সমিত ঘোষ
নিজ খামারে ধান তোল/ আধি নয় তেভাগা চাই/ কর্জা ধানের বাড়ি নাই/ বে-আইনি আদায় নাই/ দল বেঁধে ধান কাটো/ ভলান্টিয়ার বাহিনী গড়ে তোল।
কৃষক সভার ইস্তাহার
১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের পর থেকেই কৃষক সম্প্রদায়রা শোষিত ও বঞ্চিত। ব্রিটিশদের অত্যাচারে সাধারণ কৃষকদের জীবন অতিষ্ট হয়ে ওঠে। করভারে জীবন জর্জরিত হয়ে ওঠে। এদিকে ইংরেজরা ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভ করে ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভ করে। দেওয়ানি লাভের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজদের আধিপত্য এদেশে আরও দৃঢ় হয়। এরপর তারা রাজস্ব আদায়ের ভার পেলেন। এদিকে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় মন্বন্তরেরর ফলে সমগ্র বাংলায় ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। নায়েব সেতাব রায় ও রেজা খাঁর অত্যাচারে গ্রাম বাংলার মানুষ ক্রমাগত নির্যাতিত হতে থাকে। এরপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতে থাকে। একশালা, পাঁচশালা থেকে শুরু করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, রায়তওয়ারি, মহলওয়ারি থেকে শুরু করে ভাইয়াচারি প্রথা প্রবর্তিত হয়। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ সরকার প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়। এই সময় থেকেই বাংলার কৃষকদের দুর্দশা শুরু হয়।
এদিকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সকল শ্রেণির মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই মহাবিদ্রোহ শুরু হয়। ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে এটাই ছিল প্রথম ঐক্যবদ্ধ লড়াই যা ভারতের স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি রাখে। বাংলার কৃষি ও কৃষকদের যখন উন্নতি হচ্ছে না, তখন বেঙ্গল গভর্ণমেন্ট প্রজাদের রক্ষা করবার জন্য ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ‘Bengal Tenancy Act’ চালু হয়। শুধু নামেই আইন হয়। প্রকৃতপক্ষে বাংলার কৃষক, নিরক্ষর রায়তদের অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। আইন প্রবর্তন হলেও কর বৃদ্ধি, বৃটিশদের অত্যাচার, উচ্ছেদ, নির্যাতন এসব চলতেই থাকল। এর ফলে এই অত্যাচারের প্রতিবাদে কৃষক সংগঠনের সূত্রপাত হয়। কৃষক সংগঠনের প্রথম অধিবেশন হয় লক্ষ্ণৌতে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল। এদিকে বাংলাদেশে ১৯২০-২৬ খ্রিস্টাব্দে কৃষক আন্দোলন কৃষক স্বার্থে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করে। কৃষকদের সমস্যার সমাধানের জন্য ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর ফজলুল হক মন্ত্রীসভা বাংলার ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা বিষয়ে তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিশন নিযুক্ত করেন। এই কমিশনের নাম হয় ‘ফ্লাউড কমিশন’। ফ্লাউড কমিশন ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপোর্টে অনেক আশার কথা শোনালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় আগষ্ট আন্দোলন। সারা ভারতব্যাপী এই আন্দোলনে দিনাজপুরও সামিল হয়েছিল। দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলা সদর বালুরঘাট শহরেও আগস্ট আন্দোলনের আঁচ লেগেছিল। এই সময় সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকে ভারতের মুক্তি সংগ্রামে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও (১৯৩৯-৪৫ খ্রি.) শুরু হয়ে গেছে। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। এমত অবস্থায় বৃটিশরাও দিশেহারা হয়ে পড়ে। আবার ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে এক মহামারী মন্বন্তর দেখা দেয়। বস্তুত, এই মন্বন্তর ছিল তেভাগা আন্দোলনের বাস্তব পটভূমি। এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। জমি বিক্রির হার কমে যায়। তারকচন্দ্র দাস এক সমীক্ষায় বলেছেন যে নিঃস্ব ব্যক্তিদের ৪০ শতাংশ ছিল দিনমজুর এবং ৫৪ শতাংশ ছিল তপশিলি জাতিভুক্ত। তিনি আরও বলেন, কলকাতায় প্রায় ৩০ হাজার নারী গণিকাবৃত্তি অবলম্বন করতে বাধ্য হয়।
তেভাগা আন্দোলন ছিল অবিভক্ত বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়। ফ্লাউড কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী ভাগচাষি ও ক্ষেত মজুরদের ফসলের তিনভাগের দুই ভাগ অধিকার এবং জমিদারদের তিনভাগের একভাগের দাবিতে তদানীন্তন যুক্ত বাংলার ২৬টি জেলার মধ্যে উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের প্রায় ১৩টি জেলার এই আন্দোলন ব্যাপক গণসংগ্রামের রূপ নেয়। ১৯৪০ সালের জুন মাসে যশোর জেলার পাজিয়াতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভার চতুর্থ সম্মেলনে তেভাগার দাবি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ১৯৪০-৪১ খ্রিস্টাব্দে তেভাগা অধিকাংশ জেলায় প্রচারধর্মী স্তরে থেকে যায়। ১৯৪৬-এর পর থেকে আন্দোলন ক্রমশ প্রকট রূপ নেয়।
উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর ও রংপুরের প্রায় দেড় হাজার বর্গমাইল এলাকায়, পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহের পঞ্চাশটি গ্রাম, পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের ৩০টি গ্রামে, ২৪ পরগনার সুন্দরবন অঞ্চলের কাকদ্বীপ, ক্যানিং, হাড়োয়া ও হাসনাবাদের এলাকায় মধ্য ও দক্ষিণ বাংলার যশোর ও খুলনার অন্তত ছয়টি থানায় স্বাধীনতার পূর্বযুগে তেভাগা আন্দোলন ব্যাপক গণআন্দোলনের রূপ নেয়। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পাবনা, ঢাকা, হাওড়া, হুগলি, নদীয়া, মালদহ ও রাজশাহি সহ আরও কয়েকটি জেলায়। তেভাগা আন্দোলন দুটো পর্যায়ে বিভক্ত ছিল— প্রথম পর্যায়ে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাস থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত।
তেভাগা আন্দোলন প্রসঙ্গে বিগত বছরে একাধিক গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭০ সালে আন্দোলনের রজতজয়ন্তী বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে আন্দোলনের সংগঠক, নেতা ও কর্মীদের নানা স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক পর্বে তেভাগা আন্দোলন নিয়ে গ্রন্থ লেখেন প্রথিতযশা নানা লেখক ও গবেষক। সুনীল সেনের ‘Agrarian Struggle in Bengal 1946-47’ ডি.এন. ধনগারের ‘Peasant Protest and Politics, The Tebhaga Movement in Bengal 1946-47’, রনজিৎ গুহের ‘Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India’, রত্নলেখা রায়ের ‘Change in Bengal Agrarian Society’, চিত্তব্রত পালিতের ‘Political Economy and Protest in Colonial India’ এ. আর. দেশাই- এর ‘Peasant Struggle in India’, কুনাল চট্টোপাধ্যায়ের ‘তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস’, সুস্নাত দাসের ‘অবিভক্ত বাংলার কৃষক সংগ্রাম’, পিটার কাস্টার্সের ‘Women’s Role in Tebhaga Movement’ অ্যাড্রিয়েন কুপারের ‘Share croping and share cropers Struggle in Bengal 1930-1950’ এছাড়া আঞ্চলিক স্তরেও বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
নভেম্বর, ১৯৪৬ সাল থেকে তেভাগা আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হলেও সরকারি তথ্যানুযায়ী দিনাজপুর জেলায় সক্রিয়ভাবে তেভাগা আন্দোলন শুরু হয় ডিসেম্বরে ধান কাটার ভরা মরশুমে। তেভাগা আন্দোলনে দিনাজপুরের মানুষজন, বিশেষত নিম্নবর্গের মানুষজনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ক্ষেতমজুর, বর্গাদার, আধিয়ারদের মধ্যে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও বীরত্বের চেহারা স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। জেলার কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির নেতারা আধিয়ারদের কাছে আহ্বান জানালো, ধান কাটার পর তারা যেন উৎপন্ন ফসল তাদের নিজেদের খোলানে নিয়ে যায়। জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক তখন সুশীল সেন। ধীরে ধীরে দিনাজপুর জেলায় গ্রামে গ্রামে তেভাগা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল।
ঠাকুরগাঁও ছিল আগে থেকেই কৃষক আন্দোলনের মজবুত ঘাঁটি। এরপর আটোয়ারী, বালিয়াডাঙ্গী থেকে শুরু করে রানিশঙ্কাইল, বীরগঞ্জ, বোঁচাগঞ্জ ও পীরগঞ্জে বিস্তার লাভ করে। বালুরঘাট মহকুমায় তেভাগার দাবিতে সংঘটিত প্রচার চলছিল। আন্দোলন পরিচালনার জন্য নেতাদের বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব দেওয়া হল। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাকির হোসেন স্নাতকোত্তর মহাবিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের খ্যাতনামা অধ্যাপক ড. অশোক মজুমদার তার গবেষণা মূলক রচনা ‘Peasant Protest in Indian Politics’ নামে একখানি প্রকাশিত গ্রন্থে দিনাজপুর জেলার তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা অজিত রায়, বিভূতি গুহ, সুনীল সেন, মহী বাগচী, অবনী লাহিড়ী, কালী সরকার প্রমুখের বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার নিয়ে দিনাজপুরের তেভাগা আন্দোলন সম্পর্কে লিখেছেন— সুশীল সেন আটোয়ারী থানার রামপুরে গিয়েছিলেন আন্দোলন সংগঠিত করতে। তাঁর উপর দায়িত্ব ছিল এই থানার তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত করার। রামপুর গ্রাম ছিল কমিউনিস্টদের এক শক্ত ঘাঁটি। এখান থেকে তিনি তেভাগা আন্দোলন ও সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। ঠাকুরগাঁকে পূর্ব, পশ্চিম দুইভাগে সাংগঠনিক ভাবে ভাগ করা হল। পূর্ব দিকের দায়িত্ব দেওয়া হল অজিত রায় ও বিভূতি গুহকে। পশ্চিমাঞ্চলে আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হল সুনীল সেন ও গুরুদাস তালুকদার এর উপর। বোঁচাগঞ্জের দায়িত্ব অর্পিত হল জনার্দন ভট্টাচার্যের ওপর। চিরিরবন্দর ও কোতোয়ালি থানার তেভাগা আন্দোলনেল দায়িত্বে পাঠানো হল শচীন্দু চক্রবর্তী ও সুধীর সমাজপতিকে। পতিরামের কৃষ্ণ দাস মহন্ত ও ননী মহন্তকে ভার দেওয়া হল বালুরঘাট ও কুমারগঞ্জ থানার। বংশীহারী, ইটাহার ও কুশমন্ডি থানার দায়িত্ব পড়ে বসন্ত চ্যাটার্জীর ওপর।
রানিশঙ্কাইল থানার দায়িত্বে রাখা হল অনিল চক্রবর্তী ও বালিয়াডাঙ্গী থানার পরীক্ষিত নেতা পষ্ট রাম সিং এবং তার স্ত্রী জয়মনিকে। দিনাজপুর শহর দেখবেন সত্যব্রত চক্রবর্তী, দীনেশ দাস ও বরদা চক্রবর্তী। ঠাকুরগাঁ শহরের প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হল আইনজীবী ও পণ্ডিত মানুষ বলে খ্যাত হাজী মোহাম্মদ দানেশকে, সঙ্গে ভূজেন পালিত। আন্দোলনের শক্তিশালী এলাকা দিনাজপুর, বোঁচাগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁ শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়িত্বে ছিলেন দূর্গা সেন। অবনী লাহিড়ীকে দায়িত্ব দেওয়া হল সমগ্র দিনাজপুর জেলার তেভাগা আন্দোলন দেখভাল করার এবং সেই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ। পূর্ব ঠাকুরগাঁ এর ধানগাঁও জেলার নেতাদের সভায় দায়িত্ব বন্টনের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দিনাজপুর জেলার কাজকর্মকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে নেওয়া হয়। এ বিষয়ে পরে আলোকপাত করব।
তেভাগা আন্দোলন তো একদিনে সংগঠিত হয়নি। তেভাগা আন্দোলন সংঘটিত হবার পেছনে নানা কারণ ছিল। মূল প্রেক্ষাপট ছিল শোষণ ও বঞ্চনা। প্রজা ও কৃষকদের পক্ষের সে সময়ের বড় সমর্থক ছিল কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সভা। জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। তখন বর্গাদার হয়েছিল সবচেয়ে অবহেলিত এবং অরক্ষিত চাষি প্রজা। জমিদার মধ্যস্বত্বভোগী বিভিন্ন ধরনের রায়তদের সঙ্গে মৌখিক লিজে চুক্তিবদ্ধ এক শ্রেণির কৃষক তারা। এদের যখন-তখন উচ্ছেদ করা যেত। এর বিরুদ্ধে আইনের কোনও সুযোগ তাদের কাছে ছিল না। এই বর্গাদাররা আধিয়ার নামেও পরিচিত ছিল। কিন্তু জোতদার-জমিদার শ্রেণী তাদের কাছ থেকে অর্ধেকের বেশি ভাগ আদায় করত। এছাড়াও ছিল বিভিন্ন ধরনের কর সংগ্রহ। জমিদারবাবুর নজরানা, হাট ও মেলায় তোলা আদায়, পার্বনি ইত্যাদি। এছাড়া পাহারাদারি ও মহলাদারির খরচ আদায় ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের নজরানা আর আদায় দিতে দিতে বর্গাদার নিঃশেষিত হয়ে যেতেন। এর সঙ্গে ছিল দাদনের কারবার। বাংলাদেশে যখন তেভাগার দ্রুত প্রসার ঘটল তার আগেই দিনাজপুরে কৃষকেরা হাটে হাটে, মেলায় জমিদারদের তোলা আদায়ের বিরুদ্ধে ‘তোলাগণ্ডি’ বা তোলা আদায় বন্ধের ডাক দেয়। পতিরাম হাট, হরিরামপুর হাট, ঠাকুরগাঁয়ের আলুয়াখোয়ার মেলায় কৃষকেরা এই আন্দোলন করে বিজয়ী হয়। কৃষকদের মধ্যে ৪১ শতাংশ যে বর্গাদার ছিল তাদের অবস্থা একেবারেই ভালো ছিল না।
জোতদার-জমিদার অধ্যুষিত দিনাজপুর জেলায় এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বালুরঘাট, কুশমন্ডি, ইটাহার, বংশীহারী ও কালিয়াগঞ্জ থানায় আন্দোলন জোরদার হয় এবং কিছু পরিমাণে জয়যুক্ত হয়। এ জন্য কৃষকদের উপর অনেক মিথ্যা মামলাও রুজু হয়। সে সময় কৃষকদের পাশে ছিল কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির বিভিন্ন শাখা, বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সমিতির পাঁজিয়া, (যশোহর জেলা) সম্মেলন থেকে ১৯৪০-এর জুন মাসে তেভাগা লড়াইয়ে ডাক দেওয়া হয় । এই সম্মেলনে বর্গা প্রথাকেই তুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এরপরও কয়েক বছর ধরে কৃষক সমিতির কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চলতে থাকে। এর মধ্যেই ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে নলিতাবাড়ী (ময়মনসিংহ জেলা) সম্মেলনেও তেভাগার দাবিতে সমস্ত বর্গাদারকে সঙ্ঘবদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়। শেষে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা সেপ্টেম্বর ৪৬-এ তেভাগা সংগ্রামের ডাক দেয়। ৪ জানুয়ারি, ১৯৪৭-এ দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দরের তালপুকুর গ্রামে এক কৃষক মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালায়।
তেভাগার মরণজয়ী সংগ্রামে বাংলাদেশে প্রথম শহিদ হয়েছিলেন চিরিরবন্দরের লড়াকু সাঁওতাল চাষি শিবরাম মাঝি এবং মুসলিম কৃষক সমিরুদ্দিন আহমেদ। কলকাতার আত্মঘাতী দাঙ্গার প্রায়শ্চিত্য করেছিল এই দুই কৃষক সস্তান। ৪৭ সালের ৪ জানুয়ারি চিরিরবন্দরে দায়িত্বে থাকা দুই কৃষক নেতা সুধীর সমাজপতি ও শচীন্দু চক্রবর্তীকে সশস্ত্র পুলিশ গ্রেপ্তার করতে এলে মুহূর্তের মধ্যে প্রায় চারশো কৃষক একজোট হয়ে প্রতিবাদ জানায়। কৃষক প্রতিবাদের জবাব শেষ পর্যন্ত পুলিশ গুলির বিনিময়ে দিয়েছিল। তেভাগার সংগ্রাম ধীরে ধীরে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।কবিতা, ছড়া, লোকনাটকের মাধ্যমে তেভাগার কথা প্রকাশ হতে থাকে। দিনাজপুরের জনপ্রিয় লোকনাটক খনগানে, খুশি সরকার সুন্দর রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন—
মোর হে নামত/ হান্ডিয়া মহাজুন/ জানে সকলে/ ধানের উপরে/ ওকি ও ভায়া রে/ ধর্ম ছাড়া/ অধর্মের কামলা মোক/ ভালয় লাগেনি/ ও মোর ভায়া/ সুদের কারবারি/ মোর হে.......ধানের উপর।
তেভাগা আন্দোলনে চাষিদের প্রধান দাবি ছিল জমিতে উৎপন্ন ফসলের অর্ধেকের পরিবর্তে দুই-তৃতীয়াংশ ফসলের অধিকার। সংগঠিত কৃষকেরা স্লোগান তোলে, ‘নিজ খামারে ধান তোলো’, ‘ধান কেটে ঘরে তোলো’ ‘দখল রেখে চাষ কর’, ‘জান দিব তবু ধান দিব না’, ‘তেভাগা চাই’ ইত্যাদি৷ ঐক্যবদ্ধ কৃষক আন্দোলন যখন আরম্ভ হয় তখন কৃষকদের মধ্যে প্রচন্ড উৎসাহের সৃষ্টি হয়। ‘জমিদারি প্রথা ধ্বংস হোক’, ‘খাজনার হার অর্ধেক করো’, ‘বাকি ঋণ মুকুব করো’, ‘বে-আইনি আদায় বন্ধ করো’, ‘লাঙল যার জমি তার’- কৃষক আন্দোলনের এইসব দাবিতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত কৃষক সাড়া দেয়। কৃষকসভার পক্ষ থেকে প্রচার পুস্তিকা ছোটো ছোটো ইস্তাহারে বিলি করা হয়। কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ লড়াই সম্পর্কে ইংরেজি দৈনিক ‘The Statesman’ লিখেছিল– “বিগত শতকের পর শতক ধরে যে মূক ছিল, আজ এক স্লোগানের চিৎকার ধ্বনিতে সে রূপান্তরিত সঙ্গীদের নিয়ে মাঠ ভেঙে এগিয়ে চলেছে। প্রত্যেকের কাঁধে রাইফেলের মতো করে ধরা লাঠি। মিছিলের পুরোভাগে একটি লাল পতাকা দেখে অনুপ্রাণিত হতে হয়। বাঁশবনের নৈঃশব্দ্যের মধ্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত কপালের কাছে তুলে তারা যখন নীচু স্বরে ‘ইনক্লাব’ এবং ‘কমরেড’ বলে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে তা শুনে কেমন যেন ভয় করে।”
তেভাগার দাবি আদায়ের পক্ষে দাঁড়াবার একমাত্র বাংলা দৈনিক ছিল কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ এবং ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘পিপল্স এইজ’। ‘স্বাধীনতা’ কাগজে প্রতিবেদন লিখতে গোলাম কুদ্দুসের মতো সাহিত্যিক, ছবি আঁকতে সোমনাথ হোরের মতো শিল্পীকে তেভাগা আন্দোলনের এলাকায় পাঠানো হল। নিখিল চক্রবর্তী, খোকা রায়, কৃষ্ণ বিনোদ রায় প্রমুখ নেতারা এই দুটি কাগজে বর্গাদার, আধিয়ারের তেভাগা আন্দোলন তুলে ধরেন ও দাবির সমর্থনে একের পর এক প্রবন্ধ লিখেছেন। বঞ্চিত কৃষকদের কথা তুলে ধরতে ও দাবি আদায়ের সংগ্রামে পূর্ণ একাত্মতা দেখাতে কাগজ দুটি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। জমিদারি স্বার্থের প্রতি এতটুকু দরদ দেখাননি।
তেভাগা আন্দোলন উত্তরবঙ্গেও ছড়িয়ে পড়েছিল। মোট ১৯টি জেলায় প্রাদেশিক কৃষক সমিতির নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। পশ্চিম দিনাজপুর (বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুর) জেলাতেও তেভাগা আন্দোলন সক্রিয় রূপ নেয়। এই জেলার রাজবংশী, সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা ও মুসলমানরা প্রত্যক্ষভাবে তেভাগা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। কৃষক মেয়েরাও পিছিয়ে ছিল না। গোপন চিঠিপত্র আনা-নেওয়া, কর্মীদের সাবধানে লুকিয়ে রাখা এইসব কাজে কৃষক বধূদের অবদান ভুলবার নয়। রাজবংশি ও নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মেয়েদের উৎসাহ ছিল দেখবার মতো। আন্দোলনের পরিকল্পনায় দিনাজপুর জেলাকে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। অঞ্চলগুলি হল—

গরিব কৃষক, খেতমজুর ও ভাগচাষিদের অবস্থা ক্রমেই সংকট থেকে সংকটতর হয়ে ওঠে। বাংলায় হাহাকার দেখা দেয়। উত্তরবঙ্গেও কৃষক নির্যাতনের পরিমাণ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে কৃষকেরা ঐক্যবদ্ধভাবে তেভাগা আন্দোলনের ডাক দেয়। ওই বছরই সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিষাণ সভা তেভাগা আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করে। কমিউনিস্ট পার্টিও তীব্রভাবে এই আন্দোলন সমর্থন করে। চারু মজুমদার গ্রামাঞ্চলে ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকদের গণ-আন্দোলনকে সক্রিয় করতে হবে বলে উল্লেখ করেন। জ্যোতি বসু, রূপনারায়ণ রায়, রতনলাল ব্রাক্ষ্মণ প্রমুখ ‘শেষ সংগ্রামের দিকে এগিয়ে চলো’ বলে কৃষক আধিয়ারদের উৎসাহিত করেন।
১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই চাষিরা সব জায়গায় ধান কেটে নিজ খোলানে তোলার কাজ শেষ করে ফেলে। দেশে তখন সোহরাবর্দি মন্ত্রিসভা এবং তিনিই মুখ্যমন্ত্রী, মুসলিম লিগ দল শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এই সময় সারা জেলাব্যাপী তেভাগা আন্দোলনের প্রচার ও সমাবেশ শুরু হয়। জোতদার ও জমিদাররা নির্যাতিত কৃষকদের সংঘবদ্ধ আন্দোলনে সজ্জিত হয়ে ওঠে। তেভাগা আন্দোলনের দ্রুত প্রসার এবং সকলের চাপে লিগ সরকার বাধ্য হয়ে একটি বিল গেজেট প্রকাশ করে। বিলটিতে কৃষকদের স্বার্থে প্রচুর আশ্বাসবাণী ছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিলটি ছিল একটি বিরাট ধাপ্পা। বিলটি নিয়ে আলোচনা হয় কিন্তু আইনসভায় না পাঠানোর ফলে এটি আইনে পরিণত হয়নি। অপরদিকে সরকার কূটকৌশলে তেভাগা আন্দোলন দমন করবার জন্য তৎপর হয়। পুলিশ, জোতদার, বরকন্দাজ, আধিয়ার, খেতমজুর ও কৃষকদের উপর নির্মম অত্যচার শুরু করে। তারা কৃষক ও ভাগচাষিদের খোলান থেকে জোর করে ধান তুলে আনতে শুরু করে। এর প্রতিবাদে কৃষকেরা সংঘবদ্ধ হয়। লড়াই ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করে। গরিব খেতমজুর ও আধিয়াররা পুলিশ ও জোতদারের দ্বারা নির্যাতিত হয়। কৃষকদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। নারীরাও পুলিশের অত্যচার থেকে রেহাই পায় না। কিন্তু এত অত্যাচারেও তেভাগা আন্দোলন থেমে থাকেনি। তেভাগা আন্দোলন তার নিজের পথে সাবলীলভাবে চলেছে। ভলান্টিয়ার বাহিনীরা লাল ঝান্ডা কাঁধে তুলে নিয়ে স্লোগান তোলে ‘ইনক্লাব জিন্দাবাদ’। আন্দোলনকে দমন করতে সরকার ও পুলিশ ক্রমশ নির্মম হয়ে ওঠে। বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট থানার রহিমানুরগঞ্জ ইউনিয়নের খাঁপুর গ্রাম ছিল তেভাগা আন্দোলনের পীঠস্থান। এখানে একটি নির্মম ও নৃশংস ঘটনা ঘটে। খাঁপুর ছিল একটি জমিদার প্রধান গ্রাম। বাকি সব জোতদার, ছোট জোতদার, মাঝারি কৃষক, আধিয়ার ও দিনমজুর। তেভাগা আন্দোলন হওয়ার অল্প দিনের মধ্যে খাঁপুর আন্দোলনের একটা শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
শুরু হয় খোলান ভাঙা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পতিরামে ঠাকুর এস্টেটের নায়েব ও এলাকার বড়ো জোতদার লক্ষ্মী চক্রবর্তীর খোলান ভাঙার কাজ চলছিল। এই রকম অবস্থায় পুলিশ আসে। ভলান্টিয়াররা পুলিশকে ঘিরে ধরেন। পুলিশ পিছু হটে। পতিরামের চৌমাথায় জড় হয় বিরাট মিছিল। এতে অংশগ্রহণ করে খোকা বর্মন, শিবচরণ বর্মন, গুলু কবিরাজ, নৈমুদ্দিন মণ্ডল, পবেন বর্মন, গোষ্ঠবিহারী সরকার, গুরুচরণ বর্মন, মোঙলা মুর্মু প্রমুখ। তেভাগার একটা অংশ ছিল ‘খোলান ভাঙা’ আন্দোলন।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ দিনাজপুরের ইতিহাসে একটি আতঙ্কের দিন। খাঁপুর গ্রাম সকলের কাছে পরিচিত হয়। এই সময় বালুরঘাটের মহকুমা শাসক ছিলেন পানাউল্লা, আর থানারা দারোগা ছিলেন ফণী পাঠক। সরকার ও পুলিশের যৌথ চেষ্টায় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জোতদার ও জমিদাররা ঐক্যবদ্ধ হয়। আধিয়ারেরা যে সব ধান কেটে নিজ নিজ খোলানে তুলে ফেলেছিল পরে জোতদাররা পুলিশ ও পাইকের সাহায্যে ধান নিজেদের গোলায় নিয়ে আসে। এর ফলে অসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পায়। কৃষক সভার লাঠিয়াল যেসব ধান কেটে নিজ নিজ স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠিত শক্তির সামনে জোতদারদের সরাসরি আক্রমণ করার সাহস কখনও পায়নি। এমনকি দিনের বেলায় গ্রামে ঢুকে পুলিশেরও নির্যাতন করার সাহস ছিল না। চারু মজুমদার তার প্রবন্ধে তেভাগা আন্দোলনের ঘটনা ও অভিজ্ঞতার সার তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি স্পষ্টভাবেই দ্বৈত ক্ষমতার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তিনি দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের কথা বলেননি, এলাকা ভিত্তিক ক্ষমতা দখল করে বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন।
খাঁপুরের কৃষক বিদ্রোহের নেতা ছিলেন কৃষ্ণদাস মহন্ত, চিয়ারসাই শেখ, গুরুচরণ বর্মন, দুখনাকোল কামার, হোপন মার্ডি, গজিমুদ্দিন শেখ, গোপেশ্বর দাস, যশোদারাণী সরকার প্রমুখ। পুলিশ প্রথমে খাঁপুর এলাকার প্রধান নেতা কৃষ্ণদাস মোহস্তকে গ্রেপ্তার করে। এরপর ১৯-২০ ফেব্রুয়ারির রাতে ভ্যানে করে একদল পুলিশ খাঁপুরে হাজির হয়। তারা সন্তর্পণে স্থানীয় কৃষক নেতা নীলকণ্ঠ দাসের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। পুলিশ বাড়ির দরজা ভেঙে ফেলে। কিন্তু নীলকণ্ঠকে কোথাও পাওয়া গেল না। এর মধ্যে অনেক কৃষক জমায়েত হল। পুলিশ অবস্থা বুঝে পিছু হটতে শুরু করল। এদিকে পুলিশ খাঁপুরে আসবে এ খবর কৃষকেরা আগেই পেয়েছিল। এর জন্য রাস্তার মাঝে একটি বিরাট ট্রেঞ্চ খুঁড়ে রাখে। পিছু হটবার সময় পুলিশের গাড়ি ট্রেঞ্চে পড়ে যায়। এবার শুরু হয় গুলি চালানো। কৃষকেরাও তাদের অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ শুরু করে। সামনের সারিতে ছিলেন চিয়ারসাই শেখ। তিনি লাঠি হাতে পুলিশকে আক্রমণ করলে পুলিশ গুলি চালায়। গুলি লাগে চিয়ারসাই শেখের হাতে। এরপর তিনি লাঠি ছেড়ে বাড়ি থেকে শাবল এনে গাড়ির টায়ার ফুটো করতে উদ্যোগী হন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দুটো গুলি তাকে ঝাঁঝরা করে দেয়। চিয়ারসাই শেখ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পতাকা নিয়ে যশোধারাণী অগ্রসর হতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এবার শুরু হল অসম লড়াই। একদিকে কৃষকেরা লাঠি, দা, তির-ধনুক, শাবল, কুড়াল, বল্লম, ঝাঁটা, অন্যদিকে পুলিশের গুলি। পুলিশের গুলির আঘাতে দলে দলে কৃষক মাটিতে আছড়ে পড়তে আরম্ভ করে। কয়েকমুঠো ধানের জন্য কৃষকের রক্তে খাঁপুরের মাটি লাল হয়ে যায়।
অনেক কৃষক মৃত্যু বরণ করলেন এবং প্রায় শতাধিক কৃষক আহত হলেন। এরপর পুলিশ মৃত, অর্থমৃত সবাইকে ট্রাকে গাদাগাদি করে নিয়ে পতিরাম দিয়ে সোজা রাস্তায় না গিয়ে ত্রিমোহিনী হয়ে অনেক ঘোরাপথে বালুরঘাটে যায়। ট্রাক যেদিক দিয়ে গেছে আশেপাশের মানুষ শুনেছে ট্রাকের ভেতর থেকে মৃদু আওয়াজ ‘আধি নয় তেভাগা চাই’। সংঘর্ষের খবর চারিদিকে জানাজানি হতেই খাঁপুরে জমায়েত হতে লাগল নেতা, কর্মী ও ভলান্টিয়ার। কৃষক মেয়েরাও পিছিয়ে ছিল না। পাঁচ-ছয় হাজার কৃষকদের নিয়ে এক বিরাট জনসভা হল। সভা থেকে স্লোগান উঠল— কমরেড হুকুম দাও খাঁপুর আজ শেষ করে দিই। কিন্তু সেদিন সেটি সম্ভব হয়নি। সরকারি হিসেব অনুসারে সেদিন ১২১ রাউন্ড গুলি চলেছিল। পুলিশ ও কৃষকের সংঘর্ষে মারা গেছিল ২২ জন বীর কৃষক ও কৃষানী। এরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে সেদিন শহিদ হয়েছিলেন। এই ২২ জন শহিদ হলেন— ১। চিয়ারসাই শেখ, ২। যশোধারণী সরকার, ৩। কৌশল্যা কামারিনী, ৪। হপন মার্ডি, ৫। গুরুচরণ বর্মন, ৬। মাঝি সরেন, ৭। দুখনা কোলকামার, ৮।পুরনা কোলকামার, ৯। ফাগুয়া কোলকামার, ১০। ভোলানাথ কোলকামার, ১১। কৈলাস ভুঁইমালী, ১২। খোতো বর্মন, ১৩। ভাদু বর্মন, ১৪। আলু বর্মন, ১৫। মঙ্গল বর্মন, ১৬। জ্ঞান বর্মন, ১৭। নারায়ণ মুর্মু, ১৮। ভুবন বর্মন, ১৯। গহনুরা মাহাতো, ২০। শ্যামাচরণ বর্মন, ২১। নগেন বর্মন এবং ২২। ভবানী বর্মন। নিম্নবিত্ত গরিব নিম্নবর্গীয় খেটে খাওয়া খাঁপুরের বীর কৃষকেরা সংগ্রামের আন্দোলনের যে উজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করেছিলেন তা কৃষক ও মেহনতি মানুষদের মনে চির অম্লান থাকবে।
তেভাগা আন্দোলনে দিনাজপুরের বীর রমণীদের ভূমিকা উল্লেখ না করলে আলোচনা অসমাপ্ত থেকে যাবে।। ড. সুনীল সেন তাঁর লেখা ‘বাংলার শ্রমজীবী নারী ও গণআন্দোলন’ নামক গবেষণামূলক পুস্তকটি উৎসর্গ করে লিখেছেন— “দুই রাজবংশী রমণী দীপসরি সিং ও ভান্ডানী বর্মনের বোনের স্মৃতির প্রতি-যারা আমার মনে অবিনশ্বর ছাপ রেখে গেছেন।” এছাড়াও ছিল আটোয়ারী থানার রামপুর গ্রামের দীপসরি সিং, রানিশঙ্কাইল থানার গুয়া গ্রামের ভান্ডানী বর্মন, বালিয়াডাঙ্গী থানার জয়মনি সিংহ প্রমুখ। দিনাজপুরের মহিলানেত্রী রানী মিত্র, বীনা গুহ প্রমুখ দাঁড়িয়েছিলেন কৃষকদের পক্ষে। ইলা মিত্র (নাচোল), ঠুমনিয়ার সুনীমা সিং, ফকো বর্মণী (ধুমনিয়া), দীপেশ্বরি বর্মন (আটোয়ারী), অলোকা মজুমদার (দিনাজপুর), আশা সেন (দিনাজপুর), সাবিত্রী সেন (দিনাজপুর) দীপ্তি বাগচী (ঠাকুরগাঁ), তৃপ্তি মিত্র (ঠাকুরগাঁ), সাবেরা খাতুন (মুন্সি পাড়া), মনসুরা বেগম (দিনাজপুর), ফুলেশ্বরী বর্মনী (বীরগঞ্জ), রানী বসন্ত (রামপুর),মাতি বর্মনী, বৃন্দাবনী বর্মনী (রানীশঙ্কাইল), রোহিনী বর্মনী, (রানীশঙ্কাইল), সিয়া বর্মনী জয়া বর্মনী (রানিশঙ্কাইল), ভুতেরশ্বরী বর্মনী (সেতাবগঞ্জ), বুধমনি বর্মনী, যমুনা বর্মনী, (ফুলবাড়ি), কন্ঠমনি (ইটাহার), পেলিয়া বর্মনী, কামিনীবালা বর্মনী ও শিখা বর্মনী প্রমুখ কৃষাণী নেত্রীরা সেদিন ধানের লড়াইয়ের জন্য নিজেদের জীবনকে জোতদার-মহাজন-পুলিশের সামনে নিলাম করে দিয়েছিলেন। ধান ও জমি রক্তাক্ত হয়েছিল। কিন্তু তারা নিজেদের অধিকার ছাড়েননি।
১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ভারত স্বাধীন হয়। কিন্তু বাংলার চাষিদের তেভাগার দাবি সরকার মেনে নেয় না। কৃষকেরা শোষণের জাঁতাকলের মধ্যেই পড়ে রইল। দেশ ভাগ হল। দিনাজপুর জেলাও ভাগ হল। খাঁপুর পড়ল দক্ষিণ দিনাজপুরের মধ্যে। খাঁপুরে যেখানে ট্রেঞ্চ খুঁড়ে, গাছ ফেলে পুলিশের গাড়ি আটকে দেওয়া হয়েছিল সেখানে কমিউনিষ্ট পার্টির উদ্যোগে একটি পাকা শহিদবেদী তৈরি করা হয়। প্রতিবছর ৭ ফাল্গুন সেখানে শহিদদিবস পালিত হয়। যে ২২টা তাজা প্রাণ সেদিন খাঁপুরের মাটিকে লাল রক্ত দিয়ে ভিজিয়ে দিয়েছিল তাদের আত্মবলিদান চিরস্মরণীয়। কয়েকমুঠো ধানের জন্য খাঁপুরের কৃষক সংগ্রামীদের এত বড় আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসের পাতায় চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ৷
সমগ্র দিনাজপুর জেলায় তেভাগা আন্দোলনে প্রায় ৪০ জন কৃষক পুলিশের গুলিতে মারা যান। গ্রেপ্তার হন ১০০০-এরও বেশি, আহত হন প্রায় ১০,০০০ মানুষ। দিনাজপুর জেলায় ৩৫টি পুলিশ ক্যাম্প বসেছিল। গুলি চলে ঠুমনিয়া, চিরিরবন্দর, খাঁপুর ও ঠাকুরগাঁয়ে। ১৯৪৭ সালের ২২ জানুয়ারি সরকার ‘বঙ্গীয় বর্গাদার সাময়িক নিয়ন্ত্রণ বিল’ প্রকাশ করে এবং ১৯৪৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি অর্ডিন্যান্স জারি করে তেভাগার দাবি মেনে নেয়।
তেভাগা আন্দোলন শুধু কৃষাণ-কৃষাণীর এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পরবর্তীতে তেভাগাকে নিয়ে গান, কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্র রূপায়িত হয়েছে। কিছু গান, কবিতা, তেভাগা আন্দোলন চলাকালীন রচিত হয়েছিল। বিষ্ণু দে ‘মৌভোগ’ কবিতাতে তেভাগার কৃষকদের কথা তুলে ধরেছেন। তেভাগাকে নিয়ে গান লিখেছেন অনেকে। জেলাস্তরে লোককবিরা অনেক গান, গাঁথা লিখেছেন যা গবেষণার বিষয়। সলিল চৌধুরী থেকে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, পঞ্চানন দাস প্রমুখরা তেভাগার গান গেয়েছেন । সলিল চৌধুরীর গানে বলিষ্ঠ ভাষা পায় সংগ্রামী কৃষকদের দাবি—
হেই সামালো! হেই সামালো হেই সামালো ধান হো কাস্তেটা দাও শান হো জান কাবুল আর মান কবুল আর দেব না, আর দেব না রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো…
তেভাগা আন্দোলন চলাকালীন প্রখ্যাত শিল্পী সোমনাথ হোড়ের আঁকা কৃষকদের স্কেচ এবং পরবর্তীকালে আন্দোলনের দিনপঞ্জি নিয়ে প্রকাশিত ‘তেভাগার ডায়েরি’ শুধুমাত্র তেভাগা সংগ্রামের চিত্র হিসেবেই নয়, বাংলা সাহিত্যের আসরে নিজের ঠাঁই করে নিয়েছে। গোলাম কুদ্দুসের ‘লাখে না মিলয়ে এক’ প্রতিবেদনটি এক অনবদ্য বিবরণ ও সাহিত্য। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হারাণের নাত জামাই’ গল্পটি তেভাগার প্রেক্ষাপটে একটি অসাধারণ সৃষ্টি। শিশির দাসের ‘শৃঙ্খলিত মৃত্তিকা’ তেভাগা আন্দোলনের পটভূমিকায় এক অসাধারণ গবেষণাধর্মী উপন্যাস।
ত্রিশের দশকে বাংলা সাহিত্য ন্যুট হ্যামসুন, দস্তয়েভস্কির কল্লোলিত পদচারণা, রবীন্দ্রনাথ এলিয়টকে বাংলায় নিয়ে এলেন। বিমল রায়ের পরিচালনায় ‘উদয়ের পথে’ সিনেমা হাউসের নতুন জোয়ার আনলো। ‘ধরতি-কে লাল’’ কৃষকদের অধিকারকে মান্যতা দিল। ১৯৪৬ -এ চেতন আনন্দ I P T A-এর ছাতার তলায় তৈরি করলেন ‘নীচা নগর’। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘লোয়ার ডেপথ্স’-কে সামনে রেখে গরিব মানুষের প্রতিবাদী চেহারা শুধু সিনেমার বিষয়বস্তুই ছিল না, দর্শক গ্রাহ্যও হল। কৃষক জীবন ,জমিদারি শোষণ, কৃষককে প্রতিবাদের মিছিলে আহ্বান করে ছবি তৈরি হল। কৃষক জীবনের শোষণের জমিদারি নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে ১৯৫৩ তে তৈরি হল ‘দো বিঘা জমিন’।
তেভাগার লড়াইয়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফসল যেমন ভূমি সংস্কার আইন কিংবা অপারেশন বর্গা, সাংস্কৃতিক জীবনেও সামন্ততান্ত্রিক ধ্যান ধারনার জোয়াল ভাঙার শিক্ষাও দিয়েছে তেভাগার লড়াই।
নীচে তেভাগা সংগ্রামের একটি মরমিয়া সংগীত তুলে ধরলাম। তেভাগার রজত জয়ন্তী পূর্তি (১৯৭৩ সাল) উপলক্ষে উদযাপন কমিটির সুমিত চক্রবর্তী কর্তৃক কালান্তর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত স্মারক সংখ্যায় প্রথম ছাপা হয়। রাজশাহি জেলে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল বন্দি অবস্থায় দিনাজপুর জেলায় কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং তেভাগা সংগ্রামের নায়ক কালী সরকার এই গানটি লেখেন এবং ঐ জেলার খাপরা ওয়ার্ডে ‘নানকিং বিজয় উৎসব’ অনুষ্ঠানে কালী সরকার নিম্নলিখিত গানটি পরিবেশন করেন। মহরমের সময় মুসলিম কৃষকরা জংগান গেয়ে থাকেন। তেভাগার জংগান:
রণে সাজিল রে রণে যায় রণডঙ্গা বাজিল রে।। দেশ ছাড়িবার কালে বিদেশি সরকার ।। মরণ কামড় হানে সবার উপর।। যে কামড়ে ক্ষিপ্ত হল দেশের যত ভাই সেই যে কারণে হল খাঁপুরের লড়াই।। একে একে বলে যাই শুনেন বন্ধুগণ খাঁপুরের যুদ্ধের কথা করিব বর্ণন।। ১৩৫৩ সাল মাঘ মাসের শেষে তেভাগার রণে কৃষক কৃদিল সাহসে ।। ভালকা বাঁশের ধনুক নিল হস্তেতে তুলিয়া চোখা চোখা তির নিল পৃষ্ঠেতে বাঁধিয়া।। দলে দলে কৃষক সাজে বলে মার, মার কোমর বান্ধিয়া সবে হইল তৈয়ার।।
অনেক ক্ষেত্রে কোনও আন্দোলনকে দুটো ভাগে ভাগ করে দেখা হয়। একটি হল এলিট গ্রুপ যা উচ্চবর্গীয়/ অভিজাত শ্রেণি। অপরটি হল সাবল্টার্ন পিপল বা নিম্নবর্গীয় শ্রেণি। যদিও তেভাগা আন্দোলনকে এভাবে দেখা উচিত হবে না। তবুও বলতে হয় সাধারণ বর্গাদার, কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষ, আধিয়ার এই মাটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষগুলো বেশিরভাগ নিম্নবর্গীয় শ্রেণির মানুষ। হাল, বলদ, কাদামাটি, ধান, গম, সর্ষে, ভুট্টা সহ অন্যান্য সবজি ও ফসল নিয়েই এদের জীবন-জীবিকা প্রবহমান। সাদামাটা খেটে খাওয়া সোদা মাটির গন্ধ মাখা মানুষগুলোই ছিল তেভাগা আন্দোলনের প্রাণ।
তথ্যসূত্র:
১। ‘তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস’— কুনাল চট্টোপাধ্যায়।
২। ‘ভারত তীর্থ উত্তরবঙ্গ’— আনন্দ গোপাল ঘোষ ও অসীম কুমার সরকার (সম্পাদিত)।
৩। ‘বঙ্গদেশের উত্তর প্রান্তীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ধারা’— ধনঞ্জয় রায়।
৪। ‘উত্তরবঙ্গের ইতিহাস’— সমিত ঘোষ।
৫। ‘দিনাজপুর জেলার ইতিহাস’— ধনঞ্জয় রায়।
৬। ‘দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার পুরাকীর্তি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাস’— ড. সমিত ঘোষ।
৭। ‘তেভাগার সংগ্রাম ফিরে দেখা’— পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কৃষক সভা।
৮। ‘বাংলার তেভাগা-তেভাগার সংগ্রাম’— জয়ন্ত ভট্টাচার্য।
৯। ‘বিপ্লবী আন্দোলনে উত্থাল দিনাজপুর (১৯০৫-১৯৬৭)’— ড. সমিত ঘোষ।
১০। ‘তেভাগার নারী’— চিত্তরঞ্জন পাল (সম্পাদিত)।
১১। ‘পশ্চিমবঙ্গ পত্রিকা’, তেভাগা সংখ্যা, ১৪০৪ বঙ্গাব্দ।
১২। ‘Transformation of the Rural Society of North Bengal (1793-1978)’— Dr. Samit Ghosh.
১৩। ‘Dinajpur Gazetteer’— F. W. Strong.
১৪। ‘Floud Commission Report’.
১৫। ‘Proceedings of the West Bengal Legislative Assembly’, Vol.72, No.2,1947, W.B.S.A.