সঞ্জীব দাস
সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে নিম্নবর্গের দ্রোহকথার উপর লিখতে বসে আমার মনে পড়ছে চুনি কোটালের মুখ। চুনি কোটালের কথা আদৌ আজ ক-জনের মনে আছে? মেধাবী লোধা কন্যা লেখাপড়া শিখে বড় হতে চেয়েছিল।প্রতিবাদ, বিদ্রোহ তাঁর দূরতর স্বপ্নেও বোধ হয় ছিল না। কিন্তু তাতেও টলে গিয়েছিল বর্ণবাদী ক্ষমতাতন্ত্রের ভিত! তাদের হাতযশেই লোধা-শবরদের মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্নাতক হয়েও সে প্রত্যাশিত চাকুরি প্রথমে পায় না। পরে পেলেও শুরু হয় স্নবিশ কর্তাব্যক্তিদের উপেক্ষা এবং মানসিক অত্যাচার। তবুও সে মানিয়ে চলছিল। কিন্তু সে এম এ ক্লাসে ভর্তি হতেই সমস্যা অন্য দিকে মোড় নিল। উচ্চবর্ণের ক্ষমতাতন্ত্র এতটা বেয়াদপি সহ্য করে কী করে! ব্রাহ্মণ অধ্যাপক তাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে। এতটা সে আর নিতে পারে না। হতাশা এবং গ্লানিতে নিজেকে সে শেষ করে দেয়। তার জীবনকে নিয়েই মহাশ্বেতা লিখেছিলেন ‘Story of Chuni kotal’ (চুনি কোটালের গল্প)।১ ছাপা হয়েছিল Economic and Political Weekly পত্রিকায়। শিরোনামে ‘গল্প’ শব্দটি থাকলেও আদতে এটি একটি প্রবন্ধ। উচ্চবর্ণের হেজিমনির দাপটে কোণঠাসা চুনিকোটালের জীবনযন্ত্রণা মহাশ্বেতার লেখনীগুণে এখানে জীবনীয় হয়ে উঠেছে।
আর একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল লিখতে বসে। গল্প? নাকি একটি মুখ? মুখটি এক শিক্ষকের। সোমনাথ মান্ডি। জাতিতে সাঁওতাল। বাড়ি বাঁকুড়ার সিমলাপাল। চাকুরিস্থল হুগলি জেলার চণ্ডীতলার গরলগাছা সুরবালা বিদ্যামন্দির। আমি তখন ঐ স্কুলেই চাকুরি করতাম। সময়টা ২০০৭। সেই সময় আমি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় মগ্ন। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে বাস্তবতা ছিল আমার গবেষণার বিষয়। সাঁওতাল, মুন্ডারা নিঃসন্দেহে নানা প্যারামিটারের মানকে ‘subaltern’-এর মধ্যেই পড়ে। সে-ই তাদের জীবনকে ধরতে চেয়েছিলেন শৈলজানন্দ বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এমনটাই দাবি। আমার প্রকল্প ছিল সেই দাবির বাস্তবতা বিচার। আর তা করতে বসে আমি তাঁর ‘কয়লাকুঠির গল্প’ গুলি সর্বাগ্রে বিশ্লেষণ করতে উদ্যোগী হই। সেখানে আমি অনেকগুলি অপরিচিত স্ল্যাং পাই। এগুলো সাঁওতাল সমাজের এমনটাই লেখক জানিয়েছেন। যেমন, ‘খালভরা’। যাই হোক আমার লেখা এবং লেখকের গল্পগুলি পড়ে সোমনাথের বিরক্তি-দীর্ণ মন্তব্য আজও আমার স্মৃতিধার্য হয়ে আছে:
এসব গালি আমাদের সমাজের নয়। তোমাদের এই লেখক আমাদের সমাজের কিছুই জানেন না। ঐ কুলি-কামিনদের অন্যান্যদের সঙ্গে তিনি আমাদের গুলিয়ে ফেলেছেন। আমাদের জীবনের অনেকটাই তিনি বানিয়ে লিখেছেন।
একথা শুনে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের মতো তখন আমারও বলতে ইচ্ছে হল: ‘Can sub-altern speak’?২
অনেক দিন আগে নিম্নবর্গের তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। ভারতবর্ষে উপনিবেশবাদের জাঁকিয়ে বসা এবং এদেশে নারীর অবস্থানের প্রকৃতি ইত্যাদি যদিও ছিল সেই বয়ানের বিষয়, তবুও সব ছাড়িয়ে বড় হয়ে উঠেছিল সে-ই অতলান্ত প্রশ্ন– ঐ যে ম্লানমুখ, নতশির যাদের কথা তুলে ধরার আন্তরিক প্রয়াস বাংলা গল্পে, উপন্যাসে চলমান সেসবের বাস্তবতা সত্যই কতটা? এই সব মানুষ নিজেরা কী নিজেদের কথা মুখ ফুটে বলতে পারে? তারা পারে কী উচ্চতর অবস্থানে আসীন স্নবিশদের কাছে নিজেদের কথা পৌঁছে দিতে? না-কি সাব-অল্টার্নদের নামে এই উঁচুতলার মেধাবীরা নিজেদের পর্যবেক্ষণ তাদের নামে চালিয়ে দিচ্ছে? সেখানে অজান্তেই কী মিশে যাচ্ছে লেখকের আবেগের সোনাঝুরি?
এইসব কথা মনের কোণে উঁকি মারে যখনই প্রান্তিক মানুষের কথা পড়ি, যখন তাদের জীবন-যাপন কেন্দ্রিক কোনো আখ্যান হস্তগোচর হয়। সে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘কয়লাকুঠির গল্প’ হোক, কিংবা তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’ কিংবা বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’। সেলিনা হোসেনের দুটি উপন্যাস পাঠের প্রতিক্রিয়ায় সে-ই একই প্রশ্ন উদ্যত হয়ে উঠল মনে-মননের ভিতর মহলে। সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এষণাই এই প্রতিবেদনের পশ্চাদভূমি।
প্রথমেই আসি, ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ উপন্যাসের কথায়। এই উপন্যাসের থিম আপাতভাবে প্রাচীন বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ্য ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের এক স্বভাব কবি কাহ্নুপাদ ও তাঁর সহযোদ্ধাদের স্বপ্নিল সংগ্রাম ও তার পরিণাম। আর এই প্রাতিভাসিকতার আড়ালে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে উর্দুভাষী এলিট মুসলমান প্রতাপতন্ত্রের হেজিমনির বিরুদ্ধে তদানীন্তন বাংলাভাষীদের মরিয়া প্রতিবাদের স্বরায়ণ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা ওপার বাংলার ভাষার ওপর আক্রমণ করেছিল। তারা চেয়েছিল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তারা বাংলা ভাষাকে টুঁটি চেপে হত্যা করতে চেয়েছিল। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল ভাষার দিক থেকে হঠাৎই subaltern-এ পর্যবসিত হওয়া পূর্বপাকিস্তানের বাংলাভাষী নাগরিকবৃন্দ। বস্তুত ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই ওপার বাংলায় স্বাধীনতার স্বপ্ন বিস্তার লাভ করে। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনই বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সোপান। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের ‘নীল ময়ূরের যৌবনে’ সেই যুগসত্যকেই রূপকের মধ্য দিয়ে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
এই আখ্যনের কেন্দ্রীয় চরিতচরিত্র কাহ্নুপাদ। বিখ্যাত চর্যাপদ রচয়িতাদের অন্যতম। অধিকাংশ চর্যাপদকর্তাদের মতো সেও অন্ত্যজ শ্রেণিভুক্ত। আখ্যানের সূচনা কাহ্নু ও তার সখি শবরীর স্নিগ্ধপ্রেমের কথায়। তারপর কাহ্নুর পেশাগত জীবনের বর্ণনায় সর্বজ্ঞ কথক প্রবৃত্ত হন। তার মুখ থেকে জানা কাহ্নুপাদ রাজা বুদ্ধমিত্রের দরবারে চাকুরি করে। সকলের কাছে তাই সে শ্রদ্ধার পাত্র। পাল রাজা বুদ্ধমিত্রের কাদা-নিমজ্জিত ঘোড়ার গাড়ির চাকা তুলে দিয়ে একদিন সে এই চাকুরি পাবার সৌভাগ্য অর্জন করেছিল। “নইলে ব্রাহ্মণদের প্রচণ্ড প্রতাপে রাজার কাছে যাবার সাধ্য কারো নেই,অন্তত অন্ত্যজ শ্রেণীর লোকেদের।” বাংলার পাল রাজারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিলেন। ফলে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র তার শক্তি হারায়। অনেকটা উপরে উঠে আসে নানা অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ। কিন্তু শেষদিকে পাল রাজারা দুর্বল হয়ে পড়লে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র গৌড় পুনরায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অন্ত্যজরা আবার অবনমিত অর্থাৎ নিম্নবর্গভুক্ত হয়ে পড়ে। এই নতুন বর্গব্যবস্থাকেই আখ্যানের আশ্রয়ে লেখক সামনে এনেছেন। নিম্নবর্গের উত্থানকে কে কবে খোলা মনে মেনেছে! তা-ই ব্রাহ্মণ মন্ত্রী দেবল ভদ্র এবং পারিষদদের কেউ-ই ব্যাপারটাকে সুনজরে দেখে না। তাই অহরহ তারা সকলে তার ক্ষতি করার জন্য উঠেপড়ে লাগে।
এই কাহ্নুপাদ একজন স্বভাব কবি, হাত যখন অবশ হয়ে আসে তখন তার মনের মধ্যে কবিতার পঙ্ক্তি গুনগুনিয়ে ওঠে। সে পঙ্ক্তিতে কখনো ভালোবাসা, কখনো প্রতিবাদ উৎকীর্ণ হয়। কিন্তু প্রতিবাদের উচ্চারণ সরাসরি সেই প্রতিকূল পরিবেশে সম্ভব ছিল না। তাতে ক্ষমতাতন্ত্রের রোষানলে পড়ার সম্ভাবনা। আর তাই তার আবেগের প্রকাশের আশ্রয় হয় সান্ধ্যভাষা। শবরীকে সে বলে: ‘চারদিকে ভীষণ অন্ধকার, শবরী। পথ বন্ধ। এগুতে পারছি না।’ ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে তার মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। নিজেদের দারিদ্র্য আর অভাবের কথা মনে পড়লে তার মনের মধ্যে এক দারুণ তাড়নার সৃষ্টি হয়। বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে তার অন্তরে: “রাজসভায় কত ঐশ্বর্য। কত বিলাস। কত অপচয়, কত অনাচার। কোন কিছুরই লেখাজোখা নেই।” সে দেখে ধর্মে-কর্মে, আচার-অনুষ্ঠানে, বিধি-নিষেধের খতিয়ান প্রণয়নে হোতা সেজে বসে আছে ঐ ব্রাহ্মণেরাই। ওদের প্রতাপকে অস্বীকার করে কার সাধ্য! অন্তরে যত ক্ষোভই থাকুক না কেন তাকে স্বীকার করে নিতে হয়েছে এই ব্যবস্থা। নইলে তো প্রাণে বাঁচাই দায়।এসব ভাবতে ভাবতে সে দরবার অভিমুখে অগ্রসর হয়।
কাহ্নুপাদের বিদ্রোহের কেন্দ্রে অচিরেই চলে আসে তার মাতৃভাষা বাংলা। সেকালে বাংলার ভদ্রলোকের ভাষা ছিল সংস্কৃত। বাংলা ভাষাকে ম্লেচ্ছভাষা জ্ঞানে উচ্চবর্গীয়রা অবজ্ঞা করত। কাহ্নু সেই ভাষাকেই প্রতিবাদের অস্ত্র করে তুলবে বলে মল্লারীকে জানায়:
মাঝে মাঝে তাই ভাবি মল্লারী যে দরকার নেই ওই রাজসভার। তোমার মতো হাজারজানের কণ্ঠই তো আমাদের সব, কিন্তু পারি না, যখন ওরা অবজ্ঞা করে তখন ওদের ঘাড়ে পা রেখে আমার ভাষার শক্তি দেখাতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে নিজের ভাষাটা ওদের সামনে মুকুটের মতো মাথায় পরি। এ ভাষায় যে নদীর স্রোত আছে তা ওদের জানা দরকার। এটা আমাকে করতেই হবে মল্লারী।
আখ্যান এরপর যত এগিয়েছে ততই সামন্ততান্ত্রিকশক্তির বিরুদ্ধে কাহ্নুপাদের বিদ্রোহী অবস্থান দৃঢ়তর হয়েছে। তার এই বিদ্রোহে, লড়াইতে ক্রমশ আরও অনেকে জড়িয়ে পড়েছে। ভুসুকু, দেশাখ থেকে সবাই। কাহ্নু মাতৃভাষাকে সম্মানের আসনে দেখার স্বপ্ন দেখলেও মন্ত্রী দেবল ভদ্রের মতো উচ্চবর্গীয় ক্ষমতার অধিকারীরা তা হতে দেবে কেন? তাই কুক্কুরীপাদ সান্ধ্যভাষায় বলে ওঠে– ‘রুখের তেন্তুলি কুম্ভীরে খাঅ’। সরাসরি বলতে পারে না বলে কুক্কুরীপাদ এমন আবরণ দিয়ে বলে। সে বলে:
ওদের জীবনে গাছের তেঁতুল ওই দেবল ভদ্রের মতো হোঁতকা মুখো কুমিরে খায় বলেই তো এদের এত যন্ত্রনা। সমাজে ঠাঁই নেই, মুখের ভাষার দাম নেই, ঘরে নিত্য অভাব।
কাহ্নুপাদেরও তাই করা উচিত সে মনে করে। পূর্বে একবার সে প্রচণ্ড ক্রোধে লিখে ফেলেছিল ডোম্বির কথা তীক্ষ্ণ ভাষায় :
নগর বাহিরেঁ ডোম্বি তোহোরী কুড়িআ। ছই ছোই যাইসি ব্রাহ্ম নাড়িআ।।
কিন্তু, এমন বিস্ফোরক পঙ্ক্তি লিখেও কাহ্নুপাদ পরক্ষণে তা কেটে দেয় দরবারের উচ্চবর্গীয় ক্ষমতাবানদের ভয়ে। সে জানে সেখানে বসে এই কথা বললে তারা তার টুঁটি ছিঁড়ে মেরে ফেলবে। এই বোধ থেকেই সে কুক্কুরীপাদের মতো ব্যঞ্জনাগর্ভ ভাষার আশ্রয় নেয়:
তিন ভুঅন মই বাহিঅ হেঁলে। হাঁউ সুতেলি মহাসুহ লীডেঁ।।
এই পঙ্ক্তিতেও প্রতিবাদের তীব্রতা সে খুঁজে পায় না। তাই সে লেখে:
আলিএঁ কালিএঁ বাট রুন্ধেলা। তা দেখি কাহ্ন বিমনা ভইলা।। কাহ্ন কাহঁ গই করিব নিবাস। জো মন গোঅর সো উআস।।
এতেও তার মন ভরে না। আসলে ভাষার আবরণ যে প্রতিবন্ধক তা সে বোঝে। সে জানে এই আবরণটা তুলে দিলে রচনা আরো তীব্র হত। কিন্তু ক্ষমতাতন্ত্রের প্রতি ভীতি তার তখনও যায়নি। সে রাজার অনুমতি নিয়ে রাজসভায় ভাষার দাবি জানাতে উপস্থিত হয়। কিন্তু ব্রাহ্মণমন্ত্রী দেবল ভদ্র তাকে খেদিয়ে দেয়:
দেবল ভদ্রের মেজাজ অসহিষ্ণু হয়ে গেছে, উৎসবের পরবর্তী অংশের জন্যই সে এখন উন্মুখ। রাগ এসে পড়ে কাহ্নপাদের ওপর। রুক্ষ মেজাজে খেঁকিয়ে ওঠে, এত রাত পর্যন্ত বসে আছিস কেন?
গীত পড়বো।
গীত?
দেবল ভদ্রের চোখ কপালে ওঠে, ভীষণ বিস্ময়।
কার লেখা গীত?
আমার।
তোর! তুই কি গীত লিখিস? তুই সংস্কৃতের কী জানিস!
সংস্কৃত জানবো কেন? আমার ভাষায় লিখেছি।
ক্রুদ্ধ দেবল তীব্র ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে তার গানকে নস্যাৎ করে দেয়: ও ছুঁচোর কেত্তন। তারপর
তাকে রাজ দরবার ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়।
সংবেদী মানুষ কাহ্নু মনে করে এই অপমান তার নিজের একার নয়। তার সমাজের সমস্ত মানুষের। কেননা তাদের দাবিই এই গীতে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। সে তাই বিষাদখিন্ন কণ্ঠে বলে ওঠে: “রাজসভা থেকে যে যন্ত্রণা নিয়ে ফিরেছি তার দায়ভার এই লোকালয়েরও। আমি উপলক্ষমাত্র, কিন্তু বহন করতে হবে সবাইকে। আমার মুখের ভাষার অবমাননা আমাদের সবার।” কাহ্নুর এই বোধ অন্যদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়।
আখ্যানের উপান্তে দেখা যায় ক্ষমতাতন্ত্রের প্রতি যাবতীয় ভীতি-মোহ ঝেড়ে ফেলেছে কাহ্নু। তাই সে দেবল ভদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে অকপটে বলতে পারে রাজদরবারে আর পাখা না-টানার ইচ্ছের কথা। এখন সে স্থির করে, নিজেদের সম্মান এবং মাতৃভাষার মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে নিজেদেরই সক্রিয় হতে হবে যাতে ওরাও বুঝতে পারে তারাও মানুষ। সে দেশাখের কাছে বলে এই নতুন উপলব্ধির কথা:
এতদিনে আমার ভুল ভাঙলো দেশাখ। আমি এখন বুঝতে পারছি যে শুধু রাজদরবারই কোনো ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। ওরা যতই সংস্কৃতের বড়াই করুক ওটা কারো মুখের ভাষা নয়। বাঁচিয়ে রাখবে কে? আমাদের ভাষা আমাদের মুখে মুখেই বেঁচে থাকবে রে দেশাখ।
ক্ষমতাবানেরা কবে প্রতিবাদকে সহ্য করেছে? দেবল ভদ্রও তাই কাহ্নুর ঔদ্ধত্য মেনে নেয়নি। রাজার লোক মারফত রাজদরবারে হাজির হতে তার কাছে নির্দেশ পাঠানো হয়। তবু সে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে রুষ্ট দেবল ভদ্র তাকে গ্রেপ্তার করে চুনের ঘরে নিক্ষেপ করে। কিন্তু ততদিনে অন্যদের মধ্যেও প্রতিবাদী চেতনার বারুদ ছড়িয়ে পড়েছে। এখন কাহ্নুর এই নারকীয় শাস্তির প্রতিক্রিয়ায় সেই বারুদ বিস্ফোরণে ফেটে পড়ে। ডোম্বি রাতের অন্ধকারে হামলা চালিয়ে দেবল ভদ্রের ভাগ্নেকে খুন করে। এর পরিণামে দেবল ভদ্রের নেতৃত্বাধীন ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র আরও নৃশংস হয়ে ওঠে। কাহ্নুদের পল্লি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরদিন ডোম্বীকে মেরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় গাছে।আর কাহ্নুর হাত দুটি কেটে নেওয়া হয় কবিতা লেখার অপরাধে। তবে শেষ পর্যন্ত সতীর্থদের তৎপরতায় সে প্রাণে বেঁচে যায়।
সমকালকে ধরতে অতীত ঘটনা, ঐতিহাসিক চরিত্রের আশ্রয় নেওয়া নতুন কিছু নয়। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শরদিন্দু অসামান্য সফলতায় এই কাজটি পূর্বেই করেছেন। শরদিন্দুর ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ উপন্যাসটি এদিক থেকে তো একটি ‘masterpiece’. সেলিনা তাঁর এই উপন্যাসে পূর্বজদের দেখানো পথটিকে অনুসরণ করতে গিয়েই চোরাবালিতে পথ হারিয়েছেন। তিনি বোধ হয় বিস্মৃত হয়েছিলেন উচ্চবর্গের ‘হেজিমনি’-র বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের প্রতিবাদ, বিদ্রোহকে তিনি উপজীব্য করেছেন। জীবনাভিজ্ঞতার অভাব এখানে তাঁর পিছু টেনে ধরেছে। সর্বোপরি এখানে নিম্নবর্গের যাপনকথা, তাদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সত্যকে গ্রস্ত করেছে মধ্যবিত্তের আবেগ-ভাবালুতা। ফলে উর্দুভাষী শাসকের হেজিমনির বিরুদ্ধে মাঠে -ময়দানে লড়াই করা বাঙালিদের আসল স্বর হারিয়ে গেছে। কাহ্নু থেকে ভুসুকু-ডোম্বীদের কথায়-আচরণে মধ্যবিত্ত লেখকের স্বরই গাঢ় হয়ে উঠেছে।
এর পর আসা যাক ‘কাঁটাতারের প্রজাপতি’-র কথায়। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইলা মিত্র। ওপার বাংলার এক কিংবদন্তি বিপ্লবী নারী। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল এলাকার কৃষকদের তেভাগা আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা তাঁকে কিংবদন্তি করে তুলেছে। শোষিত, নিগৃহীত কৃষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে তিনি সেদিন সর্বস্ব পণ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
আসল নাম ইলা সেন। পিতা ছিলেন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল। বাবার পেশার কারণে জীবনের দীর্ঘ সময় কলকাতায় অতিবাহিত করেন। খেলাধুলায় ১৯৩৬ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তাঁর নাম ছিল প্রথম সারিতে। সাঁতারে ছিলেন পটু। সেই যুগে খেলাধুলায় তাঁর মতো বাঙালি মেয়ে ছিল হাতেগোনা। ১৯৪৩ সালে বেথুন কলেজে বাংলা বিভাগের সাম্মানিক বিভাগে পড়ার সময়েই তিনি কলকাতায় মহিলা আত্নরক্ষা সমিতির সদস্য হন। ১৯৪৩ সালে তিনি হিন্দু কোড বিলের পক্ষে আন্দোলনে যোগ দেন।
ইলার বয়স তখন কুড়ি। নাচোলের রামচন্দ্রপুরের জমিদার মহিমচন্দ্র মিত্রের বাড়িতে তিনি পুত্রবধূ হয়ে আসেন। রক্ষণশীল পরিবারের নিয়ম মেনে অন্তঃপুরেই থাকতেন। কিন্তু এভাবে মন কী টেকে! শেষ পর্যন্ত অবশ্য মুক্তির খোঁজ মেলে। বাড়ির কাছেই একটি স্কুল খোলা হয়েছিল মেয়েদের জন্য। সেখানে তিনি পড়ানো শুরু করেন। এই স্কুলকে কেন্দ্র করেই তাঁর সংগ্রামী জীবনের সূচনা। তাঁর এই কর্মকাণ্ডের পশ্চাতে ছিল স্বামী রমেন মিত্রের অকুণ্ঠ সমর্থন। ইতিমধ্যে নাচোলে জ্বলে ওঠে তেভাগা আন্দোলনের আগুন। তিনি যোগ দেন সেই আন্দোলনে। ক্রমেই হয়ে ওঠেন এলাকার অবিসংবাদী নেত্রী। লোকমুখে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘নাচোলের রাণীমা’ নামে। এই আন্দোলন জোতদার-জমিদার এবং সরকারের আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠে। সরকার নাচোলের আন্দোলন দমন করতে সেনা নামায়। সেদিনের ইতিহাস স্বয়ং ইলা মিত্রের কথায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে:
I had to work underground for four years for organising the Tebhaga movement at Nachale, was arrested by the Pakistani army on 7 January 1950, and I was sentenced for life from the court.. After my arrest, I had to endure what a woman undergoes in a male chauvinist society, in jail custody.৩
ইলা মিত্রের এই সংগ্রামী জীবন অবলম্বনেই সেলিনা হোসেন রচনা করেছেন ‘কাঁটাতারের প্রজাপতি’।
এখন প্রশ্ন হল লেখক কি ইতিহাসের প্রতি নিষ্ঠাবান থেকেছেন? শ্রেণি-দৃষ্টিকোণ সেখানে কি ক্রিয়াশীল ছিল? সেই দৃষ্টিভঙ্গি কি সমাজবাস্তবতাকে মান্যতা দিয়েছে? এসবের উত্তর দিতে হলে আখ্যানে বর্ণিত ঘটনা এবং ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলিকে পাশাপাশি রাখতে হবে।
‘কাঁটাতারে প্রজাপতি’ উপন্যাসের আখ্যানের পরতে পরতে রয়েছে রাজনৈতিক ঘটনা ও পরিস্থিতির বাস্তবিক বর্ণনা। আখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্র জমিদার রমেন মিত্র ও স্ত্রী ইলা মিত্র পূর্ববঙ্গের নাচোলের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও সংগঠক ছিলেন। কৃষ্ণগােবিন্দপুরে হাটসভায় বক্তৃতার জন্য ইলা মিত্রের বক্তৃতার যে খসড়া তৈরি হয় সেখানে কৃষক আন্দোলনের রূপরেখা উঠে আসে। সেই সূত্রে উপন্যাসে এসেছে ১৯২৯ সালের বিশ্বমন্দা, ভারতের কৃষি অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব, ভূমিসংস্কারের লক্ষ্যে ক্লাউড কমিশন গঠন, কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত প্রাদেশিক কৃষক সভা কর্তৃক জমিতে দখল স্বত্ব প্রতিষ্ঠা ও ফসলের দুই তৃতীয়াংশ ভাগ লাভের দাবি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব, ১৯৪০ সালের কমিশন কর্তৃক কৃষকদের দাবির অনুকূলে রায় প্রদান, সে বছর জুনে যশােরে অনুষ্ঠিত কৃষক সভার চতুর্থ প্রাদেশিক সম্মেলনে তেভাগা আন্দোলনের সিদ্ধান্ত ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনা ।তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে। ১৯৪৬ নোয়াখালিতে দাঙ্গার তাণ্ডবলীলা, কলকাতায় দাঙ্গা, ১৯৪৮ সালের জুনের মধ্যে দেশ ছাড়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের ঘােষণা, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট নতুন রাষ্ট্রের জন্ম, দেশবিভাগের প্রতিক্রিয়া, কৃষক সভা ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন, কমিউনিস্টদের ওপর মুসলিম লিগের দমন– পীড়ন, কলকাতায় অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস, সেই কংগ্রেসে রণদিভের সশস্ত্র সংগ্রামের নীতি অনুমােদন ইত্যাদি স্মরণীয় ঘটনা।
সেকালের দাঙ্গার বাস্তবতাকেও লেখক এড়িয়ে যাননি। সময়ের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে উপন্যাসে দাঙ্গার বিস্তৃত বর্ণনায় প্রবৃত্ত হয়েছেন নিরাসক্ত ভঙ্গিতে:
১২ আগস্ট কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করলে, মুসলিম লীগ তাতে যােগ দিল না। তার আগেই ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘােষণা করেছিল। এ দিন প্রচণ্ড দাঙ্গায় কলকাতার বায়ু দূষিত। রমেন চোখ বুজলে দেখতে পায় সেই দৃশ্য। দেখতে পায়, উপুড় হয়ে এক যুবক, মুখ থুবড়ে পড়ে এক মহিলা, দ্বিখণ্ডিত শিশু, ভাবতেই অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে আসে মুখ থেকে।
নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা মণি সিংহ তাঁর গ্রন্থে নাচোলের তেভাগা আন্দোলন এবং ইলা মিত্রের অভূতপূর্ব নেতৃত্বের জীবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন:
নাচোলের সংগ্রামে আরেকটি জনপ্রিয় ও স্মরণীয় নাম হচ্ছে ইলা মিত্র। তিনি শুধু রমেন মিত্রের সহধর্মিণীই ছিলেন না, সহকর্মীও বটে। তিনি তখন ছিলেন একটি শিশুপুত্রের জননী। তিনি সব মায়া কাটিয়ে সাঁওতালদের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সাঁওতালরা তাঁকে নিজেদের মধ্যে পেয়ে উজ্জীবিত হয়ে উঠল। তিনি এঁদের নেতৃত্ব দিয়েছেন তেজস্বিতার সঙ্গে। সাঁওতালদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল শীর্ষে। তাঁকে সবাই ‘রাণীমা’ বলে ডাকত। তিনি সাঁওতালী ভাষাও শিখেছিলেন। তাঁদের তে-ভাগার দাবি অবশেষে সকলেই মেনে নিয়েছিল। এই সাফল্যে কৃষকরা আশা করেছিলেন, তাঁদের যে সব জমি ইতিপূর্বে হস্তচ্যুত হয়েছিল, সেগুলোর অধিকারও তাঁরা পাবেন। এক শক্তিশালী সংগঠন গড়ে ওঠার ফলেই দরিদ্র-নিপীড়িত কৃষকদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল।৪
সে-ই বর্ণনা মান্যতা পেয়েছে সেলিনা হোসেনের উপন্যাসেও। এখানে সর্বজ্ঞ কথকের বর্ণনায় ইলা মিত্রের নাচোলে তেভাগা আন্দোলনে নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার প্রথম দিনটি প্রাণময় হয়ে উঠেছে:
মিটিংয়ের দিন কৃষ্ণগোবিন্দপুর হাট লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। চণ্ডীপুর, কৃষ্ণপুর, কেন্দুয়া, গাসুড়া, শিবনগর, মান্দা, গোলাপাড়া, মল্লিকপুর, কালুপুর, মহীপুর সব জায়গা থেকে দলে দলে লোক আসে। পিঁপড়ের সারির মতো মানুষ চারদিক ঘিরে ফেলে– শত শত কণ্ঠে স্লোগান ওঠে: জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ কর, লাঙল যার জমি তার, ইজারাদারি বন্ধ কর– গর্জন থামে না, গর্জন ভেসে যায়, গর্জন স্রোত হয়ে মহানন্দায় মিলিত হয়। বক্তৃতা করে ফণীভূষণ মাস্টার, নওয়াবগঞ্জের পার্টি সেক্রেটারি মাণিক ঝাঁও, অজয় ঘোষ। সাজানো পয়েন্টের ভিত্তিতে ইলা মিত্র ইতিহাস টেনে এমন সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় বক্তৃতা করে যে, সবাই অভিভূত হয়ে শোনে। … গর্জে ওঠে স্লোগান: জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ কর, লাঙল যার জমি তার– লাঙল যার জমি তার – লাঙল যার জমি তার। এসব স্লোগান হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত হয়, ওদের ভাঙা পাঁজর থেকে বেরিয়ে আসে নিঃশ্বাসের মতো। এসব আকুতি উচ্চারণের জন্য ওরা নিজেদের ধন্য মনে করে– সামনে একটাই আশা, যদি কোনোদিন সত্য হয়ে ওঠে লাঙল এবং জমির অধিকার।
নিম্নবর্গের জেগে ওঠার কথাও আখ্যানে উঠে এসেছে বাস্তবলগ্নভাবে:
তখন বক্তৃতা শুরু করে কায়েস মণ্ডল, কিছুটা ভীতু স্বভাবের লোক, সাত চড়ে রা কাড়ে না, সে আজ নিজের থেকে কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়েছে। ওর ভেতর বুনো গোয়ার্তুমি আছে, বেশি উত্তেজিত হলে গোঁ গোঁ শব্দ করে কেবল, গুছিয়ে বলতে পারে না। তবু এসব লোকজন কথা বলতে চায়চায়, এটাই ইলার তৃপ্তি। কায়েস মণ্ডলের গলায় তেমন জোর নেই, কথা বেধে যায় বারবার, তবু বলার চেষ্টা করছে, জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে নেয়, একটু পর ‘ভাইসব’ বলে শক্তি সঞ্চয় করে। এক সময় কায়েস মণ্ডল মরিয়া হয়ে বলে, হামরা জানি শরিয়তে সুদ খাওয়া হারাম। কিন্তু হামারগ্যে চারপাশে যারা আছে, তারা সুদের টাকার পাহাড় ব্যানাচ্ছে। তাদের কি সুদ হালাল? জোতদাররা, মহাজনরা ঋণের ট্যাকার সুদ খ্যায় ক্যান? হ্যাকের মুখে কি বড় কথা ম্যানায়? ক্যাবল যত দোষ হারিখে, হামরা হামারঘে গায়ের চ্যামড়া দিয়্যা সুদের ঢোল ব্যানাই?
এসেছে জোতদারদের প্রতিরোধ, হিন্দু-মুসলমান কৃষিকদের মধ্যে বিভেদ চাগিয়ে দেওয়ার সত্যও:
নাসের জোতদার গ্রামের মুরুব্বিদের নিয়ে তার বাড়িতে সভা ডাকে। উত্তেজিত ভাষায় বলে, নারীশিক্ষার নামে শরিয়তবিরোধী কাজ-কর্ম শুরু হয়েছে গ্রামে। এটা চলতে দেয়া উচিত নয়। আপনারা কি বলেন ভাইসব? বুড়ো মজিরুদ্দিন মাথা নাড়ে, হ্যাঁ, আমারও তাই মত। তাছাড়া দেখেন আমরা তো ঘরের মেয়েদের বেপর্দা হতে দেই না। স্কুলে যাচ্ছে চাষাভুষো ঘরের মেয়েরা। বেশি বাড় বেড়েছে ওদের।
ঠিক, ঠিক। সভায় গুঞ্জন ওঠে। কাশেম ব্যাপারি নাকি সুরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ছোটলোকগুলোর আবার বিদ্যা শেখার শখ হয়েছে? ন্যাড়ার বেলতলা যাবার শখ আর কি? হো-হো হাসির রোল ওঠে।
নাসের জোতদারের কাছারি ঘরে সে হাসির রেশ মিলিয়ে গেলে পেছন থেকে উঠে দাঁড়ায় আজিজ। সে এসেছে সভার কথাবার্তা শুনতে। কথা ছিল, সে আসবে। কিন্তু ঐ বিদ্রূপাত্মক হাসির কিছুটা রোষের সঙ্গে বলে, কোনো কষ্ট পর সিডিটিক বলবে না। শুধু শুনে স্থির রাখতে পারে না। বিদ্যা-শিক্ষার দরকার চাচা। জোতদারদের কাগজে ওরা কোথায় যে কি টিপ-সই দেয়, ওরা নিজেরাও জানে না। ফলে ঋণের বোঝা বয়ে বেড়ায় সারা জীবন। লেখাপড়া শিখলে, … নিজেদেরটা নিজেরাই বুঝে নিতে পারবে।
এসেছে পুলিশ-সেনার দমননীতি এবং কৃষকদের প্রতিরোধের কথা:
এখানকার এসব ঘটনার খবর সরকারের কাছে গেল। কিন্তু এখানকার অবস্থা, আন্দোলনের ব্যাপকতা সম্পর্কে তারা ভালোভাবে জানতে পারেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাত্র পাঁচজন পুলিশ ও একজন দারোগা পাঠানো হলো। পুলিশের প্রত্যেকের হাতেই রাইফেল। এদিকে পুলিশের আগমনে কৃষকরা বিক্ষুব্ধ হলো। বল্লম, তির-ধনুক প্রভৃতিতে সজ্জিত হয়ে কৃষকরাও অগ্রসর হতে লাগল এবং চারদিক থেকে পুলিশকে ঘিরে ফেলল। পুলিশও বেপরোয়া গুলি ছুড়তে লাগল, কিন্তু ফল হলো উল্টো। ওই সংঘর্ষে পাঁচজন পুলিশ ও দারোগা সবাই মারা পড়ল। যখন ওই খবর গিয়ে ওপর মহলে পৌঁছুল, তখন সরকারি কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ ও তৎপর হয়ে উঠল। এবার পুলিশ নয়, সশস্ত্র সৈন্য আমদানি করা হলো। শোনা যায়, হাজার দুয়েক সৈন্য আমনুরা রেলস্টেশনে নেমেছিল। স্টেশন থেকে নাচোল আট মাইল। তারা জেনে এসেছে এবং তাদের বোঝানো হয়েছে এখানকার সব নারী-পুরুষ তাদের শত্রু-পাকিস্তানের শত্রু। কাজেই তারা যাকে পেল তাকেই হত্যা করল। দুর্জয় সাহস থাকলেই বর্শা, বল্লম আর তীর-ধনুক নিয়ে সৈন্যদের আধুনিক রাইফেল মেশিনগানের সঙ্গে সংগ্রাম করা যায় না। কৃষকরা ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। তার জন্য মাত্রাতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়। সৈন্যরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ওইসব পাকিস্তানি পাঞ্জাবি পাঠান হিংস্র সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচার জন্য যে যেদিকে পারল পালিয়ে যেতে লাগল।
ইলা মিত্র সেনাবাহিনীর হস্তগোচর হয়। এই বর্ণনার সমর্থন তাঁর স্বীকারোক্তিতেও মেলে। লেখকের বিবরণ এরকম:
১) রমেন মিত্র ও ইলা মিত্র সেই সময় দুজন দুই স্থানে ছিলেন। কয়েকশ জঙ্গি সাঁওতাল রমেন মিত্র ও মাতলা সর্দারকে নিয়ে সীমান্তের দিকে ছুটলেন। সীমান্তের নিরাপদ পথঘাট মাতলা সর্দারের জানা ছিল। মাতলা সর্দারের নেতৃত্বে একদল সীমান্তের অপর পারে মালদহে চলে গেল। ওপারে গিয়ে মাতলা সর্দার কপালে করাঘাত করে বিলাপ করতে লাগলেন। অনেকেই মারা পড়েছে। কিন্তু সেটাও মূল কারণ নয়। বিলাপের মধ্যে শোনা গেল-“রানীমা এখনো এলেন না! মা কি তবে শত্রুর হাতে ধরা পড়লেন?” সকলেই উদ্বিগ্ন, চিন্তায় দিশেহারা। তাঁদের আশঙ্কা সত্যে পরিণত হয়েছিল। ইলা মিত্র ধরা পড়েছিলেন। তিনি চারশ লোক নিয়ে সীমান্ত পার হতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথ দেখাবার উপযুক্ত লোক ছিল না। তাঁরা যেতে যেতে রহনপুর রেলস্টেশনের কাছে পৌঁছুলেন। সেই স্থানটি ছিল বিপজ্জনক। তার কাছেই ছিল সৈন্যদের ক্যাম্প। তাঁদের দেখে সৈন্যরা দ্রুত এসে ঘেরাও করে ফেলল। এরই মধ্যে রমেন মিত্র, ইলা মিত্র, মাতলা সর্দারসহ কয়েকজনের নামে হুলিয়া বের হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে সৈন্যরা পেয়ে গেল। ইলা মিত্র সাঁওতাল মেয়ের পোশাক পরে ছিলেন। সাঁওতাল ভাষায় কথা বলছিলেন! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ধরা পড়ে গেলেন।
২) যাঁদের গ্রেপ্তার করা হলো প্রথম থেকেই তাঁদের সকলের ওপর সৈন্যরা পৈশাচিক উল্লাস ও হিংস্রতায় যন্ত্রণা দিয়ে নির্যাতন শুরু করল। সেই নিষ্ঠুর নির্যাতনের কাহিনী ভাষায় অবর্ণনীয়! রক্তে রক্তে তাঁদের দেহ লাল হয়ে গেল। জ্ঞানহারা হলো, তবুও বর্বর সৈন্যরা নিপীড়নে ক্ষান্ত হলো না। ইলা মিত্রকেও তারা নির্মমভাবে অত্যাচার করল। সে অত্যাচারের কৌশল ভয়ঙ্কর, অমানুষিক এবং বর্বর। তারপর সবাইকে নাচোল আনা হলো। ‘হরেক’কে তারা টানতে টানতে নিয়ে এলো। তর্জন গর্জন করে তারা বলল, “বল ইলা মিত্র পুলিশকে মারবার জন্য হুকুম দিয়েছিল।” কিন্তু হরেক একটি কথাও বলল না। তাঁকে বলা হলো, “যদি তুই এ কথা না বলিস, তবে তোকে একেবারে মেরে ফেলব।” এই কথা বলে তারা হরেকের পেট-বুকে সজোরে বুট দিয়ে লাথি মারতে লাগল। হরেকের মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল, কিন্তু হরেকের মুখ দিয়ে তাদের শেখানো একটি কথাও বের করা গেল না। এর ফলে হরেককে শেষ পর্যন্ত মরতে হলো। এভাবে তারা সবাইকে নির্দয়ভাবে প্রহার করেও কারো মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারল না। মামলা সাজানোর জন্য তারা এভাবে কয়েকজনকে মারতে মারতে মেরে ফেলেছে, কিন্তু কারো মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারেনি।
এই বর্বর ও নৃশংস অত্যাচার লেখকের বর্ণনায় জীবন্ত। মধ্যযুগীয় বর্বরতার কাছে ইলা মিত্রের অনমনীয় দৃঢ়তাও প্রাণবন্ত:
ইলা পাথরের মতাে অনড়, নির্যাতনে ওর মুখে শব্দ নেই, যন্ত্রণায় ওর চোখে জল নেই। ও মহাকালের আকাশের। নীচে কালাে পাথরের মূর্তি, যার শরীরের ওপর দিয়ে শতাব্দীর ঝড় বয়ে যায়।
ইলা মিত্রকে পার্টি থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কোনাে সংস্কারের বশবর্তী হয়ে তিনি যেন কিছু গােপন না করেন। পার্টির নির্দেশে ইলা এক জবানবন্দি পেশ করেছিলেন, কারণ কোনাে পত্রিকা এটি প্রকাশ করতে চায়নি। অতএব কমিউনিস্ট পার্টি থেকে লিফলেট আকারে জবানবন্দি প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৫০ সালের ১৬ জানুয়ারি। এদিন থেকে তার উপর পুলিশের নির্যাতন শুরু। সেলিনা হােসেনের প্রবন্ধ সংকলন ‘নির্ভয় করাে হে’ বইয়ে ‘সেই জবানবন্দিটি এবং ‘আমাদের ঋণ’ নিবন্ধে বিস্তৃতভাবে জবানবন্দিটি তুলে ধরা আছে। তার অংশবিশেষ তুলে এখানে ধরা হল:
কেসটির ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। বিগত ৭-১-৫০ তারিখে আমি রােহনপুরে গ্রেফতার হই এবং পরদিন আমাকে নাচোল নিয়ে যাওয়া হয় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানতে। আমার যেহেতু বলার কিছু ছিল না, কাজেই তারা আমার সমস্ত কাপড়-চোপড় খুলে নেয় এবং সম্পূর্ণ উলঙ্গভাবে সেলের মধ্যে আমাকে বন্দি করে রাখে। …. সেদিন সন্ধ্যাবেলায় এস. আই. -এর উপস্থিতিতে সেপাইরা তাদের বন্দুকের বাট দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করতে শুরু করে। সে সময় আমার নাক দিয়ে প্রচুর রক্ত পড়তে থাকে।যে কামরাটিতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলাে সেখানে স্বীকারােক্তি আদায়ের জন্য তারা নানা ধরনের অমানুষিক। পদ্ধতিতে চেষ্টা চালায়। দুটি লাঠির মধ্যে আমার পা দুটি ঢুকিয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছিল এবং সে সময়ে চারধারে যারা দাঁড়িয়ে ছিলাে, তারা বলছিলাে যে, আমাকে পাকিস্তানি ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে।….. জোর করে আমাকে কিছু বলাতে না পেরে তারা আমার চুলও উপড়ে তুলে ফেলেছিল।
সেলের মধ্যে আবার এস, আই সেপাইদেরকে চারটে গরম সেদ্ধ ডিম আনার হুকুম দিল এবং বললাে, এবার সে কথা বলবে। তারপর চার পাঁচজন সেপাই আমাকে জোরপূর্বক ধরে চিত করে শুইয়ে রাখলাে এবং একজন আমার যৌন অঙ্গের মধ্যে একটি গরম সিদ্ধ ডিম ঢুকিয়ে দিল…. এরপর আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।
৯-১-৫০ তারিখের সকালে যখন আমার জ্ঞান ফিরলাে তখন উপরিউক্ত এস, আই এবং কয়েকজন সেপাই আমার সেলে এসে তাদের বুট দিয়ে আমার পেটে লাথি মারতে শুরু করলাে। এরপর ডান পায়ের গােড়ালিতে একটা পেরেক ফুটিয়ে দেওয়া হলাে এস. আইকে বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম- ‘আমরা আবার রাত্রিতে আসছি এবং তুমি যদি স্বীকার না করাে, তাহলে সেপাইরা একে একে ধর্ষণ করবে। গভীর রাত্রিতে… তিন চারজন আমাকে ধরে রাখলাে এবং একজন। সেপাই সত্যি আমাকে ধর্ষণ করতে শুরু করলাে।
পরদিন ১০-১-৫০ তারিখে যখন জ্ঞান ফিরে এলাে তখন আমি দেখলাম যে, আমার দেহ থেকে দারুণভাবে রক্ত ঝরছে, সেই অবস্থাতেই আমাকে নাচোল থেকে নবাবগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হলাে।
১১-১-৫০ তারিখে সরকারি হাসপাতালে নার্স আমাকে পরীক্ষা করলেন। ….. আমার পরনে যে রক্তমাখা জাল, কাপড় ছিলাে সেটা পরিবর্তন করে একটি পরিষ্কার কাপড় দেওয়া হলাে।
১৬-১-৫০ তারিখে সেপাইরা জোর করে একটি সাদা কাগজে সই আদায় করলাে। ২১-১-৫০ তারিখে নবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে এসে সেখানে জেল হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়া হলাে।
জবানবন্দিটি এখানেই সমাপ্ত। সেলিনা হােসেন ‘কাঁটাতারে প্রজাপতি’ উপন্যাসে মূল জবানবন্দিটিকে হুবহু একইভাবে বর্ণনা করেছেন। এই অত্যাচারের কথা মণি সিংহের স্মৃতিচারণাতেও এসেছে:
ইলা মিত্রের ওপর যে পৈশাচিক ও বীভৎস অত্যাচার করা হয়েছিল, তা একমাত্র নাৎসি ফ্যাসিস্টদের অত্যাচারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তাঁকে কেবল মারপিট করে শয্যাশায়ীই করা হয়নি, তাঁর যৌনাঙ্গে গরম ডিম ও / ধর্ষণ পর্যন্ত করা হয়েছিল। সভ্য জগতে এর তুলনা বিরল।৫
তুলনামূলক বিচারে দেখা যায় প্রান্তিক মানুষের প্রতিবাদ, তাদের লড়াইয়ের উপস্থাপনা এই উপন্যাসে অনেকবেশি বাস্তবিক হয়ে উঠেছে। প্রান্তিক মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা লেখকের জীবনদৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। কায়েস মণ্ডল কিংবা আজিজদের স্বর একেবারে তাদের নিজস্ব। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, রাজনৈতিক চরিত্র হলেও ব্যক্তিমানুষ ইলা মিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে লেখক ভুলে যাননি। তাঁর স্বামীপ্রেম, সন্তান-বাৎসল্য, অতিথিপরায়ণতা ইত্যাদি দিকও স্বল্পরেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন ঔপন্যাসিক। এইভাবে চরিত্রটি রাজনৈতিক সংগ্রামী আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করেও রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষ হয়ে উঠেছে। এখানেই উপন্যাসটির বিশিষ্টতা নিহিত।
উল্লেখপঞ্জি:
১) Devi Mahasweta: ‘Story of Chuni kotal’, Economic and Political Weekly, vol. 27, no. 35 (1992), 1836-1837
২) Chakravorty Spivak Gayatri: ‘Can, The Subaltern Speak?’, Walther Konig, Verlag, 2021
৩) Mitra Ila Mitra’s ‘Testimony of Struggle’ Vol. 45, Issue No. 33, 14 Aug, 2010
৪) সিংহ মণি: ‘জীবন সংগ্রাম’, ‘নাচোল কৃষক বিদ্রোহের কথা’, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৯২, পৃষ্ঠা-১২৬-১৩০
৫) সিংহ মণি: ‘জীবন সংগ্রাম’, ‘নাচোল কৃষক বিদ্রোহের কথা’, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৯২, পৃষ্ঠা-১২৬-১৩০