নীলেশ্বর দাস
প্রস্তাবনা
সোশ্যাল মিডিয়া এবং সেই সংক্রান্ত ব্যাধির বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক অনেক ক্ষেত্রেই ইংরেজি শব্দের হুবহু প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এর মূল কারণ হল, বহু ইংরেজি শব্দ অনুবাদের পর তার মূল অর্থ হারিয়ে ফেলে বা পাঠকের কাছে অত্যন্ত গুরুপাচ্য হয়ে যায় (যেমন ভিডিয়ো হল দূরেক্ষণ, ওয়েবসাইট হল আন্তর্জালিক সংযোগ ব্যবস্থা)। ফলত এই অংশে, ইংরেজি শব্দের প্রাচুর্য হয় অনিবার্য অথবা প্রয়োজনীয়। সোশ্যাল মিডিয়া একটি তুলনামূলকভাবে নতুন ইংরেজি শব্দ যার আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ দাঁড়ায় ‘সামাজিক মাধ্যম’।
সোশ্যাল মিডিয়া আসলে কী?
ব্রিটিশ অভিধান অক্সফোর্ড-এর বিবরণ অনুযায়ী — ‘যে কোনও ওয়েবসাইট বা সফট্ওয়্যার প্রোগ্রাম যা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর কাজে ব্যবহৃত হয় তাকেই বলে সোশ্যাল মিডিয়া’। উদাহরণস্বরূপ নামী সোশ্যাল মিডিয়া সাইট, যেমন ফেসবুক, হোয়াটস্অ্যাপ, এবং টিক্-টক্-এর কথা বলা যেতে পারে। সহজ ভাষায় সোশ্যাল মিডিয়া হল — একপ্রকার ডিজিটাল মিডিয়া যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মোবাইল ফোন বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের মাধ্যমে অন্যজনের সঙ্গে এককভাবে বা দলগতভাবে তথ্যের আদান-প্রদান করতে পারেন। যেমন হোয়াটসঅ্যাপে জন্মদিনের শুভেচ্ছাবার্তা কিংবা বিবাহের ভিডিয়ো আদান-প্রদান। ওবার এবং উইল্ডমান (২০১৫) প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী সোশ্যাল মিডিয়া হল :
- ওয়েব ২.০-এর ভিত্তিতে তৈরি ইন্টারনেট অ্যাপ্লিকেশন।
- উপভোক্তাদের পরিষেবাভিত্তিক প্রোফাইলগুলো পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
- উপভোক্তাদের দ্বারা তৈরি কনটেন্ট, যেমন ভিডিয়ো এবং ফটো হল সোশ্যাল মিডিয়ার প্রধান রসদ।
- সোশ্যাল মিডিয়া একটি অনলাইন নেটওয়ার্কিং তৈরি করে যা এক উপভোক্তাকে অন্য ব্যবহারকারী ব্যক্তি বা গ্রুপের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করে।
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রকার ও প্রয়োগ
যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ার প্রকার ও কার্যবিধি বিবিধ হতে পারে, সেহেতু প্রকারভেদে বিন্যস্ত করা কঠিন। জার্মান প্রফেসর আন্দ্রেয়াস এম কাপলান ‘বিজনেস হরাইজন’ (২০১২) পত্রিকায় মোবাইল সোশ্যাল মিডিয়াকে চারভাগে বিভক্ত করে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন:
১. স্পেস টাইমার (সময় এবং অবস্থান উভয় সংবেদনশীল) — নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকাকালীন তথ্যের আদান-প্রদান। উদাহরণস্বরূপ ফেসবুক প্লেসেস বা ইনস্টাগ্রামে জিয়োলোকেশন পোস্ট-এ ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গার ছবি বা অন্যান্য তথ্য আদান-প্রদান করতে পারেন।
২. স্পেস লোকেটর (কেবল অবস্থান সংবেদনশীল) — একটি বিশেষ অবস্থানের ভিত্তিতে তথ্যের আদানপ্রদান। উদাহরণস্বরূপ যেল্প (yelp) উপভোক্তা কোনও বিশেষ জায়গার দোকান বা শপিং মলের সম্বন্ধে নিজস্ব মতামত প্রদান করতে পারেন।
৩. ক্যুইক টাইমার (কেবল সময় সংবেদনশীল) — দৈনন্দিন সংযোগের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া যা তৎক্ষণাৎ তথ্যের আদান-প্রদান করতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটস্যাপ।
৪. স্লো টাইমার (অবস্থান বা সময় সংবেদনশীল নয়) — সাধারণের জন্য উপলব্ধ ইউটিউব বা উইকিপিডিয়া পেজ যা সময় বা অবস্থানের উপর নির্ভরশীল নয়।
তথ্য সংরক্ষক কোম্পানি স্টাটিস্টা (Statista), ২০২৩ প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে ৪০০ কোটি উপভোক্তা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার করেন, যা প্রায় ৬০% মানুষের সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে পরিচিতির প্রদর্শন। সর্বাধিক ব্যবহারকারী চিন দেশের অধিবাসীরা এবং সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া হল ফেসবুক। জানুয়ারি ২০২৩ অবধি প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১০টি বহুল প্রচলিত সোশ্যাল মিডিয়ার নাম নিম্নোক্ত —

বর্তমান যুবক-যুবতি এবং সোশ্যাল মিডিয়া
যুবাবস্থা নূতনের দূত। যুবা দশায় মানুষ নতুন সামাজিক রীতি-নীতি দ্রুত গ্রহণ করে, তা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে, এবং সমস্ত কিছুকে প্রশ্নসুলভ দৃষ্টিতে বিচার করে। যুবাবস্থার এই স্থিতিস্থাপকতা ব্যক্তিত্ব গঠন এবং সামাজিক অগ্রগতির দিক নির্দেশ করে। অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়া যুবক মনের বিকাশকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ফলত সোশ্যাল মিডিয়া কী ধরনের তথ্য জনসমক্ষে রাখছে তা অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি যুবক-যুবতির সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের রীতি ও পদ্ধতি নিয়ে আসতে পারে মস্তিষ্কের গঠনগত ও কার্যগত পরিবর্তন।

সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার ও বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞান
অত্যধিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে — এবিষয়ে চিকিৎসক ও বিষেশজ্ঞদের মধ্যে কোনও দ্বিমত নেই। যদিও সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারকে আলাদা ভাবে কোনও রোগ হিসেবে গণ্য করা উচিত কিনা সে বিষয়ে একাধিক বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। মার্কিন দেশের মানসিক রোগ সংক্রান্ত পুস্তক ডায়াগনস্টিক এন্ড স্টাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল -এর পঞ্চম সংস্করণেও সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার-এর কোনও চর্চা করা হয়নি, তবে ইন্টারনেট আসক্তির বিষয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ রয়েছে — যা কিনা সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারের প্রায় সমতুল্য বলা যায়। বহু দেশের সামাজিক স্বাস্থ্য এবং মানসিক রোগ বিষেশজ্ঞরা যদিও একক বা যৌথ ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারের সম্ভাব্য লক্ষণ এবং চিকিৎসা সম্বন্ধে একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। তুরেল এবং সেরেঙ্কো (২০১২) ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ ইনফরমেশন সিস্টেমস’ নামক পত্রিকায় ৩টি মডেলের বিবরণ দিয়েছেন যা মানুষকে আসক্তিমূলক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের দিকে পরিচালিত করতে পারে :
১. কগনিটিভ-বিহেভিওরাল বা জ্ঞানীয়-আচরণমূলক মডেল — এই মডেল অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি যখন অপরিচিত বা বিশ্রী পরিস্থিতিতে থাকে তখন তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে উপভোক্তা সোশ্যাল মিডিয়াকে তাঁর নেগেটিভ পরিস্থিতির থেকে মুক্তি বা অব্যাহতির উপায় হিসেবে বেছে নেন।
২. সোশ্যাল স্কিল বা সামাজিক দক্ষতা মডেল — এই মডেল অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি তখনই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তাদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার শুরু করেন যখন তারা মুখোমুখি আলোচনার পরিবর্তে ভার্চুয়াল যোগাযোগ পছন্দ করেন। কারণ তাদের সামাজিক সংযোগশীলতা সংক্রান্ত দক্ষতার অভাব রয়েছে।
৩. সোশ্যাল কগনিটিভ বা সামাজিক-জ্ঞানমূলক মডেল — এই মডেল অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার এই কারণে করেন যে লোকে তাঁর ছবি বা ভিডিয়োতে লাইক, কমেন্ট বা ট্যাগ করছেন। তারা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রাপ্ত ইতিবাচক ফলাফলের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং আসক্ত হয়ে পড়তে পারেন।
অনেক ক্ষেত্রে ‘সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার’ শব্দটির পরিবর্তে ‘প্রব্লেমেটিক সোশ্যাল মিডিয়া ইউস’ বা ‘সমস্যাযুক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার’ শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে। যে নামেই চিহ্নিত করা হোক না কেন, অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই মনে করেন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অপপ্রভাব সম্পর্কে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত গবেষণা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিশেষত যেখানে যুব সমাজের ওপর সোশ্যাল মিডিয়া অপব্যবহারের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অনস্বীকার্য।
সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার — লক্ষণ এবং শনাক্তকরণের উপায়
সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারকে আচরণগত আসক্তি সংক্ৰান্ত রোগের মধ্যে গণনা করা যেতে পারে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারকে অন্যান্য মানসিক রোগের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন, যেখানে উপভোক্তা অসুবিধা হওয়া সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা বন্ধ করতে অসমর্থ হন। উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি কোনও কোনও ক্ষেত্রে অত্যধিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য বা ঘটনা উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটির সূত্র হয়ে উঠতে পারে। একই রকম ভাবে, বিষণ্ণতা বা ক্লিনিকাল ডিপ্রেশন, একাকিত্ব, সোশ্যাল অ্যাংজাইটি, এনোরেক্সিয়া বা অন্যান্য ইটিং ডিসঅর্ডার, উপভোক্তার নিম্ন-আত্মসম্মান বোধ এবং অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার (অথবা মনোযোগের অভাব সংক্রান্ত অতিসক্রিয়তার রোগ) সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারের সঙ্গে দ্বিমুখী সম্পর্ক পোষণ করে।
সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার-কে চিহ্নিত করার জন্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ঐকমত্য নেই। তবে একে আচরণগত আসক্তি হিসেবে গণ্য করা হলে বেশ কিছু লক্ষণ সাধারণভাবেই প্রকট হয়ে পড়ে। যেমন, ক্রেভিং বা ব্যবহারে তীব্র ইচ্ছা; ইউস ডেসপাইট হার্ম বা অসুবিধা সত্ত্বেও ব্যবহার; প্রায়রিটাইজেশন বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকে অন্যান্য কাজের ওপর প্রাধান্য; এবং উইথড্রয়াল বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিরতির কারণে মানসিক অশান্তি। ‘কমপিউটারস ইন হিউমান বিহেভিয়ার’ নামক পত্রিকায় (২০১৬) ডাচ প্রফেসর রেজিনা ভ্যান ডেন আইজেনডেন এবং সহকর্মীরা একটি বিশেষ স্কেল সম্পর্কে চর্চা করেন যা সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার-কে শনাক্তকরণের জন্য উপযুক্ত বলা যেতে পারে। ‘সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার স্কেল’ নামক এই স্কেল-এর প্রাসঙ্গিকতা পরে চুয়াল্লিশটি বিভিন্ন দেশের মানুষের ওপর যাচাই করে দেখা হয় যা বিখ্যাত ‘অ্যাডিকশন’ পত্রিকায় (২০২১) প্রকাশ পায়। সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার স্কেলের সম্ভাব্য বঙ্গানুবাদ নীচে দেওয়া হল। আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ যদি অত্যধিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন বা দৈনন্দিন কাজের পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়াতে বেশি মগ্ন থাকেন তাহলে নীচের প্রশ্নগুলি সম্ভাব্য সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারের সম্পর্কে জানতে সাহায্য করতে পারে।

কেন হয় সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার?
কেন হয় সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার, এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমাদের কাছে আজও অজানা। মাদক পদার্থ (উদা: অ্যালকোহল বা মদ) যেভাবে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড পাথওয়েকে হাইজ্যাক করে, ফলে মদ্যপান করা ছাড়া আর কোনও কাজেই আনন্দ পাওয়া যায় না। একইরকম ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারেও মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড পাথওয়েকেই দায়ী মনে করেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
১. আচরণগত কন্ডিশনিং : আচরণগত কন্ডিশনিং উপভোক্তার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ধরনকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যার ফলে ব্যক্তি সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর আসক্ত হয়ে পড়ে।উপভোক্তার শরীর ও মন সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলোর প্রতি অত্যধিক মিথ্যা টান বা জরুরি তলব অনুভব করেন যা নিজেকে সোশ্যাল মিডিয়াতে নিবিষ্ট করার পর মানসিক অব্যাহতি লাভ করেন।
২. উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং বা নিরন্তর তথ্যের প্রবাহ : সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলি এমনভাবে রূপ দেওয়া হয় যাতে করে স্ক্রলিং করার সময় ব্যবহারকারীর সময় সম্পর্কে এক ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়। কিছু সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম তার কনটেন্ট বা তথ্যের প্রবাহ অটোপ্লে সূচির মারফত নিরন্তর চলতেই থাকে। ফলত, উপভোক্তা নিজের অজান্তেই প্রয়োজনের চেয়ে অধিক সময় এবং অধিক তথ্যের সংস্পর্শে আসতে থাকে।
৩. সামাজিক চাপ : সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাপ্ত মেসেজ, প্রেরক এবং প্রাপক উভয়ের উপরেই তাৎক্ষণিকতার প্রত্যাশা তৈরি করে, যা সামাজিক চাপ তৈরি করে। যেহেতু প্রত্যেক প্রেরক দ্রুত তাঁর প্রশ্নের উত্তর কামনা করেন এবং প্রাপক শেষ কখন মেসেজ দেখেছেন তা জানতে পারেন— একই চিন্তা প্রাপকের মনেও কাজ করে। ফলে প্রত্যেক সোশ্যাল মিডিয়া উপভোক্তা সামাজিক প্রত্যাশা লঙ্ঘনের ভয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপ অনুভব করেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এই সামাজিক চাপ বারবার সোশ্যাল মিডিয়া ফিড-এর ওপর নজর রাখতে এবং অনেক ক্ষেত্রে আসক্তিমূলক ব্যবহারের রূপ নিতে বাধ্য করে।
৪. অনুকরণ, তুলনা এবং সোশ্যাল রিওয়ার্ড : উপভোক্তা কর্তৃক প্রস্তুত কনটেন্ট সোশ্যাল মিডিয়ার রসদ। সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়াতে চলতে থাকা ট্রেন্ড, হ্যাসট্যাগ, বা লাইক উপভোক্তাদের সুযোগ দেয় অন্যের কনটেন্ট অনুকরণ করার, তুলনা করার যা সোশ্যাল রিওয়ার্ড-এর রূপ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বারবার ব্যবহার করতে উপভোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করে।
৫. আত্মীকৃত নিউজফিড এবং আপডেটস : একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল সার্চ ইঞ্জিন প্রত্যেক উপভোক্তার থেকে ‘কুকি’ বা তথ্যের টুকরো গ্রহণ করে। এই কুকি প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাঁদের নিজের প্রয়োজন মাফিক সোশ্যাল মিডিয়া উপলব্ধির সুযোগ দেয়, যা উপভোক্তার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি ক্রমাগত আকৃষ্ট হওয়া এবং অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়তে বাধ্য করে।
৬. Zeigarnik প্রভাব : এই মতবাদ অনুযায়ী, মানব মস্তিষ্ক একটি কাজ বা উপলব্ধির সন্তোষজনক সমাপ্তি না-হওয়া পর্যন্ত ওই অসমাপ্ত কাজটি চালিয়ে যেতে পছন্দ করে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির অন্তহীন প্রকৃতি এইভাবে উপভোক্তার মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। যেহেতু ব্যবহারকারী স্ক্রলিং ‘সমাপ্ত’ করার সুযোগ পায় না, ফলে কাজটি বার বার চালিয়ে যাওয়ার এবং ‘সমাপ্ত’ করার একটি অবচেতন ইচ্ছা ক্রমাগত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
৭. Ovsiankina প্রভাব : এই মতবাদ অনুযায়ী, মানব মস্তিষ্কের একটি অসমাপ্ত বা বিঘ্নিত কাজ সম্পূর্ণ করতে পুনঃপদক্ষেপ নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ‘সংক্ষিপ্ত, দ্রুত গতির, দেওয়া-নেওয়ার’ রীতি একটি সন্তোষজনক সমাপ্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ প্রত্যেক উপভোক্তা একটি সন্তোষজনক সমাপ্তির অভিপ্রায়ে সোশ্যাল মিডিয়া চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার — প্রতিরোধ ও প্রতিকার
যুক্তিসংগতভাবেই বৈজ্ঞানিক মহলে সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা এবং উপশমের পদ্ধতি সম্পর্কে মতানৈক্য রয়েছে। ভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা পদ্ধতির সংক্রান্ত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে কিছু চর্চিত চিকিৎসা বা থেরাপি হল :
- স্ক্রিন-টাইমার বা অ্যাপ্লিকেশন ভিত্তিক-টাইমার-এর প্রয়োগ (যেমন : ডিজিটাল ওয়েল-বিয়িং)
- পেরেন্টাল কন্ট্রোল : শিশু এবং যুবা উপভোক্তাদের জন্য বিশেষ ভাবে উপকারী
- সাংগঠনিক, বা বিদ্যালয়ের পাঠক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্তি : শনাক্ত করুন এবং মনিটর করুন
- বেহেভিওরাল বা আচরণগত থেরাপি
- কগনিটিভ-বেহেভিওরাল বা জ্ঞানীয়-আচরণগত থেরাপি
কথায় বলে, রোগ-প্রতিরোধ রোগ-প্রতিকারের সবচেয়ে সফল উপায়। যেহেতু মোবাইল এবং ইন্টারনেট-এর প্রয়োগ অদূর ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বই কমবে না — ফলত সোশ্যাল মিডিয়া ডিসর্ডার-এর প্রকোপও সমান তালে বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে সাবধানতা এবং সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার সম্পর্কে অবহিত থাকাও প্রতিকারের এক কার্যকরী উপায় হয়ে উঠতে পারে।
১. ব্যক্তিগত কর্তব্য — ডিজিটাল হাইজিন অর্থাৎ মোবাইল বা অন্যান্য গ্যাজেট ব্যবহারকালীন কিছু সময় নির্ধারণ করা, কাজের সময় সোশ্যাল মিডিয়ার প্রয়োগ না-করা, রাতে বিছানায় শুয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার না-করা, এবং নিয়মিত ‘গ্রিন টাইম’ পালন করা।
২. মাতা-পিতার কর্তব্য — সোশ্যাল মিডিয়া এবং ওই সংক্রান্ত ব্যবহার ও প্রভাবের বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকা। শিশু এবং যুবা ছেলে-মেয়ের মোবাইল, ল্যাপটপ বা ট্যাবলেট-এ পেরেন্টাল কন্ট্রোল প্রয়োগ করা, কিছু সোশ্যাল মিডিয়া এপ্লিকেশন (যেমন: ইউটিউব কিডস, ফেসবুক মেসেঞ্জার কিডস) বিশেষত ১৮ বছরের নীচে উপভোক্তাদের জন্য তৈরি হয়েছে, যা কিছু অংশে সোশ্যাল মিডিয়া ডিসর্ডার সংক্রান্ত সমস্যা কম করতে পারে।
৩. সরকারের কর্তব্য — মার্কিন দেশে স্মার্ট অ্যাক্ট (SMART Act — Social Media Addiction Reduction Technology)-এর মতো আইন উপভোক্তার নিজস্বতা এবং নিরাপত্তা দুই-ই নজরে রাখে। বিশেষত, সাইবার বুলিং, ক্ষতিকর তথ্য, এবং আত্মহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজনীয় বলে লেখক মনে করেন।
উপসংহার
সোশ্যাল মিডিয়া ক্রমশ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। অত্যধিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপ্রীতিকর। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজের স্ফূর্তি এবং আত্ম-সম্মান বোধ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা বর্তমান যুব সমাজকে ভার্চুয়াল জগতের প্রতি ধীরে ধীরে আসক্ত করে তুলছে। কোন কোন সোশ্যাল মিডিয়া, কীভাবে, কখন, এবং কতসময় ধরে ব্যবহার করলে তা ক্ষতিকর হতে পারে, সে বিষয়ে সঠিক তথ্যের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ফলত ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ (অন্তত কিছু পরিমাণ) অনিবার্য হয়ে পড়ে। মোবাইল ফোনের ন্যায্য ব্যবহার, স্ক্রিন/ আপ টাইমারের প্রয়োগ, এবং ডিজিটাল হাইজিন-এর প্রতিপালন এই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডারের প্রতিরোধক বলে গণ্য করা যায়। রোগের প্রতিকার হিসেবে বাক্ চিকিৎসা বা কগনিটিভ বেহেভিওরাল থেরাপি কিছু ক্ষেত্রে কার্যকরী সাব্যস্ত হয়েছে। এই রোগের প্রকার, কারণ এবং চিকিৎসা সম্বন্ধে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা অবশ্য প্রয়োজনীয়। শেষে বলতেই হয়, ‘সম্ভবত সবকিছুর অত্যধিক ততটাই খারাপ যতটা খারাপ তার অভাব।’