চৈতালী চক্রবর্তী
আত্মরতিতে (female masturbation) ব্যস্ত এক যুবতি। পারিপার্শ্বিক ভাবনা লোপ পেয়েছে। মুখের অভিব্যক্তিতে কত অতৃপ্ত বাসনা ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মুখে হাসি ফুটছে। বলিউডের ‘লাস্ট স্টোরিজ’ সিনেমায় স্বমেহনের দৃশ্য ঝড় তুলেছিল। এমন খোলামেলাভাবে যৌনতাকে পরিবেশন করার জন্য তর্ক-বিতর্ক কম হয়নি। অনেকে আবার এই সাহসী চেষ্টার বাহবাও দিয়েছিলেন।
হস্তমৈথুন, স্বমেহন, আত্মরতি (female masturbation) এই শব্দগুলো এখনও গোপনীয়তার পর্দায় ঢাকা। হস্তমৈথুনরত পুরুষকে দেখলে যতটা সমালোচনা হবে, স্বমেহনে ব্যস্ত নারী মানেই লজ্জার পারদ আরও চড়বে। পুরুষের সঙ্গেই সঙ্গমরত অবস্থাতেই নারীকে ভেবে নেওয়া হয়, সেখানে স্বাধীনভাবে আত্মসুখের দরজা খোলা মানেই নানা আলোচনা। নিম্নরুচি, অপরাধী নানা তকমা সেঁটে দেওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। অথচ নারী ও পুরুষের স্বমেহনকে সাধারণ শারীরিক ক্রিয়ার মধ্যেই ফেলেছিলেন বাৎস্যায়ন। তাঁর কামসূত্রে হস্তমৈথুন, স্বমেহনের নানা ধরনের কথা লেখা আছে। আত্মরতি সেখানে অপরাধ নয়। স্বর্গীয় সুখ অনুভব করার উপায়।
আধুনিক সময়েও নারীর স্বমেহন (Female Masturbation) নিয়ে নানা ট্যাবু আছে সমাজে। অনেকেই মনে করেন স্বমেহন করলে শরীরের ক্ষতি হয়। পাপ-পুণ্যের দাঁড়িপাল্লাতেও মেপে দেওয়া হয় এই জৈবিক ক্রিয়াকে। সেক্স হিস্টোরিয়ান হ্যালি লিয়েবারমেন তাঁর লেখা বই ‘বাজ : এ স্টিমুলেটিং হিস্ট্রি অব দ্য সেক্স টয়’-তে আত্মরতির গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। লিয়েবারমেন বিস্তর গবেষণা করেছেন আত্মরতি ও তার ইতিহাস নিয়ে। তিনি বলেছেন, আধুনিক সময় যে সেক্স টয়, ভাইব্রেটর ব্যবহার করা হয় তার ধারণা তৈরি হয়েছিল প্রাচীনকালেই। প্রাচীন গ্রিস, মিশর, চিনে হস্তমৈথুনকে শারীরিক প্রক্রিয়ার অঙ্গ বলেই মনে করা হত। যদিও এই ভাবনাকে স্বাধীনতা দিতে নানা বাধা-বিপত্তি, যুক্তি-তর্কের পাহাড় ডিঙোতে হয়েছে। আধুনিক সময়ে এসেও নিজের মুখে স্বমেহনের কথা বলতে সংকোচবোধ করেন অনেক মহিলাই। কোথাও যেন একটা অপরাধবোধের লক্ষণরেখা টানা আছে এখনও। তাকে পার হতে ভয় পান অনেকেই।
অথচ স্বমেহনকে আধুনিক সমাজ যতটা ঘৃণা বা লজ্জার আবরণে ঢেকেছে, প্রাচীন সময় কিন্তু ততটাই স্বাধীনতা দিয়েছে আত্মসুখ অনুভবের এই স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়াকে। বিশ্বজুড়ে প্রাগৈতিহাসিক কালে পাথরে আঁকা চিত্র, বিভিন্ন গুহাচিত্রে বা শিলাচিত্রে নারী ও পুরুষদের হস্তমৈথুনের ছবি অঙ্কিত আছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায় সুপ্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার কথা। সুমেরীয়রা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত যে হস্তমৈথুন পুরুষ এবং নারী, উভয়ের ক্ষেত্রেই যৌন ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। পুরুষরা হস্তমৈথুনের সময় একধরনের তেল ব্যবহার করতেন যাতে সম্ভবত চূর্ণীকৃত লৌহ আকর মেশানো থাকত। পুরুষের হস্তমৈথুনকে দৈবিক বা আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেও জুড়ে দিয়েছিলেন সুমেরীয়রা। তাঁরা মনে করতেন, যে তাঁদের দেবতা নদীর তীরে হস্তমৈথুন করে যে বীর্জপাত করেন তার থেকেই টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর জন্ম হয়েছিল।
প্রাচীন গ্রিসেও হস্তমৈথুনকে যৌনসুখ উপভোগের অন্যতম মাধ্যম বলে মনে করা হত। নারী ও পুরুষের মধ্যে বিভেদ ছিল না। রোমের প্রথম দিককার হাস্যকৌতুক বিষয়ক লেখক লুসিলিয়াসের কিছু কাহিনির মধ্যে হস্তমৈথুনের উল্লেখ বিশেষভাবে আছে। এবং এও বলা হয়েছে যে রোমানরা হস্তমৈথুনের জন্য বাম হাতকে বেছে নিয়েছিল।
ভাবলে অবাক হতে হয়, ২০০৯ সালে নেদারল্যান্ড ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যেও বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলেমেয়েদের প্রতিদিন হস্তমৈথুন করার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়।
হিন্দু পুরাণের অনেক জায়গাতেই হস্তমৈথুনকে পাপ বলে ব্যাখ্যা করা হলেও প্রাচীন ভারতের যে নিদর্শন পাওয়া গেছে তাতে হস্তমৈথুনকে নিষিদ্ধ বলে রাখঢাক করা হয়নি। বিশেষ করে আর্য সমাজে পুরুষের অজাচার বা আত্মরতি উপভোগকে স্বাভাবিক বলেই মনে করা হত। বৈদিক যুগেও তা অপরাধ ছিল না। এমনকি আর্যরা যে দেবদেবীকে মানত তাঁদের বর্ণনাতেও স্বমেহনের উল্লেখ পাওয়া গেছে। সরস্বতী পুরাণ বলে, উর্বশীকে দেখে নাকি স্বমেহন করেছিলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা। তবে এ নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্কও আছে। তবু বলা যেতে পারে সনাতন হিন্দু ধর্মই ছিল সমস্ত প্রাচীন ধর্মের মধ্যে যৌনতার ব্যাপারে সবচেয়ে মুক্তমনা। যৌনতার ব্যাপারে কোনও রাখঢাক করা হয়নি, বরং সেটিকে জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাত্স্যায়নের কামসূত্রে বর্ণনাই করা আছে কীভাবে পুরুষরা হস্তমৈথুনকে আত্মসুখ অনুভবের অন্যতম শৈল্পিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত সনাতন ভারতের সেই মুক্ত মন পরবর্তীকালে সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। দুশো বছরের ইংরেজ শাসনকালে ভিক্টোরিয়ান মনোভাব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ভারতীয়দের উপর। তাই কামসূত্র হয়ে গেছে ‘নিষিদ্ধ’ গ্রন্থ, আর হস্তমৈথুন হয়ে গেছে ‘অপরাধ’।
পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নারীর স্বমেহন নিয়ে প্রকাশ্যে যতটা কথাবার্তা হয়, ভারতে তা একেবারেই হয় না বললে চলে। হস্তমৈথুন নিয়ে অনেক ভুল ধারণাও আছে সমাজে। এই ভাবনার প্রাচীর ভাঙতে উদ্যোগী হয়েছেন মুম্বইয়ের পাঁচ কলেজ পড়ুয়া। স্বমেহন অপরাধ নয়, ট্যাবু ভেঙে বেরিয়ে আসুক মহিলারা — তাঁদের ক্যাম্পেনের মূল ভাবনা এটাই। যৌনভাবনা নিয়ে আলোচনা হোক খোলাখুলি, সব লজ্জার আগল ভেঙেই নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলুক মেয়েরা, সোশ্যাল মিডিয়ায় আস্ত একটা প্লাটফর্মই তৈরি করে ফেলেছেন তাঁরা। এই উদ্যোগের নাম ‘ওহ মাই হৃতিক’। আসলে নারীর মনে ঝড় তোলা পুরুষদের মধ্যে একজন হৃতিক রোশন, তিনি আবার সেলিব্রিটিও বটে। তাই তাঁর নামই ব্যবহার করেছেন কলেজ পড়ুয়ারা।
দিল্লি, জয়পুর, মুম্বইতে বেশ সাড়া ফেলেছে এই ক্যাম্পেন। কলেজ পড়ুয়াদের বক্তব্য, শুরুতে সাড়া পেতে দেরি হয়েছিল। মনের মধ্যে কৌতূহল থাকলেও তাকে সামনে নিয়ে আসার সাহস অনেকেরই থাকে না। তবে মেয়েরা নিজেদের চিন্তা-ভাবনার দরজা খুলছে ধীরে ধীরে। আত্মসুখ (female masturbation) ভোগ করার অধিকার সবারই রয়েছে। স্ব-কাম শব্দটা কোনও নির্দিষ্ট লিঙ্গের জন্য বাঁধা নয়। সে জন্যই ২৮ মে আন্তর্জাতিক স্বমেহন দিবস পালন করা হয় এখনও। শুধু দিন হিসেবে এর গুরুত্ব বোঝানোর জন্য নয়, মুক্ত চিন্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।
ইতিহাসবিদ হ্যালি লিয়েবারমেন তাঁর বইতে লিখেছেন, আত্মরতির সময় মহিলারা ৯ গুণ বেশি তৃপ্তি পায় পুরুষদের থেকে। গ্রিক দার্শনিক টিরেসিয়াস শুধুমাত্র এই সুখ অনুভব করার জন্যই নাকি সাত বছরের জন্য লিঙ্গ পরিবর্তন করে নারী হয়েছিলেন। গ্রিক পুরাণে স্বমেহনের বিস্তারিত বর্ণনা আছে। তাদের শিল্পকলায় আত্মরতির কথা বলা হয়েছে কোনও রাখঢাক না-করেই। মাটির পাত্রে আঁকা হয়েছে হস্তমৈথুনের ছবি। সে সব শিল্পকলা এখন দুর্মূল্য। গ্রিক পুরাণ বলছে, ঘরের পুরুষরা যখন যুদ্ধে যেতেন, তখন বছরের পর বছর একাই কাটাতে হত মহিলাদের। আত্মরতিই ছিল তাদের যৌনতৃপ্তির একমাত্র উপায়। গ্রিক পুরাণে তাই আত্মকামকে অপরাধ বলা হয়নি।
শুনলে অবাক হতে হয়, প্রাচীন মিশরে স্বমেহনকে উৎসব হিসেবে পালন করা হত। যৌনতাকে কেন্দ্র করে নানা গল্পকথা প্রচলিত আছে মিশরে। কিন্তু নীলনদের তীরে আত্মরতির যে রেওয়াজ পালন তা সত্যিই অবাক করার মতোই। ইতিহাসবিদরা বলেছেন, গণস্বমেহনের উৎসব। আত্মকাম সেখানে ছিল আর পাঁচটা সাধারণ জৈবিক ক্রিয়ার মতোই। যৌনতা নিয়ে কোনও আড়াল আবডাল ছিল না। প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, তাঁদের দেবতা অটাম স্বমেহন করেই বিশ্ব-সংসার তৈরি করেছেন। দেবতার স্বমেহনের ফলই হল নীলনদ। তাই দেবতার পুজো দিতে হস্তমৈথুন করে নীলনদের জলে বীর্য ভাসানোই রীতি ছিল প্রাচীন মিশরীয়দের। নদীর তীরে স্বমেহন করতেন মহিলারাও। এখানে কোনও লজ্জা বা সংকোচের ব্যাপার ছিল না। আত্মরতি ছিল দেবতার পুজোর অর্ঘ্য। মনে করা হত এই অর্ঘ্য পেলেই দেবতা তুষ্ট হবেন। মরুভূমির দেশ সবুজে ভরে যাবে। নতুন সৃষ্টি হবে।
প্রাচীন চিন দেশেও স্বমেহনকে পাপ বলে মনে করা হত না। তবে ভয় একটা ছিল। প্রাচীন চৈনিক সাহিত্যগুলোতে তার প্রমাণ কিছুটা মেলে। মনে করা হত হস্তমৈথুনের মাধ্যমে পুরুষদের বীর্যপাত হলে শক্তিক্ষয় হয়। নারীদের ক্ষেত্রেও একইরকম ধারণা ছিল। যদিও পরে এই ধারণা বদলে যায়।
ভারতীয় সভ্যতা সার্বিকভাবে স্বমেহনকে কখনওই মুক্ত ও স্বাধীনভাবে মেনে নেয়নি। মনু সংহিতায় আত্মরতিকে পাপ বলা হয়েছিল। শুধুমাত্র আত্মসুখের জন্য শরীরকে ব্যবহার করাকে অপরাধ বলা হত। তবে সব শাস্ত্র ও পুরাণই যে আত্মরতিকে খারাপ বলেছিল তেমনটা নয়। যুগে যুগে এই ভাবনায় বদল এসেছিল। বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ স্বমেহনকে (female masturbation) মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। সঙ্গমকে শৈল্পিক ভাবনায় মুড়ে দিয়েছিলেন বাৎস্যায়ন। যদিও ব্রিটিশ শাসনকালে কামসূত্রকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
অষ্টাদশ শতকের পর থেকে স্বমেহনে নানা বিধিনিষেধ চাপানো হয়েছিল। ক্যাথলিক চার্চ রীতিমতো নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলেছিল, যে পুরুষ বা মহিলা আত্মকামে মগ্ন থাকবে তাদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। কারণ সঙ্গম ছাড়াই বীর্যপাত বা স্বমেহন ঈশ্বরের চোখে অপরাধ। গোঁড়া খ্রিস্টানরা বলতেন, আত্মরতি মানেই হল আত্মনির্যাতন। নিজে নিজেই যৌনসুখ অনুভব করা মানে নিজেকে নিজেই যৌননিপীড়ন করা। তাঁদের চোখে স্বমেহন ছিল পাপ।
ইতিহাসবিদরা বলেন, পুরুষশাসিত সমাজে নারী মুক্তভাবে আত্মসুখ অনুভব করবে সেটা মেনে নিতে পারেননি অনেকেই। তাই স্বমেহনের দরজা নারীদের জন্য প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। যৌন চাহিদা যাদের বেশি তাদের হিস্টিরিয়ার রোগী বলা হত। তার জন্য নানা চিকিৎসাপদ্ধতিও ছিল। এমনও শোনা গেছে, বিংশ শতাব্দীতে এসেও স্বমেহনকে অপরাধ বলে ভাবত আমেরিকা। মনে করা হত নানা যৌন রোগের কারণ হল এই আত্মরতি। পরে দেহকোশ ও জীবাণুর ধারণা তৈরি হলে সেই ভাবনা বদলে যায়। তবে স্বমেহন করতে গিয়ে ধরা পড়া অনেক কিশোরীর উপরেই নির্যাতন করা হয়েছিল সে সময়। ক্লিটোরিসে ছ্যাঁকা দেওয়া, যোনিপথ পুড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি মারাত্মক সব প্রায়শ্চিত্তের বিধান দেওয়া হত সে সময়।
ডিলডো, ভাইব্রেটরের ধারণাও এসেছে প্রাচীন সময় থেকেই। আশির দশকে ডক্টর জোসেফ মরটিমার ইলেকট্রিক ভাইব্রেটর তৈরি করেন। সে নিয়েও নানা সমালোচনা হয়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন যন্ত্রের সাহায্যে নারীদের ‘অর্গ্যাজম’ হলে পুরুষ সঙ্গীর আর দরকারই পড়বে না। ইতিহাসবিদ হ্যালি লিয়েবারমেন বলছেন, নারী স্বাধীনতা শুধু শিক্ষা, পেশায় নয়। যৌনসুখেও সমান অধিকার আছে মেয়েদের। যেদিন এই ভাবনা সার্বিকভাবে গৃহীত হবে, সেদিনই মুক্তির দরজা খুলে যাবে।