সুমন্ত্র দত্ত
বাংলায় নিম্নবর্গের আন্দোলন হিসেবে অষ্টাদশ শতাব্দীর রংপুর কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩) অন্যতম। স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ ও বিতর্কের অন্ত নেই। এ নিয়ে ইতিহাসচর্চা নিরন্তর চলছে। রংপুর বিদ্রোহ সম্পর্কে ঐতিহাসিক গবেষণার প্রাথমিক উপাদান হল সমকালীন বিভিন্ন রিপোর্ট, চিঠিপত্র ও সরকারি নথিপত্র। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল– ‘Paterson Commission Report– Rangpur Insurrection’, ‘Bengal Revenue Consultation’, Gazetteer of Rangpur District, Ferminger (ed), Bengal District Records, Rangpur, ‘Writings and Speeches of Edmund Burke, Vol VI, India : The Launching of the Hastings Impeachment, 1786-1788’ প্রভৃতি। পরবর্তীকালে এই বিদ্রোহ সম্পর্কে যেসব গবেষণা হয়েছে তা মূলত এইসব প্রাথমিক নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে। এছাড়া কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই বিদ্রোহ সম্পর্কিত সমকালীন কিছু সাহিত্যিক উপাদানও ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, রতিরাম দাসের ‘রংপুর জাগের গান’। এই গানের সংগ্রাহক পণ্ডিত যাদবেশ্বর তর্করত্ন (১৮৫১-১৯২৪) রতিরাম দাসকে রংপুর বিদ্রোহের সমসাময়িক বলে মনে করেন। কবি রতিরাম দাস রচিত (আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে) বেশ কয়েকটি জাগ গানের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই গানগুলি নানা ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণীর উৎস। এগুলির মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি ১৭৮৩-র কৃষক বিদ্রোহ, দেবী সিংহের অত্যাচার, ডিমলার রাজা হররাম সেন ও স্থানীয় নানা বিষয় উঠে এসেছে।
রংপুর বিদ্রোহ সম্পর্কে গৌণ উপাদান বা পরবর্তী গবেষণাসমূহের মধ্যে উল্লেখ করা যায় ই জি গ্লেজিয়ার, ‘A Report on the District of Rungpure’ (১৮৭৩), নিখিলনাথ রায়ের ‘মুর্শিদাবাদ কাহিনী’ (১৩১০ বঙ্গাব্দ), সুপ্রকাশ রায়ের ‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ (১৯৬৬), নরহরি কবিরাজের গবেষণা ‘A Peasant Uprising in Bengal 1783: The First Formidable Peasant Rising Against the Rule of the East India Company’ (১৯৭২), রণজিৎ গুহের ‘Elementary Aspects of Peasant’s Insurgency in Colonial India’ (১৯৮৩), বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন’ (১৯৮৬) গ্রন্থে রতনলাল চক্রবর্তীর ‘রংপুর কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩)’ প্রবন্ধ, জন উইলসনের প্রবন্ধ ‘A Thousand Countries to Go: Peasants and Rulers in Late Eighteenth Century Bengal’, অমৃতা সেনগুপ্তের সাম্প্রতিক গবেষণা সন্দর্ভ ‘Sannyasi-Fakir, Chuar, Rangpur Rebellions in late eighteenth and early nineteenth-century Bengal’ (২০১৯) প্রভৃতি।
বিদ্রোহের পটভূমি
রংপুর বিদ্রোহের পটভূমিকা নিহিত আছে ঔপনিবেশিক বাংলার ভূমিরাজস্ব নীতি ও রাজস্ব আদায় পদ্ধতির মধ্যে। ঘটনাচক্রে বাংলার ভূমি রাজস্ব, আইনকানুন, রীতিনীতি, ভাষা ইত্যাদি সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে ১৭৬৫ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার ‘দেওয়ানি’ (রাজস্ব আদায় ও জমিজমা সংক্রান্ত মামলার বিচারের অধিকার) লাভের পর যত বেশি সম্ভব মুনাফা অর্জনকেই লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। বাংলার ইতিহাসে রাষ্ট্রগঠন ও রাষ্ট্রচিন্তায় এই প্রথম মুনাফার লক্ষ্য সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়।১ এক্ষেত্রে লর্ড ক্লাইভ সরাসরি দায়িত্ব গ্রহণ না করে বাংলায় রেজা খাঁ এবং বিহার ও উড়িষ্যায় সীতাব রায় নামক দুই ব্যক্তির মারফত রাজস্ব আদায় করতে থাকেন। তাঁদের কাছ থেকে রাজস্ব বুঝে নেওয়ার জন্য নিযুক্ত হন একজন ব্রিটিশ ‘রেসিডেন্ট’। অপরদিকে আইন ও রাষ্ট্রক্ষমতা রয়ে যায় নবাবের হাতে (‘নিজামত’)। এইভাবেই শুরু হয় কুখ্যাত ‘দ্বৈত শাসন’। অর্থাৎ আইনত কোম্পানি ও নবাবের মধ্যে দেওয়ানি ও নিজামত ক্ষমতার বিভাজন। কিন্তু তৎকালীন নবাব নজম-উদ-দৌল্লা তাঁর ‘নিজামত’ ক্ষমতাও রেজা খাঁর হাতেই অর্পণ করেন। ফলে বাংলার শাসনব্যবস্থায় রেজা খাঁ-ই কার্যত সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। অধিক পরিমাণ রাজস্বের জন্য কোম্পানির চাপের ফলে রেজা খাঁ ‘আমিল’-দের (রাজস্ব সংক্রান্ত কাজের জন্য নির্ধারিত ব্যক্তি) ওপর ও ‘আমিল’-রা জমিদারদের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ফলে জমিদারদেরও আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। শুরু হয় জমিদারদের দ্বারা কৃষক শোষণ।
১৭৬৯ সালে বাংলায় কোম্পানির গভর্নর ভেরেলস্টের আমলে ‘আমিল’-দের অত্যাচার ও কৃষক শোষণ রোধ করার জন্য কোম্পানির নিম্নপদস্থ আমলাদের মধ্য থেকে ‘সুপারভাইজার’ নিয়োগ করা হয়। এ ব্যবস্থাও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী গভর্নর কার্টিয়ার ‘সুপারভাইজার প্রথা’-র বিলুপ্তি ঘটিয়ে ১৭৭০-এর জুলাই মাসে মুর্শিদাবাদ ও পাটনায় দুটি ‘রাজস্ব নিয়ামক পরিষদ’ বা ‘Comptrolling Council of Revenue’ গঠন করেন, যেটি ১৭৭১-এর এপ্রিল মাস থেকে কাজ শুরু করে। এইভাবে কোম্পানি ধীরে ধীরে সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। শাসন ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টার এই টানাপোড়েনের ফলে বাংলায় এক বিশৃঙ্খল ও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইতিমধ্যে বাংলায় শুরু হয়ে যায় ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ (১১৭৬ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ)। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের জীবনহানি হয়, সমগ্র কৃষিজমির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিত্যক্ত বলে ঘোষিত হয়। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে ভূমিরাজস্ব হ্রাস করার পরিবর্তে পরের বছর তা ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়।
১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার নবনিযুক্ত গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস প্রথমেই দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে মহম্মদ রেজা খাঁ ও সীতাব রায়কে পদচ্যুত করেন ও সরকারি কোশাগার মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করেন। গভর্নর ও কাউন্সিলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘Board of Revenue’-র ওপর রাজস্ব ব্যবস্থার পূর্ণ দায়িত্ব দেন। এরপর একটি ভ্রাম্যমাণ কমিটি (Committee of Ciucuit) বিভিন্ন নিলামের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নিলামদারের কাছে পাঁচ বছরের জন্য জমি বন্দোবস্ত করে। এই ব্যবস্থাই হল ‘ইজারাদারি ব্যবস্থা’। প্রত্যেক জেলায় রাজস্ব আদায়ের জন্য একজন ইউরোপীয় ‘কালেক্টর’ নিযুক্ত করা হয়। তাঁকে সাহায্য করার জন্য একজন দেশীয় ‘দেওয়ান’ ছিলেন। এই বন্দোবস্ত প্রথমে নদিয়ায় ও পরে বাংলার অন্যান্য জেলায় চালু করা হয়। কিন্তু এর ফলে অনেক জমিদার তাঁদের জমিদারি হারান, অনেকে জোর করে বেশি নিলাম ডেকে কোনোক্রমে নিজেদের জমিদারি রক্ষা করেন (যেমন, রাজশাহীতে রাণী ভবানী)। আবার অনেক ক্ষেত্রেই যে সমস্ত ধনী ব্যক্তি জমির ইজারা নেন, তাঁদের অনেকেরই ভূমিব্যবস্থা সম্পর্কে কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। এবিষয়ে তাঁরা নির্ভর করতেন নায়েব, গোমস্তাদের ওপর। সবচেয়ে করুণ ও ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল কৃষকরা। দুর্ভিক্ষজনিত সংকট, রাজস্বের উচ্চহার এবং ইজারাদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ ও অত্যাচারে তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল।
এই পরিস্থিতিতে বাংলায় আবির্ভাব ঘটে দেবী সিংহের। পশ্চিম ভারতের পানিপথের এক ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান দেবী সিংহ মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে ব্যবসায় ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে রেজা খাঁকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উৎকোচ প্রদান করে পূর্ণিয়া জেলার রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করেন। ইংরেজদের সন্তুষ্ট করার জন্য তিনি বাৎসরিক ১৬ লক্ষ টাকা বন্দোবস্তে (যেখানে পূর্বে ৯ লক্ষ টাকায় ইজারা দেওয়া হলেও সেখান থেকে ৬ লক্ষ টাকার বেশি আদায় করা সম্ভব হয়নি) সেখানকার ইজারা নেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করতে কৃষকদের ওপর চূড়ান্ত অত্যাচার করা হয়। ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালে দেবী সিংহকে পদচ্যুত করে মুর্শিদাবাদে ‘প্রাদেশিক রেভিনিউ বোর্ড’-এর কর্মাধক্ষ্য নিযুক্ত করেন। কিন্তু সেখানেও দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হলে হেস্টিংস ‘রেভিনিউ বোর্ড’ ভেঙে দিয়ে তাঁকে দিনাজপুর ও রংপুরের ইজারা দান করেন ও মাসিক এক হাজার টাকা বেতনে দিনাজপুরের নাবালক রাজার দেওয়ান নিযুক্ত করে তাঁকে মুর্শিদাবাদ থেকে সরিয়ে দেন। দেবী সিংহ দিনাজপুর, রংপুর ও এদ্রাকপুরের ইজারা নিয়ে হরেরাম নামক এক দুর্জনের সহায়তায় ঐ অঞ্চলে শোষণ ও অত্যাচার শুরু করেন। দেবী সিংহের অত্যাচারের বিবরণ অনেক লেখক ও ঐতিহাসিক বিস্তারিত দিয়েছেন।২ রতিরাম দাসের জাগের গানেও এ সম্পর্কে জানা যায়। দেবী সিংহের অত্যাচারের কিছু নমুনা তুলে ধরা যাক। যেমন– ক) জমিদার ও অন্যান্য ভূস্বামীদের ওপর অবিশ্বাস্য হারে কর স্থাপন, খ) করপ্রদানে অপারগ জমিদারদের বন্দি করা ও তাঁদের জমি, সম্পত্তি প্রভৃতি নামমাত্র মূল্যে কিনে নেওয়া, গ) ‘লাখেরাজ’ বা নিষ্কর জমিও বাজেয়াপ্ত করা, ঘ) কর আদায়ের জন্য কৃষক ও রায়তদের ওপর অমানুষিক উৎপীড়ন এবং স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে তাদের ও তাদের পরিবারের ওপর সীমাহীন শারীরিক নির্যাতন, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এই পরিস্থিতিতে কৃষক বা রায়তরা নিজেদের যথাসর্বস্ব বন্ধক রেখে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কর পরিশোধের চেষ্টা করলেও সেই ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাও তাদের থাকত না। ফলে তারা ক্রমশ সর্বহারায় পরিণত হয়। এমতাবস্থায় সম্পদ বৃদ্ধির ব্যবস্থা না করে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিণাম মারাত্মক হয়ে ওঠে।
উচ্চহারে রাজস্বের দাবি ছাড়াও বিভিন্ন অবৈধ কর (‘আবওয়াব’) ও উপকর কৃষকদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। ‘দেরিনভিল্লা’, ‘রসুম’, ‘হুন্ডিয়ান’, ‘মাথট’, ‘কর্তণী’, ‘ফেরারি’ ইত্যাদি বহুবিধ উপকর বাবদ দুই থেকে আট শতাংশ হারে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হত। এছাড়া “বিভিন্ন প্রকার চাঁদা, ফরমাইস, পিয়ন খরচ, কারবারি, ইনাম, ডাকখরচ, হাঙ্গামা খরচ, দান খরচ, ফাওতি, সিজুয়াল খরচ, সাগরেদ পোষা, দাখিল দেওয়ানি চৌকিবন্দি, আবাদকামি, মেহমানি, নজরানা বা সেলামি ইত্যাদি হিসেবে অর্থ আদায় এবং সিধা হিসেবে ধান চাল আদায় প্রচলিত ছিল। মৃত জমিদারদের পারলৌকিক ক্রিয়া তথা শ্রাদ্ধের জন্যও কৃষকদের নিকট থেকে অর্থ আদায় করা হত।”৩ ফলে রংপুরের বিভিন্ন এলাকার রায়তরা এ পরিস্থিতিতে এলাকা ছেড়ে চলে যায় এবং পরিণামে ঐ সমস্ত এলাকার কৃষিজমি জনশূন্য প্রান্তরে পরিণত হয়। রংপুর বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে দেবী সিংহ ও তাঁর অনুচরদের দ্বারা কৃষকদের ওপর শোষণ ও অত্যাচার ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
আর একটি বিষয় হল ১৭৬৫ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত ভূমিরাজস্ব আদায় নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রংপুরেও ব্যর্থ হয়েছিল। এই ব্যর্থতার একটা বিশেষ কারণ ছিল রংপুরে ‘শারাফ’ নামে স্থানীয় ব্যাংক ব্যবসায়ীদের অবলুপ্তি এবং ‘নাকাদ’ বা রেশম শ্রমিকদের রাজস্ব প্রদান থেকে অব্যাহতি। কোম্পানির মুদ্রানীতি অনুসারে রাজস্ব দিতে হত ফরাসি ‘আর্কট’ মুদ্রায়। ‘শারাফ’-রা আর্কট মুদ্রা৪ ও বহুল প্রচলিত ‘নারায়ণী মুদ্রা’-র৫ মধ্যে সহজলভ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা করতেন। উল্লেখযোগ্য যে, স্থানীয়ভাবে বহুল প্রচারিত ‘নারায়ণী মুদ্রা’ ফরাসি ‘আর্কট মুদ্রা’-র চেয়ে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের ছিল। কিন্তু সরকারিভাবে ‘শারাফ’ পদ বাতিলের ফলে মুদ্রা বিনিময়ে জমিদার ও কৃষকদের মাত্রাতিরিক্ত ‘বাট্টা’ ও মুদ্রার ওজন ঘাটতির কবলে পড়তে হয়। ফলে মুদ্রাব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতা কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করে। অপরদিকে, রেশম শ্রমিকদের রাজস্ব প্রদান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলে বহু সংখ্যক কৃষি শ্রমিক নিজেদের ‘নাকাদ’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজস্ব প্রদান থেকে অব্যাহতি পায়। ফলে অবশিষ্ট রায়তদের ওপর রাজস্বের চাপ বেশি পড়ে।৬
বিদ্রোহের সূত্রপাত, বিস্তার ও অবসান
উপরিউক্ত অসহনীয় পরিস্থিতিতে ১৭৮২-র শেষভাগ থেকেই কৃষকদের অসন্তোষ ও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে উঠছিল। কালেক্টর রিচার্ড গুডল্যান্ড (গুডল্যাড?)৭ বলেছেন, তখন থেকেই রায়তরা রাজস্বপ্রদান বন্ধ করতে থাকে। ১৭৮৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই রংপুরের কৃষকরা বিদ্রোহের জন্য ঐক্যবদ্ধ হন। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে কৃষকরা দেবী সিংহের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। উল্লেখযোগ্য যে, প্রথমদিকে তাঁরা প্রধানত দেবী সিংহের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তা কোম্পানির প্রশাসন পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। তবে রংপুর বিদ্রোহ নিয়ে যে সব ঔপনিবেশিক আখ্যান আছে সেগুলি প্রায় সবই প্রমাণ করতে চেয়েছে যে রংপুরে কৃষকদের বিদ্রোহ কোম্পানি সরকারের বিরুদ্ধে নয়, ছিল ইজারাদার ও স্থানীয় রাজস্ব কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারি নথিপত্র থেকে প্রমাণিত হয় যে মাত্রাতিরিক্ত রাজস্ব নির্ধারণের মাধ্যমে ইজারা প্রদান ও ইজারাদারদের উপর খাজনা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চাপ প্রয়োগ, এমনকি খাজনা আদায়ের জন্য ইজারাদারদের বলপ্রয়োগের ব্যাপারে কোম্পানির সম্মতি ছিল। এই রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে ইজারাদারদের সব কাজকেই তারা প্রশাসনিকভাবে বৈধতা দিয়েছে।৮ কোম্পানির পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণের ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও কাজ করেছিল।
রংপুরে বিদ্রোহের সূত্রপাত হয় বামনডাঙা ও টেপা পরগনার বিদলাতুর ও কোরনারসোনা গ্রামে। এ সময় তাদের নেতৃত্ব দেন ধীরাজনারায়ণ। বিদ্রোহীরা তাঁকে ‘নবাব’ মনোনীত করেন ও ইজারাদারদের কোনও প্রকার রাজস্ব দিতে অস্বীকার করেন। বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে শালমারি, কাকিনা, ফতেপুর, কাজিরহাট, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে। কিশোরগঞ্জে বিদ্রোহীরা পলাতক অত্যাচারী রাজস্ব আদায়কারী শেখ মুহম্মদ মোল্লার কাছারি ভস্মীভূত করেন। সেখানে আটক জমিদার ও কৃষকদের মুক্তি দেন। অন্যান্য স্থান থেকেও আটক কৃষকদের মুক্ত করা হয়। কাজিরহাটের কালিকাপুরের গোবিন্দরামের কাছারি আক্রমণ করে ডিমলাতে গিয়ে অত্যাচারী গোমস্তা গৌরমোহন চৌধুরীকে হত্যা করা হয়। ভবানীগঞ্জে কোম্পানির ধানের গোলা লুঠ করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে রিচার্ড গুডল্যান্ড-এর কাছে কৃষকরা যে সকল দাবি পেশ করেন তা হল ‘দেরিনভিল্লা’ উপকরের অবসান, ‘নারায়ণী মুদ্রা’-র মাধ্যমে রাজস্ব প্রদান, ‘কর্তণী’, ‘ফেরারি’ ও ‘হুন্ডিয়ান’– এইসব অবৈধ কর বিলোপ, দুই বছরের জন্য রাজস্বপ্রদান স্থগিত রাখা। গুডল্যান্ড দু-বছরের খাজনা মকুব করা ছাড়া বাকি শর্ত মেনে নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাকি শর্তগুলিও মানা না হলে ও পুনরায় কাজিরহাটে শেখ মুহম্মদ মোল্লা, কাকিনায় রামদুলাল ভট্টাচার্য, গোকুল মেহতা প্রমুখ অত্যাচার শুরু করলে পরবর্তী বিদ্রোহ কাকিনা ও টেপাকে কেন্দ্র করে মারাত্মক আকার ধারণ করে। কৃষকরা শেখ কেনা সরকারকে ‘নবাব’ ও রাম প্রসাদকে ‘সর্দার’ বা ‘দেওয়ান’ নিযুক্ত করে ১৭৮৩-র ১৩ ফেব্রুয়ারি সশস্ত্র সংঘর্ষ শুরু করেন। কাকিনাতে গোকুল মেহতাকে হত্যা করা হয়। রংপুরের বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে দিনাজপুরে। বোদা, মুরপুর, আলানছড়ি, বড়গঞ্জ, ডিহি-জামতা প্রভৃতি স্থানে বিদ্রোহ দেখা যায়। গুডল্যান্ড একে ‘দ্বিতীয় সর্বজনীন বিদ্রোহ’ (Second Great Rebellion) বলেছেন।৯ কোম্পানির স্থানীয় প্রশাসন মনে করে গ্রাম প্রধান বা ‘বসনিয়া’-গণ বিদ্রোহের পুরোধা। ফলে তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করে দু-একজনকে জনসমক্ষে ফাঁসি দেওয়া হয়।
এ সময় বিদ্রোহীরা নিজেদের ছয়টি উপদলে বিভক্ত করে রংপুরের বিভিন্ন স্থানে সমবেত হন। তাঁদের সাথে যোগ দেন দিনাজপুর ও কোচবিহারের একদল কৃষক। কৃষকদের প্রতিরোধের জন্য লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোনাল্ডের নেতৃত্বে সৈন্য প্রেরণ করা হয়। মোগলহাটে কয়েকশো ধনুর্ধর কৃষক কোম্পানি প্রশাসন প্রেরিত সুবাদার ও জমাদারকে আক্রমণ করেন। এই দলের অধিনায়ক ছিলেন নূরুউদ্দীন মোহাম্মদ বাকের জং ওরফে নূরলদীন বা নূরুল উদ্দিন, যিনি ‘নবাব’ উপাধি নিয়ে দয়াশীল নামে এক ব্যক্তিকে তাঁর ‘দেওয়ান’ নিযুক্ত করেন। নূরলদীন উত্তরবঙ্গের কৃষকদের বিদ্রোহের পরিচালনার ভার গ্রহণ করলেন। তিনি এক ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে দেবী সিংহকে আর কর না দিতে আদেশ জারি করলেন। দেবী সিংহ এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ব্যয় সংকুলানের জন্য কৃষকদের উপর ‘ঢিং খরচ’ নামে বিদ্রোহের চাঁদা ধার্য করলেন। ব্রিটিশ শাসকদের নথিপত্র অনুযায়ী নূরলদীন ছিলেন সব বিদ্রোহীদের মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি ‘স্বাধীনতার সনদ’ (Scripture of Independence) নিয়ে, মুকুট শোভিত হয়ে বিদ্রোহী কৃষকদের মাঝে আবির্ভূত হন।১০ যদিও ‘স্বাধীনতার সনদ’ বলতে কী বোঝায় তার কোনও ব্যাখ্যা সরকারি নথিপত্রে পাওয়া যায় না। তবে একথা ঠিক যে এই বিদ্রোহে ‘নবাব’ বা নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে একমাত্র নূরলদীনই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। যাই হোক, এমতাবস্থায় দেবী সিংহ পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন রংপুরের কালেক্টর গুডল্যান্ড-এর কাছে। লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোন্যাল্ড তাঁর বিরাট বাহিনী নিয়ে রংপুরে প্রবেশ করেই সেটাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন দিকে পাঠিয়ে দিলেন। এরা বিদ্রোহীদের সাথে সরাসরি যুদ্ধ করার আগে ‘পোড়ামাটি নীতি’ (Scorched Earth Policy)১১ নিয়ে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও গ্রাম ধ্বংস করে।
বিভিন্ন খণ্ডযুদ্ধের পর নূরলদীনের নেতৃত্বে রংপুরে ইংরেজ শাসনের প্রধান ঘাঁটি মোগলহাট বন্দরের ইংরেজ কুঠির উপর আক্রমণ শুরু হয়। বিদ্রোহীদের প্রধান বাহিনীটি অবস্থান নেয় পাটগ্রামে। কালেক্টর গুডল্যান্ড নূরলদীনের দলকে কৃষক বিদ্রোহের দলগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা সমস্যাসংকুল বলে অভিহিত করেছেন।১২ ম্যাকডোন্যাল্ড তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে কূটকৌশলের মাধ্যমে রাতের অন্ধকারে বিদ্রোহীদের ঘাঁটি ঘিরে ফেলে পরদিন (১৭৮৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি) ভোরে অতর্কিত আক্রমণে বিদ্রোহীদের দিশেহারা করে দেন। ইংরেজদের মতো আধুনিক সমরাস্ত্র বা প্রশিক্ষণ বিদ্রোহীদের না থাকায় তাঁরা দলে দলে নিহত হন, আহত হন অসংখ্য আর বাকিরা প্রাণভয়ে পলায়ন করেন। নূরলদীনের সহকারী দয়াশীল নিহত হন। গুরুতরভাবে আহত নূরলদীনেরও কয়েকদিনের মধ্যেই মৃত্যু ঘটে। এরপর কিছুদিন বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চললেও ধীরে ধীরে বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে যায়।
বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি
রংপুর বিদ্রোহ (স্থানীয় ভাষায় রংপুর ‘ডিং’ বা ‘ঢিং’) ছিল একটি কৃষক বিদ্রোহ যা ঔপনিবেশিক শোষণ ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত কুফলগুলোকে উন্মোচিত করেছিল। এটি ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বৈশিষ্ট্যগুলিকে সামনে নিয়ে আসে। নরহরি কবিরাজের মতে রংপুর বিদ্রোহ বা ‘ঢিং’ বাংলায় কৃষক বিদ্রোহের একটি দীর্ঘ ধারার অগ্রদূত। বিদেশি শাসনের আধিপত্য নিপীড়িত জাতির ‘স্বাধীন সামাজিক বিকাশ’-কে বিপর্যস্ত করেছিল। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষকরা। কিন্তু রংপুর কৃষক বিদ্রোহকে কোনও একক ঘটনা বলা যায় না। এই বিদ্রোহে বহু বিচিত্র ঘটনার সমাবেশ ঘটেছিল। নেতৃত্বের বিষয়ে বলা যায় যে, একক নেতৃত্বের পরিবর্তে এতে বহু নেতৃত্বের দেখা পাওয়া যায়। বিদ্রোহের প্রধান নেতা হিসেবে কাজিরহাট পরগনার ধীরাজনারায়ণ, কাকিনা পরগনার শেখ কেনা সরকার ও সুলতানা তালুকের নূরলদীনের কথা জানা যায়। এই নেতাদের রায়তরা ‘নবাব’ আখ্যা দিয়েছেন, যে সম্বোধন মূলত প্রতীকী অর্থে অর্থাৎ ‘নেতা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল। নির্বাচিত ‘নবাব’-কে বিদ্রোহ পরিচালনার জন্য নজরানা বা ‘ঢিং খরচা’ প্রদান করে কৃষকরা একদিকে আনুগত্য ও অন্যদিকে প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসরণের উদাহরণ রেখেছিলেন। তবে উপরিউক্ত তিনজন ছাড়া বিদ্রোহে রামপ্রসাদ সর্দার, দয়াশীল, ভুদারো, শেখ হাবসি, শেখ কাবিল রহমত, আলিবর্দি, দয়ারাম দাস, হরনারায়ণ দাস, বাণেশ্বর দাস, ইসরাইল খান প্রমুখ স্থানীয় বসনিয়াদের নেতৃত্বও লক্ষ করা যায়।১৩ নেতা নির্বাচনে কৃষকরা প্রাচীন রীতি অনুযায়ী ‘বসনিয়া’ বা গ্রাম প্রধানকে প্রাধান্য দেন। নির্বাচিত ‘নবাব’-রা ছিলেন ‘বসনিয়া’ ও ক্ষুদ্র ভূস্বামী বা সম্পন্ন কৃষক।১৪ নেতারা সকলেই ছিলেন রংপুরের অধিবাসী এবং উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত। তবে বিদ্রোহের প্রধান শক্তি ছিলেন কৃষকরাই। সম্ভবত সাংগঠনিক সুবিধা, কেন্দ্রীভূত শক্তি অর্জন ও বিদ্রোহ পরিচালনার জন্য তাঁরা ‘নবাব’ নির্বাচন করে নেতৃত্ব গঠন করেন।১৫ এই নেতৃত্ব ছিল সর্বাংশে স্থানীয়।
রংপুর বিদ্রোহ আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর ক্ষেত্রে প্রসারিত হতে পারেনি। বিদ্রোহের ব্যাপ্তি ছিল বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুরের পূর্বাংশে। এর বাইরে এই বিদ্রোহ বিশেষ বিস্তৃত হয়নি। প্রশ্ন ওঠে এর কারণ কী? তার একটা কারণ হল নানা স্তরে বিভক্ত বাংলার কৃষকশ্রেণি, যাদের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ভিন্ন প্রকৃতির, তাঁদের মধ্যে কোনোপ্রকার শ্রেণিসুলভ ঐক্যবোধ সে সময় গড়ে ওঠেনি। কৃষকরা যেখানে নির্যাতনের শিকার সেখানেই বিদ্রোহ হয়েছে। অন্যত্র তেমন হয়নি বা অন্য অঞ্চলের কৃষকরা সেভাবে সাহায্যে এগিয়ে আসেনি, যা বিদ্রোহকে আঞ্চলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। রংপুর বিদ্রোহে বিদ্রোহী কৃষকরা নিজেদের গণ্ডি, সামর্থ্য ও পদ্ধতিতে স্বরাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তাঁদের এই ‘স্বরাজ’ ছিল স্থানীয় উপাদান সমৃদ্ধ ও স্থানীয় প্রকৃতির। তাঁরা মূলত তাঁদের পরিচিত প্রশাসনিক সংগঠন ও কার্যাবলির অনুকরণ করেন। যেমন, তাঁদের দ্বারা গঠিত সরকারে ‘নবাব’ ও ‘দেওয়ান’ সহ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মচারীও নিযুক্ত ছিলেন, যা অনেকেটা মুঘল সরকার কাঠামোর অনুরূপ। সরকার পরিচালনার জন্য পাইক, গুপ্তচরও নিযুক্ত হত। সরকারের পক্ষে বিভিন্ন ঘোষণায় কোম্পানি ও তার সহযোগীদের রাজস্ব প্রদানে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কেন্দ্রীয় সংগঠনের মতো স্থানীয় সংগঠনও ছিল। এইভাবে ঔপনিবেশিক শাসনকে অস্বীকার করার একটা প্রবণতা নিম্নবর্গের কৃষকদের মধ্যে দেখা যায়।
এখন প্রশ্ন ওঠে যে, অন্যান্য অনেক বিদ্রোহের মতো ‘ধর্ম’ কি রংপুর বিদ্রোহকেও প্রভাবিত করেছিল? একথা বলা যায় যে-কোনও কৃষক বিদ্রোহে বিদ্রোহী কৃষকদের মানসিকতার উৎস বহুমুখী। অন্যান্য অনেক প্রভাবের সঙ্গে ধর্মচেতনাও নানাভাবে মিশে থাকে। রংপুর বিদ্রোহের চরিত্র ও গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্যই কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন, ধর্মের ভিত্তিতে নয়। সাঁওতাল বিদ্রোহের মতো অলৌকিক ক্ষমতায় নেতাদের অকুণ্ঠ বিশ্বাসও রংপুর বিদ্রোহে দেখা যায় না। ধীরাজনারায়ণ, শেখ কেনা সরকার বা নূরলদীন কেউই অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বলে জানা যায় না। নরহরি কবিরাজ এই বিদ্রোহে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা বলেছেন,১৬ কিন্তু এ প্রশ্ন উঠতে পারে যে, অষ্টাদশ শতাব্দীর হিন্দু-মুসলমান কি তাঁদের হিন্দু-মুসলমান হিসেবে স্বতন্ত্র ভাবতেন? যদি তাঁরা তা না ভেবে থাকেন তাহলে এই বিদ্রোহে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের তত্ত্ব উদ্ভাবন অপ্রয়োজনীয় ও কতকাংশে উদ্দেশ্যমূলক। এ প্রসঙ্গে রতনলাল চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন যে, ঐক্য বলতে বোঝায় মতৈক্য ও মতৈক্যে থাকে চেতনা। রংপুর বিদ্রোহে সম্প্রদায়গত চেতনা যদি নাই থাকে তাহলে হিন্দ-মুসলমান ঐক্যের প্রশ্ন অবান্তর। সরকার গঠনে হিন্দু-মুসলমান অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় আয়োজনের ফলশ্রুতি। যেখানে যে বসনিয়া প্রভাবশালী সেখানেই তিনি ‘নবাব’ বা ‘দেওয়ান’ হয়েছেন। কোনও ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে নয়।১৭
রংপুর বিদ্রোহে লক্ষণীয় চারটি মৌলিক বিষয়ের উল্লেখ করেছেন রণজিৎ গুহ। সেগুলি হল– আলোচনা (Confer), পরিকল্পনা (Plan), সমাবেশ (Assemble) ও আক্রমণ (Attack)।১৮ প্রথমে কৃষকরা একত্রিত হয়ে বিদ্রোহের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। পরে তাঁরা পূর্বের ইজারাদার ও স্থানীয় প্রভাবশালী গ্রামপ্রধান বা ‘বসনিয়া’-দের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কৃষকরা বসনিয়া, পূর্বের ইজারাদার, অন্যান্য কৃষকদের আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান। বিদ্রোহী কৃষকরা সর্বশক্তি দিয়ে সমাবেশ করেন ও নিজেদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে পরিকল্পিত আন্দোলন ছড়িয়ে দেন। বিদ্রোহী কৃষকদের প্রথম বড়ো জমায়েত হয় বামনডাঙ্গা পরগনার বিদলাপুর ও কোরনারসোনা গ্রামে। তারপর হাজার হাজার বিদ্রোহী কৈমারির দিকে অগ্রসর হয়। একটি যৌথ পরিকল্পনার মাধ্যমে কৈমারির বৃহৎ জমায়েত দুটি অংশে ভাগ হয়ে কাজিরহাট পরগনা, কাকিনা ও টেপা পরগনার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। বিদ্রোহীরা বিভিন্ন কাছারিতে গিয়ে প্রথমে খাজনা কমানোর আবেদন জানান। কিন্তু এতে প্রত্যাখ্যাত ও নির্যাতিত হলে আক্রমণ করেন। এর উদাহরণ হল দেবী সিং-এর সহযোগী ডিমলার গৌরমোহন চৌধুরি ও টেপা পরগনার গোকুল মেহতার হত্যাকাণ্ড। অর্থাৎ সবদিক থেকে এই বিদ্রোহ ছিল সুপরিকল্পিত।
মার্কসবাদী ঐতিহাসিক নরহরি কবিরাজ তাঁর গ্রন্থে বিদ্রোহের কারণ, গতি ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, এটি ছিল প্রকৃতপক্ষে একটি কৃষক বিদ্রোহ এবং আন্দোলনটিকে উপনিবেশ-বিরোধী ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ হিসেবে দেখা উচিত।১৯ কিন্তু এই বিদ্রোহকে একটি ‘কৃষক বিদ্রোহ’ বলা হলেও দেখা যায় বিদ্রোহীদের মধ্যে যেমন নিষ্পেষিত রায়তরা ছিলেন, তেমনি ছিলেন ‘বসনিয়া’ বা গ্রামপ্রধানরা। আবার বিদ্রোহে ক্ষুদ্র জমিদারদেরও ভূমিকা ছিল। কারণ জমিদারেরাও ইজারাদারি ব্যবস্থায় নিগৃহীত হচ্ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইটাকুমারীর জমিদার শিবচন্দ্র রায় দেবী সিংহের কাছে খাজনা হ্রাসের আবেদন জানালে বন্দি হন। সেসময় প্রজাদের কাছে জনপ্রিয় শিবচন্দ্রের বাড়ি পাহারা দেন প্রজারা। পরে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনেন পরিবারের সদস্যরা। শিবচন্দ্র তারপর মন্থনার জমিদার জয়দুর্গা দেবীর (যিনি ‘দেবী চৌধুরানী’ নামে পরিচিত) সঙ্গে পরামর্শ করে ও ফতেপুর চাকলার অধীনে সমস্ত অত্যাচারিত ক্ষতিগ্রস্ত জমিদার ও শীর্ষ বিদ্রোহী নেতাদের নিয়ে এক বৈঠকে নিজের ঘটনা ও প্রজাদের উপর অত্যাচারের নিষ্ঠুর কাহিনি তুলে ধরে সকলকে দেবী সিংহ ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে আক্রমণে প্ররোচিত করেন। প্রকৃতপক্ষে মাত্রাতিরিক্ত ‘জমা’ (নির্ধারিত রাজস্ব) বৃদ্ধি, বর্ধিত ‘জমা’-র ভূমি বন্দোবস্ত গ্রহণ করতে তাঁদের বাধ্য করা, বিভিন্ন অবৈধ উপকর ধার্য, স্বল্পমূল্যে জমি বিক্রয় ও জমি হস্তান্তরে বাধ্য করা, রাজস্ব আদায়ে শারীরিক নির্যাতন ইত্যাদি জমিদারদেরও বাধ্য করেছিল বিদ্রোহে কৃষকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে। এইসব তথ্যের আলোকে এই বিদ্রোহকে একেবারে বিশুদ্ধ ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ বলা যায় কি? আবার একথাও অনস্বীকার্য যে, বিদ্রোহে বসনিয়া বা জমিদারদের অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বদান প্রধানত কৃষকদের সাথে অভিন্ন স্বার্থকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। যদিও অর্থনৈতিকভাবে এই শ্রেণিগুলির শক্তি ও স্বার্থ এক নয়। রংপুর বিদ্রোহে এঁদের ঐক্য হয়েছিল ইজারাদারদের অত্যাচারের পরিপ্রেক্ষিতে। শোষক ও শোষিতের প্রশ্নে কৃষকশ্রেণিকে সমর্থনের মাধ্যমে তাঁরা ইজারাদারবিরোধী প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। সেদিক থেকে সে যুগের সীমাবদ্ধ বেষ্টনীর মধ্যে শোষকের বিরুদ্ধে নানাবিধ স্বার্থসমন্বিত নিপীড়িত শ্রেণির ঐক্যবদ্ধ চেতনা হিসেবে এই বিদ্রোহকে কিছুটা সীমিত অর্থে ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ বলা যেতে পারে। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র সম্মিলিত চেতনা (collective consciousness) ছিল। বিদ্রোহের নেতারা তাঁদের কাছে আশার আলোস্বরূপ হয়ে উঠেছিলেন। অবশেষে, তাঁরা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে তাঁদের জীবনকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এভাবে তাঁদের মতাদর্শের পরিধি বিস্তৃত হয়।২০
প্রাক্-ধনতান্ত্রিক যুগের কৃষক বিদ্রোহগুলি সম্পর্কে হবসবম একসময় বলেছিলেন যে, সম্পূর্ণভাবে শিল্পায়িত না হওয়া সমাজের কৃষক বিদ্রোহগুলি প্রাক্-রাজনৈতিক।২১ তবে রণজিৎ গুহ এই বিদ্রোহে কৃষকের রাজনৈতিক চৈতন্য লক্ষ করেছেন।২২ কারণ ‘পরগনা দস্তুর’২৩ ও ‘পরগণা নিরিখ’২৪ সংরক্ষণে ও খাজনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী কৃষক শ্রেণির মধ্যে যে চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল তা যে কোনও বিচারে ছিল রাজনৈতিক। তবে বাংলার কৃষক বিদ্রোহের রাজনৈতিক চেতনা প্রমাণ করার জন্য রণজিৎ গুহের ‘Domination Subordination Resistance’ তত্ত্বের মূল বক্তব্য হল শোষক শ্রেণির আধিপত্যের পাশাপাশি আছে কৃষক শ্রেণির (রণজিৎ গুহের ভাষায় ‘Subaltern’) শোষণ সচেতনতা, যার ফলে তাঁরা সব সময়ই চেষ্টা করেছেন গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোকে পালটে দিয়ে সেখানে নিজেদের মতো করে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। শ্রেণিচেতনা হল এই তত্ত্বের পূর্বশর্ত। কিন্তু রংপুর বিদ্রোহে কৃষকরা কতখানি শ্রেণিচেতনার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তার কোনও বাস্তব তথ্য অনুপস্থিত। সিরাজুল ইসলাম তাই বলেছেন, “এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারীরা অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল, কিন্তু শ্রেণিগতভাবে নয়। সনাতন রাষ্ট্রকাঠামোর ধ্বংসস্তুপের উপর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীরা বিদ্রোহ করে।…..কিন্তু বিদ্রোহের নেতৃত্ব আসে উচ্চশ্রেণি থেকে।”২৫ কিন্তু নিম্নবর্গীয় ঐতিহাসিক গোষ্ঠীর বিদ্রোহ ব্যখ্যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘স্বকীয় সত্তা’ বা Autonomous Domain সম্পর্কে নরহরি কবিরাজ বলেছেন রংপুর বিদ্রোহে এই চরিত্র স্পষ্ট। কারণ বিদ্রোহীদের যখন জিজ্ঞাসা করা হয় যে তাঁদের নেতা কারা, উত্তরে তাঁরা বলেন তাঁরাই বিদ্রোহী, তাঁরাই তাঁদের নেতা।২৬
আবার একথা বলা অযৌক্তিক হবে না যে, এই বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে কৃষকেরা তাঁদের প্রতি বঞ্চনার ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটন করার পরিবর্তে প্রথমে এক নমনীয় রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কিছুটা দরকষাকষি করতে চেয়েছিলেন। দেখা যায় যে, বিদ্রোহের প্রথম পর্বে রংপুরের রায়তদের একাংশ গুডল্যান্ডের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করে এক দরখাস্তে ‘দেরেনভিল্লা’-র অবসান, রাজস্ব প্রদানে ‘নারায়ণী মুদ্রা’-র পুনঃপ্রবর্তন, দুই বছরের জন্য রাজস্বপ্রদান স্থগিত রাখার আর্জিসহ লেখেন, “আপনি একটা দেশের প্রধান; আমাদের যাওয়ার মতো হাজারটা দেশ রয়েছে। আপনি প্রধান, আমরা রায়ত; আপনি তাই আমাদের ন্যায়বিচার দেবেন।”২৭ এই বক্তব্যের মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন হুমকি ছিল। তা হল যে ন্যায়বিচার না পেলে এ দেশ ছেড়ে চলে যাবার পথ কৃষকের খোলা। তাঁরা অন্যত্র চলে গেলে কালেক্টর কাদের ওপর কর্তৃত্ব করবেন? এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বাংলার অনেক স্থানেই জমির তুলনায় কৃষকের সংখ্যা কম থাকায় কৃষকরা এমন সব অঞ্চলে চলে যেতেন যেখানে তাঁদের সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত হয়। এ থেকে মনে হয় যে, কৃষকদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ন্যায়বিচার ও সেইসঙ্গে সুস্থ জীবনযাপন। তা পেলে তাঁরা আর বিদ্রোহের পথে বা কৃষিজমি ছেড়ে যাবেন না। কিন্তু তা না পেয়ে শেষ অস্ত্র হিসেবে বিদ্রোহ ছাড়া আর কোনও পথ তাঁদের সামনে ছিল না। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। যেমন, দেখা যায় ১৭৮৩-তে রংপুর জেলার সর্বত্র বিদ্রোহ ছড়ায়নি। বিশেষত দক্ষিণ অংশে আর পূর্ব দিকের কুন্ডি পরগনায় বিদ্রোহ হয়নি। কুন্ডির সীমান্তে বিদ্রোহ চরম আকার ধারণ করলে কুন্ডির কয়েকশো রায়ত দেবী সিংহের কাছারিতে গিয়ে ‘দেরেনভিল্লা’ বাতিলের দাবি জানায় এবং সেখানে উপস্থিত লালা মানিকচন্দ্র (রংপুরে কোম্পানির প্রাক্তন রাজস্ব কর্মচারী) ও দুইজন জমিদার কৃষকদের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দু আনা (১২.৫ শতাংশ) ‘দেরেনভিল্লা’ ধার্য করেন এবং যারা ইতিমধ্যে তার থেকে বেশি খাজনা দিয়েছে তাদের পরবর্তীকালে হিসেবে সমন্বয় সাধনের প্রতিশ্রুতি দেন। ফলে কৃষকরা আবার কৃষিকাজে ফিরে যেতে উৎসাহিত হন। অথচ অন্যান্য স্থানে কৃষকদের সঙ্গে এ ধরনের আলোচনা না হওয়ায় সেইসব অঞ্চলে বিদ্রোহ হয়েছিল।২৮ সুতরাং এই ধারণা অবান্তর নয় যে, কৃষকরা প্রথমদিকে নিজেদের মতো করে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রচলিত ব্যবস্থায় আরও ভালোভাবে থাকার চেষ্টা করতে চেয়েছিলেন।
রংপুর বিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে ওই অঞ্চলের রাজস্ব আদায়, জমি জরিপ ইত্যাদি বন্ধ থাকে। এক বছর মেয়াদি জমি বন্দোবস্তের নীতি গ্রহণ করা হয়। শত অত্যাচার সত্ত্বেও রাজস্ব দিতে অস্বীকৃতি জানায় কৃষকরা। শুধুমাত্র রংপুরেই খাজনা অনাদায়ি থাকে ৩,৯০,২০০ টাকার মতো।২৯ প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য ও রাজস্ব আদায়ের জন্য জে ডি প্যাটারসনকে কমিশনার নিযুক্ত করে রংপুরে প্রেরণ করা হয়। তিনি অনুসন্ধানের পর প্রজাদের ওপর দেবী সিংহের অত্যাচার ও তার ফলে কৃষকদের বিদ্রোহ যে যুক্তিসংগত তার বিবরণ কলকাতায় পাঠান। কিন্তু হেস্টিংসের দাক্ষিণ্যে দেবী সিংহ এবং রংপুরের কালেক্টর গুডল্যান্ডকে নির্দোষ প্রমাণিত ও প্যাটারসনকেই মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা হয়। এরপর হেস্টিংস দেশে ফিরে গেলে তাঁর পক্ষে দেবী সিংহকে আর কোনও সরকারি কাজে নিযুক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিশের আমলে দেবী সিংহকে তাঁর পদ ও ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা হয়।৩০ তবে বিদ্রোহের অবসান হলেও কৃষকরা যে শোষণমুক্ত হয়েছিলেন তা নয়। লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯০ সালে ইজারা প্রথার অবসান ঘটিয়ে দশশালা বন্দোবস্তের প্রবর্তন করেন। এটি ভূমি রাজস্বের আরও স্থায়ী ব্যবস্থার পথকে প্রশস্ত করে ও অবাধ শোষণ-উৎপীড়নের আর একটি নতুন দরজা খুলে দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, চেতনা ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ১৭৮৩ সালের রংপুর কৃষক বিদ্রোহ নিম্নবর্গের প্রতিরোধ আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ বিদ্রোহকে ইজারাদারি শোষণ ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে নিম্নবর্গীয় কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত, ঐক্যবদ্ধ ও সশস্ত্র সংগ্রাম হিসেবে অভিহিত করা অযৌক্তিক হবে না। কৃষি অর্থনীতিতে কোনও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বা জমিতে ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি হয়তো কৃষকরা তোলেননি, কিন্তু এ আন্দোলন প্রচলিত রাজস্ব নীতি ও ইজারাদারি ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছিল। এই বিদ্রোহ ব্রিটিশদের পলাশি-পরবর্তী সময়ে সর্বাপেক্ষা সমস্যায় ফেলে এবং বাধ্য করে রাজস্বনীতি পরিবর্তন করতে। সেইসঙ্গে এই বিদ্রোহ ভবিষ্যতের বিদ্রোহ আর আন্দোলনের বীজ রোপণ করে। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে যে মজ্জাগত নিপীড়ন প্রচ্ছন্ন ছিল তাই-ই উন্মোচন করে এই বিদ্রোহ। ইজারাদারি শোষণের বিরুদ্ধে শুরু হয়ে এ বিদ্রোহ যে ঔপনিবেশিকতা বিরোধী সংগ্রামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও পরবর্তী কৃষক আন্দোলনের পথপ্রদর্শক হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা অস্বীকার করা যায় না।
সূত্র নির্দেশ:
১। বি এইচ ব্যাডেনপাওয়েল, ‘The Land Systems of British India’, Vol.I, অক্সফোর্ড, লন্ডন, ১৮৯২, পৃঃ ৪০
২। দেবী সিংহ ও তাঁর অত্যাচারের বিস্তারিত বর্ণণার জন্য দ্রঃ নিখিলনাথ রায়, ‘মূর্শিদাবাদ কাহিনী’, ২য় সং, কলিকাতা, ১৩১০ বঙ্গাব্দ, পৃঃ ৫৩৯-৫৭৯
৩। রতনলাল চক্রবর্তী, ‘রংপুর কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩)’ দ্রঃ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত, ‘বাংলাদেশের সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন’, ১ম সং, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৮৬, পৃঃ ৪৬
৪। ইউরোপীয় বণিকরা দক্ষিণ ভারতের উপকূলীয় এলাকায় ‘আর্কট’ মুদ্রার মাধ্যমে ব্যবসা করতেন। একটি নতুন ‘আর্কট’ মুদ্রার মান সরকার নির্ধারণ করত ‘বাট্টা’ প্রথার (‘বাট্টা’র মাধ্যমে অসম মূল্যের মুদ্রাগুলিকে মানসম্পন্ন মুদ্রার সমতুল্য করা হত) মাধ্যমে।
৫। বাংলা হরফে প্রথম মুদ্রা বার করার কৃতিত্ব কোচ রাজাদের৷ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মহারাজা নরনারায়ণের নাম উৎকীর্ণ করা (১৫৫৪–১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দ) মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে, তার একাংশ রয়েছে এশিয়াটিক সোসাইটির সংগ্রহে৷ এই মুদ্রার হরফ বাংলা৷ পরবর্তীকালেও কোচবিহারের শাসকরা মুদ্রা প্রচলন করেছেন৷ এই মুদ্রাকে বলে নারায়ণী মুদ্রা, কারণ প্রত্যেক রাজার মধ্য নাম ছিল ‘নারায়ণ’৷
৬। রতনলাল চক্রবর্তী, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৪১-৪৩
৭। এ প্রসঙ্গে একটি বিভ্রান্তি আছে। অমৃতা সেনগুপ্ত তাঁর গবেষণাপত্রে জানাচ্ছেন যে, রংপুর বিদ্রোহ সম্পর্কে পরবর্তীকালে প্রকাশিত বিভিন্ন বিবরণীতে রিচার্ড গুডল্যাড নামটি লিখিত হলেও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য লেখ্যাগারে রক্ষিত পাণ্ডুলিপিতে আছে গুডল্যান্ড। দ্রঃ অমৃতা সেনগুপ্ত, ‘Sannyasi-Fakir, Chuar, Rangpur Rebellions in late eighteenth and early nineteenth-century Bengal’, ২০১৯, পৃঃ ২৫৪
৮। ই জি গ্লেজিয়ার, ‘A Report on the District of Rungpure’, কলকাতা, ১৮৭৩, পৃঃ ১৯
৯। কমিটি অফ রেভিনিউকে গুডল্যাড, মার্চ, ১৭৮৩, দ্রঃ Ferminger(ed), ‘Bengal District Records, Rangpur’, iv, p.153
১০। রংপুরের কালেক্টরকে সাব-ডিভিশনাল কালেক্টর, ১৭ জুলাই, ১৮৭৩; উদ্ধৃত, রতনলাল চক্রবর্তী, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৫৬
১১। ‘পোড়ামাটি নীতি’ এমন একটি সামরিক কৌশল যার দ্বারা সেনারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার সময় সামরিক-অসামরিক নির্বিশেষে প্রতিপক্ষের সবাইকে হত্যার পাশাপাশি শত্রুর পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব এমন স্থাপনা ও অবকাঠামো, খাদ্যের উৎস, জল সরবরাহ, পরিবহণ, যোগাযোগ, শিল্পকারখানা ইত্যাদি পুড়িয়ে দেয়। প্রতিপক্ষের সবকিছু একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াই হল ‘Schorched Earth Policy’ বা ‘পোড়ামাটি নীতি’।
১২। ই জি গ্লেজিয়ার, পূর্বোক্ত, পৃঃ ২২
১৩। রতনলাল চক্রবর্তী, পুর্বোক্ত, পৃঃ ৫৫
১৪। রণজিৎ গুহ, ‘Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India’, লন্ডন, ১৯৯৯, পৃঃ ১১৪
১৫। রতনলাল চক্রবর্তী, পুর্বোক্ত, পৃঃ ৫৬
১৬। নরহরি কবিরাজ, ‘A Peasant Uprising in Bengal 1783: The First Formidable Peasant Rising Against the Rule of the East India Company’, দিল্লি, ১৯৭২, পৃঃ ৩৯
১৭। রতনলাল চক্রবর্তী, পুর্বোক্ত, পৃঃ ৫৮
১৮। রণজিৎ গুহ, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১১৬
১৯। নরহরি কবিরাজ, পূর্বোক্ত
২০। বি বি চৌধুরী, ‘Transformation of Rural Protest in Eastern India, 1757– 1930’, Proceedings of Indian History Congress, 1979, পৃঃ ৫০৩-৫৪১
২১। ই জে হবসবম, ‘Primitive Rebels’, লন্ডন, ১৯৫৯, পৃঃ ২২
২২। রণজিৎ গুহ, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৪৫
২৩। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য জমির বিভিন্ন ধরনের স্বত্বাধিকারীদের অধিকার ও দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রচলিত প্রথা ও রীতিনীতির অভিন্নতার ভিত্তিতে পরগনাগুলিকে ‘দস্তুর’ বা এলাকায় ভাগ করা হত। সরকার ও অপরাপর সকল পক্ষ প্রথাগতভাবেই ‘পরগনা দস্তুর’ বা পরগনার নিয়ম কানুন মেনে চলতে বাধ্য ছিল।
২৪। ‘পরগনা নিরিখ’-এর মাধ্যমে জমির খাজনা, মজুরি, ওজন ও পরিমাপ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রিত হত। প্রতিটি পরগনার নিজস্ব ‘নিরিখ’ ছিল যা সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণ জানতেন ও বুঝতেন।
২৫। সিরাজুল ইসলাম, ‘বাংলার ইতিহাস, ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো’, পৃঃ ৩৩৫-৩৩৬
২৬। নরহরি কবিরাজ, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৩৮
২৭। অমৃতা সেনগুপ্ত, পূর্বোক্ত, পৃঃ ২৫৬
২৮। জন ই উইলসন, ‘A Thousand Countries to Go: Peasants and Rulers in Late Eighteenth Century Bengal’
২৯। সুপ্রকাশ রায়, ‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’, কলকাতা, ৩য় সং, পৃঃ ১১১
৩০। সুপ্রকাশ রায়, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১১১-১১২