শুভাশিস ভট্টাচার্য
“As soon as you are born, you’re given a name, a religion, a nationality and a race. You spend the rest of your life defining and defending a fictional identity.”
Brandon Garic Notch
সামাজিক মাধ্যমে জনৈক বন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছিলাম এই বাক্যবন্ধ, সঙ্গে একটি ছবি। ছবিতে একটি শিশুর মুখ, কপালে বারকোড বা রেখাসংখ্যা (সাদা-কালো রেখার নকশা সংবলিত ছাপ; যার মধ্যে উদ্ধারযোগ্য প্রয়োজনীয় তথ্য নিহিত থাকে)। বারকোডের রেখাগুলি যেন গারদ। দুটি হাত ভেঙে ফেলতে চাইছে সেই লৌহকারাপ্রাচীর। কথাটা মনে ধরেছিল। ছবিটাও। এ উক্তি কে করেছেন তা জানতে অন্তর্জাল ঘেঁটে যে নামটি পেয়েছিলাম সেই নাম আগেই বলেছি, Brandon Garic Notch।
উল্লিখিত বক্তব্যের বিরোধিতা করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ‘identity’ বা পরিচিতি শব্দটি একইসঙ্গে বিস্তৃত, ব্যাপ্ত এবং বহুমুখী। সমাজ-সংস্কৃতি প্রদত্ত পরিচিতির বাইরেও ব্যক্তি হিসাবে আমরা আমাদের নিজেদের এক-একটি ভাবমূর্তি বা ইমেজ (image) গড়ে তুলি মনে মনে। শুধু নিজের সম্পর্কে ধারণা তৈরিই নয়, আমরা চাই সেই ভাবমূর্তিই সামাজিক স্বীকৃতি পাক আমার পরিচিতি রূপে। ধরুন আমি নিজেকে গায়ক বলে ভাবছি এবং শুধু ভাবছিই না, চাইছি আমার এই ভাবনার প্রতি সর্বজনের স্বীকৃতি ও গায়ক রূপে পরিচিতি। কিন্তু একবারও ভেবে দেখছি না যে, আমার এই ভাবমূর্তি নির্মাণের বেশির ভাগটাই কল্পনাপ্রসূত এবং আমি নিজের সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করি বাস্তবে সেটি ওই রকম নাও হতে পারে। তাই কেউ আমার এই ভাবনাকে সমর্থন জানিয়ে প্রশংসা করলে আমি খুশি ও উৎফুল্ল হই আবার পক্ষান্তরে উপেক্ষা বা তিরস্কারে ক্রোধান্বিত হই কারণ আমি ওই কাল্পনিক ভাবমূর্তির ওপরে মানসিকভাবে পুরোপুরি নির্ভরশীল। নিজের গুণ, সক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি সম্পর্কে বাস্তব এবং সম্যক ধারণা না থাকলে, আত্মমূল্যায়ন (Self estimation) এবং ধারণা আর বাস্তবতার সমতার অভাবে, কাঙ্ক্ষিত পরিচিতি অধরাই থেকে যায়। তৈরি হয় অন্তর্দ্বন্দ্ব, বয়ে আনে পরিচিতির সংকট, অস্তিত্বের সংকট। আর এভাবেই প্রজ্ঞা ও বোধির স্বকীয় ঐশ্বর্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার পরিবর্তে জীবন এগিয়ে যায় আত্মবিস্মৃতির পথে, পরিচয়হীন এক অবস্থার দিকে। ‘identity crisis’ থেকে ‘loss of identity’।
একজন শিল্পীর জীবন কি এই পরিচিতির সংকট মুক্ত? সেই সংকট কি তাঁর শিল্পসৃষ্টি বা শিল্পীসত্তাকে কোনও ভাবে প্রভাবান্বিত করে না? শিল্পীর পরিচিতির সংকট প্রসঙ্গে আসার আগে শিল্প কী এবং শিল্পীর সঙ্গে শিল্পের পারস্পরিক সম্পর্কের বিন্যাসের বিষয়ে কিছু কথা বলতেই হয়।
‘শিল্প’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘art’; গ্রিক ভাষা থেকে রূপান্তরিত লাতিন শব্দ ‘ars’ থেকে এসেছে। প্রাচীনকালে ‘ars’ শব্দটি বর্তমান কালের ‘craft’ অর্থে ব্যবহার করা হত। শিল্প বা শিল্পকলা শব্দকে পণ্ডিতেরা নানা ভাবে ব্যাখ্যা এবং বর্ণনা করেছেন। অস্কার ওয়াইল্ড যেমন “art for art’s sake” তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন, তলস্তয় বা বার্নার্ড শ তেমনি শিল্পের সামাজিক মূল্যমান-কে শিল্পের উদ্দেশ্য মনে করেছেন। আবার রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “শিল্প হচ্ছে তাই যা নিছক প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি তাগিদ থেকে মানুষকে চালনা করে, শিল্প সৃষ্টিতে নিযুক্ত করে”।
শিল্প নিয়ে নানান ব্যাখ্যা থাকলেও একথা বলা যেতেই পারে যে, শিল্প গড়ে উঠবে কেবলমাত্র সৃষ্টির তাগিদে, সৃজনের আনন্দেই। সেখানে অন্য কোনও কিছু স্থান পেতে পারে না। শিল্পের দায়বদ্ধতা শুধু শিল্পের কাছেই। শিল্পসৃজন আকস্মিক।কোনও ঘটনার অভিঘাত বা কোনও বিশেষ মানসিক অবস্থা, যেমন আনন্দ, দুঃখ, ক্রোধ, হতাশা, উদ্বেগ, ক্ষোভ, উল্লাস এগুলিই শিল্পসৃষ্টির কারণ হিসাবে কাজ করে, শিল্পীকে তাড়িত করে, নিয়ে যায় নতুন শিল্পসৃজনের পথে। আর এই শিল্পসৃজনের কাজটি করেন একজন শিল্পী। শিল্পী কথাটিরও ব্যাপ্তি বিশাল। তাই সেই বিস্তারের মধ্যে না গিয়ে এক্ষেত্রে আলোচনা কেবলমাত্র সংগীতশিল্পী, তাঁর পরিচিতি ও পরিচিতির সংকট এই পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল।
একজন সংগীতশিল্পীর পরিচিতি যে সকল সংকটের সম্মুখীন হয় তার অন্যতম প্রধান হল তকমাপ্রাপ্ত হওয়া। যখন ওই শিল্পীকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিভুক্ত করে দেগে দেওয়া হয় বা চিহ্নিত করা হয়। এই ঘটনার অজস্র উদাহরণ অতীতেও ছিল, আজও আছে আর আগামীদিনে কী হবে তার উত্তর আছে কালের গর্ভে। কোনও শিল্পীর পরিচিতির সঙ্গে একটি বিশেষ তকমা জুড়ে যেতে বিশেষ বিলম্ব হয় না। এইরকম অজস্র ঘটনার মধ্যে থেকে কয়েকটির উল্লেখ করছি, নামগুলির উল্লেখ ব্যতিরেকে।
একই গুরুর কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষাগ্রহণকারী বেশ কয়েকজন প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন গায়কের মধ্যে একজন একই মরশুমে পরপর কয়েকটি অনুষ্ঠানে তার গুরু এবং সতীর্থদের সঙ্গে হারমোনিয়ামে সহযোগী শিল্পী হিসাবে সংগত করেছিলেন। অনতিবিলম্বেই ওই উদীয়মান কন্ঠসংগীতশিল্পীর হারমোনিয়াম বাদকের পরিচিতি পিছনে ফেলে দিল তার গায়ক পরিচিতিকে। বিষয়টির গুরুত্ব এবং আগামীদিনে এর ক্ষতিকর প্রভাব উপলব্ধি করে ওই গায়ক এরপর সচেষ্ট হয়েছিলেন তাঁর কন্ঠসংগীতশিল্পীর পরিচয়কে সংকট থেকে উদ্ধার এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে ঐ শিল্পী সফল হলেও সকলে এমনতর সৌভাগ্যের অধিকারী হন না তা বলাই বাহুল্য।
আর একজন ভ্রাতৃস্থানীয় অত্যন্ত গুণী শিল্পীর সঙ্গে একটি অনুষ্ঠান করতে যাবার সময় যাত্রাপথে গাড়িতে বেশ জমে উঠেছিল ভ্রাম্যমাণক আড্ডা। কথায় কথায় জানতে পারলাম শহর ছাড়ার আগে তিনি সদ্য কিছু শ্যামাসংগীত রেকর্ড করেছেন। এ কথা জানার পর খুব স্বাভাবিক কারণেই জানতে চেয়েছিলাম, সেই রেকর্ডবদ্ধ গান জনসমক্ষে আসবে কবে? সেই শিল্পী ভাইয়ের জবাবখানি শুনলেই পাঠক বুঝতে সক্ষম হবেন এই তকমাপ্রাপ্ত হবার বিষয়টিকে শিল্পীরা কতখানি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনাধীন রাখেন। প্রসঙ্গত উল্লেখনীয় এই শিল্পী বয়সে নবীন হলেও শাস্ত্রীয় সংগীতসহ সব ধরনের সংগীত পরিবেশনায় অত্যন্ত পারদর্শী এবং বিশেষভাবে দক্ষ। আমার প্রশ্নের জবাবে যা বলেছিলেন সেই শিল্পী তা এইরকম, রাগাশ্রয়ী বাংলা গান এবং বাংলা আধুনিক গান নিয়েও ওঁর কিছু নতুন গান অদূর ভবিষ্যতেই রেকর্ডবদ্ধ হতে চলেছে। ওঁর পরিকল্পনা সেই গানগুলি শ্রোতাদের কানে পৌঁছে দেবার পরেই শ্যামাসংগীতের ডালি তাঁদের জন্য উন্মুক্ত করার। অন্যথায় প্রথমেই শ্যামাসংগীতগুলি শ্রোতার কাছে পৌঁছলে, ওঁর আশঙ্কা, তাঁকে কেবলমাত্র শ্যামাসংগীত গায়ক বলেই হয়তো দেগে দেওয়া হবে।
‘সহযোগী শিল্পী’ — এই পরিচিতি একবার নামের সঙ্গে জুড়ে গেলে সেই পরিচিতির বাইরে এসে নিজেকে মুখ্য শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করাটা প্রায় অসম্ভবের সমতুল। কত না গুণী একক গায়ন বা বাদনে সক্ষম কন্ঠ ও যন্ত্রশিল্পী আজীবন সহযোগী শিল্পী (accompanist)-র তকমা নিয়েই গানবাজনা করে গেলেন। একক বা মুখ্য শিল্পী হবার স্বপ্ন বুকে নিয়ে সেই মতো নিষ্ঠার সঙ্গে নিত্য অনুশীলন, শিক্ষাগ্রহণ নিজের গায়ন বা বাদন ক্ষমতাকে ক্রমাগত পরিশীলিত করে যোগ্যতা অর্জনের পরেও আজীবন সহযোগী শিল্পী হয়ে রয়ে যেতে হয়েছে এমন উদাহরণের অভাব নেই। মঞ্চের মধ্যমণি হয়ে সুরের আবেশে শ্রোতার হৃদয় মাতাতে সমর্থ শিল্পী মঞ্চের একধারে বসে গানবাজনা করছেন সহযোগী শিল্পী হিসাবে এ চিত্র দুর্ভাগ্যজনক হলেও ঘোরতর বাস্তব। সেই যোগ্য শিল্পী কি অস্তিত্বের সংকট অনুভব করেন না ‘সহযোগী শিল্পী’ এই পরিচিতি যাঁকে তাঁর প্রাপ্য প্রকৃত পরিচিতি থেকে রেখে দিল বহুদূরে?
সহযোগী শিল্পী প্রসঙ্গে যাঁদের কথা অনিবার্যভাবে এসে পড়ে, এবার তাঁদের কথায় আসা যাক। বলতে চাইছি তবলিয়া বা তবলাবাদক সম্প্রদায়ের কথা। যাঁদের সম্বোধন করে থাকি ‘তবলচি’ বলে। ‘তবলচি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ তবলাবাদক হলেও এই উচ্চারণের সঙ্গে খানিক অ-শ্রদ্ধা এবং অবজ্ঞার ভাব মিশে থাকে বলে সংগীত রসিকেরা তবলিয়া বা তবলাবাদক এই শব্দগুলিকেই প্রাধান্য দেন। শ্রদ্ধেয় সুকুমার রায় মহাশয়ের কবিতার বিখ্যাত পংক্তি অবস্থা বুঝিয়ে দেয় — “কনিষ্ঠটি তবলা বাজায়, যাত্রাদলে পাঁচটাকা পায়”। পরবর্তীকালে অবস্থার উত্তরণ ঘটলেও রাজদরবারে সংগীত পরিবেশনকালে এমনকি গত শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও গায়কের সঙ্গে এক আসনে বসার অধিকার পর্যন্ত ছিল না তবলাবাদকের। মূল শিল্পী সর্বদা বসতেন উচ্চাসনে। অর্থপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও বৈষম্য ছিল একইরকম। আজকে শাস্ত্রীয় সংগীত অনুষ্ঠানের মঞ্চে তবলাবাদক মূল শিল্পীর সঙ্গে একই আসনে বসে বাজাচ্ছেন, সাম্মানিক পাচ্ছেন যথাযথ এই বহুকাঙ্খিত ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ভগীরথের ভূমিকা নিয়েছিলেন যাঁরা, তাঁরা প্রণম্য, শুধু শিল্পীকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানপ্রদান করাই নয়, তাঁরা উজ্জ্বল করেছেন এই মাটির সাংগীতিক ঐতিহ্যকে, ঘটিয়েছেন শিল্পীর পরিচিতির সংকটের বন্ধনমুক্তি।
সংগীতশাস্ত্র অনুযায়ী গীত, বাদ্য এবং নৃত্যের সমন্বয়কেই সংগীত (গীতং বাদ্যং তথা নৃত্যং ত্রয়ং সংগীতমুচ্যতে) বলা হয়েছে। তথাপি নৃত্য বিষয়টিকে লঘু এবং অবহেলার দৃষ্টিতে দেখার একটা প্রবণতা কয়েক দশক আগেও দেখা গেছে। এমনকি আজকের দিনেও এমন গোঁড়া, রক্ষণশীল মানুষের সন্ধান মেলে যাঁরা নৃত্যচর্চা এবং নৃত্য উপস্থাপনাকে সুনজরে দেখেন না, তাকে অপ-আখ্যা দিয়ে দোষের বিষয় বলে চিহ্নিত করেন। আর এই কারণেই ‘নৃত্যশিল্পী’ — এই পরিচয় বহনকারীকেও ‘নাচিয়ে’ বলে, দেওয়া হয়েছে অপবাদ, করা হয়েছে তাঁর সম্মানহানির অপপ্রয়াস। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আজ একজন নর্তক বা নর্তকী সসম্মানে মাথা উঁচু করে নিজের শিল্পমাধ্যম এবং শিল্পীসত্তার কথা সগর্বে, সোচ্চারে সর্বসমক্ষে ঘোষণা করতে পারছেন, নৃত্যের ডালি সাজিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন দেশ-বিদেশের দর্শকের সামনে তাঁদের সাদর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে, এটাই পরম প্রাপ্তি। একজন শিল্পী পাবেন তাঁর প্রাপ্য সম্মান, কাজের স্বীকৃতি এবং সর্বোপরি শিল্পী পরিচিতি, এটাই কাম্য। কেননা একজন শিল্পীর পরিচিতি এবং অস্তিত্ব কোথায় যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
শিল্পীর পরিচিতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়ার নানাবিধ কারণ থাকলেও এই পরিচিতির সংকট তাঁরাই বোধহয় সবথেকে বেশিমাত্রায় অনুভব করেন যাঁরা কেবলমাত্র অন্য কোনও সুপ্রতিষ্ঠিত খ্যাতিমান শিল্পীর কন্ঠস্বর এবং গায়নশৈলীর অনুকরণে, সেইসব শিল্পীর কন্ঠে গাওয়া বিখ্যাত ও জনপ্রিয় গানগুলিই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেয়ে থাকেন। চালুকথায় যাঁদের ‘কন্ঠিশিল্পী’ বলা হয়। এইভাবে কেবলমাত্র অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে এই সকল শিল্পীরা স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেন অচিরেই। নিজস্ব গায়কির সন্ধান তো দূর অস্ত এঁরা নিজের প্রকৃত কন্ঠস্বরকেই চিনে উঠতে পারেন না। যাঁরা অন্ধ অনুকরণের নেতিবাচক দিকগুলি সম্পর্কে অবগত হয়ে পরবর্তীকালে গানের মধ্যে স্বতন্ত্র ঢং, স্বকীয়তা আনতে সমর্থ হয়েছেন তাঁরা নিজেদের সৃষ্টির মাঝে খুঁজে পেয়েছেন নিজের অস্তিত্ব, আপন পরিচিতি। যাঁরা কোনও নির্দিষ্ট শিল্পীর গানের হুবহু নকল করে গান গাওয়ার মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ রেখেছেন, তাঁরা ওই বিশেষ শিল্পীর ছায়া হয়েই রয়ে গেছেন। আত্মপরিচিতিহীন এক অস্তিত্ব, যাঁর পরিচিতি পরজীবী উদ্ভিদের মতো থেকে যায় বৃহৎ কোনও নাম এবং পরিচিতির আশ্রয়ে।
সাফল্য এবং জনপ্রিয়তা একজন শিল্পীকে আত্মবিশ্বাসী এবং উজ্জীবিত করে তোলার পাশাপাশি শিখরে পৌঁছে দেয় ওই শিল্পীর পরিচিতি। আর এখানেই শিল্পীকে দিতে হয় অগ্নিপরীক্ষা। শিখরে পৌঁছানোর কঠিন লড়াইয়ের থেকেও কঠিনতর হয়ে পড়ে ওই উচ্চতায় নিজের অবস্থানকে ধরে রাখা। একবারের সাফল্য নয়, চাই ধারাবাহিক সাফল্য। অন্যথায় ঘনিয়ে আসে সংকট, পরিচিতির সংকট, সংকট অস্তিত্ব রক্ষার। অটুট আত্মবিশ্বাস আর মনের জোরকে সম্বল করে নিজের কাজের গুণমানের উন্নতিসাধন, আধুনিকীকরণ এবং সে মান বজায় রেখে শ্রোতাদের চাহিদা পূরণ করে, সময়ের সঙ্গে চলতে না পারলে সংকট হয় গাঢ়তর। ঘিরে ধরে সব হারানোর ভয় — এই বুঝি আলোকবৃত্তের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে পড়তে হবে অনিশ্চয়তার অন্ধকারের গভীরে। ঘনীভূত হয় পরিচিতি ও অস্তিত্বের সংকটাপন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা। স্নায়ু এবং মনের ওপর চাপ পড়তে থাকে। রজ্জুতেও ঘটে সর্পভ্রম।
একটি ঘটনার কথা বলি। প্রায় বছর দশেক আগে দক্ষিণ-কলকাতার একটি রেকর্ডিং স্টুডিয়োতে নতুন গান রেকর্ড করার কাজ চলছিল। শহরের অতি পরিচিত জনপ্রিয় গায়িকা উপস্থিত হয়েছেন নির্বাচিত গানগুলি গাইতে। তালবাদ্যসহ অন্যান্য সকল বাদ্যযন্ত্রীর বাজনা আগেই গৃহীত হয়েছিল শুধুমাত্র গায়িকার কণ্ঠের শব্দগ্রহণের কাজটিই ছিল বাকি। সেইটিই অর্থাৎ ভয়েস ডাবিং (voice dubbing)-এর কাজটিই হচ্ছিল সেদিন। গান গাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে প্রায় পাঁচ/দশ মিনিটের ব্যবধানে তিনি একবার করে চোখ রাখছিলেন তাঁর মুঠোফোনের পর্দায় এবং কোনও নতুন বার্তা (message) বা ফোন কল না-দেখতে পেয়ে প্রত্যেকবারই গভীর উদ্বেগের সঙ্গে একই কথা বলছিলেন — “এতটা সময় চলে গেল কোনও নতুন message বা call আসছে না আমার ফোনে। তবে কি কেউ আমার কথা ভাবছে না? লোকে আমায় ভুলে গেল?”
শিল্পীর এই কথাগুলির বারবার বলে যাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর পেশাগত জীবনের অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতাজনিত মানসিক উদ্বেগের সাক্ষ্য বহন করে এবং এই উৎকণ্ঠার কেন্দ্রস্থলে থাকে শিল্পীর পরিচিতির সংকট, অস্তিত্বের সংকটের সম্ভাবনার গভীর শঙ্কা।
আবার একবার মফসসল শহরের এক অনুষ্ঠানে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তার কার্য-কারণ সম্পর্ক খুঁজতে গেলে আজও দিশাহারা হয়ে পড়ি, সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। সেই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে আমন্ত্রিত ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয়, বরেণ্য, বর্ষীয়ান একজন সংগীতশিল্পী। খ্যাতির শীর্ষে থাকা সেই শিল্পী সেদিন অনুষ্ঠান সংগীত পরিবেশন না করলেও, বিশেষ অতিথি হিসাবে নিজের বক্তব্য পেশ করে, দর্শকাসনের প্রথম সারিতে বসে দেখছিলেন এবং শুনছিলেন সবকিছু। এক বন্ধুর সঙ্গে বিশেষ প্রয়োজনে দেখা করতে সাজঘরে উপস্থিত হয়েছিলাম। বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল, হঠাৎ সেই সাজঘরে প্রবেশ করলেন সেদিনের অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি, আমাদের সকলের প্রিয় শিল্পী। সেখানে তখন এমন দু-চারজন তরুণ যুবা উপস্থিত ছিলেন যাঁরা ওঁর কাছে সংগীতশিক্ষাগ্রহণ করেন। সেই বিশাল ব্যক্তিত্বের সামনে থেমে গেল আমাদের সকলের কথা। এবার কথা বলা শুরু করলেন তিনি। আগ্রহভরে নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম সব। কিন্তু পরম বিস্ময়ে লক্ষ করলাম তিনি তখন শুধু নিজের সম্পর্কেই বলে চলেছেন নানান কথা। তাঁর কীর্তি কেন ব্যতিক্রমী, তাঁর কাজ কিংবদন্তী শিল্পীদের স্বীকৃতি আদায় করে নিতে সমর্থ হয়েছে, অপরাপর মহান শিল্পীরা তাঁর সম্পর্কে কী কী প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনছিলাম আর ভাবছিলাম ওঁর কীর্তিকাহিনি সর্বজনবিদিত। সেসব কথা বলার জন্য তো বহু মানুষ এবং প্রচারমাধ্যম উদ্গ্রীব রয়েছে। নিজের মুখে কি এই কথাগুলি তাঁর না বললেই নয়?
শিল্পী হিসাবে যাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত, জনপ্রিয়তা এবং চাহিদা তুঙ্গে, খ্যাতি-অর্থ কোনও কিছুরই যখন কোনও খামতি নেই সেই অবস্থায় একজন শিল্পীর এমন অপ্রয়োজনীয় এবং সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য বিস্মিত করে। মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনও অপ্রাপ্তি, হতাশাবোধ থেকেই কি উঠে এসেছিল কথাগুলো? হয়তো আরও বৃহত্তর পরিচিতি এবং সম্মানের প্রত্যাশা রয়ে গিয়েছে চেতনে-অবচেতনে আর সেই অপ্রাপ্তিজনিত হতাশাই হয়তো খুলে দিয়েছে অনাবশ্যক কথার উৎসমুখ।
শিল্প সৃষ্টি করেন শিল্পী। যদি বলি শিল্প সমাজের দর্পণ, সেক্ষেত্রে শিল্পীর ব্যক্তি-অভিঘাত আসলে সমষ্টির অভিঘাতের প্রতিনিধিত্ব করে। একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত সংকট এবং সমষ্টির সংকট যতক্ষণ অভিন্ন থাকে ততক্ষণ কোন সমস্যা বা দ্বন্দ্ব তৈরি হয় না। শিল্পী একজন বাস্তব মানুষ, রক্তমাংসের মানুষ, মাটির সাথে যাঁর নিবিড় সংযোগ। তাঁর অনুভূতি, জীবন, সংবেদনশীলতা, তাঁর বেঁচে থাকা এসব নিয়েই তাঁর শিল্পসৃষ্টি। এই বেঁচে থাকাটাই যখন টালমাটাল হয়ে যায় তখন শিল্পীর সংকট শিল্পকে প্রভাবিত করে, ব্যক্তির সংকট শিল্পে জায়গা করে নেয়। আর শিল্পীর এই অস্তিত্বের সংকট এবং পরিচিতির সংকট যখন মিলেমিশে যায়, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বা আরোপ করা না হয়, তখনই তাঁর শিল্পসৃষ্টিতে রক্তমাংসের সন্ধান পাওয়া যায়।
আবার, শিল্পীর আছে দায়বদ্ধতা, আছে ব্যক্তিত্ব এবং শিল্পীর অহংকার। সে দায়বদ্ধ তাঁর শিল্পের প্রতি, সৃষ্টির প্রতি, সততার প্রতি। এই দায়বদ্ধতাকে শিল্পী এড়িয়ে যেতে বা অস্বীকার করতে পারেন না। সে জানে শেষ পর্যন্ত একটি গানকে গান, ছবিকে ছবি হয়ে উঠতে লাগে। কিন্তু এর পরেও শিল্পীর সৃষ্টির ভবিষ্যৎ কী হবে সে নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। থেকে যায় শিল্পীর পরিচিতি এবং অস্তিত্বের সংকটাপন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা। ধরা যাক এই সমস্ত কিছু মাথায় রেখে, শিল্প, নিজের শিল্পীসত্তা এবং দায়বদ্ধতার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে, পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে একজন গায়ক একটি গান হৃদয় উজাড় করে গাইলেন এবং নিয়ে এলেন শ্রোতাদের সামনে। কিন্তু দেখা গেল সে গান শ্রোতারা গ্রহণ করলেন না বা অতি মুষ্টিমেয় শ্রোতাই সে গান শুনলেন এবং গানের কদর করলেন। একজন গায়কের পক্ষে এটা মৃত্যুর সামিল। পাশাপাশি সেই গায়ক দেখলেন তুলনামূলকভাবে লঘু, চটুল, চটকদার অন্য কোনও গান অপ্রত্যাশিতভাবে তুমুল জনপ্রিয় হল। এমতাবস্থায় যখন শিল্পীর অস্তিত্বের সংকট, পরিচিতির সংকট প্রধান হয়ে ওঠে তখন সে কি করবে? তাকেও তো বাঁচতে হয়, সেও তো সামাজিক মানুষ। তাই সে যদি বাঁচে, শিল্পী হিসাবে বাঁচে, তবে তাঁর ‘সামাজিক মানুষ’ সত্তাকে বিসর্জন দিতে হয়। আবার সে যদি সামাজিক মানুষ হিসাবে বাঁচে তবে তাঁকে আপস করতে হয় জনপ্রিয়তার সঙ্গে, শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা অস্বীকার করে বাজার যা চাইছে সেই চাহিদার সঙ্গে।
রুচির অভিঘাত, সময়ের অভিঘাত সংকটকে করে গভীর থেকে গভীরতর। কান খোলা থাকলে ঠিক ধরা পড়বে আজকাল কবিগান বা অষ্টপ্রহর কীর্তনের মধ্যেও ঢুকে পড়ছে বাজার চলতি চটুল বাংলা বা হিন্দি গানের সুর, লোকগান এবং বাউল গানের যন্ত্রানুষঙ্গে দেখা যাচ্ছে ইলেকট্রিক গিটার, সিনথেসাইজার সহ ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার। ফলত সংগীতের এই প্রচলিত ধারাগুলি হারাচ্ছে তার বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্র্য, চিরাচরিত ঐতিহ্য এবং শ্রুতিমাধুর্য। এখানেও শিল্প এবং শিল্পীর অস্তিত্বের সংকট। এই যথেচ্ছাচারকে শিল্পমাধ্যমের আধুনিকীকরণ এবং মানুষ তা গ্রহণ করছেন, মেনে নিচ্ছেন — এই অজুহাত দেখিয়ে আপসকারী শিল্পী পরম্পরা, ঐতিহ্য সব ভুলে, স্বকীয়তা ছেড়ে করছেন বাজারচলতি চটুলের অনুকরণ। একজন সামাজিক মানুষ রূপে, সংসার প্রতিপালনের দায় তাঁকে এই আপসে বাধ্য করে। আর এখানেই একজন শিল্পী মানুষের সঙ্গে সামাজিক মানুষের দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকে।
শিল্পীর সৃষ্টি আকস্মিক, স্বতঃস্ফূর্ত। তিনি সৃষ্টি করেন সৃষ্টির আনন্দেই। সৃষ্টিশীলতাকে সক্রিয় করতে এই সমাজ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা উদ্দীপক এবং অনুঘটকের কাজ করে বই-কি। চারপাশে ঘটে যাওয়া নানাবিধ ঘটনা শিল্পীমনে প্রতিবেদন জাগায়, অনুরণিত করে, সেখান থেকেই একজন শিল্পী খুঁজে পান তাঁর সৃষ্টির রসদ। একজন শিল্পী কী করবেন, কী গান গাইবেন বা কী নাটক লিখবেন তা একান্তই সেই শিল্পীর ব্যক্তিগত স্বাধীন সিদ্ধান্ত। কিন্তু যখন শিল্পী কী সৃষ্টি করবেন, কেমন গান বা নাটক লিখবেন, কী গাইবেন, কী করবেন আর কী করবেন না সেটাও বাইরে থেকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন শিল্পীর পরিচিতি এবং অস্তিত্ব উভয়েই সংকটের মুখে পড়ে। কখনও কখনও যেমন এই ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বিষয়গুলি শিল্পীর সৃজনকে প্রভাবিত করেছে আবার বহুক্ষেত্রে কিন্তু শিল্পী তাঁর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে, শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সৃষ্টির কথাও ভেবেছেন এমন উদাহরণের অভাব নেই। গণনাট্য বা গণসংগঠনের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা অনেকবার দেখা গেছে। বহু শিল্পীর নিজস্ব শিল্পভাবনা এবং যেভাবে তিনি তাঁর কথা বলতে চান তার সঙ্গে দলীয় নির্দেশ (পার্টি লাইন)-এর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল এবং অনেকেই সংগঠন ছেড়ে বেড়িয়ে এসেছিলেন সৃষ্টির স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে, শিল্পীর পরিচিতি এবং শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতায়। ওপরের কথাগুলি যেমন সত্য তেমনই গণনাট্যের মতো একটি যূথবদ্ধ সংগঠন সম্পর্কে আরও কিছু কথা না বললে অর্ধসত্য বলা হয়। প্রকৃত অর্থেই ব্যক্তির মুক্তি জড়িয়ে থাকে সমষ্টির মুক্তির মধ্যে। গণনাট্য হয়ে উঠেছিল সেই মঞ্চ যেখানে ব্যক্তিচেতনা, ব্যক্তিসংকট বৃহত্তর সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিচিতি নির্মাণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল এ কথা স্বীকার বা উল্লেখ না করলে সত্যের অপলাপ ঘটে। গণনাট্যের মাধ্যমেই ব্যক্তি এবং সমষ্টির সংকট, তাঁদের স্বপ্ন, আবেগ মিলেমিশে এক হয়ে খুঁজে পেয়েছিল ভাষা; তাঁদের গান, নাটক, কবিতা গড়ে নিয়েছিল ভিন্নধর্মী একান্ত নিজস্ব শৈলী এবং সার্থকভাবে ঘটিয়েছিল পরিচিতির নবনির্মাণ। শিল্পীর ব্যক্তিগত পরিচিতির সংকটের প্রশ্ন এসেছে অনেক পরে। কিন্তু তার আগে গণনাট্য যে শিল্পীদের পরিচিতি নির্মাণের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল সে বিষয়ে কোনও সংশয় বা দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই।
শিল্পীকে সমাজের বিবেক বললে অত্যুক্তি করা হবে না। তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা, সাহস, ব্যক্তিত্বের ঋজুতা তাঁকে মাথা উঁচু করে শিল্পী পরিচিতি নিয়ে গর্বের সঙ্গে বাঁচতে বলে। শিল্পী তো বন্দনা গায় না কৃপালাভের আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু কখনও যদি কোন শিল্পী রাজানুগ্রহপ্রত্যাশী হয়ে স্তাবকতার পথ বেছে নেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই তিনি নিজেই তাঁর বহু শ্রমার্জিত শিল্পী পরিচিতির প্রতি করেন চরম অপমান। শিল্পীসত্তা বিকিয়ে দিয়ে শিল্পী পরিণত হন দাস-এ। অস্তিত্ব রক্ষা সুনিশ্চিত হয় হারিয়ে যায় শিল্পী, শিল্পী পরিচিতি।