অটিজম

অদিতি বন্দ্যোপাধ্যায়

(অনুলিখন : শুভাশিস ভট্টাচার্য)

চোদ্দো মাস বয়স অবধি শিশুটি ঠিকঠাক কথা বলছিল। হঠাৎ করে দেড় বছরের কাছাকাছি গিয়ে দেখা যাচ্ছে বাচ্চাটি আর কথা বলতে পারছে না বা কথা বলা কমে যাচ্ছে। সে নিজের জগতে থাকছে, নিজের মনে খেলে যাচ্ছে। অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলছে না। হয়তো একটা চাকা বা বাটি ঘুরিয়েই চলেছে বা ঘূর্ণায়মান কোনও বস্তু, পাখা, চরকি, পার্কের মেরি গো রাউন্ড ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে অকারণবশত এবং একটা অবসেসিভ ডিসঅর্ডারের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে, অকারণে চিৎকার করে উঠছে, কান্নাকাটি করছে বা আপনমনে খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে, কখনও বা ভয় ভাবনা ছাড়াই পথে চলন্ত গাড়ির সামনে চলে আসছে, কোনও কিছু না-ভেবে হয়তো আগুনে হাত দিয়ে দিচ্ছে, কারণে অকারণে অত্যন্ত বিরক্তি প্রকাশ করছে, এগিয়ে গিয়ে হয়তো কাউকে জড়িয়ে ধরছে, আবার হয়তো কাউকে ধাক্কা মারছে। অথচ তার এই ধরনের আচরণের কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 

কারণ হয়তো লুকিয়ে আছে একটি ছোট্ট শব্দবন্ধের মধ্যে — ‘অটিজম’ বা ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার’।

অটিজম একটি নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার(Neuro developmental disorder), অর্থাৎ স্নায়ুজনিত বিকাশ সম্বন্ধীয় ক্ষেত্রে একটি বিশৃঙ্খল বা গোলমেলে অবস্থা। আসলে ‘অটিজম’ একটি স্নায়ুগত রোগবৈশিষ্ট্য। তাই একে রোগ না-বলে একটা কন্ডিশন (Condition) বা অবস্থা বলাটাই উচিত। তবে এই কন্ডিশনের আওতায় বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন রকমের মানুষ অবস্থান করেন, যাঁদের সমস্যাগুলো মূলত স্নায়ুজনিত কারণে হয় এবং তা কখনও মানসিকভাবে বা কখনও শারীরিকভাবে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। এটা একটা বড়ো স্পেকট্রাম (Spectrum) অর্থাৎ এর বিস্তৃতি অনেকটা ছড়িয়ে থাকা এক বড়ো ছাতার মতো। যেহেতু এটি একটি অবস্থা যা আজীবন থেকে যায় (Lifelong Condition), রোগ নয়, তাই এর সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হয় না এবং অটিজম সংক্রান্ত চিকিৎসার কোনও নির্দিষ্ট ওষুধও নেই। অটিজমের বিভিন্ন উপসর্গের চিকিৎসার কারণে আলাদা আলাদা ওষুধ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। হয়তো কোনও বাচ্চার ঘুমের সমস্যা আছে, বা অতিসক্রিয় (Hyperactive), তখন সেগুলির জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়। তবে অতি দ্রুততার সাথে, সারা জীবনের জন্য, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সহায়তা প্রদান করা গেলে এরা কিন্তু বহুলাংশে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসতে পারে। 

সাধারণত একটি শিশুর জীবনের দ্বিতীয় বর্ষ, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, বারো/ চোদ্দো মাস বয়স থেকেই অটিজমের লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে থাকে, যে সমস্ত লক্ষণগুলির কথা বলা হয়েছে শুরুতেই। এটাও উল্লেখনীয় যে, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার শিশুদের মানসিক বিকাশজনিত এমন একটি সমস্যা যা শিশুকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন অতি সংগতভাবেই উঠে আসে — তবে কি এই ধরনের শিশুরা ভবিষ্যতে কোনোদিনই জীবনের মূল স্রোতে ফিরতে পারবে না? জবাবে বলতে হয়, না, বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। তবে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার এবং একজন অটিস্টিক শিশু বা মানুষকে বুঝতে গেলে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য আমাদের জানতেই হবে। 

আমাদের স্নায়ুতন্ত্র এবং পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে বুঝতে পারি এবং ইন্দ্রিয়লব্ধ সকল অনুভূতিকে মস্তিষ্কে বিশ্লেষণ (process) করে তার ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি, সাড়া দিয়ে থাকি এবং মনের ভাব প্রকাশ করি। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। কিন্তু আমরা সকলেই প্রায় একইরকমভাবে বাইরের পরিবেশকে বুঝি এবং সেইমতো সাড়া দিয়ে থাকি। অটিজম-এ এই বুঝতে পারা এবং সেই অনুযায়ী বা তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা বা সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ভাবে খানিক অন্যরকম হয়ে যায়। এটা কেন হয় বা কীভাবে হয়, বিজ্ঞান আজও সে উত্তর খুঁজে চলেছে। নানান তত্ত্ব (Theory), যুক্তিতর্ক (Hypothesis) খাড়া করলেও অটিজমের সংখ্যা তো কমেনি-ই বরং এই সংখ্যা উত্তরোত্তর ক্রমবর্ধমান। এই সময়ের পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমান বিশ্বে প্রতি আটচল্লিশ জন শিশুর মধ্যে একজনের অটিজম রয়েছে। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (Centre for Disease Control and Prevention ) সংক্ষেপে সিডিসি-র সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যানও অটিজমের ক্রমবর্ধমান অবস্থার চিত্রই তুলে ধরে। তবে এই পরিসংখ্যানগুলির সমস্তই আমরা পাই পাশ্চাত্যের দেশগুলি থেকে। আমাদের দেশ ভারতবর্ষে বা পশ্চিমবঙ্গে তেমন কোনও পরিসংখ্যান নেই। 

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার এই শব্দবন্ধে ‘স্পেকট্রাম’ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অটিজমের বিশালতা বোঝাতেই এই স্পেকট্রাম শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অবস্থার তারতম্য বিচার করে অটিজমকে মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় — ১) মৃদু বা মাইল্ড অটিজম (Mild Autism) ২) মডারেট অটিজম (Moderate Autism) এবং ৩) সিভিয়ার অটিজম (Severe Autism)।

যে সমস্ত শিশুর মাইল্ড অটিজম রয়েছে অর্থাৎ যাদের সমস্যা অন্যদের তুলনায় কম, তারা কথা বলতে পারে, স্কুলে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে প্রাপ্তবয়স্ক হলে বাইরে বেরিয়ে চাকরিও করতে সক্ষম হয়। মডারেট অটিজম-এর আওতায় থাকা শিশুদের পড়াশুনার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সহায়তা লাগে, নানাবিধ আনুষঙ্গিক তত্ত্বাবধানের (Supervision) মধ্যে থেকে এদের কাজ করতে হয়। তবে সিভিয়ারদের সমস্যা অত্যন্ত গভীর। উপরিউক্ত সমস্যাগুলোর সাথে এদের মানসিক প্রতিবন্ধকতা বহুলাংশে থাকে। মডারেট এবং সিভিয়ার এই দুই ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে, অনেকেই কিন্তু কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারছে না। এই কথা বলতে পারা বা না-পারার সঙ্গে কিন্তু মাইল্ড, মডারেট, সিভিয়ারের সম্পর্ক খুব ওতপ্রোত নয়। কারণ, অনেকেই কথা বলতে সক্ষম না হলেও তাঁর মনের ভাব লিখে, টাইপ করে বা আকারে ইঙ্গিতে প্রকাশ করতে পারে। এবার প্রশ্ন, একটি শিশুর অটিজম রয়েছে কি না, তা বোঝা যাবে কীভাবে? প্রধানত যে সমস্যাটা মুখ্য হয়ে ওঠে তা হল, শিশুটি কথা বলছে না। এর সঙ্গে যে লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে থাকে সেগুলি শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে।

আসলে এই এই সমস্তকিছু অসুবিধা সৃষ্টি হওয়ার কারণ অটিজম একটি সোস্যাল কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার (Social communication disorder) অর্থাৎ একজন কীভাবে অপর একজনের সাথে সামাজিকভাবে তাঁর সম্পর্ক নির্মাণ বা স্থাপন করবে, তা নির্ভর করে সেই ব্যক্তিবিশেষের কমিউনিকেশন স্কিল বা ভাবের আদানপ্রদানের দক্ষতার উপরে। আর এই বিশেষ জায়গাটাতেই অটিস্টিক শিশু বা মানুষটি অক্ষম হন। এই অক্ষমতা থেকে তাঁদের বের করে আনতে হলে, বিলম্ব না-করে যত দ্রুত সম্ভব এদের বিভিন্ন থেরাপি (Therapy) বা ইন্টারভেনশনের (Intervention) মধ্যে যুক্ত করতে হবে। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিশুর অটিজম রয়েছে কি না তার শনাক্তকরণ। কোনও শিশু অটিস্টিক কি না তা বুঝতে পারা খুব সহজসাধ্য নয়। অটিজমের লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে থাকে শিশুটি জীবনের দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করার প্রায় সাথে সাথেই। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা আগে তা বুঝতে পারলেও সব বাবা-মায়েদের পক্ষে বুঝতে পারা সম্ভব হয় না। তবে, এই শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে, যাঁদের একাধিক সন্তান রয়েছে, তাঁরা তাঁদের আগের সন্তানদের সাথে তুলনামূলক বিচারের ভিত্তিতে সহজেই বুঝতে পারেন যে, কথা বলতে পারা, হাঁটতে শেখা বা দৈনন্দিন আচরণে তাঁদের এই সন্তানটির কোথাও একটা সমস্যা থেকে যাচ্ছে। কিন্তু যাঁদের প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটে, তাঁদের পক্ষে অটিজম শনাক্তকরণে সমস্যা হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বয়স্ক ব্যক্তিরা বলে থাকেন— আস্তে আস্তে সব শিখবে, কথা বলবে, কোনও অসুবিধা নেই। সব ঠিক হয়ে যাবার অপেক্ষায় থেকে থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে অনর্থক বিলম্ব ঘটে যায়। একমাত্র অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই খুব সহজে অটিজম চিহ্নিত করতে সক্ষম হন, সকলে নন। তাই সন্তানের আচরণে বিন্দুমাত্র সন্দেহের উদ্রেক হওয়ামাত্রই স্থানীয় চিকিৎসক, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অথবা মনস্তত্ত্ববিদ বা মানসিক রোগের চিকিৎসক (Child Psychiatrist)-এর সাথে যোগাযোগ করা উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। যাঁরা গ্রামাঞ্চলে থাকেন, তাঁরা প্রয়োজনে নিকটবর্তী চিকিৎসাকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে পারেন। অটিজম শনাক্তকরণের গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমানে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদেরও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এই বিষয়ে তাঁদের পারদর্শী করে তুলতে। 

সাধারণের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, উচ্চশিক্ষিত বা over qualified পিতামাতার সন্তানের অটিস্টিক হওয়ার প্রবণতা বেশি। যদিও, এইরকম ধারণা করার পিছনে কোনও বিজ্ঞানসম্মত কারণ নেই। এই ভাবনা ভিত্তিহীন এবং এটি একটি কল্পিত ধারণা বা মিথ ছাড়া আর কিছুই নয়। উচ্চশিক্ষিত পিতামাতা হয়তো তাঁদের সন্তানের এই অস্বাভাবিকত্বকে অধিকাংশের তুলনায় দ্রুত চিহ্নিত করে সেইমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হন। 

শিশু অটিস্টিক কি না তা বুঝে ওঠাটাই যেখানে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, সেখানে মাইল্ড অটিজমে আক্রান্ত শিশুর সমস্যা নির্ণয়ের কাজটি আরও দুরূহ হয়ে পড়ে। অধিকন্তু, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনক হলেও, মা-বাবারা শিশুর সমস্যা রয়েছে বুঝতে পারার পরেও বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে একধরনের অনীহা প্রকাশ করেন। ফলত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে অযথা বিলম্ব হয়ে যায়, ব্যাহত হয় শিশুটির জীবনের মূলস্রোতে ফিরে আসার সম্ভাবনা। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতেই হয়, সব অটিস্টিক শিশুই কিন্তু মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (Mainstream school) যাবার উপযুক্ত হয় না, যারা মাইল্ড অটিজম বা বর্ডার লাইন বা Asperger’s syndrome- এর আওতায় পড়ে তারাই কিন্তু এই ধরনের শিক্ষায়তনে যাওয়ার যোগ্য। সেক্ষেত্রেও আবার অনেক পিতামাতা স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে শিশুর সমস্যার বিষয় লুকিয়ে রাখেন, গোপন করে যান পাছে শিশুটিকে মূলধারার শিক্ষালয়ে (Mainstream school) ভর্তি না-নেওয়া হয় এই আশঙ্কায়। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পক্ষে একদিনেই এই ধরনের শিশুর সমস্যার কথা বুঝে উঠতে পারা সম্ভব হয় না। পরবর্তীকালে যখন ওই শিশুর কিছু কিছু বিশেষ এবং অস্বাভাবিক আচরণে যখন তাঁরা অনুমান করতে পারেন বা বুঝতে সক্ষম হন যে, শিশুটির নিশ্চয়ই কোনও একটি সমস্যা রয়েছে, তখন তাঁরা শিশুটির সমস্যার বিষয়ে অভিভাবকদের সাথে কথা বলতে আগ্রহী হলে, দেখা যায়, সেখানেও সন্তানের সমস্যার কথা মেনে নিতে অস্বীকৃত হন অনেক মা-বাবাই। 

অটিজম শনাক্তকরণের প্রক্রিয়াটি কিন্তু বেশ বড়ো, যাকে বলা হয় সাইকোমেট্রিক ইভ্যালুয়েশন (Psychometric evaluation) এবং এটি চলতে চলতেই সমান্তরালভাবে তাঁকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় থেরাপির অন্তর্ভুক্তিকরণের প্রক্রিয়াও চালু রাখা বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনের ভিত্তিতে অটিস্টিক শিশুর জন্য থেরাপি বেছে নেওয়া হয় এবং তা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হয়। এই থেরাপি নানারকমের হতে পারে। যেমন— কথা বলা শেখানো এবং কথা বা স্পিচ্ বের করে আনার জন্য ‘স্পিচ্ থেরাপি’, আবার বিভিন্নরকম দৈনন্দিন এবং পারিপার্শ্বিক কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে তাঁকে শান্ত করতে, তাকে তার অসুবিধাগুলোর থেকে বের করে আনতে, সেগুলোকে সহজ করে দিতে ‘অকুপেশনাল থেরাপি’-র প্রয়োজন হতে পারে। যখন অটিস্টিক শিশু অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতো দৌড়তে, খেলতে বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা ইত্যাদি স্বাভাবিক কাজগুলি করতে অসমর্থ হচ্ছে, তখন ফিজিওথেরাপি জরুরি হয়ে পড়ে। একইসাথে আচরণগত পরিবর্তন বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ (Behavioural Modification Training) এবং Special Education বা বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা অপরিহার্য। পাশাপাশি কিছু শিল্প বা কলাভিত্তিক থেরাপি (Art based Therapy) যেমন, ‘মিউজিক থেরাপি’, ‘ডান্স মুভমেন্ট থেরাপি’, ‘স্পোর্টস থেরাপি’ ইত্যাদি যে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা নিতে সক্ষম তা আজ সর্বজনস্বীকৃত। আর যেহেতু এক্ষেত্রে থেরাপি যাদের উপর প্রযুক্ত হচ্ছে তারা সকলেই শিশু, তাই, তাদের অবস্থানে নিজেকে রেখে, তাদের মতো করে থেরাপি প্রয়োগ করাই কাঙ্ক্ষিত, যাতে সেই থেরাপি ওই শিশুর কাছে চিত্তাকর্ষক এবং উপভোগ্য হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে প্লে থেরাপি (Play therapy) অর্থাৎ উদ্দেশ্যপূর্ণ বা অর্থপূর্ণভাবে খেলার মাধ্যমে যে থেরাপি প্রয়োগ করা হয়, তা সর্বাধিক কার্যকর ভূমিকা নিয়ে থাকে। আসলে আমাদের শিশুদের মস্তিষ্ক অনেকটা কাঁচা মাটির ঢ্যালা বা প্লাস্টিসিনের মতো, আর মস্তিষ্ক বা ব্রেইন-এর এই ধর্মকে নিউরো প্লাস্টিসিটি বলা হয়। যেমনভাবে আমরা প্লাস্টিককে গলিয়ে নানানরকম মডেল তৈরি করতে পারি, ঠিক তেমন করে, যদি অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে, অতি দ্রুততার সাথে ইন্টারভেনশন এবং প্রয়োজনীয় থেরাপি শুরু করা যায়, তবে ওই শিশুটির মধ্যে আমূল পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। 

দেখা গেছে, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার-এর মধ্যে যারা মাইল্ড বা মৃদু অটিজমের অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ যাদের আই কিউ (Intelligence quotient) মাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক বা নর্মালের কাছাকাছি (স্বাভাবিক বা নর্মাল বলতে Regular neurotypical শিশু, যারা নিয়মিত স্কুলে যায়, স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় মূলস্রোতের মধ্যে রয়েছে, তাদের বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে) তারা কথা বলতে পারে, কেউ হয়তো অঙ্কে খুব ভালো, কেউ হয়তো অত্যন্ত সুন্দর ছবি আঁকতে পারে, গান গায় বা নাচ করে, এককথায় একেকজন অসম্ভব গুণী বা বিরল প্রতিভার অধিকারী। সর্বোপরি, মাইল্ড অটিজমের সঙ্গে আনুষঙ্গিক কোনও শারীরিক সমস্যা না থাকলে, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই থাকে না, তাকে বাহ্যিকভাবে দেখে, আর পাঁচজন স্বাভাবিক শিশুর থেকে আলাদা বলে মনে হয় না, তার সমস্যা বোঝা সম্ভব হয় না। এই শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক হলে, তখনও তাকে কেবলমাত্র বাহ্যিকভাবে দেখে অস্বাভাবিক বলে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না, তার আচরণের জন্য তাকে আলাদা মনে হয়। এখন অনেকেই ভাবতে পারেন যে, এই অটিজম (মাইল্ড) থাকাতে তো ভালোই হল, এতে অসুবিধার কী আছে? অসুবিধাটা যে ঠিক কী বা কোথায় তা কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের চোখে পড়ে না বা নজরে এলেও আমরা তার গুরুত্ব বুঝতে পারি না। মেইনস্ট্রিম স্কুলে ইনক্লুসিভ এডুকেশন অর্থাৎ সকলকে নিয়ে যে শিক্ষা ব্যবস্থা, সেখানে মূলস্রোতে থাকা ছেলেমেয়েদের মা-বাবারা কিন্তু বেশ বুঝতে পারেন যে, তাঁর সন্তানের সাথে একই জায়গায় পড়াশুনা করছে এমন আর একটি ছেলে বা মেয়ে, যার মাইল্ড অটিজম রয়েছে। সেই শিশুটি মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত ছটফটে হয়ে উঠছে, মাঝেমাঝেই জোরে জোরে আওয়াজ করছে, হয়তো বন্ধুত্ব করতে গিয়েছিল অথচ ধাক্কা দিয়ে বন্ধুকে ফেলে দিল, অর্থাৎ ওই শিশুটির কোথাও একটা সমস্যা রয়েছে। পাশাপাশি যখন তাঁরা দেখেন, ওই একই শিশুর আই কিউ মাত্রা যথেষ্ট ভালো, সে ক্লাসে রেজাল্টও খুব ভালো করছে, তখন তাঁরা দ্রুত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান যে, তাহলে বোধহয় সমস্যা ততটা নয়, ওই শিশুর এইসব দুষ্টুমি ইচ্ছাকৃত। আবার এর বিপরীতে, যাঁদের সন্তান হয়তো সিভিয়ার বা মডারেট অটিজমের আওতায় পড়েন, যাদের সমস্যা প্রভূত বেশি, তাঁরা আক্ষেপ করেন এই বলে যে, তাঁদের ছেলে বা মেয়ে যদি মাইল্ড অটিজম রেঞ্জেও পড়ত, তাহলেও তো সে কিছু করতে পারত। এভাবেই মাইল্ড অটিস্টিক মানুষেরা যে প্রতি পদে পদে সমাজের ভুল বোঝার শিকার হয়ে থাকে, তা জানা, উপলব্ধি করা সকলের জন্য ভীষণ রকম প্রয়োজন। 

আমরা জানি যে অটিজম একটি সোশ্যাল কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার (Social communication disorder), আমরা এও জানি যে বর্তমান বিশ্বে প্রতি আটচল্লিশ জনের মধ্যে একজন অটিস্টিক। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না যাদের মাইল্ড অটিজম রয়েছে, তাদের সমস্যাগুলি ঠিক কোথায়। এদের শৈশবস্থাতেই প্রথম যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তা হল, পারিপার্শ্বিকের সাথে কিছুতেই খাপ খাওয়াতে না-পারা। দেখা যাচ্ছে শিশুটি মেধাসম্পন্ন এবং বিশেষ প্রতিভার অধিকারী। এই কারণে তাকে নিয়মিত স্কুল এবং বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এবার হয়তো তাকে কোনও জন্মদিনের অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দেখা গেল, সেখানে সে অকারণে অতিরিক্ত জোরে চিৎকার করে উঠল এবং এই কারণে কেউ তাকে বকলে হয়তো সে ওই ব্যক্তির জামা টেনে ধরল। সেই ব্যক্তি পুনরায় তাকে বকলে সে হয়তো আবার ওই ব্যক্তির জামা টেনে ধরল। অর্থাৎ শিশুটি ওই ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে, চাইছে ওই ব্যক্তির সম্পূর্ণ মনোযোগ (Attention) তাঁর দিকেই থাকুক। কিন্তু সে বুঝতে পারছে না, এই যে তাকে বারবার বকা হচ্ছে তার কিছু আচরণের জন্য তা আসলে একপ্রকার শাস্তি (Punishment), বারবার বকা হচ্ছে তার আচরণের সংশোধন চেয়ে। এই বুঝতে না পারা, যাকে আমরা বলছি সোস্যাল কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার (Social communication disorder) — এদের ক্ষেত্রে এক বড়ো সমস্যা। 

দ্বিতীয়ত, সময়ের সাথে সাথে শিশুটি বড়ো হতে থাকলে, বয়ঃসন্ধিকালে, প্রথম থেকে নানাবিধ ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ পাওয়া সত্ত্বেও, কোনটা তাঁর ব্যক্তিগত সময় (Private time), কোন সময়ে সে সকলের থেকে নিজেকে আলাদা রাখবে, সামাজিক লজ্জাবোধ — ইত্যাদি জায়গাগুলো সেভাবে তৈরি হয় না। বয়ঃসন্ধিক্ষণে প্রত্যেক ছেলেমেয়ের মধ্যেই রাগ, জেদের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। স্বাভাবিক কারণেই হরমোনের ক্ষরণের নানাবিধ পরিবর্তনের ফলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই সময়ে এই ধরনের আচরণ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এরা, এই পরিবর্তনের সাথে স্বাভাবিকভাবে মানিয়ে নিতে পারে না এবং অনেক সময় তার বহিঃপ্রকাশ বেশ ভয়ংকর হয়ে ওঠে; তার নিজের এবং পারিপার্শ্বিক মানুষজন উভয়ের জন্যেই। সে হয়তো হঠাৎ করে ভীষণ রেগে গেল, আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল, চারপাশের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলল। অথচ তার এই ধরনের আচরণের আপাতগ্রাহ্য কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

মাইল্ড অটিজমে আরও একটি ঘটনা ঘটে মূলত বয়ঃসন্ধির সময়ে। হঠাৎ করে খিঁচুনি (Convulsion) শুরু হয়ে যেতে পারে। এই অবস্থায় এদের নানারকম ওষুধ খেতে হয় স্নায়ু শিথিল রাখার জন্য। তাই অনেক সময় তারা হঠাৎ ঝিমিয়ে গেলে বা ঘুমিয়ে পড়লে, অচেতন হয়ে পড়লে তা অনুধাবন করে এদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। 

এরপর আসে নিঃসঙ্গতা, যা তাকে ঘিরে ধরে, গ্রাস করে। সে সেভাবে বন্ধু পায় না, বন্ধুরা খেলতে চায় না। বন্ধুত্ব করাটাই একটা বিষম বিড়ম্বনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই অবস্থায় সমাজ না এগিয়ে এলে এরা বড়ো অসহায়। কিন্তু বাস্তবে এদের মন বড়ো পবিত্র, বড়ো সুন্দর। কারণ, তারা সমাজের জটিলতা বুঝতে অক্ষম।

সময়ের সাথে সাথে বদলেছে সামাজিক পরিবেশও। আগে বড়ো একান্নবর্তী পরিবারের কোনও একটি শিশু সদস্যের অটিজম থাকলে সেই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে তার বাবা-মাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে হত না। ওই শিশুর ভাইবোন এবং পরিবারের অপরাপর সদস্যেরা তাঁর সমস্যা অনুধাবন করে, সহমর্মী হয়ে প্রয়োজনীয় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। কিন্তু আজকের এই সময়ে অধিকাংশই অণুপরিবার এবং বেশিরভাগ বাবা-মায়েরই একটিমাত্র সন্তান। এমতাবস্থায় যদি সেই একমাত্র শিশুও অটিস্টিক হয়, তবে তাঁদের অবর্তমানে সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে পিতামাতার উদ্‌বেগ, দুশ্চিন্তা অত্যন্ত স্বাভাবিক হয়ে পড়ে। অটিস্টিক শিশুর মা-বাবারা মনে করেন তাঁদের জীবন বড়ো কঠিন। কিন্তু তাঁদের ভুলে গেলে চলবে না, ওই শিশুর জীবন আরও বেশি কঠিন, কারণ, প্রাত্যহিক জীবনে প্রতি মুহূর্তের সংগ্রাম লড়ে যেতে হচ্ছে তাঁদের সন্তানকেই। অভিভাবকদের জায়গা অত্যন্ত কঠিন হলেও তাঁদের সন্তানের সমস্যা তাঁদেরকেই বুঝতে হবে, মেনে নিতে হবে এবং এও বুঝতে হবে যে, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এই শিশুর উপযোগী করে গড়ে তোলাও রয়েছে তাঁদের হাতেই। তাই, নিজেকে শান্ত রেখে, সন্তানকে বকাবকি, মারধোর না করে তাকে পূর্ণ সহযোগিতা করাই একান্ত জরুরি। তাকে সকলের থেকে আলাদা করে, একা করে না-রেখে, তাকে সকলের সাথে মিশতে দেওয়া, উৎসব, অনুষ্ঠানে সকলের মাঝে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কার্যকরী হয়ে থাকে। অটিস্টিক শিশুরা স্বভাবত ভীষণ উদ্‌বিগ্ন থাকে এবং অনিশ্চয়তাবোধে ভোগে। এই জায়গা থেকে বের করে, জীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে তাই বাবা-মা সহ পরিবারের সদস্যদেরও, অটিস্টিক শিশুদের সাথে কীভাবে ব্যবহার করা উচিত, কীভাবে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজগুলি শেখানো যেতে পারে এবং তার সাথে কোন ধরনের ব্যবহার কখনোই করা উচিত নয় — এই বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়ে, যা পাওয়া যেতে পারে কেবলমাত্র অটিজম সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সংস্থা বা ব্যক্তির কাছ থেকেই। 

মাইল্ড অটিজম বা Asperger’s syndrome থাকা সত্ত্বেও জীবনে সফল হয়েছেন এমন উদাহরণের অভাব নেই। ডঃ টেম্পল গ্র্যান্ডিন (Mary Temple Grandin), যাঁর দুটি পিএইচ ডি রয়েছে, অধ্যাপক ডঃ স্টিফেন শোর (Stephen Shore)ও পিএইচ ডি করেছেন। আমাদের দেশেও এই ধরনের সফল মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি নাম উল্লেখ করা যেতেই পারে — বিরাজ ভাটিয়া, যিনি সফট্ওয়্যার কোম্পানিতে কর্মরত; উসেইদ শেখ (Usaid Shaikh) একজন সফল গ্রাফিক ডিজাইনার এবং নৃত্যশিল্পী; প্রণব বক্সী একজন পরিচিত মডেল প্রমুখ। সফল হলেও এঁদের প্রত্যেকেরই কোথাও এক লুকানো ব্যথা রয়েছে। এখানেই মাইল্ড অটিজম আক্রান্ত মানুষটি এবং তাঁর পরিবারের অত্যন্ত কষ্টের জায়গা। 

বিকাশজনিত সমস্যা যে সন্তানের থাকে, তার মা-বাবার জীবনের লড়াই নিঃসন্দেহে বড়ো কঠিন। সবথেকে বড়ো দুশ্চিন্তা হল, তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তা। আজকে তাঁরা সন্তানের পাশে আছেন, কিন্তু যেদিন তাঁরা থাকবেন না সেদিন তাঁদের সন্তানের কী হবে? সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে সহমর্মিতা, ভালোবাসা নিয়ে। এদের সমস্যা সমাধানে কী করা যেতে পারে সে-বিষয়ে নির্দিষ্ট কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পরিবার এবং সমাজ উভয়কেই একসঙ্গে, হাতে হাত রেখে কাজ করতে হবে অটিস্টিক নাগরিকের মানুষিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় — সবার সঙ্গে একভাবে বাঁচার শর্তে।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান