সুশান্ত পাল
Don’t kill my daughter in front of my eyes.
Alright, alright, peel off her clothes and shoo her aside.
দেশভাগ হবে; লক্ষ্যে সংগঠিত হল উনিশশো ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ বিস্তৃত দাঙ্গা। শিকার? সরকারি হিসেবে মৃত্যু দশ লক্ষ। পঞ্চাশ লক্ষ হিন্দু শিখ আপন বাসভূমি ছেড়ে আশ্রয়ের সন্ধানে পাড়ি দিল অজানা গন্তব্যে। সত্তর লক্ষ মুসলমান জনতা শেকড়চ্যুত হয়ে পৌঁছে গেল কাঁটাতারের অপর পারে। এপারে-ওপারে ইন্ডিয়া পাকিস্তানে উদ্বাস্তু মানুষের স্রোত। উন্মূলন অস্তিত্বে বুকে বিষাদ, যন্ত্রণা; শিউরে-ওঠা বিকৃতি বিকারের দগদগে তাজা চিহ্ন। লক্ষাধিক ধর্ষিতা নারীর সমগ্র সত্তা জুড়ে, দেহ-মনে উদগ্র নৃশংসতার গভীর ক্ষত। নির্মমতার স্মৃতি হানা দেবে যাদের আমৃত্যু।
দেশভাগ দাঙ্গা তো শুধু বসতবাটীচ্যুত করে না, কাড়ে না প্রাণ; নিশ্চিত করে অপমৃত্যু, আত্মার দৈন্য। নিঃসঙ্গতা অপরিণাম। অসহ শূন্যতা রোধ করে বিস্মৃতির যাবতীয় সম্ভাবনা। যা কর্কশ সত্য, নোংরা। বেঁচে থাকার অভিশাপে ক্ষেত্রান্তরে মৃত্যু বোধকরি কাঙ্ক্ষিত। মৃত যে কালচেতনাহীন; মৃতের কোনও মন নাই। দেহ নাই। আশ্রয় আকুলতা নেই। ঘিনঘিনে আবিলতাও।
ক্ষমতা নিরঙ্কুশের যেমন দেশভাগ, পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গপাঠের তেমনই এক সন্দেহাতীত অধিক্ষেত্র দাঙ্গা। যে সমাজে আবহমান পুরুষলিঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব; তপ্ত পুরুষকে যৌনসম্ভোগে তৃপ্ত করা নারীজীবনের সার্থকতা; লজ্জাহীন ভয়হীন শিশ্ন শৌর্যে সাহসে প্রত্যয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ — যৌনতায় নারীর সম্মতির পরোয়া করে না; যৌনসক্ষমতা সম্মানিত পেশিবহুল বীর্যবত্তায়— ‘মেয়েলিপনা’ ধিক্কৃত; লিঙ্গ-রাজনীতির ক্ষমতা আস্ফালনে সে-সমাজে জনচেতনায় প্রধান হয়ে ওঠে লিঙ্গ ফ্যান্টাসি। ‘Sex was a means of access both the life of the body and the life of the species.’ দাঙ্গা তো সর্বার্থেই এক যুদ্ধজয়ের আহ্বান। পুরুষাঙ্গ এখানে সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র। তার ক্ষমতা প্রদর্শন করো, নিয়ন্ত্রণ করো, অধীনস্থ করো অপর-কে। হিংস্রতা ও যৌনতার সীমারেখা মুছে যায় অতঃপর। ধর্ষক প্রকাশ্য দণ্ডায়মান! নতজানু সময় অস্ফুটে বলে ওঠে — জো হুকুম মেরে আকা…! শয়তান শিরোধার্য! দেশভাগের দামামা বেজে উঠেছে; বলকায় ম্যাসকিউলিনিটি!
All wars are fought on women’s bodies
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নিরঙ্কুশ আধিপত্যের মূল লক্ষ্যে সংগঠিত ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশের দাঙ্গার একমাত্র কার্যক্রম প্রতিপক্ষের সমূল বিনাশ, উৎখাত। ঘরবাড়ি, আসবাব, সম্পদ, মানুষজন জ্বালিয়ে ছারখার করো, লুট করো, নিধন করো। বিশেষত বিধর্মী নারীর দেহে প্রোথিত করো পুরুষলিঙ্গের কর্তৃত্ব; স্বীয় ধর্মীয় দাপটের প্রশ্নাতীত চিহ্ন [মনে হয়, ধর্ম ও পুরুষ — ক্ষমতার দুই চিহ্ন পরস্পর সম্পূরক]। বালিকা যুবতি নারী — বিপরীত লিঙ্গ নির্বিশেষে ছিন্নভিন্ন করো নারীশরীর। অর্জিত মানুষী বিবেক উধাও, আদিম জান্তব বাসনা মুখব্যাদান করেছে। দখলদারদের দলবদ্ধ উন্মত্ত রিরংসায় সারি সারি নিথর নারীশরীর; ঘৃণার শোণিত বীর্য নিস্পন্দ নারীজঙ্ঘা বেয়ে মিশে যাচ্ছে ভারত-পাক উপমহাদেশের মাটিতে। পুরুষতান্ত্রিক মৌলবাদের কাছে হতমান — ‘এ-যুগে কোথাও কোনো আলো — কোনো কান্তিময় আলো/ চোখের সুমুখে নেই যাত্রিকের…।’
When the world sleeps, India will awake to life...
গুরুদাসপুর থেকে ট্রেন এসেছে লাহোরে। কামরা ভরতি লাশ গাদাগাদি ঠাসাঠাসি। কালচে জমাট রক্তপিছিল স্তূপে মাছির ভনভন। তখনও পচন ধরেনি লাশে। নিষ্পলক চোখে অসহায় ভীতি, বাঁচার আকুতি। বোনের আসার অপেক্ষায় আইসক্রিমওয়ালা দিলনাবাজ। বোন এল খণ্ডিত স্বাধীনতার মূল্য চুকিয়ে লাশের যোগফলে সংখ্যা জুগিয়ে। লাহোর জ্বলছে। চারিদিকে আগুন আর্তনাদ দিশেহারা ছুট। ধর্মোন্মাদ শাসানি। হায়নার চোখ চকচকে। দিলনাবাজে ঘুমিয়ে থাকা সংগুপ্ত জানোয়ার পিঞ্জর খুলে নখদাঁত ধারালো করছে। এতকালের বন্ধু তোতারাম, শের সিং, হরি এখন থেকে তার কাছে শুধুই মালাউন। যাকে ভালোবেসে কাছে পেতে চাইত এই-সেদিনও, সেই শান্তাবিবিকে এখন বলপূর্বক ছিনিয়ে নিতে চায় সে। সর্বনাশী দেশভাগের বিনষ্টি কালপর্বে যুবতি শান্তা কর্মজীবী মানুষগুলির কাছে হয়ে উঠেছিল বন্ধনের মর্মচারিণী। দুর্যোগের কালান্তরে তাকে নিয়ে সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখে মালিশওয়ালা হাসান। ইচ্ছে তার লাহোর থেকে শান্তাবিবিকে সঙ্গে করে পৌঁছে যাবে অমৃতসর। প্রেমের জন্য বিসর্জন দেবে আপন ধর্ম, মুসলমানের ছেলে হবে হিন্দু। কিন্তু, সময় কালান্তক। জিঘাংসা পুড়িয়ে মারছে মানুষকে, পুড়ছে দেশ। দিলনাবাজ ফুৎকারে নিভিয়ে দেয় প্রেমের অনির্বাণ দীপশিখা। হাসানকে খুন করে তার একদা ভালোবাসার নারীদেহ দখলে নেয়। বোনের খুনের বদলা নিতে তখন সে হিংস্র শ্বাপদ; দঙ্গলভুক্ত হয়ে লৈঙ্গিক আগ্রাসনে শামিল ধর্ষকাম পিশাচ উল্লাসে। নতুন করে মানচিত্র আঁকা হয়েছে। সদ্য ঘোষিত ভাগাভাগির দেশ ভূমিষ্ঠ। এদিকে বর্বরতার শতচ্ছিন্ন শরীরে শান্তাবিবির বিবমিষা জাগে…।
বু (গন্ধ)
রক্তমাংসের ভোগ্যপিণ্ড দেখে দেখে লুব্ধকের একঘেয়েমি আসে না। ধর্ষকাম লালসা গ্রাস করে না অরুচি। অগ্নিক্ষুধায় খাণ্ডবদহনের সর্বনাশী এক আয়োজন!
মুগলপুরের শরণার্থী শিবিরে শোনা যাচ্ছে নারী-পুরুষ-শিশুর আর্ত চিৎকার; অমৃতসর থেকে লুটপাট গোলাগুলির মধ্যে প্রাণ বাঁচিয়ে আসতে পেরেছে ভাগ্যবান তারা। এদের মধ্যে একজন সিরাজুদ্দিন। পথে হারিয়েছে তার স্ত্রীকে; দাঙ্গাবাজেরা যার শরীরের সব অন্ত্র টেনে হিঁচড়ে এনেছিল বার করে। কোনোমতে কন্যা সাকিনাকে নিয়ে পালায় সিরাজুদ্দিন। তারপর কীভাবে যেন বিচ্ছেদ হয়ে ক্যাম্পে ঠাঁই। সবাই যে-যার হারিয়ে যাওয়া মানুষ খুঁজে চলেছে; মা অথবা স্ত্রী কিংবা মেয়ে। অসহায় পিতা সিরাজুদ্দিন খুঁজে চলেছে তার সাকিনা। হারানো মেয়ে ফিরে পেতে সাহায্য চাইল ক্যাম্প দেখভালের আটজন রাজাকার যুবকের কাছে। একদিন অমৃতসরে রাস্তার ধারে যুবকেরা দেখতে পেল একটি মেয়েকে। দুর্ভাগ্যক্রমে এ-সেই নিরুদ্দিষ্ট সাকিনা। উদ্ধার করে যাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল পিতার কাছে, রক্ষকরূপী ভক্ষক আট রাজাকার যুবক সতেরোর তরতাজা শরীরটি নিঃশেষে ভোগ করার পর তাকে ফেলে আসে রেল লাইনের ধারে। ধর্ষিতা ও ধর্ষকের ধর্ম যখন এক হয়ে যায়, বুঝতে অসুবিধা হয় না তখন — দাঙ্গার সময় বিধর্মী নারীর প্রতি ক্রোধ অছিলা মাত্র, ধর্ম নয় কামার্ত পুরুষের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য যে-কোনও নারীদেহ হলেই চলে। সংজ্ঞাহীন সাকিনা লাশ হয়ে চলে আসে হাসপাতালের স্ট্রেচারে। সিরাজুদ্দিন নিস্পন্দ মেয়েকে দেখে চিৎকার করে ওঠে। জানে না, তার মা-মরা মেয়ে আদৌ বেঁচে আছে কিনা। ডাক্তার আসেন, শায়িত বিস্রস্ত ধর্ষিতা শরীরটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য সিরাজুদ্দিনকে বলেন — ‘খিড়কি খোল্ দো।’ ‘খোল্-দো’ শব্দবন্ধে মৃতপ্রায় সাকিনার শরীরে দেখা গেল মর্মান্তিক প্রতিক্রিয়া: সে যন্ত্রের মতো নিষ্প্রাণ হাতে সালোয়ারের দড়ি খুলে নিম্নাঙ্গ উন্মুক্ত করে দিল। এ-সমাজ, এই দুঃসময় তো তাকে পশুপ্রবৃত্তির পূর্তিতে যৌনাঙ্গের দ্বার খুলে রাখার সবক শিখিয়েছে; চেতনে অবচেতনে। আদিম অন্ধকারের উৎসমুখ খুলে গিয়েছে।
ইহুদি নারী মোজেল স্বেচ্ছায় তার ছেঁচড়ে যাওয়া উলঙ্গ ফরসা শরীর মেলে ধরেছে, ধর্ষণে আহ্বান করেছে যতসব শরীরখেকো দখলদারদের। গনগনে লেলিহান আসঙ্গ লিপ্সা থেকে বাঁচাতে চেয়েছে তরুণী কৃপাল কৌরের ইজ্জত। নিজের কুর্তা খুলে পরিয়ে দিয়েছে কৃপালকে, শিখ রমণীকে যতদূর সম্ভব মুসলমানি বেশে মানানসই করতে। যদি স্বধর্মের নারীদেহটি রেয়াত করা হয়! প্রাণ বাজি রেখে ত্রিলোচনের প্রেমিকাকে উদ্ধার করতে বিন্দুমাত্র বিচলিত বোধ করেনি মোজেল। বরং কৃপালকে ঘরনি করার স্বপ্ন দেখলেও দাঙ্গাক্রান্ত মহল্লা থেকে তাকে উদ্ধার করার কোনও সংকল্প দেখা যায় না ত্রিলোচনের বিমূঢ় আচরণে। বিপন্ন এক নারীকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এসেছে অপর এক নারী। যে বোহেমিয়ান; প্রথাগত ধর্মের অনুশাসন, নিগড় বারেবারে ভাঙতে চেয়েছে। সমাজ নির্দিষ্ট গণ্ডি নয়, নিজের মর্জি মাফিক শর্তহীন বাঁচার এক স্বাধীন পথ বেছেছে। সহমর্মের বোধ থেকে কর্তব্যের ডাকে নিজে ন্যাংটো হয়ে প্রতিবেশী নারীকে লুম্পেনদের পুরুষাঙ্গে রক্তাক্ত হতে দেয়নি। ওই জল্লাদ্দদের তো চাই জ্যান্ত উদলা মেয়েমানুষ। অপরাধবোধে, বিবেকের তাড়নায় ধর্মভীরু শিখ ত্রিলোচন সর্দারজির শান-মান-জান পাগড়ি খুলে মোজেলের নগ্নশরীর ঢেকে দেয়। কিন্তু, মরে যেতে যেতে সে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছে শুচিতার সামূহিক আবরণ। ধর্মযুদ্ধের ডাক দিয়ে দাঙ্গার যে সংঘটন, অবাধ ছাড়পত্র অবমাননা, অত্যাচার, জিঘাংসা, ধর্ষকাম মানসিকতায় — উদোম অস্তিত্বে মোজেল চিনিয়ে দিতে চেয়েছে বিকারের সেই বিবর ও তার আঁধার সময়। সম্মিলিত লালস চোখ আত্মসাৎ করে নিক তার দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া শরীর।
ইশর সিং বেঁচে আছে খুন জখম রাহাজানি-তে। আর কামপ্রবলা সঙ্গিনী কলবন্ত কাউরের সঙ্গে উদ্দাম সংগমে। দেশভাগের সন্ধিক্ষণ তার কাছে এনে দিয়েছে বিবিধ অযাচিত সুযোগ। সাতচল্লিশের উদ্বেজিত সময়ে নতুন নারীশরীর আস্বাদন করতে চায় ইশর। শহর জুড়ে নির্বিচার লুটপাটে অংশগ্রহণ করতে নেই তার মনুষ্যত্বের কোনও টানাপোড়েন। একদিন টাকা-পয়সা গয়না লোটার পর ইশর সিং পবিত্র কৃপাণ দিয়ে খুন করল একে একে পরিবারের ছয় সদস্যকে। রেহাই পেল একটি মেয়ে। কেননা সে ছিল ‘বহুৎ খুপসুরৎ’। অপ্রতিরোধ্য কামলোলুপ তাড়নায় মেয়েটিকে কাঁধে তুলে সর্দার বেরিয়ে এল। রাস্তায় খালের পারে ঝোপের মধ্যে তাকে শুইয়ে দিয়ে নিংড়োতে চাইল যৌনক্ষুৎপিপাসা। অথচ, টগবগে উত্তেজনা চকিতে থিতিয়ে গেল। লুটের মেয়েটি যে নিঃসাড়; মড়া। লাশ ধর্ষকের যৌনক্ষুধাকে শান্ত করতে পারলেও অহং যে থেকে যাবে অতৃপ্ত; কেননা ধর্ষিতার তরফে থাকবে না কোনও অসহায় কাতরতা, নিরুপায় বাধা, ভয়ার্ত চাপা আর্তনাদ। সে যে ‘বিলকুল ঠান্ডা গোস্ত…।’ অভাবিত বিপর্যয় ঘটে যায়। গোস্ত-শরীর শক্তিমদমত্ত ইশর সিং-এর শরীরে আমদানি করে নির্জীব হিমশীতলতা। সর্দারজি এখন নপুংসক; কলবন্তের ‘মাংসল পাছায় জোরে থাপ্পড় মেরে’, ‘তার উন্নত স্তন জোরে জোরে’ কচলে, জানা-সমস্ত কামকলা প্রয়োগ করেও নিজেকে উত্তপ্ত করতে পারে না আর। শিথিল নিস্তেজ হীনাঙ্গ-অস্তিত্ব ইশর সিং নিজেই ঠান্ডা গোস্ত-এ রূপান্তরিত; ক্লীবপুরুষ…।
খাল-বিল-নদীর দেশের মেয়ে সুবালা উদ্বাস্তু হয়ে এসেছে এ দ্যাশ; বেঁচে থাকার লড়াই কঠিনতর; তবু অনিঃশেষ মাতৃত্বের অপার স্নেহ, অনিবার বাৎসল্যেই তাই অস্বীকৃত হয় আত্মসমর্পণ, ফুরিয়ে যাওয়া। নতুন দেশে দুধের শিশুকে বাঁচাতে, নিজেকে ও বুড়ি দিদিমাকে বাঁচিয়ে রাখতে ভিক্ষোপজীবিনী হয়ে ওঠে সুবালা। পুরুষ ছকে বাঁধা লজ্জানত-গণ্ডি লঙ্ঘন করে বৃহত্তর জীবনসংগ্রামে জনসমুদ্রের মাঝে এসে দাঁড়ায়। নিজেকে আর সে আড়াল করতে চায় না, লোভাতুর দৃষ্টি থেকে লুকিয়ে রাখতে চায় না তার শরীর। ভরা বাসের সিটে বসে ‘বুকের কাপড় সরিয়ে ছেলের মুখে মাই গুঁজে দেয়। … এ তো গেঁয়োমি, অসভ্যতা বা অশ্লীলতা নয়, এ যে বিদ্রোহ!’ দেশভাগের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা দেশের ‘কচি-মা’ ও তার দুধের সন্তানকে ফুটপাথে ভিক্ষা করতে বসিয়ে দেয়, বিপরীতে পাশ্চাত্য ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ভেসে ওঠে সুবেশা সুতন্বী বিদেশিনি মডেলের উত্তেজক ছবি — সেই ক্লীব দেশে ‘এতগুলি পুরুষের দৃষ্টিপাত তার কাছে অতি সহজ স্বাভাবিক ব্যাপার…।’
তোমার খুকি চাঁদ ধরতে যায়
সে সর্বার্থেই অনিকেত; উচ্ছিন্ন মানবী। ছিন্নমূল এক সংসারের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। বাপ মা ভাই বোনকে বাঁচিয়ে নিজে বাঁচতে চেয়েছিল। দেশহীনতার দুর্যোগে ব্যক্তিগত শখ আহ্লাদ এমনকি প্রেমিকের সঙ্গে ঘর বাঁধার পরিকল্পনাকে তুচ্ছ, হীন আত্মপরায়ণতা মনে হত তার। কিন্তু সাংসারিক পাকপ্যাঁচ যে বড়ো নির্মম। সেই সময় উদ্বাস্তু মানুষের টিকে থাকা এক দুর্দায়। পারিবারিক মূল্যবোধ নিঃশেষ হয়ে রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলি যেন এ সময়ে হয়ে পড়ল নির্দয়, স্বার্থোন্মত্ত। নীতা নামের বাড়ির বড়ো মেয়েটিকে পরিবারের ক্ষুদ্রচেতা আর-সবাই নিংড়ে নিতে চাইল। টেনে চলো শুধু সংসারের জোয়াল; বিনিময়ে জুটতে থাকল উপেক্ষা প্রতারণা; শূন্য মমতা। ইয়ুং-এর সর্বকালীন সর্বজনীন সর্বজাতিক ‘গ্রেট মাদার’ আদিকল্পের আদলে পুরুষতন্ত্র নীতাকে কাচের ফ্রেমে বন্দি পুত্তলিজননীর আদলে পুজো করে বলবে — স্নেহময়ী মাতৃকাশক্তির আধার সে ত্যাগতিতিক্ষার পরাকাষ্ঠা মর্ত্যমানবী! জগদ্ধাত্রী ভূমিকায় নিরন্ন মানুষগুলিকে বাঁচিয়ে রাখে সে তার বরাভয়ে, অন্ন বিতরিয়া। মেঘে ঢাকা তারা হয়ে সে নিঃস্ব হয়ে ক্ষয়ে যেতে চায়নি। রক্তমাংসের সাধারণ নারী হয়েই ঝরনা পাহাড় প্রকৃতির মাঝে মনের মানুষের সঙ্গে লীন হয়ে যেতে চেয়েছে। বাঁচতে চেয়ে আর্তনাদ করেছে, কিন্তু আত্মাদর স্বজন অভিশপ্ত সময় থাবা বসিয়েছে তার শরীরে। ব্যাপ্ত নিঃসীম ক্ষয়িষ্ণুতা তাকে স্নিগ্ধ প্রশান্ত শুকতারা হয়ে নিজেকে মেলে ধরতে দেয়নি। ভাঙন তখন দুর্মর, ক্ষয়রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে মনে; যক্ষ্মায় ধুকছে চারপাশ!
ঠাঁইনাড়ার রামায়ণ
চব্বিশ শটের মন্তাজ:
REEL NO.14 (FOURTEEN)
1. Close shot সীতা। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রসাধন করছে। Cut
2. Long shot to mid shot ঈশ্বর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। সে দরজার কাছে দাঁড়ায়। সীতা ফিরে তাকায়। Cut
3. Long shot সীতা। সে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। Cut
4. Close shot ঈশ্বর। সে সীতার দিকে তাকিয়ে আছে। Cut
5. Close shot ঈশ্বর। সে সীতাকে অস্পষ্ট দেখছে। Cut
6. Long shot ঈশ্বর। সে সীতার দিকে খানিকটা এগিয়ে যায়। Cut
7. Close shot সীতা। ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে আছে। Cut
8. Close shot ঈশ্বর। সে সীতার দিকে তাকিয়ে আছে। Cut
9. Close shot একটি চোখ তাকিয়ে আছে। Cut
10. Close shot বঁটিদাও। Cut
11. Close shot একটি চোখ তাকিয়ে আছে। Cut
12. Long shot সীতা। সে বঁটিদাওটা হাতে নেয় এবং সরে যায়। কি যেন একটা কাটার শব্দ ভেসে আসে। Cut
13. Mid shot ঈশ্বর। তার পাঞ্জাবিতে রক্তের ছিটে লাগে। তারপর সে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। Cut
14. Close shot তানপুরা ও তবলা। সেগুলোও নড়ে ওঠে। Cut
15. Long shot সীতা। সে চৌকির উপর একটা হাত রেখে মেঝেতে পড়ে আছে। ঈশ্বর তার দিকে তাকিয়ে দেখছে। Cut
16. Close shot ঈশ্বর। সে বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে দেখছে। Cut
17. Close shot সীতা। অস্পষ্ট থেকে স্পষ্ট এবং স্পষ্ট থেকে অস্পষ্ট লাগছে। Cut
18. Mid shot ঈশ্বর তাকিয়ে থাকে। তারপর সীতার দিকে এগিয়ে যায়। Cut
19. Close shot রক্তমাখা বঁটিদাওটা মাটিতে পড়ে আছে। সেটা অস্পষ্ট থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। Cut
20. Mid shot ঈশ্বর। সে মাটি থেকে বঁটিদাওটা তুলে হাতে নেয়। Cut
21. Close shot সীতার মুখ। অস্পষ্ট থেকে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। Cut
22. Close shot ঈশ্বর। সে বঁটিদাওটা হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে। Cut
23. Long shot ঈশ্বর। সে বঁটিদাওটা হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে। Cut
24. Close shot সীতা। মৃত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। নেপথ্য থেকে ভেসে আসে : হায় রাম। Cut
চিত্রনাট্য অবিকল উদ্ধৃত করা হল। চলচ্চিত্রের নাম ‘সুবর্ণরেখা’। ঋত্বিক কুমার ঘটক দেশভাগের ট্রমা, অভিশাপ, বিয়োগান্ত চলমান আখ্যান রচনা করে চলেছেন। পচে যাওয়া রাজনীতি ধসে যাওয়া মানুষিক মূল্যবোধ, নিদারুণ অস্তিত্বহীনতা সমগ্র সময় সমাজকে উদোম করেছে। রামায়ণের দেশ ভারতবর্ষ যেন পতিতালয়ে রূপান্তরিত! বিস্মৃতিতে তলিয়েছে তার পুরাণ মহাকাব্য লড়াইয়ের কথকতা। রাজমাতা কৌশল্যা আজ বাগ্দিবউ হয়ে অনাদরে অবহেলায় ভিক্ষা করতে করতে জনসংখ্যা থেকে মুছে যায়। জনকনন্দিনীর ট্র্যাজেডি কালান্তরে আজকের সীতার জীবনে কালান্তক পরিণতি নিশ্চিত করে। অপরিণামদর্শী হঠকারিতা সময়কে করেছে আত্মনাশী। বড়ো দাদা ঈশ্বর Fresh Girl, Singing Girl-এর ভোগকামনায় উপস্থিত হয় তারই হারিয়ে যাওয়া বোন সীতার ঘরে। মুখোমুখি দাদা ও বোন, ক্রেতা ও বিক্রেতা। খদ্দেররূপী দাদাকে দেখে সীতার তখন আত্মঘাতী হওয়া ছাড়া কোনও পথ অবশিষ্ট থাকে না। কী, চূড়ান্ত অধঃপতন! ধরণি দ্বিধা হও! হায় রাম!
আঁকা বাঁকা সুবর্ণরেখার ওপারে ছিল ছোট্ট সীতার বড়ো বড়ো শূন্য ঘর। নীল নীল পাহাড়ের অদৃশ্য কল্পচ্ছবি ভেসে উঠত জবরদখলীকৃত ক্যাম্পের টিকে থাকা শৈশবে। ফেলে আসা সে বাড়ির বাগানে প্রজাপতিরা ঘিরে ঘিরে ধরে, কানে ভাসে এক অশ্রুত সুরমূর্ছনা। সব পথ বন্ধ হয়েছে সেথায় যাওয়ার। সে দেশ এখন পরের। এ দায় কার! নিশ্চিতির আশ্রয়টুকু মিলল না তো কোনও পারেই; নাশকতার দায়ভার নেবে কে!
তবু প্রাণ আছে
রমণীর বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গে। দাঙ্গা, দেশভাগ তাকে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করেছে। তাদের পরিত্যক্ত বাড়ি দখল করেছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তু মুসলমান যুবকেরা। বাড়িতে হিঁদুয়ানির চিহ্ন রূপে রয়ে গিয়েছে মৃতপ্রায় এক তুলসীগাছ। মোদাব্বের উপড়ে ফেলতে চায় বিধর্মীর স্মারক। হাতের কঞ্চি কচুকাটার ভঙ্গিতে তুলসীগাছের দিকে সজোরে চালায়। আশ্চর্য! তুলসীগাছের বেশ কিছুটা ওপর দিয়ে তা চলে যায়। ধীরে ধীরে দেখা যায়, কারা যেন (ইউনুস? মকসুদ? মতীন?) তুলসীগাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করেছে। জলে যত্নে তুলসীগাছ আবার সবুজ হয়ে উঠেছে। ছিন্নমূল মতীন বিতাড়িত রমণীর অশ্রুসিক্ত অনিশ্চিত যাত্রার মানসসঙ্গী হয়ে ওঠে —
হয়তো আসানসোল, বৈদ্যবাটি, লিলুয়া বা হাওড়ার রেলওয়ে পট্টিতে সে মহিলা কোনো আত্মীয়ের ঘরে আশ্রয় নিয়েছে… অথবা মহিলাটি কোনো চলতি ট্রেনের জানলার পাশে যেন বসে।… হয়তো তার যাত্রা এখনও শেষ হয় নাই।
স্বদেশ স্বজন মৃত্তিকার সঙ্গে নাড়ির বন্ধন ছিন্ন হলেও বুঝি ‘প্রাণ আছে, এখনো প্রাণ আছে’…। চুপি চুপি বলে যায় তুলসীগাছ। জিজীবিষা যে তার শিরায় শিরায়।
কেন যে বারেবারেই ভুলে যাই দেশভাগ মানুষভাগ এক নরকঋতুর কালযোগ! বারেবারে ফিরে ফিরে এসে সে ‘সবই নেয়, নারীকেও নিয়ে যায়…’
সহায় :
‘কেন চেয়ে আছ গো মা’ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘১৯৪৬-৪৭’ : জীবনানন্দ দাশ
‘রিয়ায়ৎ’ : সাদাৎ হাসান মন্টো
‘Right of death and Power over life’ : Michel Foucault
‘The Second Sex’ : Simon De Beauvoir
‘A tryst with destiny’ : Jawaharlal Nehru
1947 : ‘Earth’ : Deepa Mehta
‘Manto’ : Nandita Das
‘বু’ : সাদাৎ হাসান মন্টো
‘খোল দো’ : সাদাৎ হাসান মন্টো
‘মোজেল’ : সাদাৎ হাসান মন্টো
‘ঠান্ডা গোস্ত’ : সাদাৎ হাসান মন্টো
‘সুবালা’ : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
‘মেঘে ঢাকা তারা’ : ঋত্বিক কুমার ঘটক
‘সুবর্ণরেখা’ (চিত্রনাট্য) : ঋত্বিক কুমার ঘটক
‘একটি তুলসীগাছের কাহিনি’ : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
‘ছন্নছাড়া’ : অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
[কৃতজ্ঞতা : নিরন্তর]