সুলগ্না খান
এক
কথামুখ
সময়ের অভিঘাত বহু-চর্চিত বিষয়কে নিজস্ব প্রায়োজনিক প্রেক্ষাপটে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে। এই লেখার সূত্রপাত যে কালবেলায়; তা একাধারে মর্মান্তিক এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিজ্ঞাসার অভিমুখ-সন্ধানী। সম্প্রতি ঘটে গেছে শহর কলকাতার বুকে একটি নারকীয় হত্যাকাণ্ড। কর্মক্ষেত্র, যা এক-অর্থে, পেশাদার ব্যক্তির ‘দ্বিতীয় ঘরবাড়ি’-র সমতুল্য; সেই কর্মস্থলে-ই এক তরুণী চিকিৎসক-এর ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার অভিযোগ-কে কেন্দ্র করে,উত্তাল রাজ্য-রাজনীতির বর্তমান বৃহত্তর মানচিত্র। দুর্নীতি এবং অন্য নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি, লক্ষণীয়,এই ঘটনার শিকার যে নির্যাতিত চিকিৎসক; যদি তিনি পুরুষ হতেন, তবে পরিণতির কিছু মাত্রাভেদ হত কি? পাশবিক উপায়ে খুনের সঙ্গে, উপরি পাওনা যে ধর্ষণ; তা এক নারীর অপরায়নের কালানুক্রমিক ইতিহাসের পাতায়, একটি নতুন সংযোজন-ও বটে। সামাজিক-পারিবারিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক উত্থান-পতনের কালচক্রে, অবরোধের আড়াল, যে নারীর জীবনের ‘স্বাভাবিক সত্য’ হিসেবে ঐতিহাসিক মান্যতাপ্রাপ্ত; শিক্ষা তথা সাম্য এবং শুভবোধের আলো, খানিক পাতলা সরের মতো তথাকথিত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরত তার উপর লাগাতে পারলেও, আজও যে মেয়েরা বহুলাংশে ‘সেক্স অবজেক্ট’-এর অতিরিক্ত কিছু নন, এই জাতীয় নৃশংস ঘটনা, সেই দিকে প্রায় সার্থক দিক্নির্দেশ করে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে-যাওয়া হাথরস বা উন্নাও-এর মতো নারী-নির্যাতনের ঘটনাগুলিও, এই সমাজদর্শনের থেকে খুব একটা ব্যতিক্রমী নয়। পরিস্থিতি-বিশেষে বদল হয়েছে, নারীর সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থানের; পরিণতি প্রায়শ-ই এক।
ঠিক এরই পাশে, অন্য আর-একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার উপর-ও সতর্ক অভিনিবেশ প্রয়োজন। ঘটনাটি মালয়ালম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে, বিভিন্ন যৌন হেনস্থার অভিযোগ-সম্বলিত, প্রায়-লোমহর্ষক এক রিপোর্টের আধারে, চর্চার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত। ‘উইমেন ইন সিনেমা কালেক্টিভ’ নামে একটি সংগঠনের পিটিশনের ভিত্তিতে, বিচারপতি কে হেমা-র নেতৃত্বে গঠিত কমিটির রিপোর্ট; জেন্ডার ভায়োলেন্সের অতীব নিন্দনীয় চিত্র তুলে ধরেছে। ২৯০ পাতার এই রিপোর্টের ছত্রে ছত্রে, অমানবিকতার উলঙ্গ রূপ প্রকাশিত। ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত মহিলাদের জন্য,খাদ্য এবং পানীয়ের অভাব থেকে শুরু করে, শৌচাগার বা পোশাক পরিবর্তনের উপযুক্ত ঘর না-থাকা; যথোপযুক্ত পারিশ্রমিকদানে অনীহা তথা বঞ্চনার অভিযোগ থেকে শুরু করে যৌন-শোষণ; কোনওকিছু-ই এই রিপোর্টে বাদ যায়নি :
The 290-page report– parts of which have been redacted to hide identities of survivors and those accused of wrongdoing– says the industry is dominated by “a mafia of powerful men” and that sexual harassment of women is rampant.১
প্রসঙ্গত খেয়াল রাখা দরকার, কেরালা ফিল্ম জগতের এহেন ন্যক্কারজনক উদাহরণগুলি প্রমাণ করে, মেয়েদের সহকর্মী ভাবা তো দূরস্থান; একুশ শতকে পৌঁছেও,তাঁদের পূর্ণ মানুষ ভাবার প্রক্রিয়াটি আপাতত বহু কূট প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন। ‘পাওয়ার নেক্সাস’-এর সুদূরপ্রসারী শিকড় এতদূর প্রোথিত যে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য বা ধ্বস্তাধ্বস্তির দৃশ্যে, মেয়েদের রি-টেকে বারবার বাধ্য করা, ‘সমঝোতা’ এবং ‘মানিয়ে চলা’-র নীতিকে প্রায় অভ্যাসে পরিণত করে ফেলা; এই পুঁজিবাদী বাস্তবতার বিরুদ্ধে,কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন বা পেয়েছেন মেয়েরা, কর্মজীবন তথা আরও সুবৃহৎ ক্ষতির আশঙ্কায়। ফলত, সমবেদনা, বাস্তবচিন্তন এবং প্রসঙ্গনিষ্ঠতার পরিপ্রেক্ষিতে,যে সমস্যাগুলির একেবারে প্রাথমিক স্তরেই পর্যালোচনা প্রয়োজন; সেখানে সূত্রপাতেই মনে রাখতে হয়, যৌনতা এবং লিঙ্গপরিচয়, পারস্পরিক নিবিড়তায় সম্পৃক্ত হলেও,স্পষ্ট পার্থক্যেও ক্রিয়াশীল। যৌনপরিচয় স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুণে প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত। অপরপক্ষে লিঙ্গপরিচিতি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং ব্যক্তির স্ব-ইচ্ছা অনুসারে নির্মিত। পুরুষতন্ত্রের ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিকোণ, নারীর যৌনপরিচিতির নিজস্বতাকে, একদিকে অহং ও অবজ্ঞা, এবং অন্যদিকে পরিবর্তনশীল লিঙ্গভাবনার সাপেক্ষে, একরৈখিক অবদমনপ্রসূত মানসিক চলন দ্বারা বিচার করতে চায়। আর এই উভয়বিধ দ্বান্দ্বিকতার পটভূমিতে অভিমুখ খুঁজে নেয়,মেয়েদের মনস্তাত্ত্বিক আধুনিকতা তথা বৌদ্ধিক অগ্রগমন।
দুই
ফ্যাসিবাদ ও মান্য সংস্কৃতি : সুচেতনার ক্রমিক প্রান্তিকায়ন
নাৎসি জার্মানি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পারস্পরিক বিরোধিতার মধ্য দিয়ে, বিশ্বযুদ্ধ ক্রমশ তার চরিত্র নির্ধারণ করে নিয়েছিল। মানবসভ্যতার নৈতিক মূল্যবোধের সেই সংকটপর্বে, নাৎসি ভাবধারার বিপ্রতীপে, আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী লড়াই-এর সঙ্গে মিশে গেল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণতান্ত্রিক সংগ্রাম। জওহরলাল নেহরু সেই সময়ে লিখছেন :
পদানত ও শ্রমজীবী জনতার বিশাল অভ্যূত্থান,সর্বত্র শোষক শাসক শ্রেণীদের সন্ত্রস্ত করে তুলেছে; তারা একজোট হচ্ছে এবং এই অভ্যত্থানকে দমন করার ষড়যন্ত্র করছে। তার ফলেই জন্মলাভ করছে ফ্যাসিবাদ,এবং সাম্রাজ্যবাদীরা রক্তবন্যায় ডুবিয়ে দিচ্ছে সমস্ত আন্দোলনকে। সর্বত্র সংগ্রাম চলছে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে,পুরাতন ও নতুন সমাজব্যবস্থার মধ্যে। এই সমস্ত সংগ্রামের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান ও সবচেয়ে মৌলিক হচ্ছে একদিকে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ এবং অপরদিকে কমিউনিজমের মধ্যে লড়াই। এ-লড়াই চলছে সারা বিশ্ব জুড়ে।২
১৯৩১ সালে মাঞ্চুরিয়ায় জাপানি ফ্যাসিস্ট আক্রমণ, রাষ্ট্রসংঘের অধিবেশনে সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম লিটভিনভের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাবকে, পশ্চিমি শক্তিগুলির কমিউনিজম-বিরোধিতার নামে প্রকারান্তরে অগ্রাহ্য করার কৌশল; কোনও ইতিবাচক ভবিষ্যতের দিকে পৃথিবীকে নিয়ে যায়নি। ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ ছয় বছরের ফ্যাসিস্ট নৈরাজ্য (১৯৩৯-৪৫) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেহারায়, কেড়ে নেয় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ। বিধ্বংসী আক্রমণ নেমে আসে, বুদাপেস্ট, লেনিনগ্রাদ, বার্লিন, রটারডাম, সিঙ্গাপুর, সাংহাই, লন্ডন সহ অসংখ্য শহরের বুকে। ইউরোপ, এশিয়া জুড়ে সে-এক ঘোর তাণ্ডবকাল, বলিপ্রদত্ত সাধারণ জনজীবন।
তবু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ-ও দেখিয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। উলটো দিকে ১৯৩৩ সালে-ই হিটলার জার্মানিতে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে, স্বৈরতন্ত্রের নিষ্ঠুরতম উদাহরণ কায়েম করা সত্ত্বেও; তার সমর্থকদের মধ্যে মহিলার সংখ্যা-ও নেহাত কম ছিল না। উপাসনা, সন্তানপালন বা গৃহকর্মের মতো পরিধিতে নারীর সুযোগ্যতাকে সীমায়িত করতে চাওয়া থেকে, তীব্র আর্থিক মন্দা, বেকারত্ব-বৃদ্ধির মতো সামাজিক সমস্যার প্রশ্নে, বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মানি বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও; হিটলারের মতাদর্শের প্রবল অনুরাগীদের মধ্যে, মেয়েরাও তাঁদের উপস্থিতির জানান দিয়েছিলেন। অন্যদিকে মুসোলিনির মতো স্বৈরশাসক,বহির্বিশ্বের কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পক্ষে, নীতি প্রবর্তনে পিছপা হননি। যদিও সেই নীতি পরবর্তীকালে যুদ্ধকালীন প্রয়োজনীয়তার কারণে সংশোধন করা হয়। সন্তান প্রজননের যন্ত্র হিসেবে নারীর ঐতিহ্যগত লিঙ্গ-ভূমিকাকে স্বীকৃতি জানিয়ে,সর্বাধিক সন্তান উৎপাদনকারী মায়েদের তিনি স্বর্ণপদক-ও বিতরণ করেন। ঠিক এই চিত্রের পাশেই যদি রাখা যায়,তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন-কে; শ্রমজীবী নারীর উত্থান সেখানে সবিশেষ গুরুত্বে পর্যালোচিত। লেনিন স্পষ্টত মনে করছেন, জনহিতকর কাজে, মিলিশিয়ায়, রাজনৈতিক জীবনে যদি মেয়েদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত না করা যায়,গৃহকর্ম ও শুধুমাত্র রান্নাঘর সামলানোর মতো সংকীর্ণ পরিসর থেকে যদি তাদের বার করে না আনা যায়; তবে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ অসম্ভব। এমনকি, গণতন্ত্র কায়েম করাও সম্ভব নয়,সমাজতন্ত্র তো অনেক দূরের প্রসঙ্গ। ১৯১৭ সাল পরবর্তী, সমাজতন্ত্র-গঠনের সেই সময়পর্বে,সোভিয়েত ইউনিয়নে নারীর বিকাশ,তাই পৃথক পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। বৈবাহিক এবং পারিবারিক অধিকারসমূহ সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি; বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ভণ্ডামি,প্রতারক স্বভাবধর্মের মুখোশ খুলে দেওয়ার সঙ্গেই,জমিজমা এবং কলকারখানায় ব্যক্তিগত মালিকানার বিলোপসাধন করা হয়। ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পারিবারিক অর্থনীতি; বৃহত্তর সামাজিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়ে, মেয়েদের মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ার স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিল। অর্থাৎ অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে, নারীর উপর চেপে বসে-থাকা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ-কে সরিয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত ছিল, দাসত্বশৃঙ্খল মোচনের পূর্বসূত্র। ১৯১৮ সালে, আন্তর্জাতিক নারীদিবসের প্রেক্ষিতে, লেনিন-এর অভিমতটি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য :
আর মেয়েদের দলে টেনে আনা ছাড়া জনগণকে রাজনীতির ভেতরে টেনে আনা অসম্ভব কারণ পুঁজিবাদের আমলে মেয়েদের নিয়ে গঠিত মানবজাতির অর্ধেকাংশকে দুটো পরাধীনতার দুর্ভোগ সইতে হয়। শ্রমিক ও কিষাণ মেয়েদের পুঁজির অত্যাচার সহ্য করতে হয়; কিন্তু তাছাড়া, এমনকি, সবচেয়ে গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া রিপাবলিকগুলোতেও,তাদেরকে প্রথমত,যেহেতু আইন তাদেরকে পুরুষদের সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে সেজন্য হীনতর সামাজিক মর্যাদা ভোগ করতে হয়; দ্বিতীয়ত, আর এইটেই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, তাদেরকে পারিবারিক গোলামির দুর্ভোগও সইতে হয়; তারা হচ্ছে ক্ষুদ্রতম ও হীনতম,সবচেয়ে পরিশ্রমসাপেক্ষ ও সবচেয়ে একঘেয়ে রান্নাঘরের কাজকর্মের ও পরস্পরবিচ্ছিন্ন পারিবারিক অর্থনীতির চাপে নিষ্পেষিত ‘ঘরকন্নার কেনা-দাসী’।৩
অর্থাৎ ফ্যাসিস্ট ক্ষমতাসীনের রাজনীতি বনাম সমাজতন্ত্রের অগ্রগতি : নারীর অবস্থানগত স্থানাঙ্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে, অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হিসেবে নিশ্চিতরূপে বিচার্য হওয়ার যোগ্য। ঠিক এই জায়গা থেকে যদি ভারতীয় পটভূমির দিকে তাকানো যায়, হিন্দুত্বপন্থী শক্তির নীতি এবং প্রভাব; বিশেষভাবে মহিলাদের ক্ষেত্রে, ক্রমবর্ধমান আশঙ্কা এবং উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আধা-সামন্ততান্ত্রিক এবং আধা-পুঁজিকেন্দ্রিক ভারতীয় শাসনব্যবস্থায়, যে নব্য-ফ্যাসিবাদী উত্থান ইদানীং লক্ষ করা যাচ্ছে; তার স্বরূপ চিহ্নিত করতে হলে, আবার-ও ফিরতে হয়, নিয়ত পরিবর্তনশীল সামাজিক কাঠামোয়, নারীশ্রমের শোষণ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের চুলচেরা হিসেবনিকেশে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজ-গড়নে, গৃহকর্মে নিযুক্ত নারীর অবদান মূলত ব্যবহৃত হয়,পারিবারিক ভোগের উপাদান হিসেবে। অর্থাৎ নারীর শ্রম সেক্ষেত্রে,শোষণযন্ত্রে পিষ্ট; অর্থনৈতিক বিধিবদ্ধ সম্পর্কে আবদ্ধ না থাকায়, সামাজিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনিবার্য আবশ্যকতায় সম্পৃক্ত নয়। ফলত নারী এবং নারীশ্রম, উভয়-ই যখন নেহাত ভোগ্যপণ্য হিসেবে নির্ণায়িত, এহেন পরিধিতে নারীর ভূমিকা এবং মর্যাদা-ও কাল্পনিক পিতৃতান্ত্রিক মনস্তত্ত্বের আধারে,ফ্যাসিবাদী প্রকল্পের আওতাধীন হয়ে ওঠে। দেশ এবং রাষ্ট্রের ভেদরেখাকে সেখানে ক্রমশ বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়, উগ্র জাতীয়তাবাদী মোড়কে। ভারতের মতো বর্ণব্যবস্থাপ্রেমী একটি দেশে, ফ্যাসিবাদের কার্যকরী আয়ুধ হয়ে উঠতে দেখি,পিতৃতন্ত্রের প্রতাপ-কে। স্মরণে রাখতে হয়, এই ফ্যাসিজম পুঁজিবাদ এবং সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারার সম্মিলিত ফলাফল শুধু নয়, বাজার অর্থনীতির অভ্যন্তরে, পুরুষতান্ত্রিক উপস্থিতির অনিবার্য ফসল-ও বটে। এই পুরুষতন্ত্র এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিকল্পনা করে, যেখানে অর্থনীতির বর্ণপরিচয় নির্ধারিত হবে,শ্রমের ক্রমিক অবমূল্যায়ন এবং শোষণের ক্রমপর্যায়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত তীব্রতার অনুষঙ্গে। অর্থাৎ দ্বন্দ্বটি এক্ষেত্রে পুঁজির যথেচ্ছাচার এবং সামাজিক শ্রমনীতির মৌলিক বিরোধের মানদণ্ডের নিরিখে ব্যাখ্যাযোগ্য। আবার অন্যদিকে স্বাভাবিকভাবে-ই কল্যাণকামী রাষ্ট্রের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়, ধনতান্ত্রিক শক্তির আগ্রাসননির্ভর এই সাম্রাজ্যবাদী কূটকৌশলের সামনে।
সংবিধান এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের দূরত্ব এবং সম্পর্ক,ফ্যাসিবাদ এবং মানবাধিকারের পরস্পর-বিপ্রতীপতা; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাত্ত্বিক অবস্থানগত বৃত্তের বাইরে, মানুষ-কে ক্রমাগত বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন করেছে। এমন এক ক্রান্তিকালের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে,যেখানে রাষ্ট্র কর্তৃক সুনির্মিত সীমারেখার ভেদপ্রান্তগুলি ক্রমশ বিলুপ্ত। কখনও প্রান্তিক জনজাতির অধিকারের লড়াই-কে খর্ব করে, কখনও উন্নয়নের নামে বাস্তুর অধিকার কেড়ে নিয়ে, কখনও দলিত তথা নিম্নবর্গের রাজনৈতিক স্বর-কে অস্বীকার করে; তৈরি হয়েছে দেশমাতৃকার কাঠামো। অন্যদিকে সুবিধাভোগী শ্রেণি নিমজ্জিত রয়েছে নয়া-উদারনীতিপ্রসূত ফাঁপা প্রতিশ্রুতির আড়ম্বরে। আর সেই সুযোগে ক্রমশ শক্ত হয়েছে বর্ণবাদী, ধর্মকেন্দ্রিক, প্রতিক্রিয়াশীলতার রাজনীতি। বাস্তবিক অর্থে, ফ্যাসিবাদ আজ আর কোনও পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ। আমাদের প্রাত্যহিকতায় যা ঢুকে পড়েছে আইনের ছদ্মবেশে, সংস্কারের চেহারায়, লিঙ্গ-পরিচয়ের ব্যক্তিক সীমানায়।
একটি আধা-ঔপনিবেশিক সিস্টেমের অবক্ষয়িত মূল্যবোধ যখন ‘বিশেষ’ ধর্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ-কে প্রশ্রয় দেয়,তার উপরিতলের আপাত-নিরপেক্ষ পালিশ বজায় রাখতে সাহায্য করে; উদারনৈতিক মুনাফানীতির ঝাঁ-চকচকে অবয়ব। ফলে এই ভাববিশ্বে, বিশেষত মেয়েদের, স্বাভাবিক প্রতিপক্ষ ফ্যাসিস্ট বা আধা-ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ। যে মতাদর্শ কখনও সতীদাহের মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতার অন্দরে অক্সিজেন সঞ্চার করতে পারে। কখনও কাল্পনিক নারীপ্রতিমা-কে ধর্মীয় আদর্শের বাস্তব প্রতীক হিসেবে পুনর্নির্মাণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ মালিক মহম্মদ জায়সী-র কবিমানসজাত পদ্মিনী আখ্যানের উদার ধর্মদর্শন; ভারতীয় সতী নারীর সনাতন দায়িত্বের রাষ্ট্র-নির্দেশিত রূপকল্প হয়ে ওঠে। অথবা এই ফ্যাসিস্ট মনন ‘সাধ্বী’ নারীর সামাজিক অস্তিত্বের ‘তথাকথিত বিচ্যুতির’ মাপকাঠি নির্ধারণ করে, ‘অনার কিলিং’ বা খাপ পঞ্চায়েতের নিদান-কে সামগ্রিক গণভাবনার প্রতিচ্ছবি হিসেবেও উপস্থাপন করতে পারে। বলা বাহুল্য, ধর্ষণের মতো অপরাধ-ও বহু ক্ষেত্রে তখন একটা ন্যায্যতার দাবি আদায় করে নেয়। দাঙ্গার সুযোগে আক্রান্ত হন সংখ্যালঘু নারী। সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধি ধর্ষক বীরের সম্মানে ভূষিত হয়ে ওঠে। উচ্চবর্গের পুরুষ দ্বারা ধর্ষিত নিম্নবর্গের নারী, সামাজিক ন্যায়বিচারের গণ্ডি থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কারণ ফ্যাসিস্ট অন্ধত্ব নারীকে ভোগ্যবস্তুর অতিরিক্ত কিছু ভাবতে রাজি নয়। তাই বিবাহ-সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণ, মেয়েদের যত তিক্ত অভিজ্ঞতার-ই নিদর্শন হোক না কেন, ফ্যাসিবাদী ভাবমূর্তির কাছে তা এক অলীক কল্পনা মাত্র। যেহেতু বিয়ে তাদের কাছে একটি ‘পবিত্র বন্ধন’ ফলত যৌন সম্পর্ক-স্থাপনের ক্ষেত্রে নারীর সম্মতি বা অসম্মতি দুই-ই সমান মূল্যহীন। ঠিক যেভাবে উচ্চবর্ণের পুরুষ কর্তৃক নিম্নবর্ণের নারীকে ধর্ষণ; এক অসম্ভব ব্যাপার। এই ন্যারেটিভ-ও এক আর্থ-সামাজিক নির্মাণ, কারণ সেখানে জাতিবিদ্বেষ ও জাতিগত বিরোধ, উভয়-ই বর্তমান। এভাবেই আমরা দেখি,একটি বৃহত্তর পরাধীনতার খাঁচায়, নারীর মূল্যমান নির্দেশিত হয় উত্তর-সত্যের পৃথিবীর ফ্যাসিবাদী বয়ানের সংকীর্ণতায়।
তিন
পিতৃতন্ত্রের সাতসতেরো : অক্ষরমালায় দ্বেষ-কথা
উল্লেখ করা বাহুল্য,পিতৃতন্ত্রের প্রবক্তা বা সমর্থক হিসেবে,কোনও বিশেষ পুরুষ বা পুরুষ-শাসিত জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা যায় না। প্রাকৃতিক নিয়মে সমাজ মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত : পুরুষ ও নারী। বর্গগত বিভাজন এবং স্বভাবগত পার্থক্য : উভয়ক্ষেত্রেই তারা ভিন্ন। কিন্তু প্রত্যেক সমাজে যেটি সুনির্ণীত হয়, সেটি হল ‘আদর্শ’ নারী এবং পুরুষের ধারণা এবং ধারণাপ্রসূত আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুসংগত গুণাবলি এবং আচরণবিধি। সাধারণত সমাজ পুরুষের মধ্যে; সাহস, দৃঢ়তা, শক্তি, বল, সক্রিয়তার প্রকাশ দেখতে চায়। অপরপক্ষে নারীর পেলব, নম্র, বিনয়ী, বশংবদ রূপ সমাজদৃষ্টি-কে শোষকের ‘সুখ’ দিয়ে এসেছে। জৈবিক যে প্রভেদ নারী-পুরুষের জন্মগত অর্জন,তা পরবর্তীকালে পরিণত হয়, লিঙ্গভিত্তিক সমাজ-নির্দিষ্ট ভিন্নতায়। সমাজ সেখানে মূল্যবোধ আরোপ করে, আদতে লিঙ্গবৈষম্যের জন্ম দেয় এবং এই লিঙ্গগত অসাম্যের-ও মূল শিকার হয় প্রধানত মেয়েরা-ই। অর্থাৎ যে গুণগুলি সমাজের চোখে পুরুষোচিত এবং শ্রেয়,সেগুলিকে প্রাধান্যদানের মধ্য দিয়ে; তথাকথিত অ-পুরুষোচিত বৈশিষ্ট্যগুলিকে হীন বা নিন্মস্তরীয় প্রতিপন্ন করার এ-এক চিরাচরিত কৃৎকৌশল। ফলে স্বাভাবিক মানববৈশিষ্ট্য, যখন একান্তভাবে পুরুষের আয়ত্তাধীন হিসেবে অভিষিক্ত হয়,তখন সেই অধিকার-ই, ক্ষমতা অর্জন এবং ক্ষমতাভোগের কেন্দ্রে অবস্থান করে। অন্যদিকে নারীর উপর চাপিয়ে-দেওয়া চরিত্রধর্ম (যা আবার পুরুষের মধ্যে থাকলে, সেই পুরুষ ‘মেয়েলি’ হিসেবে গণ্য হবেন এবং উলটোটা-ও সমানভাবে সত্য; যখন কোনও মেয়েকে ‘পুরুষালি’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়) তাঁকে ক্রমশ প্রান্তিক থেকে আরও প্রান্তিক করে তোলে। মেয়েরা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক, বিশ্ব-ঐতিহাসিক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে; ‘Marginalised in the marginalised’ হয়ে ওঠেন। অমোঘ উচ্চারণের তাৎপর্যে, সিমোন-দ্য-বোভোয়া যেন আরও প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করে নেন : কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, নারী হয়ে ওঠে (‘The Second Sex’, 1949)।
বিভাজনগত এই প্রেক্ষাপটে, তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একটি জরুরি বিতর্ক। সমাজসৃষ্ট লিঙ্গভূমিকা-ই কি তবে সাধারণ মানবধর্মের এক এবং অনিবার্য বৈশিষ্ট্য? বৌদ্ধিক নিরপেক্ষতাকে যদি একমাত্র গুণমান হিসেবে গ্রহণ করি,তবে স্বীকার করতে হয়; যৌক্তিক পারম্পর্য কোনও লিঙ্গগত নির্মিতির বশীভূত নয়, বরং তা অবশ্যম্ভাবীরূপে লিঙ্গ-অনপেক্ষ। গ্লোরিয়া স্টাইনেম ‘সম্পদের পুরুষায়ন’ কীভাবে ঘটে,বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে; সম্পদের ভোগদখল এবং বন্টন,বহুলাংশে কঠোরভাবে পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত। শুধু তাই নয়, ধনী হোক বা নির্ধন, নারীরা কিন্তু একইরকম শোষণের শিকার বা ‘equally unequal’ যদিও বৈষম্যের মনস্তাত্ত্বিক ফারাকটি হয়তো সামাজিক উচ্চাবচতা ভেদে কিছুটা ভিন্ন। কিন্তু লিঙ্গচিহ্নিত অসাম্যের প্রশ্নে, ক্ষমতার বর্গীকরণে, উচ্চ বা নিম্ন কাঠামো নিরপেক্ষভাবে; পুরুষের আগ্রাসন এবং নারীর অবদমন, নিঃসংশয়াতীত সত্য। গ্লোরিয়া দেখাবেন, সামাজিক অবস্থানগত শ্রেণিভেদে, সব মহিলা-ই পরিবার তথা গৃহকর্তার কাছে সস্তা শ্রমিকের অতিরিক্ত কিছু নন। বস্তুতপক্ষে সমাজের অভ্যন্তরে মহিলাদের দায়বদ্ধতার বিচার-বিশ্লেষণ, যে ছবি তুলে আনে; তার মৌলিক ধর্ম,ক্ষেত্রবিশেষে কিছু অনিবার্য পার্থক্যসহ মূলগত স্তরে প্রায় এক। গ্লোরিয়া স্টাইনেম-এর পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে রুচিরা গুপ্তা তাই লেখেন :
…women from the upper classes are home-managers, child-bearers, and public relations and secretarial executives for their husbands, while women from the poorer classes are homemakers, child-bearers, cooks, cleaners and additional bread-winners.৪
এই পর্যালোচনার দ্বারা আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-ও প্রমাণিত হয়। লিঙ্গ-নিরপেক্ষ সামাজিক সাম্য আদায়ের লক্ষ্যে, নারীকে পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি লড়াই এবং আচরণভিত্তিক পরিবর্তনশীলতার মধ্য দিয়ে পথ বানাতে হয়। কারণ পুরুষের ক্ষেত্রে যা ন্যাচারাল কোয়ালিটি হিসেবে মান্যতাপ্রাপ্ত এবং প্রভুত্ব প্রতিস্থাপনের সহায়ক, নারীকে সেই মান্যতার ছাঁচ চূর্ণ করতে হলে; প্রতি পদক্ষেপে বিশ্লেষণাত্মক চিন্তনকৌশল আয়ত্ত করা ছাড়া উপায় নেই। তবে এই প্রচেষ্টার একটি নেতিবাচক দিক-ও আছে। যার মাধ্যমে নারী ক্রমাগত পুরুষের বিধিবদ্ধ লিঙ্গবৈশিষ্ট্য অর্জনের পথেও হাঁটতে শুরু করে। সে-ও হয়ে ওঠে, মজ্জাগত সংস্কৃতির আর একপ্রকার বাহক। অধিকারপ্রাপ্তির সংগ্রামে, সূক্ষ্ম সীমাবদ্ধতার এই দিকগুলি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া, মেয়েদের পক্ষে সম্ভবপর-ও থাকে না। অন্যদিকে পুরুষকে-ও প্রায় অনেকাংশে কৃত্রিম উপায়ে,নারীর সঙ্গে তার লিঙ্গপার্থক্য প্রমাণ এবং প্রদর্শনে, সতত ক্রিয়াশীল দেখা যায়।
সংকটের অভিমুখ অনুধাবনের পাশাপাশি, খেয়াল রাখা প্রয়োজন, নারী এবং পুরুষের মধ্যে বিভেদ, শুধুমাত্র চারিত্রিক বোধের ভিন্নতায় উপস্থাপিত তাই নয়; তাকে দার্শনিক প্রতীতিতে সংজ্ঞায়নের প্রবণতাকে-ও বাধ্যতামূলক আলোচনার মধ্যে নিয়ে আসা আবশ্যক। তথাকথিত ‘আবেগসম্পন্ন’ নারীর মূল্যায়নের রেখাচিত্রে প্রধানত গুরুত্ব পায়; দেহধর্ম-নিবিষ্টতা, প্রকৃতি-সংশ্লিষ্টতা, বৈষয়িকতা বা অন্দরের শোভা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা। অন্যপক্ষে পুরুষ মোটা দাগের শারীরিকতার স্তর উত্তীর্ণ, মননশীল, বৌদ্ধিক চেতনাসম্পন্ন,সভ্যতা ও সংস্কৃতি গঠনের কাজে সক্রিয় অংশীদারিত্বের যোগ্যতামান সমৃদ্ধ। ফলত নারীর উপর তার কর্তৃত্ব বা ক্ষমতাপ্রয়োগ, এক জাতীয় পিতৃতান্ত্রিক যুক্তিগ্রাহ্যতা থেকে উৎপন্ন। যেহেতু মেরুকরণ প্রমাণ করে, মেয়েরা ইতিহাসের পরিকাঠামো মেনে অবনমিত থাকতে-ই বাধ্য। অর্থাৎ বৈষম্যের পুরুষতান্ত্রিক শৃঙ্খলে, নারীর প্রথম পরাভব ঘটে, তাত্ত্বিক চিন্তনে। দ্বিতীয়বার ঘটে, প্রায়োগিক পরিকল্পনায়। এই প্রসঙ্গে ‘Androcentrism’-এর ধারণা আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে বলে মনে হয়। কারণ এর মাধ্যমে, বৈষম্যভাবনার প্রকট রূপের চিহ্নায়ন, অন্যতর দিক্নির্দেশনা পেতে পারে। ‘andro’ যা অর্থগত বোধে ‘পুরুষ’-এর প্রতীক, ‘centrism’-এর আড়ালে, শুধুমাত্র দমননীতি নির্ধারণ করে তাই নয়। সামাজিক-সাংস্কৃতিক-বৌদ্ধিক-যৌক্তিক-দৃষ্টিভঙ্গিগত-অভিজ্ঞতাপ্রসূত মূল্যবোধ; প্রভৃতির কেন্দ্রে ‘আদর্শায়িত’ পুরুষকে মুখ্য এবং নারীকে ‘অপরতা’র স্থান দেয়। এর ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটে, প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলনের সূত্রে, পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা-কাঠামোর গঠন-পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে। যেমন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত মেয়েরা যখন উচ্চশিক্ষার স্মারক, ডিগ্রির কাগজ হাতে নিয়ে, সংসার সামলানোর কাজে নিয়োজিত হন, তাঁদের যত-ই ‘ডোমেস্টিক ইঞ্জিনিয়ার’ ইত্যাদি গালভরা শব্দে সম্বোধন করা হোক না কেন; বাস্তববুদ্ধি বলে, তাঁরা তাঁদের স্ব-ক্ষেত্র থেকে অর্জিত বিশেষ জ্ঞান প্রয়োগের পরিসরটুকু আদৌ পান না। বরং দীর্ঘ অনভ্যাসে, অব্যবহৃত বিদ্যার বেশিরভাগ অংশ ধীরে ধীরে বিস্মৃত হন। শিক্ষার, চর্চার এই বিস্মরণ, আদতে মানসিক সাক্ষরতার বোধশূন্য, এমন এক যাপনের দিকে যাত্রা; যা আধুনিক সমাজবৃত্তে, মেয়েদের, ঐতিহ্যানুসারী লিঙ্গ-মতাদর্শের নিরিখে মূল্যায়িত হতে বাধ্য করে। Androcentrism-এর ভাবনাকে আর-ও প্রসারিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
যে হিন্দু ফ্যাসিবাদী শক্তির বাড়বাড়ন্ত নিয়ে, আমরা আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছি, সেটিও পৃথিবীজোড়া ফান্ডামেন্টালিজম এবং পিতৃতন্ত্রের অশুভ আঁতাতের যোগফল বিশেষ। লিঙ্গ-ভাবনার আদর্শগত স্তরে, এই শক্তি-ও মুলত রক্ষণশীল। নারীর গৃহকেন্দ্রিকতার সুনিশ্চিতকরণ থেকে শুরু করে, তাঁর যৌন-অধিকার এবং ইচ্ছার উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম : আধিপত্যমূলক নৈতিক আগ্রাসন এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সতত বর্তমান। তথাকথিত হিন্দু রাষ্ট্রের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোধৃত ব্যবস্থাপনায়, তবে নারীর ভূমিকাটি ঠিক কী? বলা হবে, মেয়েদের কিছু ধর্ম পুরুষের মধ্যে থাকতে পারে। আবার পুরুষের কিছু বৈশিষ্ট্য-ও মেয়েদের মধ্যে থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু হিন্দু-জাগরণ প্রক্রিয়ায়, নারীর অস্তিত্বের প্রধানতম সার্থকতা মাতৃত্বে।৫ ঐতিহ্যের সঙ্গে ‘সংগতি’ রেখে, সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের দাবি, পর্যালোচিত হওয়া-ই বাঞ্ছনীয় এবং সেটিও নিরূপিত হবে শাস্ত্রমতে। বস্তুত, চিন্তনের বহুমুখী অনিবার্যতাকে, এমন একটি পূর্বপরিকল্পিত ছাঁচের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করার একমাত্রিক প্রচেষ্টা আমরা লক্ষ করি; যেখানে বৈষম্যসৃষ্টি থেকে শুরু করে, বিরুদ্ধ মত এবং মতবৈচিত্র্য-কে অত্যন্ত কৌশলী উপায়ে,প্রথমত অবজ্ঞা এবং শেষপর্যন্ত অস্বীকৃতির একটি কর্মসূচি পুরুষতন্ত্র আগাগোড়া চালিয়ে নিয়ে যায়। এই প্রসঙ্গে রাজনীতিবিদ রাহুল গান্ধি-র অভিমত, আলাদা অভিনিবেশ দাবি করে। ২০২৩ সালে কোচিতে মহিলা কংগ্রেস আয়োজিত কনভেনশন উপলক্ষ্যে নিজের বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে রাহুল জানান :
I have heard right-wing leaders saying that girls would not have been raped if they had dressed properly. This is an insult to every single woman in the country. It is turning the victim into the villain.৬
রাহুল-এর বক্তব্য, আমাদের সেই বিশেষ যুক্তিতত্ত্বের অবয়ব-কে, আবার-ও চিনতে সাহায্য করে, যা যাপনধর্মিতার, জীবনচর্যার একটি বিধিসম্মত সংস্করণ; সুবিন্যস্তরূপে সমাজের মধ্যে চারিয়ে দেওয়ার রাজনীতি করে যায়। এর ফলে চেতনাপ্রবাহের জঙ্গমতা ক্রমশ পথভ্রষ্ট হয়, ‘অপর বর্গ’ হিসেবে স্বীকৃত নারীসত্তা ক্রমশ নিকৃষ্ট জীবে পরিণত হওয়ার দিকে অগ্রসর হন। পরিব্যাপ্ত মননসমৃদ্ধ আধুনিকতা, যে ধরনের প্রাপ্তমনস্কতার চাহিদাসম্পন্ন, ফ্যাসিস্ট-মনোধর্মী পিতৃতন্ত্রের মানচিত্রে; তার জায়গা পাওয়ার কথা নয়। তন্ত্র সেই আলোকিত স্বাধীন আকাঙ্ক্ষা-র কণ্ঠরোধের পন্থা খুঁজে নেয়, তাকে নেপথ্যচারী করে দেওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টায় সর্বদা নিয়োজিত থাকে। তাই বিশ্বমঞ্চে দেশের উজ্জ্বলতম প্রতিনিধি নারী-ও যখন, লিঙ্গ-বঞ্চনার সুবিচারের দাবিতে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়,নিয়মতান্ত্রিকতার কাছে সে-ও তখন ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ স্বর বা গণশত্রুর পর্যায়ভুক্ত। পুরুষ-প্রভাবিত সেই বলয়ে, সামাজিক ন্যায়ধারণা-কে, ক্রমাগত ধর্ষণকারী তন্ত্র হয়ে ওঠে বীরভোগ্য, নারী মনুসংহিতা-কথিত :
অস্বতন্ত্রাঃ স্ত্রিয়ঃ কার্য্যাঃ পুরুষৈঃ স্বৈর্দ্দিবানিশম। বিষয়েষু চ সজ্জন্ত্যঃ সংস্থাপ্যা আত্মনো বশে।।৭
দমনপ্রিয়ের কাছে এই ভাবনা একেবারে যথোপযুক্ত : স্ত্রীলোকদের (স্বামী প্রভৃতি) ব্যক্তিবর্গ দিনরাত পরাধীন রাখবেন। (অনিষিদ্ধ) রূপ, বিষয়াসক্ত স্ত্রীদের-ও নিজের বশে রাখতে হবে।
চার
নারীমুক্তির পথ : অতন্দ্র নৈতিক কথোপকথন
এই আলোচনায় আমরা নানাভাবে দেখেছি, পুরুষতন্ত্র, ঐতিহাসিক অনুপুঙ্খতায়, লিঙ্গ-বিশিষ্টতা সৃষ্টির মাধ্যমে, প্রকারান্তরে চেতনার ভুবনে বিভেদ তৈরি করে। নারীকে পালয়িত্রী, মাতৃকা প্রভৃতি প্রায় এক প্রত্নপ্রতিমায় আবদ্ধ রাখাও এহেন প্রকল্পের একটি কৌশলগত দিকচিহ্ন। যার দ্বারা সভ্যতার অগ্রগমনে, নারীর প্রতিক্রিয়া এবং অংশগ্রহণ; অবশ্যম্ভাবীরূপে নির্দিষ্ট সীমান্তচিহ্নিত করে ফেলা সম্ভব হয়। মেয়েদের উড়ান-কে এক ইতিবাচক গতিমুখ প্রদানের সর্বোচ্চ শর্ত, নিঃসন্দেহে ভাবনার অবরোধমুক্তি। অবশ্য-ই এর মূল সূত্রটি লুকিয়ে আছে, গতানুগতিক বা প্রচলিত চিন্তাধারার অন্দরে, সদর্থক অন্তর্ঘাতের মধ্যে। ফ্যাসিবাদ-কে যদি একটি ‘state of mind’ হিসেবে ভাবা যায়, তবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্তরে এর মোকাবিলা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে প্রয়োজন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সামাজিক-সংযুক্তিকরণ এবং সেখান থেকে আহৃত রসদের সুচিন্তিত প্রয়োগ। পিতৃতান্ত্রিক শক্তি নিজস্ব প্রভাব বিস্তারের কাজে নারীকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যেমন মনে পড়তে পারে, ১৯১৩ সালের জুলাই মাসের, রবোচায়া প্রাভদা-র ভাষ্য অনুযায়ী; শ্বেতাঙ্গ দাসব্যবসার নিরোধকল্পে, লন্ডনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম আন্তর্জাতিক কংগ্রেস উপলক্ষ্যে লেনিন জানিয়েছিলেন :
One lady from Canada waxed enthusiastic over the police and the supervision of ‘fallen’ women by policewomen, but as far as raising wages was concerned, she said that women workers did not deserve better pay.৮
অবমূল্যায়িত নারীর ক্ষমতায়ন অথবা সার্বিকভাবে সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে, সোচ্চার হচ্ছেন যে মেয়েরা, তাঁদের অনেকের মধ্যে-ও প্রচ্ছন্ন থাকে বা থাকতে পারে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণের কিছু মৌল সূত্র। পরিবারের পরিসীমায়, বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলার দ্বারা কনিষ্ঠ নারীর শোষণ দুর্লভ চিত্র নয়। আবার মূলত পুরুষকেন্দ্রিক কোনও পেশায়, যখন যোগ্যতামানে উত্তীর্ণ মহিলার প্রবেশ ঘটে; পেশার মূল চাহিদার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে নিতে, তিনি-ও ক্রমপর্যায়ে হয়ে ওঠেন, সেই পিতৃতন্ত্রের-ই অন্যতম চালিকাশক্তি। যদিও ব্যতিক্রম সর্বত্র-ই থাকে, তবুও এই প্রথানুগত্য, আদতে দীর্ঘ-অনুশীলিত নিয়ম-কে জয়যুক্ত করে। নারী নিজের মজ্জায় পিতৃতান্ত্রিকতা-কে শুধু গ্রহণ করে তাই নয়, তাকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে ভাবতে এবং ন্যায্যতাদান করতেও শিখে যায়। তাই হয়তো বিবাহ বা প্রেমসম্পর্কে মেয়েদের মারধোর করার অন্যায্যতা; শুধু ছেলে নয়,সামাজিক স্তরভেদে মেয়েদের একাংশকে-ও আন্দোলিত করে না। তারা একে একত্র যাপনের ‘সামান্য শর্ত’ হিসেবে গণ্য করে নেয়। সম্ভবত এই কারণে অনুভব সিনহা নির্দেশিত, ‘থাপ্পড়’-এর মতো চলচ্চিত্র, মূলধারার ন্যারেটিভ অবলম্বন করেও, সামাজিক বার্তার তাৎপর্যে, শ্রদ্ধা আদায় করে নিতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ ক্ষমতায়ন, মেয়েদের সামাজিক অংশীদারিত্ব এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কিছুটা সুনিশ্চিত করলেও; ক্ষমতার ধূর্ত, চতুর চেহারা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকার অঙ্গীকার থেকেও বিচ্যুত হওয়া চলে না। এরই পাশাপাশি বর্তমান বিশ্ব-পরিস্থিতির সাপেক্ষে, ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলির দাপট-ও মেয়েদের সজাগ পর্যবেক্ষণের বিশিষ্ট দাবিদার। বাহ্যিক পর্যায়ে, নারীর বহির্ভুবন-কে উন্মুক্ত রাখার কথা বললেও, ফ্যাসিস্ট-রাজ মেয়েদের বহুমাত্রিক অনুভব এবং আত্মবোধের পৃথিবীকে ক্রমিক অস্বীকৃতির আঙিনায় এনে দাঁড় করায়। জন্মদাত্রীর পবিত্র তকমা-সমন্বিত, পরাধীনতার সোনার শেকলবন্দিত্ব থেকে, ‘ভালো মেয়ে’-র আধুনিকতম অনাধুনিক সংজ্ঞাচয়নের মধ্য দিয়ে; নৈতিক চালচলনের অযৌক্তিক প্রক্রিয়ার ভার, মেয়েদের উপর চাপিয়ে রাখতে কখনও ভোলে না। এই প্রচেষ্টা নতুন নয়, কিন্তু এর কার্যপদ্ধতি সময়বিশেষে বহুরূপী। ক্ষমতা-কে অনিবার্যভাবে কায়েমি স্বার্থে পরিণত করতে হলে, চিন্তাশীলতার নির্বীজকরণ সর্বাগ্রে প্রয়োজন। মেয়েদের সংগ্রাম তাই শুধুমাত্র ক্ষমতায়নের জন্য নয়, ক্ষমতার কূট স্বরূপটি চিনে, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মধ্যেও নিহিত।
তথ্যসূত্র:
১) Geeta Pandey & Meryl Sebastian, ‘Rampant harassment and no toilets : Report exposes Kerala film industry’, BBC News, August 2024
https://www.bbc.co.uk/news/articles/cgq24z8z8170.amp
২) পরিচয় পত্রিকা, ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী সংখ্যা’, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সান্যাল (সম্পা.) ফ্যাকসিমিলি সংস্করণ, অগস্ট ২০২১,পৃ.২১১
৩) হ্যারি পোলিট সংকলিত, ‘নারী ও কমিউনিজম : মার্কস থেকে মাও’, কলকাতা, র্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন, ২০০৮, পৃ.৪২
৪) Ruchira Gupta (ed.) ‘The Essential Gloria Steinem Reader: As If Women Matter’, New Delhi, Rupa Publications, 2014, p.14
৫) Neha Dabhade, ‘RSS and women empowerment : A Masquerade, Secular Perspective’, October 2019
https://csss-isla.com/secular-perspective/rss-and-women-empowerment-a-masquerade/
updated: December 2023
৭) সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত, ‘মনুসংহিতা’, কলকাতা, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৯ সংস্করণ, পৃ.২৪৮
৮) V. I. Lenin, ‘Fifth International Congress Against Prostitution’
https://www.marxists.org/archive/lenin/works/1913/jul/26.htm