচিরেই।
‘যত মত তত পথ’-এর প্রবক্তা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্ম সমাজের দুর্গা প্রতিমা পরিদর্শন করতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে ‘মতুয়ার বুদ্ধি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাঁর ভাষায়: “এই লা যে, মতুয়ার বুদ্ধি ভালো নয়। অর্থাৎ আমার ধর্ম ঠিক আর সকলের ভুল”। রামকৃষ্ণদেব যখন এ কথা বলছেন, তার ছয় বছর আগেই আপন মতাদর্শে পল্লীসমাজে প্রবল তরঙ্গ তুলে হরিচাঁদ ঠাকুরের তিরোধান ঘটেছে। রামকৃষ্ণদেব যদি সে বিষয় অবহিত হয়ে প্রসঙ্গটির অবতারণা করে থাকেন, তাহলে বলতে হবে, মতুয়ারা শুরু থেকেই যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিল সে সম্পর্কে তিনি ওয়াকিফহাল ছিলেন। আর যদি তা না হয়, তাহলে স্বীকার করে নিতে হবে, মতুয়া শব্দটি তখনও অবধি নিজস্ব অর্থ নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত ছিল। পরে যা অনাদরে লুপ্ত হয়ে যায়।
এ কথা বুঝে নিতে কোনও সমস্যা নেই যে, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের পূর্বে এবং ব্রাহ্ম ধর্মের প্রায় সমকালে পূর্ববাংলার এক নিভৃত পল্লীতে হরিচাঁদ ঠাকুর এক নতুন মতাদর্শ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। সমকালের ব্রাহ্মনেতাদের মতো আধুনিক শিক্ষা ও ইউরোপীয় রেনেসাঁর স্পর্শ তিনি পাননি। তাঁর যা কিছু রসদ তা প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য, যুক্তি ও ভক্তিবাদের পরম্পরা থেকে গৃহীত। যে ব্রাহ্মণ্যবাদ ধর্মের আড়ালে জাত ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে চিরস্থায়ী শোষণের বন্দোবস্ত পাকা করে তুলেছিল, এ দেশের অধিকাংশ ধর্ম প্রবক্তরা যাকে প্রায় নীরবে শিরোধার্য করে নিয়েছিলেন, মতুয়া মতাদর্শ ছিল তার বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ। তিনি ধর্মের আধ্যাত্মিক বিষয়কেই একমাত্র বিচার্য মনে করেননি, জাগতিক ক্ষেত্রে মানুষের জীবন-যন্ত্রণা নিরসনে তা কী ভূমিকা রেখেছে সে দিকটিও পর্যালোচনা করেছেন। শত শত বছর ধরে যে সমাজ দলিত পতিত হয়ে পড়ে থেকেছে, কোনও অবতার যদি তাদের সেই হীন অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে না পারেন, তাহলে সেই ধর্ম ও অবতারের কী ভূমিকা, সে প্রশ্নও সঙ্গত ভাবেই উঠে এসেছে।
হরিচাঁদ ঠাকুর এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে সম্মত ছিলেন না যে, মানুষের ভাগ্য তার পূর্বজন্মের কর্মফল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যে যে জাতে জন্মেছে তা তার পূর্বজন্মের সুকর্ম বা দুষ্কর্মের ফলশ্রুতি এবং ইহ জন্মে সেই ভাগ্যলিপি খণ্ডন করা অসম্ভব; অর্থাৎ, যে দলিত পতিত কুলে জন্মেছে, ঈশ্বরের বিধান মেনে তাকে সেই হীন অবস্থাতেই জীবনযাপন করে যেতে হবে, এই শাস্ত্র বাক্য তিনি অস্বীকার করেছেন। শুধু অস্বীকার নয়, পতিত উদ্ধারই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য, এবং সেকাজে তিনি সর্বতোভাবে সফল হয়েছিলেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম কার্যত শূদ্র শোষণের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেছিল, তিনি তা থেকে পতিতদের উদ্ধার করেন এবং সমাজের সামনে শোষণ ও বৈষম্যহীন একটি মতাদর্শ উপস্থাপন করেন। ঈশ্বরের প্রতি অকামনা প্রেম ভক্তির পাশাপাশি তাঁর ধর্মের ভিত্তি হয় উদার মানবতা। শ্রীশ্রী হরিলীলামৃতের ভাষায়: “সর্ব-ধর্ম-লঙ্ঘি এবে করিলেন স্থূল। / শুদ্ধ মানুষেতে আর্তি এই হয় মূল।।” আরও স্পষ্ট ভাষায় তিনি ঘোষণা করেন — “জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা। / ইহা ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা।।” অসার আচার-বিচারে মগ্ন না হওয়া ও মানব কল্যাণে ব্রতী হওয়ার বার্তা এত তীব্র ভাষায় আর কোনও মহামানব ব্যক্ত করেছেন বলে জানা নেই।
হরিচাঁদ ঠাকুরের বড় কৃতিত্ব মৃতপ্রায় অন্ত্যজ জাতিসমূহের মধ্যে আত্মশক্তির জাগরণ ঘটানো। যুগ যুগ ধরে শোষিত ও ঘৃণিত হতে হতে যাদের প্রাণশক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা নিঃশেষ হতে চলেছিল, আপন জাদুকরি স্পর্শে তাদেরই তিনি জাগিয়ে তুললেন মাভৈঃ মন্ত্রে। “তন্ত্র মন্ত্র ভেক-ঝোলা সব ধাঁধাবাজী। / পবিত্র চরিত্রে থেকে হও কাজে কাজী।।” ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে তদনুরূপ কর্ম করো ও ঈশ্বরের নাম-গান করো (হাতে কাম, মুখে নাম), এ ছাড়া আর কোনও দিকে লক্ষ দেবার প্রয়োজন নেই; আহ্বান জানালেন তিনি। শ্রীশ্রী হরিলীলামৃতের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় আচার্য মহানন্দ হালদার লিখেছেন: “অসার জড়বাদের মোহে মানবতার যে দুর্জয় অপমান বাঙালি সমাজ করিয়াছিল — যাহার ফলে সমাজের আপাদমস্তক সর্বস্তরে ধর্মের নামে ব্যভিচারের পাশবিক লীলা খেলা চলিতেছিল — সেই জড়বাদকে ধ্বংস করিয়া সরল সহজ গার্হস্থ্য জীবনের মধ্য দিয়া মানব জীবনের চরম ও পরম উৎকর্ষতার বাণী লইয়া তিনি অবতীর্ণ হইলেন”। পরিশেষে তিনি লেখেন — “মতুয়া জড়বাদী নয় — শক্তির সাধক। দুর্বার শক্তিবেগে অনাচার, অবিচারকে ধ্বংস করিয়া অগ্রগামীর বীর মূর্তি”।
যারা ছিল মৃতপ্রায়, তারা শুধু উঠে দাঁড়ায় না, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে অগ্রগামীর বীর মূর্তি হিসেবে অচিরেই আত্মপ্রকাশ করে; এখানেই মতুয়া ধর্মান্দোলনের অবিসংবাদিত সাফল্য। পুরাকালে শংকরাচার্য প্রমুখ ধর্ম প্রচারকেরা ‘ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা’, ‘জগৎ মায়া মাত্র’ — বেদান্তের এই তত্ত্বকে বড়ো করে তুলে ধরেছেন। ভারতবর্ষ সে দর্শনের দ্বারা প্রবল ভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ফলে, লৌকিক জগৎকে অগ্রাহ্য করে পরকালের চিন্তাই মুখ্য হয়ে উঠেছে সাধারণের মনে। ভারতে প্রচলিত প্রায় সকল ধর্মের অধিকাংশ আচারের মূল লক্ষ্য তাই পরকাল। ইহকাল নিয়ে ভাবতে পদে পদে নিষেধ করেন ধর্মের কান্ডারি যত সাধক, গুরু, মহান্তরা। ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেবার ভাবনা তাদের মাথায় আসে না। সংসার তাদের কাছে মুক্তিপথের কাঁটা হিসাবে প্রতিভাত হয়, কামিনী-কাঞ্চনকে সর্বাগ্রে পরিত্যাগের বিধান দেন। ইহকালের দুঃখ-দারিদ্র্যকে ভাগ্যের লেখা বলে চালিয়ে দিয়ে, জাগতিক সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে তারা হয়ে উঠতে চান স্বর্গের ফেরিওয়ালা।
এই ভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে মতুয়া মতাদর্শ। গার্হস্থ্য ধর্মকেই এখানে শ্রেষ্ঠ ধর্মের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সংসারে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে নারীর মূল্য ও গুরুত্বকে। “এক নারী ব্রহ্মচারী” সংসারীর পক্ষে এই নির্দেশ। এই বিরাট বিশ্বজীবনে শান্তিময় গার্হস্থ্য জীবনের পূর্ণ-শান্তি উপলব্ধি করানোই মতুয়া ধর্মের লক্ষ্য। অন্ন-বস্ত্রের কষ্ট ও সামাজিক বৈষম্য বলবৎ থাকলে তা তো সম্ভব নয়। সে জন্য শিক্ষার প্রসার ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ওপর এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে চারিত্রিক পবিত্রতার ওপর। সত্য বাক্য বলো, সৎ চরিত্রের অধিকারী এবং জিতেন্দ্রিয় হও। পবিত্র চরিত্রের গুরুত্ব কত বোঝাতে বলা হয়েছে — “সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় হইবেক যেই। / না থাকুক ক্রিয়া-কর্ম হরি তুল্য সেই।।”
গৃহবাসী উৎপাদনশীল শ্রমজীবী মানুষের ওপর নির্ভর করে সমস্ত জগৎ চলছে। তারা দীনহীন হয়ে থাকলে এবং তাদের জীবন কলুষময় হলে বিশ্বের মহাসংকট উপস্থিত হবে। এ জন্য বিশুদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠার ওপর মতুয়া ধর্ম সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই শুদ্ধতা দেহের শুদ্ধতা নয়, অন্তরের শুদ্ধতা। তাঁরা জানেন দেহ একটি আবরণ মাত্র, চাই অন্তরের শুদ্ধতা। এই শুদ্ধতা আসবে অকামনা প্রেম ভক্তির পথে। সেই নিমগ্ন ভক্তির মধ্য দিয়ে দুঃখী মানুষ পরমানন্দের অধিকারী হবেন। এই আনন্দ লাভই মানব জীবনের পরম লক্ষ্য। তাঁরা বিশ্বাস করেন না ঈশ্বরের নামের জোরে পাপ খণ্ডন হয়ে স্বর্গলাভ ঘটে। খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলা হয়েছে, — “হরি নামে পাপ ক্ষয় কহে কোন ভণ্ড। / মুক্তি শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যে যারা ভক্তি নাহি চিনে।।”.…“মুক্তিকে যে করে তুচ্ছ ভক্তি করে সার। / পুণ্যকে না দেয় স্থান পাপ কোন ছার।।”
মতুয়া ধর্মাদর্শ এভাবে প্রতি পদে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিপরীতে স্বতন্ত্র পথের সন্ধান দেয়। স্বাভাবিক ভাবে দেহশুদ্ধির জন্য গুরুর দীক্ষামন্ত্র এবং পাপ পুণ্য ও মুক্তির প্রলোভন দেখিয়ে যুগ যুগ ধরে চালিয়ে যাওয়া ধর্ম ব্যবসায়ীদের অপকৌশল প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সকলে সব বাধা ও পিছুটান কাটিয়ে না উঠতে পারলেও মতুয়াদের একাংশ গুরু ও পুরোহিত বর্জনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে এই স্বাতন্ত্র্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন। কোথাও কোথাও এই বিষয়কে কেন্দ্র করে নানা দ্বন্দ্ব ঘনিয়ে ওঠে। অন্ধ সংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা সকলের পক্ষে সহজ হয় না। যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞান মনস্কতা নিশ্চিত ভাবে এর সহায়ক হতে পারত। কিন্তু সে আন্দোলনও সমাজে তেমন ভাবে শক্তি অর্জন করতে পারেনি। প্রসঙ্গক্রমে এ কথাটি বলা আবশ্যক যে, মতুয়াদের উপরোক্ত সিদ্ধান্তের পিছনে কোনও জাতি বিদ্বেষ নেই। পরিবর্তে আছে যুক্তি ও ভক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক মানবিক দর্শন। যাকে উচ্চ ও নিম্নবর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ গ্রহণ করেছিলেন। মতুয়ারা জাত ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করতে প্রয়াসী। ইদানীং কারও কারও আলোচনায় মতুয়া হিসেবে নিম্নবর্ণের একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়, এটি অত্যন্ত ভুল একটি মূল্যায়ন। তবে নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যেই যে মতুয়া ধর্মের প্রচার ও প্রসার সমধিক, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। জাতিবাদী ভারতবর্ষে সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? জাত-কৌলীন্য ছেড়ে সবার সঙ্গে এক ভূমিতলে এসে দাঁড়াবার কথা ভাবতে পারেন, এমন বিপ্লবী আর কয়জন? সৌভাগ্য যে মতুয়া ধর্মে তেমন অনেকের সন্ধান মেলে।
হরিচাঁদ ঠাকুরের তিরোধানের পর তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর (১৮৪৭-১৯৩৭) অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে মতুয়া আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে চলেন। বাংলার যুগান্তকারী বহু আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মতুয়াদের ইতিহাস। নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, জমিদার-জোতদারদের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, অস্পৃশ্যতা বিমোচনের আন্দোলন, ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের গোড়া থেকে ফসলের তেভাগার দাবি সংগঠিত করা, অস্পৃশ্য সমাজের মানুষকে সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ করতে ব্রিটিশ সরকারকে সম্মত করা, গ্রামীণ মানুষদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটিয়ে তোলার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে আগ্রহী করে তোলা, রাজনৈতিক অধিকার অর্জনে উদ্বুদ্ধ করা ও বিধান পরিষদে সদস্য প্রেরণ, সর্বোপরি সমাজে গণ-শিক্ষার প্রসার ঘটাতে অসংখ্য বিদ্যালয় স্থাপন — “খাও বা না খাও, ছেলে-মেয়েকে স্কুলে দাও” — গুরুচাঁদ ঠাকুরের এই বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। এ সব কিছুর মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে চির সংগ্রামী মতুয়াদের ভূমিকা।
অবিভক্ত বাংলায় মতুয়া সমাজের প্রতিনিধিরা বঙ্গীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ভারতে রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে তাঁদের উপেক্ষা করার উপায় নেই। কংগ্রেস দলের ঘোরতর বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের সংবিধান পরিষদে বাবাসাহেব আম্বেদকরকে বাংলার বিধান সভা থেকে নির্বাচনে জয়যুক্ত করে পাঠাতে পারা, ভারতীয় রাজনীতিতে অবশ্যই একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ, এরই ফলে বাবাসাহেব আম্বেদকরের সংবিধান পরিষদে প্রবেশাধিকারের সুযোগ ঘটে ও তিনি সংবিধান রচনার গুরু দায়িত্ব পালনে সমর্থ হন। ঠিকই যে এর প্রধান কৃতিত্ব তপশিলি ফেডারেশনের নেতা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের। কিন্তু তিনিও মতুয়াদের রাজনৈতিক অভিযানের অন্যতম সেনানী বই আর কিছু নন। যোগেন্দ্রনাথকে মতুয়া উদ্যোগ থেকে আলাদা ভাবতে গিয়ে অনেকেই ভুলে যান যে, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে তপশিলি ফেডারেশনের প্রথম প্রাদেশিক সম্মেলন