ছটফটে শৈশব, সংশয়াবিষ্ট বয়ঃসন্ধি

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

(বিভাগীয় প্রধান (সাইকিয়াট্রি), কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ) 

রোববার সকালের সেলুন। ব্যস্তসমস্ত সবাই, কারও কারও অবশ্য কোনও তাড়াই যেন নেই। এদের অনেকেই সেলুনের পুরোনো কাস্টমার। বসছে, চা খাচ্ছে, খবরের কাগজ উলটে দু-একটা মন্তব্য করছে, মাঝে মধ্যে জিগ্যেস করছে, কি রে বাবা, আজ কি বাড়ি যাব না? সেলুন মালিকের কাঁচি চলছে, এদেরও সামলাচ্ছে টুকটাক করে, কাউকে বলছে, এই তো হয়ে এল, কাউকে, আর একজন দাদা, এই দাড়িটা সেরেই আপনাকে ধরব, একটু চা চলবে দাদা, লিকার?

আমার মন্দ লাগছিল না। এখানে এলে হাতে একটু সময় না-নিয়ে এলে চলে না। দু-একটা মন্তব্যে অবশ্য সামান্য ছিটকে যাচ্ছি, অত তড়বড় করলে কি চলে আমাদের, আমরা হলাম গিয়ে নরসুন্দর, দুনিয়ায় সব কিছু নিজে নিজে করা যাবে, এটা ছাড়া! একটু বোসো না, হয়ে যাবে!

নরসুন্দরের বাক্‌চাতুর্যে তো বটেই, বিষয়বস্তুতেও মুগ্ধ হই। ঠিকই বলছে তো, করোনার সময় এটা বেশ মালুম হয়েছে। মধ্যে মধ্যে অন্য প্রসঙ্গ আসছে, বক্সিবাবুর মেয়েটা এখন আমেরিকায় থাকে, এদিকে তার মা খুবই অসুস্থ, এই-ই তো হয়, ইত্যাদি। কিছুক্ষণ পরেই কথা ঘুরে যাচ্ছে সামান্য অন্যদিকে, ছেলেপিলে মানুষ করার কথা উঠছে। বেঞ্চে ঠাসাঠাসি বসে থাকা এক ভদ্রলোক, যার মুখটা খুব চেনাচেনা লাগলেও ঠিক মনে করতে পারছিনা এখন, বলে ওঠেন —

আর দাদা ছেলে মানুষ করা, বাপ মা নিজেদের ঝগড়াই সামলাতে পারে না, তো বাচ্চা বড়ো করবে! আমাদের সময় আর এই সময়ের অনেক তফাত আছে! সবকিছুই তো বাচ্চাদের সামনেই হচ্ছে, সবই শিখছে ওরা, বাচ্চার কী দোষ? বলতে গেলেই ওল্ড ফ্যাশনড বলে গাল দেবে!

ভদ্রলোকের মনে বেশ কষ্ট দেখছি। বলতে না বলতেই পাশের জন ধরে নিলেন কথাটা —

এতোটা বোধহয় না, আজকাল মা বাবা দুজনেই তো ব্যস্ত থাকে, আমাদের মতন নয়!

আগুনে ঘি পড়ে যেন।

এটা কোনও যুক্তি? দেড় বছরের বাচ্চাকে গুঁজে দাও প্রেপ স্কুলে, স্কুলের সময়ের বাইরে যতটুক সময় জুটবে দিয়ে দাও রাজ্যের ক্লাসে, কেন, একটা বাচ্চার বাপ-মায়ের সান্নিধ্য লাগে না? অন্য লোকে সারাক্ষণ প্রক্সি দিয়ে গেলেই ছেলে মানুষ হবে?

বক্তা সেই প্রথমজন-ই, আলোচনা জমে উঠেছে। আমার চুল ছাঁটাইয়ের চেয়ারটা একেবারে ঘরের কোণে নির্ধারিত হওয়ায় সবটা শুনতে পাচ্ছিলাম না।

বিকেলের আড্ডা, অর্থাৎ সতুদার বৈঠকখানায় আবার উঠল কথাটা। মাঝে করোনার সময়ে আড্ডা প্রায় থেমে গেলেও আমাদের এই আড্ডা এখনও বহাল। তবে সময়টা এখন আর সকাল নয়, সান্ধ্য হয়েছে। একটু কিন্তু কিন্তু করে বলেই ফেলি —

সতুদা, এই যে বছর দুয়েক বাচ্চারা স্কুলের মুখ দেখল না, অনলাইনে বসে অকালপক্ক হল, এতে লাভ না ক্ষতি কোনটা হয়েছে? টিন এজের ছেলেমেয়েগুলোরই বা কি দাঁড়াল? 

ক-দিন বেশ ভালো মুডেই আছে দেখছি সতুদা। মুখচোখে কৃত্রিম ব্যাজার ভাব দেখিয়েই বললেন, 

অর্থাৎ সত্যেন চাটুজ্যে আরও কিছুটা বাজে বকুক এটাই চাইছ তুমি? তাই যদি হয় তাহলেও বলব, লাভ আর ক্ষতি, দুটোই হয়েছে!

যদি বলিস, লাভটা কোথায় দেখলে? তবে বলব, এটা একটা সুবর্ণ সুযোগ ছিল, পরিচিত গণ্ডি এবং পরিবেশ ছাপিয়ে নতুন নতুন পদ্ধতি কিংবা ভাবনার সুযোগ! আমাদের রুটিন বাঁধা ভাবনার বাইরে, তবে সেটাও কে কতটা কাজে লাগিয়েছে তা এই মুহূর্তে জাজ করতে চাইলে হবে না, সময়েই বোঝা যাবে! 

 — সে তো ভালো কথা, তাইলে ক্ষতিটা কী?

তড়বড়ে ভোম্বল সতুদাকে একরকম থামিয়ে দিয়েই প্রশ্ন করে।

— আমার প্রথম কথাটা যদি বুঝে থাকিস তাহলেই বুঝবি আমি ছোটোদের জন্য এই ‘মার্কস’বাদী শিক্ষায় আস্থা রাখি না, কে কত মার্কস্ পেল তা কখনও শিক্ষার মান নির্ধারণ করতে পারে না। প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরেই একটা গতে বাঁধা মুখস্থ বিদ্যের আখড়া হয়ে উঠেছে আর বাঁধা গৎ থেকে বেরোনোর ইচ্ছে আদৌ কারও আছে বলে মনে তো হয় না! বাপ মায়ের হাতে আছেটা কী? সকলেই সকলকে দেখে দৌড়াচ্ছে, একবারও প্রশ্ন করছে না এই দৌড়ের শেষটা কোথায়? সব বাচ্চার মেধা, যোগ্যতার মাপকাঠি মোটেই এক হওয়ার কথা নয়, যদিও সেটাই এতকাল ধরে হচ্ছে, ফলে যারা সেই ইঁদুর দৌড়ে পিছনের সারিতে চলে যাচ্ছে তাদের আত্মমূল্য বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকছে না। সব বাচ্চা একরকম হবে এটা প্রত্যাশা করাটাই অন্যায়। লেখাপড়ার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু কৌতূহলের সলতেটিকে উসকে দেওয়া, সেটা কতটা হচ্ছে তার খোঁজ করেন কেউ? গুচ্ছ গুচ্ছ নম্বর পাওয়াটাও একটা ইনফ্লেশনের মতন, সেজন্যই এ-নম্বর কোনও কম্মে লাগছে না! পলিটিক্যাল পার্টি এই নম্বর পাওয়াটাকেই ক্যাশ করছে, মায়েরা টিভি চ্যানেলে হৈহৈ করে বলছেন, আমাদের ওমুক আছে অতএব ছেলেমেয়েদের চিন্তা নেই! একটা জাতি কতখানি অধঃপাতে গেলে তাদের এটা বোঝার ক্ষমতাও লুপ্ত হয়ে যায় ভেবে দেখেছিস?

আর এই যে আমরা সুযোগটা কাজে না-লাগিয়ে ছেলেমেয়েদের ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিলাম, কারিগরি অথবা তাত্ত্বিক শিক্ষার সবটাকেই যদি ‘কোভিড বাবার জয়’ বলে উড়িয়ে দিই, তাতে করে শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকেই অনেক অনেক দূরে চলে যাব আমরা, গেছিও বটে, হাতে রইল পেন্সিলের মতো কেবল মোবাইল ফোনটাই থেকে গেল — আসল ক্ষতি তো এটাই। 

সতুদা আজ শুরু থেকেই আক্রমণে। বর্ষীয়ান অনাদি বাবু বসেছিলেন এক কোণে, মন্তব্য করেন —

ক্ষতি বিষয়ে আমরা অনেকেই সহমত পোষণ করি, কিন্তু একটি শিশুর ঠিকমতো তৈরি হতে গেলে যা যা প্রয়োজন সেগুলোর কথাও একটু বিশদ আলোচনা হোক না! বাচ্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে তো সবাই ভাবছেন, অথচ সবকিছুর পরেও কী যেন একটা অসম্পূর্ণ, অধরা থেকে যাচ্ছে!

অনাদি দার কথায় সতুদাও একটু নড়েচড়ে বসেন। ঘরের মধ্যে চেয়ার, মোড়া, সোফায় আমরা জনা দশেক। এক রাউন্ড চা হয়ে গেছে। সামান্য কেশে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে সতুদা বলতে শুরু করেন —

এটাই সবচে জরুরি প্রশ্ন দাদা, সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ! একটা শিশু যখন জন্মায় তখন তার পাশে তাকে ঘিরে থাকে পরিবার, ওটাই তার লালন ক্ষেত্র। কয়েক বছরের মধ্যেই সে চারপাশের সবকিছু চিনতে চাইছে, তার মতন করে আবিষ্কার করছে কতো কি!

স্কুলের পথ, চারদিকের মানুষ, গাড়ি ঘোড়া, দোকান বাজার, সবই এক্সপ্লোর করছে সে। একটা নতুন জীবন, নতুন প্রাণ, যার একদিকে বিধিবাঁধনহীন অবাক করা আসর, যার প্রশ্রয়ে সে বাড়ছে। আবার অন্য দিকে তৈরি অনেক শর্ত, এটা কোরোনা, ওটা বলতে নেই, এটা করলে লোকে খারাপ বলবে, এমনি হাজার দৃশ্য এবং অদৃশ্য শর্তের বেড়ি পরানো তার হাতে পায়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এ হল ‘কন্ডিশনস্ অফ ওয়ার্থ’! এই কন্ডিশনস্ বা শর্তের গুঁতোয় সে যা শিখছে তা আসলে সমাজের কাছে সম্মতি আদায়ের আদব কায়দা, সেটা না-পারলেই তার অবনমন যেন। ‘দুধ না খেলে, হবে না ভালো ছেলে’! ক্রমে তার অস্তিত্বের আসল বৈশিষ্ট্যগুলো সমাজ স্বীকৃত ধারায় বইতে থাকে, ‘ট্রু সেল্ফ’-কে ‘ফলস্ সেল্ফ’ বানানোর খেলায় যারা টিকে যায় তারা রইল মূল স্রোতে, যারা পারে না তাদের আত্মমূল্য বা সেল্ফ এস্টিমের আর মাথা তোলার জায়গা থাকে না। প্রচলিত ধারায় এই-ই হল ছেলে মানুষ করা। সকলেই তাই করছে এবং তার পরেও কেউ নিশ্চিন্ত নয়, এটাই বড় ট্র্যাজিক!

আমি মনে করি একজন মানুষের জীবনের ভিত্তিটা দাঁড়িয়ে থাকে দুটো বিষয়ের উপর, প্রথম হল সেল্ফ এস্টিম বা আত্মমূল্য, দ্বিতীয়টা, সেল্ফ কনফিডেন্স, আত্মবিশ্বাস। সন্তানের জন্য সবকিছুই করে দিতে গেলে এর কোনোটাই তৈরি হয় না!

সতুদা একটু দম নেওয়ার ফাঁকে সন্দীপ বলে ওঠে —

এর শুরুটাও তো ছোটোবেলাতেই হওয়ার কথা, তাই না?

— আমাদের সব অভ্যেস, ভালো মন্দ সবই কি ছোটোবেলায় তৈরি হয়? দেরিতে বুঝলেও কি বদল হয় না?

অম্লান এবার।

সতুদা শুরু করেন আবার —

শুরুটা সকালে হলে বিকেল সন্ধ্যায় আর পথ খুঁজতে হয় না! এই যে আমি আত্মমূল্য কি আত্মবিশ্বাসের কথা বললাম, সেটা তৈরি হয় কী করে? কাজ করতে করতেই তো? আমি যদি আমার সন্তানকে আতুপুতু করতে করতে তার সুযোগই না দিই, তারপরও তার কাছে দায়িত্ববোধ আশা করি কী করে?

— আজকের নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির যুগে বাবা মায়েরা তো প্রাণপাত করেন সন্তান পালনে, তবুও অধিকাংশ পরিবারই তেমন সন্তুষ্ট নন, নিজের সন্তানকে নিজেরাই ভয় পাচ্ছেন যেন

— এটা কেন হচ্ছে?

অনাদিবাবুই জিগ্যেস করেন আবার। 

সতুদা জবাবে অনর্গল আজ —

একটা জীবনকে যদি বিচ্ছিন্ন ভাবে না ভেবে একটা ধারাবাহিক ক্রমে দ্যাখেন, তখন দেখবেন জীবনের কোনও কোনও পর্যায়ে ওঠানামা, ঝাঁকুনি একটু বেশি হলেও সামলে নেওয়ার উপাদানও সেখানেই আছে। কিন্তু যদি খুঁজতেই না দিই? ধাক্কা খাবে, পারবে না, সময় নষ্ট হবে, অন্যদের থেকে পিছিয়ে যাবে, এইসব ভাবনায় আমরা বড়োরাই ওদের জীবনকে নিয়ে কোনও পরীক্ষা নিরীক্ষার সুযোগই দিই না, ফেলিওরের পথটা বন্ধ করতে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার জন্য কোনও জায়গা রাখি না। প্রথম প্রথম সব চলে ঠিকঠাক, বিশেষত প্রথম দশ বারোটা বছর, তারপর আসে বয়ঃসন্ধির ঝোড়ো বাতাস, লড়াই শুরু হয়ে যায়। বাচ্চা সবসময় আমার কথাই শুনবে, বাইরের কোনও কিছুই তার উপর কোনও প্রভাব ফেলবে না, এই যদি আমাদের বদ্ধমূল ধারণা হয়, তবে সংঘাত অনিবার্য। 

সতুদা একটু থামেন, বিশ্রাম চান বুঝি, বয়স তো হচ্ছে। ভোম্বল এবার সুযোগ পেয়ে একটা নতুন রকমের মন্তব্য করে —

সতুদা, আমাদের জীবনে তো অনেক নদী, অনেক ব্রিজও আছে, ছোটোবেলা আর বড়োবেলার মধ্যে যে ব্রিজটা ওটাই তো বয়ঃসন্ধি, তাই না? আমরা ওদের তখনও ছোটো ভাবলেও ওরা নিশ্চয়ই তা ভাবে না?

ঘরের আরেক কোনায় বিমল মাস্টার বসে আছেন। নিতান্তই চুপচাপ মানুষটা ভোম্বলের কথার উত্তর দেন এবার —

আমি সতুদার মতন অত কিছু না জানলেও কম বাচ্চাকে তো বড়ো হতে দেখলাম না! সেই অভিজ্ঞতায় বলছি, যে বয়সের যা, কোনোটাই ফেলনা নয়। তেরো চোদ্দো বছরের একটা ছেলে বা মেয়ের কাছে তার পড়াশোনা,কেরিয়ার যেমন ইমপর্টান্ট, তেমনি তার ক-টা বন্ধু, আজকাল তো আবার বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড ও আছে, কে তাকে কীভাবে অ্যাক্সেপ্ট করছে, তার গুরুত্ব কতটা, সেসবও মনে রাখতে হয়। এ বয়সে ওরা কেউই নিজেদের ছোটো ভাবছে না, এটা কিন্তু বুঝতেই হবে!

— আর সোশ্যাল মিডিয়া?

সন্দীপ বলে কথাটা।

— একটা বিষয় মনে রাখতেই হবে, এগুলোর কোনোটাই বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সমাধান সূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিশ-তিরিশ বছর আগের ভাবনাচিন্তা নিয়ে চললে আমরা বড়ো ভুল করব!

সতুদার কন্ঠস্বর বেজে ওঠে আবার।

একেবারে ছোট্ট বয়স থেকে দুটো কথা মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারলে সবচে ভালো। এক, সংসারে সবার কিছু দায়িত্ব আছে, ছোটোদেরও আছে তা, শুরু থেকেই এটা চালু করতে হয়। দু-নম্বরটা হল কৃতজ্ঞ থাকার শিক্ষা, কৃতজ্ঞতা জানানোর অভ্যেসটা বড়ো বয়স না, শুরুতেই দরকার।

অন্যকে সম্মান জানাতে না-পারলে নিজেও সম্মান পাবে না, এটা বোঝাটা প্রয়োজন!পড়াশুনা চাই, কিন্তু শুধুমাত্র পড়াশোনা, আর বাকি কোনও কিছুতেই নেই, এমন ছেলেপিলে তৈরি করতে চাই না আমরা। মিশতে না-শিখলে অন্যকে বোঝার মন পাব কোথা? আজকের ছেলেমেয়েদের বুদ্ধি খুব, কিন্তু সোশ্যাল ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স লবডঙ্কা! ওরা ব্যর্থ হতেই শেখেনি, তাই সামান্যতম ব্যর্থতাতেই জীবন শেষ করার দিকেও চলে যায় কেউ কেউ। ওরা রাগে, কাঁদে, কষ্ট পায়, অথচ সে-সবের দায় নিতে পারে না। বাপ মা সেই দায় সামলায়, কেননা তাদের ভয়, এটা না করলে পরীক্ষাটা ঠিকমতো দিতে পারবে না! এদের সামনে প্রচুর অপশনস্, কোনটা ছেড়ে কোনটা ধরবে, তা ভাবতেই ট্রেন মিস্ হয়ে যায়!

— কিন্তু, বাবা মায়েরাই বা কী করবে?

এবার আমিও জিগ্যেস না করে পারি না।

 — ভরসা করবে। ওটাই আয়ুধ, একমাত্র শক্তি। ছোটো থেকেই ওদের ভরসা করতে শিখবে বাপ মায়ের দল। হাতে হাতে জুগিয়ে দেবে না, কাজে উৎসাহ দেবে, ভালো করলে প্রশংসা করবে, শুধুমাত্র ওদের কাজটা করতে দিতে হবে। এই ভরসাতেই ওদের দায়িত্ব নিতে শেখা, কান্নার দায়িত্ব, ফেলিওরের দায়িত্ব, রাগের দায়িত্ব, সবকিছু শিখে ফেলবে ঠিক ওরাই। সবসময় উপদেশ নয়, জাজমেন্ট নয়, তবে যখন যখন ওদের সত্যিকারের দরকার তখন যেন কাছে পায় মা বাবাকে, বিচার, ক্রিটিসিজমের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে যেন ফিরে যায় না ওরা, সেটাও দেখতে হবে। গল্প আড্ডা মজা সবই চাই, কিন্তু ওই যে বললাম দায়িত্ব, সেটা কিন্তু ছোটো ছোটো বিষয় থেকেই শুরু হয়, ওটা বলে বলে আসে না, করতে করতেই আসে, ঠেকতে ঠেকতে আসে এটা ভুললে চলবে না।

 — সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল ফোন নিয়ে কিছু বলবে না?

ভোম্বল নাছোড়।

সতুদা হেসে ফ্যালেন এবার, মুখে বলেন, 

ওটা হল গিয়ে বিটিং অ্যারাউন্ড দ্য বুশ! সমস্যাটা মোবাইলে নেই, আছে শূন্যতায়। সেই ফাঁক পূরণ করার কিছুই তো নেই ওদের কাছে, তাই এমন করে! বাপ মায়ের সাথে এখন ওদের সম্পর্কটা চোরপুলিশের মতন, শুধুমাত্র অবস্থানটাই বদল হয় মাঝেমধ্যে।

সাড়ে আটটা বাজল, এবার বাড়ি যা সব!

স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান সতুদা। তবে প্রশ্ন থামে না, অনাদি বাবু উঠতে উঠতেও বলেন, 

— তার মানে তুমি বলছ, এত চিন্তার কিছুই নেই? ছোটোদের ছটফটানি আর টিন এজের কনফিউশন স্বাভাবিক?

— সে আর বলতে?

সতুদা হাসিমুখেই বলেন, 

শুধু মা বাপ কনফিউজড না হলেই হল। আজকের নয়, চিরকালই পেরেন্টিং-এর গোপন ফর্মুলাতে ‘পি’-তে প্লেফুলনেস, মজা, আনন্দ, হইচই, ‘এ’-তে অথেনটিসিটি, জেনুয়িননেস, কোনও হিপোক্রিসি চলবে না এখানে।

‘আর’ মানে রেসিলিয়েন্স, তরিখানা বাইতে গেলে, মাঝেমাঝে তুফান মেলে, তাই বলে হাল ছাড়া যায় কি?

‘ই’-তে এমপ্যাথি, সম-মর্মিতা, অন্যের মন বোঝার, অনুভবের দীক্ষা।

‘এন’ অর্থে, নো আলটিমেটাম, শেষ নাহি রে, কিছু-না-কিছু তো হবেই জীবনে, অতএব, শেষ বলে কিছুই নেই।

 — আর ‘টি’ মানে? টকেটিভনেস?

আমাদের আড্ডায় ভোম্বল নামের এক যুবক যে অপ্রতিরোধ্য তা তো ভুলেই গেছিলাম আমরা।

সতুদা হাসতে হাসতে বলেন, 

নাহ্, হল না রে ব্যাটা, ওটা টুগেদারনেস, রাগ শোক দুঃখ, যাই হোক একসাথে থাকব আমরা। ব্যস্ খেল খতম!

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান