নদী আন্দোলন ও সমসাময়িক রাজনীতি 

তাপস দাস 

গাছ বাঁচাও, জঙ্গল বাঁচাও, পরিবেশ বাঁচাও, বস্তি বাঁচাও, পাহাড় বাঁচাও, আদিবাসী মূল-নিবাসী জন-জাতির সংস্কৃতি-ঐতিহ্য বাঁচানোর লড়াই জোরদার করতে হবে ইত্যাদি বিভিন্ন আন্দোলন সাম্প্রতিক সময়ে নিয়মিত খবরের কাগজে, বাঙালির আড্ডায় উঠে আসছে। কিন্তু এই সবকিছু ছাপিয়ে সম্প্রতি আলোচনায় এসে পড়ছে নদী বাঁচাতে সোচ্চার হওয়ার দাবি। ভারতে পরিবেশ বাঁচানোর লড়াইয়ের ইতিহাসে, রাজস্থানের যোধপুরের রাজার সঙ্গে বিশনই জন-জাতির লড়াই আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থাকলেও চিপকো, তেহেরি বাঁধ বিরোধী বা নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনকেই ভারতের পরিবেশ আন্দোলন ভাবা হয়। যদিও তেমন ভাবে আলোচিত না হলেও, উত্তরে চিপকো আন্দোলনের সমসাময়িক দক্ষিণে কুন্তি নদীর উপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে কে.এস.এস-এর নেতৃত্বে যে আন্দোলন হয়েছিল তাকে বলা যায় আধুনিক কালের পরিবেশ আন্দোলন। ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু এই আন্দোলন “সাইলেন্ট ভ্যালি মুভমেন্ট” নামে পরিচিত। রাষ্ট্র বিরোধী সফল এই আন্দোলন নিয়ে তেমন আলোচনা শোনা যায় না। ভাগীরথী নদীর উপর তেহেরি বাঁধ হোক বা নর্মদা নদীর উপর সরদার সরোবর বাঁধ, নির্মাণ কিন্তু আটকানো যায়নি। নদী বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আধুনিক বিজ্ঞান ও বাঁধ পরবর্তী অভিজ্ঞতা বুঝিয়েছে ভারতীয় নদীর উপর তৈরি বাঁধ জল ও পলির ভারসাম্য বিরোধী ও নদীর জীব-বৈচিত্র্যের বিনাশকারী। কুন্তি/কুথিপূজা নদীর উপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়েছিল জঙ্গল, বন্যপশু ইত্যাদি বাঁচানোর নামে। নদী বাঁচানোর এত ভালো উদাহরণ ভারতে এমনকি সারা দুনিয়ায় খুব কম আছে।তেহেরি বাঁধ বিরোধী বা নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার সমস্যাকে খুব সঠিক ভাবেই মূল স্রোতের রাজনৈতিক আলোচনায় তুলে আনতে পেরেছিল, যা এই দুই আন্দোলনকে ভারতের পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাসে ঋণী করে রাখবে।

তার নিজস্ব ধারাবাহিক ছন্দে মানুষ প্রকৃতির প্রভু হয়ে উঠেছে, একই সঙ্গে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের শোষণের ব্যবস্থা পোক্ত হয়েছে। প্রকৃতির ও শ্রমজীবী মানুষের শোষণের আন্তঃসম্পর্কই এখন পৃথিবীতে সমাজ-রাজনৈতিক আলোচনায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে প্রতিদিন। প্রকৃতি বাঁচানো আর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলন একই। ‘নদী আন্দোলন’ শীর্ষক আলোচ্য লেখাতে এই প্রশ্নগুলি আলোচনার গুরুত্ব কোথায়ে? আমরা সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসের ধারায় জেনেছি নদীর পারে মানুষ বসতি স্থাপন করেছিল, গড়ে তুলেছিল সভ্যতা। নদীর জলে দৈনন্দিন জলের চাহিদা পূরণ, নদী পথে যানবাহন এবং সর্বোপরি নদীর জলে কৃষিকাজ। কিন্তু নদী কি শুধু জল? একটু অন্যভাবে বোঝা যাক। মহাভারতে সভা পর্বে আছে, 

                        “কচ্চিদ্রাষটে তারাগনি                                                                                                                
                         পূর্ণাণি চ বৃহন্তি চ,                                                                                                                    
                         ভাগশো বিনিবিষটানি                                                                                                                       
                         ন কৃষিদেব মাতৃকা।।”

আপনার রাজ্যে স্থানে স্থানে জলপূর্ণ বৃহৎ জলাশয় আছে তো? এবং কৃষিকার্য বৃষ্টির উপর নির্ভর করে না তো? অর্থাৎ, কৃষিকাজের জন্য জলের কথা বলা হচ্ছে, জলাশয়ের কথা বলা হচ্ছে। জলাশয় থেকে তো জল পাওয়া যায়, তবে নদীর এত গুরুত্ব কেন? এই প্রশ্নের উত্তর বুঝিয়ে দিলেন বিহারের বাগমতি নদীর তটবন্ধন বিরোধী আন্দোলনের সাথিরা। তাঁরা জানালেন, “নদীতে প্লাবন আসে, জলমগ্ন হয় জমি-খেত-মাঠ-পথ। তারপর জল চলে যায় খেতে উর্বর পলি রেখে। সেই খেতে গমের বীজ ছড়িয়ে দিলেই আসে জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আর আনন্দ। তাইতো, আমাদের বাড়ির মেয়েরা ‘বাড় মাইয়া’ আমাদের জমিতে না আসলে গান গেয়ে তাকে আহ্বান করে।” অর্থাৎ, ‘নদীর পলি’ হল নদীমাতৃক সভ্যতা গড়ে ওঠার আসল রসদ। এ কথা আমরা সকলেই জানি তবুও সেই কথা আলোচনায় রাখা হয় না। কারণ পলির গুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে হলে আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে বিশ্ব জুড়ে নদী ব্যবহারের ধারণা ও পদ্ধতির। উপনিবেশের যুগে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি ব্যবস্থা থেকেই ভারতে প্রায় সব নদীকে তটবন্ধন দিয়ে সংকীর্ণ করা হয়েছিল। ফলে পলি মিশ্রিত জল তার প্লাবন ভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। নদীর গর্ভ পূর্ণ হয়েছে। ভারত স্বাধীনতা পূর্ব থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৫৫০০ বাঁধ-ব্যারেজ তৈরি করেছে। প্রতিটি বাঁধ-ব্যারেজের ফলে কোটি কোটি টন পলিমাটি জমিয়েছে। যা আসলে ছড়িয়ে পরার কথা ছিল নদীর প্লাবন ভূমি জুড়ে আর সমুদ্র মোহনায়। তার ফলে ভূ-প্রাকৃতিক ক্ষতির পরিমাণ কি কখনো উত্তর ভারতের আখ চাষিরা আন্দাজ করতে চাইবে? কিংবা বাঁধ-ব্যারেজের লাভ পাওয়া তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের সুবিধাভোগী উত্তর ভারতীয়রা?

ভারতের বেশির ভাগ বাঁধ ষাট-সত্তরের দশকে তৈরি। আনুমান করা যায় কত পলি ভারতের নদীতে জমে আছে। গঙ্গা নদীতে পলি জমে থাকার এক ভয়াবহ পরিণতি আমরা ফারাক্কা ব্যারেজের উজান-ভাঁটির দুদিকে দেখতে পাই। তাই, ‘নদী বাঁচাও জীবন বাঁচাও আন্দোলন’-এর পক্ষে ২০১৭ সালের মৌরি গ্রাম কনভেনশনে যে ‘নদী ইস্তেহার’ প্রকাশ করা হয় তাতে ভাঙন কবলিত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য ‘জাতীয় নীতি’ গ্রহণ করার দাবি তোলা হয়েছে। একদিকে জল-পলির সংকট অন্য দিকে বিশ্ব জুড়ে আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় ঝড়ের প্রাদুর্ভাব মানুষকে বাধ্য করছে কৃষিনির্ভর গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ছিন্নভিন্ন করে উদ্বাস্তু হয়ে নগরের বস্তিবাসী হতে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে গঙ্গায় এত পলি আসছে কোথা থেকে? অধুনা উত্তারাখণ্ড নিবাসী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ভরত ঝুনঝুনওয়ালা গাড়োয়াল শ্রীনগরের কাছে তার বাড়িতে বসে কথা প্রসঙ্গে বোঝালেন, নবীন পাললিক শিলায় তৈরি হিমালয় পর্বতশ্রেণিতে ধস তো হবেই। ধস স্বাভাবিক ঘটনা। পাহাড়ের পাথর শত শত বছরের প্রকৃতির শাসনে মাটি কণায় রূপান্তরিত হবে আর নদী পলি আকারে সেই কণাকে বয়ে নিয়ে যাবে। তৈরি হবে সমভূমি। একে কেউ আটকে রাখতে পারবে না। এর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই টিকে থাকতে হবে বাস্তুতন্ত্রকে। মানুষ একে বদলে দিতে চাইলে বাস্তুতন্ত্রের নিয়মে যে বিপদ নেমে আসবে তার বাইরে থাকতে পারবে না মানুষ। অথচ সাড়া হিমালয় জুড়ে চলছে পরিকাঠামো তৈরির নামে যথেচ্ছ বন ধ্বংস, জাতীয় সড়ক তৈরি, হোটেল নির্মাণ, জলবিদ্যুতের নামে বাঁধ, বয়ে চলা জলের নামে টানেল, এমনকি হিমবাহ সংলগ্ন অঞ্চলেও বড়ো বড়ো নির্মাণ। পর্যটনের টাকায় রাজ্যের উন্নয়ন, জলবিদ্যুৎ তৈরিতে উত্তরাখণ্ড উর্জা প্রদেশ (বিদ্যুতে স্বাবলম্বী) হতে গিয়ে সমস্ত বাস্তুতন্ত্রের অপরিবর্তনীয় ক্ষতি করতেও রাজি। হিমালয়ে মানুষ-জীববৈচিত্র্য সমগ্র বাস্তুতন্ত্রকে বাঁচিয়ে বেঁচে থাকার পরিকল্পনা করতে হবে। তাই ‘হিমালয় নীতি’ গ্রহণের দাবি তোলা হয় ‘নদী ইস্তেহার’-এ। সঠিক নীতি গ্রহণ এবং তার যথার্থ রূপায়ণ ছাড়া ১২টি রাজ্য এবং ১টি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বিস্তৃত ভূখণ্ডের বাস্তুতন্ত্রের রক্ষা সম্ভব নয়।

আরও বোঝা দরকার, বলা দরকার, মানুষের মতো এই পৃথিবীতে সমস্ত জীববৈচিত্র্যের বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার আছে। জলজ শৈবাল থেকে নদীর প্রায় সমস্ত প্রাণী, উদ্ভিদের অস্তিত্ব আজ সংকটে। এর প্রধান কারণ নদী দূষণ। ভালো মাছ কোথায়ে হবে — যে কেউ বলবে — ‘ভালো জলে’। ভারতে এমন কোনও নদী নেই যার কোনও না কোনও অংশে দূষণ ‘মাত্রাছাড়া’ হয়নি। ভারতের বিভিন্ন নদী ও উপনদীর জলের ওপর ১১৭টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের করা পরীক্ষায় পাওয়া গেছে ২৫ শতাংশ জলের নমুনায় দুই বা তার বেশি ভারী ধাতুর উপস্থিতি। গঙ্গা নদীর জলের ওপর ৩৩টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের করা ১০টি জলের নমুনায় দূষণ অতিরিক্ত মাত্রায় পাওয়া গিয়েছে। সাতটি আই.আই.টি. সমন্বয়ে গঠিত কমিটির পরামর্শ ছিল ‘জিরো ডিসচার্জ’। অর্থাৎ, গঙ্গা নদীতে কোনও রকম তরল-কঠিন বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। ভারতীয় সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের মূল কর্তব্য (Fundamental Right) ৫১/এ/জি-তে বলা হয়েছে, জঙ্গল, জলাশয়, নদী, বন্যপশুকে রক্ষা করা এবং তাঁদের প্রতি দয়াশীল হতে হবে। অথচ দেশের কল্যাণ কামনায় শপথ নিয়ে, আমলা থেকে রাষ্ট্রনেতারা প্রতিদিন কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, প্রকৃতিকে সংরক্ষণের পরিবর্তে ধ্বংস করতে। আর নিখুঁত করে বললে বলতে হয় দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে গুটিকয়েক বহুজাতিক সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছে প্রতিদিন। ২০২১ সালের একটি রিপোর্ট বলছে ভারতীয় ব্যবসায়ী গৌতম আদানি ও তার পরিবার প্রতিদিন ১০০২ কোটি টাকা আয় করেছেন। এই বছরের অক্সফাম রিপোর্ট বলছে পৃথিবীতে গত দুই বছরে প্রতি ৩০ ঘণ্টায় একজন করে ৭৭০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। প্রায় ওই একই সময় প্রতি ৩৩ ঘণ্টাতে বিশ্ব জুড়ে ১০ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ প্রায় ২৬.৩ কোটি মানুষ দুবেলা অন্ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এই দুই বছরে। পরিবেশ নিয়ে আলোচনায় অর্থনৈতিক বৈষম্যের উল্লেখের প্রয়োজন কেন, প্রশ্ন হতে পারে? কিন্তু আধুনিক সমাজে পরিবেশের ওপর যথেচ্ছাচার ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শোষণ একই মুদ্রার দুই পিঠ। প্রকৃতি নির্ভর সরল গ্রামজীবনে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের সংস্থান ছিল বিশ্ব জুড়ে। উন্নয়নের ষড়যন্ত্রে কংক্রিটে মোড়া শহর জীবন শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকায় শুধু অনিশ্চয়তা নয়, এনেছে অশান্তি। তাই অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণ পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদের সঠিক ভাবে অনুধাবন করার প্রয়োজন। বিশ্বকে কংক্রিটে না মুড়ে সমস্ত গ্রামকে যদি ‘জল স্বাবলম্বী’ করে গড়ে তোলা যেত, তাহলে ভারতের মতো কৃষিপ্রধান দেশের অনেক সমস্যা দূর হত বলে আমাদের বিশ্বাস। প্রায় বারো হাজার বছরের ভারত ভূখণ্ডে মানুষের বাস। বিশ্ব জুড়ে মানুষ এসেছে এই ভূখণ্ডে বসবাস করতে, লুঠ করতে। দেখা গেছে বিশ্বের জল সম্পদের মাত্র ৪% এই দেশে। জনসংখ্যার নিরিখে ১৮%। অর্থাৎ এই দেশে মানুষের বেঁচে থাকার সমস্ত রসদ ছিল এতকাল ধরে। দেশে বৈষম্য যত ত্বরান্বিত হয়েছে প্রকৃতির বিপদও তত বেড়েছে। আজ বিশ্বের জল সংকটের নিরিখে ১২২টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১২০। ২০২২-এ ইয়েল ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালের প্রকাশিত পরিবেশ উদ্যোগ সূচক (এনভায়রনমেন্টাল পারফরমেন্স ইনডেক্স) তালিকায় ১৮০ দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৮০। ২০২২ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১২১ দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৭, তালিকায় পাকিস্তান (৯৯), বাংলাদেশ (৮৪), শ্রীলঙ্কা (৬৪), এমনকি নেপালেরও (৮১) নীচে।

ভারতে জলের ব্যবহারের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গঠিত হয় মিহির শাহ কমিটি। ২০১৬ সালে তার রিপোর্ট আসে। সেই রিপোর্ট বলছে ১৩০০০০ কোটির বেশি টাকা খরচ করে দেশে একেরপর এক বহুমুখী পরিকল্পনা গড়ে তোলা হয়েছে। তাতে কৃষি যোগ্য ১১৩ মিলিয়ন হেক্টর জমি জলসেচের আওতায় এলেও কার্যকর হয়েছে মাত্র ৮৯ মিলিয়ন হেক্টর। অপরদিকে ভারতের ৬৭% চাষযোগ্য জমি এখনও ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরশীল। তবে কী লাভ হল কোটি মানুষকে উচ্ছেদ করে এত টাকা খরচ করে। কবি, কথাসাহিত্যিক, পরিবেশকর্মী জয়া মিত্রের একটি বইয়ের নাম, ‘জলের নাম ভালবাসা’। তিনি বলছেন — নদী-জল ব্যবহারের ধারণা ও পদ্ধতিকে শুধু মাত্র বাস্তুকার- প্রযুক্তিবিদের কিংবা কংক্রিটের ব্যবসায়ীর মুনাফার দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে ভালোবাসার নজর দিয়ে দেখার প্রয়োজন। তবেই সেই প্রকৃতি ধ্বংস বিরোধী, শ্রমজীবী মানুষের শোষণ বিরোধী হবে। নদী-জল ব্যবহারের ধারণা ও পদ্ধতি বদল ছাড়া এই নদীপরিবেশকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সে কথাই বলে চলেছেন জয়া মিত্রের মতো সংবেদনশীল মানুষেরা। সকলের স্মরণে আছে, গঙ্গা বাঁচানোর তীব্র আকুতি নিয়ে প্রখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক জি ডি আগরওয়ালের কথা। পরবর্তী সময় সন্ন্যাস গ্রহণ করে স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দজি নামে পরিচিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে ১১২তম অনশন সত্যাগ্রহ করার অপরাধে হরিদ্বারের কংখলের কাছে মাতৃসদন আশ্রম থেকে ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে এবং পরের দিন পুলিশি হেফাজতে হাসপাতালে মারা যান তিনি। অনশন সত্যাগ্রহ চলার সময় তিনি বারবার বলতেন, ‘গঙ্গা মাইজির জন্য টাকা নয় প্রয়োজন ইচ্ছার’। দেশ জুড়ে ব্যাংক ঋণ নির্ভর উন্নয়ন নামক যে কংক্রিটে বাঁধানোর কাজ চলছে তা কি আদৌ মানুষের জন্য সুস্থ-সুষম ব্যবস্থা হয়ে উঠছে? আই পি সি সি রিপোর্ট বলছে এই ভাবে পরিবেশ ধ্বংস চললে প্রাণী জগতে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি ত্বরান্বিত হবে। মনে রাখা দারকার আগের পাঁচটি গণবিলুপ্তিতে সেই সমস্ত শক্তিশালী প্রাণীই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে যারা সব থেকে বেশি প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করত। এই সময় ৭০০ কোটি মানুষ প্রতি নিয়ত পৃথিবীকে নিংড়ে নিচ্ছে। জীবনচর্চার বদল ব্যতীত এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

প্রখ্যাত চিন্তাবিদ লেখক শুভেন্দু গুপ্ত একটি বই লিখেছেন, ‘পরিবেশ নিয়ে ভাবতে শেখালেন যারা’। সেখানে বিশ্বজুড়ে, ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্য, পুরাণ, ধর্মগুরু, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁরা পরিবেশ নিয়ে ভেবেছেন তাঁদের উল্লেখ করেছেন। প্রাচীন অথর্ববেদের পৃথিবী সুক্তের উল্লেখ করে তিনি দেখিয়েছেন —

                 “যৎ তে ভূমি বিখনামি ক্ষিপ্রং তদপি রহতু।                                                                                         
                  মা তে মর্ম বিমৃগ্ধরি মা তে হৃদয়মপিপম।।”

হে ভূমি, আমি যখনই তোমাকে খনন করে কিছু নিষ্কাশন করি (‘যৎ তে বিখনামি’), আমার কর্তব্য আবার তা পূরণ করে পূর্বের অবস্থায় যতদূর সম্ভব ফিরিয়ে আনা (‘ক্ষিপ্রং তদপি রহতু’)। ভারতীয় প্রাচীন ব্যবস্থা সেই দিক্-নির্দেশ দিয়েছিল যা শিখিয়েছিল পৃথিবীকে ব্যবহার করতে আবার তাঁকে তার অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু আধুনিক বাজার নির্ভর, মুনাফা পরিচালিত ব্যবস্থাই পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ব্যবস্থার থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? প্রকৃতির এবং শ্রমজীবী মানুষের শোষণ থেকে মুক্তির উপায়ে কোন্ পথে আসবে? এতদিন পরিবেশ বিষয়ে যেকোনও কথা কতিপয় শৌখিন পরিবেশবাদী এন জি ও কর্মী বা কিছু পরিবেশবিদ বলে থাকতেন। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে ‘পরিবেশবান্ধব রাজনৈতিক’ কর্মীরা এগিয়ে আসছেন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বোঝাপড়াকে ভিত্তি করে। আমরা জানি সমাজের নানা বঞ্চনা, ক্ষোভ, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে গণআন্দোলনের জন্ম দেয়, আর সেই গণআন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একজন প্রতিবাদী মানুষ রাজনৈতিক কর্মী হয়ে ওঠেন নির্দিষ্ট দল, ইজমের ভিত্তিতে। সেই কর্মী দলের শৃঙ্খলে ধারাবাহিক সমাজকর্মী হয়ে ওঠেন। অনেক সময় সেই কর্মী দল পরিবর্তন করলেও দলীয় শৃঙ্খলার অংশ হয়েই থাকেন। এই সময় দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু কর্মীর দলগত আনুগত্য দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের উপস্থিতি ইস্যু ভিত্তিক, দলগত স্থায়ী রূপ থাকছে না। আসলে যে কথা বলতে চাইছি, পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে দলনির্ভর রাজনীতির চেনা ছকের বাইরে অনেকেই থাকতে চাইছেন এই সময়। ইস্যুভিত্তিক সমর্থন এই সময়ের এক প্রবণতা।কারণ সাধারণ ভাবে রাজনীতিতে দুর্নীতি ও দৃষ্টিকোণের দৈন্য প্রতিদিন এমনভাবে জাঁকিয়ে বসছে, অপরদিকে কর্পোরেট পুঁজির আগ্রাসন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনও এক দলের কোনও এক ইজমের উপর নির্ভর করে এই সমস্যা সমাধানের পথ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব ব্যাপী স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদীরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করছে। এই সময় বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের জীবনচর্চা কোন্ পথে যাওয়া উচিত সেই বিষয়ে বিতর্ক সময়ের দাবি। প্রকৃতির সঙ্গে সহনশীল জীবনযাপনের ইতিহাসের ধারাবাহিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।

সাধারণ মানুষের আনন্দে থাকা সহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রাখতে প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি ভালবাসা নিয়ে, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে এই সময়ে কিছু মানুষ পরিবেশ বাঁচানোর লড়াইতে পথে নেমেছেন। সুস্থ পরিবেশের অধিকার আসলে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম। সুষ্ঠু পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব জীবনশৈলী দিতে পারে সহনশীল স্থায়ী জীবন-জীবিকা। কমাতে পারে জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তির গতি। পরিবেশ রাজনীতির কর্মীরা তাই কোনও দলগত শৃঙ্খলে বাঁধা না-পরে উপস্থিত থাকছেন বিভিন্ন গণআন্দোলনে। কখনও কখনও স্থানীয় ভোট রাজনীতিতেও সক্রিয় থাকছেন।

উত্তরবঙ্গের বন ও বনবাসীরা গ্রাম উজার করে রেল লাইন স্থাপনের বিরোধিতা করছেন। নদীর গর্ভ শূন্য করা বালি পাথর খাদানের মাফিয়াদের চোখে চোখ রাখছেন। ব্যারাকপুরের বাসিন্দা বলছেন আমাজনের জঙ্গল আমার জঙ্গল। দক্ষিণবঙ্গের বাসিন্দা হলেও আত্রেয়ী নদীর উপর বাঁধকে তিনি বলছেন এ আমার বিপদ। তিলাবনি পাহাড় আমার বাস্তুতন্ত্র। দেওচা-পাঁচামির খোলামুখ খনির আদিবাসী সংস্কৃতির ওপর আক্রমণকে তারা মনে করছেন এই আক্রমণ তিলোত্তমা কল্লোনিনী কলকাতা শহরের অস্তিত্বের উপর আক্রমণ। প্রতিদিনের আরও ভালো থাকার ভোগ-লালসা সমুদ্র উপকূলের প্রান্তিক মানুষকে উদ্বাস্তু করবে। কর্পোরেট পুঁজি এবং ব্যাংক-ঋণ-নির্ভর উন্নয়ন আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বন্ধক রাখা। পরিবেশ রাজনৈতিক কর্মীদের দলগত অহংকার না থাকায় এবং মূল স্রোতের রাজনীতিতে তেমন পরিচয়-অস্তিত্ব না চাওয়ায় তারা সহজে সাবলীল ভাবে নতুন পরিবেশ আন্দোলনে যুক্ত হয়ে উঠতে পারেন। তা হবে অসীম ধৈর্য্য নিয়ে শ্রমজীবীর অধিকার আন্দোলনকে পরিবেশ বাঁচানোর আন্দোলনে যুক্ত করা। প্রাচীন সমাজ হাজার হাজার বছর যে বেঁচে থাকার কৌশল রপ্ত করেছিল তাকে বর্তমান সময়ের নিরিখে অনুধাবন করতে হব। নচেৎ অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অবলুপ্তি নিশ্চিত।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান