বিন্যাসের ন্যারেটিভ, ন্যারেটিভের বিন্যাস : প্রসঙ্গ জাতীয়তাবাদ এবং পরিবেশচেতনা

সুলগ্না খান

এক

গোড়ার কথা

‘One of the tasks of criticism is that of the recovery of function, not of course the restoration of an original function, which is out of the question, but the recreation of function in a new context.’[১]

সামাজিক স্বরায়নের বহুবিধ পরিসরের সন্নিবেশে যে জটিল সাংস্কৃতিক আখ্যান নির্মিত হয়; সেখানে প্রকৃতির নিয়ত বিপজ্জনক পরিবর্তনশীলতার ছবিকে অস্বীকারের সময়, বহু আগেই অতীত সত্যে পর্যবসিত। বস্তুতপক্ষে প্রকৃতির সঙ্গে ক্রমিক অগ্রগতিতে বেড়ে চলা মানবসভ্যতার সামগ্রিক দূরত্ব; ‘biodiversity’-র অন্তর্গত পারস্পরিক সৌষম্যময় অবস্থানের ধারণাটিকে একপ্রকার অগ্রাহ্য করে। আর এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, জাতীয়তার নানা ভাষ্যের সঙ্গে ক্রমশ ব্যবধান বাড়িয়ে চলা, পরিবেশচেতনার, অনিবার্য সংঘর্ষের চিত্রটি। প্রসঙ্গত, মনে পড়ে যায়, অনতিদূর কালের একটি দুর্ভাগ্যজনক কিন্তু বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার উদাহরণ। ৩ আগস্ট, ২০১৯। টেক্সাস-এর অন্তর্গত, এল পাসো অঞ্চলের ওয়ালমার্ট স্টোরে, বন্দুকবাজের অতর্কিত হানায় তেইশ জন নিরীহ প্রাণ হারালেন। ‘Domestic Terrorism’ বা ‘Hate Crime’ জাতীয় পরিচিত শব্দবিন্যাসের পাশাপাশি, এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এমনকিছু অভিব্যক্তির সন্ধান মেলে, যা নিঃসন্দেহে প্রথাগত নয়। ‘শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী’ হিসেবে মূল্যায়িত এই হত্যাকারী, হামলার কিছু পূর্বে, সামাজিক মাধ্যমে তার যে বক্তব্য ছড়িয়ে দিয়েছিল, সেটি প্রণিধানযোগ্য। তার বক্তব্যে সে সরাসরি, আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের “cultural and ethnic replacement”[২]-এর সঙ্গে এই আক্রমণের সংযোগসাধন করতে চেয়েছে। উল্লেখযোগ্য ভাবে এরই পাশাপাশি অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গ জাতিসত্তার স্ব-উদ্ভাবিত বয়ানকে তুলে ধরতে গিয়ে; হামলাকারী পরিবেশচিন্তার ভিন্নতর স্বর উপস্থাপনের চেষ্টা করে। নিজেকে একজন “ecofascist” পরিচয়ে তুলে ধরে, সে জানান দেয়, “nationalism without environmentalism”[৩] আদতে এক অর্থহীন বস্তু।

প্রকৃতপ্রস্তাবে, বলা যায়, হিংসাত্মক, অত্যন্ত নিন্দনীয় এই ঘটনাটিকে ভরকেন্দ্রে রেখে, দীর্ঘলালিত অন্যমনস্কতার এক অপর বলয় আবিষ্কৃত হয়। সেখানে ‘White Supremacism’, ‘Anti-immigrant’ তত্ত্বের সঙ্গে সুকৌশলে বা সময়ের নিজস্ব দাবিতে মিশে যায়, ‘Environmentalism’-এর নৈতিক প্রশ্নটি। যে প্রশ্ন-কে তথাকথিত “Hispanic invasion of Texas”[৪]-এর সঙ্গে এক সূত্রে গ্রন্থনার প্রচেষ্টা বিশেষভাবে চোখে পড়ে। আধুনিক উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের আওতায়, গূঢ়তর হয়ে ওঠে, ‘এনভায়রনমেন্ট’-কেন্দ্রিক কথোপকথন-কে আধিপত্যকামী ভাবনাবিশ্বের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার নিজস্ব প্রয়াস; ব্যাখ্যা তথা বিরুদ্ধ ব্যাখ্যার প্রেক্ষিত প্রতিষ্ঠা। এই পটভূমিতে, স্মরণে আসতে পারে, র‍্যাচেল কারসন-এর Silent Spring-এর কথা; অবিমৃশ্যকারী সভ্যতার বিবেকবর্জিত উন্নয়নের আক্রমণে প্রকৃতির স্বরচিত নিয়মতন্ত্রের নিশ্চিত বিপর্যয়ের ইতিবৃত্ত। একুশ শতকে পৌঁছে, জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভুবনে, একচেটিয়া পুঁজিবাদের অন্তহীন মুনাফালোভের সঙ্গে ‘Conflict of Interest’-এ গুরুতর হয়ে ওঠে, পরিবেশ নিধনের সূত্রে মানবচৈতন্যের স্বেচ্ছাকৃত বিপন্নতার ইতিহাস, মূল্যবোধের সার্বিক মেরুকরণ।

দুই

Global Climate Justice : নীতি এবং ন্যায়ের দ্বন্দ্ব

২০১০ সালে প্রকাশিত Designing Climate Mitigation Policy প্রবন্ধে, বিজ্ঞানসম্মত অনুসন্ধানের সমন্বয়ে যে তথ্য উঠে এল, তা রীতিমতো চমকপ্রদ। প্রাবন্ধিকরা জানালেন :

‘Global CO2 emissions from fossil fuels have grown from about 2 billion (metric) tons in 1900 to current levels of about 30 billion tons and, in the absence of mitigation policy, are projected to roughly triple 2000 levels by the end of the century.’[৫]

১৯৯০ থেকে ২০০৫, সময়পর্বের খতিয়ান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, একাধিক গবেষণা প্রমাণ করেছে; উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিষ্কাশনমাত্রা, উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে প্রায় ৮৬% বৃদ্ধি পেয়েছিল, উন্নয়নশীল দেশগুলির ক্ষেত্রে যার পরিমাণ প্রায় ১৬%। পরিস্থিতির ভয়াবহতা পরিমাপ স্বাভাবিকভাবে তখন থেকেই বিশেষ কঠিন থাকেনি এবং সেক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলির ‘emission goal’-কে যদি কঠোর শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করাও যায়, তবুও আগামী দিনে পরিবেশের ক্ষয়রোগ-কে এড়িয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব। মনে রাখা দরকার, ইউনাইটেড স্টেটস-এর মতো; আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দেশগুলির ভূমিকা এক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। বর্তমান শতকের প্রথম পর্বেও প্রায় প্রত্যেক বছরে ইউনাইটেড স্টেটস-এর কার্বন এমিশন প্রায় ২% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।[৬] এরপরেই বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয়, চিন এবং ভারতের প্রসঙ্গ। ২০০৭ সালের হিসেব অনুযায়ী চিনের ক্ষেত্রে এই নিষ্কাশন হার প্রায় ৭.৫% বৃদ্ধি পায় এবং পরিসংখ্যান জানাচ্ছে : 

‘Still, it was large increases in China, India and other developing countries that spurred the growth of carbon dioxide pollution to a record high of 9.34 billion tons of carbon(8.47 billion metric tons) — China passed the United States as the No.1 carbon dioxide polluter in 2006.’[৭]

পৃথিবীর তাপমাত্রা সহনশীলতার পর্যায়ে রাখার জন্য, আসন্ন ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্করতম, ক্ষিপ্ত প্রাকৃতিক অন্তর্ঘাত রোধ হেতু; আগামী কয়েক বছরে বৈশ্বিক স্তরে, গ্রিনহাউস গ্যাস এমিশন অন্ততপক্ষে ৮০% কমিয়ে ফেলা আশু প্রয়োজন। প্রসঙ্গক্রমে কিয়োটো প্রোটোকলের উল্লেখ করা যায়, যার যথাযথ প্রয়োগে বিশ্ব উষ্ণায়নের গতিরোধ পুরোপুরি অসম্ভব ছিল না। অ্যাঞ্জেল ভ্যালেন্সিয়া স্পষ্টত জানান, ওজোন লেয়ারের ক্রমিক বিনাশসম্ভাবনা জনস্বার্থ রক্ষার প্রক্রিয়ায় এমন এক গুরুত্বপূর্ণ দিকচিহ্ন; যেখানে সমাধানসূত্র পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্কসূত্রে গ্রথিত।[৮] সভ্যতার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য জলবায়ুর পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকে স্বীকার তথা জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারণায় একে এক ‘Potential Threat’ হিসেবে দেখার সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ; এহেন উভমুখী প্রক্রিয়া যে তাত্ত্বিক পরিসরের জন্ম দিতে পারে, তার মধ্য দিয়ে ‘Ecological Catastrophes’-এর কর্কশ প্রতিক্রিয়াকে অনুধাবন সম্ভবপর। উন্নয়ন এবং মুনাফাধর্মিতার একরৈখিক পৃথিবীর বাইরে এসে, বিচ্যুতির দায়ভার গ্রহণের পাঠ যে বৈজ্ঞানিকতার নির্মোহ দৃষ্টিকোণের মাধ্যমেই সম্ভব, তার অন্যতম দিশানির্দেশ করেন অধ্যাপক উইলিয়াম নর্ডহস। প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিরোধের মিলিত সক্রিয়তায়, জাতীয় তথা আন্তর্জাতিকতার আবহে পরিবেশনীতি-কে যে বিচার করা প্রয়োজন, উইলিয়াম সেই পার্থক্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন। ২০১৮ সালে নিজের নোবেল প্রাইজ লেকচারে,উইলিয়াম গ্লোবাল ক্লাইমেট জাস্টিসের যৌক্তিকতাকে স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি :

‘It must be emphasized that global environmental concerns raise completely different governance issues from national environmental concerns. For national public goods, the problems largely involve making the national political institutions responsive to the diffuse national public interest rather than concentrated national private interests — responsive to public health rather than private profits. For global public goods, the problems arise because individual nations enjoy only a small fraction of the benefits of their actions.’[৯]

উইলিয়াম শীতল নিস্পৃহতার আত্মকেন্দ্রিক আদর্শকে তাঁর এই বক্তব্যে চিহ্নায়িত করতে ভুল করেননি। তিনি সরাসরি আঙুল তুলেছেন গণতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী দেশগুলির জাতীয় নীতির প্রতি, যেখানে দেশীয় স্বার্থে ‘গ্লোবাল’ সহযোগিতার একান্ত অভাব পরিলক্ষিত হয় উদাসীনতার প্রেক্ষাপটে। ‘Brutal Climatic Change’-কে যে একমাত্র ‘Cooperative multinational policies’[১০]-এর মাধ্যমেই রোধ করা সম্ভব, এই বাস্তব স্রোতের উদ্ভাসনকে উইলিয়াম প্রত্যক্ষ করেন জিজ্ঞাসু মননে। কিন্তু নেতিবাচকতার আধার যেখানে ক্রিয়াশীল, তথ্য সংগোপনের অসাধু উদ্যোগ স্বাভাবিক চিন্তাশীলতায় গতিময়। পৃথিবীকে রক্ষার যাবতীয় পরিকল্পনা যে তথ্যভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করে আছে, বহু ক্ষেত্রে গরমিলের প্রকট দৃষ্টান্ত সেখানে দুর্লভ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন পোস্টের এক অন্তর্তদন্তে ধরা পড়েছে তথ্যগোপনের রহস্যময় আপ্রাণ প্রচেষ্টা। প্রায় ১৯৬টি দেশের উপস্থাপিত রিপোর্ট পরীক্ষা করে জানা যায় :

‘a giant gap between what nations declare their emissions to be vs. the greenhouse gases they are sending into the atmosphere. The gap ranges from at least 8.5 billion to as high as 13.3 billion tons a year of underreported emissions — big enough to move the needle on how much the Earth will warm.’[১১]

ফলত এই তথ্যভ্রান্তি ব্যাপক পুঁজিবাদী স্বার্থসিদ্ধিপ্রসূত শোষণের চেহারাকে ঘনীভূত করে। স্বাভাবিকভাবেই এমিশনের পরিমাণ গুপ্ত থাকলে, গৃহীত নীতি যথাযথভাবে অনুসৃত হচ্ছে কিনা, এই মৌলিক প্রশ্নটিই সংকটচিহ্নের সামনে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। যার প্রভাব থেকে COP26-এর মতো সম্মেলনকে-ও মুক্ত বলা যায় না। পাশাপাশি এই বিতর্কে জায়গা করে নেয় ফসিল ফুয়েল সংক্রান্ত সীমান্ততত্ত্বের অনিয়ন্ত্রিত প্রকল্প। ওয়াশিংটন পোস্টের দাবি অনুযায়ী :

‘A key area of controversy is that many countries attempt to offset the emissions from burning fossil fuels by claiming that carbon is absorbed by land within their borders. U.N. rules allow countries, such as China, Russia and the United States, each to subtract more than half a billion tons of annual emissions in this manner, and in the future could allow these and other countries to continue to release significant emissions while claiming to be “net zero.” ‘[১২]

তিন

Eco-Nationalism : প্রকৃতিকথার বিশিষ্ট চিত্রকল্প

উত্তরাখণ্ডে তেহরি বাঁধ নির্মাণপ্রকল্পের বিরোধিতায়,পরিবেশের ভারসাম্য বিপর্যস্ত হওয়ার বাস্তবতাকে অবলম্বন করে যে আন্দোলন সংগঠিত হয়; চিন্তাবিদ মুকুল শর্মা তার স্বরূপ নির্ধারণ করতে গিয়ে একদা বলেছিলেন :

‘For the state and the pro-dam people, nation and nation-building has been intimately related to completing the construction of the dam. However, even for the environmentalists and the anti-dam activists, national security, national interest and national unity are no less important. Sunderlal Bahuguna and other prominent anti-dam activists have in their environmental discourse throughout emphasized water and forests as the basis of a safe and secure nation, free from outside threats.’[১৩]

মুকুল শর্মা’র এই বিশ্লেষণের সূত্র ধরে, বুঝতে অসুবিধা হয় না, সামগ্রিক প্রকৃতিভাবনা যেমন একাধারে ‘Ethnic Identity’-র অস্তিত্ব উপলব্ধির সহায় হয়ে ওঠে, তেমন-ই অন্যদিকে ‘Nation Building’ তথা জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণের নানা স্তরায়নের প্রতিবেদন রচনা করে। প্রসঙ্গত, মনে পড়ে যায়, প্যারিস ক্লাইমেট এগ্রিমেন্ট সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর রাজনৈতিক অবস্থান, যা পরিবেশের সুস্থিতিবিরোধী পদক্ষেপের দৃষ্টান্ততালিকায় ‘বিশিষ্ট’ জায়গা করে নেওয়ার অন্যতম দাবিদার হয়ে উঠতে পেরেছিল। বস্তুতপক্ষে ইকোলজি এবং ন্যাশনালিজমের সহমর্মিতা; প্রকৃতি এবং মানবসভ্যতার ‘Inseparability’-র ইতিবৃত্ত রচনা করে, এবং সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ‘জাতীয় ইকোসিস্টেম’-এর উদ্ভাসিত তাৎপর্য। ইকো-ন্যাশনালিজম অভ্যন্তরীণ দেশীয় পরিবেশনীতির মাধ্যমে, যেমন ইকোসিস্টেমের পরিসর রক্ষায় সমর্থ হতে পারে, তেমন-ই পাশাপাশি জাতীয় সম্পদের বণ্টন-পুনর্বণ্টন তথা নিয়ন্ত্রণের প্রায়োগিক দিকটিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মাত্রান্তরে পুনর্পাঠের অবকাশ তৈরি করে। 

পরিবেশ চেতনা, জাতীয় পরিচিতি এবং ন্যায়সম্মত দাবির যুগপৎ সংমিশ্রণ এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস-কে ‘national pride’ হিসেবে বিচারের পক্ষপাতী। ফলত বিচ্ছুরিত এক সমান্তরাল জগৎ আবিষ্কারের এই নিবিড় প্রত্যয় নেশনভাবনার ‘legitimization’-কে প্রশ্নাতুর ভূগোলের অন্তর্ভুক্ত করে পড়তে চায়। ১৯৮০-এর দশকে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে ইকো-ন্যাশনালিজমের প্রথম প্রকাশ, সোশ্যালিজমের প্রগাঢ় অনুভবের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য সংক্রান্ত বিরোধিতার এক তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। লিথুয়ানিয়া বা ইউক্রেন-এর স্বাধীনতার লড়াই-এর সঙ্গে যখন ‘অ্যান্টিনিউক্লিয়ার’ অবস্থানের স্বতন্ত্র দর্পণ যুক্ত হয়, তখন জাতীয় বাচনের সঙ্গে এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুর সম্পর্কগত যৌক্তিকতা অনুধাবন অনিবার্য হয়ে ওঠে। 

ঐক্যপ্রতীতির এই গভীরতা-কে সামাজিক-নির্মিতির বয়ানে পড়তে গিয়ে, অবশ্যই এর রক্ষণশীলতার দিকটিকে ভুলে গেলে চলবে না। ফলত এখানে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে, ‘Ethnic Eco-Nationalism’ তথা ‘Civic Eco-Nationalism’-এর মতো তাত্ত্বিক অভিজ্ঞানের প্রসঙ্গগুলি। স্মরণ করা যেতে পারে, তৎকালীন নাৎসি জার্মানির এনভায়রনমেন্টাল পলিসি-র কথা, যা ইকোলজিক্যাল সুস্থিতি প্রণয়নে সমর্থ হলেও নাৎসি ভাবধারার ‘Racist’ কৌণিকতাকে এড়িয়ে যেতে পারেনি। আর এখানেই ‘Ethnic Eco-Nationalism’-এর দুর্বলতার দিকটি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। কারণ ‘Ethnic Nationalism’ জাতিসত্তার সংগঠনের প্রশ্নে ‘single ethnicity’[১৪]-কে সবিশেষ গুরুত্বে বর্গসচেতন করতে চায়। অপরপক্ষে ‘Civic Eco-Nationalism’-এর পরিধিটি এক্ষেত্রে অনেকখানি উদারনৈতিক এবং যুক্তিগ্রাহ্য। সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার নান্দনিক প্রজ্ঞায়, বিচিত্র জাতিপরিচয়ের সমন্বয়ে নেশন-এর গঠনে বিশ্বাসী ‘Civic Nationalism’-এ পরিবেশ-কেন্দ্রিক ভাবনাবলয়ের বৌদ্ধিক বয়নের অনুষঙ্গ যখন যুক্ত হয়, সার্বিক ‘Climatic’ পাঠের ক্ষেত্রে ব্যক্তি নাগরিক তথা জাতীয় দায়বদ্ধতার পারস্পরিক অন্বয়-কে আমরা স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখতে পাই। অভ্যস্ত বাচনের বিরুদ্ধ নির্মাণ সম্ভাবনা প্রস্তুত হয়। যদিও এই তাত্ত্বিক-পরিসর পরিবেশ রক্ষার ব্যবহারিক প্রয়োগে কতখানি সফল হতে পেরেছে, সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নটিও ক্রমিক বিস্তারে শানিত হয়ে ওঠে। 

প্রকৃত বিচারে, সতর্কবার্তা হয়ে ভেসে আসা পরিবেশের অনুপুঙ্খ অবনতির সত্যতার সঙ্গে নিরন্তর সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠে ন্যাশনালিজমের সঙ্গে ইকো-ন্যাশনালিজমের সূক্ষ্ম পার্থক্যগত বয়ান। ন্যাশনালিজমের কেন্দ্রাভিমুখ যেখানে জাতীয় সীমার দ্বারা পরিবেষ্টিত, ক্লাইমেট চেঞ্জ তথা একে ভিত্তিভূমি-তে রেখে গড়ে ওঠা ইকো-ন্যাশনালিজমের ভাবনা নিশ্চিত অর্থে ‘Global Necessity’-র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলত এক প্রগতিপন্থী সাংস্কৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে; ইকো-ন্যাশনালিজম যেমন একাধারে রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার অন্তঃসারশূন্যতা-কে প্রত্যাখ্যানের স্পর্ধায় নির্দেশিত করতে পারে, অন্যপক্ষে কার্বন ফুটপ্রিন্টের নিয়ন্ত্রণ সহ, জাতীয় স্তরে প্রাকৃতিক সম্পদের নিপুণ ব্যবহারযোগ্যতার সম্ভাব্যতাকে পর্যালোচনা-পর্যবেক্ষণের আওতাধীন করতে সমর্থ হয়। পুঁজিতান্ত্রিক প্রতাপের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত, মানবাধিকারের অবদমনের ইতিহাসের শ্লেষাত্মক বিশ্লেষণ, ‘eco-nationalist’ অ্যাপ্রোচের গ্রন্থনায় তিক্ত বাস্তবতার পাঠ-প্রতিক্রিয়ার সমার্থক হয়ে ওঠার প্রেক্ষিত নির্মিত হয়। 

জাতীয় চেতনায় সার্বভৌমত্বের বোধ বা ভৌগোলিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে বস্তুত ইকোলজিক্যাল সংকটের কোনও প্রত্যক্ষ যোগ নেই। আধুনিক রাষ্ট্রের ডোমেস্টিক পলিসি এবং রাজনৈতিক স্বাধিকারের যে নিজস্ব ব্যাখ্যা; তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তির জটিল বিরোধ অবশ্যম্ভাবী। শক্তিশালী উন্নত দেশগুলির, উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ওপর প্রাধান্যবিস্তারের, অন্তর্নিহিত কূট স্বার্থকে অস্বীকৃতির অবকাশ নেই। ফলে অভ্যন্তরীণ জাতীয় বিধিবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিবিন্যাসের অনুষঙ্গে বৈদেশিক শক্তির দ্বারা সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা; অনেকাংশে ন্যাশনালিজম এবং এনভায়রনমেন্টালিজমের পারস্পরিক বিপ্রতীপ অবস্থানকে ক্রমাগত উৎসাহিত করে চলে। 

এই জাতীয় নীতিগত বৈপরীত্যের পটভূমিতে ‘act globally’ বয়ানের বহুস্বরিকতা বর্তমানে প্রাসঙ্গিক থেকে প্রাসঙ্গিকতর। কারণ কোনও একটি দেশের-ও নীতিবহির্ভূত, ইকোলজিক্যাল ব্যালান্সবিরুদ্ধ কর্মপ্রয়াস (কার্বন এমিশন, গ্রিনহাউস গ্যাস নীতি প্রভৃতি) সামগ্রিক বিশ্বস্বাস্থ্য-কে বিপর্যস্ত করার ক্ষমতাসম্পন্ন। ঠিক একই কারণে আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তিগুলির জাতীয় স্তরে দ্রুত রূপায়ণ সময়ের সর্বাধিক জরুরি দাবিরূপে গৃহীত হওয়া উচিত। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ভুবনায়নের যুগে, এও এক প্রতিস্পর্ধী জাতীয়তাবাদী চেতনার আখ্যান, যদিও এর সঙ্গে বৈদেশিক ‘interference’-এর প্রশ্নটিকে নৈতিক মূল্যায়নের নিরিখে গ্রহণ করা প্রয়োজন। ন্যাশনালিজমের দিগন্তকে এনভায়রনমেন্টাল ক্রাইসিসের অণুবীক্ষণে ক্রমান্বয়ে নিরীক্ষার প্রবণতা; বিশ্বব্যাপী ভবিষ্যৎ ধ্বংসপরিস্থিতির প্রতিরোধে কার্যকরী আয়ুধ হয়ে উঠতে পারে। ইকো-ন্যাশনালিজম সেই প্রতিরোধী মৌল সূত্রের এক বিকল্প দ্যোতনা।

চার

Ecofascism : উগ্রতার নয়া রূপ

২০০৫ সালে পরিবেশবিদ, ঐতিহাসিক মাইকেল ই. জিমারম্যান ইকোফ্যাসিজম-কে সংজ্ঞায়িত করলেন কিছুটা এইভাবে :

‘a totalitarian government that requires individuals to sacrifice their interests to the well-being of the ‘land’, understood as the splendid web of life, or the organic whole of nature, including peoples and their states.’[১৫]

জিমারম্যান-এর মতে, সেই অর্থে ‘ইকোফ্যাসিস্ট’ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব না থাকলেও, জার্মান সোশ্যালিজমের “Blood and soil”[১৬] মতবাদের মধ্যে এই ভাবনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকচিহ্ন খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বস্তুতপক্ষে পরিবেশ সংরক্ষণের নামে এই উগ্র মতবাদ; প্রকৃতির ক্রমিক ধ্বংসের পটভূমি হিসেবে জনবিস্ফোরণ, মাইগ্রেশন-এর মতো কারণগুলিকে দায়ী করতে চায়। পরিবেশচিন্তক নাওমি ক্লেইন ইকোফ্যাসিজম-কে “environmentalism through genocide”[১৭]-এর অভিধায় চিহ্নিত করে, সুস্পষ্টভাবে বলেন, উদ্দেশ্যমূলকতার ভয়াবহতা এক্ষেত্রে অভিনব। তার একাধারে যদি থাকে, সীমান্তে কঠোর নীতি প্রয়োগ করে শরণার্থী প্রতিরোধ; তবে অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষার প্রয়াসকে প্রায় এক ঐশ্বরিক নির্দেশের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে, একে একপ্রকার সুকৌশলী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে, ‘নির্দিষ্ট’ গোষ্ঠীগত গণনিধনের পথ নির্মাণ। 

নিঃসন্দেহে জাতীয় চেতনার প্রকল্পবিশ্বে ইকোফ্যাসিজম এক গুরুতর অশনি সংকেত। ‘Hypernationalism’ এবং ‘Supremacist’ চিন্তাধারার বিপজ্জনক সংমিশ্রণের প্রভাব এই মতাদর্শে প্রবল হয়ে উঠতে দেখা যায়; যার মূলে রয়েছে প্রান্তিকায়িত-কে অধিকতর অবদমনের উচ্চারণ এবং তারই সঙ্গে অতি সূক্ষ্মতায় মিশতে থাকে বর্ণভেদের, জাতিবিদ্বেষের রাজনীতি। ‘Deep Ecology’-কে প্রাধান্য দিতে গিয়ে, মানবসম্পদের নির্বিচার বলিদান-এর পক্ষাবলম্বনে, পেন্টি লিঙ্কোলা-র মতো ইকো-ফ্যাসিস্ট তথা র‍্যাডিক্যাল ইকোলজিস্টরা সভ্যতাকে এক বৃহত্তর সংকটের সামনে এনে দাঁড় করান :

‘When the lifeboat is full, those who hate life, will try to load it with more people and sink the lot. Those who love and respect life will take the ship’s axe and sever the extra hands that cling to the sides.’[১৮]

অতি দক্ষিণপন্থী এহেন নেতিবাচক ভাবনার প্রতাপ মাইগ্রেশন-কে প্রায় একপ্রকার ‘environmental war’ হিসেবে প্রতিপন্ন করে, যার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে ওঠে এল পাসো-র ওয়ালমার্ট স্টোরের বীভৎস হত্যালীলা। ক্লাইমেট চেঞ্জের কারণে ক্রমিক সমস্যাসংকুল হয়ে ওঠা মাইগ্রেশন-এর বহুমাত্রিক জটিলতাকে যখন অত্যন্ত সংবেদনশীল দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু বিপর্যয়ের কালবেলায় ইকো-ফ্যাসিস্ট মুভমেন্ট-এর গতিপ্রকৃতি শরণার্থীদের আশ্রয়দানের নৈতিকতা-কে প্রায় ‘আত্মহত্যাতুল্য’ হিসেবে দেখার পক্ষে বহুলাংশে মতপ্রকাশ করে। যদিও মনে রাখা দরকার, এই আন্দোলনের উদ্ভব আকস্মিক নয়। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের গোড়ায় তার আত্মপ্রকাশ, ১৯৭০-এর পর্বে পরিবেশবাদী আন্দোলনের ভিত্তিভূমিতে তার নিজস্ব অভিমতের প্রতিষ্ঠাকাল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অভিবাসন নীতি তথা এনভায়রনমেন্টাল পলিসি-কে প্রশ্ন করতে গিয়ে; ইকোফ্যাসিজম যে জাতিভিত্তিক, বর্ণভিত্তিক বিরূপতার, বিভাজিত রাজনীতির দ্বৈততা-কে খাড়া করতে চায়, তা অনেকদূর পর্যন্ত জীবনের অধিকারের পরিপন্থী। ‘Human Race’-এর কোন অংশটি সংরক্ষণযোগ্য এবং কোনটিকে ছেঁটে ফেলা প্রয়োজন; ম্যাডিসন গ্রান্ট-এর মতো ইকোফ্যাসিজম-এর প্রবক্তারা একান্ত অমানবিক সেই আধিপত্যবাদের যুক্তিশৃঙ্খলার পিঞ্জর তৈরি করেন, যার মধ্য দিয়ে ‘জেনোফোবিয়া’-র নঞর্থক চেহারাটি অনুভব করা কিছুমাত্র কঠিন নয়। 

বস্তুতপক্ষে এনভায়রনমেন্টাল মুভমেন্ট-এর নিরন্তর সংগ্রামমুখর ভুবনে, ‘White Supremacy’-এর মতো জটিল রাজনৈতিক অভিমুখ একেবারে অভিনব বস্তু না হলেও এর বিপর্যয় ঘটানোর ক্ষমতাটিকে কোনওভাবেই অস্বীকার করা চলে না। পরিবেশ সংরক্ষণ পৃথিবীর আয়ুষ্কাল দীর্ঘায়িত করার জন্য অপরিহার্য, কিন্তু তা যে মানবনিধনের বিনিময়ে নয়; উগ্র জাতীয়তাবাদের অবস্থান, এই আত্মিক চেতনার বিপ্রতীপ প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত। ফলত জলবায়ুর অবনতি রোধের প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নটি, আদতে ‘বিশেষ’ জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবলুপ্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত; এই সাংস্কৃতিক আখ্যান আর এক হেজিমনির তত্ত্ব-কে প্রশ্রয় দেয়, যা যেমন বিপজ্জনক তেমন-ই নারকীয়। কারণ এর ফলশ্রুতিতে প্রান্তিক, অসহায়, শরণাপন্নের ওপর আক্রমণ শানানোর এক সর্বজনীন নিপীড়নের প্রেক্ষিত তৈরি হয়। আমরা বলতে পারি; ধ্বংসাত্মক, বিদ্বেষের বিধিবিন্যস্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ এনভায়রনমেন্টাল ভাবাদর্শের এ এক বিবর্ণ প্রতিচ্ছবি। পক্ষান্তরে, বহুবাচনিক সমাজের আধুনিক পরিসরের অস্বীকৃতিতে আস্থাশীল এই ফ্যাসিবাদে, পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির জন্য, ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ, পপুলেশন প্রভৃতিকে যতখানি অভিযুক্ত করতে দেখা যায়; ততখানি পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায় কিনা; এই কূট প্রশ্নটিও এক্ষেত্রে উঠে আসা বিচিত্র নয়। প্রকৃতপক্ষে এই তন্ত্র যতখানি ব্যক্তিবর্গের প্রতি ‘দ্বেষ-কেন্দ্রিকতায়’ আচ্ছন্ন, ততটা সিস্টেম বা ক্ষতিকর প্রতিষ্ঠানমুখিতার সমালোচনায় নয়। সাংস্কৃতিক সত্তার মন্থনপ্রক্রিয়ায়, উদারনীতির কোনও একটিমাত্র তাত্ত্বিক আদলের বিনির্মাণ যেমন অসম্ভব, তেমন-ই ফ্যাসিস্ট দৃষ্টিকোণে তাকে একমাত্রিকতায় আবদ্ধ করাও কুটিল স্বার্থচিন্তার সমধর্মী। ধনতান্ত্রিক প্রতিবেশে ‘vigilance’ এবং প্রকৃত সমস্যা থেকে ‘নজর ঘুরিয়ে দেওয়া’-র বুদ্ধিদীপ্ত কলাকৌশলময় উপনিবেশ তৈরির প্রচেষ্টাকে আমরা এক্ষেত্রে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারি না। ক্লাইমেট মুভমেন্ট-এর মতো সর্বাগ্রগণ্য একটি আন্দোলনকে যে নব্য-ঔপনিবেশিক, উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদী প্রেক্ষিতের থেকে মুক্ত রাখাও পরিবেশতান্ত্রিক চেতনার পরিধিভুক্ত হওয়া প্রয়োজন, ইকোফ্যাসিজম সেই নিরপেক্ষ বয়ানের সামাজিক ভাষ্য অনুধাবনে প্রাণিত করে। 

পাঁচ

উপসংহার

মানবসভ্যতার উচ্চমন্যতার অহংকার-কে সর্বোচ্চ প্রাধান্যে প্রতিষ্ঠাকামী; ঔদ্ধত্য এবং নিয়ন্ত্রণভাবনার অশুভ আঁতাতের বিরুদ্ধে স্বয়ং প্রকৃতি তার স্বতন্ত্র অস্তিত্বের প্রকাশে বারবার হয়েছে সোচ্চার। ধনতন্ত্রের প্রত্যয়ী আধারে পরিপোষিত, অপরিণামদর্শী সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, উপনিবেশ-উত্তর পুঁজিবাদের লোলুপতা; ‘Climate Crisis’-নামক অনিবার্য ধ্বংসাত্মক পরিণতির অপরিহার্য সোপানমাত্র। জাতীয়তাবাদী চেতনার আপাত-পরিচিত সংজ্ঞায়নের অন্তর্গত জায়মান উন্নাসিকতাকে বস্তুতপক্ষে আজ পরিবেশসচেতনতার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিচার করা প্রয়োজন। জলবায়ুর সুস্থিত ভারসাম্য রক্ষার জন্য, ক্ষুদ্র, তথাকথিত জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে; আন্তর্জাতিক আলাপ-আলোচনার সদর্থক এবং সাধু প্রয়োগ বর্তমান কালপর্বে পরিবেশরক্ষার আশু দাবি হিসেবে গৃহীত হওয়া দরকার। ‘Global Environmental Threat’-এর সঙ্গে ‘National Interest’-এর সংঘর্ষ এক বাস্তব সত্য হলেও, সামগ্রিক বিচারে পৃথিবীকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য করে তোলার জন্য; বিশ্বব্যাপী কঠোর পরিবেশ নীতি, সত্যভাষণের প্রবণতা তৈরি না হলে, মানবসম্পদ-কে রক্ষার আশা বিফলে পর্যবসিত হওয়া, শুধুই সময়ের অপেক্ষা হিসেবে প্রমাণিত হতে বাধ্য। 

ন্যাশনালিজমের তত্ত্ব, এনভায়রনমেন্টালিজমের চিন্তন-বহির্ভূত কিনা, আজ নিশ্চিত ভাবে তা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণপ্রসূত বিবেচনাবোধের বিষয়বস্তু। বস্তুতপক্ষে জাতীয় মননের বিচার-পুনর্বিচার যে সামাজিক ন্যায়ভাবনার ন্যায্যতার প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যেতে পারে না, তার যথাযথ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে, গ্রেটা থুনবার্গ-এর মতো ভবিষ্যৎ ভুবনের উত্তরাধিকারীরা; যখন প্রবল বিক্ষোভে, অনিশ্চিত আগামী-র নিরাপত্তাহীনতাকে তারা নির্মম যুক্তিবোধে প্রতিষ্ঠা করে। ক্লাইমেট সমস্যার ভয়াবহতাকে অনুধাবন না করা, অথবা সুপরিকল্পিত কৌশলে এড়িয়ে যেতে চাওয়া রাষ্ট্রশক্তিকে; উলঙ্গ রাজা-র সেই নির্ভীক বালকের তুল্য প্রতিস্পর্ধিতায় প্রশ্ন করে। শূন্যগর্ভ শব্দের অতলে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্বপ্ন, হঠাৎ অকালে সাবালকত্ব প্রাপ্ত তরুণ মেধা, গর্জে ওঠে অবদমিত প্রকৃতির রুদ্ধ সত্তার সমর্থনে; সভ্যতার চোখে চোখ রেখে বলে ওঠে, “How dare you?”

তথ্যসূত্র

১। Northrop Frye, Anatomy of Criticism : Four Essays, Princeton and Oxford, 

     Princeton University Press, 1957, p.345

২। Alexandra Minna Stern, White nationalists’ extreme solution to the coming environmental  apocalypse, August 22, 2019 https:// theconversation.com/white-nationalists-extreme-solution-to-the-coming-environmental-apocalypse-121532

৩। ঐ;

৪। ঐ; 

৫। Joseph E. Aldy, Alan J. Krupnick, Richard G. Newell, Ian W.H. Parry and William A. Pizer, Designing Climate Mitigation Policy, Journal of Economic Literature 2010, 48 : 4, p.905

৬। Paul G. Harris, World Ethics and Climate Change : From International to Global Justice, Edinburgh, Edinburgh University Press, 2010, p.87

৭। Seth Borenstein, Global warming pollution increases 3 percent, Associated Press, September 2008 https://www.biologicaldiversity.org/news/center/articles/2008/ap-09-25-2008.html

৮। Angel Valencia Saiz, Globalisation, Cosmopolitanism and Ecological Citizenship,  Environmental Politics, Vol.14, No.2, April 2005, p.163-178

৯। William D. Nordhaus, Climate Change : The Ultimate Challenge for Economics,  Nobel Prize Lecture, December, 2018 https://www.nobelprize.org/uploads/2018/10/nordhaus-lecture.pdf

১০। ঐ;

১১। Chris Mooney, Juliet Eilperin, Desmond Butler, John Muyskens,  Anu Narayanswamy and Naema Ahmed, Countries’ Climate Pledges built on flawed data, Post investigation finds, The Washington Post, November, 2021 https://washingtonpost.com/climate-environment/interactive/2021/greenhouse-gas-emissions-pledges-data/

১২। ঐ;

১৩। Gunnel Cederlof and K. Sivaramakrishnan (ed.), Ecological Nationalisms : Nature, Livelihoods, and Identities in South Asia, Ranikhet, Permanent Black, 2006, p.25

১৪। Eco-Nationalism https://en.wikipedia.org/wiki/Eco-nationalism

১৫। Ecofascism https://en.wikipedia.org/wiki/Ecofascism

১৬। ঐ;

১৭। ঐ;

১৮। Luke Darby, What is Eco-Fascism, the Ideology Behind Attacks  in El Paso and Christchurch? August, 2019 https://www.gq.com/story/what-is-eco-fascism

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান