সুমিত সরকার
ইউরোপীয় ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত থেকে স্বতন্ত্রভাবে সমসাময়িক ভারতীয় ফ্যাসিবাদ নিয়ে আলোচনা আপাতভাবে বিরল। খুব সাম্প্রতিক সময় অবধিও ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দবন্ধের ব্যবহার অত্যন্ত অনির্দিষ্টভাবে, কেবলমাত্র স্বৈরাচারী দমনপীড়ন অথবা প্রতিক্রিয়াশীল হিংস্রতা বোঝানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ৬ই ডিসেম্বর এবং তার পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরের মদতে নেমে আসা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতা এই প্রতিক্রিয়াশীলতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ধীরে ধীরে পুরোনো বন্ধু, আত্মীয়, সহকর্মীদের দৈনন্দিন কথোপকথনের উপাদানে জারিত হয়ে ওঠে সেই ভয়ংকর অভিঘাত। ১৯৯২-৯৩ সালের ভারতবর্ষের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, ৬০ বছর আগের জার্মানির তুলনায় অনেকাংশেই ভিন্ন। তবু দুই ক্ষেত্রের মিল এবং অমিলের প্যাটার্নগুলির বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আমাদের সামনে উঠে আসে; বিশেষভাবে উঠে আসে সংঘ পরিবারের বর্তমান বর্বরোচিত সাম্প্রদায়িক আক্রমণের পদ্ধতি ও তার সর্বাত্মক প্রভাব, দেশভাগ পরবর্তী এই প্রথম যে বীভৎস, ব্যাপক হিংসার সাক্ষী থাকে এই উপমহাদেশের মানুষ। হিন্দুরাষ্ট্রের প্রতি সাম্প্রতিক এই ঝোঁক আজ আমাদের প্রজাতন্ত্রের সামগ্রিক ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে বিপদের মুখে ফেলেছে। নেহরুর এক পুরোনো সতর্কবাণী আজ ভীষণ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আমরা জানি চরিত্রগত ভাবে হিন্দু এবং মুসলিম-সাম্প্রদায়িকতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ এবং একইরকম ভয়ংকর। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের মধ্যে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার তুলনায় হয়তো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব বেশি হলেও হতে পারে। কিন্তু নেহরুর ভাষ্য অনুযায়ী “মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে ভারতীয় সমাজের উপর আধিপত্য বিস্তার করে ফ্যাসিবাদ ডেকে আনা সম্ভব নয়। যা সম্ভব একমাত্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা বা সংখ্যাগরিষ্ঠের সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে” (ফ্রন্টলাইন থেকে উদ্ধৃত, জানুয়ারি ১, ১৯৯৩)। এইজন্যই আজ ফ্যাসিবাদী সাদৃশ্য অনুসন্ধান আমাদের সামনে ঘটে চলা বিপদগুলিকে আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু বিপদ নয়, এই সাদৃশ্য উপলব্ধির সূত্রে মাঝেমধ্যে মেলে আশাবাদের ইঙ্গিত, যা অত্যন্ত বিরল অথচ এই মুহূর্তে আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।
ইতালি এবং জার্মানিতে ফ্যাসিবাদ ক্ষমতায় এসেছিল স্ট্রিট ভায়োলেন্স (সহিংস দমনপীড়ন) (মূলত উপরের স্তর থেকে অত্যন্ত সতর্কভাবে সংগঠিত, তবে নিশ্চিতভাবে বিপুল গণসমর্থনের বিষয়টিও অনস্বীকার্য), পুলিশ-প্রশাসন, আমলাতন্ত্র ও সেনাবাহিনীর ভিতরে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের গভীর অনুপ্রবেশ এবং ‘মধ্যপন্থী’ (পড়ুন শূন্যপন্থী) রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ও পরোক্ষ সম্মতির সংমিশ্রণে। সেই সময়ে ফ্যাসিবাদী এবং নাৎসি আচরণে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন চোখে পড়ে। আইন এবং সাংবিধানিক নিয়মের নির্লজ্জ লঙ্ঘন ক্রমশ আইনের বৈধতার পক্ষাবলম্বী স্বরে পরিবর্তিত হতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ মনে রাখা প্রয়োজন, ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিন্ডেনবার্গের আমন্ত্রণে রাইসস্টাগের বৃহত্তম দলের নেতা হিসাবে সম্পূর্ণ সাংবিধানিক পদ্ধতিতেই হিটলার চ্যান্সেলর হয়ে ওঠে এবং এর ঠিক পরের গোটা মাস জুড়ে বারবার তার দলের আইনি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা এবং তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবার কথা ঘোষণা করে। যদিও এরই মধ্যে গোয়েরিং বার্লিন পুলিশকে নাৎসি অনুগামী করে তুলে প্রকাশ্য রাস্তায় পঞ্চাশেরও বেশি ফ্যাসিস্ট-বিরোধী মানুষ খুন করে। এরই সঙ্গে ঘটে রাইসস্ট্যাগে আগুন ধরার ঘটনার ‘পরিকল্পনা’ যার অব্যবহিত পরে প্রথমে কমিউনিস্টরা, এবং তারপর সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির উপর নেমে আসে আক্রমণ, দ্রুত ধ্বংস হয়ে যেতে থাকে সমস্ত ট্রেড ইউনিয়ন।
আমাদের দেশে এমন অনেক কিছু ঘটেছে বা ঘটে চলেছে যা নিশ্চিতভাবে আমাদের সেই নাৎসি ভয়াবহতা মনে করায়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকাকে সরাসরি লঙ্ঘন করে একটি মসজিদ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে পাঁচ ঘণ্টা ধরে গুঁড়িয়ে দেওয়া, প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল ও তার শরিক দলগুলির বারবার শান্তিরক্ষার মিথ্যা আশ্বাস জ্ঞাপন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ঘটনা প্রতিরোধে কোনোরকম কড়া ব্যবস্থা না নেওয়া। ক্রমশ দাঙ্গা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় পুলিশি পক্ষপাতিত্বের নির্লজ্জ নিদর্শন। এমনকি কখনও কখনও আইনের রক্ষকরাই ‘দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে অবতীর্ণ হয়। শুরু হয় অদ্ভুত রাজনৈতিক এবং বিচারিক কৌশল যা প্রকৃতপক্ষে ভূমি দখলকারী ভাঙচুরকারীদের একটি অস্থায়ী ‘মন্দির’ নির্মাণের অনুমতি দেয়, যেখানে শুধুমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য নির্দেশিত হয় কার্ফু। ৪৬২ বছরের একটি স্মৃতিস্তম্ভকে উৎখাত করা এই অস্থায়ী নির্মাণ হঠাৎ একটি ‘বিতর্কিত কাঠামো’ থেকে ‘সংরক্ষণযোগ্য’ নির্মাণে উত্তীর্ণ হয়। এই সমস্ত ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে বিজেপির ভাষ্য কখনও সাময়িক ক্ষমা প্রার্থনা আবার কখনও অত্যন্ত মারমুখী আত্মপক্ষসমর্থনের মধ্যে অদল-বদল হতে থাকে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতারা প্রকাশ্যে ভারতীয় সংবিধানকে ‘হিন্দু বিরোধী’ আখ্যা দেয়।
আক্রমণের পরিধি সম্প্রসারণ
হিন্দুত্ব অ্যাজেন্ডার আক্রমণের পরিধি ক্রমশ চিরাচরিতভাবে সাম্প্রদায়িক মুসলিম জনগোষ্ঠী ছাড়িয়ে আরও বৃহত্তর, বিস্তৃত রূপ নেয়। রাজনৈতিক ভিন্নমতের বৃহত্তর বৃত্তকে আতঙ্কিত করার প্রচেষ্টা তীব্রতর হয়। এই বিষয়টি সম্ভবত বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে হিটলার এবং নাৎসিবাদের যথোচিত তুলনা অবধারিত ভাবেই উঠে আসবে– যেখানে এই আক্রমণ ক্রমশ ইহুদি ধর্মাবলম্বী ও কমিউনিস্টদের থেকে প্রসারিত হয়ে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, উদারপন্থী (লিবেরাল), ক্যাথলিক সহ প্রত্যেক সাহসী, স্বাধীন চিন্তক মানুষের উপর নেমে এসেছিল। এমনকি ১৯৩৪-এর জুন মাসে কিছু নাৎসি প্যারামিলিটারি সংগঠনের নেতাদের উপরেও এই আক্রমণ নেমে আসে, যাদের খুনের ঘটনা ‘নাইট অফ দ্য লঙ্গ নাইফস’ নামে কুখ্যাত। রাম-জন্মভূমি আন্দোলনের সঙ্গে আপাত সম্পর্কহীন মধ্যপ্রদেশের দুটি ঘটনার মধ্য দিয়ে বিজেপির প্রকাশ্য সন্ত্রাসের সূচনা হয়েছিল– ১৯৯১ সালের শরতে বিভিন্ন অভিনব কর্মসূচির জন্য খ্যাত এবং অসম্ভব দক্ষ শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহনিয়োগীর হত্যা এবং সম্প্রতি বিশিষ্ট প্রগতিশীল অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী বি. ডি. শর্মার জনসমক্ষে অপমান ( যদিও ১৯৭০-এর দশকে বোম্বের এক সময়ের শক্তিশালী বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে স্ট্রিট ভায়োলেন্সের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা অনেক আগেই এই পথ দেখিয়েছিল)। তাই ৬ ডিসেম্বরের সাংবাদিকদের মারধরের ঘটনা নিছক কোনও বিচ্যুতি বা বিকৃতি নয়, বরং আক্রমণের পরিধি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা এক নতুন প্রবণতার অংশ। সাম্প্রতিককাল অবধিও হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি একনিষ্ঠভাবে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আদর্শগত সংযোগ গড়ে তুলতে সফল হয়েছে। তবে চিরাচরিত ফ্যাসিস্টসুলভ কায়দায় তারা আদর্শগত সম্মতি উৎপাদনের সঙ্গে ক্ষেত্রবিশেষে জবরদস্তি সম্মতি ছিনিয়ে নিতেও সমান স্বচ্ছন্দ।
দিল্লিতে ডিসেম্বরের দাঙ্গার প্রভাব তুলনামূলকভাবে আকারে ছোটো এবং বিক্ষিপ্তভাবে কিছু এলাকায় এর পরিসর সীমাবদ্ধ ছিল।১ সেই দিল্লিতেই সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু অনুরূপ প্রতিবেদিত ঘটনায় সহিংস স্ট্রিট ভায়োলেন্সের সঙ্গে প্রশাসনিক যোগসাজশের চিত্র আবারও পরিষ্কার হয়ে যায়। দাঙ্গা বিরোধী সক্রিয় কর্মীদের শান্তির পক্ষে গান গাওয়া, সম্প্রীতির আহ্বান জানিয়ে লিফলেট বিতরণের মতো নিরীহ কাজ কিংবা পথনাটিকা মঞ্চস্থ করার উপর বারবার আক্রমণ করা হয়েছে যা কেন্দ্রীয় সরকারের নাকের ডগায় ঘটেছে যারা নাকি আপাতভাবে আরএসএস, ভিএইচপি, বজরং দলকে নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, আক্রমণের পদ্ধতির মধ্যেও রয়েছে সেই যোগসাজশের ইঙ্গিত : পুলিশ আসে গোলমাল ঘটার একটু পরে, অপাতভাবে নিষিদ্ধ আরএসএস-বজরং দলের দাঙ্গাবাজদের উপেক্ষা করে, অথচ সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দলগুলির কপালে জোটে হয় গ্রেপ্তারি অথবা পুলিশি হয়রানি। এমনকি পি. এন. হাকসার, হাবিব তানভীরের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নেতৃত্বে একটি শান্তি মিছিলেও পুলিশ বাধা দেয়। ‘রাম’ দিয়ে নাম শুরু এমন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দলের ছাত্রকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে, থাপ্পড় মেরে নিদান দেয় যে এই নাম নিয়ে এই ধরনের (সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী প্রচার) কাজ করা উচিত নয়।
প্রায়ই বজরং দলের গুণ্ডারা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে থাকে যে, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সমালোচনাকারীদের পাকিস্তানে যেতে হবে। পূর্ব দিল্লির সিলামপুরের কার্ফু জারি হওয়া মুসলিম জনবসতিপূর্ণ কিছু এলাকায় পুলিশ সমস্ত মুসলিম পুরুষদের ঘিরে রেখে তাদের ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য করে। রাজি না হওয়া পর্যন্ত চলে মারধর, এমনকি এক মুসলিম ভদ্রলোকের দাড়ি টেনে চলে নিগ্রহ।
মিথের সাধারণ বোধ হিসেবে উত্তরণ
স্পষ্টতই, এই সব কিছু সম্ভব হবার নেপথ্যে রয়েছে এক বৃহত্তর জনতার সম্মতির পরিসর। যদিও এই পরিসর কোনোভাবেই সর্বজনীন নয় এবং নিশ্চিতভাবে এখনও এক বিশাল সংখ্যক মানুষ মূলগতভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী। এই অসংখ্য মানুষ দাঙ্গার সংস্কৃতিকে আন্তরিকভাবে ধিক্কার জানালেও দাঙ্গায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এক অদ্ভুত ধরণের দাঙ্গামুখী সর্বসম্মতি কাজ করে যেখানে অনুমান এবং মিথের এক বিশাল ভাণ্ডার ক্রমে সাধারণ বোধের রূপ নিয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ততা কিংবা সমবেত জনমোহিনী ইচ্ছের অবধারিত ফলাফল হিসেবে নয়, বরং ‘খাঁটি হিন্দু ভাবাবেগে আঘাতের’ সূত্রে নির্মিত এই বৃহত্তর জনসম্মতির পিছনে আছে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং যত্নসহকারে লালিত-পালিত হিন্দুত্ব অ্যাজেন্ডার নির্মাণ। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আরএসএস, ১৯৫০-এর দশক থেকে বহু অনুষঙ্গী সংগঠন তৈরি করতে শুরু করে (যার মধ্যে জনসংঘ/বিজেপি এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ) যার গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের স্তরে উঠে আসে আর এস এসের সক্রিয় কর্মীদের একাংশ। মনে রাখা প্রয়োজন, এই সংগঠন বিস্তারের পিছনে রয়েছে বহু বছরের নিষ্ঠা এবং অপ্রত্যাশিত ধীর লয়ে, শ্লথ গতিতে তৈরি করা সাংস্কৃতিক মতাদর্শের ভিত। আর এস এসের শাখাগুলি যুবকদের শারীরিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে ‘বৌদ্ধিক’ চর্চার সংযুক্তির মাধ্যমে মতাদর্শদীক্ষার পাঠ কার্যকর করে তোলে। তৈরি হয় একের পর এক স্কুল। ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং কথোপকথনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হতে থাকে মতাদর্শগত ধারণা। এমনকি একটি খুব জনপ্রিয় হিন্দু কমিক সিরিজও বই আকারে প্রকাশ করা হয় (অমর চিত্রকথা: হিন্দু পৌরাণিক অথবা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, কাহিনীর বন্দনাসূচক আখ্যান)। এই দীর্ঘ মতাদর্শগত নির্মাণ তৈরির প্রেক্ষাপটে রয়েছে প্রায় গ্রামশিয় (অ্যান্তনিও গ্রামশি-র হেজিমনির তত্ত্ব) পদ্ধতিতে, সুচারুভাবে সমাজের আণবিক স্তরে আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার আখ্যান। ১৯৮০-এর দশকের প্রথম এবং মাঝামাঝি নাগাদ ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির মূলমঞ্চে ‘হিন্দু কার্ড’ আবির্ভূত হয় ইন্দিরা এবং রাজীব গান্ধির বদান্যতায়। শুরু হল রাষ্ট্র ব্যবস্থা কর্তৃক সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি যা ভয়ংকর মাত্রায় উত্তীর্ণ হয় ১৯৮৪-এর শিখ বিরোধী দাঙ্গা এবং পরবর্তীকালে দোষীদের ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনায়। ক্রমে ব্যাপক দুর্নীতির প্রকোপে আইনের শাসন ভাঙতে থাকে দ্রুত। এ সবই সরাসরি সংঘ পরিবারের রাম জন্মভূমি সংক্রান্ত আচমকা অভ্যুত্থানের (Blitzkrieg) ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে, যা এখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। একথা ভুললে চলবে না যে কংগ্রেস সরকারের আমলেই রামায়ণ মহাকাব্য একটি ছদ্ম-জাতীয়তাবাদী টিভি সিরিয়ালে রূপ পায়, এবং ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে, পূর্বতন কংগ্রেস শাসনামলের এক গোপন প্রশাসনিক আঁতাতের মাধ্যমে ১৯৮৬ সালে বাবরি মসজিদের ভিতরে গোপনে ‘স্থাপিত’ মূর্তিগুলির পূজা করার অনুমতি মেলে।
এখন সংঘ পরিবারের সামাজিক প্রভাব বিস্তারের এই সংঘর্ষ এক নাটকীয়, অতিরঞ্জিত আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। প্রভাব বিস্তারের প্রয়োজনে এমন ব্যাপক মাত্রায় বিপুল পুঁজির বিনিয়োগ, বিজ্ঞাপনের আধুনিক কৃৎকৌশল এবং দৃশ্য-শ্রাব্য প্রযুক্তির ব্যবহার এই উপমহাদেশে আগে কখনও দেখা যায়নি। প্রসঙ্গত, এই বিষয়ে হিটলারের অগ্রণী ভূমিকার কথা মনে রাখতে হবে। লাউডস্পিকার এবং রেডিওর মতো সেই সময়ের অপেক্ষাকৃত নতুন গণমাধ্যমের প্রযুক্তিগত কৌশলকে ব্যবহার করে হিটলার ও তার পার্টি যথাযথভাবে নাৎসি প্রোপাগান্ডার বিস্তারের কাজ সম্পন্ন করেছিল।২
ফ্যাসিবাদ, রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে উত্থানের এক দশক বা তারও কম সময়ের মধ্যে ইতালি এবং জার্মানিতে ক্ষমতায় এসেছিল। অন্যদিকে হিন্দুত্বের উত্থানের নেপথ্যে আছে এক দীর্ঘ ক্রমবিকাশের পর্যায় যা নিঃসন্দেহে তাকে অতিরিক্ত শক্তি ও স্থিতিশীলতা দিয়েছে, দিয়েছে জনচেতনায় আত্তীকৃত হবার পর্যাপ্ত সময়। আশার কথা এই যে বহু দশক ধরে চলতে থাকা ভয়ংকর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এর পক্ষে সম্পূর্ণ জনমানসের হৃদয় ও মন জয় করা এখনও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। মনে রাখতে হবে, ১৯৯১ সালেও প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে চার জন ভারতীয়ই বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন (বিজেপির সর্বভারতীয় ভোট শতাংশ ছিল ২১.৯ % )। যদি ধরেও নেওয়া যায় যে এই ভোটের মূল ইস্যু ছিল ‘রাম’, সেক্ষত্রে উত্তর প্রদেশে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ব্যাখ্যা হতে পারে রাম মন্দির নির্মাণের পক্ষে জনগণের রায়। এর অর্থ কখনোই এই নয় যে, এই জনমত মসজিদ ধ্বংসের পক্ষে। কারণ সংঘ পরিবারের প্রকৃত সামাজিক ভিত্তি প্রধানত হিন্দিবলয়ের ছোটো শহর, মফস্বলের উচ্চবর্ণের ব্যবসায়ী-পেশাদার এবং পেটি-বুর্জোয়াদের মধ্যেই নিহিত ছিল। ক্রমে এই সংযোগ সম্প্রসারিত হতে থাকে গ্রামাঞ্চলের উচ্চ সামাজিক শ্রেণির জমিদার গোষ্ঠীগুলির মধ্যে। এর বাইরের বৃত্তে এই সম্প্রসারণের প্রভাব আপাতত সীমিত। মন্ডল কমিশন সংক্রান্ত বিতর্ক-বিরোধ এবং বিহারের সাম্প্রতিক ঘটনায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমাজের বৃহত্তর বৃত্তে হিন্দুত্বের সম্প্রসারণের মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবিরাম উত্তেজনা, উচ্চকিত গণহিস্টিরিয়া ও সাম্প্রদায়িক হিংসাজনিত উদ্দীপনার নিরন্তর জোগান, যা আজকের এই ফুলে ফেঁপে ওঠা ‘হিন্দুত্বের’ কাঠামোর ভীষণভাবে প্রয়োজন। সম্ভবত সেই কারণেই জনগণ দীর্ঘ সময় ধরে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা মন্ত্রীসভা গঠনের পক্ষে রায় দেওয়ার ঝুঁকি নেয়নি। কংগ্রেসের শাসনকালের তুলনায় খুব খারাপ না হলেও বিজেপির কার্যক্রমের ধারা যে বেশ কিছুটা ‘ভিন্নধর্মী’ সেই আশঙ্কা ছিল যথেষ্ট।
একটি প্রাথমিক অন্তর্দৃষ্টিমূলক বিশ্লেষণ ফ্যাসিবাদকে “শুধু বড়ো পুঁজির ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়ক এক হাতিয়ার নয়, বরং একইসঙ্গে … পেটি-বুর্জোয়াদের একটি রহস্যময় উত্থানেরও উপকরণ” হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল।৩ রাম নামের স্লোগান ঘিরে যে এক নিগূঢ়, রহস্যময় উত্থান ঘটেছে তা অনস্বীকার্য এবং এর ব্যয়বহুল, জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারব্যবস্থা অর্থের প্রাচুর্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। অবশ্য ফ্যাসিবাদের সঙ্গে পুঁজিবাদী স্বার্থের সুনির্দিষ্ট যোগসূত্রের বিশ্লেষণ ইউরোপের কাছে এখনও একটি বিতর্কিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। অধিকাংশ ইতিহাসবিদ্ মনে করেন ফ্যাসিবাদ আলোচনা প্রসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পুঁজির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির মধ্যে নির্দিষ্ট তফাৎ করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, তুলনামূলকভাবে অনুন্নত ইতালির আর্থসামাজিক পরিস্থিতি শিল্পোন্নত জার্মানির থেকে বেশ মৌলিকভাবে ভিন্ন। ফ্যাসিবাদের সঙ্গে পুঁজিবাদী স্বার্থের সরাসরি নির্দিষ্ট অভিসন্ধিগত যোগ (এক্ষেত্রে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়) ছিল নাকি এই সম্পর্কের বিন্যাস গঠিত হয়েছে উদ্ভূত পরিস্থিতির অভিযোজনের সূত্রে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।৪ পুঁজিবাদী স্বার্থের সামনে সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণি বা আপাতদৃষ্টিতে আসন্ন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মতো কোনও বড়ো বিপদ না থাকায় ভারতীয় পরিস্থিতি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। অর্থনৈতিক সংকটের বিস্তৃতি এবং তার চরিত্রও ইউরোপের সঙ্গে খুব একটা তুলনীয় নয়। অর্থনৈতিক মন্দা-পরবর্তী জার্মানিতে, নাৎসিবাদ বস্তুতই অনেক বাণিজ্য গোষ্ঠীর কাছে “পুঁজিবাদী ব্যবস্থা রক্ষার সর্বশেষ উপলব্ধ উপায় হিসাবে” উপস্থিত হয়েছিল৫, অন্যদিকে ইতালিতে ফ্যাসিবাদ উত্থানের নেপথ্যে ছিল এক আপাত জনবিরোধী ‘পরোক্ষ বিপ্লবের’ ক্রমবিকাশের পর্যায়, গ্রামশি ফ্যাসিস্ট কারাগারে রুদ্ধ থেকেও যার বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এই দুইয়ের কোনও বৈশিষ্ট্যই এখনও পর্যন্ত ভারতে সুস্পষ্ট নয়, যেখানে নরসিমা রাও এক ধরণের দৃঢ় সংকল্প এবং দক্ষতার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক নীতির ব্যাপক পরিবর্তন আনছেন যা স্পষ্টতই তাঁর অযোধ্যা ইস্যু সামলানোর মধ্যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। জনসংঘ এবং বিজেপি বহু বছর ধরে নেহরুভিয়ান স্বনির্ভরতা এবং পরিকল্পনার জাতীয় উত্তরাধিকার প্রত্যাখ্যানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে চলেছে একথা ঠিক। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী শক্তি, যাদের কার্যপ্রণালী এবং প্রোপ্যাগান্ডা এখনও মূলত অর্থনৈতিক আলোচনা বিমুখ, তারা কোনোভাবেই এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কৃতিত্ব নেওয়ার জায়গায় নেই। তবে মনমোহন সিংয়ের নতুন অর্থনৈতিক নীতিকে সমর্থনকারী ভারতীয় বাণিজ্য গোষ্ঠীগুলির পক্ষে (যদিও সমগ্র পুঁজিপতি শ্রেণি নয়) একটি হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী শাসনকে সমর্থন জানানো অসম্ভব নয়। কারণ এই মুহূর্তে সংসদে বাম ভোটের উপর সামান্যতম নির্ভরশীল না হয়েও হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব এবং এই শাসকশ্রেণির কঠোর শ্রমিক-বিরোধী অবস্থান আদতে বাণিজ্য গোষ্ঠীগুলির জন্য উপযোগী। অন্যদিকে, যদি কোনোভাবে হিন্দুত্বের ফ্যাসিবাদী চরিত্র দৃঢ় প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়, তবে চিরাচরিত মধ্যপন্থী রাজনৈতিক বিকল্প শাসনতন্ত্র বুর্জোয়া গোষ্ঠীগুলির জন্য বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে হতে পারে, কারণ পুঁজিবাদ এবং উদ্ভুত মুনাফা বজায় রাখার স্বার্থে ফ্যাসিবাদের ‘প্রয়োজন’ আন্তঃযুদ্ধকালীন ইতালি এবং জার্মানির তুলনায় এখনকার ভারতে অনেক কম।
আত্মঘাতী রাজনৈতিক দোলাচল
এই প্রেক্ষিতেই, ৬ ডিসেম্বরের ঘটনার আগে এবং পরবর্তীকালে কংগ্রেস পার্টির, বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর দোলাচলের রাজনীতি (পড়ুন যথার্থ পক্ষ না নেওয়ার রাজনীতি) সর্বার্থেই আত্মঘাতী। এমনকি সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের নিরিখেও সমানভাবে বিপর্যয়কর। ৬ তারিখের ঐ বর্বরোচিত ঘটনার ঠিক পরে তা সামাল দেওয়ার এক সম্ভাবনা ছিল। বহুল-উদ্ধৃত বাজপেয়ীর সাক্ষাৎকারে স্পষ্টতই কিছুদিনের জন্য বিজেপির বাধ্যতামূলক রক্ষণাত্মক অবস্থান নেবার ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু ঘটনা পরম্পরা সামলাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন নরসিমা রাও। এক সাংবাদিকের ভাষায়, সেই সময় তিনি ‘জয়ের মুখ থেকে পরাজয় ছিনিয়ে নেবার’ মতন ভুল পদক্ষেপ নেন। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সার্বিক কোনও রাজনৈতিক প্রচারাভিযান ছাড়াই দাঙ্গা বন্ধ করার জন্য তিনি অত্যন্ত বিক্ষিপ্ত, অবাস্তব এবং দৃশ্যতই নিষ্ক্রিয় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ঘটনাচক্রে কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রচারের অভিমুখ বিজেপির সঙ্গে (‘হিন্দু কার্ড’) প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতায় মোড় নেয়। নীতি-আদর্শ ব্যতিরেকে, এমনকি বাস্তববাদী রাজনীতির নিরিখেও এটা স্পষ্ট যে এই ‘প্রতিযোগিতা’য় যারা আরও দৃঢ়, অবিচল, বুনিয়াদী স্তরে সংগঠিত, তারাই এই খেলা জিতবে। দিল্লির প্রথম সারির দৈনিক সংবাদপত্রগুলির ক্রমপরিবর্তিত ভূমিকাও এক্ষেত্রে উল্লেখ্য।৬ ডিসেম্বরের ঘটনার অব্যবহিত পর থেকে বিজেপির ভূমিকার স্পষ্ট নিন্দা থেকে সরে এসে যেভাবে ভাষ্য পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে এক অস্পষ্ট মতাদর্শতগত সমর্থনের রূপ নিয়েছে, তা এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বিপজ্জনক পূর্বাভাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে ।
যে নেতারা নিঃসন্দেহে তাঁদের মূল নীতিগত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখেছেন, এমনকি তাঁরাও যে সুবিধাবাদের এই স্তরে নামতে পারেন তা আমাদের বর্তমান ট্র্যাজেডির কেন্দ্রবিন্দু নির্দেশ করে যা আমার আলোচনায় আমি উপস্থাপিত করার চেষ্টা করছি– নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে এক বিশাল জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার জনসম্মতি উৎপাদন। এই সাধারণ জনসম্মতি, যার বর্তমান চরিত্র অনুযায়ী একে ভারতীয় বৈশিষ্ট্যের ফ্যাসিবাদ বলা যেতে পারে, তার বিভিন্ন উপাদানগুলির বিশ্লেষণ-সহ-সমালোচনা নিঃসন্দেহে যে কোনও কার্যকর প্রতিরোধের জন্য আশু প্রয়োজন।
ইতিপূর্বে ইউরোপে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ বিভিন্ন খণ্ডিত আধুনিক দর্শনের সঙ্গে অত্যন্ত স্থূল প্রকৃতির জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ কিংবা জার্মানিতে ইহুদি-বিরোধী কুসংস্কারগুলিকে একত্রিত করছিল। এনলাইটেনমেন্টের ‘নিষ্ফলা’ দৃঢ় যুক্তিবাদের কাঠামো থেকে দূরে সরে গিয়ে শতাব্দীর এক মোড় ঘোরানোর চালিকাশক্তি হিসেবেই শুধু এই মতাদর্শের প্রাসঙ্গিকতা সীমিত থাকে না বরং এই সময়ে এর গুরুত্ব আরও গভীরে প্রবেশ করেছে। ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের এই ধারণা এখন পশ্চিমের দেশগুলির বৌদ্ধিক নির্মাণের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারতীয় শিক্ষা সংস্কৃতিতেও ছড়িয়ে পড়েছে ক্রমশ। সংঘ পরিবারের মতাদর্শীরা (একজন গিরিলাল জৈন বা একজন স্বপন দাশগুপ্ত বাদে) নিজেরাই হয়তো উত্তর-আধুনিকতার বিভিন্ন সম্ভাবনা সম্পর্কে এখনও সম্পূর্ণ অবগত নন। কিন্তু বর্তমান অ্যাকাডেমিয়ার গতিপ্রকৃতি থেকে একথা স্পষ্ট যে ‘হিন্দুত্ব’-এর ধারণার প্রতি বুদ্ধিজীবীরা অত্যন্ত আকৃষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, এডওয়ার্ড সাইদের ‘প্রাচ্যবাদ’ (‘Orientalism’) দ্বারা অনুপ্রাণিত “critique of colonial discourse” স্বদেশিবাদের সেই ধাঁচগুলিকে তুলে আনে যা প্রকৃতপক্ষে সংঘ পরিবারের চিরাচরিত যুক্তিরই অনুরূপ। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য সাভারকারীয় ‘স্বদেশি’ নির্মাণ, যার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল ‘হিন্দুত্ব’ তার ‘তথাকথিত’ নিজস্ব ‘স্বদেশি’ (অথবা ‘প্রাচীন’ বা ‘আদিবাসী’ শব্দটিও প্রয়োগ করা যেতে পারে) উৎসের নিরিখে, ইসলাম এবং খ্রিস্টধর্মের চেয়ে উচ্চতর অবস্থানে অধিষ্ঠিত (এবং এর সম্প্রসারণ হিসেবে বিজ্ঞান, গণতন্ত্র বা মার্ক্সবাদের মতো পাশ্চাত্যের আধুনিক সৃষ্টির চেয়েও উচ্চাসনে আসীন)। ‘জনমোহিনী’ অথবা ‘সাবঅলটার্ন’-জাত এই একটি ঐশ্বরিক নির্মাণ যখন এনলাইটেনমেন্টের যুক্তিবাদ (যে জ্ঞানকে ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাব হিসেবে চিরকলঙ্কিত করা হয়েছে) বিরোধিতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, তখন তা প্রগতিশীল এমনকি র্যাডিক্যাল ঐতিহাসিকদেরও বিপথগামী করতে সক্ষম। এই সূত্রে, মনে রাখতে হবে জিওভান্নি জেন্তিলের ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞায়ন– “দৃষ্টবাদের (বিজ্ঞানবাদ) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ” কিংবা ১৯৩৩ সালে মুসোলিনির “১৮ শতকের দূরদর্শী, বিশ্বকোষবাদীদের আন্দোলন” (movement of the 18th century visionaries and Encyclopaedists) এবং “প্রগতির প্রযুক্তিগত ধারণা” প্রত্যাখ্যানের ঘটনা। দুর্ভাগ্যক্রমে, ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসে মুসোলিনির আর-একটি অপপ্রচারও সমভাবে প্রাসঙ্গিক, যেখানে সে “জাতির জন্য ক্ষতিকর বুদ্ধিবৃত্তিক এবং অকার্যকর বুদ্ধিজীবীদের” খতম করার আহ্বান জানায়। পরের বছর নুরেমবার্গ নাৎসি কংগ্রেসে হিটলার একইভাবে “চুল-চেরা, সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা”-র বিপরীতে জার্মান জনগণের “অভ্যন্তরীণ স্বর”, “হৃদয়” এবং “বিশ্বাস”-কে মহিমান্বিত করে উচ্চাসনে বসানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।৭
‘শত্রু’ চিহ্নিতকরণ ও নির্মাণ
এই ধাঁচের প্রচেষ্টা থেকে আপাতত দূরে থাকলেও, হিন্দুত্বের (অথবা ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রে) জনচেতনা প্রসারের কেন্দ্রে রয়েছে একটি শক্তিশালী এবং ক্রমবর্ধনশীল শত্রু চিহ্নিতকরণ ও নির্বাচন প্রক্রিয়া। বলাই বাহুল্য এই শত্রুর ইমেজ তৈরির নেপথ্যে আছে প্রাচীন কুসংস্কারের খণ্ডাংশের সঙ্গে নব্য পশ্চাদ্মুখী চিন্তাভাবনার সংমিশ্রণে উৎপাদিত ‘সত্য’ (পোস্ট-truth) এবং তাকে পুরোনো ‘বিশ্বাস’ হিসেবে উপস্থাপনা। রয়েছে মিডিয়ার অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এই সমস্ত খণ্ডিত নির্মাণের কার্যকরী সম্প্রচার। সমসাময়িক শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদে কালো চামড়ার মানুষ (আরও সাধারণভাবে অভিবাসীবৃন্দ যাদের বিভিন্ন কারণে নিকৃষ্ট বলে মনে করা হয়) কিংবা নাৎসি জার্মানিতে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের মতো ‘শত্রু নির্বাচনের’ অবিকল সমতুল্য হয়ে ওঠেন এখানকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। নাৎসি প্রোপাগান্ডায় ইহুদিদের মতো ভারতে মুসলমানরা অযৌক্তিক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে এমন ধারণা প্রচার করা হয়। এই অভিযোগ যে শুধু মিথ্যা তাই নয়, নাৎসি জার্মানির তথাকথিত ‘কুযুক্তি’-র চেয়েও বেশি অযৌক্তিক, যেখানে ইহুদিরা বুদ্ধিবৃত্তিক, পেশাদার এবং ব্যবসায়িক বৃত্তে মোটামুটি বিশিষ্টভাবে সফল ছিল। অন্যদিকে, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সমাজের বিভিন্ন পেশার অভিজাত স্তরে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব চূড়ান্তভাবে অনুপস্থিত, তা সে যে অর্থেই ‘অভিজাত’ বা ‘এলিট’ শব্দকে সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন। দ্বিতীয়ত, ভারতে মুসলিমদের এই ‘তথাকথিত’ সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়ার নেপথ্যে আছে ‘ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের’ (‘সিউডো-সেকুলার’) মুসলিম ‘তোষণ’– এই প্রচারের সর্বগ্রাসী প্রভাবে সাম্প্রদায়িক আক্রমণের লক্ষ্য ক্রমে বড়ো হতে থাকে; বিবিধ ঘটনার মধ্যে মুলায়ম সিং যাদবের উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে যিনি ‘হিন্দুত্বের’ ভাষ্যে হয়ে ওঠেন ‘মোল্লা’। সাম্প্রতিককালে ‘মুসলিম তোষণ’ হিসেবে দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের বহুল প্রচারিত দুটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল (১) ‘ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী’ কর্তৃক (অনুমানানুসারে) কাশ্মীরে মন্দির ধ্বংসের নিন্দা না করা এবং (২) মুসলিম ব্যক্তিগত আইন যা কার্যত বহুবিবাহের অনুমতি দেয়, তার বিলোপ না ঘটানো।
হিন্দু বা মুসলিম যে কোনও ধর্ম বা গোষ্ঠী কর্তৃক সংগঠিত অবৈধ লঙ্ঘনের অবশ্যই নিন্দা করা উচিত। কিন্তু এ এক অদ্ভুত নিন্দা যা ৬ ডিসেম্বরের ঐ বর্বরোচিত, নির্লজ্জ ঘটনার ন্যায্যতা দাবি করে! স্বাভাবিকভাবেই দাঙ্গায় (উদাহরণস্বরূপ ভাগলপুরে) যে অজস্র মুসলিম ধর্মীয় স্থান ধ্বংস হয় তার কোনও উল্লেখ থাকে না এই নিন্দাপ্রস্তাবের ঘোষণায়। ঘটনাচক্রে, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের অনতিবিলম্বেই কাশ্মীরে মন্দির ভাঙার ইস্যু উল্লেখযোগ্যভাবে তর্ক-বিতর্ক-কথোপকথনে উঠে আসতে থাকে। এরও নেপথ্যে রয়েছে পরিকল্পিত সতর্ক-নিবিড় প্রচার এবং সম্ভবত বাবরি মসজিদ ভাঙার অপরাধ থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায়। মুসলিমদের তাদের অতীত বা বর্তমান ‘আগ্রাসনের’ জন্য অনুতপ্ত অথবা প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে– প্রায়শই উল্লিখিত এই ‘(কু)যুক্তি’ ইতিমধ্যে বোম্বেতে (কিছু বর্তমান প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে) একটি অদ্ভুত বাঁক নিয়েছে। মুসলিমদের দেওয়া ধ্বংস হওয়া মন্দির পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব শিবসেনা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ধারাভিতে মন্দির পুনর্নির্মাণে নিয়োজিত এমন একটি দলের একজনকে সম্প্রতি ছুরি মারা হয়েছে (পায়োনিয়ার পত্রিকা, ৯ জানুয়ারি)।
রাজীব গান্ধি একসময় ভারসাম্য রক্ষার রাজনীতির বশবর্তী হয়ে, মুসলিম মহিলা বিল (শাহ বানো কেস, ১৯৮৫) পাশ করানো সংক্রান্ত বিরোধ সামলাতে ব্যর্থ হয়ে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের দরজা খুলে দেন হিন্দুদের পুজোর জন্য (যেখানে আগেই গোপনে রামের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল)। এই মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের (Muslim Personal Law) ইস্যুতে, সংঘ পরিবার পুনরায় রাজীব গান্ধির অপকর্মের পূর্ণ সুবিধা নেয়। তথাকথিত ‘মুসলিম মৌলবাদী’-দের তোষণের (যার একমাত্র প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী ছিলেন মুসলিম নারী) কথা উল্লিখিত হতে থাকে অবিরাম, কিন্তু পাশাপাশি পরিকল্পনামাফিক অনুচ্চারিত থেকে যায় হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার যুগপৎ তোষণ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এটি আমাদের ‘হিন্দুত্ব’ মতাদর্শের পূর্বকল্পিত জড় ধারণা ও বর্ণবাদের কথা মনে করায়। মুসলিমদের মধ্যে বহুবিবাহের আইনি অধিকারকে ক্রমাগত এই অভিমতের সঙ্গে যুক্ত করানো হতে থাকে যে মুসলমানরা এই আইনের বলে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে: যেমন দিল্লি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা (বর্তমানে বিজেপি সাংসদ) বি এল শর্মা ১৯৯১ সালে আমাদের একটি দলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এটিকে ‘সুন্দর’ভাবে বর্ণনা করেছেন, “হাম পাঁচ হামারে পচিস”। দ্য রিপোর্ট অন দ্য স্ট্যাটাস অফ উইমেন ইন ইন্ডিয়া (১৯৭৫)-র তথ্য অনুযায়ী অবশ্য দেখা যাচ্ছে মুসলিমদের (৪.৩১ %) তুলনায় হিন্দুদের মধ্যে বহুবিবাহের হার প্রকৃতপক্ষে বেশি (৫.০৬ % )। অর্থাৎ মুসলিমরা জন্ম, বংশবৃদ্ধি– এমনকি মৃত্যুর মতো স্বাভাবিক, মৌলিক জৈবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে! মনে পড়ে, ১৯৯১ সালে নয়াদিল্লিতে নিজামুদ্দিন দাঙ্গার তদন্তের সময় আমরা শুনেছিলাম যে এক হিন্দুর মৃত্যুর পর স্বয়ংক্রিয় দাহের বিপরীতে একজন মৃত মুসলমান দাফনের সময় সর্বদা কিছু জমি দখল করে। এই বর্ণবাদী মনোভাব আরও দক্ষতার সঙ্গে সংক্ষেপিত হয়েছে অতি সাম্প্রতিক ‘বাবর কি আউলাদ’ কয়েনেজের মাধ্যমে। কোনও প্রকাশ্য অপকর্মের প্রয়োজন ছাড়াই, শুধুমাত্র বাবরের ‘তথাকথিত’ বংশোদ্ভূত হওয়াই অভিশপ্ত হবার জন্য যথেষ্ট; ঠিক যেমন একসময় ধর্মান্ধ খ্রিস্টান পরিসরে সমস্ত ইহুদিরা খ্রিষ্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময় তাদের পূর্বপুরুষদের ভূমিকার জন্য নিন্দিত হত।
এমনই নৃশংসতার সঙ্গে ‘হিন্দুত্বের’ মতাদর্শ সরাসরি সাম্প্রদায়িক হিংসার পক্ষে যুক্তি খাড়া করে। এর সঙ্গে এই মতাদর্শের সামান্য ‘নরমপন্থী’ বা বিভিন্ন ছদ্মস্তরগুলিও বিবেচ্য যা হিন্দু রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী প্রভাবগুলি খুব স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। বৃহত্তর সামাজিক বৃত্তে পৌঁছানোর তাগিদে ফ্যাসিবাদ প্রায়ই সমাজের নানা প্রশংসনীয়, প্রগতিশীল উপাদান সংগ্রহ করে নিজেদের প্রচারাভিযানে সম্পৃক্ত করে এসেছে। ভার্সাই-চুক্তি পরবর্তী জার্মানিতে নাৎসিরা শুধুমাত্র নিজেদের জাতীয়তাবাদী হিসেবেই তুলে ধরেনি বরং ওয়াইমার রিপাবলিকের অত্যন্ত শক্তিশালী শ্রমিক শ্রেণির উপস্থিতির কথা মাথায় রেখে নিজেদের ‘সমাজতন্ত্রী’ কিংবা ‘শ্রমিকের প্রতিনিধি’ হিসেবে নিজেদের ছদ্ম পরিচয় গড়ে তুলতেও পিছপা হয়নি। সংঘ পরিবারও ঠিক একই কায়দায় নিজেদের এক অনন্য ‘জাতীয়তাবাদী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে চলেছে। এর নেপথ্যে সাজানো হয়েছে এই ‘গণতান্ত্রিক’ অপব্যাখ্যা যে ভারতে হিন্দু-স্বার্থ সবসময় প্রাধান্য পাওয়া উচিত এবং কোনও এক পর্যায়ে ভারতকে হিন্দু-রাষ্ট্র ঘোষণা করা উচিত কারণ আদমশুমারি অনুসারে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ (জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ হিসাবে)। কিন্তু যৌক্তিকভাবে গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ছাড়াও আরও দুটি বৈশিষ্ট্যকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়– সংখ্যালঘুদের জীবন ও মতামতের অধিকারের সুরক্ষা, ও আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, বর্তমান রাজনৈতিক সংখ্যালঘুদের ভবিষ্যতে নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের আইনি সম্ভাবনার পরিসর তৈরি এবং যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সেই ক্ষমতার হস্তান্তর হয় সেই প্রক্রিয়ার সফল সম্পাদনা। অন্যথায় হিটলার, মুসোলিনির (বা স্ট্যালিনের) একদলীয় শাসনব্যবস্থাকেও গণতন্ত্র হিসেবে (অপ)ব্যাখ্যা করা যাবে কারণ এরা প্রত্যেকেই এক সময় একক তালিকার ‘গণভোট’ ধাঁচের নির্বাচনে অংশ নিয়ে, হয়তো কারচুপি ছাড়াই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। অন্যভাষায় বলতে গেলে, গণতান্ত্রিক তত্ত্ব, স্থায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠের যে কোনও ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে। সংঘ পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, যে বিজেপি নিজেদের কেবলমাত্র ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের পার্টি বলে পরিচয় দেয় তারা নাকি গণতন্ত্রের পক্ষের অবস্থান নেবে! এ এক অদ্ভুত পরস্পরবিরোধীতা। তারই সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতির ভাষ্যের মূল কাঠামোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে তাদের দ্বিতীয় ঘোষণা– একমাত্র তারাই ‘প্রকৃত’ হিন্দু (পড়ুন ‘খাঁটি হিন্দু’) যারা আর এস এস-বিজেপি-বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতৃত্ব মেনে নেবেন। প্রোপাগান্ডার এমন অবিকল সমতুলতা ফ্যাসিবাদের স্মরণ করাতে বাধ্য। ফ্যাসিবাদী কাঠামোর আর-এক বৈশিষ্ট্য হল যেকোনও স্বাধীন ভিন্নমতকে ছদ্ম-ধর্ম নিরপেক্ষ (সিউডো-সেকুলার) তোষণ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া। সেই সূত্রেই হিটলার এবং নাৎসিরা ‘জাতিগত শুদ্ধতা’ (racial purity)-র মানদণ্ড স্থির করা থেকে শুরু করে ‘শুদ্ধ’ জার্মানদের পক্ষে কথা বলার অধিকার, সবই নিজেরা নিজেদেরকে ন্যস্ত করেছিল।
‘চরমপন্থী’ হোক বা ‘নরমপন্থী’, সার্বিকভাবে হিন্দুত্বের এই সাফল্য মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে তাদের অস্তিত্ব-সংকটের পদধ্বনি শোনায়। একদিকে দাঙ্গা, গণহত্যার ক্রমাগত ভয়ে কুঁকড়ে থাকতে থাকতে আক্ষরিকভাবেই সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হয়ে ওঠে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, অন্যদিকে এই সাম্প্রদায়িক উস্কানি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে কট্টর ও মৌলবাদী অংশকে ক্রমশ শক্তিশালী করে তোলে। তাই বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং অধ্যাপক মুশিরুল হাসানের উপর বর্বরোচিত হামলা, আপাতভাবে কাকতালীয় মনে হলেও নিছকই বিচ্ছিন্ন দুটি ঘটনা নয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই দুই ক্ষেত্রেই পুলিশকে অদ্ভুতভাবে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা যায়। ৬ ডিসেম্বরের ঘটনা ইতিমধ্যেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশে মুসলিম মৌলবাদী শক্তিকে শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি মনে রাখা প্রয়োজন যে ইন্দোনেশিয়ার পর পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের দেশও এই ভারতবর্ষ (১২০ মিলিয়ন)। জনগণের এই বিপুল সংখ্যা এবং তাদের বৈচিত্র্য, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং জাতীয় ঐক্যের সংরক্ষণের প্রশ্নে সম্ভবত বিশ্বের অন্য যে কোনও জায়গার তুলনায় আরও ঘনিষ্ঠভাবে আমাদের পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল করে তোলে। যে স্থায়ী এবং সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার পক্ষে, অপরায়নের রাজনীতিতে বিজেপি চলছে তা আমাদের লেবানন বা যুগোস্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধ বা তার চেয়েও আরও ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। সংঘ পরিবারের উগ্র জাতীয়তাবাদের জমি কর্ষণের পদ্ধতি তারই ইঙ্গিতবহ।
যৌথ কর্মসূচির পরিসর
আজকের হিন্দুত্ব এবং ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের (বিশেষত নাৎসিবাদের) মধ্যে মূলগত পার্থক্য নিহিত আছে এই দুই মতাদর্শের সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্পৃক্ততার প্রশ্নে, তাদের সম্পর্কের বিভিন্নতার নিরিখে। নাৎসিরা ধর্ম নয়, বরং জাতিগত ভিত্তিতেই আগ্রাসী ফ্যাসিবাদ তৈরি করে তরুণদের এক নতুন সভ্যতা গড়ার ডাক দিয়েছিল যা কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রকাশ্য খ্রিস্টান-বিরোধী রূপ ধারণ করে। অন্যদিকে সংঘ পরিবারের প্রকৃত উদ্দেশ্য যদিও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মৌলিক রূপান্তর কিন্তু মতাদর্শের বাধ্যতায় হিন্দু ঐতিহ্যের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য বজায় রেখেই তার প্রচারাভিযান চালিয়ে যেতে হয় তাদের। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই ধর্মীয় অনুগত্য সংঘ পরিবারের অন্যতম শক্তির উৎস। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কার্যকরী পালটা কৌশল বা কর্মসূচি নিলে এই শক্তি দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। এর কারণ ‘হিন্দুত্ব’ আদতে খুব বড়ো মাত্রায় বিভিন্ন হিন্দু-বিশ্বাস এবং আচারব্যবস্থাগুলির সমসত্ত্বকরণ বা একজাতকরণ করার উদ্দেশ্যে তার পরিবর্তন করে চলেছে। এই রূপান্তরের স্পষ্ট প্ৰতিফলন দেখা যায় এক বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতার বক্তব্যে, যে বাবরি মসজিদের নিকটবর্তী কিছু মুসলমানদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করার বিষয়ে পৈশাচিক উল্লাস প্রকাশ করে বলে– ‘এই এলাকাকে ‘ভ্যাটিকান’-সুলভ বানানোর জন্য এটি প্রয়োজনীয় ছিল’। এইভাবে ‘রামজন্মভূমি’-র ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এক অদ্ভুত রূপান্তরের কাজে নেমেছে– এক বিশাল বৈচিত্র্যময় হিন্দু ধর্মের বিপরীতে অঞ্চল, সম্প্রদায়, বর্ণ, লিঙ্গ, শ্রেণিভেদে হিন্দু ধর্মের বৈচিত্র্যের অস্তিত্বেকে সম্পূর্ণ ধূলিস্যাৎ করে একটি একক, সর্বোচ্চ দেবতার ধারণা এবং তীর্থস্থান নির্মাণ। নিঃসন্দেহে একথা বলা যায় যে লক্ষ লক্ষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ (এক্ষেত্রে সংখ্যার ঐতিহাসিক নির্ভুলতা নিষ্প্রয়োজন) এখনও আন্তরিকভাবে হিন্দু ধর্মের সহনশীলতা এবং উদারতায় আস্থা রাখেন। উদ্বেগজনক বিষয় হল একটি সহনশীল ধর্মকে ক্রমশ হিংসা, ভাঙচুর, দাঙ্গা, হত্যা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের একটি ভয়ঙ্কর যন্ত্রে পরিণত করার অভিপ্রায়। আমাদের দেশে ধর্মাচরণের বিভিন্ন পথ ও মতের বিভিন্নতা, সহনশীলতার ঐতিহ্য অত্যন্ত গভীর, সুপ্রাচীন এবং বৈচিত্র্যময়। এই বৈচিত্র্যের উদাহরণ অগুনতি– একাধিক ধর্মের মিশ্রণে উদ্ভুত নতুন ধর্মীয় পথ, সম্পূর্ণভাবে প্রচলবিরোধী এবং মূর্তিপুজো বিরোধী ভক্তি-সুফি ‘সন্ত’ কিংবা ‘পির’-দের ধর্মাচরণ (যাদের মধ্যে অনেকের কাছেই একটি প্রচলিত বাউল গানের ভাষায়, ‘মন্দির, মসজিদ, পুরোহিত, মোল্লাদের নিদানে আদতে ধর্মের পথ অবরুদ্ধ বলে মনে হয়’) থেকে শুরু করে রক্ষণশীল, অথচ গভীরভাবে সহনশীল রামকৃষ্ণের পথ, যাঁর দৃষ্টিতে হিন্দু, মুসলিম এবং খ্রিস্টানের মধ্যে তফাৎ নিতান্তই বিভিন্ন ভাষায় বলা একই শব্দের মধ্যে তফাতের অনুরূপ। অনিবার্যভাবে, বারবার মনে পড়বে ৪৫ বছর আগের জানুয়ারি মাসের সেই মর্মান্তিক রাতের কথা; সংঘ পরিবারের সংস্কৃতিতে লালিত পালিত এক যুবকের আক্রমণে সেই ধর্মপ্রাণ হিন্দুর খুন হওয়া; মনে পড়বে মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ অমোঘ উচ্চারণ ‘হে রাম’! বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রেক্ষিতে উচ্চারিত ‘রাম’ এবং মহাত্মা গান্ধির ঈশ্বর-আল্লাহর যুগ্মসত্তা রূপে কল্পিত রাম। দুই পরস্পরবিরোধী ধারণা, দুই সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থান। হিংস্রতার উপকরণ বনাম সহনশীলতার আরাধনা। মাঝে এক আলোকবর্ষ ব্যবধান।
ধর্মনিরপেক্ষতার বহুমুখী ব্যাখ্যা
‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র বহুস্বরের স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে এই সময়ের দাবি। আদ্যোপান্ত ধার্মিক থেকে শুরু করে মুক্তমনা নাস্তিক– প্রত্যেকেই এই অত্যন্ত বিস্তৃত এবং বৈচিত্র্যময় ধর্মনিরপেক্ষতার ভিন্নস্বরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেবলমাত্র সাম্প্রদায়িক বিভেদ এবং ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণার সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানের মতো কিছু ন্যূনতম সাধারণ বিষয়ে সহমতের ভিত্তিতেই ধর্মনিরপেক্ষতার এই বহুস্বর ফুটে ওঠা সম্ভব। তার মানে এই নয় যে তথাকথিত ধর্মীয় বিশ্বাসের মূলস্রোত থেকে ভিন্ন অবস্থান নেওয়া নাস্তিক ধর্মনিরপক্ষতাবাদীদের প্রকাশ্যে বুক বাজিয়ে নিজেদের বিশ্বহিন্দু পরিষদের তুলনায় ‘সহি হিন্দু’ বা মুসলিম মৌলবাদীদের তুলনায় ‘সাচ্চা মুসলমান’ হিসেবে প্রমাণ করার প্রয়োজন আছে।৮ বরং প্রয়োজন সচেতনতার, যা নিজেদের মধ্যে চিন্তাধারার নিগূঢ় তফাৎকে দূরে সরিয়ে রেখে মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার্থে সবাইকে একজায়গায় আনতে পারে। আজ ভীষণ জরুরী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যৌথফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলা ট্রটস্কিয় স্লোগান– ‘ভিন্ন পথ, কিন্তু যৌথ ঘাত’ (‘march separately, but strike together’)।৯
নিশ্চতভাবেই হিন্দুত্ববাদী শক্তি এই জাতীয় ঐক্যকে ভয় পায়। ধর্মনিরপেক্ষতা এবং প্রকৃতপক্ষে সমস্ত সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মনোভাবকে কোনও না কোনোভাবে ‘হিন্দু-বিরোধী’ হিসাবে চিহ্নিত করার অবিরাম তাগিদ এই ভয়ের স্পষ্ট জানান দেয়। একইসাথে তারা ধর্মনিরপেক্ষতা ও ‘নেহরুভিয়ান’ রাষ্ট্রীয় নীতিকে অভিন্ন হিসেবে জনগণের মধ্যে তুলে ধরার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। ফলস্বরূপ নেহরুর আমলে ঘটা যাবতীয় সুবিধাবাদ, আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণ কিংবা রাজনৈতিক দমনের পাপের বোঝা ধর্মনিরপেক্ষতার উপর চাপিয়ে তাকে কালিমালিপ্ত করার প্রক্রিয়া সহজ হয়ে পড়ে। এখানে, আবারও মনে রাখতে হবে বর্তমান বৌদ্ধিক, অ্যাকাডেমিক প্রবণতা এই ধরনের সমালোচনাকে গুরুত্ব দিয়েছে, কারণ আজকাল প্রায়শই ধর্মনিরপেক্ষতাকে আলোকিত (Enlightenment) যুক্তিবাদ এবং সংশয়বাদের একটি পশ্চিমি সৃষ্টি হিসেবে তুলে ধরা হয়, যা কিনা ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবেই ভারতে আনা হয়েছিল যা পরবর্তীকালে এদেশে তার মূর্ত রূপ ধারণ করে। শুধু তাই নয়, পশ্চিমি ধাঁচে তৈরি সমস্ত দমনমূলক জাতি-রাষ্ট্রের (nation-states) কাঠামোর মধ্যেই ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’-কে জোরপূর্বক আত্তীকৃত করা হয়েছে এমন দাবিও করা হয়। যদিও প্রকৃতপক্ষে, এমনকি ইউরোপেও, ধর্মনিরপেক্ষতার শিকড় অন্তত ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। ‘Reformation’ থেকে সূত্রপাত হওয়া ধর্মযুদ্ধের (যাকে আমরা প্রকৃত অর্থেই ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ বলতে পারি) সময় থেকেই ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রাথমিক ধারণার কথা পাওয়া যায়। ধর্মীয় সহনশীলতার পক্ষে, রাষ্ট্র এবং চার্চের পৃথকীকরণের একেবারে প্রথম প্রবক্তারা কিন্তু কেউই যুক্তিবাদী মুক্তচিন্তক ছিলেন না। বরং তাঁরা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ খ্রিস্টান অ্যানাব্যাপ্টিস্ট যাঁরা সেই সময়েও বিশ্বাস করতেন যে জবরদস্তি, নিপীড়ন এবং যেকোনও ধরনের বাধ্যতামূলকভাবে জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া ‘রাষ্ট্রীয় ধর্ম’ প্রকৃত ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী।
ভারতবর্ষে বা অন্যান্য দেশে, যেখানে বিভিন্ন মত ও পথের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অস্তিত্ব আছে, সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই প্রয়োজনীয়তা শুধুমাত্র বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মগুরুদের প্রচারিত সহনশীলতার শিক্ষা অথবা রাজতন্ত্রের বিভিন্ন ধর্মনিরপেক্ষ নীতির (আকবরের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ্য) মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দৈনন্দিন যাপন ও অস্তিত্বের উপর ভিত্তি করে নিবিড়ভাবে গড়ে ওঠা এক মনোভাব। ফলে মাঝে মাঝে ছোটো খাটো সংঘর্ষের জন্ম দিলেও এই সহাবস্থানের সংস্কৃতির হাত ধরে পরস্পরনির্ভরতায় ফিরে যাওয়া যায় অনায়াসে।১০ ফিরে যাওয়া যায় স্থিতির সহনশীল বৃত্তে। এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে, দৈনন্দিন অস্তিত্বের উপর সাম্প্রদায়িকতার আঘাত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের প্রশ্নকে দূরে ঠেলে দিতে থাকে। থমকে যায় শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের জেহাদ। পিছিয়ে পড়ে জীবন জীবিকা উন্নয়নের সমস্যা-সমাধানের প্রশ্ন। মূলত দুইভাবে মানুষকে জীবন জীবিকার ইস্যু থেকে বিভ্রান্ত করা হয়– প্রথমত মেহনতি এবং সমস্ত শোষিত প্রান্তিক গোষ্ঠীর ঐক্য ও সংগ্রামকে ভেঙে ফেলার মাধ্যমে, এবং দ্বিতীয়ত, তৈরি করা সাম্প্রদায়িক সীমানার ভিতরে নির্মম একজাতকরণের (homogenisation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতার পরিপ্রেক্ষিতে, এই একজাতকরণ স্পষ্টতই উচ্চবর্ণের অভিজাত হিন্দুদের সংগঠিত স্বার্থের অনুকূলে কাজ করে। লক্ষ করা প্রয়োজন, মন্ডল কমিশনের সুপারিশে উঠে আসা সামাজিক ন্যায়বিচার বাস্তবায়নের অত্যন্ত সামান্য পদক্ষেপও কীভাবে হিন্দুত্ববাদী আক্রমণের মুখে পড়েছে। হিন্দুত্বের কর্মসূচি এবং কর্মকাণ্ডে সুনির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক সমস্যাগুলি এখনও অবধি উল্লেখযোগ্য ভাবে অনুপস্থিত (‘রাম, রোটি, ইনসাফ’- প্রায় বিস্মৃত হয়ে যাওয়া বিজেপির এই স্লোগানে ‘রাম’-এর মতো জোরালোভাবে ‘রোটি’র অর্থ স্পষ্টভাবে কখনোই ব্যাখ্যা বা প্রচার করা হয়নি)। এই জায়গাতেই হিন্দুত্বের কর্মসূচির বিরোধিতায় ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির কার্যকরী হস্তক্ষেপ ভীষণভাবে প্রয়োজন। তবে, এই প্রতিরোধ সফল করতে ‘সাংস্কৃতিক’ বা ‘আদর্শগত’ সমস্যা থেকে ‘অর্থনৈতিক’ এবং ‘রাজনৈতিক’ সমস্যাকে আলাদা করার অভ্যেস ত্যাগ করা জরুরি, যার শিকড় দুর্ভাগ্যক্রমে ভারতীয় বাম সংস্কৃতির ঐতিহ্যের অত্যন্ত গভীরে। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী প্রচারাভিযানগুলিকে শুধুমাত্র সেমিনার বা মধ্যবিত্ত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাকে ওতপ্রোতভাবে জুড়তে হবে মানুষের রোজকার অর্থনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের সঙ্গে। দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা এবং আদর্শের প্রশ্নগুলিকে যুক্ত না করলে বস্তুগত সমস্যা এবং ‘বাস্তব’ শ্রেণি পরিচয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মধ্যে জেগে উঠবে এমন আশা করা কঠিন।
আপাতভাবে ইউরোপের ফ্যাসিবাদী যুগের পর্যালোচনা একটি নির্মম এবং হতাশাজনক চর্চা বলে মনে হলেও এখন পুনরায় সেই নৈরাজ্যবাদী শক্তিগুলি কার্যত পৃথিবীর সর্বত্র তাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে। কিন্তু ১৯৩০-৪০ দশকের প্রথম দিকের এই স্মৃতি শুধুই Storm Troopers (নাৎসি গেস্টাপো), হলোকাস্ট, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প কিংবা আপাতসম্পর্কহীন বিভিন্ন মানবিক বিকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদিও এই সম্মিলিত বিকৃতি আজ বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও তার পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ধ্বংস করে ফেলেছে, তবু পাশাপাশি আমাদের স্মরণে থাকবে একদা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং সেই সময়ে ফ্যাসিবাদের পরাজয়। মনে থাকবে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রামে জনপ্রিয় ফ্রন্ট গঠনের স্পর্ধা। মনে রাখতে হবে চিরাচরিত ‘স্তালিনীয় সন্ত্রাসের’ মিডিয়াভাষ্যের বিপরীতে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে স্তালিনগ্রাদের কাউন্টারস্ট্রাইক, তার নির্ভীক প্রত্যয়, তার অভিজ্ঞতা। গণপ্রজাতন্ত্রী স্পেনের ফ্যাসিবাদবিরোধী চিরন্তন স্লোগান থেকে আবারও শক্তি সঞ্চয়ের সময় এসেছে– ‘ফ্যাসিবাদ জয়ী হবে না ‘(‘No pasarán’)।
তথ্যসূত্র:
১. ৬ ডিসেম্বর পরবর্তী কানপুর, ভূপাল, সুরাট, বোম্বে বা অন্যান্য শহরে ঘটা দাঙ্গার মাত্রার নিরিখে দিল্লিতে ঘটা দাঙ্গার প্রভাব তুলনামূলকভাবে আকারে ছোটো ছিল। দেশজুড়ে সবমিলিয়ে প্রায় ২১৩টি জায়গায় কার্ফু জারি হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন প্রায় ৯.৭ কোটি মানুষ। ‘Cry The Beloved Country’ (People’s Union for Democratic Rights, Delhi, December 1992)
২. সংঘ পরিবারের বিবর্তনের আরও বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন : Tapan Basu, Pradip Dutta, Sumit Sarkar, Tanika Sarkar, and Sambuddha Sen, “Khaki Shorts and Saffron Flags: The Politics of the Hindu Right” (Orient Longman, Delhi 1993)
৩. Daniel Guerin, ‘Fascism and Big Business’ (1936; New York, 1974), p. 10
৪. Guerin, op cit.; Alan S Milward, “Fascism and the Economy” in Walter Laqueur ed. ‘Fascism: A Reader’s Guide’ (1976: Penguin, 1979)
৫. Milward, op.cit, p.414
৬. উদাহরণস্বরূপ, গৌতম ভদ্র প্রথম করসেবা আন্দোলন এমনকি সাধ্বী ঋতম্বরার বক্তৃতার মধ্যেও কিছু প্রশংসনীয় পরিচিতিসত্তার সাবঅলটার্ন ভাষ্যের উপাদান খুঁজে পান যা ১৯৯১ সালের শুরুর দিকে একটি বাংলা পত্রিকায় তাঁর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। সাবঅলটার্ন স্টাডিজের সম্পাদকীয় দলের আর-এক সদস্য দীপেশ চক্রবর্তী, একটি সাম্প্রতিক প্রবন্ধে যুক্তি দিয়েছেন যে এনলাইটেনমেন্ট-উত্তর পশ্চিমের “হিজ মাস্টার্স ভয়েস” কৃত সমস্ত সমালোচনা, বিরোধিতার বিষয়গুলির মধ্যে আমাদের সৃজনশীল উপাদান অনুসন্ধান করতে হবে। এনলাইটেনমেন্ট-উত্তর পশ্চিমি আধুনিক ধারণার মধ্যে ম্যাকওলে-র মতো তিনি মার্ক্সবাদকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন (Naiya, February 1991:Baromas, October 1992)
৭. Zeev Sternhell, ‘Fascist Ideology’ in Laqueur, op cit., p 334 (the quotation from Gentile); Guerin, op cit., pp 65, 168-69, 171
৮. নাস্তিক ধর্মনিরপক্ষতাবাদীরা ধর্মীয় বিশ্বাসের মূলস্রোত থেকে ভিন্ন অবস্থান নিলেও নিশ্চিতভাবেই ভারতীয় সংস্কৃতি বা মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং সুরাটের সেইসব যুবকরা এই মৌলিক মানবিকতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন যারা হিন্দুত্বের নামে মুসলিম নারীদের গণধর্ষণ করে তার ভিডিও রেকর্ড করে। আমি জানি বোম্বের কিছু উচ্চবিত্ত বাড়ির সান্ধ্য-পার্টিতে এই গণধর্ষণের ভিডিও সাগ্রহে দেখা হচ্ছে।
৯. Leon Trotsky, “For a Workers’ United Front against Fascism”(December 1931) in ‘The Struggle against Fascism in Germany’ (Penguin, 1975, p. 106)
১০. ৬ ডিসেম্বর-পরবর্তী দাঙ্গার পরেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার, দৈনন্দিন সহাবস্থান পুনরুদ্ধারের মর্মস্পর্শী আখ্যান উঠে আসে ফ্রন্টলাইন পত্রিকার কিছু প্রতিবেদনে (১৫ জানুয়ারি, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ৬০-৮১)
[মূল প্রবন্ধটি ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রেক্ষাপটে, ১৯৯৩ সালের প্রথম পর্বে লেখা। অনুবাদ: কঙ্ক ঘোষ।]