পঞ্চাশ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সফল হয়েছিল গোপালগঞ্জে, যা একান্ত ভাবেই মতুয়া অধ্যুষিত। শুধু তাই নয়, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের বিধান পরিষদে মতুয়াদের প্রথম মনোনীত সদস্য ওড়াকান্দির ভীষ্মদেব দাস ছিলেন ওই সম্মেলনের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি। মুসলিম লিগ সংসর্গের কারণে যোগেন্দ্রনাথের প্রতি বিরূপতায় প্রমথরঞ্জন ঠাকুর উপস্থিত না থাকলেও ছিলেন আরও অনেক বিশিষ্ট মতুয়া নেতা। এই সভায় ড. আম্বেদকরের সংবর্ধনার আয়োজন থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি না আসতে পারায় তা সম্ভব হয়নি।
এভাবে বাংলায় শোষিত বঞ্চিত সমাজের অধিকারের আন্দোলনকে যখন অনেকটাই সংগঠিত করা সম্ভব হচ্ছে, বাংলার রাজনীতিতে বঞ্চিত সমাজ তৃতীয় শক্তি হিসেবে উঠে আসছে, ঠিক সেই সময় নেমে আসে দেশভাগের খাঁড়া। ভাগ হয়ে যায় বাংলাও। বাংলাভাগের সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসে দেশত্যাগের বিভীষিকা। এর ফলে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয় মতুয়া সমাজ। তাঁরা ঠাঁই নাড়া হয়ে উদ্বাস্তু স্রোতে ভাসতে ভাসতে কে কোথায় ছিটকে পড়েন। তখন তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য হয় দ্রুত পুনর্বাসন এবং পায়ের নীচে মাটি ও মাথার ওপরে ছাউনি খুঁজে পাওয়া। তৃতীয় শক্তির সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন বর্ণবাদীরা।
পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু আন্দোলনের সিংহভাগ জুড়ে আছেন মতুয়া সমাজ। সরকারের পক্ষ থেকে উদ্বাস্তুদের জন্য কোনও ব্যবস্থা গ্রহণের অনেক আগে ঠাকুরনগরে প্রথম বেসরকারি কলোনি গড়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন মতুয়া পরিবারের প্রমথরঞ্জন ঠাকুর। কিন্তু তৎসত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে মতুয়ারা থিতু হতে পারেন না। পুরাণে বর্ণিত বিষ্ণুর চক্রে সতীর দেহ টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ার মতো, তাঁদের ছিন্নবিছিন্ন করে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে। এর ফলে দেখা দেয় অস্তিত্বের সংকট। প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের জীবন বাঁচিয়ে রাখার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখা তাঁদের পক্ষে কঠিনতম কাজ হয়ে দাঁড়ায়। একটু থিতু হওয়ার পর উদ্বাস্তুদের প্রথম প্রজন্ম নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় মনোযোগ দেন। কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্ম ক্রমে তা থেকে দূরে সরে যেতে এক রকম বাধ্যই হয়। এ ভাবে ভিন রাজ্যের মতুয়া সন্তানেরা একরকম আত্ম পরিচিতির সংকটে পড়ে। অনেকে হারিয়ে ফেলে নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সূত্র।
বাংলাদেশ গঠিত হবার পরও মতুয়ারা সেদেশে নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারেননি। ফলে উদ্বাস্তু স্রোত অব্যাহত থেকেছে। কিন্তু এই পর্বের উদ্বাস্তুদের গ্রহণ করার ক্ষেত্রে চলতে থাকে নানা টালবাহানা। আসামের পরিস্থিতি সকলেরই জানা। ১৯৭১-এর পরে যাওয়া যে-কোনও বাঙালি সেখানে অবাঞ্ছিত, তাদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ডিটেনশন ক্যাম্প। ভারতের আর সব রাজ্যেও উদ্বাস্তুরা সমাদৃত নন। মাঝে মধ্যেই পুলিশ তাদের ধরে পুশব্যাক করার চেষ্টা করে। অর্থাৎ এরা এক প্রকার রাষ্ট্রহীন। এই পর্বের উদ্বাস্তুদের মধ্যে একটা ভালো অংশ মতুয়া সমাজের। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ প্রতিকূল হয় ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ হয়ে যাবার পর। এই আইনে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাইয়ের পরে বিনানুমতিতে ভারতে প্রবেশ করা সকল ব্যক্তিকে ইললিগাল মাইগ্রান্ট ঘোষণা করা হয়। এক কথায় কোটি কোটি মানুষের রাষ্ট্রহীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আশ্চর্যের বিষয়, মতুয়া সমাজ ব্যতিরেকে আর কোনও পক্ষই এ নিয়ে প্রতিবাদে বা আন্দোলনে শামিল হননি। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় আরও ষোলোটি বছর। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের পর বাকি ভারতবর্ষ এই আইনের অন্তর্নিহিত বিপদ উপলব্ধি করতে পারে এবং আন্দোলনে শামিল হয়।
বাঙালি উদ্বাস্তুদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ যেহেতু মতুয়া সমাজের, সেহেতু বলাই যায় যে, নাগরিকত্ব আইনের এই টালবাহানায় তাঁদের অস্তিত্ব বিপন্ন। কেন্দ্রীয় সরকারের আশ্বাসে বিশ্বাস রেখে অনেকে অপেক্ষা করছেন, নাগরিকত্বের সংকট থেকে মুক্তি পাবেন বলে। কিন্তু, এত দ্রুত সমস্যার অবসান হবে বলে মনে হয় না। কারণ, এর বিনিময়ে তাঁদের স্বতন্ত্র পরিচিতি বিসর্জন দিতে হতে পারে। এর মধ্যে গোপনীয় কিছু নেই যে, বিজেপি দল ও সরকার আরএসএসের ভাবাদর্শ দ্বারা পরিচালিত। মনুবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ তাঁদের অস্থি-মজ্জায়। অন্যদিকে মতুয়া মতাদর্শ তীব্র ভাবে মনুবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী। আরএসএসের পক্ষে মতুয়াদের এই অবস্থানকে স্বীকার করে নেওয়া সম্ভব হবে না। তাঁরা চেষ্টা করবে মতুয়াদের ভাবনা-চিন্তার বদল ঘটাতে। তার জন্য প্রকাশ্য কোনও সংঘাতের পথে না গিয়ে, চেষ্টা চলবে ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণ্য ভাবধারার মধ্যে তাঁদের টেনে আনতে। ইতিমধ্যে সে কাজ শুরুও হয়েছে। মতুয়া ঘরের অনেকেই এখন ‘জয় শ্রীরাম’ বুলি মুখে তুলে নিয়েছেন।
ইতিপূর্বে ভারতবর্ষের ইতিহাস বৌদ্ধ ধর্মকে ভারত ছাড়া হতে দেখেছে। নেপালের গুহা থেকে আবিষ্কার করতে দেখেছে চর্যাপদ। পরিত্যক্ত অজন্তার গুহাচিত্র আবিষ্কৃত হতে দেখেছে ব্রিটিশ ভূ-পর্যটকদের দ্বারা। সুতরাং, মতুয়া ভাবাদর্শকে কীভাবে ভারত ছাড়া করতে হবে, মানুষের মন থেকে কীভাবে সেই বিপ্লবী চিন্তার বীজ উৎপাটন করে দূরে নিক্ষেপ করতে হবে, তা নিয়ে মনুবাদীদের খুব বেশি কসরৎ করতে হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং, বলাই যায়, দেশ বিভাগ ও রাজনৈতিক কারণে মতুয়াদের অস্তিত্বের যে সংকট শুরু হয়েছিল, নিজেদের সংগ্রামী ভূমিকায় যা তাঁরা খানিকটা কাটিয়েও উঠেছিলেন, তা এবার এমন একটা দিক থেকে আক্রান্ত হতে চলেছে, যে সম্পর্কে তাঁরা সম্পূর্ণ অসাবধানী ও অসচেতন। এ যুদ্ধে জিতে নিজেদের অবস্থানকে তাঁরা আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারবেন কিনা, ভবিষ্যৎই শুধু তা বলতে পারবে।