মৈত্রেয় দেব
শিরোনামের দু-টি শব্দই সভ্য সমাজে খুব একটা গৃহীত নয়, আদরের তো নয়ই। অতএব এককথায় বলে ফেললেই চলে, মন বা সমাজ, কিংবা সমাজ-মনের কোথাও এদের জায়গা নেই। তবে এমন সপাটে বিদেয় করায় সমস্যা আছে, অস্বস্তিকর হলেও এদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সমাজ কিন্তু একেবারে অচেতন নয়। আমাদের প্রাচীন মহাকাব্যে ‘আত্মহত্যা’ শব্দটি না থাকলেও ‘কৃপামৃত্যু’ আছে, ‘প্রায়োপবেশন’-ও আছে, পরবর্তীতে ‘জহর ব্রত’-ও আছে। বিদেশের শব্দ ভান্ডারে ষোলোশ বিয়াল্লিশের (মতান্তরে ষোলোশ পঁয়ত্রিশ) আগে ‘সুইসাইড’ শব্দটির কোনও উল্লেখ নেই। থমাস ব্রাউনি-র লেখা ‘রিলিজিয়ো মেডিসি’ নামের বইতে এ-শব্দের প্রথম ব্যবহার। তারপর নামের বদল হতে হতে, ‘ডেলিবারেট সেল্ফ হার্ম’, ‘ইনটেশনাল সেল্ফ হার্ম’, ‘প্যারাসুইসাইড’, এইসব নামান্তরের আড়ালে আত্মহনন পথের মানুষের উদ্দেশ্যটাকেই সংশয় চিহ্নে বিদ্ধ করার পর এতদিনে একে ‘সেল্ফ ডাইরেক্টেড ভায়োলেন্স’ নামে ডাকা শুরু হয়েছে, সে নামও কতদিন স্থায়ী হবে জানা নেই।
অবসাদের দশাও তথৈবচ।
একসময় তার নাম ছিল মেলানকোলিয়া। রবার্ট বার্টন (ষোলোশ একুশ) তাঁর ‘অ্যানাটমি অফ মেলানকোলি’-তে বহুরকম অবসাদের কথা বলেছেন। তখন তা ছিল শরীরে কালো পিত্ত জমে তা থেকে ধোঁয়া উঠে তৈরি হওয়া সমস্যা। ইউরোপের রোমান্টিক যুগে মেলানকোলি প্রায় ফ্যাশন হয়ে উঠল। বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে যখন অবসাদ নাশক ওষুধ বেরোল তখন কিন্তু মানুষ তা গ্রহণ করল না, বিশেষত বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া হল সাংঘাতিক। কীই, মানুষের বোধ বুদ্ধি, রুচি অরুচি, সব ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ হবে? যাই হোক, এখন অবস্থা অবশ্যই কিছুটা বাস্তবানুগ। তবুও কয়েক বছর আগের সমীক্ষা (যেখানে সাধারণ মানুষকে ডিপ্রেশন বা অবসাদ কেন হয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে বলা হচ্ছে) জানাচ্ছে, মাত্র দশ শতাংশ মানুষ এর বায়োলজিকাল কারণটার উল্লেখ করছেন।
সমাজ মনের গোপন কোণে অবসাদ এবং আত্মহত্যা বিষয়ে আলোচনার সীমাবদ্ধতাও তাই মেনে নিতেই হবে আমাদের। আলোচনার প্রয়োজন সাপেক্ষে কয়েকটি উপাত্ত জরুরি, যাদের প্রথমটি হল —
মানুষ আত্মহত্যা করে কেন?
দ্বিতীয় উপাত্তটি—
কেবলমাত্র ডিপ্রেশন বা অবসাদেই কি আত্মহত্যা ঘটছে, আর কিছুই কী নেই?
তৃতীয় উপাত্তের সংশয় হল —
তাই যদি হয়, তবে অবসাদের চিকিৎসাতেও এত অবহেলা কেন?
একটু বিশদ হওয়া যাক এবার।
শেষ কয়েক দশক ধরে আত্মহত্যার কারণে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষের সংখ্যাটা বেড়েই চলেছে। কোভিড অতিমারির সময়কালে সে মিছিলের বহর আরও খানিক বেড়েছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা অপরাধ নয়। মানুষের মনের অস্বাভাবিক কষ্ট এবং অসহায় বোধ কখনও সমাধানের খোঁজে নিজের অস্তিত্বকেই শেষ করতে চায়। চিকিৎসক জীবনে দেখেছি আত্মহত্যার এই চেষ্টাটুকু একটা সংকেতের মতো, একটা বার্তা, আমি বড্ডই কষ্টে আছি, তোমরা কেউ আমার কষ্টটা বোঝো, শোনো, উপায় বলো কিছু!
আমরা কখনও তা শুনি, কখনও শুনতেই পাই না। অপরাধ না-হলেও জাতীয় ক্রাইম ব্যুরো-র তালিকা থেকেই আমরা জানি, ঠিক কতজন মানুষ এ-বছর আত্মহত্যায় মারা গেলেন।
সংখ্যার নিরিখে সারা পৃথিবীতে শেষ এক দশকে আত্মহত্যা কিন্তু কমেছে। ব্যতিক্রম আমাদের দেশ।
হয়তো যতটা সক্রিয় হলে পরিস্থিতির বদল হতে পারত, ঠিক ততটা হইনি আমরা, যুক্তির পাত্রাধার তৈল অথবা তৈলাধার পাত্রে হারিয়ে গেছে আমাদের কার্যকর ভূমিকা, অতএব যা হওয়ার তাই হয়েছে। স্বীকার করি বা নাই করি, আত্মহত্যা আছে। মানুষ কেন এমন করেন তার সংবেদী বিশ্লেষণের চেষ্টাও আছে।
ধর্ম এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বত্রই যে এই নিয়ে অস্বস্তি বরাবরের। আসলে ধর্মধ্বজা নিয়ে যাঁরা চলেন তাঁদের কাছে কোনও যুক্তিতেই আত্মহত্যা প্রসঙ্গটি গৃহীত নয়, কারণ যিনি আত্মহত্যা করছেন তিনি প্রকারান্তরে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকেই অগ্রাহ্য করছেন অথবা আস্থা রাখতে পারছেন না। অতএব এটা পাপ। প্রশাসনের দিক থেকেও এটা রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধকে অগ্রাহ্য করার সাহস দেখানো, এতে রাষ্ট্রের বদনাম এবং এই ভরসাহীনতা তো প্রকৃতপক্ষে প্রশাসনের বিরুদ্ধেই আঙুল তোলা। না-খেতে পেয়ে মৃত্যুকেও যে কারণে মেনে নেওয়া যায় না তেমনই আত্মহত্যায় মৃত্যুকেও মেনে নেওয়া তাই কঠিন।
তাহলে মোদ্দা কথা
ধার্মিকদের কাছে আত্মহত্যা মহাপাপ, রাষ্ট্রের কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, দার্শনিকের চোখে জীবনের সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন কিংবা সিদ্ধান্ত, সমাজবিজ্ঞানীর নজরে সমাজ সম্পর্কের অতি বিচ্ছিন্নতা অথবা অতি সম্পৃক্ত ভাব, আর চিকিৎসকের বিচারে অতি অবশ্যই রোগ, মনোরোগ, নইলে আর এমন করবে কেন?
ভিন্ন চোখে দেখলে অবশ্যই এর বাইরে অনেক কিছুই নজরে আসবে, প্রশ্ন উঠবে যে মানুষটা অনটনে মরলেন, ধার শুধতে না পেরে মরলেন তাঁদের ক্ষেত্রেও কি মানসিক রোগের ফ্যাক্টর-টি প্রযোজ্য? আত্মহত্যাকে রোগ হিসেবে দাঁড় করাতে পারলে একটা সমাধান সূত্র নিশ্চিত পাওয়া যায় যেন। অর্থাৎ, যাক বাবা, একটা কিছু তো হাতে রইল! যাঁদের হারিয়েছি এবং ভবিষ্যতেও হারাব বলে ভাবছি, মনোরোগের তকমাটি গায়ে সেঁটে গেলে আর কোনও ভাবনা থাকে না সমাজের, রাষ্ট্রেরও কোনও দায় নেই।
এখানেও একটা বিপরীত বুদ্ধি বা যুক্তি মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে — আমাদের মতন দেশে মনোরোগের চিকিৎসা বেশ দাগি বিষয়, নেহাত বিপদে না-পড়লে কেই বা পাগলের ডাক্তারের কাছে যায়! এদেশে বদ্ধ উন্মাদের ধারণা সুলভ হলেও মুক্ত পাগল বা উন্মাদ জাতীয় কিছু হয় কিনা তেমন আলোচনার সুযোগ নেই। ফলে যাঁরা অবসন্ন, বিষাদগ্রস্ত, তাঁদেরই বা কত শতাংশ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছান তা বলা শক্ত। স্টিগমার গুঁতোয় এঁদের কত ভাগ মাঝপথে চিকিৎসা- বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন তাও বা কে জানে? তবে কি আমাদের যাবতীয় প্রচেষ্টা কেবলমাত্র কারণ নির্দেশের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সমাধানের ভিন্ন কোনও আন্তরিক মার্গ আছে, যা আমরা যুক্তিতর্কের জালে খুঁজে পাচ্ছি না?
সময়ের নিরিখে যে মানুষটি আত্মহত্যা করছেন তার কয়েকটি দূরবর্তী কারণ থাকে, যাদের প্রি-ডিসপোসিং ফ্যাক্টর বলা যায়। অবসাদে ভোগা মানুষ, অর্থনৈতিক ভাবে সংকটে থাকা মানুষ, পারিবারিক ভাবে অথবা সম্পর্কের ওঠানামার পর্যায়ে, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুখে ভোগা মানুষ, নেশাগ্রস্ত মানুষ, নিঃসঙ্গ মানুষ, এমন অনেক কিছুই বাহ্যিক অথবা অন্তরালের কারণ হতে পারে।
মনের রোগের কথা অবশ্যই ভাবতে হবে, যার সিংহভাগ এখন মানসিক অবসাদ, যদিও বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, মদ্যপানে আসক্তিতে সুইসাইডের সংখ্যাও বড়ো কম নয়।
ব্যক্তিত্বের কোনও কোনও ধরনে, বিশেষত যেখানে ঝোঁকের মাথায় কোনও কিছু করার প্রবণতা থাকে, আত্মহত্যার আশঙ্কা বেশি। কমবয়সিদের মধ্যে অনেকের এখন বর্ডারলাইন পার্সনালিটি ডিসঅর্ডার দেখা যায়, যাদের জীবন অনেকটা রোলার কোস্টারের মতন, মনমেজাজের ওঠানামা লেগেই থাকে। এরা সম্পর্কের কাঙাল, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া আর নতুন সম্পর্ক তৈরি হওয়া, দুটোই ঘনঘন হয়।
আজকাল নার্সিসিস্টিক ধরনের ব্যক্তিত্বের মানুষও বহু, যাঁদের ভালোবাসা নিজেকে ঘিরেই। একটা আত্মগর্বী ভাব সবকিছুতেই যেন জেগে থাকে। অসম্ভব সংবেদনশীল এঁরা, তাই সামান্যতম বিষয়, যাতে নিজেদের ছোটো করা হচ্ছে বলে মনে হয় তাতেই জ্বলে ওঠেন। জীবনের কোনও ব্যর্থতা, হার, এসবও এক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটিয়ে দেয়। তার মানে, প্রবল রাগ, আত্মাভিমান, হার মেনে নিতে না-পারার বৈশিষ্ট্য অনেক জীবনেই বিপদ ডেকে আনে।
যাঁরা সদা উদ্বিগ্ন কিংবা যাঁদের মধ্যে লজ্জার বোধ খুব বেশি, কী করে মুখ দেখাব এই ভাবনায় যাঁরা বিহ্বল, তাঁদের মানসিক গঠনে সবসময়ই একটা গেল, গেল ভাব থাকে।
অনেকের আবার কমিউনিকেশন প্রবলেম থাকে। অন্য লোকের কথা সঠিক বোঝা অথবা নিজেদের কথা, আবেগ ইত্যাদি গুছিয়ে প্রকাশে ত্রুটি এঁদের। ফলে ‘ভালনেরাবল গ্রুপ’ বলতে যা বুঝি আমরা, সে আওতায় এঁরাও আছেন। এঁদের সব থাকলেও যাকে চলতি কথায় ‘প্রবলেম সলভিং স্কিল’ বলে, সেটার অভাব, তাই অল্পেই ভেঙে পড়েন।
আমাদের দেশের বর্তমান প্রবণতার দিকে নজর রাখলেই দেখা যাবে দুটো অসমবয়সী দলের মধ্যে আত্মহত্যার হার উত্তরোত্তর বাড়ছে।
প্রথমটা কমবয়সিদের। ছাত্র-ছাত্রী, অভিযাত্রিক মানুষ সব। বুদ্ধি আছে, অভিজ্ঞতা কম। হতাশা মেনে নেওয়ার শক্তি কম। আধফোটা ফুল, স্বপ্ন ঢের, ঝোঁকের মাথায় কাজ করে ফেলে। এ বয়সের কত না চাপ। কেরিয়ার, সম্পর্ক, আইডেনটিটি। নেশা আছে, ইন্টারনেট আছে, সন্তোষ নেই।
রোজ-ই কাগজে এ-বয়সের এমন যত ঘটনা জানছেন, তাদের অনেকেই অবসাদে ভোগা সত্ত্বেও চিকিৎসার দরজায় পৌঁছানোর সুযোগ পায়নি, এত ভালো মেয়ে, এত ভালো রেজাল্ট করে, ওর আবার কীসের দুঃখ? কারও কারও এই কাজটা ইনস্ট্রুমেন্টাল, ভয় দেখানোও বলতেই পারেন, বাইক দাও, মোবাইল দাও, নইলে…, কী করে বুঝবেন?
কারও কারও জীবনের কষ্টের, না-পারার অসহায়তার এটাই সংকেত।
কারও জীবনে অসম্পূর্ণতার জন্ম দিয়েছে সম্পর্ক। সম্মতি মেলেনি, আনরিকুইটেড লাভ।
অর্থাৎ একের সঙ্গে অন্যের প্রভেদ বিস্তর। আশার কথা, যত সুইসাইডের চেষ্টা হয় এ বয়সে, তাদের অনেকেই বেঁচে যায়।
এবার দ্বিতীয় দল — এদেশের প্রবীণ নাগরিকদের মধ্যেও কিন্তু আত্মহত্যার হার যথেষ্ট। এঁদের অনেকের নিঃসঙ্গতা এবং নিজেদের বোঝা হিসেবে দেখা, এই দুই ভাবনা প্রবল।
বেশি বয়সেও কিন্তু অবসাদ যথেষ্টই হয়, যদিও তা নির্ণয় করার দক্ষতা সকলের (চিকিৎসক সমেত) থাকে না। রাতের ঘুম না হওয়া থেকে শুরু করে বারংবার কোষ্ঠকাঠিন্যের কথা বলাটাও যে ডিপ্রেশন হতেই পারে, সেটাই তো ভাবি না কেউ। মনে হয়, এ বয়সে তো এমন হবেই! সামান্য চিকিৎসাতেও কিন্তু বয়স্ক মানুষের ডিপ্রেশন সাড়া দেয়।
আর এ-বয়সের আত্মহত্যার চেষ্টায় কিন্তু মৃত্যুর হার অনেক বেশি। নিজের শান্তি স্বস্ত্যয়ন করাচ্ছেন, পছন্দের জিনিস একে তাকে দিয়ে দিচ্ছেন, উইল করার কথা বলছেন, এসবও কি খেয়াল করছি আমরা?
যাঁরা দীর্ঘ কাল অসুখে ভোগেন, তাঁদের মনেও এমন ভাবনা থাকে।
মানুষের মনের সমীক্ষায় দেখা গেছে, অবসাদে ভোগা মানুষের মনে আত্মহত্যার ছোটখাটো এলোমেলো ভাবনা অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই থাকে। এ ভাবনা চলেও যায় আবার, তবে কোন সূত্র ধরে এইসব ভাবনা আত্মহত্যার চৌকাঠ পেরিয়ে যায়, এটা সবসময় বোঝা মুশকিল! বিজ্ঞানী স্নাইডম্যান, যিনি সারাজীবন এই নিয়েই কাজ করেছেন, তাঁর মতে, এই কারক অংশটি আসলে বেদনা! অসম্ভব কষ্ট একটা, যা থেকেই মুক্তি চায় মানুষ। এই কষ্টের নামও দিয়েছিলেন তিনি, তাঁর শব্দবন্ধে এটি ‘সাইকেক’।
বারুদের স্তূপে দেশলাই কাঠি জ্বালানোর কাজটা অবশ্য করে আপাত তুচ্ছ অথবা আপাত গুরুত্বপূর্ণ কোনও ঘটনা, যাকে প্রেসিপিটেটিং ফ্যাক্টর বলা যায়!
ধরা যাক একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা। এখানে দারিদ্র্য আছে। স্বামীটির সপ্তাহান্তে মদ্যপান আছে। কারণে অকারণে স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা আছে। বৌটি দুয়েক বার ঘুমের বড়ি খেয়েছে। ক-দিন পর সমস্যা মিটেও গেছে। আবার কোনও একটা কারণে ঝগড়া হয়েছে, মেয়েটি কোলের ছেলের কথা ভেবে আর কিছু করেনি। একদিন সে যখন শুনছে, তার স্বামীটির আর কোনও সম্পর্ক আছে, সেদিন ঝগড়া চেঁচামেচি চূড়ান্ত হল, তারপর সব চুপচাপ। ভোরবেলা ঝুলে পড়ল মেয়েটি, এই অপমানটা সে নিতে পারেনি।
ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিলই। একটা আগুনের ফুলকি সমাপ্তি রেখাটা দেগে দিল মাত্র!
এমন ঘটনা প্রায় রোজ-ই ঘটছে। দূরবর্তী এবং নিকটবর্তী, কারণগুলো চোখের সামনে পড়ে থাকলেও প্রায় সময় চোখ এড়িয়ে যায়। ঘটনার পর আমরাই হা-হুতাশ করি, তারপর ভুলেও যাই।
মনোরোগ বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতায় বারবারই আমার মনে হয়েছে, আমরা যেন আগে থেকেই অনেক কিছু স্থির করে বসে আছি। তথ্যের জায়গায় মিথ নামের মিথ্যে বসিয়েছি। মনে মনে ভাবছি, যারা বারবার সুইসাইডের কথা বলে তারা নাটক করে, ভয় দেখায়, কিন্তু সুইসাইড করেনা… অথবা সুইসাইড যে করবেই তাকে রোখা যাবেই না…
ধরেই নিচ্ছি আর কিছুই করার নেই। সেই ফাঁকে ভুলগুলো আরও জাঁকিয়ে বসছে।
মানুষ একবারই বাঁচে। যত অসঙ্গতিই থাক সেখানে, এই বাঁচার সুযোগটা তৈরি করার তাগিদ কোথায়?
বাজারি মিডিয়া ফলাও করে সেলিব্রেটি সুইসাইডের খবর ছাপে, সেনসেশন তৈরির সুযোগ ছাড়বে না তারা। মাত্রাছাড়া সুইসাইড রিপোর্টিং-এ নিয়ম মানার কোনও ব্যাপার নেই। তাঁরা বোঝান, পরীক্ষায় ফেল মানে আত্মহত্যা, সম্পর্ক ভুল মানে সুইসাইড, আর আমরাও কেমন নির্বিবাদে পাখিপড়ার মতো সে কথাই আউরে চলেছি। যদি সত্যিই কাজ করতে হয় তো ডিপ্রেশন কি মদ বা মাদকআসক্তি চিকিৎসার মতো ‘মডিফায়েবল রিস্ক ফ্যাক্টর’-গুলোকে চেপে ধরি! বিপর্যস্ত করি মিথগুলো, তবেই না বদলাবে সংখ্যাতত্ত্ব!
কোটি কোটি মানুষ মনের অবসাদে ভুগছেন। সাধারণ মানুষের কাছে অবসাদ বা ডিপ্রেশনের ধারণাটা ভাসা ভাসা। মন খারাপ মানেই ডিপ্রেশন নয়। একটানা দু-সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে যদি ক্লান্তি,পরিবেশের পছন্দের বিষয়েও অনাগ্রহ, মন খারাপ, কিচ্ছুই ভালো লাগছে না, প্রায় সব বিষয়েই হতাশ ভাব, আমার দ্বারা আর কিছুই হবে না, সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হচ্ছে সারাদিন কীভাবে কাটাব, হাজার দুশ্চিন্তা অথচ কিছুই করতে পারছি না, কখনও মনে হয়, এভাবে বেঁচে থাকার কোনও মানেই তো নেই, এইসব মিলেজুলে তৈরি হয় অবসাদের কাঠামো।
অচিকিৎসিত অবসাদ আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়াবেই।
যে সব উপাত্তের কথা শুরুতেই বলেছি তা হয়তো কিছুটা স্পষ্ট হল।
আত্মহত্যা অবশ্যই একটি প্রতিরোধযোগ্য সমস্যা। একই সাথে বলতে হবে এটা একটা জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নও।
মনোরোগের চিকিৎসক কিংবা মনোবিদের হাতে এর সমাধান নেই।
সমাজের সব স্তরের মানুষের ভাবনায় এ-বিষয়ের গুরুত্ব যেদিন স্থান পাবে, একমাত্র সেদিনই আত্মহত্যা কিংবা অবসাদ মুছে দেওয়ার চাবিকাঠিটা খুঁজে পাওয়া যাবে।