ঔপনিবেশিক যুগের বাংলায় আদিবাসী-কৃষক বিদ্রোহ ও গোষ্ঠী-চেতনার নানা গড়ন

সুস্নাত দাশ

কৃষক বিদ্রোহের চরিত্র নিয়ে সাধারণত দু’ধরনের তর্ক আছে। আঠারো-উনিশ শতকের বিদ্রোহগুলি ছিল প্রাক্-রাজনৈতিক— কারণ এগুলি ছিল মূলতঃ ধর্মীয়, অপরিকল্পিত, অসংগঠিত, লক্ষ্যহীন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ববিহীন এবং স্বতঃস্ফূর্ত। অনেকে আবার মনে করেন এগুলি ছিল রাজনৈতিক, কেননা এগুলির ছিল পরিকল্পনা, সংগঠন, নেতৃত্ব ও সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম মনে করেন (দ্র. আনোয়ার হোসেন ও মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত বাংলাদেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন, ঢাকা, ১৯৮৬) সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ এশিয়ার (ভারত যার অন্যতম) কৃষক-বিদ্রোহ সংক্রান্ত গবেষণায় প্রশ্ন উঠছে প্রাক্-ধনতান্ত্রিক যুগের কৃষক বিদ্রোহগুলি আদৌ রাজনৈতিক ছিল কি না! কৃষক সমাজের চেতনার মান ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে প্রশ্নগুলি জড়িত।

অপরদিকে E. J. Hobsbawm-এর মতে (Primitive Rebels গ্রন্থ দ্রষ্টব্য) এগুলি ছিল নীতি ও লক্ষ্যবিহীন বিদ্রোহ যা রাজনৈতিক চেতনার পূর্বাভাষ মাত্র— রাজনৈতিক নয়। হবসবমের অনুকরণে অনেকে এখানকার প্রাক্-ধনতান্ত্রিক কৃষক-বিদ্রোহকে প্রাক্-রাজনৈতিক রূপে আখ্যায়িত করার পক্ষপাতী। সাবলটার্ন গোষ্ঠীর প্রধান মুখপাত্র অধ্যাপক রণজিৎ গুহ (১৯৮৩) এক্ষেত্রে হবস্‌বম্ এবং তাঁর অনুসারীদের বক্তব্যকে খন্ডন করে দেখানোর চেষ্টা করেন যে, গ্রামীণ মানুষের সশস্ত্র বিদ্রোহে এমন কোনও উপাদান নেই যা রাজনৈতিক নয়। কৃষকের চেতনা এবং কৃষকের শ্রেণিশক্তির মধ্যেকার সম্পর্ক ও সম্ভাবনাকে রণজিৎ গুহ বুঝতে চেয়েছেন ‘On Some Aspects of the Historiography of Colonial India’ (Subaltern Studies-I) এবং ‘The Prose of Counter Insurgency’ (Subaltern Studies-II) নামক দুটি নিবন্ধে এবং অবশ্যই Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India গ্রন্থে। গুহর বক্তব্যের মূল বিষয় হল যে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সম্পর্কের দ্বারা কৃষক-বিদ্রোহের চরিত্রগুলিকে সামগ্রিকভাবে বোঝা যায় না— আংশিকভাবে বোঝা যায় মাত্র। এর জন্য কৃষক-মনস্তত্ত্ব বোঝা প্রয়োজন। গুহ দেখিয়েছেন কৃষকদের অর্থনৈতিক বক্তিত্ব ব্যতীতও তার চেতনার জগতে রয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের নানা ভিত্তি ও উপাদান। রণজিৎ গুহ তাঁদের নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চায় ঔপনিবেশিক ভারতের কৃষকচেতনার মোট ছয়টি মৌলিক উপাদানের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যেমন : ১) অস্বীকৃতি (Negation), ২) দ্ব্যর্থকতা (Ambiguity), ৩) রীতিনীতি বা প্রণালী (Modality), ৪) সংহতি (Solidarity), ৫) বার্তাপ্রেরণ (Transmission), ৬) আঞ্চলিকতা (Territoriality)। সুতরাং প্রাক্-ধনতান্ত্রিক কালে ঔপনিবেশিক ভারতের কৃষক বিদ্রোহগুলি যে নিজস্ব কৃষক-চেতনা দ্বারা পরিচালিত ছিল তাতে সন্দেহ নেই। সাব অলটার্ন স্টাডিজের দ্বিতীয় খণ্ডে রণজিৎ গুহ সাঁওতাল বিদ্রোহে ধর্মের ভূমিকা নির্ধারণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য সাঁওতালদের ধর্ম-চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে ‘হুল’ বোধগম্য হবে না।

অধ্যাপক বিনয়ভূষণ চৌধুরীও ঔপনিবেশিক যুগের কৃষক বিদ্রোহে কৃষক সমাজ ও আদিবাসীদের নিজস্ব চেতনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ধর্মীয় উপাদান এই চেতনা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কিন্তু অধ্যাপক চৌধুরীর মতে সাঁওতাল বিদ্রোহে ধর্মের ভূমিকা নির্ধারণের জন্য এটাই যথেষ্ট নয়। এটা শুধু বোঝায়, সাঁওতালদের নানা কাজ ও চিন্তাভাবনা ধর্মচেতনা দ্বারা প্রভাবিত। ধর্মের প্রভাবের দিক থেকে বিচার করলে দু’ধরনের আন্দোলন দেখা যায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এ প্রভাব একান্তই সীমিত, এখানে ধর্ম-বিশ্বাসের ভূমিকা প্রধানত আন্দোলনের সংহতিরক্ষায়। দ্বিতীয় ধরনের আন্দোলনে এ প্রভাব অনেক সুদূরপ্রসারী এবং গভীর। এখানে বিদ্রোহের যৌথ সিদ্ধান্ত ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। সংগঠনের মূল শক্তি ধর্ম প্রভাবিত কোনো কোনো বিশ্বাস। নেতার প্রতি অবিচল আনুগত্যের একটা প্রধান উৎস ধর্মীয় ধারণা। আন্দোলনের উপায় ও লক্ষ্যেও ধর্ম বিশ্বাসের গভীর প্রভাব। তবে ধর্মবোধ অপরিবর্তনীয় মোটেই কিছু নয়। অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে ধর্মীয় ধারণাও পাল্টে গেছে। বিনয়ভূষণ চৌধুরী তাঁর ‘ধর্ম ও পূর্ব ভারতে কৃষক আন্দোলন (১৮২৪-১৯০০)’ নিবন্ধে (পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ প্রকাশিত ইতিহাস অনুসন্ধান – ৩য় খণ্ডে) এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর উপজাতীয় বা আদিবাসী বিদ্রোহগুলির লক্ষ্য ছিল ‘ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করা এবং উপজাতি সমূহের প্রাকৃতিক স্বাধীনতা বজায় রাখা।’ আবার সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৮২), সিলেট বিদ্রোহ (১৭৯৯), কুমিল্লার ফিরিঙ্গী খেদা বিদ্রোহ (১৭৮৭) প্রভৃতিতে ধর্মীয় উপাদান ও চরিত্র প্রত্যক্ষ থাকলেও তার অন্তঃস্থলে প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক অসন্তোষ। বিভিন্ন গবেষণায় জানা যায় যে এই বিদ্রোহগুলির নেতৃত্বে ও পশ্চাতে কোম্পানি শাসনে বিক্ষুব্ধ মধ্যস্বত্বভোগী ও রায়তদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণ দিয়ে যে কৃষক-বিদ্রোহের সামগ্রিক রূপ বোঝানো যায় না তা ড. বিনয় ভূষণ চৌধুরী সহ অনেকেই মনে করেন। এ প্রসঙ্গে হামজা আলাভি বলেছেন, “The Historical process by which a class-in-itself is transformed into a class-for-itself are complex and are mediated by a variety of factors, including influences of pre-existing forms of social organisation and institutions which embody primordial loyalties, such as those of kinship or ethnic identity etc; this is especially true in peasant societies, furthermore, given an hiererchical social order in peasant societies, the absence of horizontal political cleavages along class lines implies the existence of vertical cleavages which cut across class lines.” অর্থাৎ কৌম-পরিচিতি তথা গোষ্ঠী-আনুগত্য শ্ররণী বা অর্থনৈতিক স্তরবিন্যাসের পরিচিতি অপেক্ষা আদিবাসী-কৃষক সত্তায় অনেক বেশি ক্রিয়াশীল। [Hamja Alavi, ‘Peasant Classes and Primordial Loyaltics’, The Journal of Peasant Studies, Vol – I No. Oct. 1973, P-29]

ঊনবিংশ শতাব্দীতে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার বহু পূর্ব থেকেই উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কৃষকসমাজ এগিয়ে এসেছিল। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা তারাই প্রথম উত্তোলন করেছিল। যেমন উদাহরণরূপে উল্লেখযোগ্য পূর্ব ভারতে তিতুমীরের বিদ্রোহ (১৮৩১), কোল (১৮৩১), সাঁওতাল (১৮৫৫), নীল (১৮৬০), পাবনার কৃষক বিদ্রোহ (১৮৭৩)। পশ্চিম ভারতের মহারাষ্ট্রে মহাজন বিরোধী বিদ্রোহ (১৮৭৫), দক্ষিণভারতে মোপলা বিদ্রোহ (১৮৩৬-৮৫) প্রভৃতি এই সংগ্রামী ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। ব্রিটিশরাজ ও দেশীয় সমস্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম সত্ত্বেও এই বিদ্রোহগুলির সীমাবদ্ধতা ছিল নানা ক্ষেত্রে। অধ্যাপক নরহরি কবিরাজ বা সুপ্রকাশ রায় এগুলির স্বতঃস্ফূর্ততা, বিক্ষিপ্ত চরিত্র এবং ধর্মীয় সংস্কারগুলিকে এক্ষেত্রে চিহ্নিত করেছেন। এই নিবন্ধে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে বিদ্রোহগুলি বিষয়ে কিছু উপাদান সংক্ষেপে বিশ্লেষণ হবে।


দুই

অতীতে আদিবাসীরা ভারতীয় জনজীবনের মূলস্রোতটি থেকে নিজেদের অনেকটাই বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। অনুপজাতীয় উচ্চবর্গের মূল্যবোধগুলি তারা আয়ত্ব করবে এমন আশা করা হত না এবং সেরকম করার কোনও পার্থিব তাগিদও তাদের ছিল না। আয়ত্বকরণ কখনও কখনও ঘটলেও তা অতিমাত্রায় আংশিক, অথবা তা প্রভাবিত করত আদিবাসীদের একটি ক্ষুদ্রাকার উচ্চবর্গকে যারা আর্থিক কারণে স্বীয় সম্প্রদায় থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখত। এই অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়কালে, যখন ব্রিটিশরা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে সম্পূর্ণভাবে বিজয় ও বশীভূত করতে সক্ষম হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, ঔপনিবেশিক আইন বলবৎ হয় এবং আদিবাসী অঞ্চলগুলি অর্থনৈতিক শোষনের সম্মুখীন হয়। এইভাবে আধুনিক ভারতীয় রাষ্ট্রের আবির্ভাব-প্রক্রিয়া কর্তৃক গঠিত হয়েছিল আদিবাসীদের সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষিত। কোনও কোনও ক্ষেত্রে, অবশ্যই অঞ্চল বিশেষে আদিবাসী সংস্কার প্রবক্তারা একটি কৃষ্টিগত সংশ্লেষ গড়ে তোলার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছিলেন। তাদের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছিল যে এই সংশ্লেষ নতুন সমাজে তাদের সম্প্রদায়কে একটি সম্মানজনক স্থান এনে দেবে।

M. N. Srinivas তাঁর Social Change in Modern India শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সংস্কৃতায়ন (Sanskritization) শুধুমাত্র হিন্দু বর্ণগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিম ভারতের ভিল, মধ্যভারতের গোন্দ ও ওরাওঁ এবং হিমালয়ের পাহাড়িদের মতো উপজাতি ও আধা-উপজাতি গোষ্ঠীগুলির মধ্যেও এই প্রক্রিয়াটি লক্ষ্য করা যায়। এরফলে সাধারণত যে উপজাতি সংস্কৃতায়নের সাহায্য নিচ্ছে তারা নিজেদের হিন্দু বর্ণপ্রথার অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করে। সংস্কৃতায়ন বলতে কি বোঝায় সে সম্পর্কে শ্রীনিবাসের বক্তব্য হল: ‘সংস্কৃতায়ন হল সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি নীচু হিন্দু জাতি বা উপজাতি বা অন্য কোনও গোষ্ঠী তার লোকাচার, ক্রিয়াবিধি, মতাদর্শ ও জীবনচর্চাকে একটু উঁচু এবং প্রায়শই দ্বিজ জাতির আদলে পরিবর্তিত করে। বর্ণভিত্তিক স্তরকাঠামোয় ঐ জাতির যে স্থান তা স্থানীয় সমাজের দ্বারা সনাতনভাবে স্বীকৃত। তার থেকে উচ্চতর স্থানের দাবি সাধারণত এই ধরনের পরিবর্তনের পরেই আসে। এই দাবির স্বীকৃতি পেতে লেগে যায় বেশ কিছু সময়, বলতে কি, দু-এক পুরুষও।’

ওরাওঁ সমাজে সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে S. C. Roy-এর উৎকৃষ্ট গ্রন্থটি (Oraon Religion and Customs) পড়লে বোঝা যায় যে রায় নিজে এই ধরনের ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করেননি। তিনি লেখেন যে আর্য সমাজ প্রভৃতি হিন্দু সংস্কারক গোষ্ঠীগুলি ‘শুদ্ধি’ প্রভৃতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ওরা ওঁদের হিন্দু সমাজের আওতার মধ্যে নিয়ে আসতে চেষ্টা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়’। কারণ রায়ের মতানুসারে, ‘আলোকপ্রাপ্ত ওরাওঁ নেতারা স্বভাবতই এই ধরনের প্রচারকদের এড়িয়ে চলত। কারণ তাদের ভয় ছিল যে দ্বিজ বর্ণগুলির ধর্মীয় সামাজিক বিশেষ মর্যাদা নিয়ে গড়ে ওঠা শাস্ত্রানুগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক হিন্দুধর্ম বর্ণান্তরিত আদিবাসীদের স্থান দেবে হিন্দু বর্ণস্তর কাঠামোর একেবারে নীচে না হলেও বেশ নীচের দিকে।’ অন্যান্য তথ্যসূত্র থেকেও অনুমান করা যায় যে মোটের উপর আদিবাসীরা বর্ণস্তর কাঠামোয় কোনও স্থান দাবি করেনি। অবশ্য একথা সত্যি যে ক্ষেত্রবিশেষে তারা নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে দাবি করেছে। এই ব্যাপারটি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ ক্ষত্রিয়রা মাংসাহার ও সুরা পানের মতো ‘অপবিত্র’ ক্রিয়াকর্মের শরিক হয়েও উচ্চ সামাজিক মর্যাদাভোগ ভোগ করে থাকে। অন্যভাবে বলতে গেলে, ক্ষত্রিয়োচিত প্রতিষ্ঠার দাবিদার আদিবাসীরা চায় যে ‘অপবিত্র’ আচারবিধিতে অভ্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো হোক।

শ্রীনিবাসের তত্ত্ব আলোচনা প্রসঙ্গে Louis Dumont[Homo Hierarchicus] দেখিয়েছেন, যেসব নিম্নবর্গের বর্ণ বা উপজাতি তাদের জীবনচর্চায় সংস্কার নিয়ে আসে, তাদের পক্ষেও এই পদ্ধতির মাধ্যমে নিজেদের সামাজিক সংস্থানকে উন্নত করা খুবই কঠিন। রাজনৈতিক কার্যকলাপের মাধ্যমে উচ্চবর্ণগুলির কাছ থেকে বলপূর্বক এই সংস্থান আদায় করে নিতে হয়। এইভাবে কোনও সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং বর্ণকাঠামোয় তাদের অবস্থান পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। ফলত আদিবাসীদের পক্ষে উচ্চতর মর্যাদা বা সামাজিক সমস্থিতি দাবি করা বৃথা, যদি না একইসঙ্গে ক্ষমতাশালী সম্প্রদায়গুলির বিরুদ্ধে তারা একটা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে। এছাড়া কোনও বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক মাত্রা সংস্কৃতায়ন তত্ত্বে অনুপস্থিত। এতে মনে করা হয়েছে যে অনন্তকাল সবাই শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ্য শুদ্ধতার লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর জন্যই চেষ্টা করে যাবে। যার প্রকৃতপক্ষে বাস্তব ভিত্তি ছিল না।

ব্রিটিশ শাসন আদিবাসী সমাজের পক্ষে ছিল অভিশাপ স্বরূপ। উপনিবেশিক শাসনের প্রারম্ভিক পর্ব থেকেই আদিবাসী সমাজে মোড়লের পদটি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। গ্রামের প্রধান ব্যক্তিত্বরূপে এতদিন তার যে ভূমিকা ছিল তা ক্রমহ্রাসমান হয়ে ওঠে। ব্রিটিশদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার গল্প কয়েক বৎসরের মধ্যেই গ্রামের মোড়ল অধিকাংশ স্থানেই জমিদার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত গ্রামীণ প্রশাসন যন্ত্রের অঙ্গীভূত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ প্রাক্-ব্রিটিশ যুগে যারা স্বাধীনভাবে কার্য সম্পাদন করতে পারত ব্রিটিশ শাসনকালে তারাই জমিদারদের অধস্তন সহযোগীতে রূপান্তরিত হয়। নানা ধরনের বেগার প্রথা, স্বল্প মজুরি, ঋণদান প্রভৃতির মধ্য দিয়ে আদিবাসীদের জন্য যে অভূতপূর্ব শোষণ-পীড়নমূলক বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করা হয়েছিল গ্রামের মোড়ল জমিদারের প্রতিনিধিরূপে সেই বন্দোবস্তের অংশীদারে রূপান্তরিত হয়েছিল। বেশ কিছু সংখ্যক গ্রামপ্রধান অবস্থাপন্ন হয়ে উঠে দ্বিবিধ কারণে— (১) নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তৎপরতা এবং (২) জমিদার কর্তৃক গ্রামের উপর নির্দিষ্ট খাজনা আদায়ের জন্য একটি লভ্যাংশ আত্মসাৎকরণ। এরফলে আদিবাসী সমাজ সংগঠনের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন সূচিত হয়। আদিবাসী সমাজের মধ্যে অতঃপর স্তরবিন্যাস ঘটে। হিন্দু সমাজ সংগঠনের মতোই আদিবাসী সমাজ সংগঠনেও অবস্থাপন্ন মানুষেরা ক্ষমতা ও মর্যাদা ভোগের অধিকারী হয়ে ওঠে।

ঔপনিবেশিক শাসনকালে আদিবাসী সমাজ সংগঠন পরিবর্তনের সম্মুখীন হলেও একথা স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে তাদের সংগঠনের সংহতি ও দৃঢ়তা হিন্দু সমাজ সংগঠনের সমাগোত্রীয় হয়ে ওঠেনি, প্রকৃতিগতভাবে তা ছিল বিপরীতধর্মী। এটাই সাবঅলটার্ন ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহ কথিত আঞ্চলিকতা বা territoriality-র সমস্যা যা আদিবাসী সমাজের প্রতিরোধ সংগ্রামকে দুর্বল করেছিল।

কৃষি ছাড়াও আদিবাসী অর্থনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হল অ-আদিবাসী (Non-tribal) অঞ্চলের তুলনায় বনজ সম্পদের উপর লক্ষ্যণীয় মাত্রায় নির্ভরশীলতা। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, ‘The tribal economy was characterised by the close integration of cultivation with forest and pasture’, ব্রিটিশ শাসনের প্রারম্ভিক পর্বে আদিবাসীদের অর্থনৈতিক সংহতি তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়নি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি ভারতবর্ষে দৃঢ় হয়ে ওঠার পর আদিবাসীদের নিরুপদ্রব জীবন পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়। যে বনজ সম্পদকে তারা নিজেদের সম্পত্তি ভেবে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করত সেই অধিকার থেকে ব্রিটিশ শাসন তাদের বঞ্চিত করে। ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত আইনাদি কেবলমাত্র আদিবাসীদের বন থেকে গাছ কাটার অধিকারই খর্ব করেনি, বনাঞ্চল পরিষ্কার করে জমিকে লাঙলের আওতাধীনে আনয়নের বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা জারি করে। নব রূপে বিদেশি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের যূপকাষ্টে বলি হয়েছিল সমগ্র আদিবাসী সম্প্রদায়ের স্বার্থ। ব্রিটিশ শাসনকালে দরিদ্র আদিবাসীরা ছিল পৌনঃপুনিক দুর্ভিক্ষের শিকার। প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণাদির ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে, ‘The tribals were the worst sufferers during famines in Bengal and Bihar.’ বস্তুতপক্ষে খাদ্যশস্যের দুষ্প্রাপ্যতা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষকে অস্তিত্বগত সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রতি নিয়তই লড়াই চালাতে হত। ব্রিটিশ শাসনকালে খাদ্যের জন্য আদিবাসীদের হাহাকার তাদের পরম্পরাগত ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে প্রভাবান্বিত করেছিল গভীরভাবে। এর ফলে আদিবাসীদের মনে যে ভাবাবেগ সঞ্চারিত হয়েছিল তার মাধ্যমেই রচিত হয়েছিল কতিপয় আদিবাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট।

তিন

ঔপনিবেশিক শাসন আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকারও কেড়ে নিয়েছিল। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে রাজস্ব প্রাপ্তির আশায় অরণ্য অঞ্চলে চাপিয়ে দেওয়া হয় ঔপনিবেশিক শাসন। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকেই আদিবাসীদের প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ভোগ করে আসা অরণ্যসম্পদকে ব্রিটিশ সরকারের একচেটিয়া অধিকারে আনার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে আদিবাসীদের প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ভোগ করে আসা আরণ্যক জীবন বিড়ম্বিত হতে থাকে। অনেক উপজাতি ভূমিহীন মজুরে পরিণত হয়েছিল। অসহনীয় আর্থিক অনটন ও কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে কাটাতে এই নিষ্ঠুর ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্তি লাভের জন্য তারা প্রস্তুত হচ্ছিল সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্য। বিশেষ করে রাজস্ব ব্যবস্থা ও অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধেই বিভিন্ন উপজাতিরা বিদ্রোহ করে। এর সঙ্গে ছিল অন্যান্য অর্থনৈতিক শোষণ। ‘এক পাই’ (আধসের-এর মত) লবণ ঋণ করলে দুই ‘কুণ্ডি’ ধান দিয়ে পরিশোধ করতে হত, তা ছিল একমন ধানের সমান। একখণ্ড কাপড় ঋণ দিয়ে জোর করে আদায় করা হত একটা বলদ বা গরু। এই অত্যাচার ও শোষণের মাত্র কমবেশি হলেও তাদের আদিম কৃষিভিত্তিক গোষ্ঠীগত সমাজব্যবস্থা সর্বত্রই সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাই যখনই কোনো বিশেষ অঞ্চলে উপজাতিরা সশস্ত্র অভ্যুত্থান করত, তার প্রভাব পড়ত অন্যান্য উপজাতির উপরও। উপজাতিরা নিজেদের শ্রেণি হিসেবে নয়, সাঁওতাল, মুণ্ডা, হো, কোল প্রভৃতি গোষ্ঠীরূপে দেখতে অভ্যস্ত ছিল। তাই তাদের মধ্যে বিরাজ করত ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যবোধ। এইসব কারণেই সমস্ত উনিশ শতক ছিল ইংরেজের বিরুদ্ধে উপজাতিদের গণজাগরণ, গণআন্দোলন, গণবিপ্লবের ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনের ঔপনিবেশিক শোষণের দিকটা যতই ফুটে উঠতে থাকল ততই বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন কারণে গণবিদ্রোহ ঘটতে লাগল একের পর এক। ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কম করে চল্লিশটা বড়ো এবং অসংখ্য ছোটো ছোটো বিদ্রোহ হয়। ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয়েছিল বাংলা ও বিহারের মাটিতে, ওখানেই সর্বপ্রথম মানুষ অস্ত্রধারণ করেছিল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে পালামৌ-এ চেরো অভ্যুত্থান, ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে সিংভূমে হো-দের বিক্ষোভ, ১৮২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে একটানা ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোল বিদ্রোহ।

এছাড়াও ঔপনিবেশিকতা বিরোধী কিছু মিশ্র সংগ্রামী ঐতিহ্য ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে ভারতের নানা প্রান্তে ছিল যাতে কম-বেশি আদিবাসী বা উপাজাতি সমাজভুক্ত মানুষের অংশগ্রহণ ঘটেছিল পরোক্ষভাবে, খুব সচেতন মাত্রায় নয়। দেওয়ানী লাভের পর কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের কঠোরতা ও মন্বন্তরজনিত অর্থনৈতিক সংকট একদিকে কৃষক, অপরদিকে কর্মচ্যুত সৈন্যদের বাধ্য করেছিল সন্ন্যাসী, ফকির আর অসন্তুষ্ট জমিদারদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে। এই বিদ্রোহ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল প্রায় চল্লিশ বছর। বাংলা-বিহারের পাঁচটা জেলায়, বিশেষভাবে মানভূম জেলায় চূয়াররা বিদ্রোহ করেছিল দু’বার ১৭৬৬-১৭৭২ আর ১৭৯৫-১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে। ১৭৬৭ খ্রিঃ ধলভূমের রাজা, ১৭৮৩ খ্রিঃ উড়িষ্যায় এবং ১৮২৭-১৮৮০ খ্রিঃ সম্বলপুরে বিদ্রোহ হয় ইংরেজের বিরুদ্ধে। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে চব্বিশ পরগণায় লবণশিল্পে নিযুক্ত মালাঙ্গী, জমিদার ও গোমস্তাদের সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। দাক্ষিণাত্যে ভিজিয়ানাগ্রামের রাজা বিদ্রোহ করেন ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে, তামিলনাড়ুর পলিগাররা ১৭৯০ খ্রিঃ আর পারলেকামেডি ১৮১৩-১৪ খ্রিস্টাব্দে। ত্রিবাঙ্কুরে দেওয়ান ভেলু থাম্পি ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে, মহীশূরের কৃষকগণ ১৮৩০-৩১, গঞ্জামে ১৮৩৫ আর কুর্নুলে ১৮৪৬-৪৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহ করেছিল। বাদ যায়নি পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল। সৌরাষ্ট্রে বিদ্রোহ হয়েছিল একটানা, ১৮১৬ থেকে ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। গুজরাটে কলিসরা অস্ত্রধারণ করে দু’বার। পেশোয়া চূড়ান্তভাবে পরাজিত হবার পর মহারাষ্ট্রে ক্রমাগত বিদ্রোহ হয়েছে একের পর এক। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৮১৮-৩১ খ্রিস্টাব্দে ভীল বিদ্রোহ, ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে সাতারার অভ্যুত্থান এবং ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের গাতকারী বিদ্রোহ। উত্তরে হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। গণবিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটেছিল বিলাসপুরে (১৮০৫) আলিগড় (১৮১৪-১৭) খান্দেশে (১৮৫২)। আর দ্বিতীয় শিখযুদ্ধ তো (১৮৪৮-৪৯) শিখ সৈন্য ও জনসাধারণের যৌথ সশস্ত্র বিদ্রোহ। আর ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে সাঁওতাল বিদ্রোহ কোম্পানির শাসনকে বার বার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছে।

এই সব ধারাবাহিক গণবিদ্রোহগুলি যতই তীব্র হোক না কেন, প্রকৃতিতে এগুলি ছিল আঞ্চলিক এবং পরস্পরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। স্থানীয় অসন্তুষ্টি ও অন্যান্য কারণের জন্য এই সব বিদ্রোহের সৃষ্টি হওয়ায় এর প্রভাবও ছিল সীমিত। এদের চরিত্র ছিল প্রায় একই ধরণের, একই জাতীয় এবং সাধারণ অবস্থা ছিল এগুলির পটভূমি। কোনও সামগ্রিক বা জাতীয় প্রচেষ্টা এগুলির দ্বারা প্রতিফলিত হয়নি। বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দ ছিলেন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিচারে প্রায় সামন্ত শ্রেণি। দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সংস্কারাচ্ছন্ন। আধুনিক সভ্যতা সম্পর্কে এরা ছিলেন উদাসীন অথচ ঐ আধুনিক সভ্যতা তাদের সমাজের প্রতিরোধের দেয়ালগুলি ভেঙ্গে দিয়েছিল। সামাজিক ধারণা ও সংস্কৃতি ছিল অত্যন্ত প্রগতিহীন পুরানো সামাজিক সম্পর্ক ও শাসনের প্রাচীন পদ্ধতিগুলিকে ধরে রাখাই ছিল এদের উদ্দেশ্য। স্বভাবতই এইরকম বিচ্ছিন্ন সমাজ ও বিদ্রোহ ইংরেজ সরকারের মত শক্তিশালী বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে সাফল্য লাভ করতে পারে না। ব্রিটিশ সরকার একের পর এক বিদ্রোহ দমন ও শান্ত করে কোথাও কোথাও বিদ্রোহী নেতাদের বা জমিদারদের পুনরায় তাদের জমিদারীতে স্থাপন করেছিল। শর্ত ছিল বিদেশি শাসনে শান্তভাবে বসবাস করতে হবে। অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের চিরকালের মত সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা হত। বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন অন্যান্য রাজা ও জমিদারদের শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভেলু থাম্পির মৃতদেহটাকেই ফাঁসী দেওয়া হয়েছিল জন সমক্ষে।

এই বিদ্রোহগুলি যেমন তাদের অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের নজির হয়ে আছে তেমনি শাসক গোষ্ঠীর নৃশংসতা ও অমানুষিক দমন নীতিতে কলঙ্কিত হয়ে আছে তাদের ইতিহাস। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি পরায়ণ ও অত্যাচার মূলক শাসননীতি প্রবর্তন এদের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। এদের স্বাতন্ত্র্যবোধকে চূর্ণ করে প্রত্যক্ষভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের আওতায় আনা হয়েছিল। আদিবাসী সর্দারদের জমিদারের স্বীকৃতি দিয়ে প্রবর্তন করা হয়েছিল নতুন রাজস্ব ব্যবস্থা এবং উপজাতি কর্তৃক উৎপাদিত সামগ্রীর উপর ধার্য করা হয়েছিল শুল্ক। এতদিন যেখানে ভূস্বামীর নামমাত্র অধীনতা স্বীকার করে তারা নিজেদের গোষ্ঠীর আদিম রীতিনীতি অনুসারে শাসিত হওয়ার স্বাধীনতা ভোগ করত, এখন থেকে তাদের মেনে চলতে হল দুই প্রভুর প্রভুত্ব— ভূস্বামী ও ব্রিটিশ সরকারের। তাদের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হল। যেহেতু কৃষিকার্য ছিল তাদের প্রধান উপজীবিকা, তাই রাজস্ব নির্ধারণের উপর তাদের কল্যাণ-অকল্যাণ অনেক পরিমাণে নির্ভর করত। এগুলি তাদের মনে বিচ্ছিন্নতাবোধই সৃষ্টি করত বেশি করে।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের পলাশির প্রান্তরে পরাজয়ের পাঁচ বছর পরেই পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই মানুষ প্রতিবাদ প্রতিরোধে সামিল হয়। ১৭৬৫ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত মজনু শাহ ও ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে সন্ন্যাস বিদ্রোহ, ১৭৭৯-৮৪ সালে তিলকা মুরমু-র নেতৃত্বে ভাগলপুর এলাকার সাঁওতাল কৃষকদের বিদ্রোহ প্রাণপণে ব্রিটিশ শক্তিকে বাধা দেয়। তিলকা মুরমু (মাঝি)-র উপর প্রচণ্ড অত্যাচার এবং সর্বশেষে ফাঁসিকাঠে ঝোলানোর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শক্তি বর্বরতার নিদর্শন প্রদর্শন করেও সাঁওতাল কৃষকদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। পরবর্তীকালে ১৭৯৯ সালে রাইপুর, মেদিনীপুর এবং ধলভূমগড় এলাকার আদিবাসী ও অন্যান্য কৃষকদের বিদ্রোহ ইতিহাসে যা চুয়াড় বিদ্রোহ নামে খ্যাত— ব্রিটিশ শাসকদের শক্ত প্রতিরোধের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ১৮২০ সাল থেকে ছোটোনাগপুর এলাকায় কোল, মুণ্ডা এবং হো বিদ্রোহ ছিল ভারতবর্ষের আদিবাসী কৃষকদের খণ্ডখণ্ড কিন্তু গৌরবজনক বিদ্রোহ যা আসলে ছিল ভারতবর্ষে বড়ো ধরনের একটি আদিবাসী বিদ্রোহেরই প্রাক প্রস্তুতি। এই পথ ধরেই বাংলা বিহার সীমান্তের ভাগলপুর ও বীরভূম এলাকার বিস্তীর্ণ বনভূমি এলাকায় সাঁওতাল কৃষকগণ ১৭৯০ সাল থেকেই ধীরে ধীরে বসতি গড়ে তুলতে থাকেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ঐ জঙ্গল এলাকাকে চিহ্নিত করেন দমিন-ই-কো এলাকা হিসাবে। সেখানকার পাহাড়িয়া দুর্ধর্ষ আদিবাসীদের বশে আনতে ব্যর্থ হয়ে ডাক পড়ে সাঁওতাল কৃষকদের। ভাগলপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও ধলভূমগড়, কটর এলাকা থেকে দলে দলে সাঁওতাল কৃষক জঙ্গল সাফ করে বসতি তোলেন। ১৫-২০ বছরের মধ্যে ৪০০ গ্রাম পত্তন করা হয়। জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৮৫০০০। উর্বর কুমারী মাটিতে ফলতে থকে নানান ফসল।


চার

যদি সাঁওতাল বিদ্রোহকে আমাদের এই আলোচনার অন্যতম কেস-স্টাডি রূপে গ্রহণ করি তবে সু-নিশ্চিতভাবেই তার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য ও অবদান আমাদের নজর এড়াবে না। সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৬) ছিল নিঃসন্দেহে পূর্বেকার আদিবাসী-উপজাতি অভ্যুত্থানগুলি থেকে নানা কারণে পৃথক। ভারতে ব্রিটিশ-ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সামরিক অভ্যুত্থানের পূর্বাহ্নে সাঁওতাল জনগণের এই সংগঠিত বিদ্রোহ প্রভাব ও ব্যাপকতায় ভারতীয়দের প্রথম স্বাধীনতার সংগ্রাম বললেও অত্যুক্তি হয় না। দামনে-কোহ অঞ্চলে যখন বন-জঙ্গল হাসিল করে সাঁওতাল আদিবাসীগণ বসত গড়লেন তখন তাদের সরকার থেকে বলা হয়েছিল কোনো খাজনা এর জন্য দিতে হবে না। জন-বসতি স্থাপন করাই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। প্রথমে খাজনা দিতে হবে না বলে ঘোষণা থাকলেও কয়েক বছরের মধ্যে খাজনার বোঝা বাড়তে থাকে। কিন্তু যে ব্যবস্থা উপজাতিদের মনে বিদেশি সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল, তা হল, ইংরেজ শাসনের ছত্র- ছায়ায় আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে যে কোনও বর্ণ ও জাতির বসবাসের ব্যবস্থা। তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এই সব ‘দিকু’ বা বহিরাগতদের (মহাজন, ব্যবসায়ী ইত্যাদি) হস্তক্ষেপের ফলে উপজাতিদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সমস্ত উপজাতিদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় চূড়ান্তভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল কোম্পানির শাসন। বড়ো জমিদার ও কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে উপজাতিদের অসন্তুষ্টির কারণ ছিল এই যে, উপজাতিদের অধিকার অস্বীকার করে তারা জমি বন্দোবস্ত করেছিল ‘দিকু’দের সঙ্গে। অথচ জমি পরিস্কার করে চাষোপযোগী করে তোলার কৃতিত্ব ছিল ঐ সব উপজাতিদের। উপজাতিদের চোখে ঘৃণ্য এইসব বিদেশিরা দু’একটা গ্রাম ঠিকাদারদের পত্তনী দিত। ফলে উপজাতি-গ্রামের সাংগঠনিক কাঠামো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ঠিকাদাররা বা জমির দালালরা আদিবাসী-উপজাতিদের চোখে অপরিসীম বিদ্বেষের পাত্র ছিল। ব্যবসায়ী ও মহাজনরা ছিল সাধারণত হিন্দু, কিন্তু অকল্পনীয় মুনাফা অর্জন ও মহাজনীবৃত্তির জন্য তাদের প্রতি উপজাতিদের ছিল আকণ্ঠ বিতৃষ্ণা। সাথে সাথে ঘোড়া নিয়ে সামান্য পুঁজিকে সম্বল করে বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম, আরা, ছাপরা প্রভৃতি এলাকা থেকে হাজির হয় ছোটো ছোটো ব্যবসায়ী ময়রা ও বানিয়ার দল। হাজির ভাটিখানার মালিক। রেলপথ স্থাপনের জন্য বাইরে থেকে আসা দেশী-বিদেশি ঠিকাদার, কর্মচারীদের অত্যাচার-জোর-জুলুমও কিছু কম ছিল না। এমনকি সাঁওতাল নারীদের অসম্মান করা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল।

পশ্চিম থেকে আসা সুদখোর মহাজন ও নীতিহীন অর্থলিপ্সু বানিয়াদের অত্যাচার ১৮৫০-এর পর থেকেই চরমে উঠেছিল। তারা ধীরে ধীরে পাহাড়তলীর সাঁওতাল এলাকায় পাশাপাশি বসতি গড়ে ব্যবসা শুরু করে অচিরেই তারা সাঁওতাল কৃষকদের সরলতা ও নিরক্ষরতার সুযোগ নিয়ে বাংলা ও হিন্দি বলতে ও বুঝতে না পারার সুযোগে তঞ্চকতার মাধ্যমে বহুগুণ সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। তাছাড়া সাঁওতাল কৃষকগণ খরচের ক্ষেত্রে সচেতন না থাকায় বে-হিসাবি খরচ করে অচিরেই দেনাগ্রস্ত হয়ে মহাজনের শোষণের যাঁতাকলে পড়ে যান। কেনারাম বেচারাম নামক মাপক যন্ত্র, সিঁদুর লাগানো মহাজনী খাতা এবং গণনার কারচুপির কারণে একবার মহাজনের খপ্পরে পড়লে সেখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনও উপায়ই থাকত না। কৃষকের সমস্ত রক্ত জল করা ফসল মহাজন ও ব্যবসায়ীরা লুণ্ঠন করত। এ ভাবেই ৫০ থেকে ৫০০ গুণ সুদ আদায়ের মধ্য দিয়ে অচিরেই সমস্ত জমির মালিকানাও ব্যবসায়ী মহাজনদের করতলগত হয়ে পড়ে। সাঁওতাল কৃষকগণ আবার নূতন এলাকায় গিয়ে জমি হাসিল করার চেষ্টা করে কিন্তু দেনার দায়ে ও চড়া সুদে মহাজনের দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ কৃষকদের পালানোর পথ রুদ্ধ। সে প্রচেষ্টা হলে দারোগা, পেয়াদা ও কোর্টের জজ ও মহুরিদের যোগসাজশে মিথ্যা দেনা ও মামলায় জড়িয়ে সাঁওতাল কৃষকদের দাস হিসাবে বেগার খাটতে বাধ্য করা হত। যে সমস্ত সম্পন্ন সাঁওতাল কৃষক ঋণ নিত না তাদেরও মিথ্যা চুরির কেসে জড়িয়ে সর্বস্বান্ত করা হত। এরূপ নির্যাতন অত্যাচারের মুখে দাঁড়িয়ে সাঁওতাল কৃষকদের মধ্যে প্রতিরোধের পথে বাঁচার পথ খোঁজা শুরু হয়। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর সংগঠিত হয়ে বিদ্রোহ করা ছাড়া কোনও পথ অবশিষ্ট থাকে না। তাই ১৮৫৩-৫৪ সাল থেকেই সাঁওতাল কৃষকগণ গোপনে শলা পরামর্শ করতে থাকেন। সিদ্ধান্তে আসেন বিদ্রোহ করার। এর পূর্বে থানার দারোগা বা ভাগলপুরের ম্যাজিস্ট্রেটকে জানিয়েও কোন সুবিচার পাওয়া যায় নি। কেননা তারা কোম্পানির খাজনা বৃদ্ধি ও আদায়ের ব্যাপারেই ব্যস্ত থাকতেন। সাঁওতালদের দুঃখের কাহিনি শোনা বা প্রতিকারের জন্য সময় দেওয়ার বাসনা বা সময় কোনোটাই ছিল না। তাছাড়া শাসকগণ ব্যবসা ও লুণ্ঠনে সমানভাবে আত্মনিয়োগ করে এলাকায় এক একজন ক্ষুদে নবাবে পরিণত হয়েছিলেন।

ঔপনিবেশিক শ্বেতাঙ্গ-প্রভুদের আশ্রয়পুষ্ট জমিদার ও মহাজনদের বশংবদ, ইংরাজ সরকারের আজ্ঞাবাহী পুলিশ-দারোগার অত্যাচারই প্রাথমিক ভাবে এই বিদ্রোহের জন্মদাতা। ১৮৫৪ সালেই ঝড়ের পূর্বাভাস দেখা দিয়েছিল। লক্ষ্মীপুরের সাসানের পরগণাতে একজন প্রভাবশালী সাঁওতাল নেতা বীর সিং-এর নেতৃত্বে অত্যাচারিত সাঁওতালরা ধনী ও অত্যাচারী জমিদার- মহাজনদের বাড়িতে লুণ্ঠন শুরু করে। যদিও এর কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ ছিল না। বীর সিং-কে পাকুড় রাজ এস্টেটের দেওয়ান জগবন্ধু রায়ের কাছারি বাড়ি ডেকে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের জরিমানা এবং প্রকাশ্যে সর্বসমক্ষে জুতোপেটা করা হয়। ওখানকার কুখ্যাত দারোগা মহেশলাল দত্ত জমিদারদের হুকুমে সাঁওতাল মুখিয়া যুবকদের ধরপাকড় শুরু করলে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। সাঁওতালগণ প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

১৮৫৫ সালের গোড়ায় বীরভূম, বাঁকুড়া, ছোটোনাগপুর ও হাজারিবাগ থেকে ৬/৭ হাজার সাঁওতাল দামনে-কোহে জড়ো হয়। তাদের অভিযোগ যে ডাকাতির জন্য তাদের সহকর্মীদের শাস্তি দেওয়া হল, অথচ যে সব জমিদার মহাজনদের অত্যাচার ও শোষণের ফলে তারা আইন ভঙ্গ করেছে, তাদের কোনো বিচার হল না। তাই সাঁওতাল সমাজ গোপন সভায় হুল বা বিদ্রোহের অঙ্গীকার করে তাদের উপর অত্যাচার, দুর্ব্যবহার ও অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের শেষ পন্থা রূপে। এই সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে শালগাছের পাতা সহ ডালকে বিদ্রোহের প্রতীক রূপে সমস্ত সাঁওতাল গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হল। এই সময়কালেই একদিন জুন মাসে (১৮৫৫) মহেশ দারোগা সাতকাঠিয়া গ্রামে গিয়ে সাঁওতালদের গ্রেপ্তার করে আর নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে গাছে বেঁধে চাবুক মারে। এরকম অত্যাচার ও অবিচারের চূড়ান্ত পরিণতিতে ১৮৫৫ সালের জুন মাসের ৩০ তারিখে শাল গিরার ডাকে ৪০০ গ্রাম থেকে প্রায় ১০, ০০০ সাঁওতাল জড়ো হন ভগনাডিহির উঁচু টিলায়। সেখানে সিধু-কানু ভাষণে সমস্ত বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন। সিদ্ধান্ত হয় কলকাতায় বড়োলাটকে খবর দেওয়ার। তাছাড়া বীরভূম এবং ভাগলপুরের ম্যাজিষ্ট্রেট ও থানার দারোগাদেরকেও জানানো হয়। ১৫ দিন সময় দিয়েও জবাব আসেনি। উপরন্তু সাঁওতালগণ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে জেনে দিঘি থানার মহেশ দারোগা সিধু-কানুকে গ্রেপ্তার করতে আসেন। জুলাই মাসের ৭ তারিখ মিথ্যা মামলায় সিধু ও কানুকে গ্রেপ্তার করতে গেলে মহেশ দারোগা, কেনারাম ভকত সহ ৯ জন বরকন্দাজ সাঁওতালদের হাতে নিহত হন। এরপর বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে একদল ভাগলপুর অপরদল কলকাতার দিকে পদযাত্রা শুরু করেন। ভারতীয় জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে এটাই ছিল সম্ভবত প্রথম গণ পদযাত্রা।

বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার অন্তত ১২টি জেলায় সাঁওতাল বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। সিধু-কানু বিদ্রোহ ও যুদ্ধ পরিচালনায় যতই অনভিজ্ঞতার ও অপরিণামদর্শতিার প্রমাণ রাখুন না কেন, তাঁদের ঘোষিত বিদ্রোহের-সনদ আদিবাসী এলাকার সমস্ত স্তরের শ্রমজীবী জনসাধারণকে বিদ্রোহে কোনো না কোনো ভাবে সামিল করেছিল। এদের মধ্যে কামার, কুমোর, তেলি, গোয়ালা, চামার, ভুঁইয়া, বাগদি, হাড়ি, ডোম ইত্যাদি নিম্নবর্গের হিন্দুরা ছাড়াও মুসলমানদের মধ্যে মোমিন, জোলারাও অস্ত্র নিয়ে না হলেও বিদ্রোহে সহযোগিতা করেছিল বলে সমসাময়িক সংবাদ-পত্রিকায় জানানো হয়েছে। (দ্রষ্টব্য ক্যালকাটা রিভ্যু, ১৮৫৬) এভাবেই সাঁওতাল বিদ্রোহ কালক্রমে শ্রেণিসংগ্রামের রূপ নেয়। ঐতিহাসিক বিনয়ভূষণ চৌধুরী ও রণজিৎ গুহ তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে বিদ্রোহকে সংগঠিত করার এই সূচনা-পর্বে নেতৃবৃন্দ সাঁওতাল ঐতিহ্যানুসারী লোকাচার ও ধর্মীয়-সংস্কারকে ব্যবহার করেছিলেন, যার উপকার ও অপকার বা সুবিধা ও অসুবিধা উভয়ই ঘটেছিল। বস্তুত সাঁওতাল বিদ্রোহ দেখিয়েছিল যে ধর্মের নাম করে জড়ো হওয়ার পরিণাম মোটেই ভালো হয় না। কিন্তু কিছুই সে সময় করার ছিল না। পুরানো ধরণের প্রতিবাদী বহু কৃষক আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তি যে ধর্মের ব্যবহার ছিল তার প্রমাণ দেশে-বিদেশে প্রভূত রয়েছে। তথাপি কিছুতেই বিদ্রোহ দমন করতে না পেরে দানাপুর থেকে সেনা এনে, হিল রেঞ্জার্স বাহিনী নিয়োগ করে গোটা সাঁওতাল এলাকাকে ঘিরে ফেলা হয়। এতেও সুফল না পেয়ে ১০ই নভেম্বর তারিখে যুদ্ধ আইন অর্থাৎ “মার্শাল ল” জারি করা হয়। অর্থাৎ দেখামাত্র গুলি ও সমস্ত গ্রামকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করার বর্বর অভিযান শুরু হয়। এতেও বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ না করে বীরের মত জীবন দেন। ব্রিটিশ সেনানায়ক মেজর জার্ভিস অবাক হয়ে তির-ধনুক নিয়ে উন্নত অস্ত্রের সাথে লড়াইকে অসমসাহসিক লড়াই বলে ডায়েরিতে লিখে গেছেন। তিনি এটাকে অসম যুদ্ধ এবং বর্বর গণহত্যা বলেছেন। উন্নত সভ্যতার দাবিদার ব্রিটিশ বাহিনী সমস্ত যুদ্ধ আইন লঙ্ঘন করে এভাবে নৃশংসতা ও বর্বরতার নজির রেখে গেছে। এটা যুদ্ধের ইতিহাসে গণহত্যার কলঙ্কতম নজির হয়ে থাকবে। অবশেষে ৩০ হাজার মানুষের গণহত্যা ও সিধুকে গুলি করে খুন ও কানুকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে রাখার জঘন্য ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাস সৃষ্টির এগুলি জঘন্যতম দৃষ্টান্ত।

পাঁচ

প্রায় একশত বছরের ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রান্তের আদিবাসী ও কৃষকদের বিদ্রোহগুলি ধীরে ধীরে ভারতবাসীর স্বাধীনতা স্পৃহাকে উজ্জীবিত করে তুলেছিল। এ বিদ্রোহগুলির রসদ সংগ্রহ করেই পরবর্তীকালে যুবসমাজের মধ্যে আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা ও সংগঠন গড়ে স্বাধীনতা পাওয়ার স্বপ্ন মুখরিত হতে থাকে। বিকৃত নামে অভিহিত করা বা মুছে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা হয়েছে, বশংবদ ঐতিহাসিকদের দিয়ে নিজেদের মনোমত স্বার্থবাহী ইতিহাস লেখানো হয়েছে, তবুও ব্রিটিশরা জনমন থেকে বিদ্রোহগুলিকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে পারে নি। নিজেদের অজান্তেই তারা ইতিহাসের অনেক উপাদান নথিপত্রে রেখে গেছে। এ থেকেই আমাদের গবেষকদের নূতন ইতিহাস খুঁজে বের করতে হবে যা সত্যিকারের জনগণের সংগ্রামের ইতিহাস। নূতন প্রজন্মের শিক্ষার জন্য অতীত মিথ্যা ইতিহাস ছুঁড়ে ফেলে নূতন ইতিহাস লেখা শুরু হোক। তাহলেই সাঁওতাল বিদ্রোহের মত বিভিন্ন ইতিহাসের সঠিক অবস্থানের মূল্যায়ন করা সম্ভব। ভারতীয় ঐতিহাসিকেরা সাঁওতাল বিদ্রোহের ঘটনার অবমূল্যায়ন করলেও মহান দার্শনিক কার্ল মার্কস তাঁর A Notes on Indian History গ্রন্থে সাঁওতাল বিদ্রোহ সম্পর্কে উল্লেখ করতে ভুল করেননি।

সমস্ত উনিশ শতক ধরে সারা ভারত জুড়ে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন উপজাতিদের সশস্ত্র অভ্যুত্থান। এই বিদ্রোহগুলি যেমন তাদের অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের নজির হয়ে আছে তেমনি শাসক গোষ্ঠীর নৃশংসতা ও অমানুষিক দমন নীতিতে কলঙ্কিত হয়ে আছে তাদের ইতিহাস। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি পরায়ণ ও অত্যাচার মূলক শাসননীতি প্রবর্তন এদের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। এদের স্বাতন্ত্র্যবোধকে চূর্ণ করে প্রত্যক্ষভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের আওতায় আনা হয়েছিল। আদিবাসী সর্দারদের জমিদারের স্বীকৃতি দিয়ে প্রবর্তন করা হয়েছিল নতুন রাজস্ব ব্যবস্থা এবং উপজাতি কর্তৃক উৎপাদিত সামগ্রীর উপর ধার্য করা হয়েছিল শুল্ক। এতদিন যেখানে ভূস্বামীর নামমাত্র অধীনতা স্বীকার করে তারা নিজেদের গোষ্ঠীর আদিম রীতিনীতি অনুসারে শাসিত হওয়ার স্বাধীনতা ভোগ করত, এখন থেকে তাদের মেনে চলতে হল দুই প্রভুর প্রভুত্ব— ভূস্বামী ও ব্রিটিশ সরকারের। তাদের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হল। যেহেতু কৃষিকার্য ছিল তাদের প্রধান উপজীবিকা, তাই রাজস্ব নির্ধারণের উপর তাদের কল্যাণ-অকল্যাণ অনেক পরিমাণে নির্ভর করত। কিন্তু যে সব নীতি নির্ধারিত হত, সেগুলি তাদের মনে বিচ্ছিন্নতাবোধই সৃষ্টি করত বেশি করে। যে ব্যবস্থা উপজাতিদের মনে বিদেশি সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল, তা হল, ইংরেজ শাসনের ছত্র-ছায়ায় আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে যে কোনও বর্ণ ও জাতির বসবাসের ব্যবস্থা। তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এই সব ‘দিকু’ বা বহিরাগতদের (মহাজন, ব্যবসায়ী ইত্যাদি) হস্তক্ষেপের ফলে উপজাতিদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজস্ব ও অরণ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে অরণ্যের উপর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ ও অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ‘ঝুম’ চাষের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার গরিব আদিবাসীরা চাষের অভাবে অন্নকষ্টের সম্মুখীন হল। ‘ঝুম’ চাষে গবাদিপশু বা সার ইত্যাদির প্রয়োজন হত না কারণ অকর্ষিত জমিতে একবার মাত্র শস্য উৎপাদন করেই আবার অন্য কোনও অকর্ষিত জমি চাষ করা হত।

সমস্ত উপজাতিদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় চূড়ান্তভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল কোম্পানির শাসন। বড়ো জমিদার ও কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে উপজাতিদের অসন্তুষ্টির কারণ ছিল এই যে, উপজাতিদের অধিকার অস্বীকার করে তারা জমি বন্দোবস্ত করেছিল ‘দিকু’দের সঙ্গে। অথচ জমি পরিস্কার করে চাষোপযোগী করে তোলার কৃতিত্ব ছিল ঐ সব উপজাতিদের। উপজাতিদের চোখে ঘৃণ্য এইসব বিদেশিরা দু’একটা গ্রাম ঠিকাদারদের পত্তনী দিত। ফলে উপজাতি-গ্রামের সাংগঠনিক কাঠামো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ঠিকাদাররা বা জমির দালালরা ছিল সাধারণত মুসলমান এবং তারা অপরিসীম বিদ্বেষের পাত্র ছিল উপজাতিদের চোখে। ব্যবসায়ী ও মহাজনরা ছিল সাধারণত হিন্দু, কিন্তু অকল্পনীয় মুনাফা অর্জন ও মহাজনীবৃত্তির জন্য তাদের প্রতি উপজাতিদের ছিল আকণ্ঠ বিতৃষ্ণা। অনেক উপজাতি ভূমিহীন মজুরে পরিণত হয়েছিল। অসহনীয় আর্থিক অনটন ও কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে কাটাতে এই নিষ্ঠুর ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্তি লাভের জন্য তারা প্রস্তুত হচ্ছিল সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্য। এইসব কারণেই সমস্ত উনিশ শতক ছিল ইংরেজের বিরুদ্ধে উপজাতিদের গণজাগরণ, গণআন্দোলন, গণবিপ্লবের ইতিহাস। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে পালামৌ-এ চেরো অভ্যুত্থান, ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে সিংভূমে হো-দের বিক্ষোভ, ১৮২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে একটানা ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোল বিদ্রোহ, ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে সাঁওতাল বিদ্রোহ কোম্পানির শাসনকে বার বার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছে।

অধ্যাপক সুমিত সরকারের মতে, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পর উপজাতি অভ্যুত্থান দুটি নতুন বৈশিষ্ট্যে গড়ে উঠেছিল। প্রথম, অরণ্যের অধিকারের উপর গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। দুই, বিদ্রোহের মূল ভূমিকা থেকে সরে যাচ্ছিল ঐতিহ্যগত প্রধান বা সর্দাররা। তাদের স্থান অধিকার করছিল ধর্মীয় নেতারা যারা সম্প্রদায়কে উজ্জীবিত করার জন্য এবং অলৌকিক পরিবর্তনের দ্বারা প্রত্যাশিত স্বর্ণযুগের আশায় অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় সামাজিক পরিবর্তনের উপর জোর দিচ্ছিল বেশি করে।

এই অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে এবং ‘সর্দার’-দের নেতৃত্বে প্রাথমিক আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার ফলে ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্বে প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছিল ‘ত্রাণকর্তাদের’, যারা প্রায়ই হিন্দু অথবা খ্রিস্টান ধর্ম থেকে উপাদান সংগ্রহ করতে আন্দোলনকে উজ্জীবিত করতে। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সাঁওতাল-বিদ্রোহের ব্যর্থতার পর ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে খারওয়াররা আবার বিদ্রোহ করে। ‘একেশ্বরবাদ’ প্রচার ও সামাজিক সংস্কার মুখ্য উদ্দেশ্য হলেও এই বিদ্রোহ ক্রমশই কৃষিসম্পর্কিত বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিচ্ছিল। দক্ষিণ-রাজস্থান এবং উত্তর-পশ্চিম গুজরাট ছিল আদিবাসী অসন্তোষের দুটি অঞ্চল। ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দের গুজরাটের পাঁচমহলের নাইকদা অরণ্যের উপজাতিরা থানা আক্রমণ করে ‘ধর্মরাজ্য’ স্থাপনের উদ্দেশ্যে। এখানে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের নেতা রূপ সিং গোবর ধর্মীয় নেতা জোরিয়ার-এর সঙ্গে এই আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছিল।

উপজাতি অভ্যুত্থানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অঞ্চল ছিল গোদাবরী নদীর উত্তরে ‘ভিজাগাপত্তম্ এজেন্সী’। এখানকার কয়া, কোণ্ডা, ডোরা, কোন্দ প্রভৃতি উপজাতি ‘পদু’ চাষের উপর নির্ভরশীল ছিল। ইতিপূর্বে ১৮৪০, ১৮৪৫, ১৮৫৮, ১৮৬১ ও ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহগুলি পরিচালিত হয়েছিল মনসবদারদের বিরুদ্ধে। পার্বত্য সর্দাররা এই সব বিদ্রোহ পরিচালনা করে। ব্রিটিশ সরকার ‘মুত্তাদার বা প্রধানদের সঙ্গে রাজস্বের বন্দোবস্ত করে তাদের কিছু ‘ছাড়’ দেওয়ার বিনিময়ে প্রয়োগ করল অরণ্য-আইন। কিন্তু এর ফলে অসন্তোষ কমল না। মুত্তাদাররা সরকারের সহযোগীতে পরিণত হওয়ায় ধর্মীয় বাতাবরণে পুষ্ট এক নতুন নেতৃত্বের উদ্ভব হল। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে যে বিদ্রোহ হয় তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল সুরলা রামান্না এবং রাজানা অনন্তায়। প্রথম জন একজন উপজাতি যুবক এবং প্রাক্তন কনেষ্টবল, অপরজন শিক্ষক। তাঁরা দাবি করলেন যে, তারা উভয়ে যথাক্রমে রাম এবং হনুমানের অবতার এবং তাদের বিদ্রোহী অনুগামী উপজাতিরা হল ‘রাম দণ্ডু’ বা রামের বাহিনী।

তবে পূর্ব-ভারতে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্বে বিরসা মুন্ডার বিদ্রোহতে যদিও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক চেতনার অভাব ছিল এবং বিরসাও তাঁর পূর্বসূরী সিধু-কানু-র মতন দেবতার নাম নিয়ে বিদ্রোহ শুরু করেছিল, কিন্তু তাতে চল্লিশ বছর আগের মতন ততটা কুসংস্কার-নির্ভরতা ছিল না। এটা নিশ্চিত ভাবেই উত্তরণ। যেমন ১৮৩০-এর ওয়াহাবি-ফরাজি থেকে ১৮৮০-র মালাবারে মোপলা বিদ্রোহে ইসলাম ধর্মের ব্যবহার সত্ত্বেও তা ছিল নতুন শ্রেণি-চেতনায় জাগরণ, তেমনি ১৮৫৫-৫৬-এর সাঁওতাল বিদ্রোহের ভুল-ভ্রান্তি কাটিয়ে ইংরাজি-স্কুলে পাঠ নেওয়া নব্য-যুবক বিরসা নিজের সমাজকে শিক্ষিত করতে চেয়েছিল, আনতে চেয়েছিল যুগোপযোগী নতুন সংস্কার যা আত্ম-শক্তিবৃদ্ধির সহায়ক হবে। এর সঙ্গে বোধহয় তুলনীয় চীনে ১৮৫০-এর দশকের তাইপিং বিদ্রোহের পশ্চাদপদতা ঝেড়ে ফেলে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের বক্সার বিদ্রোহের বাস্তবতাকে গ্রহণ করার ঘটনা।

মুন্ডা অঞ্চলে ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে নূতন নায়ক আবির্ভূত হল। উজ্জ্বল মুখাবয়ব, একুশ বছরের যুবক বিরসা মুন্ডার জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৮৭৪। রাঁচি জেলার তামার থানার অর্ন্তগত চালকাদ গ্রামের এক মুন্ডা সর্দার তার পিতা। বিরসা চাইবাসার জার্মান মিশন স্কুলে বাল্যের শিক্ষা সমাপ্ত করে ক্যাথলিক গীর্জার বিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যান। স্কুলে পড়াশোনার সময়েই বিরসার মনে হয় কোলদের উন্নতি করতে গেলে কুসংস্কার দূর করতে হবে এবং দীর্ঘকালের শোষণ উৎপীড়নের অবসান ঘটবে। স্কুলে থাকার সময়েই বিরসা কোল জাতির ধর্ম ও প্রচলিত হিন্দুধর্মের সঙ্গে নবলদ্ধ খ্রিস্টান ধর্মের মিশ্রন ঘটিয়ে এক নূতন ধর্মমত গড়ে তোলেন। তাঁর এই নূতন ধর্মমতের উদ্দেশ্য ছিল মুন্ডা সমাজের ওপর থেকে রোমান পুরোহিত ও খ্রিস্টান পাদ্রী এই দুই সম্প্রদায়ের ধর্মযাজক তথা ধর্মের নামে শোষকদের দুষ্ট প্রভাব নষ্ট করা। বিরসা প্রচার করেন ‘শিংবোঙ্গা’ স্বয়ং তাঁর মারফৎ বাণী পাঠিয়েছেন যে এখন থেকে বহু দেবতার বদলে কেবল একজন দেবতাকেই মুন্ডাদের মেনে পূজা করতে হবে। মুন্ডারা জীবজন্তুর মাংস ভক্ষণ ত্যাগ করবে, সৎ জীবনযাপন করবে। সবরকমের কুসংস্কার ত্যাগ করে, সুন্দর, নির্মল ও পবিত্র চরিত্র গঠন করবে, আর হিন্দুদের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মত গলায় ‘জানে’ অর্থাৎ পবিত্র সূত্র ধারণ করবে। প্রধান দেবতা শিং বোঙ্গার নির্দেশ হল, তাঁর পূজা মুন্ডারা নিজেরাই করবে এর জন্য পুরোহিত ডাকতে হবে না। শিং বোঙ্গার এই নির্দেশ জানতে পেরে মুন্ডা সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাণের সাড়া জেগে উঠল। তাদের মধ্যে এক ব্যাপক গভীর সামাজিক আলোড়ন দেখা দিল। ‘সংস্কৃতায়নে’-র বাস্তব রূপ বিরসার আন্দোলনেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। শতশত মুন্ডা যুবক বিরসার নবমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে নতুন চেতনায় উদ্‌বুদ্ধ হল। তারা দলে দলে বিরসার গ্রামে সমবেত হল এবং তরুণ নায়ককে ভগবানের মত পূজা করতে লাগল। বিরসা হলেন বিরসা ভগবান, মুন্ডা ভাষায় ‘ধাত্ব আবা’ অর্থাৎ বিশ্বের পিতা। বিরসা তাঁর নতুন বাণী জমিদারদের খাজনা, বেগার খাটা প্রভৃতি বন্ধ করার জন্য শিষ্যদের ছোটো ছোটো দলে ভাগ করে গ্রামে গ্রামে প্রচারক দল পাঠালেন। তাঁর নির্দেশে বিদ্রোহের দিন মুন্ডাদের জানিয়ে দেওয়া হল। ওই দিন হল ‘প্রলয়ের দিন’ সকল মুন্ডাকে নবসাজে সেজে অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে বিরসার গ্রাম চালকাদে সমবেত হতে হবে।

অবশেষে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে একটি আইন পাস করে জমি ও বনভূমির উপর মুন্ডাদের প্রাচীন অধিকার স্বীকার করা হল। লেঃ গভর্নর উডবাণ সাহেব এসে ঘোষণা করে যে মুন্ডাদের প্রাচীন অধিকার রক্ষা করা হবে। জমিদাররা কোনোদিন ওই আইন মেনে চলেনি। আইন রক্ষার্থে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে শীতের ফসল হল না। কারও ঘরে এক মুঠো শস্য উঠল না। আবার এক দুর্ভিক্ষের ছায়া ঘনিয়ে এল। জমিদারগণ খাজনা মেটাতে না পারার জন্য চাষীদের নিঃস্ব করতে লাগল। বিরসা অভয়দানের জন্য প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেই ‘দিকু’ দস্যুদের তাড়াতে পারলেই মুন্ডারা বাঁচবে একথা তারা বুঝেছিল। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের খ্রিস্টমাস পর্বের পূর্বদিন বিদ্রোহের দিন স্থির করা হল। মুন্ডারা ওইদিন নিজ নিজ তির ধনুক, বল্লম প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুন্ডা অঞ্চলের রাজা, হাকিম, জমিদার, জায়গিরদার, ব্রাহ্মণ, ঠিকাদার, খ্রিস্টান পাদ্রি শোষক এবং অত্যাচারীদের আক্রমণ করবে ও হত্যা করবে। বিরসা বললেন, “এইসব শয়তানকে হত্যা করলেই এই দেশ আমাদের হবে। জমির মালিক আমরাই হব।”

ওই বছরের খ্রিস্টমাস পর্বের দিন কয়েক আগেই বিরসার বিশ্বস্ত অনুচরগণের এক একজনকে বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হল। তারা তানা, কুঁটি, তামা, বাসিয়া, রাঁচি প্রভৃতি অঞ্চলে জমিদারদের কুঠি, মন্দির, গীর্জা, খামার, থানা, আদালত প্রভৃতির উপর আক্রমণ আরম্ভ হল। বহু জমিদারী কর্মচারী, পুরোহিত, পাদ্রী, চৌকিদার নিহত হল। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ৭ জানুয়ারি তিনশত মুন্ডা যুবক তির ধনুক, বল্লম, টাঙ্গি, খড়গ প্রভৃতি নিয়ে খুন্তির থানার উপর আক্রমণ করে। কনস্টেবলগণ প্রতিরোধ করলেও নিহত বা গুরুতর রূপে আহত হয়। বিদ্রোহীরা থানায় অগ্নিসংযোগ করে। খবর পাওয়ামাত্র পুলিশের কমিশনার ও ডেপুটি কমিশনার দারেন্দার সামরিক ঘাঁটি থেকে ১৫০ জন সৈন্য ও সশস্ত্র পুলিশবাহিনী নিয়ে হাজির হয়। এরপর খুস্তির নিকটবর্তী দুমারী পাহাড়, জানুমপিড়ি প্রভৃতি অঞ্চল থেকে শত শত মুন্ডা বিরসার নেতৃত্বে নিকটবর্তী বনাঞ্চলে সমবেত হল। ৯ জানুয়ারি সকালে পুলিশ কমিশনার সৈন্য ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের আদেশ দিয়ে অগ্রবর্তী হল তখন শত শত বিষাক্ত তির ছুটে এল পুলিস ও সৈন্যবাহিনীর দিকে। বহু পুলিশ, সৈন্য আক্রান্ত হলে তারাও অবিশ্রান্ত ধারায় গুলিবৃষ্টি করল। বিরসা মুন্ডা যুবকদের নিহত হতে দেখে যুদ্ধে বিরতি দিয়ে অরণ্যে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। আহত ও নিহত মুন্ডা যুবকদের মধ্যে তিনটি বীরবেশ সজ্জিত মুন্ডা যুবতীর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল।

বিরসামুন্ডার বিদ্রোহী বাহিনীর সঙ্গে ইংরেজ সৈন্য ও পুলিসবাহিনীর যুদ্ধ প্রায় দু’মাস স্থায়ী হয়েছিল। ধীরে ধীরে বিদ্রোহের আগুন স্তিমিত হয়ে এল। শতাধিক অনুচর সমেত বিরসা গ্রেপ্তার হলেন। শুরু হল বিচার। তা শেষ হওয়ার আগেই বিদ্রোহী নায়ক বিরসা মুন্ডা মাত্র আটাশ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বহুদিন পরে অন্যান্য বিদ্রোহীদের বিচার শেষ হল। বিচারে দু’জনের ফাঁসি, বারোজনের দ্বীপান্তর এবং তিয়াত্তর জনের পাঁচ থেকে দশ বছরের সশ্রম কারাদন্ড হয়। এতদিন পর্যন্ত ইংরেজ সরকার আদিবাসী চাষীদের ভার জমিদার-মহাজনদের হাতে অর্পন করে নিশ্চিন্ত ছিল। এইবার তাদের টনক নড়ল। সরকার মুন্ডা অঞ্চলের সমস্ত জমি জরীপ করে, জমি ও বনভূমির উপর মুন্ডাদের অধিকার আংশিকভাবে স্বীকার করে নিল। এছাড়া জমিদারের জমিতে আদিবাসীদের জোর করে বেগার খাটানো সাময়িকভাবে বন্ধ হল।

ছয়

ঔপনিবেশিক ভারতে উনিশ শতকের কৃষক বিদ্রোহগুলির কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে। কৃষক বিদ্রোহগুলির মধ্যে কোনও রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল না। এই বিদ্রোহগুলির মূল ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক অসন্তোষ। এগুলি সংঘটিত হয় বিদেশি নীলকর, দেশী জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে। কোনও বিশেষ ক্ষোভ বা অসন্তোষ দূর করাই ছিল উদ্দেশ্য, যা কখনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিণত হয়নি। বিদ্রোহগুলির ব্যাপ্তি ছিল সীমিত। শোষণ ও শাসনব্যবস্থার অবসানও তাদের মনে স্থান পায় নি। সর্বত্র কৃষকদের লক্ষ্য ছিল ঋণপত্র, দলিল প্রভৃতি ধ্বংস করে ফেলা, কারণ তারা জানত, ঐগুলিই তাদের শোষণে সাহায্য করে। একমাত্র মোপলা বিদ্রোহ ছাড়া দাক্ষিণাত্যের অন্যান্য কৃষকবিদ্রোহ প্রাণহাণির সংখ্যা ছিল কম। ‘ডেকান রায়ট কমিশনের’ রিপোর্ট বলে যে, দাক্ষিণাত্যের কুন্‌বি কৃষকরা দুর্ধর্ষ হলেও আইনের প্রতি তাদের স্বাভাবিক আনুগত্য তাদের সংযত রেখেছিল। বিভিন্ন বিদ্রোহগুলির মধ্যে কোনও যোগাযোগও ছিল না। অভীষ্ট সিদ্ধ হলেই কৃষক-সম্প্রদায়ের ঐক্য শিথিল হয়ে পড়ত। ফলে নীলবিদ্রোহ, পাবনার কৃষক আন্দোলন বা দাক্ষিণাত্যের বিদ্রোহী রায়তরা কোন উত্তরাধিকারী রেখে যেতে পারে নি। এই কারণে কৃষক বিদ্রোহগুলি কখনোই ইংরেজ প্রভুত্বের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় নি। যখনই মাত্রাতিরিক্ত এবং অসহনীয় অত্যাচার তাদের অস্তিত্বকে বিলুপ্ত করতে উদ্যোগী হত তখনই তারা বিদ্রোহ করত।

আর একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যা রণজিৎ গুহ এলিমেন্টারি আসপেক্টসের দ্বিতীয় উপাদান দ্ব্যর্থকতা বা (ambiguity)-তে বর্ণিত। যার ফলে আদিবাসী ও কৃষক-আন্দোলনকে ডাকাতি বা লুঠেরাদের কাজ বলে উল্লেখ করা হত। দুর্ভিক্ষকালে দুর্ভিক্ষতাড়িত মানুষের অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেত আকস্মিকভাবে। কেননা ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে এটাই ছিল অস্তিত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা। বিভিন্ন অপরাধের মধ্যে ডাকাতি ছিল প্রায় অনিবার্য একটি ঘটনা এবং জড়িত মানুষেরা কেউই সাধারণ দাগী আসামী নয়। অনেকক্ষেত্রে গোটা গ্রামই সংঘবদ্ধ লুঠতরাজে লিপ্ত হয়ে পড়ত। একে বলা যেতে পারে সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ জীবনের দুষ্কৃতায়ন। উড়িষ্যাতে এমনটি ঘটেছিল। উড়িষ্যার কমিশনার নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে নিঃস্ব মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র পথ ছিল তস্করবৃত্তি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল তুলনামূলকভাবে অরক্ষিত শস্যের গোলা বা দোকানগুলি, আঞ্চলিক জমিদার বা মহাজনেরা যেগুলির মালিক ছিল। ‘Deccan Riot (দক্ষিণাত্যের দাঙ্গা)’ রূপে ব্রিটিশ প্রশাসন একে অভিহিত করে। মাদ্রাজে ১৮৭৬-৭৮ সালে রাতের অন্ধকার নামলেই ক্ষুধার্ত মানুষ বেরিয়ে পড়ত ধনী চাষী ও ব্যবসায়ীদের গোলা বা চালকল লুঠ করত। ঐ সময় ডাকাতির প্রকোপ এত বেড়ে গিয়েছিল যে পুলিসের Inspector General এই ঘটনাগুলিকেই ঐ আকালের বছরের সবচেয়ে বড়ো অপরাধ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। ১৮৭৭ সালের প্রথম ছয় মাস সময়কালে মাসিক ১০০ থেকে ১৫০টি করে ডাকাতি হয়েছিল। জুলাই এবং আগস্ট মাসে এমনকি এই হারও দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। কেননা তখন আরও একটি শুখা মরসুমের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। আক্রমণকারীরা ছিল প্রধানত নিম্ন-জাতের কৃষি-শ্রমিক।

ভারতের কৃষক-বিদ্রোহের ইতিহাসে উপজাতীয়-আদিবাসীদের সংগ্রাম যে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে তাতে আজ আর কোনও সন্দেহ নেই। ঔপনিবেশিক শাসন, জমিদার, মহাজন ও ইজারাদারদের শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রান্তের পর্বত-অরণ্যচারী উপজাতীয়গণ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকেই সংগ্রাম শুরু করে। এই সংগ্রামগুলির সঙ্গে দীর্ঘকাল পর্যন্ত জাতীয় আন্দোলনের কোনো যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি। এছাড়া উল্লেখ করতে হয় মালাবারের মোপলা বিদ্রোহের কথা। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত কেরলের মোপলা কৃষকগণ আত্মরক্ষার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল ধারাবাহিকভাবে। ইংরেজ সরকার, মহাজন ও জমিদার— এই ত্রিমুখী শোষণের বিরুদ্ধে মালাবারের ওয়ালুভানাদ এর এরনাদ তালুক জুড়ে প্রায় দশলক্ষ মোপলা কৃষক সাধারণ হাতিয়ার নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে জমিদার ও মহাজনদের রক্ষার জন্য ব্রিটিশবাহিনী তাদের সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে। এমনকি স্থায়ীভাবে একটি ব্রিটিশ বাহিনী এই অঞ্চলে স্থাপিত হয়। তথাপি মোপলা বিদ্রোহীরা যখনই শক্তি সঞ্চয় করতে পারত, তখনই গেরিলা পদ্ধতিতে আঘাত হানত শত্রুর উপর। এরা ছিল চির-বিদ্রোহী। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মোপলা কৃষকগণ শেষবারের মত বিদ্রোহ করে। কিন্তু তখন তারা গান্ধিজির নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে নিজেদের জাতীয় রাজনীতির সংগে সংযুক্ত করে ফেলেছিল।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে যখন জাতীয় কংগ্রেস কিছুটা কৃষকমুখী হয়ে উঠছে গান্ধির প্রভাবে ও নেতৃত্বে এবং বিভিন্ন প্রদেশে প্রধানত উদারনৈতিক পেটি-বুর্জোয়া রায়ত চাষীদের নেতৃত্বে কৃষক সংগঠন বা প্রজা আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করছে— তখন আদিবাসী কৃষক সমাজ — যারা নানা কারণে উত্তরবঙ্গের সমতলে বসতি স্থাপন করেছিল— তারাও এই মূল জাতীয় স্রোতে সামিল হতে শুরু করে। গান্ধিজির নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনে ততটা না হলেও আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০-৩৩) থেকেই দেখা যায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা বিরোধী সংগ্রামে আদিবাসী কৃষক সমাজের অংশগ্রহণ।

অবিভক্ত বাংলায় দিনাজপুর জেলার পাথরঘাটা, মেহেন্দীপাড়া, জগন্নাথপুর গ্রাম উথলি গ্রামের সাঁওতালগণ আইন অমান্য আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামিল হয়। ওই অঞ্চলের আন্দোলনে সাঁওতালদের নেতৃত্ব দেয় জগন্নাথপুর গ্রামের মঙ্গল টুডু এবং উথলি গ্রামের জেদারাম প্রধান ও পল্টন টুডু। কিন্তু ১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলন এই জেলার আদিবাসীদের মধ্যে কংগ্রেসের নির্দেশ মতো অহিংস থাকেনি। ওই সময় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মধ্যে খাজনা না দেবার আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে চৌকিদারি ট্যাক্স আদায় করা সম্ভব হয় না। ১৯৩০ সালের অক্টোবরে পতিরাজ অঞ্চলে সশস্ত্র সাঁওতালদের বড়ো মিছিল চৌকিদারি ট্যাক্স আদায় বন্ধ করে দেয়। ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় মাতলা সাঁওতাল, ললিয়া ওঁরাও, বুধে ওঁরাও, বৈদ্যনাথ ওঁরাও, সোমড়া ওঁরাও, গাডেরাম ওঁরাও প্রমুখ সাঁওতালগণ। West Dinajpur District Gagetteer-এ বলা হয়েছে, “The secret reports mentions that in October 1930, it was reported that the residents of Patra Police Station, Itahar including Santals armed with bows and arrows had been indulging in lawnessness demonstrations as a result of which no Chowkidari tax could be collected”.

সাঁওতাল আদিবাসী সমাজের মধ্যে পূর্বেকার ধর্মীয় বিশ্বাস ও পশ্চাদ্‌পদ কৃষকচেতনার পরিবর্তন এইভাবে ঘটে গিয়েছিল জাতীয় আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার রাজনৈতিক চেতনাকে ভিত্তি করে। ফ্রান্‌জ ফ্যানন যে শ্রেণিভিত্তিক প্রতিরোধ চেতনার কথা বলেছেন তার বাস্তব উদাহরণ অনেকক্ষেত্রেই এই কৃষক আন্দোলনগুলির মধ্যে দেখা গেছে। ১৯৩২ সালে দিনাজপুর এবং পার্শ্ববর্তী মালদহ জেলায় দেখা দেয় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ। আর ১৯৪৬-৪৭-এর তেভাগা আন্দোলনে অবিভক্ত বাঙলার আদিবাসী সমাজের অংশগ্রহণ ছিল এক নতুন শ্রেণি-চেতনায় উত্তরন।

নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি :
ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে, ‘সাঁওতাল গণ-সংগ্রমের ইতিহাস’, কলকাতা
আব্দুল্লাহ রসুল, ‘সাঁওতাল বিদ্রোহের অমর কাহিনী’, কলকাতা, ১৯৫৬ রণজিৎকুমার সমাদ্দার, ‘বাংলার গণসংগ্রামের পটভূমিকা’, কলকাতা, ১৯৯১
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’, প্রথম খণ্ড, ঢাকা।
বিনয়ভূষণ চৌধুরী, ‘ধর্ম ও পূর্ব-ভারতে কৃষক আন্দোলন’; প্রকাশিত ইতিহাস: অনুসন্ধান-৩, ১৯৮৮, পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ।
K.S.Singh, ‘Tribals of India’, New Delhi.
Kali Kinkar. Dutta, ‘The Santhal Insurrection of 1855’, Calcutta.
L.Natarajan, ‘Pesant Uprisings in India (1850-1900)’, Calcutta. Ranjit Guha, ‘Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India’, New Delhi.
‘Subaltern Studies’ (Vols.I-V), New Delhi. ‘Calcutta Review’, (1855-56); Reserved in Asiatic Society, Kolkata.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান