অঞ্জন সাহা
ভূমিকা
শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণ সহযোগে কৃষক বিদ্রোহের সামগ্রিক রূপ বোঝানো যায় না, এর জন্য বিদ্রোহীদের মানসিকতা বিশ্লেষণ অপরিহার্য। বিদ্রোহের উদ্ভবে অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতের ভূমিকা অনস্বীকার্য; কিন্তু বিদ্রোহের যৌথ সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ‘প্রভু’ শ্রেণি সম্পর্কে কৃষকদের নিরুদ্ধ আক্রোশের ফল নয়। তাদের নানা বিশ্বাস ও ধারণা প্রতিরোধের সংকল্পকে প্রভাবিত করে— যেমন, অন্যতম বিশ্বাস তাদের ও প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর শক্তির আপেক্ষিকতা সম্পর্কিত। প্রতিদ্বন্দ্বীর পরাজয় অনিবার্য, এ বিশ্বাস সবক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়। কিন্তু শত্রু অপ্রতিরোধ্য নয়, এ বিশ্বাস না থাকলে সংঘবদ্ধ আন্দোলন সহজসাধ্য নয়। কৃষকদের বিচার বস্তুনিষ্ঠ নাও হতে পারে; হয়তো তাদের ক্ষমতাকে তারা অতিরঞ্জিত করেছে, বা শত্রুর শক্তিকে যথাযথ মূল্য দেয়নি। ঐতিহাসিক কাজ এ বিশ্বাসের বাস্তব ভিত্তি যাচাই করা, তাকে চিহ্নিত করা এবং যথাসম্ভব ব্যাখ্যা করা।
আন্দোলনের প্রাথমিক ও পরবর্তী পর্যায়গুলির সঙ্গে কৃষকদের সাম্প্রতিক শ্রেণি সম্পর্কের সংযোগ অনেক ক্ষেত্রে অপ্রত্যক্ষ। প্রায়ই দেখা গেছে, বিদ্রোহীদের প্রাথমিকভাবে ঘোষিত লক্ষ্য পরে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। যে ধারণার উপর কোনো নূতন লক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত, তার উৎস কৃষকদের অতীত দিনের যৌথ স্মৃতি; সে অতীত কোথাও বা সুদূর, কোথাও নিকট। বহু বাস্তব অভিজ্ঞতা এ স্মৃতিতে বিধৃত হয়ে আছে, কিন্তু তাই স্মৃতির একমাত্র উপাদান নয়। সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য কৃষকদের সহজাত আকাঙ্ক্ষা, অনিবার্য আশাভঙ্গ, নূতন স্বপ্ন রচনা, এবং আরো অনেক কিছু স্মৃতির পরিমণ্ডল গড়ে তোলে। অতীতের প্রায়-বিস্মৃত এমন মুহূর্তও নূতনভাবে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। তাই, কৃষকদের সাম্প্রতিক শ্রেণি-সম্পর্ক এ অতীত-চারণা, ইতিহাস-চেতনার একটি উপলক্ষ্য মাত্র। অর্থাৎ যে ধারণা ও বিশ্বাস প্রভাবিত হয়ে বিদ্রোহীরা তাদের লক্ষ্য স্থির করে তা অত্যন্ত জটিল। কৃষক বিদ্রোহে ধর্মচেতনার ভূমিকা আলোচনা প্রসঙ্গে এর কয়েকটা বিশেষ দিক প্রথমেই উল্লেখ করতে চাই। বিদ্রোহী কৃষকদের মানসিকতার উৎস বহুমুখী, অন্যান্য অনেক প্রভাবের সঙ্গে ধর্মচেতনাও নানাভাবে মিশে থাকে। যে ধর্মবিশ্বাস কৃষক আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে, বহুক্ষেত্রে কৃষকদের পুরনো ধর্মবিশ্বাস থেকে স্বতন্ত্র। পুরনো ধর্মবিশ্বাস যদি থাকেও বা, তার অর্থ পরিবর্তিত হয়ে গেছে; বা কৃষকেরা সচেতনভাবে তার অংশবিশেষ বেছে নিয়েছে। তাছাড়া ধর্মচেতনার বিশিষ্ট ভূমিকা আন্দোলনের সব পর্যায়ে সমান থাকে না। সাধারণত, এ ভূমিকা তখনই স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, যখন বিদ্রোহী কৃষক বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় সম্পূর্ণভাবে আস্থা হারিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের কথা ভেবেছে; কারণ তাদের সুদৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এ ছাড়া ‘প্রভু’ শ্রেণির কর্তৃত্বের অবসান ঘটানো সম্ভব নয়। অর্থাৎ এ ধর্মচেতনার ভূমিকা এক বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য-ভাবে সম্পৃক্ত।
ধর্মের প্রভাবের দিক থেকে বিচার করলে দু’ধরনের আন্দোলন দেখা যায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এ প্রভাব একান্তই সীমিত; এখানে ধর্মবিশ্বাসের ভূমিকা প্রধানত আন্দোলনের সংহতিরক্ষায়। দ্বিতীয় ধরনের আন্দোলনে এ প্রভাব অনেক সুদূরপ্রসারী এবং গভীর। এখানে বিদ্রোহের যৌথ সিদ্ধান্ত ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। সংগঠনের মূল শক্তি ধর্ম-প্রভাবিত কোনও কোনও বিশ্বাস। নেতার প্রতি অবিচল আনুগত্যের একটা প্রধান উৎস ধর্মীয় ধারণা। আন্দোলনের উপায় ও লক্ষ্যেও ধর্ম-বিশ্বাসের গভীর প্রভাব। তবে ধর্মবোধ অপরিবর্তনীয় কিছু মোটেই নয়, অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে ধর্মীয় ধারণাও পাল্টে গেছে। কৃষক আন্দোলনের উপর ধর্মের গভীরতর প্রভাবের দৃষ্টান্ত হিসেবে নিম্নলিখিত আন্দোলনকে আমরা বেছে নিয়েছি: ময়মনসিংহের শেরপুর অঞ্চলে ‘পাগলপন্থী আন্দোলন’ (১৮২৪-১৮৩৩)। এক নূতন ধর্মীয় সম্প্রদায়ভুক্ত (‘পাগলপন্থী’) এবং নানা উপজাতির অন্তর্ভুক্ত কৃষকদের এ আন্দোলনের দু’টি প্রধান পর্যায়– গোড়ার দিকে জমিদারী অপশাসনের বিরুদ্ধে এবং ১৮২৪ সালের শেষের দিক থেকে সম্মিলিত জমিদার ও ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে। ‘পাগল-পন্থা’র প্রবর্তক করিম শাহ। তাঁর মৃত্যুর (১৮১৩) পর তাঁর পুত্র টিপুর আমলেই এ নূতন ধর্মীয় গোষ্ঠী ক্রমেই কৃষকদের প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। আন্দোলনের উপর ধর্মীয় প্রভাবের রূপ ও চরিত্র বিশ্লেষণের আগে আন্দোলন সম্পর্কে কয়েকটা ব্যাখ্যার উল্লেখ প্রয়োজন, বিশেষ করে যেখানে কৃষকদের ধর্ম ও রাজনীতির আন্তঃসম্পর্ক আলোচিত হয়েছে। তাদের বিশ্লেষণ পদ্ধতি এবং কোনও কোনও সিদ্ধান্ত আমার কাছে অবশ্য সম্পূর্ণভাবে গ্রহণীয় নয়। প্রথম ব্যাখ্যা ভিলেম শেণ্ডেলের (Willem Schendel) – পাগলপন্থী আন্দোলন সম্পর্কে।১ তাঁর সিদ্ধান্ত :
(ক) পূর্ববর্তী তিন-চার দশক ধরে জমিদারদের কার্যকলাপে কৃষকেরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।এ আন্দোলন তাই অনিবার্য ছিল।
(খ) এটা আসলে ‘বহু ধর্মের ও জাতির’কৃষক আন্দোলন, কারণ ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে আন্দোলনকারীদের অনেকেই পাগল-সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল না। কিন্তু নেতৃত্ব পাগলপন্থীদের হাতে ছিল বলেই সবাইকে নির্বিচারে পাগল বলা হত।
(গ) আসল সংঘর্ষের সময় পাগল সম্প্রদায়ের তিন প্রধান, করিম, টিপু ও তার মা, প্রত্যক্ষ কোনও অংশ নেয়নি। তাদের ভূমিকা ছিল একান্তই প্রতীকী।
(ঘ) এমন কি প্রতিরোধের ডাক তাঁরা দেননি, বিদ্রোহী কৃষকেরা তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে।
(ঙ) শেণ্ডেল-এ আন্দোলন সম্পর্কে ফুক্স-এর সিদ্ধান্তও মানেন নি। ফুক্স২ মনে করেন, এ আন্দোলন সর্বতোভাবে ‘স্বর্ণযুগ’ সম্পর্কিত বিশ্বাসের দ্বারা প্রভাবিত। শেণ্ডেলের মতে, অতিপ্রাকৃত শক্তির হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে নূতন আদর্শ জগৎ ও সমাজ গড়ে উঠবে, বিদ্রোহীদের এরকম স্পষ্ট কোনও দর্শন ছিল না। অতিপ্রাকৃত শক্তির ভূমিকা সম্পর্কে কৃষকেরা বলত বটে, কিন্তু এর উপর তাদের নির্ভরশীলতা ছিল একেবারেই সীমাবদ্ধ।
(চ) তাদের লক্ষ্যও ছিল একান্তই সীমিত : সরকারি বিধি-বিধান-নিয়ন্ত্রিত জমিদারী প্রথা। রাজশক্তি সম্পর্কে তাদের আক্রোশের প্রধান কারণ, জমিদারদের অবৈধ ক্ষমতার যথেচ্ছ অপব্যবহার বন্ধ করার জন্য সরকারের কাছে তাদের আবেদন নিবেদনে কোন ফল হয়নি।
(ছ) ধর্মের যদি কোন ভূমিকা থাকে, তা পাগলপন্থীদের সংগঠনের জন্য; আগে থেকেই তা ছিল; বিদ্রোহের সময় তা বিশেষভাবে কার্যকরী হয়েছে।
প্রতিরোধের সংগঠনের উপর ধর্মের প্রভাব সম্পর্কে শেণ্ডেলের শেষ সিদ্ধান্ত তাঁর নিজস্ব যুক্তি অনুসারে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, এ অঞ্চলের কৃষকেরা বহু ধর্ম, বহু জাতিভূক্ত। অবশ্য এত ভিন্নতা সত্ত্বেও তারা এক হতে পারত, যদি তারা বিশ্বাস করত, তাদের মধ্যে এক ‘পরিত্রাতা’-র আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁর প্রভাব ধর্ম ও জাতিগত বিভেদবোধ ভুলিয়ে এক নূতন ঐক্যবোধের সৃষ্টি করতে পেরেছে। কিন্তু শেণ্ডেল-এ আন্দোলনে এ ধরনের পরিত্রাতার ভূমিকা স্বীকার করেন না।
অপর একটি ব্যাখ্যায় ধর্মকে কৃষকদের মধ্যে এক বৈপ্লবিক মানসিকতা সৃষ্টির উৎস হিসেবে শুধু দেখানো হয়েছে। এ মানসিকতার বিশিষ্ট রূপ, বিদ্রোহী কৃষকদের কর্মপ্রয়াসে এক গভীর বিশ্বাসের অনুপ্রেরণা। এ বিশ্বাস মতে, দিব্যশক্তি-অনুপ্রাণিত এবং নির্দেশিত এক পরিত্রাতার নেতৃত্বে কৃষকেরা এক আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে, সেখানে এক শ্রেণির উপর অন্য শ্রেণির প্রভুত্ব থাকবে না। নূতন সমাজের বনিয়াদ সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্ব। শোষণ এবং অসাম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কৃষকদের জয় অনিবার্য, কারণ তা ঈশ্বরের অভিপ্রায়। কৃষকরা তাই শুধু নিজের সীমিত শক্তির উপর নির্ভরশীল থাকবে না; দৈবীশক্তির প্রভাবে প্রবল শত্রুকূলের পরাক্রম খর্ব হবে। এ ব্যাখ্যার প্রধান প্রবক্তা স্টিফেন ফুক্স। কিন্তু ধর্ম- প্রভাবিত আন্দোলনের এটাই একটি মাত্র বা প্রধান লক্ষণ নয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেখা গেছে আন্দোলনের বিশেষ কোনও মুহূর্তে এ বিশ্বাস সক্রিয় ছিল; কিন্তু পরে তা দুর্বল হয়ে গেছে, বা অন্য ধরনের প্রভাবে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। তাছাড়া, কোন বিশেষ অবস্থায় এ ধরনের বৈপ্লবিক আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে, তার বিশ্লেষণ ঐতিহাসিকের একটা প্রধান দায়িত্ব।
ধর্ম-প্রভাবিত কৃষক-আন্দোলনগুলির এক বিশেষ সরকারি ভাষ্যও আছে।৩ এর উল্লেখ প্রাসঙ্গিক, কারণ বিদ্রোহীদের সম্পর্কে সরকারি নীতি প্রধানত এর দ্বারাই নির্ধারিত হয়েছে। এ ভাষ্যের কয়েকটা প্রবণতা লক্ষণীয়। এক মতে কৃষক বা উপজাতিদের ধর্মবিশ্বাস ‘কুসংস্কার’ বই কিছু নয়। কেন এ বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলা যাবে, তার কোনও সঙ্গত ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। বিশেষ করে, উপজাতিদের ধর্ম-বিশ্বাস সম্পর্কে সরকারি মহলে স্পষ্টতই এক অবজ্ঞার ভাবও ছিল; তা হল যে সভ্যতা-সংস্কৃতির দিক থেকে উপজাতিরা হিন্দু সম্প্রদায়ের থেকে অনেক নিকৃষ্ট। এমনকি উপজাতিদের আন্দোলনে ব্যাপক হিংসার প্রয়োগকে তাদের ধর্মবিশ্বাসের ফল বলেই সরকারি মহলের কেউ কেউ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আরও একটা ধারণার উপর সরকারি ভাষ্য নির্ভরশীল। তা হল : আন্দোলনের শুরু নেতাদের উদ্যোগেই, সাধারণ কৃষক তাদের নির্দেশকে অনুসরণ করেছে মাত্র। নেতার উদ্যোগ কিন্তু আদৌ নিঃস্বার্থ নয়, বহু ক্ষেত্রে সে ‘ধাপ্পাবাজ প্রবঞ্চক মাত্র।’ আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধি তার লক্ষ্য, আন্দোলনের খরচ চালানোর অজুহাতে আদায় করা অর্থ প্রধানতঃ সেই আত্মসাৎ করত। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কৃষকেরা এ ‘চাঁদা’দিত না; তা আসলে জোর করে আদায় করা হত। প্রবঞ্চনার দায়ে নেতার বিরুদ্ধে সরকারের ফৌজদারী মামলা তাই যুক্তিসঙ্গত। নেতা মিথ্যা ছলনায় কৃষকদের বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল, এর কারণ, তাদের স্বাধীন বিচার-বুদ্ধির অভাব, বিশ্বাস প্রবণতা, নেতা— বিশেষ করে ধর্মগুরুর প্রতি অন্ধ আনুগত্য।
বিদ্রোহের নৈতিক এবং ধর্মীয় ভিত্তি
ওয়াহাবি-ফরাজী আন্দোলনের মতো ময়মনসিংহ জেলার শেরপুর অঞ্চলের পাগলপন্থী আন্দোলনও বহুলাংশে এক ধর্মীয়গোষ্ঠী-নির্দেশিত। এ গোষ্ঠীর উদ্ভবও হয়েছিল আন্দোলনের মাত্র কয়েক দশক আগে। এখানেও আন্দোলনের প্রাথমিক প্রেরণা ছিল ধর্ম ও সমাজসংস্কার, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তা কৃষকদের প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ঐ বিশেষ সময়কার পাগলপন্থীদের ধর্মবিশ্বাস, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন, আচার, রীতি-নীতি সম্পর্কে আমাদের ধারণা সুস্পষ্ট নয়। এ সম্পর্কে একমাত্র সমসাময়িক বিবরণ বিদ্রোহের উপর মরিসন-লিখিত সরকারী প্রতিবেদন।৪ স্পষ্টত বিদ্রোহীদের সম্পর্কে মরিসনের বিন্দুমাত্র সহানুভূতি ছিল না। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সংস্কৃতিকে বোঝার জন্য শুধু বৈজ্ঞানিকের নিরাসক্ত দৃষ্টিই যথেষ্ট নয়; সে সংস্কৃতিভুক্ত মানুষগুলির সম্পর্কে এক গভীর সহমর্মিতাবোধ না থাকলে তাদের বিশ্বাসের অন্তরঙ্গ জগতে পৌঁছানো সম্ভব নয়। রাজ প্রতিনিধি মরিসনের কোনওটাই ছিল না। তবুও এ বিবরণ থেকে কিছু কিছু তথ্য ও ইঙ্গিত মেলে। শেরপুর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অধিবাসীদের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনে বিকৃতি ও উচ্ছৃঙ্খলতা লক্ষ্য করে তিনি এ সংস্কারের কাজে ব্রতী হন। কিন্তু তার অনুগামীদের জীবন-চর্চা প্রচলিত রীতি-নীতি থেকে এতই ভিন্ন ছিল যে, অন্যরা তাদের ‘পাগল’ বলে ডাকত। করিমের ব্যাপক প্রভাবের দুটি প্রধান কারণ— তাঁর পূতচরিত্র, ধর্মনিষ্ঠা; এবং অলৌকিক ক্ষমতা, ‘যাদু-বিদ্যা’ কুশলতা। সুষঙ-এর জমিদার নিজেই তার জমিদারীর অন্তর্গত লাটেরকান্দী গ্রামে তার বসবাসের ব্যবস্থা করেন। শিষ্যদের দানেই করিম-পরিবারের ভরণপোষণ চলত।
পুত্র টিপুকেই করিম ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব দেন। প্রধানত তার উদ্যোগেই শিষ্য সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। সরকারি প্রতিবেদন মতে, করিমের মৃত্যুর (আনুমানিক ১৮১৩) পর পাগল-পন্থা ও সংগঠনে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। সংগঠন পরিচালনার ভার পড়ে তার স্ত্রী ও পুত্রের উপর। শিষ্যরা বিশ্বাস করত, গুরুপত্নীও (মা-সাহেবা) অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্না। কিন্তু মরিসনের ধারণায়, টিপুর না ছিল পিতার আদর্শনিষ্ঠা, না ছিল কোনও বিদ্যাবুদ্ধি; স্থানীয় জনসাধারণের নৈতিক জীবন-শুদ্ধির কোন প্রয়াস তার ছিল না, শুধু তাই নয়, তার জীবনে তাদের ‘কুসংস্কারের’প্রভাব বাড়তে থাকে; তাদের অন্ধবিশ্বাসের তাগিদেই যাদু-বিদ্যার নানা কারুকলা দেখানোর দিকে তার প্রবণতা বাড়ে। এভাবেই শিষ্যদের উপর তার বিপুল প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। করিমের প্রতি মরিসন শ্রদ্ধাবান; কিন্তু টিপুর চরিত্রে প্রশংসা করার মতো তিনি কিছুই দেখেননি। রাজ-বিরোধী বিদ্রোহের নেতা টিপুর চরিত্র চিত্রণে রাজ প্রতিনিধির দৃষ্টিতে পক্ষপাত অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাঁর বিবরণের কয়েকটি দিক কিন্তু লক্ষণীয় : যেমন, শেরপুর অঞ্চলে নানা ধর্ম ও উপজাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান; পাগল-পন্থার সাম্প্রতিকতা; ‘পাগল-পন্থা’র প্রবর্তক করিম শা’র ফকির হিসেবে পরিচিতি; করিম অনুগামীদের ‘পাগল’ আখ্যা; করিমের বিপুল প্রভাব; এর একটা কারণ হিসেবে করিমের অলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে শিষ্যদের বিশ্বাসের উল্লেখ, এবং টিপুর আমলে পাগল-সংগঠনে দ্রুত পরিবর্তন।
স্টিফেন ফুকস্ পাগল-পন্থাকে ‘ইসলাম পুনরুজ্জীবন’ আন্দোলনের মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন। ওয়াহাবি-ফরাজী আন্দোলনের সঙ্গে এ বৃহত্তর পুনরুজ্জীবন আন্দোলনের যে প্রত্যক্ষ যোগ, পাগল-পন্থার ক্ষেত্রে তা মোটেই ছিল কিনা বলা শক্ত। এ প্রসঙ্গে দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। ওয়াহাবি-ফরাজী গুরুর প্রচার ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল, ভ্রান্ত বিশ্বাস ও আচার থেকে মুসলমানদের ইসলামের আদি অনাবিল ধর্মবিশ্বাসে ফিরিয়ে আনা। পাগল-পন্থার প্রচার ও আকর্ষণ মোটেই এ বিশেষ ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, নানা ধর্ম-সম্প্রদায়ের লোক করিমের শিষ্য হয়েছে। বস্তুত পাগল-পন্থায় দীক্ষার জন্য কোন বিশেষ ধর্ম-সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ ছেড়ে আসার প্রয়োজন সম্ভবত ছিল না। দ্বিতীয়ত, ইসলামের নির্দেশ করিম সচেতনভাবে লঙ্ঘন না করলেও তাঁর সাধন-পদ্ধতির বিশিষ্ট একটা ধারা ছিল। ইসলামীয় দর্শনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হলেও সে ধারা এত ভিন্ন (সুফী) যে এর অনুগামীদের মুসলমান সমাজে স্বতন্ত্র এক গোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করা যায়। বস্তুত এ পদ্ধতির এমন কিছু ধর্মীয় ও সামাজিক তাৎপর্য ছিল, বহু ক্ষেত্রে এরা ইসলাম-বিরোধী বলে নিন্দিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য এই যে, ইসলামের আদি আদর্শ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী ওয়াহাবি-ফরাজী নেতাদের তীব্রতম সমালোচনায় একটা প্রধান লক্ষ্য ছিল এরা।৫
বলাই বাহুল্য, করিম শাহের বিপুল প্রভাবের কারণ সুফী সাধন-পদ্ধতির পুনঃপ্রবর্তন নয়। সুফী বা বাউল সাধনার কঠিন পথ যে অনেকের কাছেই আকর্ষণীয় ছিল না, তা ধরেই নেওয়া যায়। মরিসন খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন, সাধারণ মানুষের উপযোগী করে করিম নিজের ধর্মাদর্শ প্রচার করেন। কিন্তু সে আদর্শ সম্পর্কে তার প্রতিবেদনে বিশেষ কিছু বলা হয়নি, শুধু প্রীতি ও সৌভ্রাত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নৈতিক বিধানগুলি সহজ, সরল; ইন্দ্রিয় সংযম, সত্যবাদিতা ক্রোধজয়, পরনিন্দা পরিহার— পাগলগুরু এসব চারিত্রিক গুণের উপর বিশেষ জোর দিতেন। কতগুলি বিধান সম্ভবত স্বল্প-সংখ্যক অনুগামীর জন্য নির্দিষ্ট ছিল, যেমন কঠোর শৃংখলার সঙ্গে রোজা পালন করা। “পাগলরা দিন ও রাত ধরেই উপবাস করত, সন্ধ্যার পরে রোজার মত উপবাস ভাঙতো না!” সবার পক্ষে এ নিয়ম মানা অসম্ভব ছিল। করিমের সামাজিক দর্শনও ছিল সহজবোধ্য, যেমন ঋণের জন্য সুদ দাবী না করা, পণ না নেওয়া, ভগবান ছাড়া কারো অধীনতা স্বীকার না করা ভগবানের রাজ্যে কাউকে ‘সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত না করা’ ইত্যাদি। প্রেম ও ভ্রাতৃত্ববোধের আদর্শ আগেই উল্লেখ করেছি। এ সামাজিক দর্শনে মৌলিকত্ব হয়তো বিশেষ ছিল না; কিন্তু জমিদারী অপশাসন-ক্লিষ্ট কৃষককুলের কাছে এ প্রচারের মূল্য ছিল অপরিসীম। বিশেষ করে এ প্রচার একেবারে সাম্প্রতিক। বিশেষ এক পরিবেশে, বিশেষ এক ব্যক্তিত্বের ছোঁয়ার অতি পরিচিত কথাও প্রাণময়, গভীর অর্থবহ হয়ে ওঠে। অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওয়াহাবি-ফরাজীরা জোর করে নিজেদের মত চাপাতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু ভিন্ন ধর্মমত ও আচার সম্পর্কে করিমের ঔদার্য অনেক বেশী। সেজন্য বিভিন্ন ধর্ম-গোষ্ঠীর কৃষকের কাছে করিমের আদর্শের একটা সহজ আকর্ষণ ছিল। তাছাড়া, যাদের মধ্যে করিম নূতন আদর্শ প্রচার করেন, তাদের ধর্ম বিশ্বাস ও নীতি এমন কোনও অনড় কাঠামোতে আবদ্ধ হয়নি, যা অতিক্রম করে এ আদর্শে সাড়া দেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন ছিল। এ অঞ্চলে নূতন আবাদযোগ্য জমি লাভের আশায় নানা উপজাতি এবং অন্যান্য গোষ্ঠীভুক্ত কৃষকেরা ক্রমান্নয়ে বসতি স্থাপন করে, নানা উপজাতির মিশ্রণের ফলে তাদের আদি সমাজ-সংগঠন, ধর্মবিশ্বাসও অনেকখানি পাল্টে যায়। উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে যে ধরনের যৌথ সমাজব্যবস্থা দেখা যায়, এখানে তা অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিদ্রোহের ঘটনা পরম্পরা
করিমের মৃত্যুর (১৮১৩) পর থেকে পাগলপন্থী সংগঠনে পরিবর্তন ঘটে। অন্তত এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে টিপুর আমলেই পাগলপন্থীদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। মরিসনের ভাষ্য অনুসারে, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই শেরপুরে এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে টিপু নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব কায়েম করে। পাগল দলের কোনও কোনও কাজকে মরিসন স্রেফ ডাকাতি বলেছেন। এ কাজের বিস্তারিত বিবরণ নেই। তবে জমিদার-কৃষক সম্পর্কে তিক্ততা তখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যে ‘ডাকাতি’ হয়তো জমিদার-বিরোধী সংঘর্ষের কোনও ঘটনা ছিল। সরকারী আইনে সংঘবন্ধ প্রতিরোধকে বর্ণনা করার অন্য কোনও ভাষা নেই। পাগলপন্থী কৃষক বিক্ষোভের সব চাইতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠার জন্য সঙ্ঘবদ্ধ সংগ্রামের সিদ্ধান্ত। ১৮২৩/২৪ সাল পর্যন্ত পাগলপন্থী আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সীমিত– জমিদারের বে-আইনী কাজে বাধা দেওয়া; অবৈধ আবওয়াব আদায়ের চেষ্টা প্রতিরোধ করা। কোথাও তারা একথা বলেনি যে জমিদারী কর্তৃত্বের অবসান হোক৷ সহিংস প্রতিরোধ কোনও কোনও ক্ষেত্রে অনিবার্য হয়ে পড়েছিল; কিন্তু আন্দোলনের প্রধান রূপ ছিল, সম্মিলিতভাবে আদালতে জমিদারের দাবীকে বে-আইনী প্রমাণ করা। আদালতে গিয়ে কোনও সুরাহা হচ্ছিল না বলে তারা ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছিল। আইন-মাফিক প্রতিরোধের ভঙ্গীও মোটেই গতানুগতিক ছিল না। সাধারণত বাদী ও বিবাদী পক্ষ নিজেদের বক্তব্যের ন্যায্যতা প্রমাণ করার জন্য উকিল ইত্যাদি মধ্যবর্তী গোষ্ঠীর উপর নির্ভর করে। পাগলপন্থীরা শুধু এতেই নিশ্চিন্ত হতে পারেনি, দল বেঁধে তারা আদালতের কাছে জমায়েত হত।
১৮২৪ সালের শেষের দিকে এ আন্দোলনে মৌলিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আন্দোলনের লক্ষ্য তখন শুধুমাত্র জমিদারী স্বৈরাচারের প্রতিরোধ নয়; জমিদারতন্ত্র ও কোম্পানীরাজের অবসান ও স্বাধীন পাগলরাজের প্রতিষ্ঠা। তাদের বিশ্বাস ছিল, এ লক্ষ্য দুঃসাধ্য কিছু নয়; কারণ তাদের নেতাদের অলৌকিক ক্ষমতার জন্য তাদের প্রতিরোধ দুর্জয় হবে। আন্দোলনের এ মৌলিক পরিবর্তনের পটভূমিকা হিসেবে দুটো প্রধান ঘটনাকে চিহ্নিত করা যায়। প্রথম ইঙ্গ-ব্রহ্মযুদ্ধের ফলে (১৮২৪-২৬) নানাভাবে জমিদারদের প্রজা পীড়নের তীব্রতা হঠাৎ বেড়ে যায়। দ্বিতীয় ঘটনা– বিদ্রোহীদের মানসিকতায় গুরুত্বপূর্ণ এক পরিবর্তন; তাদের এক দৃঢ় প্রত্যয় যে ব্রিটিশরাজ জমিদার বিরোধী কোনও স্থায়ী ব্যবস্থা নেবে না। আসলে, বিদ্রোহীদের এ নূতন উপলব্ধিই আন্দোলনে এ মৌলিক পরিবর্তনের প্রধান কারণ। ‘স্বর্ণযুগ’ আবির্ভাবের নিশ্চিত সম্ভাবনায় বিশ্বাস দ্বারা অনুপ্রাণিত সব কৃষক বিদ্রোহেই এ উপলব্ধির প্রধান ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। এ ধরনের আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের মধ্য দিয়ে শোষক শ্রেণীর প্রভুত্বের অবসান ঘটানো। স্বভাবতই যত দিন এ বিশ্বাস থাকে যে তদানীন্তন রাষ্ট্র ব্যবস্থা শোষক গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারবে, কৃষকদের ন্যায্য দাবীকে সহানুভূতির সঙ্গে বিচার করবে, অর্থাৎ রাজশক্তি প্রকাশ্যে জমিদার বা অন্য প্রবল শ্রেণির পক্ষ নেবে না; তত দিন বিকল্প রাজনৈতিক কর্তৃত্ব লাভের প্রশ্ন আসে না। এ বিশ্বাস ভেঙ্গে গেলেই এ ভিন্ন মানসিকতার জন্ম হয়। এমন নয় যে রাজশক্তির ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে কৃষকদের আগে কখনও অবিশ্বাস বা সন্দেহ জন্মেনি। কিন্তু নানা কারণে সে সন্দেহ এক নিশ্চিত প্রত্যয়ে রূপান্তরিত হয়নি। তা ছাড়া, এ নূতন ধরনের আন্দোলন শুরু করার আগে কৃষকদের নানা দিক বিচার-বিবেচনা করতে হয়; কারণ এতে ঝুঁকি অনেক; পরাজয় শোষক শ্রেণির ক্ষমতা আরও মজবুত করবে, এটাও তারা জানত। তাই সংকল্পকে কার্যকরী করার আগে কৃষকদের মনে আসে নানা সতর্ক বিচার, দ্বিধা, সংশয়। এ নূতন আন্দোলন আরম্ভ করার সিদ্ধান্ত নিতে বহুদিন সময় লেগেছিল। ঝোঁকের মাথায় বিদ্রোহীরা কিছু করেনি।
কিন্তু নূতন আন্দোলনের আগে যে ঘটনাগুলি কৃষকদের বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল, তার প্রায় সবগুলির সঙ্গে সরকারের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র ছিল। এ ঘটনাগুলির তাৎপর্য শুধু আগেকার মত অতিরিক্ত খাজনা বা আবওয়াবের দাবী নয়, সমগ্র আঞ্চলিক কৃষি-অর্থনীতির উপর এতে এক গুরুভার বোঝা চাপে। শুধু তাই নয়, আগে সংঘবদ্ধ কৃষকেরা নানাভাবে অতিরিক্ত খাজনার দাবী বেশ কিছুদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারত। এখন তার কোনও উপায় থাকল না। নূতন ঘটনাগুলি ব্রহ্মদেশের সঙ্গে ইংরেজের যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত। সামরিক প্রয়োজন বলেই এ সম্পর্কিত সরকারী সব নির্দেশ অতি দ্রুত কার্যকরী করতে হত। অথচ এ প্রয়োজন মেটানোর জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা সরকার নিজে করতে পারত না, জমিদারের উপর নির্ভরতা তাই অপরিহার্য ছিল। আর এ জরুরী অবস্থায় সরকারের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রজা-পীড়ন প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।৬ দূর বার্মা সীমান্তে যুদ্ধের প্রয়োজনে সৈন্য চলাচল করত এক দীর্ঘ নূতন রাস্তা ধরে; শেরপুরের পাশ দিয়েই এ রাস্তা গিয়েছিল। এ অঞ্চলের কৃষি-অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত শ্রম প্রায় অনুপস্থিত ছিল। কৃষিতে নিয়োজিত প্রযুক্তিতে এমন কোনও উন্নতি হয়নি, যার ফলে জমির উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে যেতে পারত এবং চাষবাসের কাজ অপেক্ষাকৃত কম শ্রম দিয়ে চালানো যেত। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যে শেরপুরে নূতন রাস্তা বানানোর বেশীর ভাগ কাজ করতে হয়েছিল ১৮২৪ সালের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত; এবং নভেম্বরেই সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিরোধের সূচনা। শ্রমের প্রয়োজন তো শুধু রাস্তা বানানোর জন্য নয়। সামরিক নানা কাজের জন্যই তো শ্রমের দরকার—বিশেষ করে বিরাট সৈন্যবাহিনী যখন সীমান্তের দিকে এগোচ্ছিল।
জমিদার মজুরদের যথোচিত মূল্য দিচ্ছিল না বা দিতে পারছিল না। তারা হয়তো ভেবেছিল জমিদারের হুকুম মেনে চলা প্রজার অবশ্য করণীয়, মজুরি দিতে না পারলেও প্রজাদের প্রতিবাদ দস্তুর সম্মত হবে না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে একসঙ্গে অত মজুরী যোগানো জমিদারের পক্ষে সহজসাধ্য ছিল না। আইন অনুযায়ী সরকার জমিদারের প্রয়োজনীয় এ অর্থ দিতে বাধ্য ছিল। শেরপুরের জমিদারদের অভিযোগ, সরকার থেকে তাদের প্রাপ্যের অতি সামান্য অংশই নির্দিষ্ট সময়ে তারা পেয়েছে। এ অভিযোগ পরের সরকারী অনুসন্ধানে সত্য বলে প্রমাণিত হয়। সরকারী নির্দেশ পালনে জমিদারের অসুবিধের আর একটা কারণ হল রাস্তায় দিনমজুর হিসেবে খাটতে অনেক কৃষকদের তীব্র আপত্তি ছিল। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের দিনমজুরীতে তাদের জাত যাবে। এমনিতে দিনমজুর খাটার প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। জাত খোয়া যাবে— এ অভিযোগে তারা অন্যের জমিতে মজুরী নিয়ে কাজ করতে অনিচ্ছুক ছিল, এমন দৃষ্টান্ত সুলভ নয়। অনুমান করা যায়, জমিদারের ঠিকাদারদের কাজের পদ্ধতি কৃষকদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। একইভাবে, গ্রাম থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন সামরিক উপকরণের জন্যও কৃষকরা ঠিক ঠিক দাম পেত না। সরকারী বিবরণে এ অভিযোগের সত্যতা স্বীকৃত হয়েছে।
শুধু যে শ্রম এবং সামরিক উপকরণের যথাযথ মূল্য থেকে কৃষকেরা বঞ্চিত হয়েছিল তাই নয়। এসব উপকরণ যোগানোর জন্য জমিদারকে অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে, এ অজুহাতে তারা প্রজাদের উপর নূতন এক আবওয়াব বসাল, খরচা রসিদি পল্টন : অর্থাৎ সৈন্যদের রসদ যোগানোর খরচ হিসেবে কৃষকদের এটা দিতে হবে। যেখানে সামরিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য রাস্তা যথেষ্ট ছিল না, জলপথ ব্যবহার অপরিহার্য ছিল, সরকার প্রয়োজনীয় নৌকা সরবরাহের জন্যও জমিদারদের ভার দিল। কৃষক এবং অন্যান্যদের অভিযোগ, এর জন্য দেওয়া মূল্য পর্যাপ্ত ছিল না। তাছাড়া যাদের জীবিকা নৌকার ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত ছিল— যেমন মৎস্যজীবী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তাদের ক্ষতিই ছিল বেশি। কৃষকেরাও বহু ক্ষেত্রে গঞ্জে বা শহরে নৌকায় সওদা বিকিকিনি করত। এমনও ঘটেছে শত্রু যাতে নৌকা ব্যবহারের সুযোগ না পায়, সরকার সে জন্য হুকুমনামা জারি করে বলেছে— সব নৌকা যেন বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হয়। ব্রহ্মযুদ্ধের থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি তাই আগের থেকে গুণগতভাবে পৃথক। অতিরিক্ত খাজনা বা আবওয়াব আদায়ের সঙ্গে যুক্ত জমিদারী স্বৈরতন্ত্রের যা চেহারা, মূল পরিস্থিতিতে তা সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেল। তাছাড়া জমিদার ও রাজশক্তির স্বার্থের অভিন্নতা কৃষকদের কাছে স্পষ্টতর হয়ে উঠল।
সরকারী নথিপত্র থেকে অনুমান করা যায়, বেশ কিছুদিন ধরে তাদের প্রস্তুতি চলছিল। টিপুর এবং তাঁর মার অতিপ্রাকৃত, দৈবীশক্তিতে বিশ্বাস তাদের অনেক দিন ধরেই ছিল। এ অলৌকিক ক্ষমতা প্রয়োগের রূপটাই শুধু এখন পাল্টাল। এখন তারা বিশ্বাস করল, সামরিক সাজসরঞ্জামের দিক থেকে আপেক্ষিক দুর্বলতার জন্য তাদের হীনমন্যতার কোনও কারণ নেই; কারণ টিপুর ও তার মা’র দৈবীশক্তিতে যুদ্ধক্ষেত্রে তারা অপরাজেয় হবে। নেতাদের আশ্বাস বাণীর কথা অতি দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে গেল। শিষ্যরা এখন বিশ্বাস করল— নেতারা যাই ইচ্ছা করবেন, তাই করতে পারেন, এমনকি তাদের মন্ত্রপূত কাঠের বন্দুক ও তলোয়ার সত্যিকারের বন্দুক ও তলোয়ারের মতই কার্যকরী, তবে সে কাঠ যোগাড় করতে হবে এক বিশেষ গাছ থেকে; ব্রিটিশদের কামান পাগলদের দৈহিক কোনও ক্ষতি করতে পারবে না; কারণ নেতার অলৌকিক শক্তি অদৃশ্য দুর্ভেদ্য বর্মের মতো কাজ করবে; মা-সাহেবা যদি ইচ্ছা করেন, তাহলে শুধুমাত্র কাপড় ঝেড়েই লুকানো সৈন্যদলকে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির করতে পারেন।৭
বিকল্প সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার আসন্ন আবির্ভাব সম্পর্কে পাগলদের সব বিশ্বাস টিপুকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। এটা উল্লেখযোগ্য যে, ব্রিটিশরাজের বিকল্প হিসেবেই শিষ্যরা টিপুর সার্বভৌমত্ব কল্পনা করেছিল। সরকারী নথিপত্র থেকে এ বিশ্বাসের কয়েকটা দিক সম্পর্কে আমরা জানতে পারি।৮ সর্বাত্মক প্রতিরোধ শুরু হবার কিছু আগে বা পরে পাগলদের মধ্যে এ বিশ্বাস বিশাল এলাকায় পরিব্যাপ্ত ছিল। প্রতিরোধের শুরুতে টিপুর এক ভবিষ্যদ্বাণীর কথা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে — খুব শীগগির এক নূতন শক্তির আবির্ভাব ঘটবে; ফলে তাদের সব দুঃখ-দুর্দশার অবসান হবে; ব্রিটিশরাজের অবসান আসন্ন; তার বদলে আসবে পাগলরাজের (‘Paugal Patriarch’) নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব; ফকির টিপু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নিজেকে ‘বাদশাহ’ বলে ঘোষণা করবে; জমিদারদের স্বেচ্ছাচার চিরকালের মতো লুপ্ত হবে; আবওয়াব, বেগার-ইত্যাদির অস্তিত্বই থাকবে না; প্রতি ‘কুর’ চাষের জমির খাজনা ধার্য হবে মাত্র চার আনা; নূতন জমির জন্য প্রথম তিন বছর কোনও কিছুই দিতে হবে না। চেতনার রূপান্তর বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। তাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন প্রধানত জমিদারী স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে। নূতন আন্দোলনে সে লক্ষণ অবশ্যই ছিল; কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে পাগলদের স্বাধীন রাজনৈতিক কর্তৃত্বের স্বপ্ন। জমিদার বিরোধী ঘোষণায় অনিবার্যভাবে অবৈধ খাজনা ও আবওয়াব আদায়ের কথা এসেছে; কিন্তু সেখানেও দেখি সম্পূর্ণ নূতন এক ঘোষণা : তারা জমিদারের কর্তৃত্বই স্বীকার করে না— কারণ একমাত্র নিয়মসম্মত কর্তৃত্ব তাদের নেতা টিপুর। টিপুর সার্বভৌমত্বে অন্য সব কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ ভাবে আচ্ছন্ন।
১৮২৫ সালের শুরু থেকে পাগলপন্থী প্রতিষ্ঠার সব ব্যবস্থাই তখন হয়ে গেছে। ‘টিপু পাগলের রাজদরবার’ স্থাপিত হল শংকরপুর নামক জায়গায় তাঁর নিজের বাসস্থানে। ঠিক কোন সময় এ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল, সরকারী বিবরণে তার উল্লেখ নেই। সম্ভবত ফেব্রুয়ারীর গোড়ায় ‘কোষাগার এবং রাজস্ব বিভাগের অধ্যক্ষ’ হিসেবে ‘টপু ভাই সাহেবের’ নাম ঘোষণা করল ‘গোটা পাগল সম্প্রদায়’। সংগঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থাও হল। জোরজুলুম করে টিপুর সাগরেদরা অর্থ আদায় করছে— সরকারী মহলের এ অভিযোগ ভিত্তিহীন। আসলে কৃষকেরা জমিদারকে খাজনা দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে তাদের পাগল রাজাকেই দিচ্ছিল। টিপু নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা করেছে; প্রশাসনের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে তার অনুগামীদের নিযুক্ত করা হয়েছে; রাস্তা তৈরীর কাজ প্রায় বন্ধ; জমিদারকে খাজনা না দেওয়ার জন্য নেতারা কৃষকদের ‘প্ররোচিত’করছে; তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেই যাচ্ছে—পুলিশ হোক বা জমিদারের আমলা-পেয়াদা হোক তাদের হুমকি, শাসানি দেওয়া হচ্ছে— সারা শেরপুর জুড়ে মার্চের গোড়াতেও এ অবস্থা। পাগলপন্থীদের শায়েস্তা করার জন্য পাঠানো হল ময়মনসিংহের ম্যাজিষ্ট্রেট ড্যাম্পিয়ারকে। তাঁর মন্তব্য— শেরপুরের অবস্থাকে ‘প্রায় বিদ্রোহ’ বলা চলে।৯
হতে পারে সন্ত্রস্ত প্রশাসনের বিবরণে খানিকটা অতিরঞ্জন আছে। তবে বিদ্রোহের ব্যাপ্তি সম্পর্কে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। কিন্তু পাগলরা প্রকাশ্যে ব্রিটিশরাজকে উপেক্ষা করছে, তার বদলে নিজেদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে— প্রশাসনের পক্ষে এটা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। সমগ্র আন্দোলনকে ব্রিটিশ সরকার তাই ‘রাজদ্রোহ’ বলে গণ্য করল। শুধুমাত্র পুলিশ দিয়ে এদের দমানো সম্ভব হল না, সৈন্য নামানো হল পুলিশকে সাহায্যের জন্য। নির্দেশ দেওয়া হল, প্রথম সারির নেতাদের কোনও দয়া দেখানো হবে না; তাদের বাড়ীঘর চুরমার করে দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হবে; যেসব ক্ষেত্রে কৃষকেরা ‘হাঙ্গামা সৃষ্টির জন্য বদ্ধপরিকর’, পুলিশ বা সেনাবাহিনী সেখানে বিশেষ ব্যবস্থা নেবে। এভাবে আন্দোলনকে দমন করা হল। সরকার কিন্তু জমিদারী পরিচালনার গলদ স্বীকার করে নিল। কিছু সময়ের জন্য জমিদারদের অপসারণ করে পরিচালনার ভার সরকারি কর্মচারীকে দেওয়া হল। এর উদ্দেশ্য খাজনার হার, পরিমাণ এবং আবওয়াব আদায় ইত্যাদি ব্যাপারে যে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা এতদিন কৃষকদের বিক্ষুব্ধ করে তুলছিল তা দূর করা। কোনও কোনও অযৌক্তিক আবওয়ার বাতিল করা হল। কিন্তু খাজনার হার ইত্যাদি সম্পর্কে মোটামুটি পুরনো ব্যবস্থাই বহাল থাকল। কৃষকেরা বারবার অভিযোগ করেছে খাজনার হার নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি একেবারেই দায়সারাভাবে করা হচ্ছে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে জমিদারী আমলার সাক্ষ্যকেই ধ্রুবসত্য বলে মানা হয়েছে; প্রতিবাদ করেও কোনও সুরাহা হয়নি; বরং তাদের কপালে জুটেছে ‘বর্বরোচিত ব্যবহার’; তাদের পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছে জমিদারের কর্তৃত্ব তাদের মানতেই হবে; এবং প্রচলিত দস্তুর তারা ভাঙ্গতে পারবে না।
প্রতিরোধ তাই আবার অনিবার্য হয়ে উঠল। কিন্তু প্রথম আন্দোলনের প্রায় আট বছর পরে (১৮৩৩) এটা সম্ভব হল। প্রথম পরাজয়ের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে নিতে স্বভাবতই অনেক সময় লেগেছে। কৃষকেরা অনেক মূল্য দিয়ে এটা বুঝতে পেরেছে জমিদার ও ব্রিটিশরাজের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা দুঃসাধ্য। তাই অনেক ব্যাপক প্রস্তুতির পর তারা লড়াইয়ের নামার সিদ্ধান্ত করল। তাছাড়া কৃষকেরা ভেবেছিল, সরকারী হস্তক্ষেপের ফলে খাজনা ইত্যাদি ব্যাপারে তাদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষের কারণ দূর হবে। বিশেষ করে, কিছু সময়ের জন্য হলেও জমিদারদের অপসারণ তাদের খানিকটা আশ্বস্ত করেছিল। আশাভঙ্গ যখন হল, কৃষকেরা আবার বড়ো সংঘর্ষের জন্য নিজেদের সংগঠিত করতে সচেষ্ট হল। এবারকার আন্দোলনের একটা উল্লেখযোগ্য দিক, নেতাদের দৈবীশক্তির উপর নির্ভরতা আগের মতো ছিল না। এ শক্তি গতবারের সংঘর্ষে ব্রিটিশ সৈন্যের কার্যকারিতা কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ করতে পারেনি— এ রূঢ় বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের মোহভঙ্গের একটা সম্ভাব্য কারণ। গতবারের তুলনায় এ প্রস্তুতি যে অনেক উন্নত ধরনের এতে সন্দেহ নেই১০, এর কয়েকটা বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য। পাহাড়ী অঞ্চলের গারোদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ স্থাপন করল, কারণ সম্ভবত দুটি। নূতন অঞ্চলে সংগঠনের বিস্তার বিদ্রোহীদের শক্তি বৃদ্ধি করবে, সমতলের জমিদারদের সঙ্গে পাহাড়ী গারোদের দীর্ঘদিনের তিক্ত সম্পর্কের কথা মনে রেখেই হয়ত বিদ্রোহীরা এ ধরনের চেষ্টা করেছিল। দ্বিতীয়ত, সংঘর্ষ যদি পাহাড়ী অঞ্চলেও ছড়ায়, তাহলে পাহাড়ের ভৌগোলিক প্রকৃতি সম্পর্কে গারোদের জ্ঞান বিশেষ কাজে আসবে। সরকারী বিবরণে, এও বলা হয়েছে, পাগল সৈন্যদলে ‘আসামের ভাড়াটে সৈন্যরা’ও আছে, খুব সম্ভবত গারো পাহাড় সংলগ্ন আসামের কোনও কোনও অঞ্চল থেকে পাগলরা বেশ খানিকটা সমর্থন পেয়েছিল। তাছাড়া তারা প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের জন্যও আগের থেকে অনেক বেশি প্রস্তুত ছিল। সরকারী বিবরণ অনুযায়ী তিনশো বা চারশো জনের নানা দল বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিল; মূল বাহিনীতে ছিল প্রায় তিন হাজারের মতো পাগল; জোনাকী পাত্র তার অধিনায়ক; অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে অবশ্য নতুনত্ব নেই— বর্শা, ধনুক, বিষ-মেশানো তীর এবং কয়েকটা মাত্র বন্দুক। প্রয়োজন হলে অবশ্যই তারা রণকৌশল পরিবর্তন করত। যেমন, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে চাইলে তারা গারো পাহাড়ের নানা অঞ্চলে আত্মগোপন করত। পাহাড়ী গারোদের সঙ্গে যোগাযোগ তখন খুবই কাজে এসেছিল। উন্নততর প্রস্তুতি ও নিপুণ সংগঠনের জন্যই বিদ্রোহীরা বড়ো অঞ্চল জুড়ে নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। প্রথমবারের মত, এবারও তাদের মূল লক্ষ্য নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা।
বিদ্রোহীদের এ সংগঠিত শক্তি স্থানীয় প্রশাসন অকপটে স্বীকার করেছে। “শেরপুর এবং গারো পাহাড়ের মধ্যবর্তী অঞ্চল সম্পূর্ণটাই তাদের দখলে। অধিনায়ক জোনাকি পাত্রের ঘোষণা, শেরপুরে শুধুমাত্র তার কর্তৃত্বই মানা হবে; তার স্পর্ধা এতদূর গেছে যে, সে দূত মারফৎ এ অঞ্চলের এক প্রধান জমিদারকে হুকুম করেছে যেন তাকে অর্থ পাঠানো হয়; যেন জমিদার একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার সামনে হাজির হয়; অন্যথা, তাকে শাস্তিভোগ করতে হবে; তার সম্পত্তি, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হবে।” বস্তুত নূতন হারে খাজনা আদায় বহুদিন জমিদারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। জমিদারের পেয়াদাদের বিদ্রোহীরা পিটিয়ে গ্রাম থেকে বার করে দিত। পেয়াদাদের রক্ষার জন্য শেরপুরের ম্যাজিস্ট্রেট এক উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে পাঠান। বিদ্রোহীরা তাঁকে এবং তার দলবলকে তোয়াক্কাই করেনি। এ রাজপুরুষের প্রতিবেদন— “পাগলদের এমনই দুঃসাহস যে, আমার তাঁবুর পাশের গ্রামের এক তালুকদার ও তার ছয় পেয়াদাকে তারা ধরে নিয়ে গেছে; প্রায় পক্ষকাল তাদের পাহাড়ে আটকে রাখার পর এক পেয়াদা সহ তালুকদারকে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ পাঠিয়েও কোন লাভ হয় না; অন্যদের কোন খোঁজ এখনও নেই।”১১ এক রাজকর্মচারী বেশ কয়েকটা ‘বর্ধিষ্ণু গ্রাম’ ঘুরে দেখেন, সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনও সম্পত্তি নেই; কারণ খাজনা আদায়ের জন্য পুলিশী ব্যবস্থা এড়ানোর জন্য তারা আত্মগোপন করেছে, ক্রোক করার মতো কোনও কিছুই সেখানে অবশিষ্ট ছিল না। কিন্তু যেই না রাজকর্মচারী গ্রাম ছাড়লেন, অমনি আবার তারা স্ত্রী, সন্তান, গবাদি পশু ও জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে এল। কিন্তু আগের বারের মতই দীর্ঘদিন ব্রিটিশ সৈন্যদলের সঙ্গে তারা পেরে ওঠেনি।
উপসংহার
কৃষক তার দাবিদাওয়ার লড়াই বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই করে। কাছের লোক, জমিদার, আমলা ও বরকন্দাজ-এর উপরই তার চিরকালের রাগ। কারণ তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় তারাই অত্যাচার করে। ‘সরকার’, ‘কোম্পানী বাহাদুর’-এর প্রতি তার মনোভাব দ্ব্যর্থ। যখনই প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ফৌজকে দেখে তখন সে অনেক সময় সরকারের সঙ্গে মোকাবিলা করে। কিন্তু সাধারণত দূরের অপ্রত্যক্ষ শক্তির প্রতি তার মোহের অন্ত থাকে না, তার কাছে সে ন্যায়বিচার চায়। যাদুবিচার বিশ্বাসী ‘সংস্কারাচ্ছন্ন’ কৃষক কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার সুরাহার কথা ভোলেনি। টিপুর ভবিষ্যদবাণীতে খাজনার হার চিরতরে নির্ধারণ করা, বেগারি বন্ধ করা, ন্যায় বিচার করা ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি ছিল। শেরপুরের কৃষকের দৈনন্দিন লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা-ব্যতিরেকে টিপুর ন্যায়রাজ্যের স্বপ্ন দানা বাঁধেনি।
তথ্যসূত্র:
(১) Willem Van Schendel, ‘Madmen of Mymensingh: Peasant Resistance and Colonial Process in Eastern India, 1824-1833’. Indian Economic and Social History Review, April-June, 1985.
(২) Stephen Fuchs, ‘Rebellious Prophets: A Study of Messianic Movements in Indian Religions’ (Asia Publishing House, 1965).
(৩) Report by R. Morrison, ‘Officiating Judge of Circuit’, Dacca, 12 Nov., 1825, para 11.
(৪) Ibid, Para II.
(৫) Q. Ahmed, ‘The Wahabi Movement in India’ (Calcutta, 1966), pp.5-9.
(৬) Morrison, Ibid, para 36-64.
(৭) Ibid, Para 12.
(৮) Ibid, Para 33.
(৯) Bengal Judicial Criminal Proceedings; 1 April, 1825, No.87; W. Dampier, Mymensingh Magistrate to Dacca Court of Circuit, 31 March, 1825.
(১০) Bengal Judicial Criminal Proceedings; 13 May, 1833, Nov. 15-16.
(১১) Dunbar, Mymensingh Magistrate to Commissioner, Dacca Division, 8 Feb., 1833.