পরিবেশ, করোনা এবং মার্কস প্রসঙ্গ

বাসব বসাক

মাত্র এই সেদিন, ২০১৯-এর ১ ডিসেম্বর চিনের উহান প্রদেশে জ্বর আর তীব্র শ্বাসকষ্টের লক্ষণ যুক্ত এক রোগীর শরীরে এক সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ভাইরাসের উপস্থিতি নজরে আসে চিকিৎসকদের। সেই নবাগত ভাইরাসটি ক্রমে নোভেল করোনা ভাইরাস বা সার্স কোভ-২ নামে পরিচিতি লাভ করে এবং অত্যন্ত দ্রুততায় মাত্র মাস তিনেকের মধ্যেই আবিশ্ব এক অভূতপূর্ব মহামারির আকার নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। গোটা পৃথিবীতে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল সাড়ে ছেষট্টি লক্ষের মতো, আর মৃতের সংখ্যা প্রায় চার লক্ষ ছুঁই ছুঁই; শুরুর ছয় মাসের মধ্যে (জুন, ২০২০) কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গিয়েছিলেন এক লক্ষাধিক মানুষ। পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিনই লাফিয়ে বাড়ছিল আক্রান্ত ও মৃতের মিছিল। করোনা কবলিত দুনিয়া সত্যিই ‘মহা আশঙ্কা যপিছে মৌন মন্তরে’। অতি ক্ষুদ্র করোনা ভাইরাসের এহেন সংহার মূর্তি ও এমন ব্যাপকতা দেখে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের অবলুপ্তি এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসলীলা জনিত আশঙ্কার পাশাপাশি করোনা মহামারিকে গণ-অবলুপ্তির আশঙ্কা হিসাবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ, এ বিষয়ে বিশেষ সন্দেহ নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এহেন উন্নয়নের মধ্যেও দেশে দেশে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা যে এই মহামারি ও তার পরিপ্রেক্ষিতে ভেঙে পড়া অর্থনীতির অধোগতি রুখতে পুরোদস্তুর ব্যর্থ হয়েছে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

উৎপত্তির উৎস সন্ধানে

বিজ্ঞানীদের ধারনা করোনা ভাইরাসের অন্য কোনও একটি জাত (strain) বাদুড় থেকে প্যাঙ্গোলিন জাতীয় কোনো প্রাণীর দেহ হয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করার পথে বিবর্তিত হয়েই এই নোভেল করোনা ভাইরাসের সৃষ্টি। সন্দেহ নেই এ জন্য মানুষের খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য জীবের আবাসভূমিতে মানব সমাজের আধিপত্য বিস্তারের কারণে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সম্পৃক্ততা বহুগুণ বেড়ে যাওয়াই নব্য ভাইরাসটির সৃষ্টির পটভূমি নির্মান করে থাকবে। কিন্তু করোনা সংক্রমণকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি হিসাবে চিহ্নিত করার সঙ্গে সঙ্গেই, নিজের দেশে করোনার ভয়ানক আক্রমণ রুখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প নিদান দিয়েছিলেন যেহেতু চিনের উহান প্রদেশে এর জন্ম তাই এই ভাইরাস চিনের দূরভিসন্ধিতে অত্যন্ত গোপনে কোনও চিনা পরীক্ষাগারে তৈরি না হয়ে যায় না। তিনি বারবার এই ভাইরাসকে চিনা ভাইরাস বলতে থাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শেষ পর্যন্ত তাদের বিরক্তি গোপন করতে পারেনি। ট্রাম্প সাহেবকে এজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে সতর্কও করা হয়। আমাদের দেশেও চরম দক্ষিণপন্থীরা ট্রাম্পের ভাষ্যের অনুরণন তুলতে শুরু করেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে ১৭ মার্চ তারিখে প্রখ্যাত নেচার মেডিসিন পত্রিকার ২৬ তম সংখ্যায় (২৬; ৪৫০-৪৫২ /২০২০) প্রকাশিত একটি গবেষণা পত্রে ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসন, অ্যান্ড্রু রামবাউড এবং রবার্ট এফ গ্যারি নোভেল করোনা ভাইরাসের জিনোমটির অনুপুঙ্খ পরীক্ষা করে স্পষ্ট ভাষাতে জানিয়ে দেন আর যাই হোক এই নব্য ভাইরাসটি কোনও মতেই কোনও পরীক্ষাগারে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, “Our analyses clearly show that SARS CoV-2 is not a laboratory costract or a purposefully manipulated virus”। বরং একটু তলিয়ে দেখলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যাবতীয় প্রাকৃতিক সম্পদ নিংড়ে মুনাফার পাহাড় গড়তে ব্যস্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গর্ভেই এই ধরনের মারক ভাইরাসের জন্ম।

বিবর্তন জীববিদ্যা বিশারদ রব ওয়ালেশ ২০১৬ সালে ‘Big Farms Make Big Flu : Dispatches on Infectious Diseases, Agribusiness and the Nature’ নামে একটি বই লেখেন, যে বইয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন যে বিশ্বায়িত কৃষিব্যবসা কীভাবে হেপাটাইটিস-ই, নিপা ভাইরাস, কিউ ফিভার, সালমোনেল্লা, ইবোলা ইত্যাদি একাধিক রোগজীবাণুর পরিব্যক্তি বা মিউটেশন ঘটিয়ে নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে থাকে। সেই রব ওয়ালেশ সম্প্রতি করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে চিহ্নিত করেছেন এহেন মহামারির আসল কারণটিকে, “Origin and spread of CoViD-19 can be seen as related to the circuits of capital” — কোভিড-১৯-এর সৃষ্টি ও সংক্রমণের ব্যাপকতা পুঁজির চক্রের সঙ্গে নিবিড় ভাবে সম্পর্কিত। তাঁর বক্তব্যের সারাৎসার হল সার্স কোভ-২ বা নতুন যে কোনও ধরনের মারক ভাইরাসের উৎপত্তির কারণ মুনাফা সর্বস্ব পুঁজিনিবিড় কৃষিব্যবসার সম্প্রসারণ করতে গিয়ে প্রকৃতির রাজ্যে যেভাবে হানাদারি চলেছে তার ফলে সামগ্রিক ভাবে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয় বা চ্যুতি (Ecological rift) ক্রমশ প্রসারিত হতে থাকায় আবিশ্ব মহামারি সৃষ্টি করার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন নতুন রোগজীবাণুর সৃষ্টি হয়ে চলেছে।

কার্ল মার্কসও মানুষ ও প্রকৃতির আন্তঃসম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ভাঙনকেই যাবতীয় প্রাকৃতিক সমস্যার মূল হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। ভূ-তত্ত্ববিদ জুস্টাস ফন লিবিগের গবেষণা মার্কসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাই তিনি মূলত মাটির বিপাকীয় চ্যুতির ওপরেই আলোকপাত করেছিলেন। মার্কসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পুঁজিবাদের উদ্ভবের আগে মানুষ ফসল উৎপাদন করত হয় নিজের ও তার পরিবারের জন্য অথবা বড়োজোর সে যে-সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাস করে, সেই এলাকার ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য। ফলে পুঁজিবাদ পূর্ববর্তী সমাজে মাটি থেকে পুষ্টি উপাদান সমূহ খাদ্যশস্যের মাধ্যমে যেমন মানব শরীরে আত্তীকৃত হওয়ার সুযোগ ছিল, তেমনই মানুষের মল, মূত্র বা মৃতদেহ থেকে সেইসব উপাদান আবার সেই একই এলাকার মাটিতে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও প্রতিবন্ধকতা ছিল না। সেই কারণে জীব-ভূ-রাসায়নিক চক্রে ফাটল ধরার বড়ো একটা সুযোগ ছিল না। তাই মাটির প্রাকৃতিক গুণাবলিও খুব কিছু ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারত না। ফলে সেকালে সামগ্রিকভাবে প্রকৃতিতে একটা ভারসাম্য বজায় ছিল। কিন্তু পুঁজিবাদের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আমদানি ঘটল উৎপাদনের নতুনতর প্রকরণ (means of production), অর্থাৎ যন্ত্র, যে যন্ত্রের অধিকার কখনোই সর্বজনীন নয়, কেবলমাত্র যন্ত্রমালিকের। কিন্তু শুধু যন্ত্র আর কাঁচামাল থাকলেই তো আর উৎপাদন হয় না; সে জন্য চাই যন্ত্র পরিচালনায় দক্ষ উৎপাদনশীল শক্তি (productive force) অর্থাৎ কিনা শ্রমিক, মার্কসের ভাষায় ‘প্রোলেতারিয়েত’। এই শ্রমিক তো আর আকাশ থেকে আসে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকের জোগান আসে গ্রাম থেকে। এইভাবে দলে দলে গ্রামীণ মানুষের শহরমুখী স্রোতের ফলে মাটির সঙ্গে মানুষের যে নিবিড় সম্পর্ক, যে মিথস্ক্রিয়া এতদিন জীব-ভূ-রাসায়নিক চক্রের আবর্তনের মধ্যে দিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ধরে রেখেছিল, সেই চক্রে বড়োসড়ো ফাটল ধরা শুরু হয় পুঁজিবাদের অগ্রগতির সঙ্গে তাল রেখে। অন্যদিকে ভৌগোলিক এলাকা কেন্দ্রিক উৎপাদনের পরিবর্তে আরও বেশি মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে ধাবিত পুঁজিবাদ চায় পুঁজির অবাধ গতি, চায় বিশ্বায়িত বাজার। ফলে অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলতে থাকে প্রকৃতি ও পরিবেশের অবাধ লুণ্ঠন। আর এই দুইয়ের চক্করে ক্রমে বেড়ে চলে প্রকৃতির বিপাকীয় ফাটল, মাটি হারাতে থাকে তার পুষ্টিগুণ। আরও মুনাফার লক্ষ্যে তখন বাড়তে থাকে কৃত্রিম সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ প্রয়োগ, বাড়ে মাটির নীচের জলভান্ডারের নির্মম শোষণ, বাড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির অপরিমিত দহন এবং লাফিয়ে বাড়তে থাকে দূষণের মাত্রা। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষয়। আর সেই ফাঁকেই বাড়তে থাকে আমাদের অসুখ বিসুখও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পূর্ববর্তী নির্দেশক (২০১৭-১৮) মারিয়া নেইরার কথায়, “Human health is strongly linked to the health of the ecosystems which meet many of our most critical needs”। ডারউইন ও হাক্সলের শিষ্য, মার্কসের প্রিয় বন্ধু প্রাণীবিদ রে ল্যাঙ্কেস্টার ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর বই ‘Kingdom of Man’-এর ‘প্রকৃতির বদলা’ (‘Nature’s revenge’) শীর্ষক অধ্যায়ে এক শতাব্দী আগেই স্পষ্ট ভাষায় লিখে গেছেন, “that all modern epidemics could be traced to human modifications of ecological conditions”। মুনাফার লক্ষ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় প্রাণী ও উদ্ভিদ উৎপন্ন করতে গিয়ে লোভাতুর মানুষের দ্বারা কীভাবে বাস্তুতান্ত্রিক অবস্থার এহেন ভয়ানক ক্ষয়িষ্ণু পরিবর্তন ঘটে চলেছে সে ব্যাখ্যাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দিয়ে গেছেন ল্যাঙ্কেস্টার, “In his greedy efforts to produce large quantities of animals and plants…man has accumulated unnatural swarmps of species in field and ranch and unnatural crowds of his own kind in towns and forests”। এও তো মার্কসের সেই বিপাকীয় চ্যুতির (metabolic rift) কথাই। যত না প্রাকৃতিক কারণে, তার থেকে ঢের বেশি এই সর্বগ্রাসী দখলদারিত্বের কারণেই তো নতুন নতুন রোগ বালাই, নতুন ব্যাকটেরিয়া, নতুনতর ভাইরাসের উদ্ভব ঘটে চলেছে। ল্যাঙ্কেস্টারের মতে এই সব কিছুর জন্য দায়ী আসলে পুঁজির বহুজাতিক দালালরা; তাঁর কথায় ‘Cosmopolitan dealer in finance’। সেদিন অবশ্য কেউ তেমন পাত্তা দেননি এসব কথার। এরপরেও মার্কসবাদী চিন্তাবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কীভাবে বাড়িয়ে তুলেছে মহামারির আশঙ্কা সেই বিষয়ে। ২০০০ সালে ‘Is Capitalism a Disease?’ নিবন্ধে রিচার্ড লেভিন রোগ মহামারির ক্রমবর্ধমান ভ্রূকুটি (‘growing threat of disease pandemnic’) অনুধাবন করার ক্ষেত্রে খামতি থেকে গেছে। কারণ আমাদের প্রচলিত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা পৃথিবীর ইতিহাস, অন্যান্য জীবপ্রজাতি, বিবর্তনের ধারা এবং বাস্তুতন্ত্রের দিকে নজর দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে (“conventional public health failed to look at world history, to look at other species, to look at evolution and ecology.”)। ফলে বেড়ে চলেছে রোগ-ভোগ-মহামারি; যার প্রত্যক্ষ অভিঘাতে মারা পড়ছে মানুষ, বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা গরিব মানুষ। এঙ্গেলস তাঁর ১৮৪৫ সালে লেখা Condition of the working class in England-এ ‘Disease and epidemiological conditions’ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে একেই বলেছেন সামাজিক হত্যা (‘social murder’)। এই যে করোনার ধাক্কায় আবিশ্ব এত মানুষের মৃত্যু ঘটল, তার দায় বর্তমান বাজার নির্ভর পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা ও তার নিয়ামকরা কখনোই এড়াতে পারে না। ২০২০ সালের মে মাসে লন্ডনের ফিনান্সিয়াল টাইমস্-এর মতো পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধেও তাই প্রকাশিত হতে দেখা গেছে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে লেখা এমন শানিত লাইন: ‘ভাইরাস নগ্ন করে দিয়েছে প্রচলিত সামাজিক চুক্তির অন্তঃসারশূন্যতা’ (“Virus lays bare the frailty of the social contract”)।

পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন

করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে দেশে দেশে লকডাউন শুরু হওয়ার একেবারে গোড়ার দিকে সুনীল আকাশ, নির্মল প্রকৃতি, প্যারিসের রাজপথে রাজহাঁসের সারি, উটির হাইরোডে বিশ্রামরত হরিণের পাল, ভেনিসের জলে ডলফিনের ডিগবাজি ইত্যাকার ছবি বন্যার স্রোতের মতো আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ, ট্যুইটার, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ভরিয়ে তুলেছিল। আর সেইসব ছবি ও ভিডিয়োগুলোকে, যা কিনা প্রধানত বিভিন্ন সিনেমার ক্লিপিংস বা অন্য কোনও প্রেক্ষিতে অনেক আগে এবং অন্য কোনও জায়গায় তোলা — কোনও রকম বিচার বিশ্লেষণ না করেই আমরাও দিব্যি সত্য বলে মেনে নিয়ে পুলকিত হচ্ছিলাম। কোভিড-১৯ এর প্রেক্ষিতে আবিশ্ব লকডাউনের আবহে দূষণমুক্ত নির্মল পরিবেশের অলীক স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমরা কেউ লক্ষই করিনি যে প্রখ্যাত ন্যাশনাল ওশিয়নিক এ্যান্ড এ্যাটমোস্ফেরিক এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই লকডাউনের মধ্যেও এপ্রিল, ২০২০-তে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব সর্বকালীন রেকর্ড ছাপিয়ে পৌঁছে গেছে ৪১৬.১৭ পার্টস পার মিলিয়নে। সেই সঙ্গে সুচারু কৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল এই বার্তা যে প্ৰকৃতি বুঝি এই মহামারির মধ্যে দিয়ে নিজেই নিজের অসুখ সারাতে আদা নুন খেয়ে নেমে পড়েছে। বলা হচ্ছিল প্রকৃতির এহেন কঠিন অসুখের ভাইরাস আসলে আর কেউ নয়; — অগণন, অসংখ্য মানুষ। প্রকৃতির রোগ সারাতে হলে বলি চাই। কোনও বিশেষ জাতিসত্তার বা কোনও বিশেষ বর্ণের কিংবা কোনও বিশেষ ধর্মের কিছু মানুষের জীবনের বিনিময়েই কেবলমাত্র সেরে উঠতে পারে প্রকৃতি। প্রকৃতির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে এমন দু-এক লাখ কোল্যাটারাল ড্যামেজ মেনে নেওয়াই বুঝি আমাদের কর্তব্য। আর প্রকৃতি নিজেই নিজের চিকিৎসায় নেমে পড়েছে এমন অদ্ভুতুড়ে তত্ত্ব আমাদের মনোজগতেও অল্প অল্প করে রেখাপাত করতে শুরু করেছিল। সোশ্যাল ডারউইনিজমের নামে ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা হাজির করে আমাদের বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা শুরু হয়েছিল প্রকৃতির মারে মরতে হবে তাদেরকেই, যারা অপুষ্টিতে ভুগছে; অপুষ্টির কারণে যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। স্বাভাবিক ভাবেই মরতে হবে গরিব ও নিম্নমধ্যবিত্ত কিছু মানুষকে। আর এই ভাবেই অত্যন্ত ধূর্ততার সঙ্গে এই পৃথিবীর বুকে কিছু ব্যক্তি মানুষের তথাকথিত টিকে থাকার অক্ষমতার ভ্রান্ত ধারণার ওপর সবটুকু দায় চাপিয়ে দিয়ে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল আসল সত্যটি। আর তা হল প্রাকৃতিক সম্পদের দেদার লুটের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এহেন অতিমারির মূল কারণ। এও একধরনের ফ্যাসিবাদ বই কি! একে আমরা বলতে পারি পরিবেশগত ফ্যাসিবাদ (environmental fascism) বা বাস্তুতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ (eco-fascism)। ২০১৯ সালে জর্ডন ডাইয়েট ও ক্যাসিডি ‘Overpopulation Discourse : Patriarchy, Racism and the Spectre of Ecofascism’ নিবন্ধে দেখিয়েছেন ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর জার্মানিতে কীভাবে নানা ধরনের পরিবেশগত সমস্যাকে বিশেষ বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষের বিরুদ্ধে তীব্র জাতিবিদ্বেষ (xenophobia) তৈরি করার মধ্য দিয়ে আসলে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং শেষপর্যন্ত ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। সেই ট্র্যাডিশনই সমানে চলেছে। এই কোভিড-১৯ অতিমারির পটভূমিতে এই ভারতবর্ষেও আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম কীভাবে সংক্রমণের জন্য কেবলমাত্র দিল্লির নিজামুদ্দিনের একটি ধর্মীয় জমায়েতকে দায়ী করে একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে টার্গেট করার ঘৃণ্য ও অন্যায় চেষ্টা চালানো হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে জলবায়ু আন্দোলনের নেতা জ্যেমি মার্গোলিয়া সঠিক ভাবেই বলেছেন, জলবায়ুর আরোগ্যের জন্য দুর্বল মানুষের মৃত্যু কামনা আর যাই হোক জলবায়ুর প্রতি ন্যায় বিচার হতে পারে না কখনোই (“…the weak will die but it’s okay because it helps the climate, is not climate justice.”)।

এঙ্গেলস সেই কবেই লিখেছিলেন, “আমাদের অবস্থান প্রকৃতির সীমারেখার বাইরে নয়; বরং রক্ত-মাংস-মেদ-মজ্জা-মেধা-মনন সহ আমরা প্রকৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, প্রকৃতির মধ্যেই আমাদের অস্তিত্ব”। মানুষের ইতিহাস ও প্রকৃতির ইতিহাস যে অভিন্ন মার্কসও সে কথা বলেছেন বারবার। কিন্তু মুশকিল হল অতিভোগের দর্শন পুঁজিবাদকে এই সরল সত্যটি অস্বীকার করার স্পর্ধা জোগায়। ফলে পুঁজিবাদ প্রকৃতিকে জয় করবার সদম্ভ এক ভ্রান্ত মানসিকতার বশবর্তী হয়ে আরও বেশি মুনাফার লক্ষ্যে প্রাকৃতিক সম্পদের বাধাবদ্ধনহীন লুট অব্যাহত রাখে। তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় চলতে থাকে নির্বিচার অরণ্য হত্যা, অপর্যাপ্ত জীবাশ্ম জ্বালানির দহন অথবা লাগামহীন দূষণ এবং এসবের হাত ধরে বারবার ফিরে আসে করোনার মতো অতিমারি। ফলে পুঁজিবাদ ও পরিবেশের সম্পর্কটা চিরকালই দ্বান্দ্বিক। আর এই দ্বান্দ্বিকতা, সন্দেহ নেই, সব অর্থেই ধ্বংসাত্মক বা ঋণাত্মক দ্বান্দ্বিকতা (negatively dialectic)। প্রখ্যাত পরিবেশ অর্থনীতিবিদ ই পি থমসন একেই ‘সর্বাগ্রাসী বিধ্বংসিতা’ বা ‘এক্সটটর্নিমিজম’ (exterminism) হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।

মনে রাখা দরকার এই গ্রহের বাস্তুতান্ত্রিক সংকট এবং বিশ্বায়িত পুঁজিবাদী অর্থনীতির এহেন দ্বিধাগ্রস্ততা (‘faltering of the global capitalist economy’)— বর্তমান সময়ে পুঁজির গঠনগত সংকটের ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক ভাবে পরস্পর যুক্ত দুটো উপাদান (‘dialectically interconnected elements of the structural crisis of capital that defines our age’)। মার্কসও তার সময়ের বাস্তবতার নিরিখে এই দ্বন্দ্বের কথা বলে গেছেন, “সভ্যতা ও বিশেষ করে শিল্পের বিকাশ সাধারণ নিয়মেই অরণ্য ও প্রকৃতির ধ্বংস সাধনে এতটাই সক্রিয় থেকেছে যে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ ও পুনরুৎপাদনের যে কোনও উদ্যোগই সেই তুলনায় একেবারেই গুরুত্বহীন” (The development of civilization and industry in general has always shown itself so active in destruction of forests that everything that has been done for their conservation and production is completely insignificant in comparison.)।

বিশ্ব বাজারের কানাগলি

প্রাকৃতিক সম্পদ নিংড়ে মুনাফার পাহাড় গড়তে গিয়ে পুঁজিবাদ যতবার জড়িয়ে পড়েছে এমন গভীর সংকটের আবর্তে, ততবারই সে ওই বাজার নির্ভর অর্থনীতির কানাগলিতেই সংকটমুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে ঘনিয়ে তুলেছে গভীরতর সংকট। কোভিড-১৯ এর প্রেক্ষিতে আমরা তা আরও একবার নতুন করে প্রত্যক্ষ করছি। সংকটাকীর্ণ পুঁজিবাদ যে মুক্ত বাজার অর্থনীতির ভুল পথ ধরেই এগোতে চাইবে, আজ থেকে দেড়শো বছর আগেই সে কথা মার্কস তাঁর গভীর প্রজ্ঞায় উপলব্ধি করেছিলেন। আমাদের মনে রাখা দরকার মার্কস যে সময় তাঁর দর্শন নির্মাণ করছেন, সেই সময়কালটা ছিল পুঁজিবাদের উষাকাল। ১৮৩৬ সালে প্রথম ট্রেন চলেছে ইংল্যান্ডের ট্রকটন থেকে ডার্লিংটনের মধ্যে। আর তার মাত্র বারো বছরের মধ্যে মার্কস ও এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইস্তাহার লিখছেন ১৮৪৮ সালে। আজ যে বিশ্বজোড়া লগ্নি পুঁজির দাপট, (যদিও করোনা অতিমারির আঘাতে সেই ‘সর্ব রোগহর’ লগ্নিপুঁজির বেলুনটি বর্তমানে বেমালুম চুপসে গেছে) সেই ফিনান্স ক্যাপিটাল শব্দবন্ধটি মার্কসের পক্ষে সেই সময় দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না। তবু লগ্নিপুঁজিই যে পুঁজিবাদের ভবিতব্য, অনন্যসাধারণ দূরদর্শিতায় সে ইঙ্গিত কিন্তু দিয়ে গেছেন মার্কস ও এঙ্গেলস। পুঁজির চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মার্কস বেছে নিয়েছেন শেক্সপিয়ারের উক্তি, ‘money is an eternal prostitute’। ‘Freedom of trade’, মুক্ত বাণিজ্যের কথাও স্পষ্ট করেই বলে গেছেন তাঁরা, “Under the freedom of trade the whole severity of the laws of political economy will be applied to the working class…by free trade all economical laws, with their most astounding contradictions, will act upon a large scale, upon a greated extent of territory, upon the territory of the whole earth.”। করোনা অতিমারির অভিঘাতে অবরুদ্ধ অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে ঠিক সেই কাজটাই তো করতে চাইছে পুঁজিবাদ। পুঁজিকে অবাধ করতে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা তুলে দেওয়ার পক্ষে সব রকম আয়োজন শুরু হয়ে গেছে দেশে দেশে। এই যে করোনার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থ সাহায্য ঘোষণা করেছিল বিশ্বব্যাংক তার মুখ্য শর্তগুলিই হল — ভর্তুকি তুলে নাও, বাতিল করো লাইসেন্সিং প্রথা, দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে ঘটাও কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস। আর ঠিক এই কারণেই লকডাউন তুলে নেওয়ার জন্য ট্রাম্প এতটা মরিয়া ছিলেন অথবা লকডাউনের মধ্যেই আমাদের দেশের যাবতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ জলের দরে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দিতে এত ব্যস্ত মোদিজি। নিজেদের সর্বোন্নত দেশ হিসাবে দাবি করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রত্যক্ষ করছিল অবিরাম মৃত্যু মিছিল তখন সে দেশের ক্ষুব্ধ নাগরিকদের চাপে কার্যত বাধ্য হয়েই করোনা মোকাবিলায় সরকারের পালনীয় কর্তব্য কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে একটি সমীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল নিমরাজি ট্রাম্প প্রশাসনকে। আশ্চর্যের বিষয় হল সেই সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল উপরাষ্ট্রপতি মাইক পেন্সকে, যিনি কিনা একসময়ে সিগারেট উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলির স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত প্রাণ হয়ে নিদান দিয়েছিলেন, “গণমাধ্যম ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষ থেকে যতই গণ উন্মাদনা সৃষ্টি করার চেষ্টা হোক না কেন, ধূমপান কখনোই মৃত্যুর কারণ নয়” (“despite the hysteria from the political classes and media, smoking does not kill.”); অথবা কর্পোরেট তেল কোম্পানিগুলির পক্ষ নিয়ে বলেছিলেন, “বিশ্ব-উষ্ণায়ন একটি ভ্রান্ত ধারণা ছাড়া কিছুই নয়” (“Global warming is nothing but a myth”)। এইভাবে পুঁজির অবাধ চলাচলের পথ সুগম করতে গিয়েই ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠতে থাকে পুঁজিবাদ বনাম শ্রমিকের দ্বন্দ্ব।

মার্কস তাঁর অর্থনৈতিক তত্ত্বের সাহায্যে পুঁজিবাদের গতিধারাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে শ্রমিকের শ্রম চুরি করেই তৈরি হয় উদ্বৃত্তমূল্য যা থেকে আসে পুঁজিমালিকের বিপুল মুনাফা। ১৮৪৪ সালে প্রকাশিত Wages and Labour-এ তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেণিকে ঠিক কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়ে থাকে, “it regards the proletarians…like a horse, he must receive enough to enable him to work.”। কিন্তু যখন তার আর কিছু দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না তখন পুঁজিবাদ তার দিকে ফিরেও তাকায় না। আমাদের দেশে অপরিকল্পিত লকডাউনের কারণে হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের দুঃসহ যন্ত্রণা আর মৃত্যু মিছিল আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এমনকি কর্পোরেট স্বার্থবাহী সরকার কীভাবে সংসদকে এড়িয়ে শ্রমিকের মজুরি হ্রাস, আন্তর্জাতিক আইনকে লঙ্ঘন করে অন্যায় ভাবে কাজের সময় বৃদ্ধি এবং এমনকি ঘুরপথে ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাইকে বৈধতা দিয়েছিল তাও আমরা দেখেছি। করোনা অতিমারির প্রেক্ষিতে আমারা শুনেছি আমেরিকার টেক্সাসের লেফটেন্যান্ট জেনারেল ড্যান প্যাট্রিক ফক্স নিউজ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কেমন অম্লান বদনে বলে দিয়েছিলেন, কোভিড-১৯ এর ধাক্কায় মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তুলনায় বরং বয়স্কদের মৃত্যুই অধিকতর কাম্য (“Older people would rather die than let CoViD-19 harm US economy.”)। মনে রাখা ভালো, আমেরিকায় করোনার মারে এত মানুষের মৃত্যুর পিছনে লুকিয়ে আছে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিবর্তে কর্পোরেট স্বাস্থ্য বিমা শিল্পের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা। আমাদের দেশকেও সেই পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ক্রমশ।

যারা এতদিন ভ্রূ-কুঁচকে সোচ্চারে বলে গেছেন বিশ্বায়িত অর্থনীতির যুগের আধুনিক শ্রমিক আর মার্কসের সময়ের শ্রমিক কখনোই এক হতে পারে না অথবা যারা ব্যঙ্গের সুরে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন মাসে কয়েক লক্ষ টাকা মাইনে পাওয়া, কোম্পানি ডিরেক্টর বা খোদ মালিকের সঙ্গে পাঁচতারা হোটেলের ডিনার পার্টি কিংবা নাইট ক্লাবে যাওয়া তথাকথিত সাদা কলারওয়ালা চাকুরেদের কি প্রোলেতারিয়েত বলা যায় আদৌ; সেই অতি বোদ্ধারাই, যখন অতিমারির দোহাই দিয়ে এক ধাক্কায় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর কর্মচারীদের মাইনে, অথবা এমনকি দলে দলে ছাঁটাই করে দেওয়া হচ্ছিল তাদের, তখন বড়ো আতান্তরে পড়েছেন সন্দেহ কী! ক্যাপিটালের প্রথম অধ্যায়েই মার্কস কিন্তু ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন শ্রমিক মানেই কেবল হাতুড়ি পেটানো নয়, ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনও বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আর সসেজ কারখানার একজন মজুরের মধ্যে আসলে মূলগত কোনও ফারাক নেই — “A schoolmaster is a productive labourer when in addition to belabouring the heads of the scholars, he works like a horse to enrich the school proprietor. That the later has laid out his capital in a teaching factory, instead of a sausage factory, does not alter the relation.”। আজ অবশ্য এই কথা অনেকেই মর্মে মর্মে অনুভব করছে।

মার্কসের দেখানো পথেই মুক্তির ঠিকানা

১৯৬১ সালে বের্টোল্ট ব্রেশট তাঁর ‘Tales from the Calender’-এ লিখেছিলেন বাড়িতে আগুন লাগলে সে বাড়ি থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসাটাই কাজের কথা। এক সময় যারা সদম্ভে বলতেন পুঁজিবাদের শেষ হওয়া মানে পৃথিবীর অস্তিত্বেরও ইতি (‘End of Capitalism means end of the world’); করোনা অতিমারির অভিঘাতে ত্রাহি রবে তারা পুঁজিবাদের জতুগৃহ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সেসময় ইতালির মতো দেশ মর্টগেজে ছাড় দেওয়ার ঘোষণা করতে কার্যত বাধ্য হয়েছে, ফ্রান্সের সরকার নানা ধরনের বিল ও কর প্রদান আপাতত স্থগিত ঘোষণা করেছে, স্পেন ব্যক্তি মালিকানাধীন কর্পোরেট হাসপাতালগুলোকে রীতিমতো ডিক্রি জারি করে রাষ্ট্রীকরণ করেছিল, এমনকি আমেরিকাও জনগণের চাপে প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও সে দেশের কাজ হারানো মানুষের হাতে টাকা তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। আমাদের দেশেও আওয়াজ উঠেছিল আয়করের আওতায় পড়ে না এমন প্রতিটি কাজ হারানো অসংগঠিত শ্রমিকের হাতে আগামী অন্তত ছয় মাসের জন্য প্রতি মাসে তুলে দিতে হবে কম করে সাড়ে সাত হাজার টাকা।

ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেল্থ-এর অধ্যাপক জাসো শোয়ার্টজ্ সঠিক ভাবেই বলেছেন এই শতাব্দীর গোড়ায় যখন বিশ্বে প্রথমবারের জন্য করোনা ভাইরাস-১ (CoV-1)-এর সংক্রমণ ঘটেছিল (যে ভাইরাস আজকের নোবেল করোনা ভাইরাস বা CoV-1 এর পূর্বসূরি), সেই সময় থেকেই যদি টিকা তৈরির প্রয়াস জারি রাখা যেত তাহলে আজকের নোবেল করোনা (CoV-2) প্রতিরোধী টিকা তৈরি করার কাজটা, সন্দেহ নেই, অনেক সহজ হতে পারত। কিন্তু বাজার নির্ভর অর্থনীতি আপাত চাহিদাহীন পণ্য তৈরি করার ক্ষেত্রে কখনোই বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখায় না। অধ্যাপক শোয়ার্টজের কথায়, “Low term government investments matter, because creating vaccines, antiviral medicines and other vital tools required decades of serious investments even when demand is low. Market based economy often struggle to develop a product for which there is no immediate demand.”। এই মহামারি আসলে আজকের বাজার সর্বস্ব পুঁজিবাদের ঝকমকে রঙদার নির্মোক খসিয়ে ভেতরের অস্থিসার কদর্য চেহারাটা উলঙ্গ করে দিয়েছে। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষ আজ বুঝতে পারছে কেএফসির চিকেনের ঠ্যাং অথবা ডোমিনোজের পিৎজা না চিবিয়েও দিব্যি বেঁচে থাকা যায়। সে বুঝতে পেরছে আলো ধলমল ঝাঁ চকচকে শপিং মলের বৈভব নয়, সংকট মুহূর্তে আমাদের রক্ষা করতে ছিল কেবল পাড়ার মুদি দোকানের পরিচিত দোকানি অথবা শহরতলি থেকে ভ্যান রিক্সায় সবজি বা মাছ বয়ে আনা গ্রাম্য লোকটাই।

স্লোভানিয়ার মার্কসীয় তত্ত্ববিদ স্লাভোই জিজেক ‘Pandemic — CoViD-19, Shakes the World’ শীর্ষক একটি নাতিদীর্ঘ বই লিখেছেন। কোভিডের মারে ভোগবাদ সম্পর্কে মোহভঙ্গের পর লকডাউন পরবর্তী দুনিয়াটা কেমন হতে চলেছে সে সম্পর্কে জিজেক লিখছেন, “… the abandoned streets in a megalopolis — the usually bustling urban centres looking like ghost town; stores with open doors and no customers, just a lone walker or a car here and there provide a glimpse of what a non-consumerist world look like.” জিজেকের ভাষায়, ‘আজ যে সব পদক্ষেপ আমাদের সামনে কমিউনিস্ট সুলভ বলে মনে হচ্ছে তাকে সমগ্র বিশ্বজুড়েই প্রয়োগ করার কথা ভাবতে হবে’ (Measures that appear to most of us today as communist will have to be considered on a global level)। তাঁর মতে, আগামী দিনে আমাদের মুক্তির দিশা খুঁজতে হবে “বাজারের বোঝাপড়ার নিয়ামকগুলির বাইরে বিশ্বজুড়ে গড়ে তোলা উৎপাদন ও বণ্টনের এক সুষম সমন্বয়ের মধ্যেই” (Co-ordination of production and distribution will have to take place outside the co-ordinates of the market.)। সন্দেহ নেই করোনা অতিমারি চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে বাজার নির্ভর পুঁজিবাদী অর্থনীতির অসারত্ব। করোনা প্রমাণ করেছে এই পচাগলা নড়বড়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধ্বংসপ্রাপ্তি মানেই সমস্ত দুনিয়াদারির সমাপ্তি নয়। এই ক্ষয়িষ্ণু ব্যবস্থার কঙ্কালের ওপরেই নির্মিত হবে এক নতুন ব্যবস্থা। বাজার অর্থনীতি আর বিলগ্নিকরণের বিপ্রতীপে কায়েম হবে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। আমাদের বেছে নিতে হবে ধ্বংস অথবা সমাজতন্ত্র। জারি রাখতে হবে সেই লক্ষ্য অর্জনের লড়াই। আর সে জন্য যা দরকার তা হল, সামির আমিন তাঁর ‘The Implosion of Contemporary Capitalism’-এ যেমনটা বলেছেন, “…audacity, more audacity, always audacity”। চাই স্পর্ধা, আরও স্পর্ধা, প্রতি মুহূর্তের স্পর্ধা।

[কৃতজ্ঞতা : নন্দন]

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান