মানবেন্দ্রনাথ রায় : ফ্যাসিবাদের স্বরূপ উন্মোচন

সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় 

অবিভক্ত বঙ্গদেশে সোমেন চন্দ (১৯২০, ২৪ মে – ১৯৪২, ৮ মার্চ) হলেন ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রামের প্রথম শহিদ। তাঁকে নিয়ে গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মানুষদের আবেগ অত্যন্ত যুক্তিসংগত। তাঁকে নিয়ে বাংলাভাষায় বেশকিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। সেই সময়ের ৪৬ নম্বর ধর্মতলা স্ট্রিটকে কেন্দ্র করে ফ্যাসিবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে উজ্জ্বল বলয় রচিত হয়েছিল, তার সঙ্গে তাঁর হত্যাকাণ্ডের মর্মান্তিক ঘটনাটি অন্বিত হয়ে স্বাভাবিকভাবেই যে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল তার প্রভাব সোমেনের জন্মশতবর্ষেও দেখা গিয়েছিল বিভিন্ন পত্রিকার পৃষ্ঠায় ও গ্রন্থপ্রকাশের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক পর্বের কয়েক বছর আগে মানবেন্দ্রনাথ রায় ফ্যাসিবাদ বিষয়ে যে বইটি লিখেছিলেন তা কিন্তু তেমনভাবে আলোচনার মধ্যে আসে না। এম এন রায় ১৯১৬-থেকে ১৯১৯ পর্যন্ত আমেরিকা ও মেক্সিকোতে ছিলেন। ১৯৩০-এর ডিসেম্বরে ভারতে ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি ইউরোপে ছিলেন। এই বিখ্যাত বঙ্গসন্তান জার্মানিতে ও ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান-প্রক্রিয়ার সাক্ষী ছিলেন। তিনি মার্কসবাদী অবস্থান থেকে ফ্যাসিবাদের উত্থানের প্রক্রিয়াকে নিজের মতো করে বিবৃত ও ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই লেখায় এম এন রায়ের ইংরেজি ভাষায় লেখা ‘ফ্যাসিজম’ বইটির সূত্রে তার ফ্যাসিবাদ-ভাবনাকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত ভি বি কার্ণিক-এর লেখা ‘এম এন রায়’ জীবনী-গ্রন্থটি (১৯৮৭) থেকে জানা যায়, ভারতে ফিরে আসার পরে কয়েকমাস আত্মগোপন করে থাকার পরে ১৯৩১-এর ২১ জুলাই রায় বোম্বাইতে গ্রেফতার হন। ৫ বছর ৪ মাস বন্দি থাকার পরে ১৯৩৬-এর ২০ নভেম্বর তিনি মুক্তি পান। কারাবন্দি থাকার সময়েই তিনি ইংরেজিতে ‘ফ্যাসিজম’ বইটি লেখেন। তখনও পর্যন্ত এম এন রায় মার্কসবাদে আস্থাশীল ছিলেন। পরে তিনি র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিজমের রাস্তায় হাঁটেন। উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায় বইটি ১৯৩৮ সালে কলকাতার ডি এম লাইব্রেরি (৪২ কর্নওয়ালিস স্ট্রিট) থেকে ছাপা হয়েছিল। অর্থাৎ মানবেন্দ্রনাথ কারাবন্দি থাকার সময়ে বইটি লেখেন ও তাঁর কারামুক্তির পরে বইটি ছাপা হয়। বইটির পিডিএফ নেটে পাওয়া যায়। (https://www.marxists.org/archive/roy/1938/roy-fascism.pdf)        

রায় তীব্র স্তালিন-বিরোধী মনসিকতা পোষণ করতেন। কিন্তু তার ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতার সঙ্গে তার স্তালিন-বিরোধী মনসিকতাকে যুক্ত করার কোনো যুক্তি নেই। পরবর্তী আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাব, তিনি ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন মাত্রাকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে চেয়েছেন। আমাদের কাছে তার ফ্যাসিবাদ-উত্থান-প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা ও তার বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩০-এর দশকেই তিনি তাঁর মতো করে ফ্যাসিবাদকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের মার্কসবাদী বিশ্লেষণ এখনও প্রাসঙ্গিক। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গবেষক বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিবাদকে আরও নতুন নতুন দিক থেকে বিশ্লেষণের কাজ করেছেন। কিন্তু তার জন্য ১৯৩০-এর দশকেই এই বইটিতে তিনি যে অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণ রেখে গেছেন তার গুরুত্ব কমে যায়নি বা বাতিল হয়ে যায়নি। 

আমরা আগেই দেখেছি, ১৯৩০-এর দশকে কারাবন্দি থাকার সময়ে (১৯৩১-এর ২১ জুলাই থেকে ১৯৩৬-এর ২০ নভেম্বর) মানবেন্দ্রনাথ রায় ইংরেজি বই ‘Fascism’ লেখেন। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। মানবেন্দ্রনাথ রায় ফ্যাসিবাদের দর্শন বিষয়ক আলোচনায় প্রথমেই সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, অনেকের ধারণা আছে যে, ফ্যাসিবাদের কোনো দর্শন নেই– এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। এই ধারণা মেনে নিলে ফ্যাসিবাদের বিপদকে যথাযথভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ফ্যাসিবাদ সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই তার দর্শনগত ভিত্তি নির্মিত হয়ে উঠেছিল। আধুনিক বৈজ্ঞানিক দর্শনগুলি অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বৈপ্লবিক সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনগুলিকে মতাদর্শগত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিল। পক্ষান্তরে যে দর্শনগুলি ফ্যাসিবাদের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল তারা স্বাভাবিকভাবেই আধুনিক বৈজ্ঞানিক দর্শনগুলির বিপরীতমেরুতে দাঁড়িয়েছিল। মানবেন্দ্রনাথ বলেছিলেন: ফ্যাসিবাদের দর্শন হল পোস্ট-হেগেলিয়ান ভাববাদের যুক্তিসম্মত পরিণতি। যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আলট্রা-মডার্ন পজিটিভইজম, নিউ-রিয়ালিজম ও এমপেরিসিজম-এর বিভিন্ন সিউডো-সায়েন্টিফিক স্কুল। এই ধারণাগুলি ভাববাদকে প্রত্যাখ্যান করার ভান করে নতুন ধরনের মেটাফিজিক্যাল মিস্টিসিজমকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছিল। এই স্কুলগুলি ভাববাদ বিরোধিতার ছদ্মবেশে প্র্যাগম্যাটিজম ও নিয়ো-হেগেলবাদকে ক্লাইমেক্সে পৌঁছে দিয়েছিল। 

নৈতিকতা, বিচার ও স্বাধীনতা সম্পর্কে সব ধরনের মানকে অস্বীকার করে ফ্যাসিবাদ ঐশ্বরিক অনুমোদনের দাবি তুলত। ইতালীয় ফ্যাসিবাদের সরকারি দার্শনিক জিওভান্নি জেন্টাইল তার ‘ফ্যাসিজম অ্যান্ড কালচার’ বইতে বলেছিলেন: মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ধর্মবিশ্বাসী। তাই চিন্তা করা মানেই ঈশ্বরের ধ্যান করা। যিনি যত বেশি চিন্তা করবেন তিনি ততই ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অনুভব করবেন। মানুষ নয়, ঈশ্বরই সবকিছু। মানুষ কিছুই নয়। মানবেন্দ্রনাথ মন্তব্য করছেন: রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াশীলতা ও সামাজিক বর্বরতাকে যুক্তিসম্মত করে তোলার উদ্দেশ্যে ফ্যাসিবাদের দার্শনিকটি আধুনিক ইয়োরোপীয় দর্শনের মৌলিক নীতি মানবতাবাদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে ছিলেন। 

স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের আগে মানুষকে ঐশ্বরিক অভিভাবকত্বের ধারণা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। ফ্যাসিবাদের দর্শন অতি-ধর্মীয়তার ভিত্তিতে মানুষকে আত্মবিলোপের যে শিক্ষা দেয় তা আসলে ভালগার মেটিরিয়ালিজম-এর বহিঃপ্রকাশ। যা আসলে দার্শনিক বস্তুবাদের বৈপ্লবিক তত্ত্বসমূহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে জাগিয়ে রাখে। ফ্যাসিস্ট ফেথ বা বিশ্বাস মানুষকে দেবত্বের সঙ্গে জড়িয়ে রাখে ও তাদের সর্বশক্তিমানের নিয়ন্ত্রণাধীন যন্ত্রে পরিণত করতে চায়। যার পরিণতিতে মানুষের ইচ্ছা ও সক্রিয়তা বিশ্বের সমস্ত নীতি থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। তাহলেই সব ধরনের বর্বরতা ও হিংসা ন্যায়সংগত হয়ে উঠবে। কারণ তা এমন এক ঐশ্বরিক উদ্দেশ্যকে অনুসরণ করছে, যা ব্রহ্মাণ্ডে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। এইসব কর্মকাণ্ড ঈশ্বর দ্বারা অনুপ্রাণিত। ঈশ্বর অবক্ষয়িত ও অসুস্থ ধনতন্ত্রকে সুরক্ষা দিচ্ছেন। প্রতিটি ধর্মান্ধ সমর্থক ভালগার মেটিরিয়ালিজম-এর জীর্ণ ব্যবস্থা দ্বারা অনুপ্রাণিত হচ্ছে ও ঐশ্বরিক প্রক্রিয়ার যন্ত্রাংশে পরিণত হচ্ছে। আত্মবিস্মৃতির এক সুচতুর কৌশলের মাধ্যমে সে নিজেকে অন্তহীন স্বাধীনতার অধিকারী ভাবতে শুরু করে। এইভাবে প্রত্যেক ফ্যাসিস্টই সুপারম্যান হয়ে ওঠে। নিজেকে অস্বীকারের এই সুপার-রিলিজিয়াস তত্ত্ব ফ্যাসিবাদের একলেটিক দার্শনিকদের মানুষের অশেষ ও অমরত্বের এসেন্স আবিষ্কারের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মানবেন্দ্রনাথ জেন্টাইল-এর লেখার উল্লেখ করে বলছেন: ফ্যাসিস্টদের আত্ম-বিলোপের তত্ত্ব ও সর্বশক্তিমানের প্রতি বিশ্বাসের মধ্যে নাকি দ্বন্দ্ব রয়েছে এমন বোকাবোকা ভাবনার ‘দার্শনিক’ ব্যাখ্যা দেওয়া জেন্টাইল-এর পক্ষে কঠিন হয়নি। 

জেন্টাইল তার ‘ফ্যাসিজম ও কালচার’ বইতে বলেছিলেন: ঈশ্বর ও চিন্তা জীবনের দুটি বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে। দুটি উপাদানই প্রয়োজনীয় ও আবশ্যক, কিন্তু পরস্পরের বিরোধী, তাদের সম্পর্ক দ্বন্দ্বময়। আত্ম-উপলব্ধির শাশ্বত প্রক্রিয়ার মধ্যে মানুষ ও ঈশ্বর নমনীয় ঐক্যের মধ্যে অবস্থান করছেন। এই ঐক্য অস্থির ও সবসময়েই অতৃপ্ত। মানবেন্দ্রনাথ এই চিন্তাকে হেগেলীয় ডায়েলেকটিক্স ক্যারিকেচার বলেছিলেন ও হিন্দু মিস্টিসিজম-এর কাছাকাছি বলে মনে করেছিলেন। মিস্টিসিজম মানসিক বিভ্রান্তির জন্ম দেয় ও অবসকিউর‍্যানটিজম বা দুর্জ্ঞেয়বাদের আড়ালে আশ্রয় খোঁজে। যা পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্যেকে ও যুক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক ধারণাসমূহকে প্রত্যাখ্যান করে। জেন্টাইল যেভাবে ফ্যাসিস্ট দর্শনকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, মানবেন্দ্রনাথ তাকে মিস্টিসিজমের ধ্রুপদী নমুনা বলে মন্তব্য করেছিলেন। মানুষের চিন্তা হচ্ছে ঈশ্বরের মনন বা কনটেমপ্লেশন। যদিও চিন্তার বিষয়ের সঙ্গে চিন্তার সম্পর্ক একেবারে বিপরীতধর্মী। কোনো বস্তু সম্পর্কে চিন্তা করার মধ্যে দিয়ে আমরা সেই বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করি। মনন বা কনটেমপ্লেশন এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে দেয় না। যা জানা আছে তার মধ্যেই চিন্তাকে আটকে রাখতে চায়। কেউ যদি ধর্মীয় প্রাক্-অনুমান থেকে শুরু করে তাহলে সে ঐশ্বরিক গুণাবলিকে ধ্যান করতে থাকে। এইভাবে ঈশ্বরের মনন বা কনটেমপ্লেশনের সঙ্গে চিন্তাকে অবিচ্ছিন্ন করে তুলে এক ধরনের কনফিউশন বানিয়ে তোলা হয়, অথবা এপিস্টেমোলজি বা জ্ঞানতত্ত্ব-এর মূল নীতিগুলিকে সচেতনভাবে বিকৃত করা হয়।

বুর্জোয়া শ্রেণির ক্ষমতা যতই ক্ষীয়মান হতে থাকল, তারা ততই ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটরশিপের নিষ্ঠুর অস্ত্রগুলি ব্যবহার করতে শুরু করল ও ‘রাজার ঐশ্বরিক উত্তরাধিকার’-এর ধারণাকে সামনে আনতে লাগল। রাজা অতীতের বিষয় হতে পারে, কিন্তু বর্তমানেও রাষ্ট্রের হাতে সেই বিশেষ ঐশ্বরিক অধিকার বেঁচে রয়েছে। হেগেলের মেটাফিজিক্যাল তত্ত্ব বিমূর্তভাবে এই ভাবনায় আত্তীকৃত হয়ে রয়েছে। যে শ্রেণি রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে তারা হেগেলের মেটাফিজিক্যাল তত্ত্বকে যুক্তিসম্মত করে তোলার চেষ্টা করে। মধ্যযুগের নীতিবাক্য ছিল ‘রাজা কোনো ভুল করতে পারে না’। ফ্যাসিবাদের দার্শনিকরা তাকে বদলে দিয়ে বললেন, ‘রাষ্ট্র কোনো ভুল করতে পারে না’। মানবেন্দ্রনাথ বলেছেন, প্রসঙ্গক্রমে ফ্যাসিবাদের দর্শনের শিকড় ‘গীতা’-র দর্শনের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। যেখানে বলা হয়েছে বিশ্বের সমস্ত ক্ষমতাই (বিভূতি) আসলে ঈশ্বরের ক্ষমতা। সেই কারণেই বলা যায়, দর্শনগতভাবে ফ্যাসিবাদ কোনো নতুন ফেনোমেনা নয়। আবার এটাও বলা যাবে না যে, ফ্যাসিবাদের কোনো দর্শন নেই। ফ্যাসিস্ট দর্শন অধ্যাত্মবাদী দৃষ্টিভঙ্গির যুক্তিসম্মত পরিণতি। ‘গীতা’-র তত্ত্ব ও রাষ্ট্র সম্পর্কে ফ্যাসিস্ট নিয়ো-হেগেলিয়ান মেটাফিজিক্যাল ধারণার সম্পর্ক সহজেই বোঝা যায়। বাস্তবে ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটরশিপের দর্শন হচ্ছে আধুনিক মিস্টিসিজম ও স্পিরিচুয়ালিজমের পরিণতি, যারা জীবন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী। ফ্যাসিবাদের দর্শনের ভারতীয় পূর্বপুরুষদের খোঁজ পাওয়া যায় শোপেনহাওয়ের-এর সূত্র ধরে, যার অনুগামী ছিলেন নিৎসে ও নিৎসেকেই ফ্যাসিবাদের দার্শনিক বলা হয়। বাবাসাহের আম্বেদকর মনুস্মৃতি ও নিৎসের তুলনা করে দেখিয়েছিলেন: ‘Thus Manu’s is a degraded and degenerate philosophy of Superman as compared with that of Nietzsche and therefore far more odious and loathsome than the philosophy of Nietzsche.’। লক্ষণীয় বিষয় হল: ১৯৩০-এর দশকেই মানবেন্দ্রনাথ এই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। 

মানবেন্দ্রনাথ জিওভান্নি জেন্টাইল-এর ‘ফ্যাসিজম অ্যান্ড কালচার’ বইটির সূত্রে আলোচনা করে দেখিয়েছেন: ফ্যাসিস্ট আন্দোলন গভীর আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার ভিত্তিতে সক্রিয় হয়েছিল। তাই ফ্যাসিবাদী তত্ত্বকে তার সক্রিয়তার সূত্রে বুঝে নিতে হবে। জেন্টাইল বলেছিলেন: ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ কোনো বদ্ধ ব্যবস্থা নয়। এটি নতুন ধরনের জীবনযাপন পদ্ধতি। ফ্যাসিবাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট। মানবেন্দ্রনাথ তাই বলেছেন: ফ্যাসিবাদের মোটিভগুলিকে তার অ্যাকশনের সূত্রেই স্পষ্ট বোঝা যায়। ফ্যাসিস্ট আন্দোলন মোহভঙ্গ হওয়া পেটি-বুর্জোয়া জনগনকে একটি ধর্মান্ধ সংগঠনে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ফ্যাসিস্ট আন্দোলন ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিপীড়িত মানুষদের বিদ্রোহকে হিংস্রভাবে দমন করেছিল। বুর্জোয়া শ্রেণি এই প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলনকে উৎসাহিত করেছিল ও স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতা দখলে সাহায্য করেছিল। মানবেন্দ্রনাথ ফ্যাসিস্ট দার্শনিকদের বক্তব্যের সূত্রে জানিয়েছেন: ফ্যাসিবাদের কোনো নীতি নেই। এটি আইডিওলজির লজিক্যাল সিস্টেমের দ্বারা ভারাক্রান্ত নয়। অধ্যাত্মবাদ বা স্পিরিচুয়ালিজম কোনো যুক্তি মানে না, সেখানে লজিকের কোনো জায়গা নেই। ফ্যাসিবাদের আধাত্মিকতার মাধ্যমেই তার স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অধ্যাত্মবাদ বা স্পিরিচুয়ালিজম-এর বহিঃপ্রকাশ যখন পাগলামোর স্তরে পৌঁছে যায় তখনই তা ধনতন্ত্রের আধিপত্যকে যুক্তিসিদ্ধ করে তোলে।

ফ্যাসিস্ট দর্শনের দার্শনিক ভিত্তি অনুসন্ধান করতে গিয়ে মানবেন্দ্রনাথ বলেছিলেন: বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বৈপ্লবিক বস্তুবাদী মতাদর্শকে সংহত হতে সাহায্য করেছিল। ফ্যাসিবাদী দর্শন এই মতাদর্শের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত আক্রমণ চালিয়েছিল। তার ফলে পাশ্চাত্য দর্শন ক্রমাগত প্রতিক্রিয়াশীল চেহারা নিচ্ছিল। ধনতান্ত্রিক সংস্কৃতির দার্শনিক অবদানগুলি সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছিল হেগেলের দর্শনে। যার পরিণতিতে আধুনিক ধ্রুপদী দর্শন অ্যাবসোলিউট আইডিয়ালিজম বা চরম আদর্শবাদে পৌঁছেছিল। ঐতিহাসিকভাবে ও দ্বান্দ্বিক-বিচারে ধনতান্ত্রিক সংস্কৃতির সবথেকে সদর্থক অবদান হল বস্তুবাদ। যা আবার উচ্চতর সাংস্কৃতিক প্রকরণের মতাদর্শগত ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। আধুনিক দর্শনের বিকাশধারায় আদর্শবাদ থেকে বস্তুবাদে উৎক্রমণের প্রতিনিধি ছিলেন হেগেল। নবোত্থিত শ্রেণি হিসেবে বুর্জোয়ারা বস্তুবাদী দর্শনের মতো বৈপ্লবিক অস্ত্রকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিল সামন্তশ্রেণি ও রাজতন্ত্রের সমর্থনপুষ্ট ধর্মীয় অনুশাসনগুলির বিরুদ্ধে। আবার ক্ষমতায় যাবার পরে বুর্জোয়ারাই সব ধরনের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামের হাতিয়ারগুলিকে নাকচ করে দিয়েছিল। ধর্ম, মিস্টিসিজম ও আধ্যাত্মবাদ হচ্ছে মানুষ কর্তৃক অন্য মানুষের ওপর শোষণ ও কর্তৃত্বের সহায়ক উপাদান। বুর্জোয়ারা এক সময়ে বৈপ্লবিক দর্শনগুলিকে স্বীকৃতি দিত, কিন্তু শাসকশ্রেণি হিসেবে তারাই এই দর্শনগুলিকে প্রত্যাখ্যান করল এবং নয়া-অধ্যাত্মবাদী ও ‘বৈজ্ঞানিক’ মিস্টিসিজমের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠল। হেগেলের শিষ্যরা বুর্জোয়াদের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হল। এইক্ষেত্রে মানবেন্দ্রনাথ ফ্রেডরিখ উইলহেম জোসেফ শেলিং ও লুডউইগ ফয়েরবাখ-এর নাম উল্লেখ করছেন। হেগেলের পরে পাশ্চাত্য ধনতান্ত্রিক সভ্যতার দর্শনের ক্ষেত্রে পশ্চাদ্‌পসরণ দেখা গেল। 

নতুন পরিস্থিতিতে শাসকদের কান্টের দর্শনের দিকে তাকাতে হল। নিয়ো-কান্টইজম কান্টের দর্শনের বৈপ্লবিক দিকগুলিকে পরিত্যাগ করেছিল। তারা ‘সুপার-সেনসুয়াল সত্যের’ কঙ্কালগুলিকে সামনে এনে পরীক্ষানির্ভর বিজ্ঞানকে পাশে সরিয়ে রেখেছিল। ‘সুপার-সেনসুয়াল’-এর ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস। তাই এখানে যুক্তির কোনো বৈধতা নেই। কিন্তু সময়ের মধ্যে দিয়ে ধনতন্ত্রের নিজের ভিতরকার দ্বন্দ্বসমূহের তীব্রতা তার স্থায়িত্বকে এমন সংকটের মধ্যে ফেলে দিল যে, কান্টের দর্শনের প্রতিক্রিয়াশীল অংশগুলির ভালগারাইজেসনের মাধ্যমেও সবকিছুকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না। কান্ট নিজে কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ভিত্তিতেই তার দর্শনকে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর দর্শনকে হয় পুরোটা গ্রহণ করতে হবে, অথবা পুরোটা বর্জন করতে হবে। যদি কোনো অংশ বর্জন করতে হয়, তাহলে তাঁর দর্শনের সুপাল-সেনসুয়াল বিষয়ক ভাবনাকে বর্জন করতে হয়, কারণ তা কান্টিয়ান সিস্টেমের প্রেমিস বা পূর্বানুমান বা প্রতিজ্ঞাকেই অনুমোদন করে না। তার ফলে পাশ্চাত্য দর্শনের গতিকে আরও পিছনের দিকে নিয়ে যাওয়া হল। মধ্যযুগের ‘পিওরিটি’-র দিকে যেতে হল। যুক্তিবাদকে অপসারণের জন্য আধ্যাত্মিক মিস্টিসিজম-এর দিকে ঝুঁকতে হল। বৈপ্লবিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে অধিবিদ্যা ও ধর্মীয় মিস্টিসিজম-কে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। পাশ্চাত্য দর্শনের সব অ্যাকাডেমিক স্কুলগুলি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে খোলাখুলি বা প্রচ্ছন্নভাবে এই দিকেই হাঁটছিল। তা সত্ত্বেও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের দ্রুত বিকাশ আধ্যাত্মিক বাড়াবাড়ি ও ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াকে যুক্তির দিক থেকে ও দর্শনের দিক থেকে ভুল প্রমাণ করছিল। এমতাবস্থায় প্রতিক্রিয়ার পদ্ধতিগুলি যুক্তিবাদকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে ধর্মের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বোঝাপড়ায় যাচ্ছিল। কিন্তু নিয়ো-কান্টইজমও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও বস্তুবাদ যে চ্যালেঞ্জ হাজির করেছিল তার সঙ্গে মোকাবিলায় সক্ষম হচ্ছিল না। তাই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে ইউরোপের অ্যাকাডেমিক জগৎ হেগেলের ভূতকে জাগিয়ে তুলতে বাধ্য হল। নয়া-হেগেলবাদ নকল-বিজ্ঞানের মোড়কে অধিবিদ্যা ও মিস্টিসিজমের প্রকাশ ঘটাতে লাগল হেগেলের দ্বন্দ্বতত্ত্বকে বিকৃত করার মধ্যে দিয়ে। ঘটনাচক্রে নয়া-হেগেলবাদের বিকৃত দ্বন্দ্বতত্ত্ব একলেটিসিজম-এর চেহারা নিল, সমস্ত নীতিকে বর্জন করল, বিধিবহির্ভূতভাবে ক্ষমতা দখলকে দার্শনিক অনুমোদন দিল। 

মানবেন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছেন: মিস্টিক শোপেনহাওয়ার যদি ফ্যাসিবাদের পিতামহ হন ও সিনিক্যালি প্রতিক্রিয়াশীল নিৎসে যদি হন ফ্যাসিবাদের প্রফেট, তাহলে ফ্যাসিবাদের দর্শনের মূল নীতিগুলির দার্শনিক হলেন হেনরি-লুই বের্গসঁ (Henri-Louis Bergson)। তিনি দর্শনের পরিসরে বিজ্ঞানের দাবিগুলিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন ও বিজ্ঞানের সমালোচনা করেছিলেন ধর্ম, বিশ্বাস, স্বজ্ঞা ও আপ্তবাক্যের সাহায্যে। ‘ফিজিক্যাল থিয়োরি’-র সংকট থেকে তিনি সাহস অর্জন করেছিলেন। সেই কারণে কোনো সিরিয়স তাঁর দর্শনের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি তার কল্পনিক ভিত্তির কারণে। তাই সময়ের মধ্যে দিয়ে অধ্যাত্মবাদের বিজ্ঞানের সত্য ও দার্শনিক অধ্যাত্মবাদের মধ্যে একধরনের সামঞ্জস্যবিধান করতে চেয়েছিলেন। 

ধনতন্ত্রের সংকট কীভাবে দর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরে সেদিকেও মানবেন্দ্রনাথ নজর দিয়েছেন। বিজ্ঞান ধনতন্ত্রের হাতে শোষণের অনেক অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে জনগণের চেতনায় অনেক বৈপ্লবিক উপাদানও যুক্ত হয়েছিল। অধ্যাত্মবাদের উত্থান ও তার সঙ্গে বিজ্ঞানের আপাত সাদৃশ্য দেখিয়ে বুর্জোয়ারা লাভবান হয়েছিল। একদিকে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সূত্রে বস্তুগতভাবে বুর্জোয়ারা লাভবান হল। অন্যদিকে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাগুলিকে আধ্যাত্মবাদ ভুলিয়ে রাখতে পারল। জীবন দুটি স্বাধীন পরিসরে বিভক্ত হয়ে গেল। একটি পরিসর বস্তুগত জগৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকল, অন্য অংশটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মধ্যে ডুবে থাকল। বিজ্ঞান তার সত্য নিয়ে থাকল ও অধ্যাত্মবাদী সত্য ধরাছোঁয়ার বাইরে রইল, তা বস্তুগত বাস্তব থেকে আরও উন্নততর বাস্তবে বিদ্যমান রইল। প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া দর্শনকে বের্গসঁ এইভাবে সূত্রায়িত করলেন। এইভাবে ফ্যাসিবাদের দর্শন সবথেকে গোঁড়া ধরনের অধ্যাত্মবাদের চেহারা নিল। এখানে অবজেকটিভ ট্রুথ বা তন্ময় সত্যের কোনো জায়গা নেই। এখানে ব্যক্তিই সত্যের মানদণ্ড। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই ব্যক্তি সত্যে পৌঁছে যাচ্ছে। এইভাবেই যারা সমাজকে শাসনের অধিকারী বা শাসকশ্রেণির প্রতিনিধি তাদের কাছেই সত্য প্রকাশিত হতে পারে। অবক্ষয়ী ধনতান্ত্রিক সমাজে নয়া-অধ্যাত্মবাদের প্রফেসররাই উচ্চমার্গীয় মহান্ত হয়ে উঠলেন। চার্চের ধর্মোপদেষ্টারা ও নৈতিকতার বিচারবুদ্ধিহীন পণ্ডিতরা হায়ারারকি গঠন করল। এই নতুন কাঠামোটি কোনটি সত্য তার অনুমোদন দিতে শুরু করল। রাষ্ট্রও তাকে মান্যতা দিতে শুরু করল। ভালগার মেটিরিয়ালিজম যে ঘৃণ্য ভিত্তি নির্মাণ করল আধ্যাত্মবাদ তার ওপর নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 

প্রাচীন ভারতের সমাজ-কাঠামো ও চিন্তার জগতকে নিয়ন্ত্রণের কৌশলগুলির সঙ্গে এই পদ্ধতির সাযুজ্য দেখাচ্ছেন মানবেন্দ্রনাথ। প্রজ্ঞাকে প্রকাশের অধিকার ছিল শুধুই ব্রাহ্মণদের। মধ্যযুগেও ব্রাহ্মণদের সঙ্গে ক্ষত্রিয় শাসকদের সম্পর্ক ছিল ইয়োরোপে চার্চ ও সামন্ত-অভিজাতদের সম্পর্কের মতো। বর্তমান সময়ে তারাই স্বামীজিদের মোড়কে মতাদর্শের প্রবক্তা হয়ে উঠছে। মানবেন্দ্রনাথ আক্ষেপ করছেন: মতাদর্শগতভাবে ভারত যে ফ্যাসিবাদের কাছাকাছি তা অনেকেই বুঝতে পারছে না। বর্তমান ভারতে বৌদ্ধিক নেতারা যে গোঁড়া অধ্যাত্মবাদের প্রচার করছেন তা আসলে ফ্যাসিবাদী দর্শন।

সুপারম্যানের প্রতি বিশ্বাস ফ্যাসিবাদী দর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট। এই বিশ্বাসের স্রষ্টা নিৎসে। মানবেন্দ্রনাথ নিৎসের সুপারম্যানের ধারণার দিকেও নজর দিয়েছেন। নিৎসে ছিলেন শোপেনহাওয়ার-এর অনুগামী। শোপেনহাওয়ার উপনিষদের দর্শনে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। তাই মানবেন্দ্রনাথ মনে করতেন: ভালগার মেটিরিয়ালিজমের সংবেদনহীন উদ্ভাসন ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের গোঁড়া আধ্যাত্মিক মতাদর্শের মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। ফ্যাসিস্টদের জাতীয়তাবাদ হচ্ছে পুনরুত্থানবাদী ধারণার দ্বারা অনুপ্রাণিত। তাদের সক্রিয়তা দেখিয়ে দেয় পুনরুত্থানবাদী ধারণাকে তারা কতদূর এগিয়ে দিতে পারে। তাদের মতাদর্শগত প্রেক্ষাপট দেখিয়ে দেয় পুনরুত্থানবাদ হচ্ছে একধরনের সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা। যে-কোনো বৈপ্লবিক ধারণার বিরুদ্ধে এটাই হচ্ছে তাদের মতাদর্শগত অস্ত্র। ফ্যাসিবাদের পিতামহ শোপেনহাওয়ার পেসিমিজম বা হতাশাবাদের গুরু। তিনি শুধু উপনিষদের দর্শনেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন তাই নয়, তিনি সারা জীবনই হেগেলের দর্শনের বৈপ্লবিক উপাদানগুলির বিরোধিতা করতেন। কিন্তু এই কাজে তিনি দার্শনিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সাফল্য দেখাতে পারেননি। শোপেনহাওয়ারের দর্শন ছিল ১৮৪৮ সালে পরাজিত বুর্জোয়া বিপ্লবের মতাদর্শ। এই পরাজয় পেসিমিজম বা হতাশাবাদের জন্ম দিয়েছিল। তা হয়ে উঠেছিল জীবনের কঠিন বাস্তব থেকে পলায়নের দর্শন। দার্শনিকরা তাঁর সময়ের চাহিদা ও শর্তাবলীর ওপর দাঁড়িয়েই চিন্তা করেন। তাই শোপেনহাওয়ার প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান থেকে চিন্তা করা ছাড়া অন্য কোনোভাবে চিন্তা করতে পারতেন না। তাঁর চিন্তায় সেমিটিজমের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও নারীদের বিষয়ে সামন্ততান্ত্রিক অবস্থান খুবই স্পষ্ট। 

নিৎসে তাঁর গুরুর চিন্তাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলতেন প্রকৃতিগতভাবে মনুষ্যচরিত্র যে ‘ইভিলনেস ও মিন্‌নেশ’ বা অসততা ও নীচতা দ্বারা পূর্ণ, তা স্বীকার করতে লজ্জা পাওয়া উচিত নয়। আর তা অসৎ ও নীচ বলেই আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত। শোপেনহাওয়ার বলেছিলেন জীবন হচ্ছে একটা ক্রাইম বা পাপ। আর নিৎসে এটাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, ‘possessiveness, harshness, cruelty, of the desire to overwhelm the stranger and the weak, to oppress and exploit’ হিসেবে। এটা ফ্যাসিবাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

নিৎসে কিন্তু রাষ্ট্রের পূজক ছিলেন না। তিনি চাইতেন একেবারে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী এক বীর-কে। কারণ– 

Man is a rope, fastened between animal and superman– a rope over an abyss. (‘A Nietzsche Reader’, Penguin Books, 1977, p. 239)

Mankind does not represent a development of the better or the stronger or the higher in the way that is believed today. ‘Progress’ is merely a modern idea, that is to say, a false idea. The European of today is of far less value than the European of Renaissance; onward development is not by any means, by any necessity, the same thing as elevation, advance, strengthening. (‘A Nietzsche Reader’, Penguin Books, 1977, p. 247)

The word ‘superman’ as designated a type that has turned out supremely well, in antithesis to ‘modern’ men, to ‘good’ men, to Christians and other nihilists– a word which in the mouth of a Zarathustra, the destroyer of morality, becomes a very thoughtful word– has been understood almost everywhere with perfect innocence in the sense of those values whose antithesis makes its appearance in the figure of Zarathustra: that is to say, as an ‘idealistic’ type of higher species of man, half ‘saint’ and half ‘genius’….(‘A Nietzsche Reader’, Penguin Books, 1977, pp. 247-248)

নাৎসিরা নিৎসেকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করলেও তিনি কিন্তু জাতীয়তাবাদী নন। জার্মানি বিষয়ে অতিরিক্ত মুগ্ধ ছিলেন না তিনি। তিনি চাইতেন আরও বড়ো কিছু। তিনি চাইতেন এমন একটি আন্তর্জাতিক শাসকশ্রেণি, যারা হবে বিশ্বের প্রভু। পাশাপাশি একথাও মনে রাখা দরকার: তিনি নির্দিষ্টভাবে ইহুদি-বিরোধী নন। অবশ্য তিনি একথাও মনে করতেন: যতজন ইহুদিকে জার্মানি আত্তীকৃত করতে সক্ষম তা ইতিমধ্যেই জার্মানি করে ফেলেছে। তাই আর নতুন করে কোনো ইহুদিকে জার্মানিতে প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত নয়। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন: তিনি নতুন সাক্ষ্য অপছন্দ করতেন, কিন্তু প্রাচীন সাক্ষ্যকে নয়। নারীদের নিন্দায় তিনি চিরকাল অক্লান্ত। নারীরা বন্ধুত্বের উপযুক্ত নয়। পুরুষরা যুদ্ধ করবে ও নারীরা তাদের মনোরঞ্জন করবে। ‘তুমি নারীর কাছে যাচ্ছ? নিজের চাবুকটা নিতে ভুলো না।’

মনুস্মৃতিতে শূদ্র ও নারীদের সম্পর্কে অগুনতি অত্যন্ত অপমানজনক মন্তব্য করা আছে। মনুস্মৃতির ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন স্যার উইলিয়াম জোনস ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে। লুই জ্যাকোলিয়ট মনুস্মৃতির অনুবাদ করেছিলেন ‘ল’জ অফ মনু’ নামে ও তা প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা থেকেই। লুই জ্যাকোলিয়ট ছিলেন একজন ফরাসি ব্যারিস্টার, বিচারক ও লেখক। নিৎসে লুই জ্যাকোলিয়ট-এর অনুবাদটি পড়ে রিভিউ করেছিলেন। (https://en.wikipedia.org/wiki/Manusmriti)

বাবাসাহেব আম্বেদকর নিৎসের দর্শনের সঙ্গে মনুস্মৃতির তুলনা করেছিলেন এইভাবে:

This is principally due to the revelation that the philosophy of Nietzsche is capable of producing Nazism. His friends have vehemently protested against such a construction (M. P. Nicolas, “From Nietzsche Down to Hitler” 1938). But it is not difficult to see that his philosophy can be as easily applied to evolve a super state as to Superman. This is what the Nazis have done.

To identify Nietzsche, whose name and whose philosophy excites so much horror and so much loathing, with Manu is sure to cause astonishment and resentment in the mind of the Hindus. But of the fact itself there can be no doubt.

বাবাসাহেব আম্বেদকর নিৎসের লেখা থেকে নীচের উদ্ধৃতিগুলি দিয়েছেন:

(১) When I read the lawbook of Manu, an incomparably intellectual and superior work, it would be a sin against the spirit even to mention in the same breath with the Bible. You will guess immediately why; it has a genuine philosophy behind it, in it, not merely an evil-smelling Jewish distillation of Rabbinism and superstition– it gives something to chew even to the most fastidious psychologist.

(২) And, not to forget the most important point of all, it is fundamentally different from every kind of Bible: by means of it the noble classes, the philosophers and the warriors guard and guide the masses; it is replete with noble values, it is filled with a feeling of perfection, with saying yes to life, and triumphant sense of well-being in regard to itself and to life– the Sun shines upon the whole book.

(৩) All those things which Christianity smothers with its bottomless vulgarity, procreation, woman, marriage, are here treated with earnestness, with reverence, with love and confidence. How can one possibly place in the hands of children and women, a book that contains those vile words: ‘to avoid fornication, let every man have his own wife, and let every woman have her own husband… it is better to marry than to burn. And is it decent to be a Christian so long as the very origin of man is Christianised, that is to say, befouled, by the idea of the immaculate conception?….

(৪) I know of no book in which so many delicate and kindly things are said to woman, as in the LawBook of Manu; these old gray-beards and saints have a manner of being gallant to woman which, perhaps, cannot be surpassed. ‘The mouth of a woman,’ says Manu on one occasion, ‘the breast of a maiden, the prayer of a child, and the smoke of the sacrifice, are always pure’. And finally perhaps this is also a holy lie– “all the openings of the body above the navel are pure, all those below the navel are impure. Only in a maiden is the whole body pure.” (From ‘Dr. Babasaheb Ambedkar Writings & Speeches’, Volume 3, published by the Education Department, Government of Maharashtra, pages 72-87) ।

এরপর বাবাসাহেব নিৎসে ও মনুর তুলনা করে লিখেছেন: ‘Thus Manu’s is a degraded and degenerate philosophy of Superman as compared with that of Nietzsche and therefore far more odious and loathsome than the philosophy of Nietzsche.’ অর্থাৎ মানবেন্দ্রনাথের মতো বাবাসাহের আম্বেদকরও মনুস্মৃতির ব্রাহ্মণ ও নিৎসের সুপারম্যানের ধারণাকে যুক্ত করেছিলেন।

নিৎসে তার ‘ফ্রি স্পিরিট’ সম্পর্কে আলোচনার সময়ে বলেছেন: ‘কেউই আপনাকে সেইরকম একটা সেতু তৈরি করে দেবে না যার উপর আপনি ও শুধুমাত্র আপনিই আপনার জীবনের নদীটি অতিক্রম করতে পারবেন।’ সেই সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজন একটি বিশেষ ধরনের ইচ্ছা, আত্ম-মুক্তির জন্য একক ক্ষমতা। নিৎসে তাঁর ১৮৭৯ সালের মাস্টারপিস ‘All Too Human: A Book for Free Spirits’ বইতে এই কথা বলেছেন। যাকে তিনি ফ্রি স্পিরিট-এর রোমান্টিক আদর্শের প্রতি নিবেদিত একটি “discouraging-encouraging work” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নিৎসের ‘ফ্রি স্পিরিট’ আরও সমৃদ্ধ হয়েছিল ঈশ্বরের ‘বিভূতি’-র ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে। সেইকারণে স্বাভাবিকভাবেই তা শাসক ও শাসিতের ধারণার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। শাসকদের স্বাভাবিক অধিকার আছে মনুষ্যরূপী পশুপালদের শাসন করার। ক্ষমতাহীনদের অন্যায্যভাবে অবদমিত করার অধিকার আছে শাসকদের। মানবসম্পর্ক বিষয়ে এই ধরনের আপত্তিকর দৃষ্টিভঙ্গি নিৎসে পেয়েছিলেন শোপেনহাওয়ার-এর কাছ থেকে, তাঁর ‘ইভিলনেস ও মিন্‌নেশ’ বা অসততা ও নীচতা দ্বারা পূর্ণ ধারণার সূত্রে। যার পরিণতিতে নিৎসে ক্ষিপ্ত ও ক্রুদ্ধ সমাজতন্ত্র-বিরোধী মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি তাই ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিস্টদের মার্কসবাদ-বিরোধী মতাদর্শগত অগ্রদূত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন। মনবেন্দ্রনাথ লিখেছেন: ইন্দো-ইউরোপিয়ান অধ্যাত্মবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল, প্রত্যেককে তার দুঃখ ও কষ্টকে ঈশ্বরের দান বলে আনন্দের সঙ্গে স্বীকার করে নিতে হবে। নিৎসে মনে করতেন, শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতির জন্য, সমস্ত নিপীড়নকে আনন্দের সঙ্গে স্বীকার করার শিক্ষা তাদের দেওয়া উচিত। এইভাবেই নিৎসে একটি শ্রেণির ওপর অন্য একটি শ্রেণির আধিপত্যকে যুক্তিসম্মত করে তোলার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর ভাবনার সঙ্গে ভারতীয় দর্শনের ‘কর্ম’ বিষয়ক মিল দেখা যায়। কে কী ‘কর্ম’ করবে তা ঈশ্বর দ্বারা পূর্ব-নির্ধারিত। গীতায় বলা আছে চারটি বর্ণ আমিই সৃষ্টি করেছি– কোয়ালিটি বা গুণ ও মেরিট বা যোগ্যতার ভিত্তিতে। বর্ণপ্রথার মাধ্যমে ঈশ্বরের নির্দেশে বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোকজন বিভিন্ন ধরনের কাজে নিযুক্ত থাকবে। ঈশ্বরের ইচ্ছা অনুসারে সামাজিক অসাম্য চিরস্থায়ী থাকবে, নিম্নবর্ণের মানুষরা চিরকালই অবদমিত থাকবে। শাসক শ্রেণি তাদের ক্ষমতা ও সুবিধাগুলি চিরকালই ভোগ করতে থাকবে। ‘গীতা’-য় ঈশ্বর ঘোষণা করেছেন, বিশ্বের সব ধরনের ক্ষমতা এইভাবেই প্রকাশিত হচ্ছে। মানবেন্দ্রনাথ বলেছেন: এইভাবেই ব্রাহ্মণদের পবিত্র অধিকারের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। অতীতে এইভাবেই রাজারা শাসনের পবিত্র অধিকার ভোগ করতেন। একইভাবে প্যারাসিটিক বা পরজীবী জমিদাররা তাদের দ্বারা শোষিত কৃষকদের ‘ন্যাচারাল লিডার’ হয়ে আছে। দেশীয় রাজ্যগুলিতে নেটিভ প্রিন্সরা বা দেশীয় রাজারা এইভাবেই তাদের অটোক্র্যাটিক বা স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রয়োগ করছে। নিৎসে স্পষ্ট বলেছেন: প্রতিষ্ঠানগুলির পরিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবীতে সুখের বৃদ্ধি ঘটবে না। মেলানকলিক, দুর্বল, নীচ, অভিযোগকারী মানসিকতার দূরীকরণের মাধ্যমেই তা হবে। মানবেন্দ্রনাথ বলেছেন: ফ্যাসিস্টদের দর্শনের মধ্যে দিয়ে ভারতের আধ্যাত্মিক কণ্ঠের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। পার্থিব বস্তুগুলি মানুষকে সুখী করতে পারে না। সুখ হল একটি বিশেষ ধরনের মানসিক অবস্থা যা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন। এটি এক ধরনের টেম্পারামেন্টের বা বিশেষ ধরনের মেজাজের বিষয়। নিজেকে সুখী মানুষ হিসেবে কল্পনা করেই একজন সুখী হতে পারে।

ন্যাশনাল সোশ্যালিজম সম্পর্কে আলোচনার সময়ে মানবেন্দ্রনাথ বলেছেন: ফ্যাসিস্টদের ন্যাশনাল সোশ্যালিজম হল একটি প্রতারণাপূর্ণ বাক্‌চাতুর্য। তারা সোশ্যালিস্টও নয় ন্যাশানালিস্টও নয়। ধনতান্ত্রিক সমাজের অবক্ষয়ের যুগে ফ্যাসিবাদ হল একধরনের রাজনৈতিক পরিচালন পদ্ধতি। জার্মানিতে ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটরশিপ ছিল ইতালির তুলনায় অনেক বেশি হিংস্র ও নির্দয়। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ের যুগে তাকে অতিক্রম করে গিয়ে যারাই আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণের কথা বলে, যেমন শ্রমিক শ্রেণি ও তার সহযোগী শক্তিগুলি, তাদের নির্দয় ও রক্তাক্ত হিংসার মাধ্যমে ধ্বংস করাই ফ্যাসিস্ট আন্দোলন ও রাষ্ট্রের মূল কাজ। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিম্ন-মধ্যবিত্তরাই ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনে সত্যবাদিতা, সততা, আন্তরিকতা, ভদ্রতা ইত্যাদির কোনো স্থান ছিল না। এই আন্দোলন মিথ্যা, প্রতারণা ও ধাপ্পাবাজির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। মানবেন্দ্রনাথ লিয়ো ফিউট্র্যাংগার-এর (Lyon Feuchtwanger) বক্তব্যকে স্মরণ করে লিখছেন: হিটলারের আত্মজীবনীতে একশো চল্লিশ হাজার শব্দ আছে। তার মধ্যে একশো উনচল্লিশহাজার শব্দই মতিভ্রংশের পরিণতি। লিয়ো ফিউট্র্যাংগার (৭ জুলাই ১৮৮৪ – ২১ ডিসেম্বর ১৯৫৮) ছিলেন একজন জার্মান ইহুদি ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার এবং ওয়েমার জার্মানির সাহিত্য জগতের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট সহ সমসাময়িকদের প্রভাবিত করেছিলেন। লিয়ো ফিউট্র্যাংগার নাৎসি পার্টির ও তাদের ইহুদিবাদের তীব্র সমালোচক ছিলেন। ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্বে পাবার পর তিনি যে সরকারি নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু হবেন তা জানাই ছিল। তাঁর লেখাপত্তর ‘আন-জার্মান’ বলে চিহ্নিত করা হয় ও নাজিরা তা পুড়িয়ে ফেলে। স্বাভাবিকভাবেই তিনি দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানেই ফিউট্র্যাংগার ১৯৫৮ সালে প্রয়াত হন। ধনতান্ত্রিক লোলুপতার ফলে সবথেকে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের ফ্যাসিস্ট আন্দোলনে সমবেত করা হয়েছিল ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতারণাপূর্ণ প্রচারের মাধ্যমে। এক ধরনের সিউডো-সোশ্যালিজমের কথা বলে তাদের স্টর্মট্রুপারদের মধ্যে আত্তীকৃত করা হয়েছিল। এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা হয়েছিল নির্লজ্জ মিথ্যাচার, সীমাহীন কপটতা ও অশেষ লোকখ্যাপানো শূন্যগর্ভ বক্তৃতার মাধ্যমে। ধনতন্ত্র প্রগতিশীল সামাজিক শক্তি হিসেবে যেসব রাজনৈতিক অনুক্রমগুলিকে প্রতিষ্ঠা করেছিল, যেমন রাজনৈতিক, নাগরিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, এই সবগুলির বিরুদ্ধে এই সমাবেশ ও আন্দোলনকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সংসদীয় গণতন্ত্র ও ধনতন্ত্রকে অভিন্ন বলে প্রচার করা হয়েছিল ও তার বিলোপের মাধ্যমে ধনতান্ত্রিক সমাজের সব অপরাধ অপসারণ সম্ভব বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এই কথা বলে সংসদীয় গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছিল। কিন্তু ফ্যাসিস্ট জামানায় ধনতন্ত্র কিন্তু তার পূর্ণ শক্তি নিয়েই বেঁচে ছিল। শ্রমিক শ্রেণিকে আরও বেশি বেশি করে, আরও নির্দয়ভাবে শোষণ করে চলছিল।

সংসদীয় গণতন্ত্রের জামানায় যেটুকু আপেক্ষিক স্বাধীনতা পাওয়া যায় তাকে ব্যবহার করে শ্রমিক শ্রেণি নিজেদের সংগঠিত করতে পারে ও বিপ্লবের জমি তৈরি করতে পারে। সেই কারণেই বুর্জোয়ারা তাদের অর্জনগুলিকে বিলুপ্ত করে দিতে চায় নিজেদের ক্ষমতা ও সুবিধাগুলিকে রক্ষা করার জন্য। এই নোংরা কাজগুলি করানোর জন্য তাদের সবথেকে সহায়ক হল ফ্যাসিস্ট আন্দোলন। বুর্জোয়া দার্শনিকরা এই কাজে সমর্থন জোগাবে এমন তত্ত্বও বানিয়ে তোলেন। ফ্যাসিস্টরা প্রথমদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার মালিকদের গালমন্দ করলেও ক্ষমতায় আসার পর তাদের উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের শ্রেণিস্বার্থেই বিপুল পরিমাণে অর্থ সাহায্য করত। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পুলিশ ও মিলিটারির লোকজনরাও ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখত। খুব সচেতনভাবে নির্মিত বক্তৃতাবাজি, সস্তার আবেগ, অসম্ভব সব প্রতিশ্রুতি, বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ অপবাদ– জাতীয়তাবাদী জিঙ্গোইজম ও অন্য জাতির বিরুদ্ধে ঘৃণা বাড়িয়ে তুলত। এই সব কিছুর প্রভাবে আর্থিক দিক থেকে মোটামুটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া ও বৌদ্ধিক দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষরা প্রায় হিপনোটাইজ বা সম্মোহিত হয়ে যেত। জনগণের একাংশ গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। ইতালিতে এক নাটকীয় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ও জার্মানিতে ‘সংবিধানসম্মত’-ভাবে ও ‘রক্তপাতহীন’ পদ্ধতিতে ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতা দখল করেছিল। ন্যাশনাল সোশ্যালিস্টরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার পরে পুঁজির মালিকদের কোনো ক্ষতি করেনি। যদিও ক্ষমতায় যাবার আগে তারাই ছিল ন্যাশনাল সোশ্যালিস্টদের আক্রমণের লক্ষ্য। বরং বিপ্লবের বিপদ থেকে ধনতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য নাজি রাষ্ট্র শ্রমিক শ্রেণির পার্টিগুলির ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ নামিয়ে এনেছিল। ন্যাশনাল সোশ্যালিস্টরা প্রবল জাতীয় জিঙ্গোইজম জাগিয়ে তুলেছিল সাধারণ জার্মান নাগরিকদের কল্যাণের জন্য নয়। পক্ষান্তরে ভার্সাই চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যাগনেটদের মুক্ত করার জন্য। মানবেন্দ্রনাথ মনে করিয়ে দিয়েছেন: সমাজতন্ত্রের কোনো বাউন্ডারি নেই। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তা একেবারেই বেমানান। সমাজতন্ত্রের সঙ্গে ফ্যাসিস্টদের জিঙ্গোইস্ট, সাম্রাজ্যবাদী ও জাতীয়তাবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ন্যাশনাল সোশ্যালিজম হল এমন এক মোড়ক যার গভীরে অন্তর্লীন ছিল তিক্ত সমাজতন্ত্র-বিরোধিতা ও তীব্র শ্রমিক আন্দোলন বিরোধিতা। ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল মার্কসবাদকে ধ্বংস করা। ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টিকে সব ধরনের বুর্জোয়ারা মদত দিত। নাজি রাষ্ট্র ছিল জার্মান ক্যাপিটালিস্টদের নির্ভরযোগ্য অভিভাবক। জার্মান পিপলস পার্টি বরাবরই ভারী শিল্পের মালিকদের প্রতিনিধিত্ব করত। নাজি পার্টি ক্ষমতায় আসার পরেই এই পার্টি তার সদস্যদের ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে বলে ও নিজেদের অস্তিত্ব বিলোপ করে দেয়। মনারকিস্টদের আধা-সামরিক সংগঠন দ্য স্টিল হেলমেট-কেও নাজি স্টর্মট্রুপারদের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একত্রিত করে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টিকে পুরোপুরি ধ্বংস করার সব রকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নখদন্তহীন সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। রিফরমিস্ট ট্রেড ইউনিয়নগুলিকেও ছেড়ে কথা বলা হয়নি। বিরোধী নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল ও তাদের পার্টির ফান্ড বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।

২০২৪-২৫ সালে মানবেন্দ্রনাথের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তগুলি খুবই পুরানো ও বহুচর্চিত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে তিনি যে কথাগুলি বলেছিলেন তা সেই সময়ের বিচারে খুবই হালনগদ ছিল। তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের সূত্রে আমরা এমন অনেক ভাবনার সন্ধান পাই যা বর্তমান ভারতে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনির মধ্যে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে হয়।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান