মরিচঝাঁপির ঘটনা প্রসঙ্গে জ্যোতি বসুর বক্তব্য

[১৯৭৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বিধানসভায় ভাষণ।]

জ্যোতি বসু : গত বৎসরের প্রথম দিকে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও সংস্থা নানা ধরনের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ও ভুল কথা বুঝিয়ে দণ্ডকারণ্য ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে লক্ষাধিক উদ্‌বাস্তুকে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসেন। তাঁদের পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলি থেকে ঘর-বাড়ি, জমি-জমা পরিত্যাগ করে নিয়ে আসার আগে তাঁদের তথাকথিত নেতারা ও এই কাজে উৎসাহদাতা ব্যক্তি ও সংস্থাগুলি রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কোনও রকম আলাপ-আলোচনা করেনি। এ কথা সুবিদিত যে, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে নতুন করে কোনও উদ্‌বাস্তু পুনর্বাসন দেওয়া সম্ভব নয়। একথা জানা সত্ত্বেও সুষ্ঠু পুনর্বাসনের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এই লক্ষাধিক উদ্‌বাস্তুকে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসা হয় ও তাঁদের অশেষ দুঃখ-কষ্টের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার নানা অসুবিধা সত্ত্বেও যথাশীঘ্র সম্ভব তাঁদের জন্য সাময়িক আশ্রয় ও ত্রাণের ব্যবস্থা করেন। সেই সময় এই বাবদে সরকারকে চার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে ধৈর্যের সঙ্গে তাঁদের বোঝানো হয় যে, এইভাবে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসা তাঁদের নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী। দণ্ডকারণ্য ও অন্যান্য পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলিতে পুনর্বাসন ব্যবস্থা অপ্রতুল ও ত্রুটিপূর্ণ এবং তার জন্য সেখানকার উদ্‌বাস্তুদের মধ্যে ক্ষোভের কারণ আছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দৃঢ় অভিমত যে ঐ পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলির সুযোগ-সুবিধা উন্নত করার মধ্যেই উদ্‌বাস্তুদের সমস্যার প্রকৃত সমাধান করা সম্ভব। উদ্‌বাস্তুদের পক্ষে রাজ্য সরকার সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এই বিষয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। তাঁদের ভুল বুঝিয়ে পশ্চিমবাংলায় নিয়ে আসা হয়েছিল, তারা পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলিতে ফিরে গেলে পুনরায় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পাবেন, এই প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয়। একই সঙ্গে সেখানকার অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার যখন এই উদ্‌বাস্তুদের ফিরে যাওয়ার আবেদন জানান ও আনুষঙ্গিক সমস্ত ব্যবস্থার দায়িত্ব নেন, তখন তাঁরা এই আবেদনে সাড়া দেন। তাঁদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের সাহায্যে দণ্ডকারণ্য ও অন্যান্য কেন্দ্রে ফিরে যান, কিন্তু এদের একাংশ — যাঁরা সংখ্যায় কয়েক হাজারের বেশি নন, তাঁরা সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা করেন এবং যে কোনও পরিস্থিতিতে পশ্চিমবাংলায় থেকে যাওয়ার একতরফা সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। বস্তুত এঁরা উদ্‌বাস্তু উন্নয়নশীল সমিতি নামক একটা সংস্থা ও সরকার-বিরোধী কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনার শিকার হয়ে পড়েন। নানা ধরনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও বাগাড়ম্বরের জালে এদের জড়িয়ে ফেলে সুন্দরবন অঞ্চলের মরিচঝাঁপিতে এদের নিয়ে যাওয়া হয়। মরিচঝাঁপি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটা সংরক্ষিত বন এলাকা এবং সুন্দরবন সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। মরিচঝাঁপি অবস্থানকারী উদ্‌বাস্তুদের তথাকথিত নেতারা ক্রমশ তাঁদের বিভিন্ন বেআইনি কার্যকলাপে প্ররোচিত করেন। কিছু সুযোগসন্ধানী স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও সংস্থা এই পরিস্থিতির সুযোগ নেন ও তথাকথিত উদ্‌বাস্তু নেতাদের বেআইনি কার্যকলাপের সবরকম মদত দিতে থাকেন। মরিচঝাঁপিতে নির্বিচারে গাছ কাটা ও বন সম্পদ নষ্ট করা চলতে থাকে। কৃত্রিম উপায়ে বেআইনি মাছের ভেড়ি তৈরি করার চেষ্টা হয়। এই সব কাজে এই অঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তথাকথিত উদ্‌বাস্তু নেতারা আইনের পরোয়া না করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে টাকার বিনিময়ে সরকারের জমি বিলি করে দিতে থাকেন। সেই দলিল আমার কাছে আছে — জমি পেতে হলে সই করতে হবে ১০০ টাকা, ১৫০ টাকা দিয়ে। উদ্‌বাস্তু বা স্থায়ী অধিবাসী যাঁরা জমি পাবেন, সে বিষয়েও নানা ধরনের শর্ত তারা নিজেরাই আরোপ করে দেন। এর মধ্যে একটি শর্ত যে, উন্নয়নশীল সমিতির সদস্য হতে হবে — অন্য কোনও সংস্থা বা রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া চলবে না। অর্থাৎ তারা এক সমান্তরাল বরাবর চালাতে চাইছে। তাঁরা ভলেন্টিয়ার তৈরি করেছেন। তাঁদের পারমিট ছাড়া কেউ যেতে পারবে না। পুলিশ পারবে না, বাইরের কেউ যেতে পারবে না, এই হচ্ছে সেখানকার নিয়ম। প্রশাসন ব্যবস্থাকে এ অঞ্চলে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। তাদের অনুমতি ছাড়া কোনও লোককে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না, এমনকি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে সেখানে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। এই অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে কোনও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া সত্ত্বেও তথাকথিত উদ্‌বাস্তু নেতারা হিংসাত্মক ঘটনা ঘটানোর উস্কানি দিতে থাকেন ও বেআইনি অস্ত্র সংগ্রহ চলতে থাকে। বহু অসাধু ব্যবসায়ী নিজেদের স্বার্থে এখানে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন।

এক কথায় মরিচঝাঁপিতে আইনের শাসনকে উপেক্ষা করে এক স্বেচ্ছাচারী রাজত্ব চালানোর চেষ্টা হয়। কোনও সরকারের পক্ষেই এই অবস্থা সম্পর্কে উদাসীন থাকা সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এইসব বেআইনি কার্যকলাপের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মরিচঝাঁপিতে কয়েক মাস ধরে যে ঘটনাগুলি ঘটতে থাকে তা উদ্‌বাস্তুদের সমস্যা সমাধানের পথ নয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে বার বার উদ্‌বাস্তুদের শুভবুদ্ধি ও সুবিবেচনার কাছে আবেদন করে তাঁদের বেআইনি কার্যকলাপের পথ ছেড়ে আসতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী উদ্‌বাস্তুদের দুঃখকষ্ট নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধাবাদের খেলায় মেতে যান, তাঁরা উদ্‌বাস্তু সমস্যাগুলিকে সরকার-বিরোধী চক্রান্তের সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করতে সচেষ্ট হন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার দৃঢ়ভাবে এই কথা বলতে চান যে, যারা উদ্‌বাস্তুদের নিয়ে মরিচঝাঁপিতে বেআইনি কার্যকলাপ চালাচ্ছেন তাঁরা উদ্‌বাস্তুদের বন্ধু নন এবং উদ্‌বাস্তু সমস্যার সঠিক সমাধানে তাঁরা আগ্রহী নন।

বেআইনি কার্যকলাপ ও বিশৃঙ্খলা রোধ করবার জন্য এবং সরকারের সম্পত্তি ও মূল্যবান বন সম্পদ রক্ষার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার দুই সপ্তাহ আগে মরিচঝাঁপি অঞ্চলে কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার উদ্‌বাস্তুদের বিরুদ্ধে কোনও অর্থনৈতিক অবরোধ পরিচালনা করছেন না বা ঐ ধরনের অবরোধের কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি। বেআইনি কার্যকলাপ বন্ধের উদ্দেশ্যে ও প্ররোচনা সৃষ্টিকারীদের কাজে বাধা দেবার জন্য যে ব্যবস্থাগুলি নিতে হয়েছে তার পিছনে পশ্চিমবাংলার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন গণতান্ত্রিক মানুষের সমর্থন রয়েছে। সম্প্রতি মরিচঝাঁপির নিকটে কুমীরমারিতে রাজ্য সরকারের তিন মন্ত্রী যে বিরাট জনসভা করেছেন, তা এর প্রমাণ।

এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাগুলির বিরুদ্ধে উস্কানি দিতে থাকার ফলে পুলিশ ক্যাম্পের ওপর আক্রমণ ও পুলিশের গুলি চালানোর দুঃখজনক ঘটনাও ঘটে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। কিন্তু ইতিমধ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সরকারের পক্ষ থেকে যে দু’জনের মৃত্যু ঘটেছে তাঁরা অপরাধী হোন বা না হোন তাঁদের পরিবারবর্গকে কিছু টাকা দেব ঠিক করেছি এবং পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।

মরিচঝাঁপির প্রশ্নে বিভিন্ন মহল থেকে মানবিকতার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার উদ্‌বাস্তুদের মানবিক সমস্যাগুলি সম্পর্কে সচেতন ও সহানুভূতিশীল। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলিতে ফিরে যাওয়া সাপেক্ষে উদ্‌বাস্তুদের আশ্রয় ও ত্রাণের ব্যবস্থা রয়েছে। মরিচঝাঁপি থেকে ফিরে আসা উদ্‌বাস্তুরা তার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। যে সমস্ত স্বার্থান্বেষী মহল উদ্‌বাস্তুদের ভুল বুঝিয়ে এখানে নিয়ে এসে নানা বেআইনি কার্যকলাপে জড়িয়ে দিচ্ছে, তাঁরাই মানবিকতা বিরোধী কাজ করছেন, কারণ তাঁদের চক্রান্তের ফলেই মরিচঝাঁপির উদ্‌বাস্তুরা এক অসহনীয় দুর্দশার মধ্যে পড়েছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সমস্যার মোকাবিলা করবার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে পদক্ষেপগুলি নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সরকার তা সমর্থন করেছেন। দণ্ডকারণ্য আগত উদ্‌বাস্তুদের সমস্যার সমাধান সম্পর্কে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছেন যে, উদ্‌বাস্তুরা আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে নিজ নিজ পুনর্বাসন কেন্দ্রে ফিরে না গেলে সমস্ত সুযোগ হারাবেন। রাজ্য সরকার উদ্‌বাস্তুদের বেআইনি কার্যকলাপ থেকে নিবৃত্ত করতে চান, কিন্তু তাঁদের ওপর বলপ্রয়োগ করতে চান না। ধৈর্যের সঙ্গে সব কথা বুঝিয়ে তাঁদের ফেরত পাঠাতে হবে। কিন্তু কোনও কারণে যাঁদের ফিরে যেতে দেরি হবে তাঁদের সমস্ত কিছু সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে এবং তা দেবার জন্য আমি সম্প্রতিকালে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে লিখেছি। প্রায় এক লাখ কয়েক হাজার এখানে থেকে গেলেন। যখন অধিকাংশ উদ্‌বাস্তু ফিরে যেতে পেরেছেন, তখন যাঁরা রয়ে গেলেন তাঁদেরও ফিরে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করার কোনও যৌক্তিকতা নেই।

একমাত্র যুক্তি হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে যেহেতু আর কোনও সমস্যা বার করতে পারছেন না, এইরকম রাজনৈতিক নেতা তাঁরা এইরকম ব্যবহার করবেন। আর আমরা ওখান থেকে যে সমস্ত কাগজপত্র জোগাড় করেছি, তাতে দেখছি ওখানে জমি বিলি হচ্ছে। এরকম আমি কখনও শুনিনি, হাজার, লাখ বাস্তুহারা এখানে আগেও এসেছে, তাদের জন্য একটা আলাদা সংস্থা তৈরি করা হয়েছে এবং তাদের নেতারা ১০০ টাকা, ১৫০ টাকা, ৩০০ টাকা করে নিয়ে জমি বিলি করছেন, ১৫ বিঘা, ২৫ বিঘা, ৩০ বিঘা করে জমি। শুধু দণ্ডকারণ্যে নয়, ভূমিহীনদের একটা সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাদের জমি দেবেন।

এই ভূমিহীনদের সংজ্ঞা তাঁরা দিয়েছেন। কিন্তু কাদের তাঁরা ভূমিহীন বলছেন? এদের মধ্যে পশ্চিমবাংলার লোক আছে, ৩০ জন আগে এসেছেন এমন লোক আছে, পূর্ববাংলা এবং দণ্ডকারণ্য থেকে এসেছেন এমন লোক আছে অর্থাৎ সেখানে নানারকম শর্তাবলি আছে। কারা জমি বিতরণ করছে? এটা নাকি সমর্থন করতে হবে। ঐ দিকে বাংলাদেশ মাঝখানে আর একটা সরকার, এদিকে পশ্চিমবাংলায় আর একটা সরকার। এটা করা যায় না— কেউ একমত হবেন না— অবশ্য কিছু ঐ কংগ্রেস নেতা ছাড়া। সুখের বিষয় তাদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে প্রায় ১ লক্ষের মতোকে আমরা ফেরত পাঠিয়েছি। আমরা এইসব বিষয় নিয়ে কেন্দ্রের জনতা সরকারের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের সঙ্গে কাকে ক’টা বলদ দেওয়া হবে, কাকে কতটা জমি দেওয়া হবে, জল দেওয়া হবে কিনা ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং তাঁরা সব মেনেও নিয়েছেন। তারপর কি হচ্ছে না হচ্ছে তা সেটা আপনারা আমরা সবাই মিলে দেখব। এখানে আলাদা জনতা পার্টি কিনা তাই আপনারা আলাদা ব্যবস্থা করছেন। তাঁরা যা দিয়েছেন দেখছি তাতে আছে, উক্ত পরিবারগণ যারা জমি পাবে তাঁরা সমিতি ব্যতিরেকে অন্য কোনও রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক দল কেউ করতে পারবেন না এবং পূর্ব হতে জড়িত থাকলে স্বেচ্ছায় তা পরিত্যাগ করতে হবে। এটা কোন্‌রকম জিনিস আমি বুঝতে পাচ্ছি না। উক্ত উন্নয়ন সমিতি বলছেন আবার যে ভলেন্টিয়ারদের অনুমতি ছাড়া এখানে কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। এইসব দলিল আমার কাছে আছে। তাঁরা সেখানে পারমিট দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন কোনও অফিসারকে সেখানে নামতে দেবেন না। আমাদের জমি যা বনাঞ্চল আছে তা তারাই বিলি করবেন সরকার সেখানে বিলি করতে পারবেন না এবং এই বিলি করার বিনিময়ে তাঁরা টাকা নেবেন এই কথা বলেছেন। দণ্ডকারণ্য থেকে যাঁরা এসেছেন তাঁদের কথা বলছেন না, ফুটপাথেও যাঁরা আছেন তাঁদের কথাও বলছেন। অত্যন্ত দরদ মানুষের প্রতি। তাদের এইভাবে মিথ্যা বোঝানো হচ্ছে। এই উন্নয়ন সমিতির যাঁরা নেতা আছেন তাঁরা এইসব করছেন। আমাদের এখানের কিছু নেতা তাদের এই পশ্চিমবাংলার মাটিতে ফেলে দিয়েছেন এইভাবে। তারা যে এলেন সে বিষয়ে আমাদের সঙ্গে বা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কোনও আলোচনা করলেন না। ৩০ বছর ধরে কংগ্রেস সরকার কিছু করেননি। একটা নতুন সরকার এসেছে তাদেরও তো একটু সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু আমরা সেখানে কি দেখছি না বলা হচ্ছে কিছুই হল না — মানবিক অধিকার মেনে নিন। কিন্তু কি করা হচ্ছে? সেখানে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা আছে, চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, গোরু বলদ তাদের দেওয়া হবে— যা বিক্রি করে ফেলেছে তথাপি তার ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু তাঁরা বলছেন জঙ্গলের মধ্যে থাকবেন, সেই জঙ্গল তাঁরা ব্যবহার করবেন। সেখানে তাঁরা পুলিশ পাঠাতে দেবেন না— বন রক্ষা করতে দেবেন না। সংরক্ষিত এলাকায় পুলিশ বা অফিসার পাঠাতে দেবেন না। আবার বলা হচ্ছে যে সংবিধানে বলা আছে যে, যে যেখানে খুশি থাকবেন— যাবেন। না এইসব বাজে কথা সংবিধানে লেখা নেই। আমরা এইসব কথা শুনছি, কাগজে দেখছি ও বক্তৃতা হচ্ছে এইসব কথা বলে যে ফুটপাথে তো কত লোক আছে কই তাদের তো পাঠাচ্ছেন না। কি চমৎকার যুক্তি! ওঁরা ওখানে থাকতে পারবেন না। আমি বলি এখান থেকে একটা ব্যবস্থা করে সকলে মিলে এক হয়ে একটা ব্যবস্থা যদি করি তাহলে গোলমাল হবে না। আমি এ বিষয়ে দু-তিনটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলেছি— তাঁদের নেতাদের সঙ্গে। ফজলুর রহমান সাহেব এসেছিলেন — তিনি কাশীকান্ত মৈত্র-র জন্য অপেক্ষা করেছিলেন — তাঁর বোধ হয় কাজ ছিল আসতে পারেননি। কংগ্রেস পক্ষ থেকেও এসেছিলেন বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমি বুঝতে পারি না যে এ জিনিস হবে, এই জিনিস তাঁরা করবেন। যাঁরা ওখানে আছেন তাদের জন্য অপর দিকে নতুন ক্যাম্প হচ্ছে— ওঁরা যে বলেছেন খাদ্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তা ঠিক নয়। খাদ্য তো পাশেই আছে— তারা সেখানে এলেই পাবেন। কিন্তু আমি তাদের সেখানে ফার্নিচারের দোকান করতে দেব না। আমি মেছো ভেড়িওয়ালাদের টাকা ঢালতে দেব না। তাই আমি আবেদন করছি যে বাস্তুহারাদের সর্বনাশ করবেন না। যে ১০/১২ হাজার লোক সেখানে আছে তাদের সবাইকে যাতে আমরা পৌঁছে দিতে পারি তার ব্যবস্থা করবার জন্যই কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কথা বলছি— ব্যবস্থা করছি। আমরা সকলে মিলে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বসে একটা কিছু ব্যবস্থা করা — যেটা আমরা করছি।

[এই বিবৃতির পর বিতর্ক শেষে মুখ্যমন্ত্রী বসু যে জবাবি ভাষণ দেন তা এখানে সংরক্ষিত হয়েছে।]

জ্যোতি বসু : মাননীয় স্পিকার মহাশয়, জবাব যেটুকু দেওয়ার আছে আমি যা বুঝতে পারছি এইসব আলোচনা থেকে তাতে কয়েকটি কথা আমি সংক্ষেপে বলতে চাই। প্রথমত, কতকগুলি অসত্য কথা বলা হয়েছে, সেগুলি আমি বলে দিচ্ছি। ভারত সেবাশ্রম এইরকম কোনও সংস্থার কাজে আমরা বাধা দিইনি। কেন বাধা দেব? কারণ, আমরা ৪ কোটি টাকার উপর খরচ করেছি বাস্তুহারাদের জন্য যারা দণ্ডকারণ্য থেকে এসেছিলেন এই হল ১নং। ২নং কথা হচ্ছে কাশীকান্ত মৈত্র বললেন যে ওঁকে ডাকা হয়নি। আমি এই বিষয়ে ঠিক এখনই খোঁজ করতে পারিনি যে কার মাধ্যমে ওঁকে টেলিফোন করা হয়েছিল। আমার একটু তাড়া ছিল বলে আমি টেলিফোনে দুই কংগ্রেস, জনতা এবং সি পি আই’কে আলোচনা করতে ডেকেছিলাম। তাঁরা এসেছিলেন, আর জনতা প্রেসিডেন্ট ফজলুর রহমান তিনিও এসেছিলেন। তিনি খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন যদি কাশীবাবু আসেন। আমি বললাম খবর পাননি, না কি হয়েছে বুঝতে পারছি না। এখন বুঝলাম কি হয়েছিল। যাই হোক, ওঁর সঙ্গে আলোচনা হল, উনি একমত হয়ে বললেন ওদের পাঠিয়ে দেওয়া উচিত, তবে বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিলে ভালো হয়। আমি তখন বললাম আপনি দিল্লিতে যান, আমাদের হয়ে একটু সময় নিয়ে আসুন। তিনি দিল্লিতে গিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়েছে বলে আমি কাগজে দেখেছি, কিন্তু কি হয়েছে আমি জানি না। তৃতীয় কথা হচ্ছে, দিলীপ চক্রবর্তী নাকি বলেছেন ৭৭৭ জন ওখানে মরেছে। ৭৭ জন, কি ১০৭ জন, কি ১৮০ জন কেন হল না আমি জানি না, তবে আমরা বলেছি ২ জন ওখানে মারা গেছে। দিলীপবাবু আমার ঘরে এসেছিলেন, আমি বললাম, আপনি যে বললেন ৭৭ জন মরেছে, এটা কি আপনার কথা? তাদের নাম কি, তারা কোন্ এলাকার লোক, স্থানীয়, না কি অন্য কোথাও থেকে এসেছে, এগুলি আমাদের জানান। তিনি বললেন, আমাকে একজন পুলিশ অফিসার বলেছেন, আমি সেই পুলিশ অফিসারকে বলেছি মুখ্যমন্ত্রীকে নামগুলি বলতে হবে, তবে নিশ্চয়ই এজন্য আপনার চাকরি যাবে না। আমি টেলিফোনে আবার রাত্রে ওঁকে ধরব। তিনি বলে গেলেন আমার ঘর থেকে। আমি বললাম নামগুলো আমাকে বলে যান, তিনি বললেন পরে বলব। তিনি নিজে কিছু জানেন না, এইরকম খবর পেয়েছেন। তার পরের কথা হচ্ছে আমি নাকি সতীশ মণ্ডলকে বলেছিলাম ভিলাইতে কোন্ সালে যে আমাদের সরকার যখন হবে তখন আমি আপনাদের সব নিয়ে যাব। এইসব দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা কাশীবাবু বললেন। আমি যখন একবার মার্চ মাসে স্টিল কনফারেন্সে গিয়েছিলাম তখন আমার সঙ্গে কয়েকজন এসে দেখা করেন, তখন আমি বলেছিলাম আমাদের সমর মুখার্জি এম পি, তিনি আপনাদের সব কথা জানেন, আপনাদের উপর অন্যায় ব্যবহার করা হচ্ছে, দিল্লিতে এই নিয়ে ব্যবস্থা করার জন্য যাতে চাপ সৃষ্টি করতে পারি তার ব্যবস্থা করা হবে। সমরবাবু ২/৩ বার পার্লামেন্টে সেইসব কথা তুলেছেন। তিনি আজকে দণ্ডকারণ্যে গিয়েছেন আর একবার দেখবার জন্য, কাজেই এইরকম কথা কোনওদিন কাউকে আমি বলতে পারি না। এখন আমি যেটা বলতে চাই সেটা হচ্ছে আসল বক্তব্যের কোনও পরিষ্কার জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমরা এক হয়ে বলছি এঁরা যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের সব চলে যেতে হবে দণ্ডকারণ্যে। সেখানে তাদের জন্য ব্যবস্থা হয়েছে, আরও ব্যবস্থা তাদের জন্য দ্বিতীয়বার হবে। কিন্তু এখানকার জনতা পার্টি তাঁরা আলাদা ধরনের, তাঁরা পরিষ্কার কিছু বলছেন না, উলটে চ্যালেঞ্জ করছেন আমরা মরিচঝাঁপিতে যাব, আমরা উদ্‌বিগ্ন। কেন চ্যালেঞ্জ করছেন? আপনাদের সঙ্গে কি ঝগড়া আছে? তাহলে আপনারা পরিষ্কার করে বলুন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে, সেকেন্দার ভকতের বিরুদ্ধে, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে যে এরা যাবে না, এরা কাঠ কাটবে, জমি বিলি করবে, নানা অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, সরকারি জঙ্গল কেটে সাফ করে দেবে। এটা যদি সাহস থাকে তো বলুন। সে সাহস নেই। সেজন্য আমি বলতে চাই আসল কথা পরিষ্কার করে বলুন। মানবিকতাবোধের প্রশ্ন উঠেছে— মানবিকতাবোধ আছে বলে আমরা অপেক্ষা করি তা না হলে আমরা তাদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে দিতে পারতাম। তার মধ্যে আমরা যাব কেন? তারা শত শত মণ কাঠ কেটেছে। আমরা ঠিক করেছি সেগুলি সরকারের আওতায় এনে ডিসপোজ অফ করব। নৌকা বানিয়েছে সরকারি কাঠ নিয়ে বলছেন আত্মনির্ভরশীল। সরকারি জমি বিলি করবে, বলবেন, আত্মনির্ভরশীল। আমাদের পুলিশকে নামতে দেবে না, প্রশাসনকে কাজ করতে দেবে না, হরিপদ ভারতী মহাশয় বলছেন উনি কিছু জানেন না। উনি গিয়েছেন ওখানে ওদের উস্‌কাবার জন্য। আমাদের তো আর কেউ সমর্থন করে না, তোমাদের নিয়ে যদি বাঁচতে পারি এই কথা ভাবছেন। তারপর এখানে জনতার কয়েকজন নেতা আছেন, তাঁরা প্রাদেশিকতার বিষ ছড়াচ্ছেন যে মাড়োয়ার থেকে এসেছে, ওখান থেকে এসেছে, অমুক জায়গা থেকে এসেছে। আপনাদের সরকার তো দিল্লিতে আছে, বলুন না তাঁদের গিয়ে। খুব ভালোবাসেন ভারতবর্ষকে সবাই। কে মাড়োয়ার থেকে এসেছে, কে বিহার থেকে এসেছে, এইসব কথার সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই।

এঁরা বলছিলেন সরকারি সাহায্য তো এঁরা চাননি — কার জঙ্গল কাটছেন ওরা — সরকারি সাহায্য ওরা চাননি। কার জমি বিলি করছেন ওরা — সরকারি সাহায্য চাননি। আমরা যদি ইন্টারভেন করতাম — যে কোনও সরকারের করা দরকার — আমি বলছি, আমি স্বীকার করছি আমি অপারগ। কারও ছেলে, কারও মেয়ে গিয়েছে। আমরা এক লাখ লোক তো পাঠিয়ে দিয়েছি এখানকার জনতা পার্টি তা বন্ধ করতে পারেননি। সেইজন্য আমরা চেষ্টা করছি। আর আমি এখানে বলছি এটাও দুঃখজনক যে বর্ধমানেও মারা গিয়েছিল। আমি বলছি যারা ওদের এইভাবে সাহায্য করার কথা, বারবার করে যারা বলছেন তারাই এর জন্য রেসপন্সিবল, তারাই এর জন্য দায়ী এবং তাদের এই দায়িত্ব নিতে হবে। পুলিশকে মেরে ফেলল, কোন্ সাহসে তারা এইসব করতে পারে? এইরকম কিছু মানুষ যারা এখানে আজ বক্তৃতা দিচ্ছেন তারা তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। এইভাবে সব ইনোসেন্ট লোকগুলিকে নিয়ে রাজনীতির খেলা হচ্ছে— এই জিনিস আমরা এখানে দেখছি, বর্ধমানেও দেখেছি আর মরিচঝাঁপিতেও সেই একই জিনিস দেখছি, আমরা যদি একমত হতে পারতাম এখানে নিশ্চয়ই আমরা যেতাম আপনাদের সঙ্গে, একই কথা যদি আমরা বলতে পারতাম যে আপনারা ৬ মাস সময় নিন ওদের যদি বুঝিয়ে আমরা বলতাম — কিন্তু আপনাদের যেতে হবে, এই কথাটুকু তো আপনারা বলতে পারেন। আর অন্যায় কাজ চলবে না এই কথাটা আমরা বলতে পারি কিনা কিন্তু এখানে সেসব কথা কিছু শুনলাম না পরিষ্কারভাবে তাদের মুখে। এইজন্যই আমার মনে হয় এর ভিতর কিছু ষড়যন্ত্র আছে। তারা মনে করছেন সব ভিত্তি শিথিল হয়ে যাচ্ছে তখন এটা ধরে যদি কিছু করা যায়। আমি বলছি এইসব সুবিধা হয় না, এইসব রাজনীতি কেন করছেন — কত বিষয় তো আছে রাজনীতি করার। সেইজন্যই আমি বলছি এটা ঠিক পুলিশ তাদের তির খেয়ে হাসপাতালে আছে। আচ্ছা থাক দুই পক্ষেরই বিচার হবে কে কি করেছে। কে আগে মেরেছে, কে পরে মেরেছে — কেন মারতে হল সেইসব তদন্ত করা হচ্ছে। একবার আমরা তদন্ত করেছি, দরকার হলে দুইবার করব, আমরা তদন্ত করে দেখব। ইতিমধ্যে ক্ষতিপূরণ আমাদের দিতেই হবে, মানুষ মরে গেলে। হরিপদবাবু এখানে তিনি যেভাবে বক্তৃতা করছেন সেটা খুব খারাপ লেগেছে। তিনি ভাবলেন এক লাখ আমাদের পক্ষে থাকবে কিন্তু তারা দণ্ডকারণ্যে চলে গেল। চমৎকার, সেখানে তিনি বললেন জোরজুলুম করে পাঠিয়েছেন — এই হচ্ছে ওঁনার রাজনীতি। আমি বলি, উনি তো রাজনীতি ছেড়েই দিয়েছিলেন, আবার কেন রাজনীতির মধ্যে এলেন। যাই হোক, আমি যেটা বলতে চাইছি যে, প্রধানমন্ত্রী আমাদের কি বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছিলেন, প্রথম দিকে যখন এরা দলে দলে আসছেন তখন আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম। আমি বললাম, মধ্যপ্রদেশ সরকার তো আপনাদের সরকার, ওড়িশার সরকার তো আপনার সরকার— আর বেশিরভাগ এল ওড়িশা থেকে, যেখানে সব থেকে সুবিধা ওদের পুনর্বাসনের সেখান থেকেই ওরা এল। তা উনি বললেন, উই সেন্ট দেম বাট ইফ ইউ ওয়ান্ট মাই হেল্প আই উইল হেল্প ইউ। আমি বললাম, হোয়াট হেল্প ক্যান ইউ গিভ মি। উনি বললেন, আই শ্যাল সেন্ড দেম ব্যাক। আপনি কোনও রিলিফ ক্যাম্প খুলবেন না।

প্রধানমন্ত্রী আমাকে বললেন কোনও রিলিফ ক্যাম্প খুলবেন না। উনি তো গান্ধিবাদী জানি। আমি তাঁকে তখন বললাম, ১ লক্ষ লোক ছেলে-মেয়েদের নিয়ে চলে এসেছে আমি কি তাদের অন্যভাবে পাঠাতে পারি? আমি তো পারি না। তাদের জন্য টাকা খরচ করে পাঠাতে হবে এবং পরে বিচার হবে এই টাকা কে দেবে। তাদের জন্য ১ লক্ষ টাকা খরচ হয়ে গেল। কই, প্রধানমন্ত্রীকে তো কিছু আপনারা বললেন না, সেই সাহস আপনাদের নেই, বললে দরজা থেকে বার করে দেবে। আমি বলেছি বাস্তুহারাদের অসুবিধা হচ্ছে। আমাদের চেয়ে বড়ো বন্ধু এই বাস্তুহারাদের আর কে আছে? গত ৩০ বছরে দেখেছি আমাদের চেয়ে বড়ো বন্ধু তাদের আর কেউ নেই। আমি দেখেছি ওখানে উন্নয়ন সমিতি বলে একটা সমিতি আছে এবং তার সঙ্গে রয়েছে জনতা দলের একটা অংশ এবং কংগ্রেস। কংগ্রেসের অবশ্য কোনও নীতির বালাই নেই। ১৯৭৪ সালে যখন তাদের তাড়ানো হল তখন তো কোনও অনশন দেখিনি। তখন পি সি সেন তো এখানেই ছিলেন, না কি বিলেত গিয়েছিলেন? তারপর, ১৯৭৫ সালে যখন তাদের আবার তাড়ানো হল তখনও তো আপনারা কিছু বলেননি। আমরা বলেছি ওখানে যারা রয়েছে তাদের আমরা বেআইনি কাজ করতে দেব না। আমরা বলেছি আপনারা চলে আসুন, আমরা আপনাদের খাদ্য দেব, ক্যাম্প তৈরি হয়েছে, ওষুধের ব্যবস্থা হয়েছে, ডাক্তার পাঠাচ্ছি। আমরা আরও বলেছি যে অন্তর্বর্তীকালীন সময়টা আপনারা এখানে থাকুন আমি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে সময় চেয়ে নিচ্ছি। অনেকে আসতে চায় কিন্তু তাদের আসতে দিচ্ছে না। তারা তির, ধনুক তৈরি করছে, নানারকম অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করছে, পুলিশকে নামতে দিচ্ছে না। তারা কি এগুলি করতে পারেন? তারা বলছে অমুক জায়গায় বাস্তুহারা বসেছে, তমুক জায়গায় বাস্তুহারা বসেছে। তারা যখন জবরদখল কলোনি করেছিল তখন তাদের পেছনে কে ছিল? তখন আমরা ছাড়া তাদের পেছনে আর কেউ ছিল না। তারা তখন দলে দলে পূর্ববাংলা থেকে এখানে এসেছিল। তখন তাদের পেছনে কারা ছিল? তারা যখন জোর করে জায়গা দখল করেছিল তখন তাদের পেছনে আমরা ছিলাম। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব বেশি রয়েছে এবং আমাদের সৌভাগ্য তাঁরা রাজি হয়েছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলেছি এবং তিনি সময় দিতে রাজি হয়েছেন। আমাদের বিরুদ্ধে তো রাজনীতি করবার অনেক কিছু রয়েছে, না কি আমরা এতবড়ো হয়ে গেছি যে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না। হরিপদবাবু বলেছেন, বাজেট আসুক তখন বলব। আমি একটা জিনিস সার্কুলেট করব কেননা কোন্ ইংরেজির অর্থ কী হবে তা নিয়ে আবার হয়ত ডিকশনারি দেখতে হবে।

No. 30 CM dated 24th January, 1979

My Dear Prime Minister,

       As you are aware, in February and March, 1978, about 1 lakh 20 thousand refugees from former East Pakistan and now in rehabilitation and work site camps in Dandakaranya and other areas, deserted these camps and came to West Bengal. After good deal of efforts we repatriated all but about eight thousands of them who had taken shelter in Marichjhanpi Reserve Forest area in Sunderbans. These deserters have felled forest trees extensively, have started fisheries and are distributing lands. They have created a sort of free zone for themselves in Marichjhanpi and have expressed their determination to resist by force any attempt to repatriate them.

         Recently, it has come to our notice that new deserters are trickling to Marichijhanpi by circuitous routes to evade police vigilanceIt has also been reported that some of the leaders of these refugees are trying to allure the families who had gone back to Dandakaranya by offering of land in the reserve forest area. Shri Satish Mondal, one of their leaders, has reportedly disclosed in a meeting recently that about 5,000 P.L. refugee family of Mana Camp (Madhya Pradesh) will be coming over to Marichjhanpi. The Madhya Pradesh Police has been requested to keep watch over these P.L. refugees and to inform us of the developments from time to time.

       We have now decided to take action for containing the situation at Marichjhanpi and to make every effort to repatriate the deserters. However, a number of organisations like Unnayan (OXFAM), Nikhil Banga Nagarik Sangha, etc., are actively helping and instigating the deserters. We also have reports that some leaders of Janata Party, such as, Shri Sakti Sarkar, M.P., Shri Haripada Bharati, M.L.A., and Shri Kashi Kanta Maitra, M.L.A., are encouraging these deserters and collecting outside help for them. I should be grateful for your assistance at the political level to tackle this serious problem devel- oping in the Sunderbans.

With kind regards,                             

Yours sincerely

এটা আমি ২৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছি, গুলি তো তার পরে হয়েছে। আপনি লিখুন অ্যানসার পাবেন।

No. 392 P.M.O/79 dated 30th January, 1979, New Delhi.

My Dear Jyoti Basu,

Please refer to your letter No. 30 C.M. of the 24th January, 1979 regarding infiltration of refugees from Marichjhanpi and other camps. I agree with you in regard to the action that you have taken or prepared to take. None of the organisations nor any M.P. or M.L.Ahas approached me and if they do I shall give them appropriate answer.

With kind regards,                                              

Yours sincerely

Morarji Desai

এবং আমি এখানে আর একটি চিঠি পড়ে দিচ্ছি একই সময়ের, ইনিও আপনাদের একজন মন্ত্রী।

My Dear Basuji,

Thank you for your letter No. 13 C.M. dated 19th January, 1979 regarding the deserters returnee families.

2. Your observations about the complaints of D.Pfamilies con-cerning the nature of work being provided to them are being brought to the notice of the Chairman and Chief Administrator of DNK Project for suitable action.

আমি লিখেছিলাম যে শুধু এদের দিয়ে কৃষিকাজ করাবেন কেন? এদের যে সেকেন্ড জেনারেশন, যারা এখানে জন্মেছে, তারা যদি অন্য কাজ করতে চায় সেটা দেওয়া উচিত। তাতে উনি বলেছেন যে, সেটা উনি বিবেচনা করে দেখবেন।

I note that you have reiterated the firm resolve of the State Govern- ment to return the remaining deserters families to their respective rehabilitation sites and Karmisibir soon. However, it is getting to be one year since these families deserted DNK and other rehabilitation sites. Next Khariff season is fast approachingIt is felt that these families should return at least 3 months in advance if they are to be in a posi- tion to take up Khariff cultivation by June, 1979. However, of keeping watch over the vacant land and homestead plots to which the deserters families have not yet returned. 

মানবতা মানে কী? বাড়ি-ঘর পড়ে আছে সেখানে যাওয়া, না, ওদের মানবতায় বলে গোলমাল বাধাও, জঙ্গল কাটো, আর যা খুশি কর।

If these lands are not allotted to others before June, 1979 that land will also go uncultivated leading to avoidable loss of production or alternatively will be encroached upon leading to other difficulties. Any temporary allotment of land to others as you would appreciate has its own problems. 

এগুলি ফেলে না রেখে যদি অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে তো ভয়ংকর গোলমাল হবে। 

3. Taking all these factors into consideration we feel it will be appropriate to fix a cut off date for return of the deserters families to DNK. I thought that 31st March, 1979 may be fixed as the cut off date for the return of the remaining deserters families having returned to this point those to fail to return by that date will stand finally debarred from getting back their lands and houses and from getting renewed relief and rehabilitation assis- tance sanctioned for the returnees. Return by 31st March, 1979 will help the settler families and such karmisibirs families as are on the basis of their priority entitled to settlement during the next season, to undertake Khariff cultivation in time by June, 1979.

I hope you would appreciate the very relevant consideration set out in para 3 and agree with this approach. On hearing from you we shall take decision and have it announced and you may like to publicise this in the areas in which the deserters are now staying in West Bengal.

I shall appreciate a line in reply.

আমি একটার উত্তরে লিখি, সময় নেই সব বলবার, আমি বলেছি এই যে অবস্থা সেখানে আর একটু সময় দিলে ভালো হয়। আমরা খবরও পাঠিয়েছি দেখি কি করতে পারি। এই হচ্ছে আমার বক্তব্য। সেই জন্য আমি মনে করি এইসব বড়ো বড়ো চ্যালেঞ্জ আমাকে করে লাভ নেই। তিনি চ্যালেঞ্জ করছেন? আমরা ৪ কোটি টাকা খরচ করেছি আর কিছু টাকা খরচ করতে পারতাম না ওদের খাওয়াতে? আমরা বলছি যে আমরা আর ওদের এখানে থাকতে দিতে পারি না। কেন? সেটা আমরা আলোচনা করেছি। এক লক্ষ লোক যদি চলে গিয়ে থাকে তাহলে আর কয়েক হাজার লোক যা অবশিষ্ট আছে তারাও যাবে। এখানে দুর্ভাগ্যবশত ওদের যারা নেতা তারা কিন্তু ঐ এক লক্ষ লোকের মধ্যে যায়নি যারা তাদের ডেকে নিয়ে এসেছিল। তারা কাছাকাছিই আছে এবং তাদের পরিবার নিয়ে ভালোভাবেই আছে। তারা যাতে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে সেইজন্য এইরকম আট-দশ হাজার লোক ওদের দরকার।

আমাদের পশ্চিমবাংলার মানুষ তারা কি অপরাধ করবে? একজন বললেন অন্য জায়গায় বনজঙ্গল কাটছে। কাটতে দেবেন না, কোন অধিকারে কাটবে? সরকার যদি মনে করে কাটবেন, কাটা উচিত নয়। এর সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে হবে। আমি এসব কথার মধ্যে যাচ্ছি না। সেজন্য বলছি এক লক্ষ লোক যখন চলে গেল তখন আর আট-দশ হাজার লোক নিয়ে জল ঘোলা করবেন না। তাহলে এমন অবস্থায় যাবে যে ভারত সরকার বলবেন আমরা কিছু করতে পারব না, তোমরা তো পাঠাওনি, এদেরও এখানে অসুবিধা হবে অসুবিধায় পড়তে হবে, আমাদের পক্ষেও অসুবিধা, পশ্চিমবাংলার মানুষের পক্ষেও অসুবিধা, অনেক জটিলতা আছে। আসুন সবাই মিলে কী করা যায় দেখি এবং একমত হয়ে যদি কাজ করি তো পনেরো দিনের বেশি সময় লাগবে না, সময় নিয়ে বাইরে দেখাশুনা করে এদের পাঠিয়ে দেব। আমি জানি না এদের শুভবুদ্ধি হবে কিনা নাকি চ্যালেঞ্জের মনোভাব থাকবে। এই বলে আমি বক্তব্য শেষ করছি।

[মধ্যপ্রদেশের দণ্ডকারণ্য থেকে উদ্‌বাস্তুরা মরিচঝাঁপিতে চলে আসার ফলে যে অশান্ত অবস্থার সৃষ্টি হয় সে সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী বসু ১৯৭৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বিধানসভায় একটি বিবৃতি পেশ করেন। সেই বিবৃতি এবং বিবৃতির উপর বিতর্ক শেষে বসু-র জবাবি ভাষণ শিরোনামসহ সংকলিত হয়েছে। ভাষণের পূর্ণ বয়ান সংগ্রহ করা হয়েছে বিধানসভার কার্যবিবরণী থেকে। কৃতজ্ঞতা : ‘ন্যাশনাল বুক এজেন্সি’]

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান