তরুণকুমার দত্ত
মনোরোগ কখনও একলা আবার কখনও অন্য রোগের সঙ্গে মিশে থাকত পারে। মনোরোগীদের মাত্র ১০% কোনও ধরনের চিকিৎসার সুযোগ নেয় বা পায়। আবার আমাদের পিছিয়ে পড়া সমাজে মনোরোগ চিকিৎসক ও মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা যথেষ্ট কম। কারও মনের রোগ হলে পরিষেবা দেওয়ার জন্য সেই বিষয়ে প্রাথমিক কিছু ধারণা দরকার পড়ে। শারীরিক রোগব্যাধি কষ্ট যন্ত্রণা সম্পর্কে আমরা যতটা সচেতন বা সিরিয়াস মানসিক রোগ বিষয়ে ততটা সিরিয়াস আমরা অনেকেই নই। আবার প্রতিটি সমাজেই মানসিক রোগ বিষয়ে কিছু না কিছু স্টিগমা থাকায় কাজটা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। মনের রোগ দ্রুত চিনে ফেলে চিকিৎসা করা জরুরি। এ ব্যাপারে আমাদের পরিবারগুলির দায়িত্ব অপরিসীম। কারণ অনেক সময় রোগী বুঝতেই পারে না যে সে মনের রোগে কষ্ট পাচ্ছে। তার যে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন সেটাই সে হয়তো অনেক সময় বুঝেই উঠতে পারে না। বেশ কিছু মনোরোগ ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় টানা চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। বাস্তবে চিকিৎসা প্রায়ই অনিয়মিত হয়ে যায়। পরিবারের মানুষদের মধ্যে মানসিক সচেতনতা অনেকটাই কম। যদিও মানুষ একটু একটু করে সচেতন হচ্ছে তবুও সেটা যথেষ্টই কম। তার পর General practitioner বা house physician কনসেপ্টটাই হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ভিড়ে কি তাঁরা বিরল প্রজাতির চিকিৎসক হয়ে গেলেন। এতে করে সাধারণ মানুষকে বলে দেওয়ার কেউ নেই যে শরীরের রোগের মতো মনের রোগেরও চিকিৎসা হয়। কিছু ভুল বিশ্বাস, কুসংস্কার আর স্টিগমা কাটিয়ে উঠলে মানসিক রোগ বিষয়ে আমরা খোলামেলা কথাবার্তা বলতে পারব এবং অনেকে মানসিক রোগের চিকিৎসার সুযোগ পাবে। এই উদ্দেশ্যে মানসিক রোগ ও তার চিকিৎসার একটা আনুপূর্বিক ইতিহাস ধরা হল।
প্রথমেই দেখা যাক অস্বাভাবিক আচরণ বলতে আমরা কী কী বুঝতে পারি?
অস্বাভাবিক আচরণ বা অস্বাভাবিক চিন্তার সংজ্ঞার্থ নির্ণয় মোটেই সহজ নয়।সহজ কথায় যা স্বাভাবিক আচরণের নয় তাই অস্বাভাবিক আচরণ, অথবা স্বাভাবিক আচরণের বিপরীতটা হল অস্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু এর মানেটা কী? অস্বাভাবিকতা নির্ণয় করতে অনেক বিষয় বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
পরিসংখ্যানগত অথবা সমাজ রীতি-পদ্ধতির বিচ্যুতি (Statistical or Social norm deviance)
স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক-এর সংজ্ঞার্থ ঠিক করার একটি উপায় হল পরিসংখ্যানগত সংজ্ঞার্থ। যেসব আচরণ প্রায়শই দেখা যায় তাদের স্বাভাবিক বলে গণ্য করা যায়। আর যেসব আচরণ কদাচিৎ দেখা যায় তাকে অস্বাভাবিক বলা হয়। যেমন ধরা যাক, যে সমাজে উলঙ্গ থাকার চল বা অনুমোদন নেই সেই সমাজে যদি কেউ পোশাক পড়তে না চায় তবে তা ক্বচিৎ এবং তাকে অস্বাভাবিকভাবে দেখা হয়। কিন্তু সামাজিক প্রথা পদ্ধতি থেকে ভিন্ন বা তফাত হলেই তাকে সকল সময় নেতিমূলক বা অস্বাভাবিক ভাবা যাবে না। ধরুন আমেরিকায় কেউ একজন সাধু হতে চাইছে এবং মনাস্ট্রিতে জীবন কাটাতে চাইছে, এটা আমেরিকায় সাধারণভাবে প্রচলিত আচরণ নয় এবং সেখানে সমাজও এই ধরনের আচরণকে স্ট্যান্ডার্ড বা কাম্য আচরণবিধির মধ্যে আনে না। তবে এটা কিন্তু কখনোই অস্বাভাবিক আচরণ নয়।
কোনও ব্যক্তির সামাজিক অথবা পরিবেশগত সংস্থানে কোনও আচরণ অথবা চিন্তা কীভাবে চিহ্নিত হবে তা তার পরিবেশ পরিস্থিতির দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে। যেমন একজন থেরাপিস্টের কাছে এই অভিযোগ নিয়ে এল যে ফোনে তার কথাবার্তা অন্য কেউ শুনে নিচ্ছে ও তার সব কাজের পেছনে গোয়েন্দাগিরি করছে। এতে থেরাপিস্ট প্রথমটায় ভাবতেই পারেন লোকটি তার উপরে অত্যাচার-নিপীড়ন করার মতো ষড়যন্ত্রের অপভ্রান্তিতে ভুগছে (thought of persecution)। কিন্তু যদি লোকটি তার পরই বুঝিয়ে বলে যে সে উইটনেস প্রটেকশন প্রোগ্রামের অধীনে রয়েছে তাহলে অভিযোগটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং বোঝার মতো হবে।
এবার statistical normality বা স্বাভাবিক বণ্টন/ গড় বণ্টন বিষয়ে দু-চার কথা বলে নি। মানুষের অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যই normal distribution মেনে চলে। এর মানে অধিকাংশ ব্যক্তি কোনও একটি শ্রেণির গড়ের ধারে পাশে থাকে (যেমন কোনও নারী বা পুরুষের গড় উচ্চতা)। গড় মানের থেকে কোনও মান যত দূরে সরে যেতে থাকে, কোনও একটি নির্দিষ্ট পরিমাপের পরিসংখ্যা তত কমতে থাকে। খুব কম লোকই খুব বেঁটে বা খুব লম্বা। কিন্তু অধিকাংশ লোকই গড় উচ্চতার। ধরা যাক পরিমাপগুলির একটা লেখচিত্র অঙ্কন করা হল। এক্ষেত্রে যদি পরিমাপকে X অক্ষ ও পরিসংখ্যাকে (frequency) Y অক্ষ বরাবর রাখা হয় তাহলে ঘণ্টার মতো একটি চিত্ররূপ বা আকার পাওয়া যাবে। এটা রাশিবিজ্ঞানের প্রচলিত কথায় bell curve বা ‘Gaussian function’। যেসব ব্যক্তি বণ্টনের প্রান্তের দিকে থাকে তারা রাশিবিজ্ঞানের দিক থেকে অ-স্বাভাবিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্তন মান/cut-off value ৯৫ শতাংশ ধরা হয়। তার মানে ৯৫ শতাংশ প্রসরের বাইরে যারা রইল, (ওপরে ২.৫ এবং নীচে ২.৫ শতাংশ) তারা হল অ-স্বাভাবিক। স্বাভাবিক গড় প্রসর (normal range) নির্ধারণে reference group বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ ভিন্ন সাংস্কৃতিক বিভাগ, সমতুল বয়স গোষ্ঠী (age group) অথবা লিঙ্গের ক্ষেত্রে প্রথা পদ্ধতির (norm) সাথে তুলনার কথা ধরলে অনেকেই তখন অ-স্বাভাবিকের দলে পড়ে যায়।
স্বাস্থ্যের অনেক নির্দেশ যদিও (যেমন রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা) গড় বণ্টনের (normal distribution) অধীনে আছে। সুস্থ স্বাভাবিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে যারা ওই স্বাভাবিক মাত্রার বাইরে তারাও অস্বাভাবিক। যদিও তাদের আবশ্যিকভাবে অসুস্থ ভাবা হয় না। মানসিক বৈশিষ্ট্যের পরিমাণ (যেমন— বুদ্ধি, আগ্রাসন বা আক্রমণাত্মক আচরণ) গড় বণ্টনের ধারে পাশেই থাকে। যেমন, অনেক মানুষের বুদ্ধি গড় মানের ধারে পাশেই থাকে। খুব কম লোক ব্যতিক্রম রকমের প্রতিভাবান। মানসিক প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক মানে আবশ্যিকভাবে তাদের চিকিৎসার দরকার এমন নয়।
ব্যক্তিগত অস্বস্তি (subjective discomfort)
Ab-normality-র লক্ষণ কী? কোনও ব্যক্তি যখন অত্যধিক পরিমাণে ব্যক্তিগত অস্বস্তিতে ভোগে অথবা কোনও বিশেষ আচরণ বা চিন্তা করার সময় আবেগ সংক্রান্ত যন্ত্রণায় (emotional distress) ভোগে তখন সে অবস্থাকে abnormal বলা যায়। ধরুন যে মহিলাটি বাড়ির বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছে ও ভুগছে সেই যখন বাড়ির বাইরে বের হতে চেষ্টা করছে তখন প্রচণ্ড উদ্বেগে ভুগছে; আবার বের হতে না পারার জন্যও যথেষ্ট কষ্ট পাচ্ছে। যদিও যে-সব চিন্তা বা আচরণ abnormal বা অস্বাভাবিক ভাবা হয় তার সবই কিন্তু কারও মধ্যে ব্যক্তিগত অস্বস্তি সৃষ্টি নাও করতে পারে। যেমন ধরা যাক, কেউ পরপর খুন করে চলেছে, তার ক্ষেত্রে এই খুন বা হত্যা করার জন্য কিন্তু তার কোনও emotional distress বা মানসিক দুঃখকষ্ট বা অনুশোচনা হচ্ছে না। বরং তার মধ্যে কোনও ধরনের বিশৃঙ্খল আচরণ রয়েছে যাতে তার কোনও আবেগ প্রকাশ পাচ্ছে না বা সে আবেগশূন্য বা অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ছে।
স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারার অক্ষমতা (Inability to function normally)
এমন কোনও আচরণ বা চিন্তাভাবনা যা কোনও ব্যক্তিকে সমাজের পক্ষে মানানসই হয়ে উঠতে দেয় না অথবা স্বচ্ছন্দে কাজকর্ম করতে দেয় না তাদেরও abnormal বলা যেতে পারে। এইসব আচরণকে maladaptive বা অপ্রযোজনমূলক আচরণও বলা যেতে পারে। এর মানে হল ব্যক্তিটি প্রতিদিনের জীবনযাপনের জন্য যতটুকু মানিয়ে গুছিয়ে চলতে হয় সেটা পেরে উঠছে না। Maladaptive চিন্তা ও আচরণ প্রাথমিকভাবে কাউকে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে। কিন্তু এর ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। যেমন ধরা যাক কোনও মহিলা তার উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেতে হাত বা শরীরের কোনও জায়গা কাটলেন। এতে তার সাময়িক একটা স্বস্তি হল বটে, কিন্তু এর ফলে তার বড়ো রকমের ক্ষতি হয়ে যেতে পার। Abnormality-র সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ে maladaptive চিন্তাভাবনা ও আচরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
অস্বাভাবিকতার একটি কার্যকর সংজ্ঞার্থ (A working definition of Abnormality)
Abnormality-র একটি স্পষ্ট চিত্র পেতে এতক্ষণ যা বলা হল তার সবগুলি বিবেচনায় আনা জরুরি। মনোবিদ ও মানসিক চিকিৎসাজীবী সকলেই অন্যের মানসিক ক্রিয়া বা আচরণ স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক তা ঠিক করার সময় প্রয়োজনীয় বিভিন্ন শর্ত অবস্থা বিবেচনা করেন। (অস্বাভাবিকতা স্থির করতে অন্তত কয়েকটি শর্ত পূরণ হওয়া জরুরি)।
১) চিন্তা বা আচরণ কি সাধারণের থেকে অন্যরকম মানে unusual? যেমন অপরিচিত কারও সামনাসামনি হতে চরম উদ্বিগ্নতা (panic) অনুভব করছে কিনা অথবা চাপমুক্ত অবস্থাতেও চরম বিষণ্ণ মনে হচ্ছে কিনা?
২) চিন্তা বা আচরণ কি সামাজিক রীতি পদ্ধতির বিপরীতে যাচ্ছে? স্মরণ রাখা যে, সামাজিক রীতিনীতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় — যেমন সমকামিতা একসময় যৌন বৈচিত্র্য (variation in sexual orientation) অপেক্ষা মানসিক বিকার বলে বিবেচিত হত।
৩) ব্যক্তির আচরণ বা মানসিক ক্রিয়া (psychological functioning) ব্যক্তির মধ্যে কি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত অস্বস্তি সৃষ্টি করছে?
৪) চিন্তা প্রক্রিয়া বা আচরণটি কি অপযোজনমূলক (maladaptive) অথবা এর জন্য কাজ করার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হচ্ছে কি?
৫) চিন্তার ধরন ধারণ অথবা আচরণের জন্য ব্যক্তি কি নিজের ও অপরের কাছে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে — যেমন, কেউ আত্মহত্যা করতে যায় অথবা যুক্তিহীনভাবে অন্য লোককে আক্রমণ করে।
উল্লিখিত পাঁচটির মধ্যে অন্তত দুটি শর্ত পূরণ করলে abnormal thinking/ behaviour বলা যেতে পারে। তখন তাকে আমরা সবচেয়ে ভালোভাবে psychological disorder বলে চিহ্নিত করতে পারি। তার মানে psychological disorder হল এমন ধরনের আচার ব্যবহার বা মানসিক ক্রিয়াকর্ম যার থেকে ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ অস্বস্তি হয় ও তার থেকে নিজের বা অন্যদের ক্ষতি সাধন করে বা করার চেষ্টা করে অথবা তার প্রতিদিনের কাজকর্ম করতে পারার ক্ষমতার ক্ষতিসাধন হয়।
আরও এগোতে হলে abnormality বা অস্বাভাবিকতা শব্দবন্ধটি কীভাবে insaniy বা বাতুলতা (?) থেকে কোথায় পৃথক তা ব্যাখ্যা ও পরিষ্কার করা দরকার। কেবলমাত্র মানসিক রোগ চিকিৎসাজীবীরাই মনোরোগ diagnose করতে পারে বা ধরতে পারে, আর যে মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে তার সবচেয়ে ভালো ও উপযুক্ত চিকিৎসা ঠিক করতে পারে। অনেক সময়ই আইনজীবী ও বিচারকরা বিপদের সম্মুখীন হন কীভাবে এক মানসিক অসুস্থ ব্যক্তি, যিনি অপরাধ করেছেন তার বিচার করবেন। মনোবিদ বা মনোরোগ চিকিৎসকেরা ঠিক করেন কোন আচরণ বা চিন্তা ভাবনা abnormal; কিন্তু তারা ঠিক করেন না নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তি insane বা উন্মাদ। আমেরিকায় insanity শব্দটি legal বা আইনগত প্রতিশব্দ। মানসিকভাবে অসুস্থ কেউ যদি অপরাধ করে তবে এই বলে যুক্তি দেওয়া হয় যে insane বলে সে তার অপরাধের জন্য দায়ী নয়— কারণ কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক তার মধ্যে পার্থক্য সে করতে পারে না। এই ধরনের যুক্তিকে বলে insanity defence। [insanity defence বিষয়ে বিশদ জানতে দেখুন ‘Murder while Sleep walking’, p-183.Ciccarelli]
Psychological disorder ব্যাখ্যা করার কয়েকটি মডেল
Abnormal behaviour বলে মেনে নেওয়া নির্ভর করে আমরা behaviour কে কোন Lense দিয়ে দেখছি। অস্বাভাবিক আচরণ ও চিন্তাকে কীভাবে ব্যাখ্যা বা নির্ধারণ করব তা ব্যাখ্যার জন্য অনেক মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো হল জীববিজ্ঞান সংক্রান্ত, মনোজাঙ্গমিক (psychodynamic), আচরণমূলক, সংজ্ঞানাত্মক (cognitive), মানবতাবাদী (humanistic), অস্তিত্বমূলক (existential), diasthesis-stress system এবং সমাজ সাংস্কৃতিক মডেল সমূহ।আর একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল হল Biopsychosocial perspective। এখানে কেবল দুটি মডেল আলোচনা করা হল।
জীবমনসামাজিক পরিপ্রেক্ষিত (Biopsychosocial perspective)
Scientific Journal Science-এ George Engel ‘biopsychosocial’ কথাটি প্রথম প্রয়োগ করেন। Engel প্রস্তাব করেন মানসিক অসুস্থতাই হোক আর শারীরিক অসুস্থতাই হোক, কোনো ক্ষেত্রই শুধুমাত্র biological perspective থেকে বোঝা উচিত নয়। Diabetes একটি disorder– তবে এর সঙ্গে লোকটি কী খায় ও কতটুকু ব্যায়াম পরিশ্রম করে তারও যোগ আছে। ঠিক সেই রকম উদ্বেগ ও অবসাদে সামাজিক ও প্রাকৃতিক প্রভাব থাকতে পারে। তা না-হলে সেই মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতাকে একটি সীমিত পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখা হবে। তাই একজন mental health professional হিসাবে ব্যক্তির কষ্টের/ অস্বস্তির কেবল লক্ষণগুলি জানলেই হবে না — তার পারিবারিক জীবন, কাজের অবস্থা, সংস্কৃতি চর্চা — তেমনি খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, ব্যায়াম এ সবকিছু জানতে হবে। ধরা যাক কোনও ব্যক্তি Anxiety ধরনের disorder-এর জিনগত সম্ভাবনা সহ জন্মগ্রহণ করলেন। কিন্তু যতক্ষণ না পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ বিকাশকালের সঠিক সময়ে stressor সৃষ্টি করছে ততক্ষণ সেই didorder সেই ব্যক্তির মধ্যে পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ নাও পেতে পারে। এই ধারণা সিজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে আলাদাভাবে প্রযুক্ত হতে দেখা যায়। একটি সুনির্দিষ্ট disorder-এর ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সংস্কৃতিকে কতটুকু মান্য করা হচ্ছে সেটা ওই disorder-টি ঠিক কোন মাত্রায় বা কীরূপ আকার নেবে তা নির্ধারণ করে। এটিই disorder-এর biopsychosocial model। শরীর ও মনের সংযোগ সম্পর্কের এইটিই সবচেয়ে প্রভাবশালী মডেল।
It is much more important to know what sort of patient has a disease, than what sort of disease a patient has. (William Osle)
রোগীর কী রোগ হয়েছে জানার থেকে কোন ধরনের রোগীর রোগ হয়েছে সেটা জানা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অস্বাভাবিক আচরণের আর-একটি মডেল হল ‘ডায়াথেসিস মডেল’। এই মডেলটির মূল কথা — মনোবৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি বিকশিত হয় যখন ডায়াথেসিস (Diasthesis) (বিকারের জৈবিক পূর্ব-প্রবণতা) একটি পীড়নমূলক পরিস্থিতির ফলে উদ্ভাবিত হয়। এই মডেলের তিনটি উপাদান রয়েছে। প্রথমটি হল ডায়াথেসিস যা কিছু জৈবিক অসংগতি যা বংশগতভাবে থাকতে পারে। দ্বিতীয় উপাদানটি হল ডায়াসিস, যা একটি মনোবৈজ্ঞানিক অসংগতি বিকশিত করার সম্ভাবনাকে বহন করতে পারে। এর অর্থ হল ব্যক্তি অসংগতি বিকশিত করার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ও পূর্ব-প্রবণ থাকে। তৃতীয় উপাদানটি হল রোগজনিত পীড়কের (pathogenic stressors) উপস্থিতি অর্থাৎ যে সমস্ত পীড়কের উপস্থিতি যা মনোরোগের (psychopathology) দিকে ঠেলে দেয়। এই ধরনের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ (at risk) ব্যক্তিদের মধ্যে এই সমস্ত পীড়ক যদি উন্মুক্ত থাকে, তবে প্রকৃতপক্ষে তাদের পূর্ব-প্রবণতা অসংগতিতে পরিণত হতে পারে। এই মডেলটি বিভিন্ন মনোরোগে, যেমন উদ্বেগ (Anxiety), বিষণ্ণতা (Depression), এবং সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia)-র ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে।
তাহলে এবার মনোরোগের বিষয়ে মানুষের বিশ্বাস, ধারণা, কুসংস্কার, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসের পথে কীভাবে বিকশিত হয়েছে বলতে শুরু করি।
প্রাগিতিহাসের সময়কাল থেকে আদিম বিশ্বাস ও ক্রিয়া-কলাপের মাধ্যমে ‘মন’-কে মানুষ বুঝতে চেষ্টা করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা জীবাশ্ম খুঁজে আদি মানবের এক খুলির সন্ধান পেয়েছেন। খুলিতে স্পষ্ট একটা ছিদ্র। নৃতাত্ত্বিকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ঠিক করলেন, ওই ফুটো তুরপুনের সাহায্যে করা হয়েছিল। হঠাৎ-ই বা মাথায় ছ্যাঁদা করার দরকার হল কেন?এর একটা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। মনোরোগীর চারপাশের আদি মানবগোষ্ঠী ভেবে নিয়েছিল অপদেবতা ভর করলে মানুষ ওইরকম ‘অস্বাভাবিক’ আচরণ করে। তুরপুন দিয়ে মাথায় ছিদ্র করেছিল আদিকালের শল্য-চিকিৎসকেরা। তাদের অস্ত্রোপচারের(!) উদ্দেশ্য ছিল একটাই— অপদেবতা ওরফে দানো-কে মাথা থেকে বার করা। নৃতাত্ত্বিকরা এও বুঝেছেন, ছ্যাঁদা করার সময়ই মনোরোগীটি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিল। ‘অস্বাভাবিকতা’ বিষয়ে এই আধিভৌতিক দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে প্রস্তর যুগের সময়ের। কম করে হলেও পাঁচ লক্ষ বছরের কথা। এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকরা কিন্তু একমত হতে পারেননি। সম্প্রতিকালে কিছু ঐতিহাসিক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আদৌ প্রস্তর যুগের মানুষের এমন ধরনের বিশ্বাস ছিল কিনা? তবে এটা সত্যি পরবর্তীকালে মানুষ বিশ্বাস করত অশুভ শক্তির জন্যই ওই রকম ‘অস্বাভাবিক’ আচরণ করে। মিশরে, চিনে ও হিব্রু লেখায় তখন মানসিক বিচ্যুতিকে এরকমভাবে দেখা হয়েছে। বাইবেলেই বলা হয়েছে — খোদ প্রভুর কাছ থেকে রাজা শৌলকের মধ্যে অশুভ আত্মার আবির্ভাব ঘটায় রাজার সমূহ ক্ষতি হয়েছিল। আবার ডেভিড উন্মত্ততার অভিনয় করে শত্রুদের বোঝাতে পেরেছিলেন তার মধ্যে দৈবশক্তির আগমন ঘটেছে।এ ধরনের প্রাচীন তত্ত্বের সম্মুখীন আজও হতে হয়। একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান প্রযুক্তির এমনতর উন্নতি সত্ত্বেও ঝাড়ফুঁক প্রতিনিয়তই চলছে। ভূত ঝাড়ানো (exorcism) মানে জাদুমন্ত্র ও প্রার্থনায় কারও শরীর থেকে অপদেবতাকে দূর করা হয়। এ বিশ্বাস বহু পরিবর্তনের মধ্যেও চলে এসেছে ও টিকে আছে। অধিকাংশ সমাজেই মনে করা হয় ওঝা অপার্থিব শক্তির সাথে যোগাযোগ করে; মানে মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি। সামান (shaman) বা ওঝার সাহায্যে পীড়িত ব্যক্তি কোন আত্মার কবলে আছে যেমন জানতে পারে তেমনি তাকে শান্ত করার জন্য কী দরকার তাও জানতে পারে। সামান বা পুরোহিতরা অশুভ আত্মার কাছে মিনতি করত প্রার্থনা করত। প্রয়োজনে হুমকি দিত, অপমান করত, এমনকি চিৎকার করে ধমক দিত। কখনও মানুষটিকে জোর করে তেতো পানীয় খেতে বাধ্য করত। এসবে কাজ না হলে শেষ পর্যন্ত নির্মমভাবে চাবুক মারত, এমনকি না-খাইয়ে রাখত।
এবার প্রস্তর যুগ থেকে মানুষ ধীরে ধীরে ইতিহাসের পথে পা দিল। গ্রিক সভ্যতার সোনার চাঁদ উঠল অন্ধকার আকাশে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে পিথাগোরাস মনোরোগের মূল কারণ মস্তিষ্ক বিকৃতি বলে নির্দেশ করলেন। পিথাগোরাসের ধারণায় প্রভাবিত হয়েছিলেন হিপোক্রিটাস (৪৬০ থেকে ৩৫৭ খ্রিস্টপূর্ব)। বলতে পারি চিকিৎসাকে চিকিৎসা বিজ্ঞান করে তোলেন এই হিপোক্রিটাস। তাঁর রোগ চেনার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। কী শরীর কী মন সব রোগকেই তিনি যুক্তি ও বিচারের কষ্টিপাথরে ঘষে ঘষে পরখ করতেন। কোনও আজগুবি মন্ত্র-তন্ত্র বামাচারী ক্রিয়াকলাপে তাঁর বিন্দুমাত্র আস্থা ছিল না। তিনি-ই প্লেতোকে বুঝিয়েছিলেন, ‘রোগ চেনার জন্য চাই রোগীর প্রকৃতির পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ। শরীরের ক্ষতস্থানটিকে দেখছেন ভালো কথা, কিন্তু তার আগে রোগীর শরীরটিকে ঠিক ঠিক দেখা চাই।’ মনোরোগীকে তিনি ‘ওষুধ’ দিতেন একটাই, তা হল সুপরামর্শ। মনোরোগ চিকিৎসার ইতিহাস শুরু হল এই সময়ে। সবাই অন্তত টের পেল দত্যি-দনোর এখানে কোনও হাত নেই। মস্তিষ্কের বিকৃতি যে মনোরোগের মূল কারণ, তিনি এ ধারণার উপর বিশেষভাবে জোর দেন। দুঃখের বিষয় শারীরসংস্থান (anatomy) সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান ছিল না বলেই হয়তো মনোরোগগুলির ব্যাখ্যায় মানুষের দেহের চার প্রকার রসের বিকৃতি ও সামঞ্জস্যহীনতার কথা তিনি বলেছিলেন। তিনি বললেন মৃগীর সঙ্গে পবিত্রতা বা দৈবানুগ্রহের কোনও সম্পর্ক নেই। একটা ভুল ধারণার অবসান হল। তিনি স্পষ্ট করে বললেন মৃগী মস্তিষ্কের রোগ। মনোরোগগুলিকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করলেন — ১) ম্যানিয়া বা খেদোন্মত্ততা, ২) মেলানকুলিয়া বা বিষণ্ণতা ও ৩) ফ্রেনাইটিস (Phrenitis) বা মনের জ্বালা ও প্রদাহ। তবে হিপোক্রিটাস একটি ভুল ধারণার সৃষ্টি করলেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন, হিস্টিরিয়া কেবল মেয়েদেরই হয়। আর এই রোগে মেয়েদের জরায়ু স্থানচ্যুত হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। এই রোগে চিকিৎসা হল তাড়াতাড়ি মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা যাতে রোগী শীঘ্রই সন্তানসম্ভবা হতে পারে। মনোরোগ চিকিৎসায় তিনি ওঝা বৈদ্যের চেয়ে ব্যায়ামের ওপর জোর দেন। এর কারণ ছিল রোগী যাতে মনের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারে।
এবার প্লেতোর কথায় আসি। তিনি মনে করতেন মনোরোগের কারণ কিছুটা দৈবিক, কিছুটা নৈতিক আর কিছুটা শারীরিক। তিনি মনোরোগীদের প্রতি ন্যায় বিচার ও মানবিক আচরণের উপর বিশেষ জোর দেন। প্লেতোর ছাত্র অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্ব) মনে করতেন মনের চাপা ভাবাবেগকে বাইরে টেনে বার করে মনের চাপ কমানো যায়।
গ্রিক যুগে এই সময় মনোরোগ বিষয়ে একটা বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে শুরু করে। চিকিৎসার ব্যাপারে তাঁরা চোখের সামনে যা দেখতেন তা অত্যন্ত ভালোভাবে লক্ষ করতেন। যেমন জন্ডিসের ক্ষেত্রে রক্তের মতো লাল চোখ বা হলদে চোখ। গ্রিসের কথা বলতে গিয়ে বলতে হয় হিপোক্রিটাসের সময় চিকিৎসকদের সামাজিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না।পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে সমস্যা সমাধানের চেয়ে সমস্যা বৃদ্ধিতেই তাদের ভূমিকা বেশি ছিল। জনগণের ধারণা পরিবর্তনের মূল ভূমিকা রেখেছিল ‘হিপোক্রিটাসের স্বাস্থ্যসেবার আচরণবিধি’। যাকে সামনে রেখে সারা বিশ্ব জুড়ে মেডিকেল ছাত্ররা আজও তাদের পেশাগত শপথ নিয়ে থাকেন। যদিও মূলের সঙ্গে বর্তমানের শপথের কিছুটা অমিল আছে। সে থাক। এই শপথ শেষ পর্যন্ত সহানুভূতিশীলতার উপর জোর দিয়ে থাকে, যাতে রোগী ও চিকিৎসক উভয়েরই মঙ্গল হয়।
প্রাচীন রোম
মনোরোগ বিষয়ে রোমের বিশেষ অবদান হল মনোরোগীদের জন্য বিশিষ্ট আইনের ও রক্ষাকবচের সৃষ্টি ও বিশেষ ব্যবস্থা। সিসেরো, অ্যাসক্লেপিয়াডেস, লুক্রেসিয়াস, আরেটাস, হেলপার ও গ্যালেন মনোরোগ বিষয়ে বিশিষ্ট অবদান রেখে গেছেন। গ্রিকদের কাছ থেকে রোমানরা যে বিষয়গুলো গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যে চারটি রস-এর তত্ত্ব ছিল। এই তত্ত্ব সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে জনপ্রিয় ছিল। সিসেরো মনে করতেন মনের অতিরিক্ত আনন্দোচ্ছ্বাস, অশান্তি ও কামোত্তেজনাই মনোরোগের কারণ।অ্যাসক্লেপিয়াডেস চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনেকটা উদারপন্থী ছিলেন। রোগীর চিকিৎসায় ইনি উপযুক্ত খাদ্য, মদ, শারীরিক চিকিৎসা, মনশ্চিকিৎসা, খেলাধুলা, গান— এসবের ব্যবস্থা করেন। সেলসাস বিশ্বাস করতেন মনশ্চিকিৎসায় রোগী এবং চিকিৎসকের মধ্যে এক বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটাতেই তিনি বিশেষ জোর দেন। এই দিক থেকে তিনি মনঃসমীক্ষার rapport ধারণার পূর্বগামী বটে।শব্দানুষঙ্গকে (wod association) কাজে লাগিয়ে রোগীর মানসিক অবস্থা সমীক্ষার কথা বলেন। এ বিষয়ে তিনি য়ুঙের (Jung-এর) পূর্বগামী। এখন যাঁর কথা বলব, তিনি দ্বিতীয় শতাব্দীর মানুষ ছিলেন। ইনি হলেন গ্যালেন (১৩০-২০০ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি রেনেসাঁর সময় পর্যন্ত পাশ্চাত্য এবং ইসলাম চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছিলেন। প্রাচীন রোমের মল্লযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতে গিয়ে তাঁর বেশ কিছু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়। মানসিক অভিঘাত (trauma) ও চিকিৎসার ফলাফল সম্বন্ধে তিনি অবহিত হন। মেডিক্যাল টেক্সটগুলির একটির ভূমিকাতে তিনি আলোচনা করলেন স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতা সম্বন্ধে। তিনি জীবদ্দশায় বিজ্ঞান, মেডিসিন, দর্শন বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন (সংখ্যাটা কম নয় ৫০০ থেকে ৬০০)। তিনিই প্রধানত অভিজ্ঞতাবাদের প্রাণপুরুষ ছিলেন। তাই তথ্য আহরণে তিনি সরাসরি পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব দেন। ‘On Medical Experience’ গ্রন্থে তিনি বলেন ‘I am a man who attends only to what can perceived by the senses…।’ বিভিন্ন দুর্ঘটনা, মানসিক অভিঘাতের চিকিৎসার সুযোগ ও বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর শারীরসংস্থান থেকে গ্যালেন অত্যন্ত যত্নের সাথে মানুষের মস্তিষ্কের বর্ণনা করেন। তারপর দৃষ্টি, গন্ধ— আরও বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত মস্তিষ্ক স্নায়ুর (cranial nerve) বর্ণনা দিলেন। Fight or Flight যে সংবেদী স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত তা anatomy চর্চা থেকে জানা গেল। পরবর্তী দেড় হাজার ধরে গ্যালেনের কাজ মেডিসিনের বিশ্বকোশ হিসাবে কাজ করেছিল।
প্রাচীন চিন দেশ
প্রাচীন চিন বিশ্বাস করত অপদেবতায় ‘ভর’ করলেই মানুষের মনোরোগ হয়। প্রথমে মনোরোগীদের চিকিৎসা করত ওঝা জাতীয় একদল লোক। পরে এদের চিকিৎসার ভার পড়ে পুরোহিত শ্রেণির ওপর। এরা একাধারে পুরোহিত, চিকিৎসক, জাদুকর ও মনোবিশেষজ্ঞ। এদের কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে মনোরোগ সম্বন্ধে সম্যক ধ্যান ধারণা গড়ে ওঠে।
মধ্যযুগে মনোরোগ চিকিৎসার ইতিহাস
গ্যালেনের মৃত্যুর কিছু পরে বর্বর জাতির আক্রমণে রোমক ও গ্রিসীয় সভ্যতা ধ্বংস হতে থাকে। অলৌকিকতায় বিশ্বাস, অতিপ্রাকৃতিক ধারণা ও নানা প্রকারের কুসংস্কার ও দৈব প্রভৃতির প্রভাব যৌক্তিকতাকে ও বৈজ্ঞানিক ভাবধারাকে ম্লান করে দেয়। মধ্যযুগের অবসান কালে ধীরে ধীরে রোগ বিশেষত মানসিক রোগীকে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা শুরু হয়। এখানে devil তথা দানোই ভূমিকা গ্রহণ করে। এই সময় মনোরোগীদের তত্ত্বাবধান ও চিকিৎসার ভার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মযাজকদের ওপর ন্যস্ত হয়। রোগীদের তাঁদের ব্যবস্থা মতোই চলতে হত। এনারা রোগীদের ঘাড় থেকে অপদেবতাকে নামাবার জন্য ঘণ্টা, মোমবাতির আলো ও বাইবেলের (bell, candle & the book) ব্যবহার করতেন। রোগীদের বিশেষ বিশেষ সন্তদের নামাঙ্কিত কূপের জলে স্নানের ও পানের ব্যবস্থা করা হত। এইসব কূপের মধ্যে স্কটল্যান্ডের সেন্ট ফিলান্স কূপ, ওয়েলসের সেন্ট উইন ফ্রেড কূপ এবং আয়ারল্যান্ডের গ্লেন-না-সল্ট (glan-na-salt) প্রসিদ্ধ। এখনকার দিনে অনেকেই মনে করে এ সকল কূপের জলে সম্ভবত লিথিয়াম (Lithium salt) থাকায়ই রোগীদের মনের অসুখ কমে যেত।
মধ্যযুগে ১৪৮০-তে এক জার্মান পুরোহিত Malcus Maleficarum (The Hammer of the Witches) নামে একটি বই লেখেন এবং ও পোপ বইটিকে অনুমোদন করেন। তারপর একের পর এক সংস্করণ প্রকাশিত হতে থাকে। দ্রুত এটি অনুসন্ধানের হ্যান্ডবুকে পরিণত হয়। এতে ডাইনিদের কথা বিভিন্নভাবে বলা হল — কীভাবে তারা হাওয়ায় উড়ে বেড়ায় ইত্যাদি। এর সাথে বলা হল তাদের মোলাকাত না-করলে কীভাবে তারা মানুষকে নিপীড়ন, নির্যাতন করে। নির্যাতনের দু-একটা রূপ বলছি। শুনে নিজেকে ঠিক রাখা কঠিন। কখনো ডাইনিদের কিছুর সাথে বেঁধে ঠাণ্ডা জলে চুবিয়ে দেওয়া হত। যদি ভেসে উঠত তবে ভাবা হত তাদের দেহে ডাইনি ভর করেছে। এদের হয় পুড়িয়ে মারা হত নয়তো ঝুলিয়ে দেওয়া হত। আবার যদি তারা ডুবে যেত বা তলিয়ে যেত তবে তাদের নির্দোষ ভাবা হত। ডাইনিদের জেরা করার সময় কখনো একা রাখা হত না, এমনকি তাদের পোশাকও দেওয়া হত না — যতক্ষণ না তারা দেখা দেয় অথবা পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে পরে। যদিও লেখকরা মনোরোগবিদ্যার কিছুই বুঝতেন না। তবু তাঁরা বাইপোলার ডিসঅর্ডার, অবসাদ, বাতুলতা, অমূল প্রত্যক্ষের সবিস্তার বর্ণনা করেছেন।
মধ্যযুগের শেষ পর্বে মাস হিস্টোরিয়া বা গণ-উন্মত্ততার কিছু ঘটনা দেখা যায়। ছোঁয়াচে রোগের মতো এই উন্মত্ততায় বহু লোক আক্রান্ত হত। এরা সবাই মিলে নাচ গান চেঁচামেচি হইহুল্লোড় করত, অনেকের ভিতর আবার এই সময় খিঁচুনি (Convulsion) দেখা দিত। সাধারণভাবে গ্রীষ্মকালে রৌদ্রদগ্ধ দিনেই এর বেশি প্রকোপ দেখা যেত। এই উন্মাদনা প্রথমে ইতালিতে আরম্ভ হয়, পরে ফ্রান্স ও জার্মানিতে এবং ইউরোপের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। উন্মাদনা আরম্ভ হওয়ার আগে এরা সবাই বিচিত্র পোশাকে নিজেদের সাজিয়ে নিত এবং যথেষ্ট পরিমাণে মদও চলত। সাধারণভাবে এ রোগ মঠবাসী সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনী সম্প্রদায়কেই বিশেষভাবে আক্রমণ করত। আজকের দিনের মনোবিদরা মনে করেন যে এই গণ-পাগলামির মূলে ছিল হয়তো দীর্ঘদিনের যৌন অবদমন এবং আগ্রাসী মনোবৃত্তির অবদমন।
মধ্যযুগের পাগলদের রক্ষণাবেক্ষণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা
তখনকার দিনে পাগলদের নিয়ে যা-কিছু করা হত তার সবই আমাদের মনে হবে নিষ্ঠুর, মমতাশূন্য। দু-একটি উল্লেখ করলেই একটা চিত্র পাওয়া যাবে। লোকালয় থেকে অনেক দূরে এমন বাড়িতে তাদের রাখা হত যেখানে আলো বাতাস বা সূর্যের রশ্মি মোটেই ঢোকে না।গারদটির চারদিক দেওয়াল দিয়ে সম্পূর্ণ ভাবে ঘেরা, কেবল মাঝখানে একটি ফোকর থাকত। ওই ফোকর দিয়েই রোগীকে খাবার দেওয়া হত ও সবসময় চোখে চোখে রাখা হত। রোগীরা থাকত নগ্ন বা অর্ধনগ্ন এবং তাদের লোহার শিকল দিয়ে মেঝের সঙ্গে আটকে রাখা হত। এরা অভুক্ত বা অর্ধভুক্ত অবস্থায় নিজেদের বমি পায়খানা ও প্রস্রাবে একাকার হয়ে থাকত। এদের ভেতর অনেকেই এই পশুর চেয়েও হীন জীবন থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সুবিধা পেলেই আত্মহত্যা করত। অনেকে আবার দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে প্রাণ হারাত। আর-একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। দুরন্ত ও দুর্মদ রোগীদের সম্পূর্ণ আয়ত্তে আনার জন্য বিচিত্র ও বিভিন্ন ব্যবস্থা করা হত, যেমন ঘুরন্ত চেয়ার বা ঘুরন্ত বিছানায় (whirling chair or bed) রেখে তাকে খুব জোরে ঘুরিয়ে দেওয়া হত। এতে রোগীর বমি পায়খানা হয়ে যেত, তার চোখ ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসত। রোগী অবসাদগ্রস্ত ও সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে পড়ত। কখনো কখনো আবার ২০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু স্থান থেকে রোগীর মাথায় গায়ে অতি ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হত। মোটামুটিভাবে মনোরোগী গারদে ঢুকলে সে বেরোত একবারই, কফিনে। ১৮ শতকে মনোরোগীদের প্রকাশ্যেই অপরাধী ঘোষণা করা হল। তারপর আর দেখে কে! সুযোগ পেলেই মানুষ মনোরোগীদের মেরে ফেলত। পাগলা কুকুর ও ‘পাগল’ মানুষ তখন সমগোত্রীয়।মানুষের সামান্য মর্যাদাও তখন ওরা পায়নি। ‘চিকিৎসার ইতিহাস’ বইটিতে গ্যারিসন সে সময়কার এক দৃশ্য গড়েছেন —
…Bad was the management of hospitals, the treatment of the insane was even worse. They were either chained or caged when housed, or if harmless, were allowed to run at large, the Tomo Bedlams of England or the wizard and warlocks of Scotland. The earliest insane asylum in the northern countries were Bedlam (1547), the quaker or country Asylum near York (1792) and the Narrenthurm or ‘Lunatics Tower'(1784) one of the showplaces of ad vienna, where, as in ancient Bedlam, the public were allowed to view the insane, like animals in menagerie, on payment of a small fee….
ঐতিহাসিক তথ্যগুলি থেকে আমরা ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি হই। পাগলকে শেকল দিয়ে বেঁধে বেঁধে রাখা হত। আবার কখনো বা প্রখর রৌদ্রে দৌড় করানো হত। কখনো আবার তন্ত্র-মন্ত্র-সিদ্ধাই-ঝাঁটা পেটা-আড়ং ধোলাই। আঠারো শতকের আশির দশকে ভিয়েনায় মজার এক ‘শো-রুম’ তৈরি হল। শো-রুমের শোপিস্-গুলো দেখতে দেশ-বিদেশের ‘দর্শনার্থী’ ভেঙে পড়েছে। জীবন্ত শো-পিস্ যারা মানুষের চেহারায় মানুষের মতো হাসে, কাঁদে, আবার রাগও করে। না-না-জানোয়ারও নয়, ’জনোয়ার’। ‘জন’-টির নাম আগামার্কা খাঁটি পাগল।লুনাটিক টাওয়ারগুলো সারি সারি দাঁড়ানো, ওই টাওয়ারগুলোয় ‘জনোয়ারেরা’ দিব্যি শেকল পরে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে, ভাষাহারা চোখ মিনতি ভরা।
মজারু জনতা পয়সা ফেলে টিকিট কেটে ‘জনোয়ার’ দেখে, ‘জনোয়ার’ ওরফে স্পেশাল জানোয়ারদের ভাবসাব দেখে হেসে অস্থির হয়। কেউ থুতু ছেটায়, ঢিল মারে, গর্তে কাঠি দেয়। হ্যাঁ গো জানোয়ার… দর্শনীয় জানোয়ার কারা, ওরা, না এরা?
— আঠারো শতকের (১৭৯৪) ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে এক মহামতি চিকিৎসাক ডক্টর উইলিয়াম টিউক জোর গলায় চিৎকার করেছেন।
রেনেসাঁ থেকে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দ আধুনিক বিজ্ঞানের আবির্ভাব
গ্যালেন ও রেনেসাঁ মধ্যবর্তী সময়ে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও মেডিসিন উন্নতি প্রায় স্রোতহীন হয়ে পড়ে। নতুন কোনও জ্ঞান প্রায় সংযোজিতই হয়নি। এই সময় একটা প্রধান সমস্যা ছিল যে, চার্চের কর্তৃত্বের সংগঠনই ঠিক করত কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা। এই কর্তৃত্বই সত্য মূল্যায়নের অধিকারী ছিল। তাই অন্য কোনও যুক্তির কোনও স্থান ছিল না। যেমন ধরুন চার্চ বলতে পারত এই বিশ্বের কেন্দ্রে পৃথিবী রয়েছে — আর সেটা যেমন বলত সেটা তেমনি মানতে হত।
চতুর্দশ শতাব্দীতে একটি নতুন উদ্দীপনা ইউরোপে আবির্ভূত হল। সাহিত্য রাজনীতি বিজ্ঞান সবকিছুকে এই উদ্দীপনা প্রভাবিত করল। শিল্পের ক্ষেত্রে এক ধরনের বাস্তববোধের আবির্ভাব হল। এর ফলে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো শিল্পীরা গভীর দরদ দিয়ে শরীর অনুসন্ধান করতে শুরু করলেন। তিনি বিভিন্ন প্রাণী ও মৃত মানুষের ব্যবচ্ছেদ করলেন। শিল্পজ্ঞানের ভিত্তিতে অভিনব ও সৃজনশীল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। ১৫০০-র প্রথমদিকে তিনি মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকেলের গঠন জানতে আগ্রহী হলেন। একটি ষাঁড়কে এইমাত্র হত্যা করা হয়েছে এমন অবস্থায় গরম মোম ঢেলে দিলেন মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকেলে। আর একটি চ্যানেল দিয়ে সেলিব্রোস্পাইনাল বেরিয়ে যেতে দেওয়া হল। এবার মোমকে শক্ত হতে দেওয়া হল। তারপর মোমের ওপর থেকে আস্তে আস্তে কর্টিক্যাল অংশটি বাদ দেওয়া হল। মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকেলের গঠন বেরিয়ে এল। আজ আমরা মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকেল সম্বন্ধে যেমনটা জানি, দা ভিঞ্চির আঁকায় একেবারে সেরকমটাই পাওয়া গেল। আজ আমরা জেনেছি ‘স্বাভাবিক’ মানুষের ভেন্ট্রিকেল ও সিজোফ্রেনিয়া ও অন্যান্য বিশেষ কিছু মনোবিকারে ভেন্ট্রিকেলের গঠন কেমন পরিবর্তিত হয়। এবার ১৬০০-র দিকে বিজ্ঞানীদের মধ্যে গঠনের সাথে কাজের দিকটিও গুরুত্ব পেতে শুরু করল। স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে ঐচ্ছিক ও অনৈচ্ছিক ক্রিয়ায় ভূমিকা গ্রহণ করে তার প্রতিও বিজ্ঞানীদের মন নিবিষ্ট হল। কী করে স্মৃতি অনুভূতি ও চিন্তনের ক্ষেত্রে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া (physiological process) কাজ করে, তার মূল্য বিবেচ্য হয়ে উঠল।১৬২৮-এ William Harvey শরীরের মধ্যে দিয়ে রক্ত সংবহন বর্ণনা করতে গিয়ে যান্ত্রিক মডেলের গুরুত্বকে সামনে আনলেন। ফরাসি দার্শনিক রেনে ডেকার্তে (১৫৯৬-১৬৫০)-ও এই যান্ত্রিক মডেলের প্রতি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। উপমার (analogy) মাধ্যমে তিনি অনুমান করলেন জীবের প্রতিবর্ত (reflex) ও অনৈচ্ছিক ক্রিয়াও এই যান্ত্রিক নিয়মেই চলে। যেমন গরম স্ট্রোভে হাত লাগায় হাত সরিয়ে নেওয়া হয়, খাদ্যের পরিপাকও ওই একই রকম যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। তিনি আরও বললেন মানুষের যেমন অনৈচ্ছিক ক্রিয়াকে যান্ত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তেমনি প্রাণীর আচরণকেও ওই যান্ত্রিক ক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। এসবের মধ্যে দিয়ে ডেকার্ত মানুষের ক্ষেত্রে দেহ ও মন — এই দ্বৈত স্বত্তার ধারণায় পৌঁছালেন। আজও বিজ্ঞানকে এই দ্বৈত অবস্থার ব্যাখ্যার মুখোমুখি হতে হয়। ডেকার্তে এই সমস্যার উত্তর দিতে গিয়ে মস্তিষ্কে পিনিয়াল গ্লান্ডকে দেহমন ক্রিয়া-নিয়ন্ত্রণের সংযোগস্থল বলে অভিহিত করলেন। দেহ মনের প্রক্রিয়াকে ডেকার্ত পদার্থবিজ্ঞানের নিরিখে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেন। আজ অধিকাংশ স্নায়ুবিজ্ঞানী মনকে মস্তিষ্কের সাধক বলে মনে করেন এবং দেহমন সমস্যা সমাধান অযোগ্য বলে বিবেচনা করেন। ১৬০০-র সময়কালে পৃথিবীকে জানা বোঝার উপায় হিসেবে বিজ্ঞান আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করল। প্রথম দিকে চার্চের কর্তৃত্বই বিশ্ববীক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করত। গ্যালিলিও এগিয়ে এলেন। তিনি এই কর্তৃত্বের জায়গায় পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেন। টেলিস্কোপ, থার্মোমিটার, উন্নত অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল বৈজ্ঞানিক ভাবনা। এই প্রতিটি যন্ত্র প্রকৃতি বিষয়ে মানুষের জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে শুরু করল। পতনশীল বস্তুর বিষয়ে গ্যালিলিও সাফল্যের সাথে অ্যারিস্টটলের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করলেন। বিজ্ঞান চেতনায় বিপ্লবী প্রাণপুরুষের আবির্ভাব হল। এই বিজ্ঞান চেতনার পথে ইংরেজ চিকিৎসক থমাস উইলিস (Thomas Willls)-এর আগমন। তিনি গঠন ও কার্যের মধ্যে সমন্বয় সাধনের উদ্যোগ নিলেন। পশ্চাদ্-মস্তিষ্ক বা lower brain structure জীবের প্রাথমিক ক্রিয়া-কলাপের সাথে যুক্ত এবং বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে এই গঠনটি দেখা যায়। আবার যেসব সংগঠন মস্তিষ্কের অগ্রবর্তী বা উচ্চতর অংশে রয়েছে তারা উন্নত প্রাণীতে উন্নত ক্রিয়া-কলাপের সঙ্গে যুক্ত। নোবেল জয়ী ব্রিটিশ শরীরতত্ত্ববিদ্ Sir Charles Sherrington স্নায়ুতন্ত্রের anatomy ও physiology-তে Willis-এর অবদান স্বীকার করেছেন। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে স্নায়ুতন্ত্র সম্বন্ধে অনেকটা বিশদ জানা হয়ে গেছে। জানা হয়েছে মস্তিষ্কের ধূসর বস্তু (gray matter ) ও শ্বেত বস্তুর (white matter) কথা। শ্বেত বস্তু ও ধূসর বস্তু উভয়ের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের কাজ করে শ্বেত বস্তু। আজ আমরা জেনেছি ফ্যাট ও প্রোটিন দিয়ে তৈরি মায়োলিন সিদ্ কীভাবে ইলেকট্রিক কেবলের অন্তরকের মতো কাজ করে অ্যাক্সনের মধ্যে দিয়ে তথ্যের দ্রুত সম্প্রচার ঘটাতে পারে। এ-সময়ে স্নায়ুবিদ্যার সাথে সাথে মনোরোগ বিদ্যা একটা বৈজ্ঞানিক শক্ত ভিত্তি পেয়ে গেল।
১৭০০ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ
এতদিন মোটামুটি What চলছিল এবার প্রাধান্য পেল How। মানে কীভাবে এই স্নায়ুতন্ত্রের আবির্ভাব হল আর কীভাবেই তা কাজ করে। ১৮০০-র প্রথমদিকে আবিষ্কার হল পেশিতে তথ্য পাঠানোর এক বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে পেশির সঞ্চালন ঘটে এবং সংবেদনকে মস্তিষ্কে বয়ে নিয়ে আসার জন্য ভিন্ন আর-এক ব্যবস্থা রয়েছে। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের সময়কালে জানা গেল সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল সুনির্দিষ্ট রয়েছে। এ-প্রসঙ্গে Joseph Gall-এর কথা একটু বলা যাক। তিনি জানালেন উচ্চতর সংজ্ঞানাত্মক ক্রিয়াকলাপ (cognitive process) এবং সামাজিক নিরূপণের সাথে (social detemination) মস্তিষ্কের ললাট খণ্ড সংযুক্ত। তিনি আরও বললেন করোটি বা মাথার খুলির আকৃতির সাথে কোনোভাবে মস্তিষ্কের ক্রিয়া সম্পর্কিত। কাউকে কোনও নির্দিষ্ট কাজে পারদর্শী দেখলে তার মনে হত অন্য মানুষের মাথার খুলি থেকে তারটা ভিন্ন রকমের হবে। এই ব্যাপারটা Gall একটু ভুল করে ফেললেন। বিজ্ঞান এভাবে ভুল সংশোধনের মাধ্যমে এগিয়ে যায়। যখনই তা অকাট্য হয়ে যাবে তখন তার অগ্রগতি থেমে যাবে। ভাষা বোধ ও ভাষা সৃষ্টির ক্ষমতা থেকে Paul Broca এবং Carl Wernicke দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করে ফেললেন। ১৮৬১-তে Broca-র কাছে এক রোগী আসেন। যে রোগী এলেন, সে কথা বুঝতে পারলেও বলতে পারে না এরকম এক গুরুতর সমস্যা নিয়ে। কিছুদিনের মধ্যেই রোগীটি মারা গেলেন। Broca-র কাছে ময়নাতদন্তের সুযোগ চলে এলে তিনি দেখলেন ললাট খণ্ডের বাম পাশে এক জায়গায় একটা অস্বাভাবিকতা আছে। বিভিন্ন কারণ এর উপর ভিত্তি করে Broca দেখাতে সমর্থ হলেন ভাষা মস্তিষ্কের বামগোলার্ধের এক বিশেষ অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধের ললাট খণ্ডে ক্ষতের কারণে বিচারবোধ, বিমূর্তভাবে কোনও কিছু বোঝার ক্ষমতার মতো উচ্চতর কার্যনির্বাহক কাজে সমস্যা হয়। আজ ভাষা সৃষ্টির সম্পর্কিত ওই এলাকাকে আমরা Broca’s area বলি। Broca-র ১৫ বছর পর Wernick দেখাতে সমর্থ হলেন ভাষাবোধের সঙ্গে মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধে পার্শ্ব খণ্ড (left temporal lobe) সম্পর্কিত। তিনি যে সমস্ত রোগীদের নিয়ে কাজ করেছিলেন তারা যেটা শুনতে পায় কিন্তু বুঝতে পারে না। ১৮৭৪-এর কথা। এর কুড়ি বছর পর Hughlings Jackson দেখালেন শৈশবের পরবর্তীতে যদি cortical damage সৃষ্টি হয় তবে Babinski reflex ফিরে আসতে পারে। এ রকম অনেক অনেক উন্নতি সত্ত্বেও রোগীদের প্রতি অর্থাৎ মানসিক রোগীদের প্রতি মানুষের মানবিকতা তেমন দেখা গেল না।
পিনেলের এই বিপ্লব মনোবিদ্যার ভূমিকা বলে দিল নতুন করে। এর ঠিক পরেই ইয়র্কশায়ারে (ইংল্যান্ড) সেই মহান চিকিৎসক উইলিয়াম টিউক আরও এক ধাপ এগিয়ে ইয়র্কশায়ারের মানসিক স্বাস্থ্যসদনের সদর দরজা হাট করে খুলে দিলেন। পাগলরাই অবাক, সাধারণ মানুষরা তো হবেই। পাগলদের খোলা জায়গায় ঘোরাফেরার সুযোগ করে দিলেন।
উনিশ শতকে পিনেল ও টিউকের ‘পথ’ ধরে নতুন এক সুবাতাস নিয়ে এলেন জ্যাঁ একুঁন (Jean Equinol)। একুঁন-ও ফরাসি চিকিৎসক (১৭৭২-১৮৪০)। পাগল নিয়ে ‘পাগলামির’ প্রবণতাও ধীরে ধীরে কমল সাধারণ মানুষের মধ্যে। ঠিক তার কিছু পরেই ইংল্যান্ডের এক চিকিৎসক জন কনোলি (১৭৯৮-১৮৬০)-ও পাগলকে পাগল না-বলার স্বভাব গড়ে তুললেন জনগণমনে। মনোরোগের কোন কোন দশায় এই অস্বাভাবিকতা আসে তাও ব্যাখ্যা করলেন।
ধীরে ধীরে ইউরোপের আকাশ বাতাসটাই বদলে গেল। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দুই মনোবিদ চিকিৎসক টমাস কার্কব্রাইড (১৮০৯-৯৩) ও ডরোথা লিন্ড-ডিক্স (১৮০২-১৮৮৭) মনোরোগের নানা দিক নিয়ে বহু গবেষণা করে নতুন যুগ নিয়ে এলেন। উনিশ শতকের ষাটের দশকে ইংল্যান্ডের আর-এক মানুষের মতো মানুষ লর্ড শাক্টেসবুরি কুখ্যাত কারাগার ‘ব্রডমুর প্রিজন’- এ ঢুকে প্রকৃত অপরাধী ও মনোরোগক্লিষ্ট ‘অপরাধী-দের পৃথক পৃথক সেলে তুলে দিলেন। আসলে মনোরোগীদের সঙ্গে মানুষের মতো ব্যবহার করলে, তার প্রতি মমতা দেখাতে পারলে তার কষ্টের অনেকটা উপশম হবে। এটা হলফ করে বলা যায়। পিনের, টিউক প্রমুখ এসেছিলেন বলেই পাগলাগারদ গুলি ধীরে ধীরে মানসিক স্বাস্থ্য নিকেতনে রূপান্তরিত হয়েছে। মনোরোগীও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ছাড়পত্র পেয়েছে। উনিশ শতকেও কিছু কিছু জায়গার পাগলা গারদ ছিল তখনও ‘আদিকারের অন্ধকার’চেহারাতেই। এই সময়ের একটা চিত্র —
… Special basket contraptions were invented ….in which the patient was encased from his neck to his thighs, this bizarre means kept his arms attached to his sides but did not prevent him from walking around. Wooden boxes were also devised for inmates who threatened suicide. They were five and a half feet long, two feet wide and eighteen inches deep and the insides were padded with straw. The madman was placed inside this contraption and was kept in places by means of the lid which was shut upon him in such a way that only his head, which he was unable to withdraw into the box, continued to stick out.
পিনেলের নাম টিউকের নাম শুনেছেন হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন। ফ্রয়ডের নাম শোনেননি এমন লোক কদাচিৎ মিলবে। ১৮৫৬ থেকে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ — একটা লম্বা সময়। ব্রিয়ারের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। সম্মোহন, মনোসমীক্ষণ সত্যি যুগান্তকারী অবদান। তবে ইতিহাসটা আজ অবধি ক্ষমতাশীল গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে কূপমণ্ডূকতাবশত আজও স্নায়ু ও মনোবিজ্ঞানী হিসাবে পাভলভের ওপর ফ্রয়েডকে স্থান দেওয়া হয়। মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা তথৈবচ। লিথিয়াম প্রয়োগে ম্যানিক ডিপ্রেসিভ অবস্থা কাটিয়ে তোলা যায় — এই একটিমাত্র আবিষ্কার ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের সৌধটিকে নড়বড়ে করে দেয়। ওয়াটসন, স্কিনার, ওল্প-এর মতো মনস্তত্ত্ববিদ পাভলভের তত্ত্বকেই নানাভাবে ব্যাবহার করে CBT-কে জনপ্রিয় করে তোলেন। মনে রাখা প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সমকামীদের মনোরোগী হিসাবে চিহ্নিত করে সামাজিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হত। এবার কার ওপর ভরসা করব— WHO? সবাই বেনেদের কেনা গোলাম। WHO-র সাম্প্রতিক ভূমিকায় বৃহৎ কর্পোরেটদের হস্তক্ষেপ রয়েছে, এমনটা অনেকেই মনে করছেন। এই বিশ্বায়নের যুগে বাজার ও অর্থনীতি দুই-ই মানুষের মনকে সুচতুরভাবে প্রতিনিয়ত যেভাবে আক্রমণ ও জবরদখল করছে তা মনোরোগ ও আত্মহননের প্রবৃত্তি দুটিকেই বিপজ্জনক ভাবে বাড়িয়ে তুলছে। সব কথা ভেবে চিন্তে বলতে পারি, মানসিক রোগকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে তেমনি যে-কোনও বিশিষ্টতাও রোগ নয়। আবার সব অপরাধের পেছনে প্যাথলজি টেনে বার করারও দরকার নেই। প্রত্যেকে একটু একটু করে এগোলে আমরা হয়তো আরও কিছুটা ভালো থাকতে পারব। শেষের দিকেও শেষ করা যাচ্ছে না। কারণ বিশ্বে প্রতি চারজন অসুস্থ মানুষের মধ্যে একজন মনোরোগী। তাই বলছি মনোরোগ একটি জনস্বাস্থ্যের সমস্যা। সবাই মিলে এর মোকাবিলা করতে হবে।