মহম্মদ আলি জিন্নাহ্
(অনুবাদ : অভিক্ষেপ)
[পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদে কায়েদ-ই-আজম মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণ (১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট)]
সমবেত ভদ্রমহোদয়া এবং ভদ্রমহোদয়গণ,
এই সার্বভৌম পরিষদের তরফ থেকে যে মহত্তম সম্মান প্রদান করা সম্ভব, সেই সম্মানে আমাকে ভূষিত করার জন্য আমি আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। যাঁরা আমার কাজের প্রশংসা করে বক্তৃতা করেছেন এবং আমার সম্পর্কে ব্যক্তিগত মন্তব্য করেছেন, আমি সেই সকল নেতাদেরও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আমি আশা করছি, আপনাদের সমর্থন এবং সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা এই গণপরিষদকে সারা পৃথিবীর মধ্যে একটি আদর্শ রূপে হাজির করব। গণপরিষদের কাজ প্রধানত দু-টি— (১) পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কঠিন ও দায়িত্বপূর্ণ কাজ, (২) পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রীয় বিধানসভার অনুরূপ একটি সম্পূর্ণ সার্বভৌম পরিষদরূপে কাজ সম্পন্ন করে যাওয়া। পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রীয় বিধানসভার অনুরূপ একটি সাময়িক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করার জন্য আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। এই উপমহাদেশে দু-টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র সৃষ্টি এবং স্থাপন করার পরিকল্পনা যার জন্য সম্ভবপর হয়েছে, সেই অভূতপূর্ব ঘূর্ণিঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে শুধু আমরা নই, সমগ্র বিশ্ববাসী আশ্চর্যান্বিত হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এরূপ বিপ্লবের নজির প্রায় নেই। সর্বপ্রকার জাতি-অধ্যুষিত এই সুবিশাল উপমহাদেশকে এক বিরাট অজ্ঞাত এবং অতুলনীয় পরিকল্পনার অধীনে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হল, আমরা তা শান্তিপূর্ণভাবে অর্জন করেছি।
এই পরিষদে আমাদের প্রাথমিক কাজ সম্পর্কে এই মুহূর্তে আমি কোনো পূর্ব-বিবেচনাপ্রসূত মতামত দিতে পারছি না, তবে আমি এ সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই। প্রথম এবং সর্বপ্রধান যে বিষয়ের ওপর আমি গুরুত্ব আরোপ করতে চাইছি, তা হল— আপনাদের সর্বাগ্রে স্মরণে রাখতে হবে যে, আপনারা এখন একটি সার্বভৌম বিধান পরিষদ এবং তার সমস্তরকম ক্ষমতার অধিকারী। এই পরিষদ আপনাদের ওপর সর্বাপেক্ষা যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছে, তা হল— কীভাবে আপনারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। আমি প্রথমে যে মন্তব্য করতে চাই এবং আমি নিশ্চিত আপনারা আমার সঙ্গে এবিষয়ে একমত হবেন— সরকারের প্রথম কর্তব্য হবে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, যার দ্বারা নাগরিকদের জীবন, সম্পদ ও ধর্মবিশ্বাসের নিরাপত্তাবিধান রাষ্ট্র কর্তৃক সম্পূর্ণভাবে সম্ভব হতে পারে।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি আমার মনে উদিত হচ্ছে সেই বিষয়টা হল, যে-সকল বড়ো বড়ো অভিশাপের ফলে দেশ দুর্দশা ভোগ করেছে তাদের মধ্যে অন্যতম হল উৎকোচ গ্রহণ ও দুর্নীতি। আমি অবশ্য একথা বলতে চাইছি না যে, অন্যান্য দেশ এই অভিশাপ থেকে মুক্ত; কিন্তু আমার ধারণা আমাদের অবস্থা অপরাপরের তুলনায় অধিকতর শোচনীয়। এ বড়োই দুঃখজনক। আমাদের অবশ্যই দৃঢ়তার সঙ্গে এই অভিশাপ দমন করতে হবে: আমি আশা করছি এই পরিষদ যতশীঘ্র সম্ভব যেন এই ব্যবস্থা করতে পারে। তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করবেন আপনারা।
কালোবাজারি হচ্ছে আর-এক অভিশাপ। হ্যাঁ, আমি জানি, কালোবাজারিরা প্রায়ই ধরা পড়ে শাস্তি ভোগ করে। কখনও তাদের বিচারবিভাগীয় দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়, কিংবা কোনো কোনো সময় কেবলমাত্র জরিমানা ধার্য করা হয়। প্রতিনিয়ত আমরা খাদ্য ও জীবনের জন্য অপরিহার্য এবং অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছি। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এইসব দানবের বিরুদ্ধে আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। যে নাগরিক কালোবাজারের কারবারি, তার অপরাধ বৃহত্তম এবং সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধের থেকেও বড়ো। এরা মূলত চতুর এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি। কালোবাজারিতে যুক্ত এইসব ব্যক্তিদের কঠোরতম শাস্তি প্রদান করা উচিত। কেননা, তারা খাদ্যসামগ্রী এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তুর নিয়ন্ত্রণ করে এবং সে-সম্পর্কিত আইন ও তৎপ্রসঙ্গিত ব্যবস্থাগুলিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলে। এর ফলে ব্যাপকহারে অনশন, অনটন অভাব; এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত সংঘটিত হতে থাকে।
পরবর্তীতে আমার ভাবনায় চলে আসছে স্বজনপোষণ ও দালালির কথা। এই বিষয়কে আমাদের ওপর উত্তরাধিকারসূত্রে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভালো-খারাপ অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে চলে এসেছে এই পাপ। এই পাপকে ধ্বংস করতে হবে নির্মমভাবে। আমি স্পষ্টত বলতে চাই— প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে দালালি, স্বজনপ্রীতি এ-জাতীয় কোনো কাজকে আমি কখনোই বরদাস্ত করব না। যেখানেই দেখব এরূপ আচরণ বর্তমান, তা-সে উঁচু নীচু যে স্তরেই হোক না কেন, আমি নিশ্চয়ই বরদাস্ত করব না।
আমি জানি, এমন অনেক লোক আছেন, যাঁরা ভারতবিভাগ তথা পাঞ্জাব ও বাংলা-বিভাগকে সম্পূর্ণভাবে মেনে নিতে পারেননি। এর বিপক্ষে বহু কথা বলা হয়েছে; কিন্তু এখন যখন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, তখন আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্যই হল বিশেষ আনুগত্যের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া। যে চুক্তি এখন সর্বোত্তম এবং সকলের জন্য বাধ্যতামূলক, সেই চুক্তি অনুসরণ করেই যথাবিহিত আনুগত্যের সঙ্গে আমাদের কাজ করে যেতে হবে। আপনাদের এ-কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, যা সংঘটিত হয়েছে তা অভূতপূর্ব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যা কার্যকর করা হয়েছে তার বিপরীতে অন্য কিছু করা সম্ভব এবং সুসাধ্য ছিল কি না। উভয়পক্ষেই ভাগ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল। ভারতে এবং পাকিস্তানে এমন সব মানুষ আছেন যাঁরা হয়তো এই বিভাগ মেনে নিতে রাজি হবেন না, হয়তো বা পছন্দও করবেন না, কিন্তু আমার বিবেচনায় এ-ব্যতীত অন্য কোনো প্রকারের সমাধান ছিল না। আমি নিশ্চিত যে, ভবিষ্যত ইতিহাসও ভাগাভাগির সপক্ষেই রায় দেবে। আমরা ভবিষ্যতের দিকে যত অগ্রবর্তী হব, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ততই প্রমাণিত হবে যে ভাগাভাগি ছিল ভারতের শাসনতান্ত্রিক সমস্যার একমাত্র সমাধান। অখণ্ড ভারতের কোনোরূপ ধারণা কখনও কার্যকর হতে পারত না, বরং আমার বিবেচনায় তা আমাদের নিয়ে যেত ভয়াবহ ধ্বংসের দিকে। আমার এই অভিমত সত্য না অসত্য, ইতিহাস বিচার করবে একদিন। সে যাই হোক, দেশভাগের সময়ে সংখ্যালঘু মানুষের পাকিস্তান বা ভারত থেকে চলে যাওয়ার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া কোনও মতেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোনো সমাধানও ছিল না। এখন আমরা কী করব? আমরা যদি মহান পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সুখী ও সমৃদ্ধিশালী করে গড়ে তুলতে চাই, তবে জনসাধারণ বিশেষত গরিব মানুষদের মঙ্গলসাধনের জন্য আমাদের সম্পূর্ণ এবং একান্তভাবে মনোনিবেশ করতে হবে। আপনারা যদি অতীতের সব স্মৃতি ভুলে একে অপরের সহযোগিতায় কাজ করেন, আপনাদের জয় অনিবার্য। অতীতকে বিস্মৃত হয়ে জাতিধর্ম নির্বিশেষে যদি আপনারা এরূপ মনোভাব নিয়ে কাজ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে আপনারা অগ্রবর্তী হতে পারবেন।
একটি বিষয়ে আমি অত্যধিক গুরুত্ব দিতে চাই। আমাদের এমন এক ঐক্যবদ্ধ মনোভাবের উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে যে, কালক্রমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘুর, হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ দূর হয়ে যাবে; কারণ মুসলমানদের মধ্যে যেমন পাঠান, পাঞ্জাবি, শিয়া, সুন্নি প্রমুখ নানা বিভাগের মানুষ আছেন, হিন্দুদের মধ্যেও একইরকম ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব, ক্ষত্রিয়, বাঙালি এবং মাদ্রাসি বিবিধ ভাগ আছে। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বলব যে— নিজেদের মধ্যে এই ভেদাভেদই ভারতীয়দের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নতুবা ভারতীয়রা বহু পূর্বেই স্বাধীন হতে পারত; বিশ্বের কোনো শক্তিই চারশো মিলিয়ন অধিবাসীর এক দেশের মানুষকে দমন করে রাখতে পারত না, না-পারত কোনো শক্তি সুদীর্ঘকাল রাজত্ব কায়েম করতে, আর একান্ত সম্ভব হলেও অবশ্যই তা দীর্ঘায়ু হত না। এই মনোভাব নিয়ে আমাদের কাজ শুরু করে দেওয়া উচিত যে ক্রমে ক্রমে সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে সমস্ত জটিলতা দূর হয়ে যাবে। আমাকে জিজ্ঞাসা করলে বলব, উল্লিখিত বিষয়টি হচ্ছে আমাদের মুক্তি এবং স্বাধীনতা লাভের পথে সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধকতা। এই বিষয়গুলি না-থাকলে আমরা বহুকাল আগে থেকেই একটি স্বাধীন জাতি হয়ে থাকতে পারতাম। সবাইকে স্মরণে রাখতে হবে এই শিক্ষা যে— আপনারা সবাই স্বাধীন, আপনাদের সকলের স্বাধীনতা রয়েছে আপনাদের নিজ নিজ মসজিদে-মন্দিরে যাওয়ার; অথবা এই পাকিস্তান রাষ্ট্রে আপনাদের সম্মুখে কোনো বাধাই নেই অন্য কোনো ভজনালয়ে যাওয়ার। আপনি যে-কোনো ধর্ম, কিংবা বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয়-ব্যাপারের সঙ্গে তার কোনোপ্রকার সম্পর্ক নেই। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, এবং ইতিহাসও সাক্ষী যে, কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত ইংল্যান্ডের অবস্থা আমাদের অবস্থার তুলনায় ছিল আরও খারাপ। রোমান ক্যাথলিক আর প্রোটেস্ট্যান্টরা পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্যাতন করত সেখানে। এমনকি এখনও এমন কতকগুলি রাষ্ট্র বিদ্যমান, যেখানে একটা বিশেষ শ্রেণির প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় এবং প্রতিকূল বাধা-নিষেধও আরোপ করা হয়। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমরা সেই যুগের দিকে ধাবিত হচ্ছি না। কোনোরূপ পার্থক্য ব্যতিরেকে যে যুগে আমাদের যাত্রার সূচনা, সেখানে কোনো প্রকার পার্থক্য নেই এক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের, এক জাতি অথবা ধর্মের সঙ্গে অন্য জাতি ও ধর্মের। ইংল্যান্ডের অধিবাসীদের বাস্তব অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছিল; পালন করতে হয়েছিল তাদের স্বদেশের সরকার কর্তৃক ন্যস্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। সেই অগ্নিপরীক্ষা তারা অতিক্রম করেছিল ধাপে ধাপে। আজ ন্যায়সংগতভাবেই ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্টদের আর অস্তিত্ব নেই, বরং যা রয়েছে তা হল প্রত্যেক ব্যক্তিই হল গ্রেট ব্রিটেনের নাগরিক, এবং তারা সকলেই এক জাতির অন্তর্ভুক্ত।
আমার বিবেচনায় বর্তমানে আমাদের আদর্শ রূপে এই উদাহরণকে সামনে রাখতে হবে। আপনারা সবাই দেখতে পারবেন একদিন এমন এক সময় আসবে, যেদিন হিন্দু আর হিন্দু, মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না, ধর্মীয় অর্থে অবশ্য নয়, কারণ ধর্ম হল প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিশ্বাস, প্রকৃতপক্ষে সেই পরিচিতি হবে রাষ্ট্রের নাগরিক পরিচিতির রাজনৈতিক অর্থে।
মহোদয়া ও মহোদয়গণ, আমি আর আপনাদের অধিক সময় ব্যয় করতে চাই না। আপনারা আমাকে যে সম্মান প্রদান করেছেন, তজ্জন্য পুনরায় আপনাদের আমি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। রাজনীতির ভাষা অনুযায়ী কোনোরূপ বিরূপ অথবা বিদ্বেষমূলক মনোভাব অর্থাৎ পক্ষপাতিত্ব এবং নিজের সম্প্রদায়ের জনসাধারণের প্রতি অনুকূল মনোভাবের দ্বারা নয়, ন্যায়বিচার এবং অপক্ষপাতমূলক নীতির দ্বারা আমি সর্বদা পরিচালিত হব। ন্যায়বিচার এবং সম্পূর্ণ অ-পক্ষপাতিত্বের নীতিই আমাকে পথ দেখাবে। আমার নিশ্চিত ধারণা এবং আমি আশা করতেই পারি যে, আপনাদের সমর্থন ও সহযোগিতায় সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে পাকিস্তান এক অন্যতম মহান জাতি হয়ে উঠবে।