ফ্যাসিবাদ ও বামপন্থা : সেই সময়, এই সময়

শোভনলাল দত্তগুপ্ত

ভারতবর্ষে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদের ধারণা, ফ্যাসিবাদ নিয়ে আলোচনা যে ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না। আগামী বছরগুলিতে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও বাড়বে– এমনটাই আশঙ্কা। একই সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন বড়ো হয়ে দেখা দিচ্ছে: ফ্যাসিবাদের বিপদকে ঠেকাবে কারা? কীভাবেই বা এই বিপদের মোকাবিলা করা যাবে? এই দুটি প্রশ্নকে ঘিরে যত আলোচনাই হোক না কেন, একটি বিষয় কিন্তু মোটামুটি স্পষ্ট। এই দেশে আমরা ক্রমেই ফ্যাসিবাদের দিকে পা বাড়াচ্ছি কী না, মোদী সরকারকে ফ্যাসিবাদের ভাবনার সঙ্গে আদৌ সম্পর্কিত করা যাবে কী না, কিংবা মোদী সরকারের ও বি.জে.পি-র যে ভাবাদর্শ, তার মধ্যে ফ্যাসিবাদের ছায়া দেখার এখনই প্রয়োজন আছে কী না, এই সব প্রশ্নে সংশয় ও বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয়ে বোধ হয় সহমত পোষণ করা যায়। ফ্যাসিবাদের যে বিপদ, তার প্রকৃত মোকাবিলা করতে পারেন একমাত্র বামপন্থীরাই। তাঁরাই ফ্যাসিবাদের প্রধান বিরোধীপক্ষ, ফ্যাসিবাদও বামপন্থাকেই তার প্রধান শত্রু হিসাবে গণ্য করে। অতি বড়ো দক্ষিণপন্থীও অস্বীকার করতে পারবেন না যে ইতালি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা পালন করেছিলেন কমিউনিস্টরা। নাৎসি অধিকৃত ইউরোপের দেশগুলিতে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী যে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল, তার প্রথম সারিতে ছিলেন কমিউনিস্টরা। তাই বামপন্থীরা, বিশেষত কমিউনিস্টরা, ফ্যাসিবাদের ঘোষিত প্রতিপক্ষ।

আবার এখানেই একটি প্রশ্ন বামপন্থীদের ভাবায়। যথেষ্ট প্রভাব সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের উত্থানকে বামপন্থীরা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন কেন? ফ্যাসিবাদের মতো একটি মানবতাবাদবিরোধী ভাবাদর্শ জনমানসে ঠাঁই পেলই বা কীভাবে? ফ্যাসিবাদের গণভিত্তির কারণটাই বা কী? ফ্যাসিবাদের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বামপন্থীদের, কমিউনিস্টদের কি কোনও তাত্ত্বিক খামতি ছিল, যার মাসুল তাঁদের গুণতে হয়েছিল? বিশ-তিরিশের দশকে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থানপর্বের পর্যালোচনা যদি নির্মোহ দৃষ্টিতে করা যায়, তাহলে এই জটিল প্রশ্নের উত্তর এবং বর্তমান সময়ে এই বিষয়টির প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট হবে।

দুই

ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে বামপন্থীদের মূল্যায়নে গুরুতর ত্রুটি বিচ্যুতি ছিল, এই কথাটা স্বীকার করে নেওয়া দরকার। এর কারণ দ্বিবিধ। এক: ইতিহাসগত কারণেই ফ্যাসিবাদ সম্পর্কিত কোনও আলোচনা মার্কস-এঙ্গেলস বা লেনিনের লেখায় পাওয়া যায় না। স্তালিনের রচনাতেও ফ্যাসিবাদের কোনও যথার্থ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ অনুপস্থিত। দুই: যাঁর বক্তব্য এই বিষয়ে আমাদের কাছে সর্বাধিক পরিচিত, তিনি হলেন তৃতীয় আন্তর্জাতিকের (কমিনটার্ন) মধ্য তিরিশের দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব জর্জি দিমিত্রভ। দিমিত্রভের আলোচনাতে মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ফ্যাসিবাদের চরিত্র ও ফ্যাসিবাদকে প্রতিরোধ করার রণনীতির বিস্তৃত ব্যাখ্যা মেলে। ফ্যাসিবাদকে প্রতিরোধ করতে হলে সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তির সমন্বয়ে একটি যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলা প্রয়োজন– যেখানে শ্রেণি ঐক্যের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিলে চলবে না– দিমিত্রভের এই বক্তব্য যখন ১৯৩৫ সালে কমিনটার্নের সপ্তম কংগ্রেসে উপস্থিত করা হল, সেটি অবশ্যই ছিল অভিনব। পরবর্তী বছরগুলিতে দিমিত্রভের প্রস্তাবিত এই রণনীতিই ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

কিন্তু ফ্যাসিবাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দিমিত্রভ যে ব্যাখ্যা দিলেন তার একটা বড়ো রকমের সীমাবদ্ধতা ছিল। দিমিত্রভ সঠিকভাবে ফ্যাসিবাদকে ফিনান্স-পুঁজির বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদকে শুধুমাত্র আগ্রাসী পুঁজির সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখার মধ্যে একটা বড়ো রকমের ফাঁক ছিল। ফ্যাসিবাদ শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়– এটি যে একটি ভিন্ন গোত্রের সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা, যা শাসন করে মানুষের মস্তিষ্ক ও চেতনাকে মতাদর্শগত স্তরে, তার বিশেষ কোনও আলোচনা দিমিত্রভের ব্যাখ্যার মধ্যে মেলে না। এর নেপথ্যে কাজ করেছিল– মার্কসবাদ আসলে এক ধরনের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদ মাত্র– এই রকম একটি যান্ত্রিক ভাবনা।

এই প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, প্রাক্‌-দিমিত্রভ পর্বে তৃতীয় আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদের যে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছিল, সেখানেও গুরুতর ভুল ছিল এবং তার উৎস অর্থনীতিকেই একমাত্র বিচার্য বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা। বিশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে তিরিশের দশকের প্রথম পর্ব– এই সময়ে, বিশেষ করে ১৯২৮-৩৪ এই কালপর্বে কমিনটার্নের আলোচনায় পরিলক্ষিত হয়েছিল, এক প্রবল উগ্র-বামপন্থী ঝোঁক যার মূল কথা ছিল একটিই: বিশ্ব পুঁজিবাদ এক ঘোর সংকটের সম্মুখীন এবং ফ্যাসিবাদ এই সংকটাপন্ন পুঁজিবাদেরই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। অতএব সময় এসেছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানিয়ে তার বিরুদ্ধে মুখোমুখি শ্রেণি-সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার– যার জেরে পুঁজিবাদকে সহজেই পরাস্ত করা যাবে। এই সূত্রটিকে অবলম্বন করে দুটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হল তৎকালীন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট নেতৃত্ব। এক: বলা হল যে, ফ্যাসিবাদ যেহেতু এই সংকটাপন্ন পুঁজিবাদী অর্থনীতিরই বহিঃপ্রকাশ, তাকে গুরুত্ব দেবার কোনও কারণ নেই, অর্থাৎ, ফ্যাসিবাদ আদতে একটি দুর্বল ব্যবস্থা, যাকে একক শক্তিতেই কমিউনিস্টরা পর্যুদস্ত করতে পারবে। দুই: সোশ্যাল ডেমোক্রেসি হল ফ্যাসিবাদেরই দোসর, ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদেরই অপর একটি রূপ। সুতরাং, সোশ্যাল ডেমোক্রেসিকেও চিহ্নিত করা হল অপর এক শত্রু হিসেবে। এই বিশ্লেষণের মারাত্মক ভুলটি ছিল ফ্যাসিবাদের গণভিত্তিকে অস্বীকার করা এবং তার পরিণতিতে ফ্যাসিবাদের স্থায়িত্ব ও ঘনায়মান বিবাদকে অগ্রাহ্য করা। এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে দিমিত্রভই প্রথম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে ফ্যাসিবাদবিরোধী যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার, কমিউনিস্ট ও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের ঐক্য স্থাপনের কথা বলে ফ্যাসিবাদের বিপদকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে পেরেছিলেন।

কমিউনিস্ট পার্টিগুলি যখন ফ্যাসিবাদের আলোচনা করে তখন সঙ্গত কারণেই দিমিত্রভ প্রসঙ্গ এসে পড়ে। কিন্তু উপেক্ষিত থেকে যান আরও বেশ কয়েকজন ব্যক্তিত্ব, যাঁরা সকলেই ছিলেন কমিউনিস্ট এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য তিনটি নাম: আনতোনিও গ্রামশি, লিওন ত্রৎস্কি এবং নিকোলাই বুখারিন। মূল ধারার কমিউনিস্ট আন্দোলনে ফ্যাসিবাদের আলোচনায় এঁরা ব্রাত্যই রয়ে গেলেন– কিন্তু এঁদের আদর্শ ও বক্তব্যকে অস্বীকার করলে ফ্যাসিবাদের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এঁদের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও দুটি বিষয়ে মিল ছিল। ফ্যাসিবাদ যে নিছকই পুঁজিবাদেরই একটি রূপ মাত্র– এই অতি সরলীকৃত ধারণার তাঁরা বিরোধী ছিলেন। পুঁজিবাদ সংকটাপন্ন– ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদেরই একটি নতুন সংস্করণ মাত্র– তৃতীয় আন্তর্জাতিকের এই সরলীকৃত ভাষ্যের মধ্যে ফ্যাসিবাদের বিপদকে যথার্থভাবে অনুধাবন করার প্রশ্নে যে গুরুতর খামতি ছিল, তার বিরুদ্ধে এঁরা সরব হয়েছিলেন। একই সঙ্গে এঁদের ভাবনায় গুরুত্ব পেয়েছিল অপর একটি বিষয়– কমিনর্টানের ফ্যাসিবাদ বিশ্লেষণে যা প্রায় অনালোচিত থেকে গিয়েছিল। সেটি হল ফ্যাসিবাদের গণভিত্তিকে বোঝার চেষ্টা। এই বিষয়টিকে তৃতীয় আন্তর্জাতিক আমল দেয়নি বলেই জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব, ইতালির কমিউনিস্ট পার্টিতে অতি-বামপন্থী বরদিগা গোষ্ঠী এমন সহজ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে ফ্যাসিবাদ নেহাতই এক কাগুজে বাঘ, যাকে বামপন্থী শ্রমিক আন্দোলন এক ধাক্কায় পর্যুদস্ত করতে সক্ষম হবে।

গ্রামশি ফ্যাসিবাদের এই অতিসরলীকৃত মার্কসবাদী ভাষ্যের প্রতিস্পর্ধী যে ভাবনাটি হাজির করলেন তার তাত্ত্বিক কাঠামোতে অগ্রাধিকার পেয়েছিল উপরিকাঠামোর ধারণা, যার কেন্দ্রে ছিল মতাদর্শ ও সংস্কৃতি। সাধারণভাবে পুঁজিবাদ তার শাসন কায়েম রাখে জনগণের সম্মতি আদায় করে। যখন তার পক্ষে তার নিজস্ব সংকটের কারণেই এটা করা আর সম্ভবপর হয় না, তখনই সে স্বৈরাচারী শাসনের পক্ষে অগ্রসর হয় এবং এভাবেই তৈরি হয় ফ্যাসিবাদের ভিত্তি। কিন্তু ফ্যাসিবাদও নিছক দমন-পীড়ন করে নয়, বুর্জোয়া ব্যবস্থার সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলিকে, গোটা পুরসমাজের পরিসরের সে সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শগত রূপান্তর ঘটায়, করায়ত্ত করে মানুষের চেতনা ও ভাবনাকে। ত্রৎস্কি ১৯৩০-৩৫এ, অর্থাৎ জার্মানিতে নাৎসিবাদের প্রতিষ্ঠাপর্বে ফ্যাসিবাদের যে বিশ্লেষণ করেছিলেন, তারও যথার্থ মূল্যায়ন করা হয়নি। তিনি ফ্যাসিবাদের গণভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন পেটি বুর্জোয়াশ্রেণিকে, দোকানদার, ছোটো ব্যবসায়ীদের, সাধারণ কর্মচারী ও বিভিন্ন পেশায় প্রশিক্ষিত মানুষদের। ফ্যাসিবাদকে পুঁজিবাদেরই একটি নতুন সংস্করণ বলে থেমে যাওয়ার ভাবনাকে তাঁর কাছে ফ্যাসিবাদের অতি সরলীকরণ মনে হয়েছিল। তাই তিনিও দিমিত্রভের মতোই ডাক দিয়েছিলেন ফ্যাসিবাদবিরোধী যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার, যেখানে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও কমিউনিস্টদের একসঙ্গে সামিল হতে হবে। এখানে তাঁর একটি সংযোজনও ছিল: এই মোর্চাকে হতে হবে একই সঙ্গে রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক। ফ্যাসিস্তদের মোকাবিলা করতে হলে প্রতিটি মহল্লায় গড়ে তুলতে হবে প্রথমে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষার্থে রক্ষণাত্মক ইউনিট, যাকেই আবার রূপান্তরিত করতে হবে আক্রমণাত্মক ইউনিটে। প্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত রয়ে গেছে নিকোলাই বুখারিনের ফ্যাসিবাদ-বিশ্লেষণ। বহু দশক ধরে তিনি ছিলেন মূল ধারার মার্কসবাদের আলোচনায় ব্রাত্য। তাঁর রাজনৈতিক পুনর্বাসন হয় আশির দশকের একেবারে শেষ পর্বে এবং তারও পরে আমাদের নজরে আসে সম্পূর্ণ অজানা তাঁর একাধিক কারাপান্ডুলিপি। এই রচনাগুলির সঙ্গে তিরিশের দশকের বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিবাদ প্রসঙ্গে তাঁর একাধিক বক্তৃতা ও আলোচনা যদি মিলিয়ে পড়া যায়, তাহলে দেখা যাবে যে বুখারিন অত্যন্ত দ্বর্থ্যহীনভাবে ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করার জন্য গুরুত্ব দিয়েছিলেন সাংস্কৃতিক স্তরে লড়াই-এর ওপরে, অর্থাৎ ফ্যাসিবাদ নিছক একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়। এটি এক ভয়ংকর রকমের হিংসাশ্রয়ী সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা যা মানুষের চৈতন্যকে বিকৃত করে দেয়, তার চেতনাকে চালিত করে ভুল পথে। তার প্রতিস্পর্ধী সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে, বিকল্প হিসেবে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে।

গ্রামশি, ত্রৎস্কি, বুখারিন– এঁদের বিশ্লেষণে ফ্যাসিবাদকে একটি উপরিকাঠামোগত বিষয় হিসেবে দেখার এই যে ভাবনা, তাকে আরও গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন ভিলহেল্‌ম রাইস তাঁর Mass Psychology of Fascism গ্রন্থে, যেটি জার্মানিতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৩ সালে এবং হিটলার জমানায় সেটি জার্মানিতে নিষিদ্ধ ছিল। ফ্যাসিবাদের আলোচনায় বামপন্থী মহলে বিস্ময়করভাবে এটি আজও অনাদৃত। ফ্রয়েডের সহকর্মী রাইস ফ্যাসিবাদকে বিশ্লেষণ করেছিলেন মনন ও চেতনার স্তরে ফ্যাসিবাদ কীভাবে অনুপ্রবেশ করে, কীভাবে মানুষের চৈতন্যের স্তরে ফ্যাসিবাদ মান্যতা পায়– এই জটিল ও প্রায় অনালোচিত প্রশ্নের। সংক্ষেপে তাঁর বক্তব্যের মূল কথাগুলি ছিল এরকম:

(১) জার্মানির দীর্ঘকালের পারিবারিক রক্ষণশীলতা যার মূল কথা হল পিতৃতান্ত্রিকতা, যেখানে সর্বাধিক গুরুত্ব পায় পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ প্রধান, ফ্যাসিবাদ তাকে কাজে লাগিয়েছিল। (২) জার্মান সংস্কৃতিতে দীর্ঘকাল ধরেই প্রাধান্য পেয়েছে নেতানির্ভরতা, অন্ধ আনুগত্য এবং শৃঙ্খলাবদ্ধতা। নাৎসি মতাদর্শ এই উপাদানগুলিকেই আশ্রয় করে দখল নিয়েছিল মানুষের মনন ও চেতনার। (৩) জার্মান ফ্যাসিবাদের মূল ভিত্তি ছিল পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি, যে তার অধস্তন শ্রমিক শ্রেণিকে শাসন করবে, এবং অধস্তনের এই আনুগত্যকে সুনিশ্চিত করতে হলে তাকেও হয়ে উঠতে হবে ক্ষুদে হিটলার– এরকম এক চিন্তা তাঁদের চৈতন্যকে গ্রাস করেছিল খুব সহজে, অর্থাৎ হিটলারের মধ্যেই এই পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি খুঁজে পেয়েছিল তাদের অবদমিত, সুপ্ত ইচ্ছাপূরণের ভাবনাকে। তাই রাইস বইটির এক জায়গায় মন্তব্য করেছিলেন যে ফ্যাসিবাদের গণভিত্তি প্রতিষ্ঠা করার কৃতিত্ব আসলে হিটলারের নয়, কৃতিত্বটা এই মানসিকতার, যাকে আশ্রয় করে ফ্যাসিবাদ জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। (৪) ফ্যাসিবাদ নিজেকে টিকিয়ে রাখে কতকগুলো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও ভাঁওতা দিয়ে আর এগুলির ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলে কতকগুলো অবাস্তব, কল্পনাশ্রয়ী ভাবনা যা এমনভাবে মানুষকে স্পর্শ করে, তার চৈতন্যের বিনির্মাণ ঘটিয়ে নির্মাণ করে এক ভ্রান্ত চৈতন্য, এবং যার জেরে সাধারণ মানুষের মননে ফ্যাসিবাদ পায় মান্যতা।

তিন

স্থান, কাল, পাত্র ভিন্ন হলেও ফ্যাসিবাদ নিয়ে অতীতের এই আলোচনা, মার্কসবাদে আস্থাশীল বামপন্থী মহলের ফ্যাসিবাদ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে গুরুতর ত্রুটিবিচ্যুতির বিষয়টি ভারতবর্ষের বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না। এ কথাও বোধ হয় অনস্বীকার্য যে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য যে বাতাবরণ প্রয়োজন, আমরা ক্রমেই সেরকম একটি বাবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এই আসন্ন বিপদের মোকাবিলা করতে হলে প্রথমেই দেখা দরকার ক্ষমতায় আসীন মোদী সরকার কীভাবে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলি নিয়ে চলেছে। এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে অতীতের শিক্ষা। এক: গোড়ার দিকে হিটলারের বক্তব্যে প্রায়শই শোনা যেত যে তাঁর পার্টিটি হল বড়ো বড়ো পুঁজিপতিদের স্বার্থবিরোধী। বাস্তবে ঘটেছিল তার উলটোটা। ক্ষমতাসীন হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বৃহৎ পুঁজির সমর্থনেই জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের প্রসার ঘটে। মোদী সরকারের অনেক মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মধ্যে একটি বড়ো প্রতিশ্রুতি হল কালো টাকা ফেরত আনা এবং নোট বাতিলের মাধ্যমে দেশকে কালো টাকা থেকে মুক্ত করা। বিরোধীরা এই গোটা বিষয়টিকে যখন সম্পূর্ণ একটি মিথ্যা আখ্যা দিচ্ছেন, তার কোনও বিশ্বাসযোগ্য জবাব কেন্দ্রীয় সরকার এখনও দিতে পারেনি। কিন্তু দেশের এক বড়ো অংশের মানুষ এই মিথ্যাচারকেই সত্য বলে গণ্য করছে। দুই: প্রাচীন ভারতবর্ষ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তব এক কল্পনার মায়াজাল তৈরি করে তার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মের মিশেল খাটিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে মানুষের চৈতন্যের দখল নিতে বদ্ধপরিকর বি.জে.পি. দলটি। অত্যন্ত কঠিন ও নির্মম সত্য এটাই যে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে হিন্দুত্ববাদীরা অনেকাংশেই আজ সফল। তিন: ফ্যাসিবাদ একদিকে যেমন মানুষের চৈতন্যের দখল নিতে চায় অপরদিকে তার শাসন ও মতাদর্শকে সুনিশ্চিত করার জন্য তার প্রয়োজন হয় ঝটিকাবাহিনী তৈরি করার। ইতালি ও জার্মানিতে খুব সুপরিকল্পিতভাবে মুসোলিনি ও হিটলার এই বাহিনী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতবর্ষে এই বাহিনী হল আর. এস. এস. ও ক্রমবর্ধমান জঙ্গি হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন। চার: ফ্যাসিবাদের অন্যতম কৌশল হল হিংসা ও বিদ্বেষের বাতাবরণকে এমনভাবে সৃষ্টি করা যাতে জনমানসে এটি মান্যতা পায়, অর্থাৎ, এটাই স্বাভাবিক, এটাই সঠিক এমন একটি ভ্রান্ত চৈতন্য মানুষকে গ্রাস করে। জার্মানিতে ইহুদি নিধন এভাবেই সমাজে মান্যতা পেয়েছিল, যেমনটা শুরু হয়েছে বর্তমান সময়ের ভারতবর্ষে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের ক্ষেত্রে।

এখানেই আবারও উঠে আসে অতি গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রশ্ন: বামপন্থীরা, বিশেষত কমিউনিস্টরা, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই কঠিন ও জটিল চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে কতটা সক্ষম। এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ইতিহাসের শিক্ষা। এখনও পর্যন্ত ভারতবর্ষের মার্কসবাদী মহলে ফ্যাসিবাদের আসন্ন উত্থানকে কর্পোরেট পুঁজির আগ্রাসনের নগ্ন প্রকাশ হিসেবেই দেখা হয়। অতীতেও যেমনটা ঘটেছিল, এক্ষেত্রেও অনেকটা তাই ঘটছে। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এক ধরনের অসম্পূর্ণতা, একেদেশদর্শিতা প্রকাশ পাচ্ছে, যেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে মূলত অর্থনৈতিক বিচার। এখানে প্রশ্ন ওঠে, নয়া উদারনীতিবাদ কি তাহলে ফ্যাসিবাদের সমর্থক? ইউরোপের অধিকাংশ দেশই এখন নয়া উদারনীতিবাদের পথ অনুসরণ করে চলেছে, কিন্তু তারই মধ্যে একাধিক দেশে (যেমন– জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি) উগ্র দক্ষিণপন্থী দলের উত্থান, যারা সরাসরি ফ্যাসিস্ত মতাদর্শে বিশ্বাসী, নয়া উদারনীতিবাদী সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপ, হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডে, লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা কেন জনগণের সম্মতি আদায় করতে সমর্থ হয়েছে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত ভারতবর্ষে বিজেপি-র গত লোকসভা নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্যের বিষয়টি। হিন্দুত্বের ভাবনাকে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের মোড়কে সাধারণ মানুষের চেতনার স্তরে পৌঁছে দিয়ে বিজেপি ভারতবর্ষে যে ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়, সেটি আদতে ফ্যাসিবাদেরই ভারতীয় সংস্করণ। বামপন্থীদের যদি এই বিপদের মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে একদিকে যেমন বিজেপি-র মোকাবিলা করতে হবে পালটা, বিকল্প সংস্কৃতির এক নতুন আবহ গড়ে তুলে, অপরদিকে এই প্রশ্ন নিয়েও তাঁদের ভাবতে হবে যে, ভারতীয় মননে রক্ষণশীলতার কোন উপাদানগুলিকে বিজেপি চিহ্নিত করে তার হিন্দুত্বের কর্মসূচিকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হচ্ছে? আমাদের চেতনার স্তরে কোন দুর্বল স্থানগুলির সুবাদে মানাতা পাচ্ছে বিদ্বেষ, বিভাজন, হিংসা, অসহিষ্ণুতা? আমাদের চৈতন্যে যুগ যুগ ধরে সঞ্চারিত হয়েছে এমন কী ভাবনা যা বৈধতা দিচ্ছে বিজেপি-র চরম রক্ষণশীল হরেক কিসিমের ভাবনাকে? আরও স্পষ্ট করে বললে ঘনায়মান ফ্যাসিবাদের বিপদকে রুখতে হলে বামপন্থীদের বিশেষভাবে অনুধাবন করতে হবে ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের মানসিক গঠনকে, তার চিন্তা করার ধরনকে। অবৈজ্ঞানিক, অযৌক্তিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, জাতপাতের ভাবনায় দীর্ণ গড় ভারতবাসীর মানসিকতাই বিজেপি-র হাতিয়ার। তাই নরম হিন্দুত্ব নয়, হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতা নয়, মননের স্তরে, চেতনার স্তরে নিয়োজিত হতে হবে এক পালটা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, যার মূল কথা হবে দেশজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সর্বোৎকৃষ্ট উপাদানগুলির সঙ্গে সমাজতন্ত্রের ভাবনাকে অন্বিত করা। এই দায়িত্ব ও কর্তব্য বামপন্থীদের– এগিয়ে আসতে হবে তাঁদেরই।

[শোভনলাল দত্তগুপ্ত : ‘আকালের ভাবনা : লেখালিখি, সাক্ষাৎকার : ২০১১-২১’ (কলকাতা: সেরিবান, ২০২২)]

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান