মানুষের মন

গিরীন্দ্রশেখর বসু

অপবিজ্ঞান

এক এক সময়ে এক একটা কথার ভূত আমাদের ঘাড়ে চাপিয়া বসে। কয়েক বৎসর পূর্বে ‘বিজ্ঞান’ কথাটি এইরূপ আমাদের স্কন্ধে অধিষ্ঠান করিয়াছিল। তখন সব বিষয়ে আমরা ‘বিজ্ঞানসম্মত কারণ’, ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণা’ ও ‘বৈজ্ঞানিক যুক্তি’-র আশ্রয় লইতাম। পরে ‘বিদ্যুৎ’ কথাটা ঘাড়ে চাপিল। তখন ‘টিকিতে বিদ্যুৎ’, ‘কোষাকুষিতে বিদ্যুৎ’, ‘তুলসী গাছে বিদ্যুৎ’, ‘জীবনী শক্তির মূলে বিদ্যুৎ’ দেখিতে লাগিলাম। সম্প্রতি ‘মনস্তত্ত্ব’ কথাটা সাধারণের স্কন্ধে ভর করিয়াছে। ‘বৃদ্ধের মনস্তত্ত্ব’, ‘শিশুর মনস্তত্ত্ব’, ‘বোমার মনস্তত্ত্ব’, ‘দুর্বৃত্তের মনস্তত্ত্ব’, psychological moment, slave mentality ইত্যাদি কথা শুনিতে শুনিতে কান পচিয়া গেল। অতি-আধুনিক সাহিত্যে পাঁচ বৎসর বয়স্ক নায়কও এখন মনস্তত্ত্বের দোহাই না দিয়া কথা বলে না।

যখন যে বিজ্ঞানের কথা সাধারণের মধ্যে প্রচলিত হয় তখনই সেই বিজ্ঞানের আশ্রয়ে এক একটি অপবিজ্ঞান গড়িয়া ওঠে। মনোবিদ্যারও এইরূপ অপবিজ্ঞান সৃষ্টি হইয়াছে এবং তাহারই প্রভাবে যেখানে সেখানে মনোবিদ্যার বুক্‌নি শোনা যাইতেছে। ভুল পথেই হোক, আর ঠিক পথেই হোক, মনোবিদ্যা সম্বন্ধে সাধারণের কৌতূহল জাগিয়াছে — সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।

মনোবিদ্যা আধুনিক বিজ্ঞান

মনোবিদ্যা অতি-আধুনিক বিজ্ঞান। বহু পুরাকাল হইতে মনোবিদ্যার চর্চা প্রচলিত থাকিলেও মাত্র কিঞ্চিদধিক পঞ্চাশ বৎসর হইল ইহা বিজ্ঞানের আসন পাইয়াছে। যে মন লইয়া সকলকেই কারবার করিতে হয় তাহারই বিজ্ঞানের উৎপত্তি অন্যান্য বিজ্ঞানের পশ্চাতে হইয়াছে। ভূতবিদ্যা বা physics, কিমিতিবিদ্যা বা Chemistry, জ্যোতিষ ইত্যাদি জড়বিজ্ঞান বহুকাল পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত হ‍ইয়াছে। এখনও অনেক পণ্ডিত মনোবিদ্যাকে বিজ্ঞানের আসন দিতে প্রস্তুত নহেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে মনোবিদ্যার আসন যে সকলের শেষে তাহাতে আশ্চর্য হইবার কিছু নাই। মানুষের অনুসন্ধান-প্রবৃত্তির উপর বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত। একটু বিচার করিয়া দেখিলেই বুঝা যাইবে যে, বহির্বস্তু সম্বন্ধে মানুষ যতটা কৌতূহলী, তাহার নিজের মনে কি হইতেছে সে সম্বন্ধে ততটা নহে। এই কারণেই মানুষ মনোবিদ্যার দিকে বিশেষ আকৃষ্ট হয় নাই। সকল অবস্থায় অন্তর্দর্শনের চেষ্টা ভিন্ন মনোবিজ্ঞানের উন্নতি হইতে পারে না, কিন্তু অতি অল্পলোকেরই অন্তর্দর্শনের ইচ্ছা মনে উঠে। ‘কঠোপনিষদে’ আছে :

                            পরাঞ্চিখানি ব্যতৃশৎ স্বয়ম্ভু                                                                                                                     
                          তস্মাৎ পরাঙ পশ্যতি নাস্বরাবন।                                                                                              
                            কশ্চিস্থীরঃ প্রত্যগায়ানমৈক্ষ                                                                                                                
  দাবৃত্ত চক্ষুর মৃতত্বমিচ্ছন্ ।১।
                            পরমুখী হলদ্বার স্বয়ম্ভু বিধানে                                                                                                               
                           দৃষ্টি পরমুখী নহে অন্তরাত্মা পানে                                                                                                  
                          কদাচিৎ কোনো ধীর অমৃত সন্ধানে                                                                                           
 আবরিয়া চক্ষু দেখে প্রত্যেক আত্মনে।

অতএব মানুষের কি অপরাধ! স্বয়ম্ভু ভগবান সাধারণ মানুষের দৃষ্টি বহির্মুখ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। বাহিরের জড়বস্তু লইয়াই মানুষের তৃপ্তি। কদাচিৎ কোন ধীর ব্যক্তির আত্মদর্শনের ইচ্ছা দেখা দেয়। এইজন্যই মনোবিদের সংখ্যা অন্যান্য বৈজ্ঞানিকের তুলনায় কম এবং মনোবিজ্ঞানেরও উন্নতি অন্যান্য বিজ্ঞানের পরেই হইয়াছে।

মানুষের নিজের মন পর্যবেক্ষণ করিতে স্বভাবগত অনিচ্ছা আছে। আমরা যখন রাগী তখন যাহার উপর রাগ হইয়াছে তাহাকে শাস্তি দিতে মন নিবদ্ধ থাকে। রাগের সময় নিজের মনোভাবের কি পরিবর্তন হইতেছে না-হইতেছে, সে দিকে দৃষ্টি থাকে না। কেহ সে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেও দেখিতে ইচ্ছা হয় না। বাঘ দেখিয়া ভয় পাইলে পলাইতে ব্যস্ত হই। ভয়ে মনের কি পরিবর্তন ঘটিল তাহা দেখিবার অবসর থাকে না। সামান্য সামান্য বিষয়েও দৃষ্টি অন্তর্মুখ না হইয়া বহির্মুখে ধাবিত হয়। মনকে তাহার স্বভাবগত বহির্মুখিতা হইতে প্রতিনিবৃত্ত করিয়া অন্তর্মুখ না করিতে পারিলে মনোবিদ হওয়া যায় না। হিন্দুশাস্ত্রের আদর্শের দিক দিয়া দেখিতে গেলে এই হিসাবে মনোবিজ্ঞানের স্থান সকল বিজ্ঞানের উপরে। আত্মার সাক্ষাৎকারের চেষ্টাই হিন্দুধর্মের চরম উপদেশ। শাস্ত্রকারেরা বলেন, আত্মা অন্নময় ইত্যাদি পঞ্চকোষ দ্বারা আবৃত। মনোময়কোষ ইহাদের অন্যতম। মনোময়কোষের ভিতর দিয়া না যাইলে আত্মদর্শন সম্ভব নহে। মনোবিদ্যা এই মনোময়কোষের স্বরূপ বুঝাইতে চেষ্টা করে, সেজন্য মনোবিদ্যা আত্মদর্শনের সহায়ক। একমাত্র মনোবিদ্যাই বিভিন্ন বিজ্ঞানের মধ্যে সাত্ত্বিক বিদ্যা, অন্যান্য সমস্ত বিজ্ঞান রাজসিক। তাহারা মনকে বহির্মুখ করিয়া কর্মে প্রবৃত্ত করে। মনোবিদ্যা মনকে অন্তর্মুখ করে ও আত্মজ্ঞান লাভে সহায়ক হয়।

বিজ্ঞানের ক্ষেত্র

প্রত্যেক বিজ্ঞানই নিজ নিজ আলোচ্য বিষয় সম্বন্ধে একটা গণ্ডী ঠিক করিয়া লয়। বিজ্ঞানের প্রথম অবস্থায় এই গণ্ডী খুব নির্দিষ্ট না হইলেও বিজ্ঞান যতই উন্নতি লাভ করে গণ্ডী ততই স্পষ্টতর হয়। প্রথম অবস্থায় চিকিৎসা-বিজ্ঞানের সহিত ভূতবিদ্যা, কিমিতিবিদ্যা ইত্যাদি নানা বিজ্ঞান জড়িত ছিল। পুরাকালে কেহ পৃথক কিমিতিবিদ্যার আলোচনা করিতেন না। যিনি চিকিৎসাশাস্ত্র শিক্ষা করিতেন তিনি চিকিৎসাতত্ত্বের অঙ্গরূপে কিমিতি-বিজ্ঞান শিখিতেন। যেদিন হইতে ভূতবিদ্যা ও কিমিতিবিদ্যা চিকিৎসাশাস্ত্র হইতে পৃথক হইল এবং নিজ নিজ গণ্ডী ও আলোচ্য বিষয় স্থির করিয়া লইল, সেইদিন হইতেই এই দুই বিদ্যা দ্রুত উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে লাগিল। এখনও চিকিৎসককে কিমিতিবিদ্যা শিখিতে হয়, কিন্তু এই বিজ্ঞানকে কেহ চিকিৎসা-বিজ্ঞানের অন্তর্গত বলিয়া মনে করেন না। কিমিতি-বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় চিকিৎসা-বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় হইতে পৃথক বলিয়া এখন সকলেই জানিয়াছেন। অবশ্য এই দুই বিজ্ঞানের পরস্পর আদানপ্রদান থাকা কিছু বিচিত্র নহে।

মনোবিজ্ঞানের স্বাতন্ত্র্য

মনোবিদ্যা প্রথমত দর্শনশাস্ত্রের অন্তর্গত বলিয়া বিবেচিত হইত। অল্পদিন হইল মনোবিদ্যা দর্শনশাস্ত্র হইতে পৃথক হইয়া নিজের ক্ষেত্র নির্দেশের চেষ্টা করিতেছে। এখনও অনেক মনীষী মনোবিদ্যাকে স্বাতন্ত্র্য দান করিতে স্বীকৃত নহেন। একদিকে দার্শনিক যেমন মনোবিদ্যার উপর নিজের দখল সাব্যস্ত করিতে ব্যস্ত, অপরদিকে তেমনি শারীরশাস্ত্রবিদ (Physiologist) বলিতেছেন, মনোবিদ্যার উপর অধিকার আমার। শরীরের বিশেষ বিশেষ পরিবর্তনে মনের পরিবর্তন সাধিত হয়। শরীরের পরিবর্তন যখন শারীরব্যিদার আলোচ্য বিষয়, তখন তাহার আনুষঙ্গিক মানসিক পরিবর্তনও শারীরব্যিদার অন্তর্গত হওয়া উচিত। শারীরবিদ্যা ছাড়া মনোবিদ্যার পৃথক অস্তিত্ব থাকিতে পারে না। আরও একদিক হইতে মনোবিদ্যার স্বাতন্ত্র্য সম্বন্ধে আপত্তি উঠিতেছে। কোন কোন প্রাণিবিদ বলিতেছেন, মনোবিদ্যা বিজ্ঞানের আসন পাইতে পারে না। পরের মন আমাদের প্রত্যক্ষের বিষয় নয় এবং সে সম্বন্ধে কিছুই নিশ্চিত জ্ঞান সম্ভবপর নহে। অপরের কথায় বা ব্যবহারে তাহার মনোভাব প্রকাশ পায় বটে, কিন্তু তাহা প্রত্যক্ষের বিষয়ীভূত নয় বলিয়া বৈজ্ঞানিকের পরিত্যাজ্য। ইতরপ্রাণীর মনের যেমন আলোচনা চলে না, তাহার ব্যবহারমাত্র পর্যবেক্ষণ করা যায়, সেইরূপ মানুষেরও মনের আলোচনা না করিয়া কোন অবস্থায় পড়িলে তাহার কিরূপ ব্যবহার হয় তাহাই বৈজ্ঞানিকের আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত। এই হিসাবে মনোবিদ্যার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নাই — তাহা প্রাণিবিদ্যার অন্তর্গত মাত্র।

প্রাণিবিদের আপত্তি

প্রাণিবিদের আপত্তি বিচার করিয়া দেখিলে বুঝা যাইবে যে, মনোবিদ্যার স্বাতন্ত্র্য দানে আপত্তির প্রধান কারণ — মন-পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা। একথা স্বীকার করিতেই হইবে যে, একমাত্র নিজের মন ব্যতীত অপরের মন প্রত্যক্ষের বিষয় হইতে পারে না। মন স্বতঃই চঞ্চল এবং তাহার পর্যবেক্ষণও দুরূহ ব্যাপার সন্দেহ নাই। কিন্তু দুরূহ বলিয়াই তাহা অসম্ভব নহে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মন পর্যবেক্ষণের ফলাফল জানাইতে পারেন এবং এই সমস্ত ‘দত্তি’ (data) লইয়া মনোবিজ্ঞান গড়া সম্ভব। কেবল মাত্র প্রত্যক্ষের উপরেই যে বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হইবে এমন কথা নহে। যুক্তিযুক্ত অনুমান সকল বিজ্ঞানেই স্থান পাইয়া থাকে। অপরকে চিমটি কাটিলে তাহার যে লাগে তাহা অনুমানমাত্র। কারণ বেদনাটা আমরা দেখিতে পাই না — অপরের কথা শুনিয়াই ও তাহার মুখভঙ্গী দেখিয়া বেদনার অস্তিত্ব অনুমান করিতে হয়। কিন্তু এই অনুমানের মূল্য যে প্রত্যক্ষেরই অনুরূপ তাহা বলাই বাহুল্য। অতএব মনোবিদ প্রাণিবিদের আপত্তি গ্রাহ্য করিবে না।

শারীরবিদের আপত্তি

শরীরের পরিবর্তনে মনের পরিবর্তন হয় একথা সত্য বলিয়া পৃথকভাবে মনের পর্যবেক্ষণ করা চলে না তাহা নহে। এমন অনেক অবস্থা আছে, যেখানে শরীরের কোন পরিবর্তন লক্ষিত না হইলেও মনের গুরুতর পরিবর্তন হওয়া সম্ভব। কি অবস্থায় মনের কি পরিবর্তন হয়, মনোবিদ তাহা অবশ্য লক্ষ্য করিবেন, কিন্তু অবস্থাটিকেই বড় মনে করিয়া মন-পর্যবেক্ষণকে নিষ্ফল মনে করা ভুল। রোগে শারীর-ক্রিয়া বিপর্যস্ত হয়, কিন্তু সেজন্য কেহ শারীরশাস্ত্রকে রোগবিজ্ঞান মনে করেন না। অতএব শারীরবিদের কথায় মনোবিদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হইবার কোনই কারণ নাই। অপরপক্ষে শারীরবিদের আপত্তির উত্তরে মনোবিদ বলিতে পারেন, মনে পরিবর্তন হইলে শরীরে পরিবর্তন হয়, অতএব শারীরশাস্ত্র মনোবিদ্যার অন্তর্গত হওয়া উচিত।

দার্শনিকের আপত্তি

দার্শনিকের আপত্তি ভিন্ন প্রকারের। তিনি বলেন, মানসিক ব্যাপার লইয়া আমরা কারবার করি। অতএব মনোরাজ্যে আমাদেরই অধিকার। দার্শনিক চরম তথ্যের বিচার করেন, বৈজ্ঞানিক তাহা করেন না। কি প্রকারে পরমপদ লাভ হয়, মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কি, ইত্যাদি প্রশ্ন দার্শনিক সমাধান করিবার চেষ্টা করেন। মানসিক ব্যাপারে পর্যবেক্ষণ তাঁহার চরম লক্ষ্য নহে। মানসিক প্রবৃত্তি ইত্যাদি বিচার করিয়া, কি করিয়া পরমসত্যে উপনীত হওয়া যায় তাহাই তিনি নির্দেশ করেন। মানসিক ব্যাপার তাঁহার কাছে এই সত্যে পৌঁছিবার কারণমাত্র। পদার্থবিদ্যার তথ্যও তিনি কারণরূপে ব্যবহার করেন। মনের পর্যালোচনাই মনোবিদের চরম লক্ষ্য। দার্শনিক-বিচারে তাঁহার অধিকার নাই। শিল্পী পেন্সিল তুলি ইত্যাদি লইয়া কারবার করেন, কিন্তু পেন্সিল তুলি নির্মাণ ও তাহাদের গুণাগুণ পরীক্ষা তাহার আয়ত্তাধীন নহে। একাজ অন্য লোকের। ডাক্তার ছুরি ব্যবহার করেন, কিন্তু তিনি যে ছুরি-সম্পর্কীয় সমস্ত ব্যাপার জানিবেন তাহা আশা করা ভুল; সেইরূপ দার্শনিকের নিকট মনোবিদ্যার তথ্য প্রত্যাশা করা সমীচীন নহে। কেবলমাত্র মনোবিদই মনোবিদ্যা অনুশীলনের পূর্ণ অধিকারী, অপরে নহে।

মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়

মনোবিদ্যার সহিত অন্যান্য বিজ্ঞানের সম্পর্ক থাকিলেও বিজ্ঞানহিসাবে মনোবিদ্যার আসন যে পৃথক তাহা আর অস্বীকার করা চলে না। মনোবিদ্যার আলোচ্য বিষয়ে বৈশিষ্ট্য আছে এবং তাহারও একটা গণ্ডী আছে। এই গণ্ডী মনোবিদ্যাকে অন্যান্য বিজ্ঞান হইতে পৃথক করিয়া রাখিয়াছে। একটা উদাহরণ লওয়া যাক । ঘণ্টা বাজিতেছে। পদার্থবিদ, শারীরবিদ, প্রাণিবিদ, দার্শনিক, মনোবিদ সকলেই সেই শব্দ শুনিতেছেন। পদার্থবিদের কাছে শব্দটা বায়ুর কম্পনমাত্র। শারীরবিদ বিচার করিতেছেন, সেই শব্দে কর্ণপটহ কিরূপ নড়িতেছে, স্নায়ুমণ্ডলীতে কি প্রকার বিদ্যুৎ-প্রবাহ চলিতেছে, মস্তিষ্কের কোন্ বিশেষ অংশে কি পরিবর্তন ঘটিল, কে শব্দায়মান ঘণ্টার নিকট গেল, কে-ই বা দূরে গেল, ঘণ্টা শুনিয়া কে নৃত্য করিল, কে-ই বা লাঠি বাহির করিল, ইত্যাদি। দার্শনিক ভাবিতেছেন — এই শব্দ মানুষের মনকে কতটা উচ্চস্তরে লইয়া যাইতে পারে, শব্দ শোনার আনন্দে আনন্দময়ের কি সন্ধান পাওয়া যায়, পরমপুরুষের কোন্ সত্তা শব্দে প্রকাশিত হয়, শব্দ সত্য না ঘণ্টা সত্য, না উভয়ই মিথ্যা, মায়ামাত্র ইত্যাদি। মনোবিদ দেখিতেছেন, ঘণ্টার শব্দের স্বরূপ কি, সেই শব্দের অনুভূতির সহিত অন্যান্য শব্দের সাদৃশ্য বা পার্থক্য কোথায় ইত্যাদি। একই ঘটনাকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন প্রকারে দেখিয়া থাকেন। প্রত্যেকেরই ক্ষেত্র পৃথক। প্রত্যেকেই ঘটনার একটা বিশিষ্ট দিক দেখিতেছেন। পদার্থবিদের কাছে শব্দের অনুভূতিটা আবশ্যকীয় বিষয় নহে — তাহা গৌণ ব্যাপারমাত্র। আবার মনোবিদের কাছে শব্দের অনুভূতিটাই মুখ্য বিষয়; ঘণ্টার বা বায়ুর কম্পন গৌণ ঘটনা। পদার্থের কম্পন ভিন্ন সাধারণত শব্দের উৎপত্তি হয় না, অতএব মনোবিদ ও পদার্থবিদের আলোচ্য বিষয় বিভিন্ন হইলেও তাহাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বর্তমান। পদার্থবিদের কাছে শব্দের অনুভূতি শব্দায়মান পদার্থের কম্পনের পরিচায়কমাত্র। এ অনুভূতি না থাকিলেও তাঁহার চলে। পদার্থবিদ বধির হইলেও যন্ত্র সাহায্যে ত্বক কিংবা চক্ষুর দ্বারা কম্পন নির্ণয় করিতে পারেন। কিন্তু বধির মনোবিদ শব্দের অস্তিত্বই জানেন না। শব্দায়মান পদার্থের কম্পন তাঁহার কাছে কম্পনমাত্র, তাহা শব্দ নহে। ‘শব্দ’ কথাটা আমরা দুই বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করি বলিয়াই পদার্থবিদের শব্দ ও মনোবিদের শব্দকে অনেক সময় একই বস্তু মনে করিয়া ভ্রমে পতিত হই। শারীরবিদ বলেন, শব্দায়মান বস্তুর কম্পন কর্ণপটহকে আন্দোলিত করে। এই আন্দোলনে কর্ণের স্নায়ু উত্তেজিত হয়। সেই উত্তেজনা স্নায়ু বাহিয়া মস্তিষ্কে উপনীত হইয়া বিশেষ অংশে আঘাত করে। তাহাতেই শব্দের অনুভূতি হয়। অতএব শব্দের অনুভূতির স্থান মস্তিষ্কে। শব্দায়মান বস্তু না থাকিলেও যদি কর্ণমধ্যস্থ স্নায়ু অন্য উপায়ে উত্তেজিত করা যায় তাহা হইলেও শব্দের অনুভূতি হয়। চক্ষুতে আঘাত করিলে অনেক সময় আলোকের অনুভূতি হয়। বহির্জগতে শব্দ বা আলোক না থাকিলেও শব্দ বা আলোকের অনুভূতি হইতে পারে। স্বপ্নে বিভিন্ন অনুভূতি সুপ্রসিদ্ধ। শারীরবিদ যখন বলেন, অনুভূতি মস্তিষ্কে হয় তখন তাহার অর্থ এই বুঝিতে হইবে যে, মস্তিষ্ক মধ্যেই শব্দ হইতেছে। মনোবিদের কাছে এক হিসাবে মস্তিষ্কের অস্তিত্বই নাই। হাতে স্পর্শানুভূতি হয়, জিহ্বায় রসানুভূতি হয়। সে হিসাবে মস্তিষ্কে কোন অনুভূতিই হয় না। শব-ব্যবচ্ছেদ করিলে মস্তিষ্ক আছে জানিতে পারি, নচেৎ নহে। মাথার মধ্যে দপ্ দপ্ টন্‌ টন্‌, মাথাঘোরা, ভারবোধ ইত্যাদি সংবেদন অনুভূত হইতে পারে মাত্র। মনোবিদ অগত্যা বলিবেন, শব্দবোধ মাথায় হয় না, কানে হয়; স্পর্শবোধও সেইরূপ মস্তিষ্কে না হইয়া ত্বকেই হইয়া থাকে। এইখানে শারীরবিদ্যা ও মনোবিদ্যার পার্থক্য স্পষ্ট। মনোবিদের কাছে মানুষের মাথা চোখ মুখ হাত পা ইত্যাদি বস্তু সত্য, কিন্তু মস্তিষ্ক, যকৃৎ, প্লীহা, ইত্যাদির বিশেষ বিশেষ প্রত্যক্ষ অনুভূতি নাই। আমরা মস্তিষ্কে দয়া, মায়া ইত্যাদি মনোভাব অনুভব করি না। এই সকল মনোভাবের সহিত যে-সকল সংবেদন জড়িত থাকে হৃদয়ের উপরেই তাহাদের স্থান নির্দেশ করিয়া থাকি। এই জন্য, দয়ালুকে ‘সহৃদয়’ ব্যক্তি বলি। হিন্দুশাস্ত্রকারগণও হৃদয়কে রাগদ্বেষ আদির উৎপত্তিস্থান বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। দেখা যাইতেছে, শারীরশাস্ত্রবিদের কাছে যাহা সত্য, মনোবিদের কাছে তাহা সত্য না হইতেও পারে। বিভিন্ন বিজ্ঞানের ক্ষেত্র বিভিন্ন বলিয়া জানিলে এ বিষয়ে ভুল হইবে না। পদার্থ বিজ্ঞানে শৈত্য বা অন্ধকার বলিয়া কোন সত্তা নাই। ইহারা ‘অভাব’ পদার্থ। তাপের ও আলোকের অভাব শৈত্য ও অন্ধকার। মনোবিদের নিকট এই উভয় পদার্থই সৎ পদার্থ। তাপের ও আলোকের যেমন বিশিষ্ট অনুভূতি আছে, শৈত্য ও অন্ধকারেরও সেইরূপ নিজস্ব অনুভূতি আছে। রঙের উজ্জ্বলতাও (brightness) মনোবিদের অনুসন্ধেয় পদার্থ। ইহার আনুষঙ্গিক কোন বস্তু বা ব্যাপার পদার্থবিদ্যায় এখনও ধরা পড়ে নাই।

মানসিক ব্যাপারের বিশিষ্টতা

মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় ও অন্যান্য বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে একটা স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। অধিকাংশ বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুই জড়পদার্থ। পদার্থবিদ বা কিমিতিশাস্ত্রবিদ যে-সকল বস্তু লইয়া গবেষণা করেন, তাহাদের রূপ রস গন্ধ স্পর্শ শব্দ ইত্যাদি জড়গুণ আছে। জড়পদার্থের গুরুত্ব আছে ও তাহা পরিমিত স্থান অধিকার করে। স্থির জড়পদার্থ গতিশীল হইলে অথবা তাহাতে অন্য পরিবর্তন ঘটিলে বিজ্ঞানবিদ পরিবর্তনের কারণ স্বরূপ বিভিন্ন ‘শক্তির’ অস্তিত্ব স্বীকার করেন। এই সকল জড়শক্তির জড়গুণ সুস্পষ্ট না হইলেও তাহাদের বিশেষত্ব এই যে, তাহারা জড়বস্তুর অবস্থা পরিবর্তন ঘটাইতে পারে ও এক জড়শক্তি আর এক জড়শক্তিতে রূপান্তরিত হইতে পারে। বৈদ্যুতিক শক্তি তাপে রূপান্তরিত হইতে পারে। বৈদ্যুতিক শক্তি তাপে রূপান্তরিত হয়, তাপ গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়, চৌম্বকশক্তি হইতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, বিদ্যুৎ হইতে আলোক হয়, ইত্যাদি — মনোবিদের আলোচ্য পদার্থে কোন স্থূল জড়ধর্ম নাই। পদার্থবিদ চিনি সম্বন্ধে আলোচনা করিতে পারেন, কিন্তু চিনির মিষ্টতাগুণের আলোচনা মনোবিদের অধিকারে। পদার্থবিদের চিনির রূপ আছে, স্বাদ আছে, গুরুত্ব আছে; তাহা পরিমিত স্থান অধিকার করে। কিন্তু মনোবিদের চিনির স্বাদ বা মিষ্টতার কোন দর্শনীয় রূপ নাই, কোন গুরুত্ব নাই, তাহা স্থান অধিকার করে না। চিনি এক মণ বা দুই মণ হইতে পারে। তাহা কোন পাত্র আংশিক বা পুরা ভর্তি করিতে পারে, সাদা বা ময়লা হইতে পারে। কিন্তু মিষ্টতার ওজন নাই, এক সের দুই সের মিষ্টতা হয় না, এক বাটি মিষ্টতাও হয় না। অবশ্য মিষ্টতার কম-বেশী হইতে পারে। ক্রোধ একটা মানসিক ব্যাপার এবং তাহা মনোবিদের আলোচ্য বিষয়। ক্রোধের কম-বেশী আছে, কিন্তু ক্রোধের কোন বর্ণ স্বাদ নাই। ক্রোধ স্থান অধিকার করে না, ক্রোধের কোন ওজন নাই। কোন জড়শক্তির প্রভাব ক্রোধের উপর আসিতে পারে না।

জড়শক্তি ও চিৎশক্তি

জড়শক্তি জড়শরীরকে পরিবর্তিত করিতে পারে, কিন্তু কোন মানসিক ব্যাপারে জড়শক্তির প্রভাব নাই। কোন ব্যক্তিকে আঘাত করিলে তাহার যে ক্রোধ হয় তাহা জড়শক্তি হইতে উৎপন্ন, একথা বলা চলে না। জড়শক্তি শরীরে পরিবর্তন ঘটাইয়াছে এবং সেই পরিবর্তনের আনুষঙ্গিক মানসিক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। আনুষঙ্গিক বলিয়াই মানসিক পরিবর্তন যে জড়শক্তির দ্বারা সংঘটিত হইয়াছে, এরূপ স্বীকার করা চলে না। কেন না তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয় যে, জড়শক্তি জড়পদার্থ ব্যতীত অনুরূপ পদার্থেও পরিবর্তন ঘটাইতে পারে। এ সম্বন্ধে পরে আরও বিশদ আলোচনা করা যাইবে।

মানসিক ব্যাপারে সাক্ষাৎভাবে জড়শক্তির প্রভাব না মানিলে এমন একটি শক্তি স্বীকার করিতে হয় যাহার দ্বারা মনের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। মনের অবস্থা প্রতিমুহূর্তেই পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনের কারণস্বরূপ মানসিক শক্তির কল্পনা করা যাইতে পারে। এই মানসিক শক্তি বা চিৎশক্তি কেবল মানসিক ব্যাপারেই কার্যশীল, জড় ব্যাপারে নহে। বহির্জগতে কোন পরিবর্তন ঘটিলে যেমন বলি কোন জড়শক্তির সাহায্যে তাহা ঘটিয়াছে, মনোমধ্যে কোন পরিবর্তন ঘটিলে সেইরূপ বলিব ইহার মূলে চিৎশক্তি রহিয়াছে।

দেহ ও মনের সম্বন্ধ

মনোবিদের আলোচ্য বিষয় কি এবং তাহার গণ্ডী কতটা এতক্ষণে তাহা বোঝা গেল। মানসিক ব্যাপারের আলোচনা করিতে গেলে একটা প্রশ্ন প্রথমেই মনোবিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মনের সহিত শরীরের সম্বন্ধ কি? মনের সহিত শরীরের যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ বর্তমান তাহা প্রত্যক্ষসিদ্ধ। শরীর খারাপ হইলে মন খারাপ হয়, মন খারাপ হইলে শরীর খারাপ হয়। জড়বস্তু বা জড়শক্তির সন্নিকটে আসিলে শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তদনুযায়ী মানসিক বৃত্তির উদ্ভব হয়। কম্পমান বস্তু কেবল যে কর্ণপটহকে আন্দোলিত করে তাহা নহে; ইহার সঙ্গে শব্দানুভূতি হইয়া থাকে। ত্বকে জড়বস্তুর স্পর্শে স্পর্শানুভূতির উদ্ভব হয়। পঞ্চেন্দ্রিয়লব্ধ সমস্ত মানসিক বৃত্তি জড়বস্তুজাত। সুরা জড়পদার্থ, কিন্তু সুরাপানে কেবল যে জড়শরীরেই বিকার ঘটে তাহা নহে, সঙ্গে সঙ্গে মনেরও পরিবর্তন দেখা দেয়। মনের উপর দেহের প্রভাব যে কত, তাহা এই সকল ব্যাপার হইতে সহজে অনুমান করা যাইতে পারে। একথাও বলা চলে যে, দেহে মস্তিষ্ক না থাকলে মনই থাকিত না।

অপরপক্ষে, তাপাদি মানসিক বিকার দ্বারা দেহ খিন্ন হয়, মনের আনন্দে দেহের তৃপ্তি হয়। এই সকল ব্যাপারে দেহের উপর মানসিক শক্তির প্রভাব প্রত্যক্ষ নহে। ইচ্ছা মানসিক বৃত্তি এবং ইচ্ছাতে কোন সাধারণ জড়ধর্ম নাই। তথাপি ইচ্ছামাত্রেই আমরা হস্তপদাদি সঞ্চালন করিতে পারি। এখানে শরীরের উপর মানসিক বৃত্তির প্রভাব প্রত্যক্ষ দেখা যাইতেছে।

দেহমনের ঘাত-প্রতিঘাত

শরীর ও মনের পরস্পর ঘাত-প্রতিঘাত সাধারণের নিকট অতি সহজ ও নিত্য ঘটনা, কিন্তু মনোবিদের নিকট পরম বিস্ময়কর। মাটিতে আপেল পড়ার ভিতর যে কি গুরুতর প্রাকৃতিক রহস্য ছিল, সাধারণে তাহা লক্ষ্য করে নাই। নিউটনের মত মনীষীর চক্ষে প্রথম তাহা ধরা পড়িল। শরীর ও মনের সম্বন্ধের মধ্যে যে রহস্য রহিয়াছে সাধারণে তাহা না দেখিলেও মনোবিদ তাহা লক্ষ্য করিবেন। স্পষ্ট দেখিতেছি, মন শরীরকে চালাইতেছে ও শরীর মনকে প্রভাবান্বিত করিতেছে, কিন্তু কি করিয়া তাহা ঘটিতেছে বুঝা সহজ নহে। মনের উপর শরীরের প্রভাব স্বীকার করিলেই মনকে সাধারণ জড়পদার্থের মধ্যে ফেলিতে হয়, কারণ জড়শক্তি কেবল জড়কেই চালাইতে পারে। মনের কোন জড়গুণ দেখা যায় না। মন ও শরীর একেবারেই পৃথকবর্গের পদার্থ। আবার যদি বলি, শরীরের উপর মনের ক্রিয়া আছে, তাহা হইলে বিপদ। কেননা তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, চিৎশক্তি জড়শক্তির মতই ও তাহা জড়বস্তুকেও চালাইতে সক্ষম। ইচ্ছার মত মানসিক ব্যাপার যদি শরীরকে চালাইতে পারে তবে স্বীকার করিতে হয় যে, ইচ্ছা, তাপ, বৈদ্যুতিক শক্তি ইত্যাদি জড়শক্তির রূপান্তরমাত্র। কিন্তু ইচ্ছা প্রভৃতি মানসিক ব্যাপারকে জড়শক্তির বর্গে ফেলা যায় না। অতএব হয় ইচ্ছাশক্তিকে জড়শক্তি বলিয়া মানিতে হইবে নতুবা স্বীকার করিতে হইবে যে, জড়শক্তি ব্যতীতও শরীরে পরিবর্তন ঘটিতে পারে। এই কথা মানিলে Law of Conservation of Energy মানা চলে না। বিজ্ঞানের এই সূত্র অনুসারে স্বীকার করা হয় যে, এক শক্তি অপর শক্তিতে রূপান্তরিত হইতে পারে — যদি তাহারা একই বর্গের হয়। কিন্তু শক্তি বিনা কোন পরিবর্তন সম্ভব নহে।

