দেশান্তরের রাজনীতি : দণ্ডক থেকে মরিচঝাঁপি

অলক কুমার ঘোষ

গোড়ার কথা

সাতচল্লিশে (১৯৪৭) যা ঘটেছিল, তাকে যদি বলা যায় রাষ্ট্রভাগ, তাহলে বাঙালির দেশভাগ হয়েছিল তার পরের দুই দশকে যখন দফায় দফায় দলে দলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে দেশছাড়া হতে হয়েছিল। তাদের নতুন নাম দেওয়া হয়েছিল, উদ্‌বাস্তু। তারা ‘নতুন মানুষ’ হয়ে নতুন জীবন পেয়েছিল দিনযাপনের বদলে যাওয়া অভ্যাসে। ছেচল্লিশের (১৯৪৬) নোয়াখালি দাঙ্গার পর থেকে ছাপ্পান্নোর (১৯৫৬) মধ্যে ওপার বাংলা থেকে চলে এসেছিল প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষ, স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল এতদিন ধরে যে সাত পুরুষের ভিটেয় তারা বড়ো হয়ে উঠেছে, তা আর তাদের নয়, যে শহরে যে গ্রামে তারা জন্মেছে, সেই গ্রাম সেই শহর তাদের পরবাস। চৌষট্টির (১৯৬৪) মধ্যে আরও তিরিশ লক্ষ লোক পালিয়ে এসেছিল এপারে। শরণার্থী হয়ে বয়ে বেড়াতে হয়েছিল জীবন হারানোর গ্লানি, ‘নতুন জীবনে’ কেবল অর্থের অভাবে নয়, দীর্ণ হতে হয়েছিল মনের দীনতায়।

এমনটা যে শুধু বাংলাতেই হয়েছিল, তা নয়, পাঞ্জাবেও হয়েছিল। কিন্তু ঘরছাড়াদের নিয়ে পাঞ্জাবে তেমন রাজনীতি হয়নি, যেমনটা হয়েছিল বাংলায়। পাঞ্জাবে দেশান্তরী মানুষগুলো ঘর হারিয়েছিল একবার, কিন্তু এখানে তারা ঘর হারিয়েছিল বারবার, কিংবা ঘর খুঁজে পায়নি একবারও। সে এক অদ্ভুত আঁধারের কাল, পুনর্বাসনের রাজনীতির পাকে জড়িয়ে দিয়েছিল অগুনতি যাপিত জীবন, এপার বাংলা থেকে দণ্ডকারণ্য, দণ্ডকারণ্য থেকে মরিচঝাঁপি পর্যন্ত তার বিস্তার। এই নিবন্ধের আলোচ্য সেই পুনর্বাসনের রাজনীতি বা রাজনৈতিক অর্থনীতি।

দেশান্তরের কয়েক ধাপ : সাতচল্লিশের পর

আখ্যানের শুরুটা কিন্তু এমন ছিল না। আটচল্লিশের (১৯৪৮) জুন মাসের মধ্যে যে এগারো লক্ষ মানুষ দেশান্তরী হয়ে এপারে চলে এসেছিল, তাদের সকলেই যে ওপারে অত্যাচারিত, তাড়িত বা দাঙ্গার শিকার, তা নয়। পাকিস্তান ছেড়ে গঙ্গাতীরে হিন্দুস্থানে থাকার পুণ্যবাসনাতেও অনেকে এসেছিল। সম্পত্তি বদল করে বা নয়া বাণিজ্যের বন্দোবস্তেও অনেকে এসেছিল, এপারে থিতু হয়ে বসতেও তাদের কোনও সমস্যা হয়নি। এগারো লক্ষের মধ্যে সাড়ে তিন লক্ষ ছিল শহুরে মধ্যবিত্ত, সাড়ে পাঁচ লক্ষ গ্রামীণ উচ্চ বা মধ্যবিত্ত, এক লক্ষ সচ্ছল কৃষক, আর এক লক্ষ ছিল গ্রামীণ কারিগর। এপার বাংলা তাদের কারও দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। সম্পত্তি বদল করে যারা আসেনি বা কারিগরি-বাণিজ্যে বসতি যাদের সম্ভব হয়নি, তারাও এপারের সামাজিক সমর্থনেই জবরদখল কলোনি গড়ার জন্য কুরুক্ষেত্রের লড়াই করতে পেরেছিল, সরকারের পরোক্ষ প্রশ্রয় যে ছিল না, তাও নয়। সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত লিখেছিলেন, “Call to the Mothers of West Bengal”, মায়েদের বলেছিলেন জন্মনিয়ন্ত্রণের ‘ত্রৈমাস্যা ব্রত’ পালন করতে যাতে জন্ম বৃদ্ধির হার কমে যায়, জায়গা বেঁচে থাকে ওপারের মানুষগুলোর জন্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউট হলে ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার বক্তৃতায় বলেছিলেন, “Those who are leaving East Bengal are the best portion of the local population in brain, wealth, organizing capacity and indomitable spirit … I warn West Bengal do not spurn away such a rich racial element when seeking shelters at your doors. They alone can make you great if you utilise these human materials.”

দিকবদলের আখ্যান

ছবিটা বদলে গিয়েছিল আখ্যানের দ্বিতীয় ভাগে। এতদিন যারা এসেছিল, তারা গরিষ্ঠতায় ছিল উঁচু বর্গের উঁচু জাতের মানুষ। কিন্তু একান্ন (১৯৫১) থেকে যারা আসতে শুরু করল, তারা সেই সময়ের রাজনৈতিক সমাজের চোখে নীচু বর্গের, তুলনায় নীচু জাতের লোক। শুধু সংখ্যায় নয়, জাতপাত বা বংশার্জিত পেশার নিরিখে তাদের তুল্যমূল্যের বিচার হয়েছিল। রাষ্ট্রভাগের সময় দেশত্যাগের কথা তারা ভাবেনি। ম্যাকডোনাল্ডের কম্যুনাল অ্যাওয়ার্ড-এর (১৯৩২) এর সময় থেকেই তারা— নমঃশূদ্র, ক্ষত্রিয়, বাউরি, সদগোপ, কৈবর্ত— শ্রেণিস্বার্থের বিচারে মুসলিম কৃষকদেরই আপনজন ভেবেছিল, তাদের সঙ্গে জোট বেঁধেই কংগ্রেসি সামন্ত বর্গের দাপট আটকাতে চেয়েছিল। এমনকি মুসলিম লিগের পাকিস্তানের দাবিকেও তারা অন্যায্য মনে করেনি, বরং পাকিস্তানকেই হিন্দু আভিজাত্যের দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে ধরে নিয়েছিল। তাদের নেতা যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল সেই আশাতেই পাকিস্তান মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছিলেন। যোগেন্দ্রনাথ লিখছেন, “… I remained undaunted and unreserved in my loyalty to Pakistan… the principal objective that promoted me to work in cooperation with the Muslim league were, first that the economic interests of the Muslims in Bengal generally where identical with those of the Schedule Castes… secondly, the objective was that the Scheduled Castes and Muslims both educationally and economically backward, I was persuaded that my cooperation with the League and its ministry would lead to the undertaking on a wide scale of legislative and administrative measures which, while promoting the mutual welfare of the vast bulk of Bengal’s population and undermining the foundations of vested interests and privilege would further the cause of communal peace and harmony.”

কিন্তু ভুল ভেঙেছিল অচিরেই। পাকিস্তান আসলে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনি বানাতে চেয়েছিল। তার জন্য দরকার ছিল পূর্ব বাংলার ‘নীচুবর্গে’-র ঐক্যে ফাটল ধরানো, সেই কাজটাই সুচারুভাবে করা হয়েছিল এপার থেকে যাওয়া বিহারি মুসলমানদের কাজে লাগিয়ে, যারা ওপার থেকে নীচু বর্গের হিন্দুদের তাড়িয়ে দিয়ে জমির দখল নিতে চেয়েছিল আর সেই সঙ্গে মুসলমান বাঙালি চাষির মনেও জমির খিদে বাড়িয়ে দিতে পেরেছিল। কাজেই দাঙ্গা বাঁধতে দেরি হয়নি। ১৯৫০-এর গোপালগঞ্জের দাঙ্গা চোখ খুলে দিয়েছিল যোগেন্দ্রনাথের। ঐবছর ৯ই অক্টোবর পাকিস্তান মন্ত্রীসভা থেকে তিনি পদত্যাগ করে এপারে চলে এসেছিলেন, ঢল নেমেছিল নীচু বর্গের দেশান্তরীদের। ১৯৫২-১৯৬২-র মধ্যে এপারে এসেছিল লক্ষ লক্ষ উদ্‌বাস্তু পরিবার। এপারে এসে এদেশের চাষি কারিগরদের সঙ্গে জোট বাঁধার চেষ্টা করেছিল তারা। তপশিলি জাতির ছাত্র ও যুব সংগঠন তৈরির কাজে নেমে পড়েছিলেন পরমানন্দ হালদার। সফল হননি তেমন, উচ্চবর্গ নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক দল ও সরকারের মনে ভয় জন্মে গিয়েছিল, হয়তো তাদের মনে হয়েছিল যে, তাদের একটা বড়ো অংশকে বাংলার বাইরে পাঠিয়ে না দিলে নেতৃত্বে লাগাম হাত থেকে ছুটে যেতে পারে। এই ব্যাপারটা মাথায় রাখলে বুঝতে সুবিধা হয়, কেন আঠারো লাখ আঠাশ হাজার একর বাড়তি জমি থাকা সত্ত্বেও এই লোকগুলোকে এই বাংলায় জায়গা দেওয়া সম্ভব ছিল না, আর কেন কেন্দ্রীয় সরকারের আর রাজ্য নেতৃত্বের মত এক হয়ে গিয়েছিল এক্ষেত্রে।

দেশান্তরীর দেশান্তর : দণ্ডকের পথে

১৯৫৪ থেকে লোক পাঠানো শুরু হয়েছিল আন্দামানে। সেখানে যে ৮৬ শতাংশ সংরক্ষিত বনাঞ্চল তার মধ্যে ৩৫ শতাংশ রাখা আছে সেখানকার আদি জনজাতিগুলোর জন্য, সে কথা বেমালুম ভুলে গেল সবাই। একষট্টির (১৯৬১) মধ্যে চালান হয়ে গেল দু-হাজার পরিবার। লাভ দু-দিকে। একদিকে বেশ কিছু মানুষ বাংলা থেকে হটে গেল, অন্যদিকে সস্তার শ্রমিক পাওয়া গেল আন্দামানের জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র নির্মাণের স্বার্থে। একজন নেতা তো আগেই (১৯৫৩) সংসদে বলেছিলেন যে, কম খরচে জঙ্গল কেটে আন্দামানের উন্নতি যদি ঘটাতে হয়, তাহলে তার সহজ উপায় হল পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা উদ্‌বাস্তুদের সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া।১০

এরমধ্যেই মনে পড়ে গেল দণ্ডকারণ্যের কথা। ছাপ্পান্নতে (১৯৫৬) পুনর্বাসন মন্ত্রীদের বৈঠক হল, সাতান্নতে (১৯৫৭) তৈরি হল দণ্ডকারণ্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (DDA – Dandakaranya Development Authority) সীমান্ত পেরোতে না পেরোতেই মানুষগুলোকে ধরে ধরে পাঠানো হতে লাগল দণ্ডকারণ্যে। এখানেও দু-দিকের লাভ। উদ্‌বাস্তুর পুনর্বাসন, বাস্তুহারার বাস্তু লাভও দেখানো গেল, আর সেখানকার বনবাসী জনজাতিদের প্রতিরোধে যে জঙ্গল পরিষ্কার করা যাচ্ছিল না, এই উদ্‌বাস্তুরাই  খেয়ে না খেয়ে, জীবন বাজি রেখে তা পরিষ্কার করে দেবে, সেখান থেকে শিল্প কারখানার জন্য দরকারি বনজ ও খনিজ সম্পদ উদ্ধারের উপায় বাতলে দেবে। ‘Care and Utility’ নীতিটির যথাসার্থক প্রয়োগ আর কি! আসলে এটাই ছিল আধুনিক রাষ্ট্রের প্রগতির দর্শন।

ওড়িশার কোরাপুট জেলার উমরকোট, রায়গড়, মালকানগিরি, মধ্যপ্রদেশের বস্তার জেলায় পারলকোট, ফরাসগাঁও, আর যামরি — তিরিশ হাজার বর্গমাইল জঙ্গল নিয়ে এই রামায়ণ কাহিনির দণ্ডকারণ্য। সে নাকি “দুধ আর মধুর দেশ’, সরকারি ‘সকাল থেকে সন্ধে’ ছবিতে। পালন করা হল ‘দণ্ডকারণ্য সপ্তাহ’। চৌষট্টিতে (১৯৬৪) তৈরি হল মানা ট্রানজিট ক্যাম্প। সেখান থেকে খাটতে পারে যারা তারা গেল কর্মী শিবিরে গালভরা নাম দেওয়া হল ওয়ার্কসাইট ক্যাম্প। যারা অশক্ত তাদের পাঠানো হল পি এল এ (Permanent Liability Camp) ক্যাম্পে। অন্যরা সোজা দণ্ডকারণ্যে। বরিশালের যতীন দাসকে কর্মী শিবির থেকে নেওয়া হয়েছিল আই টি আই (ITI) ট্রেনিংয়ে, খুলনার বৈকুণ্ঠ মণ্ডল রাস্তা তৈরির কাজে, ওয়ালটেয়ার রেলপথের শ্রমিক হয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন যশোহরের মুকুন্দ বিশ্বাস। আর কখনও তাদের পরিবারকে খুঁজে পাননি তারা। দেশভাগ হয়েছিল, তারপর ভাগ হয়েছিল পরিবার।১১

দণ্ডকারণ্য : পুনর্বাসন বা নির্বাসন

কেমন দেশ সে দণ্ডকারণ্য? তার ছবি আঁকা আছে সুধীর রঞ্জন হালদার-এর উপন্যাসে, ‘অরণ্যের অন্ধকারে’। “এ তো কল্পনায় ছিল না কখনও ওদের। চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড়-পর্বত জঙ্গলে ভরা। পাথর বালির দেশ রুক্ষ এই দণ্ডকারণ্য। জল-কাদা, খাল-বিল, নদী-নালা, সবুজের সমারোহ ছাড়া কোনও দেশ হয়, এমন ধারণা ছিল না আগে।”১২ মেনে নিতে পারেনি উদ্‌বাস্তুরা, ভাঙা মন ভেঙে গেছে আরও। তবু তারা জঙ্গল কেটে জমি বার করেছে, রাস্তা বানিয়েছে, পুকুর কেটেছে — তাতে জল পায়নি যদিও, পাথর ভেঙেছে, বাঘ-ভালুকের সঙ্গে লড়াই করেছে, সাপের কামড়ে মরেছে, তৈরি করেছে বসতবাড়ি। রাতে বাতি জ্বালানোর তেল নেই, পাশ থেকে ছেলে তুলে নিয়ে গেছে ভালুক, ক্যাম্পে বাবুরা এসে তুলে নিয়ে গেছে যুবতি মেয়েদের। সরকার যাই বলুক, ওই অসহায় মানুষগুলোর কাছে দণ্ডকারণ্য ছিল ‘শয়তানের দ্বীপ’ (Devil’s Island) ‘রক্তশুকনো খড়্গ’ (Dry Guillotine)।

১৯৭৩-এর মধ্যে ১৮৪ টি পত্তনি গ্রামে বসতি হয়েছিল প্রায় সতেরো হাজার উদ্‌বাস্তু পরিবারের। প্রত্যেক চাষি পরিবার পেয়েছিল সাড়ে ছয় একর জমি, আধ একর বসত ও বাগানের জায়গা। ঋণ মিলে ছিল বাড়ি বানানোর জন্য ১৭০০ টাকা, গোরু-মোষ কিনতে ১১১৫ টাকা, কুয়ো খুঁড়তে ১৫০, বীজ ধান ও চাষের যন্ত্রপাতির জন্য ৮৫০। দোকান নিতে চাইলে দোকান ঘরের জন্য ২০০০ টাকা আর মূলধন বাবদ ১০০০ টাকা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল, সরকার কম করেনি তো ওদের জন্য।১৩ কিন্তু ওরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল পুনর্বাসনের নামে অল্প টাকায় জঙ্গল পরিষ্কার করিয়ে দুর্গম জায়গাটা হাসিল করে নিয়েছে সরকার।

কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। পুনর্বাসনই যদি একমাত্র উদ্দেশ্য হবে তাহলে এমন অবাস্তব ব্যবস্থা কিংবা অব্যবস্থা কেন? পাট্টা ছাড়া দূরে দূরে ছড়ানো পাথুরে জমি, তাতে ধান হয় না। ঢাক ঢোল পিটিয়ে ভাসকাল, পারলকোট বা পট্টেরু ড্যাম বানিয়েছিল, তাতে জমি ভেজেনি। দোকান বসিয়েছিল, কেনবার লোক নেই। জোর করে পাঠানো হয়েছিল জেলে উদ্‌বাস্তুদের, অথচ মাছ ধরবে তেমন নদী ছিল না ধরাছোঁয়ার মধ্যে। বড়েগাঁওয়ে কারখানা হয়েছিল, কাজ পেয়েছিল অন্ধ্র ও কেরলের দক্ষ শ্রমিকরা। উদ্‌বাস্তুদের শেখানোর ব্যবস্থা নেই, তাই তারা অদক্ষ। চাকরি? ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ সরকার নমঃশূদ্রদের তপশিলের সুবিধা দেয় নি, তাই চাকরিও ছিল না। লেখাপড়া? ‘অরণ্যলিপি’-তে অমিয়া সেন লিখছেন, ছেলে মেয়ে কাঁদে স্কুলের জন্য, পাঠাতে হয় রাস্তা বাঁধতে।১৪

ঘরের খোঁজে ফেরা : মরিচঝাঁপির দিকে

খুব স্বাভাবিক যে এই দণ্ডকারণ্যকে পুনর্বাসন নয়, নির্বাসন বলেই গণ্য করেছিল উদ্‌বাস্তুরা। শুধু জনজাতিরা নয়, ওড়িশার রাজনৈতিক নেতৃত্বও তাদের অহেতুক উৎপাত বলেই মনে করত। প্রায় সংঘাত হত গোঁড় উপজাতির মাতব্বরদের সঙ্গে। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় বামপন্থীরা ‘দণ্ডকের কান্না বন্ধ কর, ওদের নিয়ে এসে এই বাংলায় থাকতে দাও’ আওয়াজ তুলেছিলেন ভোটের আশায়। আটাত্তরে (১৯৭৮) সেই বামপন্থীরাই পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রক্ষমতায়, ফলে দণ্ডক ত্যাগের হিড়িক, রাজ্যে পুনর্বাস্তুহারার ঢল, ওই বছরই মার্চ মাসের মধ্যে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ছাব্বিশ হাজার। সুন্দরবনের উনচল্লিশ মাইল লম্বা আট মাইল চওড়া নির্জন দ্বীপখণ্ডে নয়া বসতি গড়ে তোলে তারা। সোঁদা জমিতে চাষ, মাছের ভেড়ি, কুটির শিল্প, পাঠশালা — এসবই ছিল বেসরকারি কর্মকাণ্ড, সরকারের ঘাড়ে কোনও দায় চাপায়নি ঐ বাস্তুসন্ধানীর দল।

কিন্তু তবুও বদলে গিয়েছিল বামপন্থার মুখ, রাজনীতির সেই মোচড় জানা ছিল না মরিচঝাঁপির উদ্‌বাস্তুদের। ১৯৭৯-র ৯ ফেব্রুয়ারি রাজ্য বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, মরিচঝাঁপি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, জনবসতি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করবে, উদ্‌বাস্তুদের কোনোমতেই সেখানে থাকতে দেওয়া সম্ভব নয়, তাদের দণ্ডকারণ্যে ফেরত যেতে হবে।১৬ এরপরের পুলিশি আক্রমণের কথা আজ সকলেরই জানা। দ্বিতীয় জালিয়ানওয়ালাবাগ মরিচঝাঁপিতে অনেককে শুইয়ে রেখে বাকি নিবারণদের ফিরতে হয়েছিল দণ্ডকারণ্যে। হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন পশ্চিমবঙ্গেরই এখানে সেখানে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিল।১৭

ভোলবদলের সত্যি মিথ্যে

প্রশ্ন ওঠে, এ কেমন রাজনীতি যেখানে ডান-বাম সব সংসদপন্থীরাই এক হয়ে যায়? সত্যিই কি ওই দলিত উদ্‌বাস্তুদের থাকতে দেওয়ার মতো জায়গা ছিল না, আশেপাশের রাজ্য থেকে লক্ষ একর জমি পাওয়া সত্ত্বেও? এ ব্যাপারে সরকারি হিসেবের সঙ্গে বেসরকারি হিসেবের অনেক ফারাক। রাধাকমল মুখোপাধ্যায়ের মতো অর্থনীতিবিদকে নিয়ে ‘দি বেঙ্গল রিহ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন’ যে সমীক্ষা করেছিল তাতে দেখানো হয়েছিল, তখনো এই বঙ্গে চাষযোগ্য পনেরো লক্ষ একর জমি পতিত অবস্থায় ছিল। রাধাকমল মনে করতেন, পূর্ব বাংলার দক্ষ গুণী চাষিদের এইসব পতিত জমিতে বসিয়ে দিলে ধানের ফলনে বিপ্লব ঘটবে, তাতে এই বঙ্গেরই লাভ। লিখছেন, “it was the pioneer settlers, the forefathers of the refugees who fought the tigers and the crocodile and who overcame the hazards of the forest and flood that created in East Bengal the granary of rice and jute in India. It was their toil which had made East Bengal one of the most flourished gardens of Asia.১৮ সুতরাং মরিচঝাঁপিতে যদি উদ্‌বাস্তুদের থাকতে দেওয়া হত, তাহলে কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এমনও নয় যে সত্তরের দশকে দণ্ডকারণ্যের শোচনীয় অভিজ্ঞতার ধাক্কাতেই কেবল উদ্‌বাস্তু বসতির জন্য সুন্দরবনের কথা উঠে এসেছিল। আগের দশকেই ১৯৬৪ সালে সতীশ চন্দ্র দাশগুপ্ত লিখেছিলেন, “there are one thousand of acres in blocks in the Sunderbans … which can accommodate 10000 families each … this families if properly taken care of will be able to produce golden crop in the Sundarbans.”১৯ এমনকি এর আগেও ১৯৫৭-র ৯ ডিসেম্বরে ‘ইউনাইটেড সেন্ট্রাল রিফিউজি কাউন্সিল’ (UCRC) তার চতুর্থ সম্মেলনের প্রস্তাবে বলেছিল যে, উদ্‌বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পাঠানোর কোনও দরকার নেই, কেননা এখানেই তাদের জন্য ফাঁকা জায়গা আছে।২০ ইঙ্গিত স্পষ্টতই ছিল সুন্দরবনের দিকে, আর বামপন্থীরাও নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার আশায় ওই ইঙ্গিতকেই রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত করেছিলেন। ১৯৬১-র ১৩ জুলাই তখনকার পুনর্বাসন মন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনকে বিরোধী নেতা হিসেবে জ্যোতি বসু যে চিঠি দিয়েছিলেন তাতেও এর আভাস দেওয়া আছে। আর এক বাম নেতা সমর মুখোপাধ্যায় ‘All India Council of East Pakistan Displaced Persons’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছিলেন, “demand by refugees are not only realistic but also can be implemented within a very reasonable period and at a cost lower than that for schemes outside West Bengal”.২১ এই সময় মুখোপাধ্যায়ই ১৯৭০-এর ২০ নভেম্বর স্বীকার করেছিলেন যে, সুন্দরবনের চার লক্ষ উদ্‌বাস্তুকে দেওয়ার মতো জায়গা আছে এবং বামপন্থীরা ক্ষমতায় এলেই তা সম্ভব হবে।২২ ১৯৭৪-এর ডিসেম্বরে ভিলাইয়ে এক বক্তৃতায় জ্যোতি বসু বলেছিলেন, আমরা ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত উদ্‌বাস্তুরা বাংলায় ফিরতে পারবে না, কিন্তু ক্ষমতা পেলেই আমরা সুন্দরবনে তাদের পুনর্বাসনের দাবি মিটিয়ে দেব।২৩ একথারই প্রতিফলন ছিল রাজ্যপাল এ এল ডায়াসকে ১৯৭৫-এর জুন মাসে দেওয়া বামপন্থীদের দাবিপত্রে।২৪

এই যদি আসল কথা, তাহলে পঞ্চাশের দশকে যখন উদ্‌বাস্তুদের জোর করে আন্দামান বা দণ্ডকারণ্যে পাঠানো হচ্ছিল, তখন বামপন্থীরা সেটা মেনে নিয়েছিলেন কেন আর কেনই বা ১৯৭৯-তে সেই তারাই উদ্‌বাস্তুদের মরিচঝাঁপি থেকে ভিটেছাড়া করেছিলেন? যে জ্যোতি বসু ১৯৭৪-এ ওই উদ্‌বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গে, বলা ভালো সুন্দরবনে, আশ্রয় দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন, সেই জ্যোতি বসুই ১৯৭৯-তে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অজুহাতে মরিচঝাঁপির উদ্‌বাস্তুদের দণ্ডকারণ্যে ফেরত পাঠিয়েছিলেন কেন? এমনকি ১৯৭৯-এর এপ্রিলে সিটিজেনস ফর ডেমোক্রেসির সাধারণ সম্পাদক ভি এস তারকুন্ডে যখন মরিচঝাঁপিতে আসতে চেয়েছিলেন, তখনও তাকে জ্যোতি বসু বারণ করেছিলেন এই বলে যে তিনি এলে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকায় অবৈধ জবরদখলকারী উদ্‌বাস্তুরা অন্যায় সমর্থন পেয়ে যাবে।২৫

রাজনীতির নানামুখ

রাজনীতির এই কৌশল বুঝতে গেলে দুটো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া দরকার। এক, সত্যিই কি মরিচঝাঁপিতে উদ্‌বাস্তু বসতির ফলে বুনো পরিবেশ বা জীববৈচিত্র্যের সমূহ ক্ষতি হত? দুই, রাজনীতির কারবারিরা কি এতটাই পরিবেশপ্রেমী ছিলেন? এক কথায় দুটো প্রশ্নেরই উত্তর, না।

রাষ্ট্র ভাগের সময়ে সুন্দরবনের বেশিরভাগটাই চলে গিয়েছিল ওপার বাংলায়। এপারের ভাগে পড়েছিল মাত্র ১৮৭৫ বর্গমাইল এলাকা। ১৬৪৬ বর্গমাইল ছিল জলে ডোবা, ২২৯ বর্গমাইল এলাকায় জঙ্গল আগেই কাটা হয়েছিল, জনবসতিও ছিল সেখানে, বাকি ৯০০ বর্গমাইলই কেবল ছিল বনাঞ্চল, তার জন্য মরিচঝাঁপি ছিল ক্ষুদ্রতম প্রান্তিক অংশ। ছোটো ছোটো ঝোপঝাড়, গরান, গেওয়া, সুন্দরী গাছ কিছু দেখা যেত, নদীর তীর ধরে ছিল কিছু গর্জন গাছ। বেশিরভাগ গাছ ছিল বেঁটে ধরনের, ঘন জঙ্গলের উপযুক্ত নয়, বড়ো বন্য পশুর উপযুক্ত মুক্তাঞ্চল তৈরি করাও সেসব গাছের সাধ্যের বাইরে। বনদপ্তরের রিপোর্টেই বলা আছে যে, যদি মরিচঝাঁপিতে একজন মানুষও না থাকত, তাহলেও দুটোর বেশি বাঘ সেখানে থাকতে পারত না।২৬ এদিক দিয়ে দেখলে সরকারি অজুহাত একেবারেই ধোপে টেঁকে না, উদ্‌বাস্তুদের কথাই ঠিক বলে মনে হয়।

সরকারি পরিবেশ প্রেমও যে একান্তই মেকি ছিল, তা বুঝতে বেশি গবেষণার দরকার নেই। উদ্‌বাস্তুদের আন্দামানে বা দণ্ডকারণ্যে পাঠানোর অর্থই ছিল সেখানকার জঙ্গল সাফ করা, জনজাতিদের বিপন্ন করা, অথচ তখন বনাঞ্চল রক্ষা বা জীববৈচিত্র্য বাঁচানোর কথা ওঠেনি। চা বাগানের প্রয়োজনে উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে যখন জঙ্গল কাটা হয়েছিল, বা জঙ্গল পরিষ্কার করে নেপালি ভুটিয়া চা-শ্রমিকদের বস্তি বানানো হয়েছিল, তখনও কিন্তু প্রাকৃতিক ভারসাম্যের কথা ওঠেনি।

তাহলে উদ্‌বাস্তু পুনর্বাসনের প্রশ্নে এই ভোলবদল কেন? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলেই অন্য রাজনীতির প্রসঙ্গ চলে আসে। পঞ্চাশের দশকে যখন দেশান্তরী মানুষগুলো পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় চেয়েছিল রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় তখন কংগ্রেস। বামপন্থীরা তখন বিরোধীর আসনে, ক্ষমতার প্রতীক্ষায়। তারা বলে আন্দামান বা দণ্ডকারণ্যে উদ্‌বাস্তুদের পাঠানোর ব্যাপারে তারা ‘অখুশি’ ছিল। সেটা নিতান্তই লোক দেখানো কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, তবে তারা প্রতিবাদী বা প্রতিরোধী যে ছিল না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আর ১৯৭৮-৭৯তে উদ্‌বাস্তুরা মরিচঝাঁপিতে চলে আসায় তারা যে শুধু অখুশি তাই নয়, রীতিমতো জঙ্গি প্রতিরোধী। মরিচঝাঁপি উদ্‌বাস্তু উন্নয়ন সমিতির নেতা রায়হরণ বাড়ই তাই বিশ্বাস করতেন, দলিত পিছড়েবর্গ মানুষদের সংখ্যাধিক্যের চাপে বর্ণশ্রেষ্ঠদের যদি রাজনীতি থেকে পিছু হটতে হয়, সেই ভয়েই তারা উদ্‌বাস্তুদের একসঙ্গে মরিচঝাঁপিতে থাকতে দেয়নি।২৭

রাজনীতির অর্থনীতি

রাজনীতির অর্থনীতি সম্ভবত আরও গভীরে ছিল। পঞ্চাশের দশকে রাজ্য রাজনীতিতে বিরোধীদল হিসেবে বামপন্থীরা কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোষক শিল্প-পুঁজির বিরুদ্ধে ছিল। নাগরিক মধ্যবিত্ত বা শ্রমিকদের চাইতেও তখন তারা গ্রামীণ কৃষি মজুর, অদক্ষ কারিগর বা প্রান্তিক কৃষকদের ওপর বেশি ভরসা রেখেছিল। উদ্‌বাস্তুরা ওই সমাজেরই সংযুক্ত অংশ, সংসদীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের পরোক্ষ সমর্থনের দরকার ছিল। সেই কারণেই পুনর্বাসনের নামে নির্বাসন দেওয়ার সিদ্ধান্তে, লোক দেখানো হলেও, ‘অখুশি’ ভাবটা তারা দেখিয়েছিল। আর সেই কারণে ১৯৭২-৭৬-এর এই সময়পর্বে নির্বাসিত উদ্‌বাস্তুদের পশ্চিমবাংলায় ফিরিয়ে আনার পক্ষে তাদের সওয়াল। কিন্তু ১৯৭৯তে রাজনীতির প্রেক্ষিত বদলে গেছে। বামপন্থীরা তখন রাজ্যের শাসনক্ষমতায়। সেই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য শিল্প-পুঁজি আর নাগরিক শ্রেণি সমর্থন জরুরি। ‘অপারেশন বর্গা’ নামে এক আধা সংস্কারি প্রকল্পে হাত দিয়ে তারা একদিকে গ্রাম থেকে শহরে আসা জমির মালিকদের ফেলে আসা গ্রামের জমি যাতে বেদখল না হয় সেই ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে চেয়েছিল, আর সেই সব জমিতেই বর্গা চাষ করছে এমন সব প্রান্তিক চাষির সমর্থনকেও নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। সেই অবস্থায় নতুন কোনও উদ্‌বাস্তু সমাজ, অনেক চাপ সত্ত্বেও যারা বামপন্থী দলীয় আনুগত্যের শামিল হতে চায়নি, তাদের বসতির ব্যাপারে আগ্রহ তো ছিলই না বরং অনাগ্রহ ছিল অনেক বেশি মাত্রায়। দণ্ডকারণ্যের বনাঞ্চল ধ্বংসে বা উত্তরবঙ্গের চা বাগান ঘিরে মাইলের পর মাইল জুড়ে নেপালি বস্তি গড়ে ওঠায় তাদের আপত্তি ছিল না, কিন্তু মরিচঝাঁপিতে পুলিশ দিয়ে গুলি চালিয়ে উদ্‌বাস্তুদের তাড়িয়ে দিতে তারা তৎপর ছিল। এই দু-মুখো নীতি থেকেই দণ্ডক থেকে মরিচঝাঁপির উদ্‌বাস্তু পুনর্বাসনের রাজনৈতিক কূটকৌশলটি স্পষ্ট হয়ে যায়। দণ্ডকারণ্যে জঙ্গল কেটে ভারি শিল্পের জন্য বনজ-খনিজ সম্পদ উদ্ধারের প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল রেলপথ নির্মাণের। অন্যদিকে মরিচঝাঁপিতে মানুষ তাড়িয়ে ঝোপঝাড়-গাছের ক্ষুদ্র বনসৃজনের দরকার ছিল, কেননা সেটা পশ্চিমবঙ্গের সদ্য বেড়ে ওঠা কাগজ শিল্পের পশ্চাৎক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারত। ১৯৭৬-এর সুন্দরবন উন্নয়ন বোর্ড একটা প্যামফ্লেট ছেপেছিল। তাতে ডেপুটি কনজার্ভেটর অব্ ফরেস্ট লিখেছিলেন, “the growth of trees in these zones is quite slow due to the site factor and attack of insects and fungus to trees rules out the possibility of quality timber, consequently the endeavor should be to grow industries which can utilise the small size timber for, say particle board or paper.”২৮

ফলকথা

তাই দণ্ডক থেকে মরিচঝাঁপি, পঁচিশ বছরের এই পুনর্বাসন রাজনীতি, কিংবা রাজনীতির অর্থনীতি, বাস্তুহীনতার ইতিহাসে এক দিকবদলের দিকে আমাদের নজর ঘুরিয়ে দেয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা ঘর হারিয়েছিল, তারাই দ্বিতীয়বার উদ্‌বাস্তু হয়েছিল জমি ও পুঁজির দ্বন্দ্বে, রাষ্ট্রনির্মাণের উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রকল্পে। রাষ্ট্রভাগ পালটে দিয়েছিল বহমান জীবনের জাতীয়তা, দেশভাগ বদলে দিয়েছিল যাপিত জীবনের দৈনন্দিনতা, হারিয়ে গিয়েছিল সন্তান, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলেবেলার সঙ্গী, খেলার মাঠ, স্কুল-কলেজ, আর সব চেনা-মুখ, আর দণ্ডক-মরিচঝাঁপির রাজনীতি নিশ্চিত করে দিয়েছিল যে, বাস্তুহারার বাস্তুসন্ধানের শেষ নেই। ঋত্বিক ঘটকের ‘সড়ক’ গল্পে পদ্মার কিনার ছেড়ে আসা ‘বুড়ি’ পাকসার্কাসের ডেরায় ঢুকতে ঢুকতে প্রশ্ন করে, “কনে বাড়ি মোর, কইবার পারো?” একই প্রশ্ন দেশান্তরের রাজনীতিতে বিধ্বস্ত দণ্ডক-মরিচঝাঁপির মানুষগুলোর। দণ্ডকমুখী রেল গাড়ির কামরায় ভেজা ধুতি মেলতে মেলতে খুলনার বৈকুণ্ঠ মণ্ডল বলেছিলেন, “কী দেখতিছেন? ইচ্ছে ছিল না ওই দেশে যাব, কিন্তু এ দেশে বান্ধব পালাম না। আজ চার দিন ভাত খাতি পারিনি। চলতিছি।” আজ এই চলার নামই দেশান্তরের রাজনীতি, কুড়ি শতকের বাঙালির সব চাইতে বড়ো ট্র‍্যাজেডি।

টীকা ও সূত্রনির্দেশ :

১. রাষ্ট্রভাগ মানেই দেশ ভাগ নয়। রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রশাসনিক একক, দেশ একটি সামাজিক-মানসিক-জৈবনিক একক।

২. উদ্‌বাস্তু জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার চমৎকার ছবি পাওয়া যায় মনোরঞ্জন চৌধুরীর বর্ণনায়। Manoranjan Chaudhury, ‘Partition and the Curse of Rehabilitation’, Kolkata, 1964

৩. যেমন অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা ভূপেন্দ্রনাথ চরিত্রটি। অন্যদের তিনি বুঝিয়েছিলেন, “তোমার কষ্ট হইবো জানি। বিদেশ বিভুঁইয়ে কি কইরা আহার সংগ্রহ করবা সেটাই বড়ো চিন্তা। তবে কি জান, গঙ্গার পাড়ে অনাহারে মরলেও শান্তি। তোমরা অন্তত এই শরীরটা গঙ্গার পাড়ে দাহ করতে পারবা।” অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’, দ্বিতীয় খণ্ড, কলকাতা, জুলাই ১৯৮৮, পৃ. ১৯৪

৪. Prafulla Kumar Chakraborty, ‘The Marginal Men’, Rahara, p. 23

৫. উদ্ধৃতি সূত্র- ঐ

৬. Letter of Resignation by Jogendranath Mondal, dated 09 October 1950, annexed to the Indian Commission of Jurists by the Committee of Enquiry on “Recruitment Exodus of Minorities from East Pakistan and Disturbances in India”, New Delhi 1965, Paragraph 6, p. 356

৭. ঐ, Paragraph 10, p. 356

৮. উদ্‌বাস্তু নেতৃত্বের নানাজনের বক্তৃতায় বা লেখায় বারবার এই ধারণার ইঙ্গিত পাওয়া যেত।

৯. Sabyasachi Basu Ray Chaudhuri, ‘Exiled to the Andamans: The Refugees from East Pakistan’, Pradeep Kumar Bose (ed.), Refugees in West Bengal, Kolkata 2000, p. 136

১০. Proceedings of the Lok Sabha Debates, 19 February 1953, Pp. 578-79

১১. উল্লেখসূত্র — অলক ঘোষ, ‘দণ্ডকারণ্য : বাংলা থেকে বিদায়’ ক্রোড়পত্র ‘হাজার বছরের বাংলা’, আনন্দবাজার পত্রিকা, জানুয়ারি ২০০০, কলকাতা, পৃ. ২৫

১২. সুধীররঞ্জন হালদার, অরণ্যের অন্ধকারে, কলকাতা ১৯৯৬, পৃ. ২৭

১৩. দণ্ডকারণ্য প্রগতির নতুন সভ্যতায় জেগে উঠেছে, সরকারি প্রচারটা ছিল এইরকমই। “Modernism came with a bang and clatter Into this vastness. Monstrous engines roared into the jungles, ripping up earth, splintering giant trees that had defied a thousand storms as if they were matchwood. The beasts of the forest fled helter-skelter and the sleepy inhabitants of The villages snuggling among the clearings rubbed their eyes in wonder.” U. Bhaskar Rao, ‘The Story of Rehabilitation’, New Delhi 1967, p. 202

১৪. দণ্ডকারণ্যের আসল ছবিটা ধরা পড়ে পুনর্বাসনের তথ্যনিষ্ঠ বর্ণনায়। দ্র. Alok Kumar Ghosh (ed.), ‘Dandakaranya: A Survey of Rehabilitation’, Writings of Saibal Kumar Gupta, Kolkata, 1999

১৬. আনন্দবাজার পত্রিকা, ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯

১৭. মরিচঝাঁপির হত্যাকাণ্ড আজ জানা ইতিহাস। দ্র: জগদীশচন্দ্র মন্ডল, ‘মরিচঝাঁপি — নৈঃশব্দ্যের অন্তরালে’, কলকাতা ২০০২; Deep Halder, ‘Blood Island: An Oral History of Marichjhapi Massacre’, New Delhi 2022; আরও দ্র. উদ্‌বাস্তু নেতা প্রশান্ত হালদার ও রঙ্গলাল গোলদারের সাক্ষাৎকার, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯; দি স্টেটসম্যান ১৭ মে ১৯৭৯

১৮. ১৯৫০-এ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘The Bengal Rehabilitation Organization’ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৫৪-র বার্ষিক প্রতিবেদনে রাধাকমল তার পর্যবেক্ষণটি রেখেছিলেন।

১৯. Satish Chandra Dasgupta, ‘Problems of Refugee Rehabilitation in West Bengal’, Kolkata 1964, Pp. 16-18

২০. Proceedings of the 4th Conference of the UCRC, 7-9 December, 1957; উদ্ধৃতিসূত্র — নিরঞ্জন হালদার (সম্পা.) ‘মরিচঝাঁপি’, কলকাতা, ১৩৮৬ বঙ্গাব্দ

২১. Letter of Samar Mukherjee to the Prime Minister of India, Ref. No. 24/61, dated 27 July 1961;  উদ্ধৃতিসূত্র — জগদীশ চন্দ্র মন্ডল, পূর্বোল্লিখিত পৃ. ৪১

২২. নিরঞ্জন হালদার সম্পাদিত বইয়ের ৪৬ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত, ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ তারিখে লেখা উদ্‌বাস্তু উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক রায়হরন বারইয়ের চিঠিতে একথা বলা আছে।

২৩. ওই

২৪. ওই

২৫. উদ্ধৃতিসূত্র — জগদীশ চন্দ্র মন্ডল, পূর্বোল্লিখিত পৃ. ১৪৯-৫০

২৬. শৈবাল কুমার গুপ্ত, ‘মরিচঝাঁপি কি মরিচিকা’, মরিচঝাঁপি বুলেটিন, মে ১৯৭৯

২৭. রাইহরণ বাড়ই-এর চিঠি, যুগান্তর পত্রিকা ৬ মার্চ ১৯৭৯

২৮. উদ্ধৃতিসূত্র — শৈবাল কুমার গুপ্ত, পূর্বোল্লিখিত, মরিচঝাঁপি বুলেটিন, মে ১৯৭৯

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান