সৌরভ মধুর দে
ভূমিকা
মানসিক চাপ যে স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, তা বলাই বাহুল্য। মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যের অধ্যয়ন হল সামাজিক এবং জৈব চিকিৎসা বিজ্ঞান, উভয়ক্ষেত্রেই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির একটি। সাম্প্রতিক দশকগুলিতে, গবেষকরা মানসিক চাপ স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে কিনা, এই জানা বিষয় থেকে সরে, কোন্ ধরনের মানসিক চাপের উৎসগুলো কীভাবে স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে আরও সম্যকভাবে অনুসন্ধান করা শুরু করেছেন। এই অনুসন্ধান গুলো সামাজিক মনোবিজ্ঞানের মূল ধারণাগুলির উপর ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে, এবং বুঝতে সাহায্য করে যে একজন ব্যক্তি কতটা চাপের সংস্পর্শে এসেছে, এবং স্বাস্থ্যের উপর চাপের প্রভাব সামাজিক কারণগুলির উপর ভিত্তি করে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। জাতি, আর্থ-সামাজিক অবস্থা (এসইএস), লিঙ্গ, বয়স, এবং মোকাবিলা শৈলী সহ মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য।
এই অধ্যায়ে, আমরা প্রথমে স্ট্রেস মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যের অধ্যয়নের মূল ধারণাগুলি বর্ণনা করব। দ্বিতীয়ত, আমরা মূল তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সংক্ষিপ্তসার করব যা মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যের উপর সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার কাঠামো তৈরি করে। তৃতীয়ত, আমরা ব্যবহৃত পদ্ধতি পর্যালোচনা করব, সেইসঙ্গে এই পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত সীমাবদ্ধতাগুলিও বিশ্লেষণ করতে সচেষ্ট হব। এমপিরিকাল বা অভিজ্ঞতামূলক গবেষণার উদাহরণের মধ্যে দিয়ে আমরা প্রারম্ভিক জীবনের প্রতিকূলতা, কাজ, পরিবার এবং পরিবেশগত স্ট্রেন সহ একাধিক ডোমেন বা অঞ্চল জুড়ে চাপের একটা মানচিত্র আঁকার চেষ্টা করব। আমরা লিঙ্গ, জাতি, আর্থসামাজিক অবস্থান বা সোশিওইকোনমিক স্টেটাস, এবং স্ট্রেসের প্রাদুর্ভাব এবং প্রকৃতি, স্ট্রেসের এর সঙ্গে যুঝতে পারা বা কোপিং এর উপায় বা রিসোর্স এবং চাপের ফলাফল সম্পর্কিত জীবনধারার পার্থক্যগুলিও আলোকপাত করব।
‘স্ট্রেসর’
‘স্ট্রেসর’ বলতে বোঝায় পরিবেশগত, সামাজিক, জৈবিক, বা মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা যার জন্য একজন ব্যক্তিকে তার স্বাভাবিক আচরণের ধরনগুলিকে সেই চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে চালাতে হয়। প্রারম্ভিক স্ট্রেস গবেষণা, প্রাণীদের উপর পরিচালিত হয়েছিল, যেখানে মানসিক চাপকে চরম তাপমাত্রার মতো ক্ষতিকারক পরিবেশগত উদ্দীপনার এক্সপোজার হিসাবে ধারণা করা হয়েছিল (Selye, 1956)। বিপরীতে, মানব বিষয়ক গবেষণা, সাধারণত সামাজিক চাপের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে থাকে (Holmes & Rahe, 1967; Wheaton, 1999)। সামাজিক চাপ তিনটি প্রধান বিভাগে পড়ে: জীবনের ঘটনা, দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেন এবং দৈনন্দিন ঝামেলা। জীবনের ঘটনাগুলি হল তীব্র পরিবর্তন যেগুলোর তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ের মধ্যে সামঞ্জস্যের প্রয়োজন হয়, যেমন চাকরি হারানো। সাধারণভাবে, একটি চাপপূর্ণ জীবনের ইভেন্টের প্রভাব, তার মাত্রা, প্রত্যাশিত অবস্থা এবং সময়ের উপর নির্ভর করে, যেখানে ঘটনাগুলি অপ্রত্যাশিত (যেমন, স্বামী/স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যু) বা ‘অফ টাইম’ (যেমন, অকালে বিধবা হওয়া) বিশেষভাবে ঘটে এবং যথেষ্ট পীড়াদায়ক হয়। একটি সাব-টাইপ, ট্রমাজনিত জীবনের ঘটনা, যাকে একজন ব্যক্তির শারীরিক বা মানসিক সুস্থতার জন্য চরম ঝুঁকি বলে মনে করা হয়। যেমন, যৌন নিপীড়ন বা সামরিক যুদ্ধ, স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকারক এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে (Thoits, 2010, p. S43)। যদিও প্রারম্ভিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলি সমস্ত বিঘ্নিত জীবনের ঘটনাগুলিকেই দুঃখজনক হিসাবে দেখত (Holmes & Rahe, 1967)। সমসাময়িক গবেষণায় দেখা যায় যে একটি ঘটনার প্রভাব একজনের ‘ভুমিকা ইতিহাস’ বা role history (Wheaton, 1990) এর সঙ্গে সম্পর্কিত, অর্থাৎ ভূমিকার গুণগতদিকের ওপর নির্ভর করে। মানে, সেই ভূমিকা যেখানে মানুষ প্রবেশ করে বা যেখান থেকে মানুষ প্রস্থান করে, তার গুণগত দিকের ওপর। একজন আপত্তিজনক পত্নীর কাছ থেকে বিবাহবিচ্ছেদ, বা অসহনীয় চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া সুস্থতা বৃদ্ধি করতে পারে। বিপরীতদিকে, বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান ভূমিকার ক্ষতি, সুস্থতার রাস্তায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। একটি সম্পর্কিত, কিন্তু খুব কমই তদন্ত করা ধারণা হল অ-ইভেন্ট বা non-event; সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতামূলক গবেষণা দেখায় যে এমন একটি ঘটনার সম্মুখীন না হওয়া যা একজনের প্রত্যাশা ছিল, যেমন বিয়ে করা বা সন্তান জন্ম দেওয়া, একজনের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে (Carlson, 2010)।
দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসগুলি হল ক্রমাগত এবং পুনরাবৃত্ত চাহিদা যার জন্য স্থায়ী সময়ের জন্য অভিযোজন প্রয়োজন, যেমন একটি চাপযুক্ত বিবাহ, চাপযুক্ত চাকরি, বা একটি বিপজ্জনক পাড়ায় বসবাস করা। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেনগুলি সাধারণত তিনটি উপশ্রেণিতে পড়ে : পদমর্যাদাগত, ভূমিকাগত এবং পরিবেষ্টিত স্ট্রেস। পদমর্যাদাগত বা স্ট্যাটাস স্ট্রেনগুলি সামাজিক কাঠামোতে একজনের অবস্থান থেকে উদ্ভূত হয়, যেমন একটি জাতিগত বা জাতিগত সংখ্যালঘু বা দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করা। ভূমিকার স্ট্রেসগুলি হল দ্বন্দ্ব বা সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কিত দাবি, যেমন পেশাগত দায়িত্ব এবং পারিবারিক দাবির মধ্যে দ্বন্দ্ব। পরিবেষ্টিত স্ট্রেসগুলি শারীরিক পরিবেশের চাপপূর্ণ দিকগুলিকে বোঝায়, যেমন শব্দ বা দূষণ (Pearlin, 1999)।
দৈনন্দিন ঝামেলা (Daily hassles) হল ছোটখাটো নানান ঘটনাবলি যার সঙ্গে সারাদিন মানিয়ে চলতে হয়, যেমন ট্রাফিক জ্যাম, বা স্ত্রীর সাথে ঝগড়া (Lazarus & Folkman, 1984)। অধিকন্তু, দীর্ঘ সময় ধরে পুনরাবৃত্তি হওয়া দৈনন্দিন ঝামেলা দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেনে পরিণত হতে পারে এবং স্বাস্থ্যের উপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ফেলতে পারে।
স্ট্রেস স্পিলওভার (Stress spillover) বলতে সেই প্রক্রিয়াকে বোঝায় যেখানে একটি ডোমেনে বা অঞ্চলে স্ট্রেস, যেমন কাজের চাপ, অন্য ডোমেনে যেমন একজনের পারিবারিক সম্পর্কে স্ট্রেস তৈরি করতে পারে, তাই নাম ‘স্পিল ওভার’, (Grzywacz, Almeida, 2005) বা সাদা বাংলায় ‘উপচে পড়া’। সেকেন্ডারি স্ট্রেসর বলতে সেসব স্ট্রেসকে বোঝায় যা জীবনের একটি বড় ঘটনার পর উদ্ভূত হয়; উদাহরণস্বরূপ, চাকরি হারানো আর্থিক স্ট্রেসের কারণ হতে পারে (Price, Choi, & Vinokur, 2002)।
স্ট্রেসরের ক্ষেত্রে একজনের সংবেদনশীলতা তার সামাজিক অবস্থান অনুসারে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়, যা জাতি, লিঙ্গ, বয়স এবং শ্রেণী স্তরবিন্যাসের ধরনকে প্রতিফলিত করে। উদাহরণস্বরূপ, নারীরা ঐতিহাসিকভাবে বিবাহ, সন্তান লালন-পালন, কর্ম-পরিবার ওভারলোড সম্পর্কিত বেশি চাপের শিকার হয়েছে যেখানে পুরুষরা, গড়ে আর্থিক এবং চাকরি-সম্পর্কিত চাপের জন্য চাপের শিকার হয়েছে; তবে পুরুষ ও মহিলাদের সামাজিক ভূমিকার পরিবর্তন এবং একত্রিত হওয়ার সাথে সাথে এই পার্থক্যগুলি একত্রিত বা পরিবর্তন হতে পারে (Thoits, 2010)। জাতিগত সংখ্যালঘুদের, শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় তাদের সংখ্যালঘু অবস্থার সাথে বৈষম্য এবং দুর্ব্যবহার সম্পর্কিত মানসিক চাপের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। জাতিগত সংখ্যালঘু, সেইসাথে নিম্ন আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যক্তিরা, শ্বেতাঙ্গ এবং উচ্চতর আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যক্তিদের তুলনায় অর্থনৈতিক স্ট্রেস, দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্ব, দারিদ্র্য, শারীরিকভাবে বিপজ্জনক কাজের পরিস্থিতি এবং অপরাধের শিকার হওয়ার মতো অনিরাপদ এলাকায় বসবাসের সাথে যুক্ত চাপের সম্মুখীন হয়ে থাকে। (Meyer et al., 2008)। বিপরীতে, বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্করা বিশেষত অক্ষমতার সূত্রপাতের পরে তাদের নিজের এবং তাদের স্ত্রীর ক্ষয়িষ্ণু স্বাস্থ্য, যত্ন নেওয়ার স্ট্রেন, স্বামী / স্ত্রী এবং সহকর্মীদের মৃত্যু নিয়ে বোঝাপড়া করার ক্ষেত্রে অধিক চাপের সম্মুখীন হয়ে থাকেন (Zarit & Zarit, 2007)।
চাপ মোকাবিলার কৌশল
মানসিক চাপ কতটা স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে তা একজনের মোকাবিলার কৌশল দ্বারা নির্ধারিত হয়। মোকাবিলা বলতে বোঝায় ‘নির্দিষ্ট বাহ্যিক এবং/অথবা অভ্যন্তরীণ চাহিদাগুলি পরিচালনা করার জন্য জ্ঞানীয় এবং আচরণগত প্রচেষ্টা, যে চাহিদাগুলি ব্যক্তির আভ্যন্তরিন রিসোর্স বা সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে থাকে’ (Lazarus & Folkman, 1984, p. 141)। সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক-ভিত্তিক স্ট্রেস গবেষকদের দ্বারা চিহ্নিত দুটি প্রধান কৌশল হল সামাজিক সমর্থন বা Social support এবং আয়ত্ত এবং/অথবা অনুভূত নিয়ন্ত্রণ বা mastery and/or perceived control (Pearlin, 1999; Pearlin, Lieberman, Menaghan, & Mullan, 1981)। সামাজিক সমর্থন বলতে সম্পদগত, মানসিক এবং তথ্যগত সহায়তা বোঝায় যা একজন অন্যদের কাছ থেকে নেয়। আয়ত্ত বলতে একজনের বিশ্বাসকে বোঝায় যে তারা একটি চাপপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করতে পারে। আয়ত্তের একটি উচ্চ বোধ স্বাস্থ্যের উপর সরাসরি প্রতিরক্ষামূলক প্রভাব ফেলে, এবং স্ট্রেসের ক্ষতিকারক প্রভাবগুলির বিরুদ্ধে বাফার বা রক্ষা করে (Ross & Mirowsky, 1989)। যাইহোক, মানসিক যন্ত্রণা এবং হতাশা সহ স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া ব্যক্তিদের মোকাবেলা করার স্বাভাবিক স্তরগুলি হ্রাস করতে পারে, যখন সেই সংস্থানগুলি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়।
মানুষ তার আচরণ, চিন্তাভাবনা বা আবেগে যে পরিবর্তনগুলি আনে চাপের সঙ্গে যুঝতে বা চাপের সাথে বোঝাপড়া করার ক্ষেত্রে বা চাপের প্রতিক্রিয়া হিসাবে, সেগুলোই হ’ল চাপ মোকাবিলা করার কৌশল (Lazarus & Folkman, 1984)। দুটি প্রধান কৌশল হল সমস্যা-কেন্দ্রিক মোকাবিলা (problem oriented coping), যেখানে কেউ এমন পরিস্থিতি পরিবর্তন করার চেষ্টা করে যা স্ট্রেস সৃষ্টি করছে (যেমন, একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক থেকে প্রস্থান) বা স্ট্রেসকে পুনরাবৃত্তি করা থেকে বিরত রাখা এবং আবেগ-কেন্দ্রিক মোকাবিলা (emotion-based coping), যেখানে কেউ তাদের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করে বা মানসিক চাপ সম্পর্কিত অনুভূতির পরিবর্তন করে। যাইহোক, আবেগ-কেন্দ্রিক মোকাবিলা বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে যখন স্ট্রেসরের পরিবর্তন করা যায় না (Reynolds et al., 2000)।
একটি নির্দিষ্ট মোকাবিলার কৌশলের নির্বাচন এবং কার্যকারিতা আংশিকভাবে, একজনের মোকাবিলা করার সংস্থান এবং সেইসঙ্গে একজনের মোকাবিলার শৈলী দ্বারা নির্ধারিত হয়। মোকাবিলা করার শৈলী বলতে একজনের সাধারণ অভিযোজন এবং সমস্যাগুলি মোকাবিলার পথগুলিকে বোঝায়, যেমন চাপের মুখোমুখি হওয়া বনাম সেই চাপকে অস্বীকার করা অর্থাৎ confronting versus denying (Menaghan, 1983)। যাইহোক, মোকাবিলার শৈলী এবং কৌশলগুলি এককভাবে মানসিক চাপে স্বাস্থ্যের পরিণতিগুলিকে সম্পূর্ণরূপে নির্ধারণ করে না: কাঠামোগত, জনসংখ্যাগত এবং মনোসামাজিক কারণ — যেমন শিক্ষা, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সংস্থান এবং জ্ঞানীয় নমনীয়তাও মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে (Thoits, 2010)।
জনসংখ্যা উপগোষ্ঠীগুলি তাদের অ্যাক্সেস এবং নির্দিষ্ট মোকাবিলা সংস্থানগুলির উপর নির্ভরতার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যে গোষ্ঠীগুলি ঐতিহাসিকভাবে কম সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী, তাদের অনুভূত নিয়ন্ত্রণ এবং চাপকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রভুত্ব নিম্ন স্তরের হয়ে থাকে। নারী, জাতিগত এবং জাতিগত সংখ্যালঘু, এবং শিক্ষার নিম্ন স্তরের ব্যক্তিরা, চাপকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রভুত্ব তাদের অ-সংখ্যালঘু সমকক্ষদের তুলনায় কম আয়ত্ত করে থাকে (Turner & Roszell, 1994)।
জাতিগত পরিচয়ের (ethnic identity) দৃঢ় অনুভূতিও এমন একটি সম্পদ যা মানসিক চাপ, বিশেষ করে জাতিগত বৈষম্য থেকে রক্ষা করে। উদাহরণস্বরূপ, জাতিগত গর্ব, একজনের জাতিগত সম্প্রদায়ের সাথে দৃঢ় বন্ধন, এবং একজনের জাতিগত গোষ্ঠীর প্রতি অঙ্গীকারের অনুভূতি ফিলিপিনো এবং আফ্রিকান-আমেরিকানদের (Sellers & Neighbors, 2008) বৈষম্য জনিত চাপের মুখ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে থাকে।
সামাজিক কারণ এবং চাপ
স্ট্রেস এবং স্ট্রেস-সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞানে যথেষ্ট পরিমাণে অভিজ্ঞতামূলক বা empirical গবেষণা রয়েছে। সামাজিক স্ট্রেস, স্ট্রেস অভিযোজন, সামাজিক গোষ্ঠীর প্রভাব, সামাজিক মূলধন বা social capital, পারিপার্শ্বিকতার অসুবিধা বা neighbourhood disadvantage, জীবনের ঘটনাগুলির পরিবর্তন এবং আর্থ- সামাজিক অবস্থার উপর প্রাসঙ্গিক গবেষণা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নির্বাচিত ফলাফলগুলি এখানে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করেছি। এই বিভাগের উদ্দেশ্য হল কীভাবে সমসাময়িক সমাজবিজ্ঞানীরা আমাদের সামাজিক চাপ বোঝার ক্ষেত্রে সাহায্য করছেন, তা পর্যালোচনা করা।
সামাজিক চাপ
আমাদের বোঝার একটি উপায় হল সামাজিক চাপ চিহ্নিত করা। Leonard Pearlin (১৯৯৯) দুটি প্রধান প্রকারের পরামর্শ দিয়েছেন : জীবনের ঘটনা প্রবাহ এবং দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস বা চাপ। প্রথমত, বিবাহবিচ্ছেদ, বিবাহ বা চাকরি হারানোর মতো জীবনের ঘটনাগুলির চাপ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসগুলি হল যা তুলনামূলকভাবে স্থায়ী দ্বন্দ্ব বা conflict, সমস্যা এবং ঝুঁকির সম্মুখীন হওয়া, যা গড়পড়তা বেশিরভাগ মানুষ দৈনন্দিন ভিত্তিতে সম্মুখীন হয়। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের মধ্যে সামাজিক ভূমিকাগত অতিরিক্ত বোঝা বা role burden বা role overload অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেমন কাজের সাথে যুক্ত স্ট্রেস এবং একজন পিতামাতা হওয়া বা জীবনের গতিপথে নিজের ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা। এতে role set এর মধ্যেও দ্বন্দ্ব জড়িত, যেমন স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে; যেখানে একজন ব্যক্তির অনেকগুলো ভূমিকা থাকে সেখানে আন্তঃভূমিকার দ্বন্দ্ব দেখা যায়, ভূমিকা বন্দিত্ব বা role captivity যেখানে একজন ব্যক্তি একটি ভূমিকার মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে আটকে পড়ে যেমন অপ্রীতিকর চাকরি বা বিবাহ। পার্লিন (১৯৯৯) যেমন দেখেছেন, ভূমিকার স্ট্রেনগুলি ব্যক্তিদের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ ভূমিকাগুলি নিজেরাই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন তারা চাকরি, বিবাহ, অভিভাবকত্ব ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত।
স্ট্রেস অভিযোজন
বহু বছর আগে, Mechanic (১৯৭৮) সমাজ এবং ব্যক্তি উভয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে চাপের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি William I. Thomas এর কাজের দ্বারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হন, যিনি উল্লেখ করেছিলেন যে সংকটের অর্থ পরিস্থিতির মধ্যে নয়, বরং পরিস্থিতি ও তার ঊর্ধ্বে ওঠার মধ্যে যে মিথস্ক্রিয়া সেই মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে নিহিত রয়েছে। একটি সংকটের ফলাফল বা প্রভাব নির্ভর করে একজন ব্যক্তি পরিস্থিতির সাথে কতটা ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে তার উপর। অতএব, অনুভূত বা perceived চ্যালেঞ্জের ফলে ব্যক্তি দ্বারা অভিজ্ঞ অসুবিধাগুলিকে স্ট্রেস বোঝায়।
মেকানিক বিশ্বাস করতেন যে সামাজিক পরিস্থিতিতে মানুষের সমস্যা মোকাবিলার বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা এবং ক্ষমতা থাকে। আবেগগত প্রতিরক্ষা বা emotional defence এর ক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই সমান মাত্রার নিয়ন্ত্রণ নেই। কোনো বিশেষ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার সময়, একজন পর্যবেক্ষককে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে যে একজন ব্যক্তি ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত কিনা।
ব্যক্তি থেকে সামাজিক উপাদানে তার মানসিক চাপের ধারণাকে প্রসারিত করে, মেকানিক বলেছেন যে একজন ব্যক্তির সমস্যা মোকাবিলা করার ক্ষমতা একটি সমাজের প্রস্তুতিমূলক প্রতিষ্ঠান, যেমন স্কুল এবং পরিবার দ্বারা প্রভাবিত হয়। একজন ব্যক্তির মানসিক নিয়ন্ত্রণ এবং মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও সমাজের উৎসাহ প্রদানকারি ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত; যেমন যারা সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করেছে (বা করেনি) তাদের জন্য সমাজের পুরষ্কার (বা শাস্তি) -এর ব্যবস্থা রয়েছে। সমাজের মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠানগুলো একটি নির্দিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে সম্মতিসূচক বা অসম্মতিসূচক কিছু নীতি নির্ধারণ করে থাকে।
একজন ব্যক্তির মধ্যে চাপজনিত শারীরবৃত্তীয় ক্ষতি বা পরিবর্তনের পরিমাণ নির্ভর করে: (১) উদ্দীপক পরিস্থিতি, ব্যক্তির কাছে পরিস্থিতির মূল্য বা গুরুত্ব; (২) একজন ব্যক্তির উদ্দীপক পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ক্ষমতা, যেমন জেনেটিক কারণ, ব্যক্তিগত দক্ষতা, সহজাত ক্ষমতা এবং অতীত অভিজ্ঞতা; (৩) সমস্যা মোকাবিলায় সমাজের দ্বারা ব্যক্তির প্রস্তুতি; এবং (৪) সমাজের অনুমোদিত আচরণের ধরনের প্রভাব।
মেকানিকের মডেল আমাদের স্ট্রেস বোঝার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এটি অভিযোজনের গুরুত্ব দেখায় এবং ব্যাখ্যা করে যে কীভাবে সেই অভিযোজন জীবনের পরিস্থিতি সম্পর্কে একজন ব্যক্তির উপলব্ধির উপর ভিত্তি করে, চাপের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমাজের দ্বারা তার প্রস্তুতির মাত্রার সাথে মিলিত হয়।
স্ট্রেস এবং সামাজিক গোষ্ঠী
একটি ঘটনা সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি তার বুদ্ধিমত্তা, অতীত অভিজ্ঞতা, সামাজিকীকরণ এবং উদ্দীপনা সম্পর্কে সচেতনতার দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, তবে গোষ্ঠী সদস্যতার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। Gordon Moss (১৯৭৩) চাপের সঙ্গে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে গোষ্ঠী সদস্যতার ভূমিকার তাৎপর্য আলোচনা করেছেন। দেখেছেন যে, চাপ এবং শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটতে পারে যখন লোকেরা তাদের বিশ্বাস বা আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে যায় বা এমন কোনো তথ্যের অভিজ্ঞতা লাভ করে । মস ব্যক্তির জন্য সামাজিক সমর্থন (social support) প্রদানে গোষ্ঠী সদস্যতার সুবিধার উপর জোর দিয়েছেন। একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে আত্মীকরণের ব্যক্তিগত অনুভূতি, সেই গোষ্ঠীতে নিজের গ্রহনযোগ্যতা ও গুরুত্বের অনুভূতি, উত্তেজনার উপসর্গগুলি থেকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন মস। এইভাবে, মস এর কাজ দেখাতে সক্ষম হয়েছে যে কীভাবে পরিবার এবং গোষ্ঠীগুলির দ্বারা প্রদত্ত সামাজিক সমর্থন শরীর এবং মনের উপর চাপের সম্ভাব্য ক্ষতিকারক প্রভাবগুলি হ্রাস করতে সহায়তা করে।
তদুপরি, সামাজিক ঘটনাগুলি কীভাবে ধারণা করে, সে সম্পর্কে একটি ঐকমত্য গড়ে তোলার জন্য ছোটো গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে প্রায়শই একটি প্রবণতা দেখা যায়। এই প্রক্রিয়াটি স্বতন্ত্র পার্থক্যকে কমিয়ে আনে, অনিশ্চয়তা কমায় এবং গোষ্ঠীর সামঞ্জস্যতা বজায় রাখে। গোষ্ঠী-অনুমোদিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংজ্ঞাগুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণতাকে সমাজবিজ্ঞান এবং সামাজিক মনোবিজ্ঞানে উদ্বেগ হ্রাসকারি অনুঘটক হিসাবে অনুমান করা হয়েছে।
সামাজিক মূলধন এবং স্বাস্থ্য
স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গোষ্ঠী ও সাংগঠনিক সদস্যতার গুরুত্ব, সামাজিক মূলধন ধারণার সাথে সম্পর্কিত। Bryan Turner (২০০৪:১৩) এটিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। সামাজিক মূলধন হল, ‘ব্যক্তিদের সামাজিক বিনিয়োগ আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী, নেটওয়ার্ক এবং তাদের সদস্যতার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ প্রতিষ্ঠান।’ তাঁর মতে, একজন ব্যক্তির তার বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীতে সদস্যতার যে বিস্তৃতি তা সেই ব্যক্তির সামাজিক মূলধনের পরিচায়ক। তবু সামাজিক পুঁজিকে শুধুমাত্র ব্যক্তি-বিশেষের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, বরং ব্যক্তির বাইরে বৃহত্তর সামাজিক গোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য একটি চরিত্র হিসেবেও একে দেখা যেতে পারে। সামাজিক পুঁজিকে Pierre Bourdieu (১৯৮৬) ব্যক্তি-বিশেষের সম্পত্তি হিসেবে দেখেছেন তার বিভিন্ন গোষ্ঠীতে সদস্যতার ওপর ভিত্তি করে। রবার্ট পুটনাম (২০০০) সামাজিক পুঁজিকে মূলত একটি সম্প্রদায়- স্তরের সম্পদ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যেটি নেটওয়ার্ক, নীতি ও বিশ্বাসের ওপর স্থাপিত সামাজিক সম্পর্কের কথা বলে। স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক মূলধন-এর ইতিবাচক প্রভাব হল গোষ্ঠীর সদস্যদের আত্মসম্মান বোধের উন্নতি, সহায়তার আশ্বাস, গোষ্ঠী ও সাংগঠনিক সম্পদে ব্যক্তির অধিকার যেগুলোর ইতিবাচক ও রক্ষাকারী বা buffering-র ভূমিকা রয়েছে চাপমুক্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে।
পারিপার্শ্বিকতার অসুবিধা
চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞানে, চাপ গবেষণার ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিকতার অসুবিধার উপর ক্রমবর্ধমান সাহিত্যে দেখা যায়। Catherine Ross (২০০০) পর্যবেক্ষণ করেছেন যে পারিপার্শ্বিকতার দৃশ্যমান শৃঙ্খলা এবং বিশৃঙ্খলার পরিপ্রেক্ষিতে একটি কন্টিনিউয়ামের মধ্যে রেটিং বা মূল্যায়িত করা যেতে পারে। আশেপাশের এলাকাগুলি পরিষ্কার এবং নিরাপদ করা, বাড়ি এবং ভবনগুলি ভালভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় এবং বাসিন্দারা একে অপরের প্রতি এবং একে অপরের সম্পত্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে। বিশৃঙ্খল পারিপার্শ্বিক এলাকাগুলি সামাজিক শৃঙ্খলার একটি ভাঙন প্রতিফলিত করে, কারণ সেখানে গোলমাল, আবর্জনা, খারাপভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা বাড়ি এবং ভবন, ভাঙচুর, ভয় এবং অপরাধ রয়েছে। রস জিজ্ঞাসা করেছিল যে যারা সুবিধাবঞ্চিত পাড়ায় বাস করে তারা কি তাদের পরিবেশের ফলে মানসিকভাবে পীড়িত হয় এবং উত্তরটি হ্যাঁ বলে পাওয়া গেছে। Ross and Mirowsky এর পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে যে সুবিধাবঞ্চিত পারিপার্শ্বিক বাসিন্দারা কম সুস্থ বোধ করেন এবং আরও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েন। তারা লক্ষ করেছেন যে এই আশেপাশের বাসিন্দারা অপরাধ, অসামাজিকতা এবং হয়রানি দ্বারা চিহ্নিত একটি চাপপূর্ণ পরিবেশে বাস করত এবং এই চাপযুক্ত অবস্থার দীর্ঘমেয়াদি এক্সপোজার তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। বিপরীতদিকে, সমৃদ্ধ আশেপাশের বাসিন্দারা তাদের স্বাস্থ্যকে সুবিধাবঞ্চিত আশেপাশের মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো রেট করেছে।
জীবনের পরিবর্তন
স্ট্রেস উৎপাদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল একজন ব্যক্তির জীবনের অভিজ্ঞতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ঘটনা। এই এলাকায় গবেষণা সাধারণত চরম পরিস্থিতিতে, যেমন যুদ্ধ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সাধারণ জীবনের ঘটনা উভয়ের প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়ার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। এই গবেষণাটি পরবর্তী দুটি উপধারায় পর্যালোচনা করা হয়েছে।
চরম পরিস্থিতি — প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো চরম পরিস্থিতিগুলি মানসিক চাপের একটি সম্ভাব্য উৎস বলে মনে হয়, কারণ এই ধরনের পরিস্থিতির সাথে মানুষের সাংঘাতিক উদ্বেগ সংযুক্ত থাকে। তবে দুর্যোগ সম্পর্কে একটি সাধারণ ভুল ধারণা হল যে লোকেরা সম্ভাব্য দুর্যোগ এলাকা থেকে আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে যায়। বাস্তবে, ক্ষতি বা ধ্বংসের সম্ভাবনা আসন্ন থাকলেও লোকেদের তাদের বাড়িঘর সরিয়ে নেওয়া সাধারণত কঠিন। এটি ২০০৫ সালে নিউ অরলিন্সে স্পষ্ট হয়েছিল, যখন হারিকেন ক্যাটরিনা দ্বারা শহর প্লাবিত হওয়ার পরও সেই স্থান পরিত্যাগ করেন নি। কিছু লোক এমনকী সম্ভাব্য বিপর্যয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং জোয়ার-ভাটা, টর্নেডো বা হারিকেন দেখার ঝুঁকি নেয়। একটি দুর্যোগ দেখার চেষ্টা করা এবং একজনের শিকার হওয়া, যাইহোক, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অতীতের গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে ভূমিকম্প, টর্নেডো এবং হারিকেনের মতো চরম পরিস্থিতি মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলি সাধারণত দেখায় বা বর্ণনা করে যে বড় আকারের বিপর্যয়ে লোকেরা শোক, ক্ষতি, যন্ত্রণা এবং হতাশার তীব্র অনুভূতি অনুভব করছে। এইভাবে, দুর্যোগের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি বোঝার উপযুক্ত কারণ রয়েছে, বিশেষ করে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার জন্য কর্মসূচির উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে।
নিউইয়র্ক সিটি এবং ওয়াশিংটন, ডিসি-তে ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১-এর সন্ত্রাসী হামলার পর, Hannah K. Knudsen (২০১৬) আমেরিকান কর্মীদের একটি জাতীয় নমুনার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিণতিগুলি তদন্ত করেছিলেন। আক্রমণের চার সপ্তাহের মধ্যে বিষণ্ণতার লক্ষণগুলি বৃদ্ধি পেলেও, উপসর্গগুলি পরে কমে যায় এবং পরবর্তীতে ১১ সেপ্টেম্বরের আগের স্তরে ফিরে আসে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সাইকোপ্যাথলজির অধ্যয়নে একটি প্যাটার্ন যেটি উদ্ভূত হয় তা হল যে দুর্যোগের অভিজ্ঞতা, যদিও গুরুতর, তবে সাধারণত সময়কালের মধ্যে কম হয় এবং একইভাবে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাবগুলি স্বল্পমেয়াদী এবং স্ব-সীমাবদ্ধ হতে থাকে। অ্যারন আন্তোনোভস্কি (১৯৭৯) দেখেছেন যে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা সবচেয়ে ভয়ানক অভিজ্ঞতার শিকার হওয়ার প্রভাবের সাথে মানিয়ে নিয়েছেন এবং এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বেঁচে যাওয়া অনেক মহিলা ভালভাবে মানিয়ে নিয়েছিলেন। বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের শিবির, ফিলিস্তিনে অবৈধ অভিবাসন, সাইপ্রাসে ব্রিটিশদের বন্দিত্ব, ইজরায়েলের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অর্থনৈতিক কঠোরতার দীর্ঘ সময়, ১৯৫৬ সালের সিনাই যুদ্ধ সত্ত্বেও অনেক মহিলা সুস্থ এবং সুখী ছিলেন, পরিবার গড়ে তুলেছিলেন, কাজ করেছিলেন এবং সম্প্রদায়ের কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন। আন্তোনোভস্কি যুক্তি দেন যে সমন্বয় বা coherence একটি শক্তিশালী অনুভূতি যা একজন ব্যক্তিকে আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি, ঘটনাগুলির পূর্বাভাসযোগ্যতার প্রতি বিশ্বাস এবং একটি ধারণা যে জিনিসগুলি সম্ভবত যুক্তিসঙ্গতভাবে ভালভাবে কাজ করবে বলে বিশ্বকে দেখতে দেয়।
জীবনের ঘটনা
জীবনের ঘটনা সম্পর্কিত গবেষণা একটি নির্দিষ্ট জীবনের ইভেন্টের উপর ফোকাস করে (উদাহরণস্বরূপ, যুদ্ধের সংস্পর্শে আসা) এবং দাবি করে যে এটি অন্য জীবনের ঘটনার (উদাহরণস্বরূপ, বেকারত্ব) থেকে বেশি চাপযুক্ত। বরং, এটি এই ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে একজন ব্যক্তির জীবনে বেশ কয়েকটি ঘটনার সঞ্চয় করে অবশেষে একটি সামগ্রিক চাপের প্রভাব তৈরি করে। জীবনের ঘটনা গবেষণায় বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল একজনের জীবনে যে কোনও ধরনের পরিবর্তন, হয় আনন্দদায়ক বা অপ্রীতিকর, উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করে কিনা বা মানসিক চাপ কি মূলতঃ অপ্রীতিকর ঘটনারই ফলাফল? যথেষ্ট প্রমাণ এই ধারণাটিকে সমর্থন করে যে, যে কোনও ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তন যার জন্য ব্যক্তিকে খাপ খাইয়ে নিতে হয় তা একটি নির্দিষ্ট চাপের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে (Selye 1956)। যাইহোক, বেশিরভাগ গবেষণা স্পষ্টভাবে অপ্রীতিকর ঘটনাগুলির পক্ষে গুরুত্ব প্রদান করেছে মানসিক চাপ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে (Thoits 2010)।
চাপ, পরিবর্তনের অনুভূত হারের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। দ্রুত পরিবর্তনের প্রভাব পরিবর্তনটি কাম্য বলে মনে করা হয়েছিল কিনা তা দ্বারা সংযত হতে পারে। দ্রুত পরিবর্তন এবং অবাঞ্ছিততা হল সবচেয়ে চাপজনক অবস্থা। জীবনে বাঞ্ছিত পরিবর্তনের থেকে অবাঞ্ছিত পরিবর্তন মানসিক উদ্বেগ ও চাপের বড়ো কারণ বলে তিনি মনে করেছেন। তাই জীবনে বড়ো পরিবর্তন এর চেয়েও সে পরিবর্তন বাঞ্ছিত কিনা তার গুরুত্ব অনেক বেশি বলে তিনি মনে করেছেন। অবাঞ্ছিত ঘটনা বা যে ঘটনা নিয়ন্ত্রণাধীন নয় সেই ঘটনার সঙ্গে সংপৃক্ত হয়ে থাকে মানসিক অস্থিরতা, হতাশা ও ক্রমবর্ধমান ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
জীবন ঘটনা গবেষণা, মানসিক চাপ এবং নির্দিষ্ট জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে অনুমিত সম্পর্ক সঠিকভাবে পরিমাপ করার গুরুতর সমস্যাগুলিও অন্তর্ভুক্ত করে। টমাস হোমস এবং রবার্ট রাহে (১৯৬৭) দ্বারা তৈরি করা সোশ্যাল রিডজাস্টমেন্ট রেটিং স্কেল বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী যন্ত্র। এই স্কেলটি অনুমানের উপর ভিত্তি করে যে পরিবর্তন, তা যতই ভালো বা খারাপ হোক না কেন, একটি নির্দিষ্ট মাত্রার সমন্বয়ের দাবি রাখে।
স্ট্রেস এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থা
আর্থ-সামাজিক অবস্থাও চাপ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিম্ন শ্রেণীকে সবচেয়ে বেশি চাপের অভিমুখ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, কারণ এর সাথে মোকাবিলা করার জন্য তাদের কাছে সবচেয়ে কম সম্পদ রয়েছ। মানুষ এবং প্রাইমেট উভয়ের অসংখ্য অধ্যয়ন পর্যালোচনা করার পর, Evans (১৯৯৪) নির্ধারণ করেছেন যে সামাজিক পদমর্যাদা স্ট্রেস পরিচালনা করার ক্ষমতার সাথে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে। সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসে একজনের অবস্থান যত উন্নত হবে, মানসিক চাপের পরিস্থিতি এবং শরীরের উপর চাপের প্রভাবগুলিকে তত ভালভাবে মোকাবিলা করতে সে সক্ষম হবে। এই সুবিধা আনুপাতিকভাবে হ্রাস পায় সামাজিক সোপান-এর নিচের দিকে। ফলস্বরূপ, Evans (১৯৯৪) পরামর্শ দিয়েছেন যে মানসিক চাপ মৃত্যুর সামাজিক গ্রেডিয়েন্টের প্রধান কারণ। স্বাস্থ্যের সাথে আর্থ-সামাজিক অবস্থার সম্পর্ক সামাজিক স্তরক্রমের প্রতিটি স্তরে ঘটে। একজনের জীবনের পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ সামাজিক শ্রেণীর অবস্থান অনুসারে পরিবর্তিত হয়। অতএব, ইভান্স উপসংহারে পৌঁছেছেন যে এটি মাইক্রোএনভায়রনমেন্টের গুণমান (বাড়ি এবং কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক হিসাবে সংজ্ঞায়িত) যা চাপপূর্ণ জীবনের ঘটনাগুলি থেকে স্ট্রেন-স্থানান্তরকে সহজতর করে। এটি কেবল ধনী হওয়া নয়, চাপের প্রভাবগুলি স্থানান্তর বা বাফার করার ক্ষমতা, যা শেষ পর্যন্ত শরীরের উপর চাপের প্রভাবের পরিমাণ নির্ধারণ করে।
সারসংক্ষেপ
সামাজিক কারণ এবং স্ট্রেস-সম্পর্কিত রোগের মধ্যে সম্পর্কের অধ্যয়ন গত ১৫ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রসর হয়েছে, কিন্তু এই সম্পর্কের সঠিক প্রকৃতি এখনও সম্পূর্ণরূপে বোঝা যায়নি। যদিও বিদ্যমান অধ্যয়ন থেকে এটা স্পষ্ট যে মানসিক চাপের অভিজ্ঞতা হল নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক অভিজ্ঞতার সংস্পর্শে আসার ফলে একজন ব্যক্তির পক্ষ থেকে একটি ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া। একজন ব্যক্তির উপর চাপের প্রভাব সম্পর্কে একটি মূল্যায়ন করার আগে, এটি জানতে হবে : (১) ঝুঁকির প্রকৃতি; (২) বিষয়গত সামাজিক পরিবেশ যার মধ্যে ঝুঁকি প্রদর্শিত হয়; (৩) জড়িত ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক শৈলী এবং ব্যক্তিত্ব; (৪) ব্যক্তির দ্বারা ঝুঁকির বিষয়গত সংজ্ঞা; (৫) ব্যক্তির উপর কাজ করে এমন সামাজিক প্রভাব, বিশেষ করে গোষ্ঠীর সদস্যপদ দ্বারা প্রদত্ত মানসিক সমর্থন; এবং (৬) ঝুঁকির সময়কাল। স্পষ্টতই, স্ট্রেস গবেষণা একটি জটিল অনুসন্ধানী প্রচেষ্টা! কিন্তু সামাজিক এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান উভয় ক্ষেত্রেই এই ধরনের গবেষণার সম্ভাব্য অবদান অপরিসীম। যেমন হাউস (১৯৭৪) উল্লেখ করেছেন, স্ট্রেস রিসার্চ শুধুমাত্র রোগের প্রক্রিয়া বোঝার জন্যই নয়, আচরণের বিস্তৃত পরিসর বোঝার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন আত্মহত্যা, অপরাধ, সামাজিক আন্দোলন, পারিবারিক হিংসা, সহিংসতা, শিশু নির্যাতন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা।
References Cited :
1. Almeida, D. M. (2005). Resilience and vulnerability to daily stressors assessed via diary methods. Current Directions in Psychological Science, 14, 62–68.
2. Bourdieu, Pierre. (1986) “The Forms of Capital.” Pp. 241-258 in Handbook of Theory and Research for the Sociology of Education, edited by J. G. Richardson. New York: Greenwood Press.
3. Carlson, D. L. (2010). Well, what did you expect?: Family transitions, life course expectations, and mental health. Doctoral dissertation, The Ohio State University, Columbus, OH. Evans, Peter (1994). Dolphins, Whittet Books Ltd: London.
4. Grzywacz, J. G., Almeida, D. M., & McDonald, D. A. (2002). Work-family spillover and daily reports of work and family stress in the adult labor force. Family Relations, 51, 28–36.
5. Holmes, T. A., & Rahe, R. H. (1967). The social readjustment rating scale. Journal of Psychosomatic Research, 11 , 213–218.
6. Knudsen, Hannah K. (2016) Dominant Themes and New Directions in Work Stress Research, Volume 33, Issue 2, Sage Publications.
7. Lazarus, R. S., & Folkman, S. (1984). Stress, appraisal, and coping. New York: Springer.
8. Mechanic, David (1978) Students Under Stress: Study in the Social Psychology of Adaptation, University of Wisconsin Press.
9. Menaghan, E. G. (1983). Individual coping efforts: Moderators of the relationship between life stress and mental health outcomes. In H. B. Kaplan (Ed.), Psychosocial stress: Trends in theory and research (pp. 157–191). New York: Academic.
10. Meyer, I. H., Schwartz, S., & Frost, D. M. (2008). Social patterning of stress and coping: Does disadvantaged status confer excess exposure and fewer coping resources? Social Science & Medicine, 67, 368–379.
11. Moss, Gordon E. (1975) Illness, Immunity and Social Interaction: The Dynamics of Biosocial Resonation, American Sociological Association.
12. Pearlin, L. I. (1999). The stress process revisited. In C. S. Aneshensel & J. C. Phelan (Eds.), Handbook of sociology of mental health (pp. 395–415). New York: Kluwer Academic/Plenum.
13. Pearlin, L. I. (1999). The stress process revisited. In C. S. Aneshensel & J. C. Phelan (Eds.), Handbook of sociology of mental health (pp. 395–415). New York: Kluwer Academic/Plenum.
14. Pearlin, L. I., Lieberman, M. A., Menaghan, E. G., & Mullan, J. T. (1981). The stress process. Journal of Health and Social Behavior, 22 , 337–356.
15. Price, R. H., Choi, J., & Vinokur, A. D. (2002). Links in the chain of adversity following job loss: How financial strain and loss of personal control lead to depression, impaired functioning and poor health. Journal of Occupational Health Psychology, 7 , 302–312.
16. Reynolds, P., Hurley, S., Torres, M., Jackson, J., Boyd, P., & Chen, V. W. (2000). Use of coping strategies and breast cancer survival: Results from the Black/White cancer survival study. American Journal of Epidemiology, 152 , 940–949.
17. Ross, C. E., & Mirowsky, J. (1989). Explaining the social patterns of depression: Control and problem solving – or support and talking. Journal of Health and Social Behavior, 30 , 206–219.
18. Ross, Catherine E. and John Mirowsky. (2001) “Neighborhood Disadvantage, Disorder, and Health.” Journal of Health and Social Behavior 42:258-76.
19. Ross, Catherine E., et. al. (2000) “The Contingent Meaning of Neighborhood Stability for Residents’ Psychological Well-being.” American Sociological Review 65: 581 -97.
20. Sellers, S. L., & Neighbors, H. (2008). The effects of goal-striving stress on the mental health of black Americans. Journal of Health and Social Behavior, 49 , 92–103.
21. Selye, H. (1956). The stress of life. New York: McGraw-Hill.
22. Thoits, P. A. (2010). Stress and health: Major findings and policy implications. Journal of Health and Social Behavior, 51 , S41–S53.
23. Turner, Bryan (2004) The New Medical Sociology: Social Forms of Health and Illness, W.W. Norton.
24. Turner, R. J., & Roszell, P. (1994). Psychosocial resources and the stress process. In W. R. Avison & I. H. Gotlib (Eds.), Stress and mental health: Contemporary issues and prospects for the future (pp. 179–210). New York: Plenum.
25. Wheaton, B. (1999). Social stress. In C. S. Aneshensel & J. Phelan (Eds.), Handbook on the sociology of mental health (pp. 277–300). New York: Plenum Press.
26. Zarit, S. H., & Zarit, J. M. (2007). Mental disorders in older adults: Fundamentals of assessment and treatment (2nd ed.). New York: Guilford Press.