মনোদৈহিক সহচারবাদ

উদাহরণের সাহায্যে সমস্যাটা আরও একটু পরিষ্কার করিয়া বলিতেছি। একটা ব্যাণ্ডের দলে নানা প্রকার যন্ত্রবাদক থাকে। তাহারা ব্যাণ্ডমাষ্টার বা নেতার ইঙ্গিতে নিজ নিজ বাদ্যযন্ত্র বাজায়। নেতা হাত নাড়িয়া সঙ্কেত করে এবং সকলে সেই অনুসারে চলে। ধরা যাক, কোন অনভিজ্ঞ দর্শক বাজনা শুনিতেছে এবং সে এমন জায়গায় বসিয়াছে যেখান হইতে ব্যাণ্ডমাষ্টারকে বা বাদকদিগকে দেখা যায় না। বেহালা ও বাশী…এই দুই যন্ত্রের শব্দে শ্রোতার মনোযোগ নিবদ্ধ। এই দুই যন্ত্র একসঙ্গে বাজিতেছে এবং একসঙ্গেই থামিতেছে। বাঁশী যখন দ্রুত বাজে, বেহালার শব্দও তখন দ্রুত হয়। আবার বেহালার সুর সপ্তমে উঠিলে বাঁশীর সুরও সপ্তমে চড়ে। কখনও মনে হয় বেহালা বাঁশীকে চালায়, আবার কখনও মনে হয় বাঁশীর বশে বেহালা চলে। দর্শক দেখিতেছে, এই দুই যন্ত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ বর্তমান। প্রথমদৃষ্টিতে মনে হয়, এই দুই যন্ত্র পরস্পরকে চালাইতে সক্ষম। অনভিজ্ঞ দর্শক বৈজ্ঞানিকের চিন্তাপ্রণালী অবলম্বন করিলে বলিবে বাঁশী বেহালাকে চালাইতেছে, কিংবা বেহালা বাঁশীকে চালাইতেছে এমন কথা বলা চলে না, কি করিয়া এই দুই যন্ত্র একসঙ্গে চলিতেছে বলিতে পারি না, তবে এই দুই যন্ত্র একত্রে সুর মিলাইয়া চলে ইহা সুস্পষ্ট। কৌতূহলী দর্শকের বৈজ্ঞানিক চিন্তা তাহাকে নূতন কোন তথ্য জানাইল না সত্য, কিন্তু কোন ভ্রমেও পড়িতে দিল না। একে অপরকে চালাইতেছে, এই যে স্পষ্ট অনুভূতি তাহা ভুল বলিয়া সে জানিল। ইহাই তাহার লাভ।

এই দর্শক যেভাবে সমস্যার সমাধান করিল, একদল মনোবিদও সেইভাবে দেহ ও মনের সম্বন্ধের মীমাংসা করেন। তাঁহারা বলেন, দেহের উপর মনের প্রভাব বা মনের উপর দেহের প্রভাব আছে মানিব না। তবে আপাতদৃষ্টিতে দেহের পরিবর্তনে যে মনের পরিবর্তন ও মনের পরিবর্তনে দেহের পরিবর্তন সাধিত হইতেছে বলিয়া মনে হয় তাহার কারণ এই যে উদাহরণের বাঁশী ও বেহালার মত দেহ ও মন একই সঙ্গে চলিতেছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই মতকে মনোদৈহিক সহচারবাদ (Psycho-physical parallelism) বলা হয়। সহচারিতা মানিলে কার্যকারণ সম্বন্ধ মানিবার আবশ্যকতা থাকে না, অথচ প্রাত্যহিক ঘটনায় দেহমনের যে সম্বন্ধ দেখা যাইতেছে তাহাও অস্বীকার করিতে হয় না।

সহচারবাদীর সমস্যা

পূর্বের উদাহরণের অনভিজ্ঞ দর্শক যদি বাদ্যকরদিগের নেতাকে দেখিতে পান তবে তিনি বলিবেন, বাঁশী ও বেহালা যে একই সুরে চলিতেছে তাহার কারণ উভয় যন্ত্রই একই ব্যক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হইতেছে। দেহ ও মনের সহচারিতার কারণ অনুমান করিতে পারি যে, উভয়কেই একই শক্তি একই সময়ে চালিত করিতেছে। বাদ্যকরদিগের নেতার ইঙ্গিত বংশীবাদক ও বেহালাবাদক উভয়েই বুঝিতে পারে, অর্থাৎ তাহার সঙ্কেতের মধ্যে বাঁশী ও বেহালা এই দুই বিভিন্ন যন্ত্রকে চালাইবার মতো দুই বিভিন্ন শক্তি আছে স্বীকার করিতে হয়। সেই রূপ একই শক্তি দেহ ও মনকে চালাইতেছে বলিলে তাহার মধ্যে চিৎশক্তি ও জড়শক্তি উভয়ই আছে অনুমান করিতে হয়, নতুবা গোল মেটে না। সেজন্য অধিকাংশ মনোদৈহিক সহচারবাদীরা বলেন যে, যখন আমরা ব্যাণ্ডমাষ্টারকে দেখি নাই তখন মাত্ৰ দেহমনের সহচারিতা মানিয়াই ক্ষান্ত হইব। এই সহচারিতার মূলে কি আছে, তাহা অনুসন্ধান করিবার মত মালমশলা আমাদের নাই এবং সেইরূপ গবেষণার আবশ্যকতা নাই। 

দেহের উপর মনের ক্রিয়া

সহচারবাদের যবনিকা এইখানেই ফেলিয়া দিতে আমার আপত্তি আছে। কেন আছে তাহা বলিতেছি। ইচ্ছা করিলেই হাত তুলিতে পারি এবং ইচ্ছা না করিলে হাত তুলি না। সহচারবাদী বলিবেন, ইচ্ছা করা-না-করার উপর বাস্তবিক হাত তোলা-না-তোলা নির্ভর করে না। আমাদের ইচ্ছা স্বাধীন নহে। ঘড়ির কাঁটা যদি মনে করে বারোটার দাগে গিয়া তবে বাজিব নচেৎ বাজিব না, তাহা হইলে তাহার ইচ্ছার স্বাধীনতার মূল্য যেরূপ, মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার মূল্যও ঠিক সেইরূপ। পূর্ব মানসিক ঘটনা পরম্পরার ফলেই ইচ্ছার উৎপত্তি। এই সকল মানসিক ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক পরিবর্তনও ঘটিতেছে। যখন মনে হাত তুলিবার ইচ্ছা উৎপন্ন হইল সেই সময় শরীরও তাহার জন্য প্রস্তুত হইল। ইহার ফলে মনে হইল আমার ইচ্ছার বশেই হাত উঠিল, সহচারবাদীর শরীরের উপর মনের তথাকথিত প্রভাব বুঝিতে বিশেষ বেগ পাইতে হইল না। মানসিক ব্যাপারের কারণ মনে খুজিতে হইবে এবং শারীরিক ব্যাপারের কারণ শরীরে খুঁজিতে হইবে, ইহাই সহচারবাদীর প্রধান কথা।

মনের উপর দেহের ক্রিয়া

এখন মনের উপর শরীরের ক্রিয়ার ব্যাখ্যা দেখা যাক। শরীরের রোগ হইলে মনের অবসাদ হয়। সহচারবাদী বলিবেন যে, এখানেও কার্যকারণ সম্বন্ধ নাই। শরীরের অবসাদের সঙ্গে সঙ্গে মনের অবসাদ হয় বটে, কিন্তু মনের অবসাদের কারণ মনের মধ্যেই আছে। ইহাও না হয় মানিলাম, কিন্তু মদ খাইলে মনে যে আনন্দ আসে তাহার ব্যাখ্যা কি? মদ তো জড়বস্তু, তাহা কেবল শরীরের উপরই ক্রিয়া করিতে পারে। মনে তাহার প্রভাব কি করিয়া বিস্তৃত হয়? মনের পরিবর্তন চিৎশক্তি ভিন্ন হইতে পারে না। এই চিৎশক্তি কোথা হইলে আসিল? সহচারবাদী এ প্রশ্ন বিচার করেন নাই। তিনি হয়ত বলিবেন, কোন মুহূর্তে কোন্ ব্যক্তি মদ খাইবে, বা কোন সময়ে কে তাহাকে মদ খাওয়াইবে, তাহা পূর্ব হইতেই স্থির আছে এবং যে মদ খাইল তাহার মনও এমনভাবে প্রথম হইতেই সৃষ্ট হইয়াছে যাহাতে ঠিক উপযুক্ত মুহূর্তে তাহার মনে পূর্ব মানসিক ঘটনা পরম্পরার ফলে আনন্দ জাগিয়া উঠে। কঠিন নিয়তি বা ভগবান জন্মের পূর্ব হইতেই মন ও দেহের সহচারিতা বিধান করিয়া রাখিয়াছেন। কোনো মনোবিদ ঠিক এই প্রকার ব্যাখ্যা করিয়াছেন কিনা আমার জানা নাই, তবে মনের উপর দেহের প্রভাব বুঝাইতে হইলে সহচারবাদীর ইহাই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা।

জড়ে চিৎশক্তি

এটা খুবই সত্য কথা যে প্রায় সমস্ত বৈজ্ঞানিকই কার্যকারণ শৃঙ্খলা মানিয়া থাকেন। এই হিসাবে তাঁহারা নিয়তিই মানিতেছেন, কিন্তু আমার মনে হয়, নিয়তি বা ভগবানকে টানিয়া না আনিলেও মনের উপর দেহের প্রভাবের সঙ্গত ব্যাখ্যা করা যাইতে পারে। মদ খাওয়ার উদাহরণেই বা যাই কেন? প্রত্যেক জড়বস্তুই আমাদের মনে কোন-না-কোন পরিবর্তন আনে। রূপ রস গন্ধ স্পর্শ শব্দ বোধ প্রত্যেকটি মানসিক ব্যাপার এবং তাহা জড়বস্তুর দ্বারাই সংঘটিত হয়। মদে যেমন আনন্দ আনে, জড়দ্রব্যে সেইরূপ রূপরসাদি বোধ আনে। অতএব সমস্ত জড়দ্রব্যে এমন গুণ মানিতে হয় যাহাতে মনের পরিবর্তন হওয়া সম্ভব, নচেৎ জড়দ্রব্যে যেমন জড়শক্তি নিহিত আছে সেইরূপ চিৎশক্তিও আছে মানিলে কোন গোল হয় না। আমার মনে হয় ইহাই সর্বাপেক্ষা সঙ্গত ব্যাখ্যা। মদের জড়শক্তি শরীরে বিকার আনে এবং মদেরই চিৎশক্তি মনের বিকার আনে। কম্পমান বস্তুর জড়শক্তি কর্ণপটহ আন্দোলিত করে এবং তাহারই চিৎশক্তি শব্দবোধ জন্মায়। ব্যাপারটা দাঁড়াইল এই, যে কোন জড়বস্তুই নিছক জড় নহে। প্রত্যেক জড়ের মধ্যেই নিহিত চৈতন্যশক্তি আছে এবং তাহারই প্রভাবে জড়বস্তু চৈতন্যে প্রতিভাত হয়।

জড়ে চৈতন্যশক্তি আছে বলিলাম তাহা অনুমানমাত্র। অনুমান হইলেও ইহা ন্যায়সঙ্গত অনুমান। বৈজ্ঞানিককে এইরূপ অনুমান বা থিওরী বা ঊহ্যের আশ্রয় সর্বদাই লইতে হয়। যে থিওরী বা উহা মানিলে প্রত্যক্ষ সকল ঘটনার সহজ ও সঙ্গত ব্যাখ্যা হয় তাহা গ্রাহ্য। কোন কোন জড়বাদী বৈজ্ঞানিক হয়ত বলিবে জড়ে চিৎশক্তির অবস্থান অসম্ভব। চিৎশক্তি প্রাণী ভিন্ন অপর কোন আশ্রয়ে থাকিতে পারে না। জড়ে চৈতন্যশক্তির আরোপ কষ্টকল্পনা। তাহা দার্শনিকের একপ্রকার রহস্যবাদ (mysticism) মাত্র। উত্তরে বলা যাইতে পারে, পদার্থবিদ বলেন যে, আমরা ঈশ্বর-সমুদ্রে ডুবিয়া আছি এবং ঈশ্বরের মধ্য দিয়াই গতায়াত করি অথচ এই ঈশ্বর ইস্পাত অপেক্ষা চল্লিশ গুণ ঘন, তখন তাঁহার কল্পনা অধিকতর অবিশ্বাস্য বলিয়াই মনে হয়। পক্ষান্তরে ভাবিয়া দেখিলে বুঝা যাইবে, জড়ে চিৎশক্তি থাকা এমন কিছু অসম্ভব বিষয় নহে, বরং না থাকাই বিচিত্র। প্রাণীদেহ জড় হইলেও তাহাতে চিৎশক্তি আছে। প্রাণ থাকিলে চিৎশক্তির কল্পনায় কোন আঘাত নাই। জড়ে যদি প্রাণের গুণ থাকা সম্ভব হয় তবে চিৎশক্তি থাকাও সম্ভব। জড়বস্তু আহার্যরূপে প্রাণিশরীরে প্রবেশ করিয়া প্রাণের সংস্পর্শে আসিলে প্রাণবান জীবকোষে পরিণত হয়, তাহা না হইলে প্রাণিশরীরের বৃদ্ধি হইত না। প্রাণের গুণ জড়ে অব্যক্তভাবে না থাকিলে তাহা জীবিত বস্তুতে পরিণত হইত না। জগদীশচন্দ্ৰ জড়ে প্রাণের অনুরূপ ক্রিয়ার অস্তিত্ব প্রমাণিত করিয়াছেন। জড়ে অব্যক্ত প্রাণশক্তির সহিত চৈতন্যশক্তি থাকা সম্ভব। এ কল্পনা কষ্টকল্পনা বা দার্শনিক রহস্যবাদ নহে। ইহা বিজ্ঞানসম্মত ঊহ্য বা থিওরী।

ঘটনার ধারাবাহিকতা ও অনিবার্যতা

সমস্ত জড়জগৎ অচ্ছেদ্য কার্যকারণ শৃঙ্খলে আবদ্ধ। যাহা কিছু ঘটিয়াছে সমস্তই তৎপূর্ব ঘটনাবলীর অবশ্যম্ভাবী ফল। জড়জগতে কোন ঘটনার স্বাধীনতা নাই। যাহা আপাতদৃষ্টিতে বিনা কারণসম্ভূত মনে হইতেছে, অনুসন্ধান করিলে তাহারও কারণ আবিষ্কার করা যাইতে পারে। ঘটনার মধ্যে অনিবার্যতা আছে বলিয়াই বৈজ্ঞানিক অনেক সময় কোন্ ঘটনা কখন ও কিরূপে ঘটিবে পূর্ব হইতে বলিতে পারেন। জ্যোতিষী গণনার দ্বারা কবে সূর্যগ্রহণাদি হইবে পূর্বেই জানিতে পারেন। যে-বিজ্ঞান যত অগ্রসর হইয়াছে সেই বিজ্ঞানে ভবিষ্যৎ ঘটনার নির্দেশ তত অধিক সম্ভবপর। কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে বলিয়া পরপর ঘটনার পরিণতিতেই কার্যরূপ ঘটনা উৎপন্ন হইতেছে এবং তাহাই আবার পরবর্তী ঘটনার কারণ হইতেছে। একটা অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র পূর্বাপর ঘটনাগুলিকে সংযুক্ত করিয়া রাখিয়াছে। পূর্ববর্তী ঘটনার সহিত সম্বন্ধ না রাখিয়া কোন পরবর্তী ব্যাপার ঘটিতে পারে না। বৈজ্ঞানিক কোন ভুঁইফোড় বা খামখেয়ালী ঘটনার অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। আকাশে হঠাৎ ধূমকেতু দেখা দিল। সাধারণে ইহাকে আকস্মিক ঘটনা বলিবেন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক জানেন, দৃষ্টিপথের অতীত থাকিলেও পূর্ব হইতেই ধূমকেতুর অস্তিত্ব ছিল। ধূমকেতু নির্দিষ্ট পথ ধরিয়া নির্দিষ্ট গতিতে আসিয়া নির্দিষ্ট সময়ে উদিত হইয়াছে মাত্র। এই ব্যাপারে আকস্মিকতা কিছুই নাই।

ঘটনার অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিকতা ও অনিবার্যতা স্বীকার না করিলে কোন বিজ্ঞানই সম্ভবপর হয় না। মনোবিজ্ঞান সম্বন্ধেও এই কথা সত্য। যদি বলি মানসিক ঘটনাগুলি যদৃচ্ছা মনে উঠে, পূর্বাপর মনের অবস্থার সহিত তাহার সম্বন্ধ নাই, তবে মনোবিজ্ঞান বলিয়া কিছুই থাকিতে পারে না। অনেক বিদ্বান ব্যক্তি মনোরাজ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ মানেন না। তাঁহারা মনে করেন, মনোরাজ্য স্বাধীন রাজ্য। কার্যকারণস্বরূপ দাসত্ব শৃঙ্খল সেখানে কাহাকেও পীড়া দেয় না। দুঃখের সহিত বলিতে হইতেছে, এরূপ চিন্তার মূল্য নাই। এক শ্রেণীর ব্যক্তি জড়জগতেও কার্যকারণ সম্বন্ধ মানেন না। তাহারা বলেন, ফল গাছ হইতে নিজের স্বভাবে মাটিতে পড়ে, তাহার আবার কারণ কি? বৈজ্ঞানিক ভাবিতেই পারেন না যে, কোন ঘটনা আকস্মিক হইতে পারে, তা জড়-জগতেই কি আর মনোজগতেই কি।

সংজ্ঞান ও নির্জ্ঞান মন

মনোদৈহিক সহচারবাদ ও মানসিক ঘটনার অনিবার্যতা এবং কার্যকারণ সম্বন্ধ জানিলে ব্যাপার কি দাঁড়ায় দেখা যাক। সুষুপ্তির সময়ে আমাদের মনে কোন চিন্তা থাকে না। ক্লোরোফরমে অজ্ঞান ব্যক্তিরও মনের চিন্তাশূন্য অবস্থা অনুমান করা যায়। এই প্রকার অজ্ঞান অবস্থায় মনের কোন বৃত্তি আছে বলিয়াই মনে হয় না, ধারাবাহিক মানসিক ব্যাপারের একটা ছেদ বা অবকাশ ঘটিয়াছে অনুমান হয়। আশ্চর্যের বিষয়, সুষুপ্তি হইতে উঠিলে বা চেতনা ফিরিয়া আসিলে পূর্বের সমস্ত ঘটনাই স্মৃতিপথে আসে। অতএব চেতনার অভাবও পূর্বাপর মানসিক ঘটনার যোগসূত্রে ছিন্ন হয় নাই বুঝিতে হইবে। যাহা ছেদ বা অবকাশ বলিয়া মনে হইতেছিল তাহা সমস্ত মনের নহে, মনের মাত্র এক অংশের বা চেতনার ছেদ। সহচারবাদীর মতে, এই যোগসূত্র দৈহিক হইতে পারে না; তাহা মনেতেই অবস্থিত, অতএব চেতনার অভাবে মনের অস্তিত্ব লুপ্ত হয় নাই। মনের এক নির্জ্ঞান অবস্থা আছে। যে-মানসিক ব্যাপার স্মৃতি হইতে লুপ্ত হয় বা জ্ঞানগোচরে থাকে না তাহা এই নির্জ্ঞান মনে আশ্রয় পায়, এবং সেখান হইতে পুনরায় স্মৃতিপথে আসিতে পারে। বুঝাইবার সুবিধার জন্য আপাতত মনের এই দুই জ্ঞানকে সংজ্ঞান ও নির্জ্ঞান বলিব। যে-সকল মানসিক ঘটনা আমাদের চেতনার বা জ্ঞানগোচরে ঘটিতেছে তাহা সংজ্ঞানে অবস্থিত বলিব। আর যাহা চেতনার বহির্ভূত যাহার অস্তিত্ব আমরা জানি না অথচ যাহা মনে আছে বলিয়া অনুমান করা যায়, যেমন সুষুপ্তির পূর্বাপর ঘটনার যোগসূত্র, তাহা নির্জ্ঞানে অবস্থিত বলিব। মনকে নদীর স্রোতের সহিত তুলনা করিলে বলা যাইতে পারে নৌকা, তরঙ্গ ইত্যাদি দৃষ্টিগোচর পদার্থ যেমন জলের উপরেই দেখা যাইতেছে, সেইরূপ আমাদের চেতনার অন্তর্গত মানসিক ব্যাপারসমূহ উপরের মনেই ঘটিতেছে। মৎস্য প্রভৃতি জলজন্তু যেমন আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে জলের নীচে থাকে, সেইরূপ আমাদের মনের নীচের তলেও নানা মানসিক বৃত্তি আশ্রয় লাভ করে। অবশ্য বাস্তবিক পক্ষে মনের উপর-নীচ বলিয়া কিছু নাই, কারণ মন সাধারণ জড়বস্তু নহে এবং তাহার কোন আকার নাই এবং মন কোন স্থানও অধিকার করে না। কেবল বর্ণনার সুবিধার জন্যই উপরের মন, নীচের মন বলা যাইতে পারে।

নির্জ্ঞান মানিতে আপত্তি

সাধারণের ধারণা, উপরের মন বা সংজ্ঞানই বুঝি সমস্ত মন। মনে যাহা কিছু ঘটে সমস্তই বুঝি আমরা জানিতে পারি। হঠাৎ কোন বিষয় স্মৃতিপথে আসিলে পূর্ব ঘটনার সহিত তাহার কি যোগ আছে, সাধারণে তাহা লইয়া মাথা ঘামান না। কাজেই একটা নির্জ্ঞান মন আছে, এ কথা জানিবার তাঁহাদের দরকার নাই। দেহবাদী বৈজ্ঞানিকও বলিবেন, যে-সকল ব্যাপারের আমাদের প্রত্যক্ষ মানসিক অনুভূতি আছে তাহা লইয়াই মন। যাহা জানি না, যাহা চেতনার বাহিরে, তাহাকে মন বলা যায় না। চেতনাই মনের একমাত্র অপরিবর্তনীয় সত্তা বা গুণ। চেতনাহীন মন বা নির্জ্ঞান মন আর সোনার পাথরবাটি একই কথা। স্মৃতির আশ্রয় মন নহে, মস্তিষ্ক। গানের ছাপ যেমন গ্রামোফোনের রেকর্ডে থাকে, তেমনি মানসিক ঘটনার ছাপ মস্তিষ্কে থাকিয়া যায়। তাহাই স্মৃতির মূল। গ্রামোফোন যন্ত্রে চড়াইলে যেমন রেকর্ডে গান বাহির হয়, মস্তিষ্কের রেকর্ডেও তেমনি উত্তেজিত হইলে লুপ্ত স্মৃতি জাগিয়া উঠে; এক সংজ্ঞান মনই আছে, নির্জ্ঞান মন বলিয়া কিছু নাই। সহচারবাদী বলিলেন, মস্তিষ্কে চিন্তা উৎপন্ন হয় মানিতে যে বাধা, মস্তিষ্কে স্মৃতির আরোপেও সেই বাধা। মস্তিষ্কে স্মৃতির ছাপ নির্জ্ঞান মনের সহচারী ঘটনামাত্র, তাহা স্মৃতির কারণ নহে। তাহা ছাড়া স্মৃতিকে মস্তিষ্কের ছাপ বলাও যা গানকে রেকর্ডের দাগ বলাও তা। অমুক রেকর্ডে এই প্রকার উঁচু-নীচু দাগ আছে বলিলে লোকে কিছুই বুঝিবে না, কিন্তু যদি বলা যায় অমুক গান আছে, তবে সহজেই তাহা লোকের বোধগম্য হইবে। মস্তিষ্কের স্মৃতির ছাপ কেহ কখন দেখেন নাই, তাহা অনুমানমাত্র; অতএব ছাপ আছে বলা অপেক্ষা অমুক ঘটনার স্মৃতি নির্জ্ঞান মনে আছে বলা ভাল। মনের সমস্ত ব্যাপার কেবল চেতনায় নিবদ্ধ বলিলে মনের সঙ্কীর্ণ সংজ্ঞা দেওয়া হয়। জড় জগতে প্রত্যক্ষ অনুভূত পদার্থ ব্যতীত যেমন অদৃষ্ট পদার্থের বাস্তবতা স্বীকার করা হয়, সেইরূপ মনোজগতেও প্রত্যক্ষ মন ছাড়া নির্জ্ঞান মনের কল্পনা যুক্তিযুক্ত।

নির্জ্ঞানের প্রমাণ

অন্য একদিক দিয়াও আমাদের নির্জ্ঞান মন স্বীকার করিতে হয়। মানসিক রোগের নিদান আলোচনা করিলে দেখা যায় যে, নির্জ্ঞান মন না মানিলে মানসিক লক্ষণের সঙ্গত ব্যাখ্যা করা যায় না। কোন রোগিণী হয়ত তাহার পুত্রকে খুবই ভালবাসে কিন্তু তাহার মনে ক্রমাগত চিন্তা উঠিতেছে ‘ছেলেকে কাটিয়া ফেলিব।’ এই চিন্তা রোগিণী ইচ্ছা করিলেও তাড়াইতে পারে না। বলা বাহুল্য, এইরূপ চিন্তা রোগিণীর স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত। রোগিণী অনেক সময় বলে কে যেন জোর করিয়া তাহার মনে এই চিন্তা ঠেলিয়া দিতেছে। হিষ্টিরিয়া রোগী ফিটের সময় হয়ত এমন আচরণ করে যাহার জন্য পরে সে অত্যন্ত লজ্জিত হয়। এক প্রকার মানসিক ব্যাধি আছে যাহাতে রোগীর মনে হয় কে যেন তাহার কানে কানে কথা বলিতেছে ও তাহাকে নানারূপ অবৈধ কার্য করিতে প্ররোচিত করিতেছে। রোগী সহস্র চেষ্টা করিয়াও তাহার কথা শোনা বন্ধ করিতে পারে না। সাধারণে অনেক সময়ে এই সকল রোগীকে ভূতাবিষ্ট বলিয়া মনে করে। কারণ রোগীর ব্যবহারে মনে হয় তাহার নিজের ব্যক্তিত্ব নষ্ট হইয়াছে এবং সম্পূর্ণ বিভিন্ন প্রকৃতির এক আত্মার বশে সে চলিতেছে। ভূত মানিলে এই সকল রোগীর ব্যবহারের একটা সঙ্গত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ভূত রোগীর স্কন্ধে অধিষ্ঠান করিয়া তাহার শরীর মন দখল করিয়াছে ও তাহাকে ইচ্ছামতো চালাইতেছে, কাজেই রোগী তাহার স্বভাববিরুদ্ধ আচরণ করিতেছে বা ভূতের কথা শুনিতে পাইতেছে। নির্জ্ঞান মন মানিলে এই সকল লক্ষণের ব্যাখ্যা করিবার জন্য ভূত ডাকিতে হয় না। নির্জ্ঞানবিদ বলেন, মানুষের স্বভাবে নানা প্রকারের বিরুদ্ধ বৃত্তির সমাবেশ দেখা যায়। মানুষ যে অবস্থায় পড়ে, সেই অবস্থানুযায়ী মানসিক বৃত্তি প্রকাশ পায়। ছোটছেলে চোরের মধ্যে প্রতিপালিত হইলে চোর হইয়া দাঁড়ায়। সামাজিক হিসাবে মানসিক প্রবৃত্তিগুলিকে ভাল ও মন্দ — এই দুই ভাগে ফেলা যায়। যাহার মধ্যে ভাল প্রবৃত্তি অধিক, সে ভাল লোক; যাহার মন্দ প্রবৃত্তি অধিক, সে মন্দ লোক। অবস্থাবিশেষে পড়িয়াই মানুষ অধিকাংশ সময়ে ভাল মন্দ হয়। ভাল লোকের মন্দ প্রবৃত্তি একেবারে নাই তাহা বলা চলে না। সাধারণত আমাদের মন্দ প্রবৃত্তিগুলি সামাজিক আবেষ্টনের গুণে নির্জ্ঞান মনে নির্বাসিত হয় ও আমরা তাহাদের অস্তিত্ব স্বীকার করিতে চাই না। মাঝে মাঝে নানা কারণে, এই সকল মন্দ প্রবৃত্তি নির্জ্ঞান হইতে সংজ্ঞানে আসিবার চেষ্টা করে। কখনো মন্দ প্রবৃত্তিগুলি স্বরূপে আসিয়াই চেতনায় দেখা দেয়। কখনও বা তাহারা ছদ্মবেশে সংজ্ঞানে আসে। নির্জ্ঞানে অবস্থিত নিরুদ্ধ প্রবৃত্তিই মানসিক রোগের মূল। এইজন্যই মানসিক রোগের লক্ষণ রোগীর স্বভাববিরুদ্ধ মনে হয় এবং সম্পূর্ণ পৃথক স্বভাবের এক মন রোগীর দেহ আশ্রয় করিয়াছে, এইরূপ অনুমান হয়। মানসিক লক্ষণগুলি নির্জ্ঞান হইতে উঠে বলিয়াই তাহা যুক্তিতর্কের দ্বারা নিবারিত হয় না। যুক্তিতর্কের ফলে কেবল সংজ্ঞানে মনোভাবের পরিবর্তন সম্ভব; নির্জ্ঞান মনে তাহাদের প্রভাব প্রবেশ করিতে পারে না। বিশেষ প্রক্রিয়ার দ্বারা চিকিৎসা করিলে নির্জ্ঞানস্থিত মনোভাব সংজ্ঞানে আসিয়া উপস্থিত হয় ও তখন তাহা যুক্তিতর্কের দ্বারা প্রশমিত হয়। নির্জ্ঞানের বৃত্তি চেতনায় আসিলে রোগী অনেক সময় ভয়ে ঘৃণা লজ্জায় অভিভূত হয়, কারণ তখন সে স্পষ্ট বুঝিতে পারে যে, এই অসামাজিক বৃত্তি তাহার নিজের মনেরই এক অংশ। এই সকল প্রমাণ হইতে নির্জ্ঞান মনের অস্তিত্ব সিদ্ধ হইয়াছে। বাস্তবিক অপ-মনোবিদ্যার (abnormal psychology) অনুশীলনে প্রথম নির্জ্ঞান মনের প্রভাব ধরা পড়ে। অপ-মনোবিদই নির্জ্ঞানের স্বরূপ নির্ণয় করেন। নির্জ্ঞানে অবস্থিত বৃত্তিগুলি যে নিশ্চল নহে ইহা তাঁহার আবিষ্কার। এই সকল বৃত্তি সর্বদাই আমাদের চেতনায় আসিবার চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু সংজ্ঞানের বিরোধী প্রবৃত্তিগুলি তাহাদিগকে বাধা দিতেছে। এই সংঘর্ষের ফলে মনের রোগের উৎপত্তি।

নির্জ্ঞান মনের আরও প্রমাণ আছে। হিপ্‌নিটজম্ বা সংবেশনের কথা অনেকে শুনিয়াছেন। কোন ব্যক্তিকে সংবেশিত করিয়া যদি সংবেশক তাঁহাকে বলেন যে, তুমি ১০,০০০ মিনিট পরে অথবা অমুক তারিখে মাথার উপর তিনবার হাত তুলিবে, তবে দেখা যায় যে, নির্দিষ্ট সময় গত হইলে ঐ ব্যক্তি আদেশমত কাজ করে। আশ্চর্য এই যে, সংবেশিত অবস্থা হইতে উঠিবার পর সংবেশকের আদেশের কথা তাহার কিছুই মনে থাকে না এবং সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ব্যক্তির মতোই ব্যবহার করে। এক বৎসর পরেও সংবেশকের আদেশ পালিত হইতে দেখা গিয়াছে, অথচ এই মধ্যবর্তী কালে সেই ব্যক্তির মনে আদেশের কোন ধারণাই থাকে না। তাহাকে এ সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করিলে সে কিছুই মনে করিয়া বলিতে পারে না। আদেশ প্রতিপালন করিবার পর যদি তাহাকে জিজ্ঞাসা করা যায় যে, সে কেন ঐরূপ ব্যবহার করিল, তবে তাহারও কোন সন্তোষজনক কারণ দেখাইতে পারে না, বলে আমার ইচ্ছা হইয়াছে করিয়াছি। এখন প্রশ্ন উঠিতেছে, কি করিয়া সংবেশিত ব্যক্তি সময়ের হিসাব রাখে এবং কি করিয়াই-বা সে বুঝিতে পারে যে, নির্দিষ্টকাল গত হইয়াছে। আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করিবার আছে। সংবেশকের আদেশ সংবেশিত ব্যক্তি নিজের স্বাধীন ইচ্ছা বলিয়াই মনে করে। সংবেশিত ব্যক্তির মনে যে কাল-গণনা চলিতেছিল এবং তাহার মনেরই কোন অজ্ঞাত প্রদেশে যে সংবেশকের আদেশের ধারণা লুক্কায়িত ছিল তাহা মানিতেই হইতেছে। নির্জ্ঞান মনেই এই ধারণা ছিল এবং নির্জ্ঞান মনই কাল নিরূপণ করিতেছিল এবং নির্দিষ্ট সময় গত হইলে সেই আদেশকে ইচ্ছার আকারে সংজ্ঞানে ঠেলিয়া দিয়াছে বলিলে সর্বাপেক্ষা সঙ্গত ব্যাখ্যা হয়।

স্বপ্নতত্ত্ব বিচার করিলেও নির্জ্ঞান মন মানিতে হয়। স্বপ্নে যে-সকল উদ্ভট কল্পনা দেখা দেয় তাহাদের উৎপত্তিও নির্জ্ঞানে। নির্জ্ঞানের স্নিগ্ধ ইচ্ছা ছদ্মবেশে নিদ্রাকালে সংজ্ঞানে দেখা দিয়া স্বপ্ন সৃষ্টি করে।

অচল ও সচল মন

মনোবিদ্যার ক্ষেত্রের পরিধি কতদূর বিস্তীর্ণ, এতক্ষণে তাহা বোঝা গেল। মনোবিদ কেবল যে সংজ্ঞানেরই আলোচনা করিবেন তাহা নহে — নির্জ্ঞানস্থিত মানসিক ব্যাপারও তাঁহার আলোচ্য বিষয়। মনোবিদ্যার দুইটা দিক আছে। মনের বৃত্তি কি কি, এই সকল বৃত্তির পরস্পর সম্বন্ধ কি প্রকারের, তাহাদের স্বরূপই-বা কি ইত্যাদির আলোচনা মনোবিদ্যার এক দিক। কোন্ প্রবৃত্তির বশে মানুষ কাজ করে, কোন্ প্রবৃত্তি জন্মগত, প্রবৃত্তিগুলির পরস্পর ঘাতপ্রতিঘাতের ফলাফলই বা কি, কি ঘটনায় মনে সাধু ইচ্ছা উঠে, কখনই-বা মনে অসামাজিক ইচ্ছা জাগে, কেন একজন কবি হয় অপরে চিকিৎসক হয়, একই আবেষ্টনে থাকিয়াও কেনই বা বিভিন্ন মানুষে বিভিন্ন ব্যবহার করে ইত্যাদি আলোচনা মনোবিদ্যার আর একদিক। এই দুইদিক পরস্পর বিযুক্ত নহে। প্রথমটির আলোচ্য বিষয় — মনের কাঠামো বা গঠন। ইহাকে অচল মন বলা যাইতে পরে। দ্বিতীয়টির আলোচ্য — মনের ক্রিয়া বা গতি। ইহাকে সচল মন বলা যায়। মনকে এন্‌জিনের সহিত তুলনা করিলে বলা যাইতে পারে, প্রথমটিতে এন্‌জিনের কলকব্জার গঠন-সংস্থান ইত্যাদি বিচার করা হয়। দ্বিতীয়টিতে এন্‌জিনের গতি, কি করিয়া এন্‌জিন দ্রুত চলে, কখনই-বা আস্তে চলে, কি করিয়া বাঁশী বাজে ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা করা হয়। আমরা কয় প্রকার সংবেদন (sensation) অনুভব করিতে পারি, সংবেদনের স্বরূপ কি, প্রত্যক্ষ অনুভূতিই (perception) বা কি, সংবেদনের সহিত প্রত্যক্ষের কি সম্বন্ধ বা প্রতিরূপের (image) সহিত প্রত্যক্ষের কি যোগ আছে, মনোযোগ কাহাকে বলে, কয়টা বিষয় একসঙ্গে অবধান করিতে পারি, দুই ব্যক্তির মধ্যে কাহার স্মৃতিশক্তি অধিক, চিন্তায় কি কি মানসিক বৃত্তি আছে, ইত্যাদি প্রশ্ন অচল মনের অন্তর্গত। কেন মনে রাগ হয়, বিরুদ্ধ প্রবৃত্তির সংঘর্ষে মনোভাবের কি প্রবর্তন ঘটে, কেন একটা কাজ ভাল লাগে, অপরটা ভাল লাগে না, উদ্ভট চিন্তা কি করিয়া মনে উদয় হয়, কি করিয়া মানুষ স্বপ্ন দেখে ইত্যাদি প্রশ্ন সচল মনের। বহুকাল মনোবিদ অচল মনের তথ্য আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। মাত্র অল্পদিন হইল সচল মনের দিকে তাহার দৃষ্টি পড়িয়াছে।

অন্তর্দর্শন

অচল ও সচল উভয় মনের তথ্যসমূহ অনুসন্ধান করিবার জন্য মনোবিদ বিভিন্ন উপায়ের আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই সকল উপায়ের মধ্যে অন্তর্দর্শনই মনোবিদের প্রথম ও প্রধান অস্ত্র। বিভিন্ন ঘটনায় বিভিন্ন অবস্থায় মনোভাব কিরূপ হয় তাহা লক্ষ্য করিলে মনের অনেক কথা জানা যায়। অন্তর্দর্শন নিতান্ত সহজ ব্যাপার নহে। অভ্যাসের দ্বারা অন্তর্দর্শনের ক্ষমতা বাড়াইতে হয়। কেবল নিজের মন দেখিলেই মনোবিদের চলিবে না। অন্তর্দর্শনে অভিজ্ঞ বহু ব্যক্তির সাক্ষ্য মনোবিদ গ্রহণ করিবেন, তবে সঠিক তথ্য নির্ণীত হইবে। কখন কখন মনোবিদকে যন্ত্রাদিরও সাহায্য লইতে হয়। চিনির মিষ্টতার স্বরূপ কি, অথবা কষ্টের সময় মনোভাব কিরূপ হয় ইত্যাদি জানিবার জন্য অন্তর্দর্শনই যথেষ্ট। কতটা পার্থক্য থাকিলে দুইটি সুরের প্রভেদ ধরা পড়ে জানিতে হইলে যন্ত্রসাহায্যে বিভিন্ন সুর উৎপাদন করিয়া অন্তর্দর্শনের দ্বারা তাহা নির্ণয় করিতে হয়। বোঝার উপর শাকের আঁটির ভার আমরা টের পাই না, কিন্তু শাকের আঁটিকে যদি ক্রমেই বড় করা যায় তবে এমন এক অবস্থা আসিবে যখন শাকের আঁটি চাপাইলেই বোঝার ভারের আধিক্য অনুভব করিতে পারিব। কতখানি বোঝায় কত বড় শাকের আঁটি চাপাইলে টের পাওয়া যাইবে, মনোবিদ তাহা নির্ণয় করিয়াছেন। এই পরীক্ষাতেও যন্ত্র আবশ্যক। আলোর প্রখরতার তারতম্য কখন চোখে ধরা পড়ে তাহা মনোবিদ যন্ত্রসাহায্যেই বুঝিতে পারেন। হাত তুলিতে বলিলে কথা শোনা ও হাত-তোলার মধ্যে কত সময় যায় তাহাও মনোবিদ বিশেষ যন্ত্রের দ্বারাই নিরূপণ করেন। মনে রাখিতে হইবে, মনোবিদ যন্ত্র ব্যবহার করিলেও অন্তর্দর্শনই সত্যাসত্য নির্ণয়ে তাহার প্রধান অবলম্বন। উদাহরণ দিলে কথাটা সরল হইবে। আলোর প্রখরতার তারতম্য নির্ণয়কালে যন্ত্রের দ্বারাই আলো বাড়ান বা কমান হয়, কিন্তু এই বাড়া-কমা আলোর সংবেদনের বাড়া-কমার অনুরূপ না হইতে পারে। পদার্থবিদের কাছে হাজার এক বাতির আলো হাজার বাতির আলো অপেক্ষা অধিক, কিন্তু মনোবিদের কাছে এই দুই আলোকজনিত সংবেদন একই। অতএব দেখা গেল, মনোবিদ পদার্থবিদেরই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করিয়া ভিন্ন সত্যে উপনীত হইতেছেন। অনেকে মনোবিদের যন্ত্রাগারে শারীরবিদ্যার যন্ত্রাদি দেখিয়া মনে করেন বুঝি শারীরবিদ্যায় জ্ঞান থাকিলেই মনোবিজ্ঞানও আয়ত্ত করা যায়, কিন্তু মনে রাখা উচিত, এই দুই বিদ্যার নির্ণীত তথ্য সম্পূর্ণ বিভিন্ন। পদার্থবিদ্যা, শারীরবিদ্যা, কিমিতিবিদ্যা ইত্যাদি বহুতর বিদ্যার যন্ত্রাদি মনোবিদ ব্যবহার করেন সত্য, কিন্তু এই সকল যন্ত্র-সাহায্যে তিনি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তাহা তাঁহার নিজস্ব।

ব্যবহার পর্যবেক্ষণ

মন-অনুসন্ধানের দ্বিতীয় উপায় আচার-ব্যবহার লক্ষ্য করা। কুকুরকে লেজ গুটাইয়া দৌড়াইতে দেখিলে যেমন তাহার ভয় হইয়াছে অনুমান করা যায়, সেইরূপ মানুষের ব্যবহার দেখিয়াও অনেক সময় তাহার মনোভাব বুঝিতে পারা যায়। যেখানে অন্তর্দর্শনের সম্ভাবনা নাই, সেখানেই এই উপায় অবলম্বন করা হয়। সুবিধা হইলে মনোবিদ প্রথম ও দ্বিতীয় উপায় একত্র প্রয়োগ করেন, অর্থাৎ পরীক্ষ্যমান ব্যক্তিকে অন্তর্দর্শন করিতে বলিয়া তাহার অনভূতির বিবরণ সংগ্রহ করেন এবং সেই সঙ্গে তাহার আচার-ব্যবহারও লক্ষ্য করেন। মানুষের ব্যবহারের দুইটা দিক আছে — একটা স্থূল ও একটা সূক্ষ্ম। ভয় পাইলে আমরা বিপদ হইতে দূরে সরিয়া যাই। পলাইয়া যাওয়াটা ভয়জনিত ব্যবহারের স্থূল দিক। ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে কতকগুলি শারীরিক পরিবর্তন ঘটে, যথা মুখ শুকাইয়া যাওয়া, বুক দুড়দুড় করা, ঘাম হওয়া ইত্যাদি। এইগুলি ব্যবহারের সূক্ষ্ম দিক। কারণ তাহা বাহিরের লোকের চোখে ধরা পড়ে না। শারীরিক পরিবর্তন ব্যবহারের অঙ্গ বলিয়াই পরিগণিত হয়। যন্ত্র ভিন্ন অনেক সময় এই সকল সূক্ষ্ম শারীরিক পরিবর্তন ধরা পড়ে না। পরীক্ষামান ব্যক্তিকে সূচ ফুটাইয়া কষ্ট দেওয়া হইল। যতক্ষণ কষ্টবোধ রহিল মনোবিদ নানা যন্ত্রের দ্বারা দেখিলেন কষ্টের সঙ্গে হৃৎপিণ্ডের গতি দ্রুত হয় কিনা, নিঃশ্বাসে কি পরিবর্তন ঘটে, রক্তের চাপ বাড়ে কি কমে, চক্ষুতারকা বিস্ফারিত হয় কি না ইত্যাদি। এইরূপ পরীক্ষা হইতে কোন মানসিক অবস্থায় কি শারীরিক পরিবর্তন হয় মনোবিদ তাহার সন্ধান লন। পরে যদি কাহারও শরীরে ও ব্যবহারে এই সকল পরিবর্তন দেখা যায়, তখন মনোবিদ অনুমান করেন যে, তাহার মনেও তদনুরূপ বৃত্তি জাগিয়াছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংজ্ঞানের অচল মনের তথ্যসমূহ অন্তর্দর্শনের দ্বারাই নির্ণীত হইয়াছে। ব্যবহার পর্যবেক্ষণে সচল মন ও নির্জ্ঞানের কিছু কিছু সংবাদ পাওয়া যায়। কাহারও ব্যবহারে হয়ত কোন বিশেষ ব্যক্তির প্রতি আক্রোশের লক্ষণ প্রকাশ পাইল, কিন্তু মনে হয়ত তাহার কোন আক্রোশই জাগিল না। এরূপ স্থলে মনোবিদ অনুমান করেন যে, সংজ্ঞানে আক্রোশ না থাকিলেও নির্জ্ঞান মনে আক্রোশ আছে এবং তাহা হইতে আক্রোশের লক্ষণ উৎপন্ন হইয়াছে। জ্ঞানত আমি সাধু হইলেও যদি আমার ব্যবহার চোরের মত হয়, তবে বুঝিতে হইবে, আমার নির্জ্ঞানে চুরি করিবার ইচ্ছা আছে। নির্জ্ঞানের সচল দিকটাই এই সব লক্ষণে ধরা পড়ে।

অবাধ ভাবানুষঙ্গ

ব্যবহার পর্যবেক্ষণ ব্যতীত অন্য উপায়েও নির্জ্ঞানের সংবাদ পাওয়া যায়। এই উপায়ের নাম অবাধ-ভাবানুক্রম বা Free Association Method। চিত্ত বিশ্লেষণে মনোবিদের ইহাই তৃতীয় অস্ত্র। পরীক্ষ্যমান ইচ্ছা করিয়া কিছু ভাবিবেন না, আপনা হইতে তাঁহার মনে যে চিন্তা উঠিবে তাহাই তিনি বলিবেন। তিনি কোন কথা মিথ্যা করিয়া বলিবেন না বা কিছু গোপন করিবেন না। এরূপ অবস্থায় পরীক্ষ্যমানের মনে যে সকল চিন্তার উদয় হয়, মনোবিদ তাহার সমস্তই লিখিয়া লন। অনেক সময় এই চিন্তাগুলি আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর বিযুক্ত ও অর্থশূন্য মনে হয়। মনোবিদ জানেন কোন চিন্তাই অর্থশূন্য হইতে পারে না এবং পর-পর চিন্তাগুলির মধ্যে একটা যোগসূত্র নিশ্চয়ই আছে। এই যোগসূত্র বাহির করিতে পারিলেই নির্জ্ঞানে কি আছে বুঝা যাইবে। ধরা যাক একজনের অবাধ ভাবানুষঙ্গ দ্বারা পাওয়া গেল — ‘কোকিল-বসন্ত-মড়ক-থিয়েটার-জগন্নাথ বিষয় নষ্ট করছে-অসুখে পড়বে-ডাক্তার-বাবার অসুখ-ভাবিত আছি।’ বলা বাহুল্য, এই চিন্তাগুলি সবই সংজ্ঞানের চিন্তা; কিন্তু মনোবিদ দেখিয়াছেন অবাধ-ভাবানুষঙ্গে যে সকল কথা মনে উঠে নির্জ্ঞানের রুদ্ধ প্রবৃত্তির দ্বারাই তাহারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ‘কোকিলের’ চিন্তার সহিত ‘বসন্ত’ এবং ‘বসন্তের’ সহিত ‘মড়কের’ চিন্তা কেন উঠিয়াছে বোঝা সহজ। মড়কের পর ‘থিয়েটার’ কেন উঠিল তাহা হয়ত পরীক্ষ্যমানও বলিতে পারিবেন না। এই দুই ভাবের যোগসূত্র নির্জ্ঞানে অবস্থিত। ‘থিয়েটার-বিষয় নষ্ট-অসুখ-ডাক্তার-বাবার অসুখ-ভাবিত, আছি’ — এই চিন্তাগুলির পরস্পর যোগ সংজ্ঞানেই রহিয়াছে। অনেক সময় পর-পর যে চিন্তা উঠে তাহাদের যোগসূত্র সংজ্ঞান ও নির্জ্ঞান উভয় মনেই দেখা যায়, অর্থাৎ একাধিক যোগসূত্রের দ্বারা এই ভাবগুলি পরস্পর সংযুক্ত। সংজ্ঞানে এক একটি ভাবের বহুমুখী অনুষঙ্গ থাকে। ‘পেন্সিল’ মনে উঠিলে কাগজ, কলম, লেখা, ছবি, ছুরি ইত্যাদি যে-কোন বিষয়ের কথা মনে আসিতে পারে। অর্থাৎ, এই সকল বিভিন্ন বিষয়ের সহিত ‘পেনসিল’ কথাটার ভাবানুষঙ্গ রহিয়াছে। কোন বিশেষ ক্ষেত্রে কোন্ ভাবটি পেন্সিল কথার পর মনে জাগিবে তাহা নির্জ্ঞান নিয়ন্ত্রিত করে। উদাহরণের ‘থিয়েটার’ কথাটার পর ‘বিষয় নষ্ট’ করার কথা মনে না আসিয়া ‘নাচ-গান’ ইত্যাদি মনে আসিতে পারিত। কিন্তু এই সমস্ত কথা না আসিয়া ‘বিষয় নষ্ট’ করা কেন আসিল বুঝিতে হইলে নির্জ্ঞানে সন্ধান লইতে হইবে। পরীক্ষ্যমানকে জিজ্ঞাসা করিলে হয়ত জানা যাইবে যে, পরীক্ষার সময় কোকিল ডাকিতেছিল বলিয়া তাহার মনে কোকিলের কথা আসিয়াছে। পরের ভাবগুলি কেন উঠিল পরীক্ষামান তাহা জানেন না। নির্জ্ঞান মনোবিদ দেখিবেন ‘কোকিল’ কথাটার পরেই ‘রোগ ও মৃত্যুর’ কথা আছে। তাহার পর আমোদ-প্রমোদ ও টাকা খরচের কথা; তাহার পরে পিতার অসুখের জন্য চিন্তা। বুঝিতে হইবে, পরীক্ষামানের নির্জ্ঞানে এমন এক ভাব আছে যাহারই প্রভাবে এই সমস্ত চিন্তা পর পর সংজ্ঞানে উঠিয়াছে। নির্জ্ঞানবিদের মতে এই পরীক্ষ্যমান ব্যক্তি সংজ্ঞানে তাহার পিতাকে হয়ত খুব ভালবাসে এবং তাহার অসুখের জন্য সে হয়ত বাস্তবিক চিন্তিতও হইয়াছে, কিন্তু তাহার নির্জ্ঞানে সে পিতার মৃত্যুকামনা পোষণ করিতেছে। পিতার মৃত্যু হইলে সে বিষয় ভোগ করিতে পারে, এই ইচ্ছার বশেই সংজ্ঞানের চিন্তা পর পর উঠিয়াছে। এই জন্যই কোকিলের ডাকে তাহার অন্য কোন কথা মনে না পড়িয়া এমন কথা মনে পড়িয়াছে, যাহার সহিত এক মারাত্মক রোগের সম্বন্ধ বর্তমান। এই জন্যই এমন এক লোকেরও কথা মনে পড়িয়াছে যে পৈতৃক বিষয় নষ্ট করিতেছে। সেই ব্যক্তি অসুখে পড়িবে এই ধারণা মনে উঠিবার কারণ এই যে, তাহা না হইলে পিতার অসুখের কথা আসা সহজ নয়। সামান্য চিন্তার ধারা হইতে নির্জ্ঞানবিদ কি ভয়ানক সিদ্ধান্ত করিলেন। প্রথম দৃষ্টিতে নির্জ্ঞানবিদের এইরূপ সিদ্ধান্তকে কষ্টকল্পনা মনে হইতে পারে। কিন্তু যদি পরীক্ষ্যমানের বিভিন্ন সময়ের চিন্তাধারা হইতে বার বার এই একই অনুমান সম্ভবপর হয় তবে আর নির্জ্ঞানস্থিত পিতৃবিদ্বেষকে অস্বীকার করা চলে না। নির্জ্ঞানে এইরূপ রুদ্ধ ইচ্ছা থাকিলে নানা ব্যবহারেও তাহা প্রকাশ পায়। এইরূপ রুদ্ধ ইচ্ছা ছদ্মবেশে স্বপ্নেও নানা আকারে দেখা দেয়।

মনোবিদ্যার সাফল্য

অন্তর্দর্শন, ব্যবহার-পর্যবেক্ষণ ও অবাধ ভাবানুষঙ্গক্রমের যথাযথ প্রয়োগে সংজ্ঞান ও নির্জ্ঞান উভয় মনের তথ্যসমূহ নির্ণীত হয়। অল্পদিন মাত্র নির্জ্ঞান মনোবিদ্যার অনুশীলন হইতেছে, কিন্তু ইতিমধ্যেই নির্জ্ঞানের যে-সমস্ত তথ্য আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহাতে চমৎকৃত হইতে হয়। সংজ্ঞান মনের উপরে নির্জ্ঞানের প্রভাব অতিশয় প্রবল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের মনোবৃত্তি নির্জ্ঞানের দ্বারাই চালিত হয়। বিভিন্ন ব্যক্তির চরিত্রের বিশেষ বিশেষ দিক কেন পুষ্টিলাভ করে, নির্জ্ঞানবিদ তাহার কারণ দেখাইতে পারেন। সকলেই জানেন প্রাত্যহিক জীবনে আমরা নিজ নিজ স্বভাববশে চলিয়া থাকি। অনেকে মনে করেন, এই স্বভাব জন্মগত ও অপরিবর্তনীয়। ‘স্বভাব যায় না ম’লে’। নির্জ্ঞানবিদ দেখাইয়াছেন, যাহাকে আমরা স্বভাব বলি তাহার অধিকাংশই জন্মগত নহে। নির্জ্ঞান মনই তাহার প্রধান নিয়ন্তা। শৈশবের আবেষ্টনে নির্জ্ঞান মন গড়িয়া উঠে এবং তাহার গতি কোন দিকে যাইবে শৈশবে তাহা একপ্রকার স্থির হইয়া যায়। কে কবি হইবে, কে চিকিৎসক হইবে, কে চোর হইবে, কে সাধু হইবে, তাহা অনেকটা শৈশব জীবনের পারিপার্শ্বিক ঘটনার উপর নির্ভর করে। নির্জ্ঞানবিদ বলেন, শিশুর জীবন যথাযথ নিয়ন্ত্রিত হইলে ভবিষ্যৎ জীবন সুখের হয়। নির্জ্ঞান মনের গোলমালে মানসিক রোগ সৃষ্টি হইতে পারে এবং চরিত্রের পূর্ণতা লাভ হয় না। নির্জ্ঞানের পরিণতির ব্যাঘাতই জীবনে অসুখী হইবার এক প্রধান কারণ।

মানুষ সাধারণত বহির্জগতের উপর নিজ প্রভাব বিস্তার করিয়া সুখভোগ করিবার চেষ্টা করে। সমস্ত জড়বিজ্ঞান মানুষের এই চেষ্টার সহায়ক। হিন্দুশাস্ত্রের উপদেশ, বহির্বস্তুতে স্থায়ী সুখ নাই, মনঃসংযমেই প্রকৃত সুখলাভ হয়। স্থিরপ্রজ্ঞ ব্যক্তি সর্বাবস্থায় সুখী। মনকে শাসনে রাখিবার জন্য নানা আচার, অনুষ্ঠান ও কৃচ্ছ্রতাসাধন উপদেশ দেওয়া হয়। নির্জ্ঞান নিরাকরণ সুখশান্তি পাইবার অন্যতম পথ। নির্জ্ঞানবিদ ভরসা দিতেছেন, রুদ্ধ প্রবৃত্তিগুলি প্রশমিত হইলে মনের দ্বন্দ্ব মিটিয়া সমস্ত দুঃখ অপনীত হয়। শোক তাপ দগ্ধ শ্রান্ত ক্লান্ত বিক্ষুব্ধ মনের শান্তির উপায় এতদিন ধর্মের উপদেশের মধ্যে নিহিত ছিল। জড়বিজ্ঞানবিদকে এখানে ধর্মোপদেষ্টার নিকট পরাজয় স্বীকার করিতে হইয়াছে। কিন্তু আজ মনোবিদ্যা মানুষকে আশ্বাস ও শান্তির বাণী শুনাইয়া বিজ্ঞানের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে অগ্রসর হইয়াছে।

(‘প্রবাসী’, বৈশাখ সংখ্যা, ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ)

[লেখক অনুসৃত বানানরীতি বজায় রাখা হয়েছে।]

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান