মযহারুল ইসলাম বাবলা
তথাকথিত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে ধর্মযোগ বা ধর্মের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। যুগ-যুগান্তর ধরে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে ধর্ম আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। আমাদের উপমহাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালেই সেটা মোটা দাগে ধরা পড়বে। জাতীয়তাবাদী মহাত্মা গান্ধি চরমভাবে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। তাঁর চরম শত্রুও তাঁকে সাম্প্রদায়িক বলতে পারবে না। তবে তিনি কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। অর্থাৎ ধর্ম এবং রাজনীতিকে যুগলবন্দি করেছিলেন। সেটা আত্মঘাতী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীদের দ্বারা তাঁর নৃশংস হত্যা সেটাই প্রমাণ করে। উপমহাদেশ বিভক্তির মূলে সর্বাধিক ক্রিয়াশীল ছিল ধর্ম। ধর্মকে উপলক্ষ্য করেই দেশ বিভাগ সম্পন্ন হয়েছিল। জাতির স্থলে প্রধান দুই ভ্রাতৃপ্রতিম সম্প্রদায়ের উচ্ছেদ, বিচ্ছেদ, উৎপাটনে এবং নৃশংস দাঙ্গায় সম্পন্ন হয়েছিল মর্মান্তিক দেশভাগ।
দেশভাগে পাকিস্তান এবং ভারত পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টিতে জাতি পরিচয়ে ধর্মকেই অবলম্বন করা হয়েছিল। মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তানে জাতিভেদ সামনে আসেনি ওই ধর্মেরই টানে। অথচ পাকিস্তানে পাঞ্জাবি, বেলুচ, সিন্ধ্রি, পাঠান এবং বাঙালি পাঁচটি জাতি ছিল। বহুজাতি ও সম্প্রদায়ের ভারতে স্ব-স্ব ধর্ম ও জাতীয়তাকে ‘ভারতীয় জাতীয়তার’ কুশলী বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রাধীনে ব্যতিক্রম বাঙালি জাতি। জাতি পরিচয় বিলুপ্তি মেনে নেয়নি তারা। ধর্মীয় পরিচয়কে অতিক্রম করে ভাষা-সংস্কৃতির বিভেদ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং শেষ পরিণতিতে পৃথক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, স্বাধীন বাংলাদেশ। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ কেবল ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না, স্বাধীন দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও ছিল নিষিদ্ধ। যেটি ভারত কিংবা পাকিস্তান কোনও রাষ্ট্রেই নেই। ১৯৭৪ সালে ভারত ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানভুক্ত করলেও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেনি। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সচল এবং সক্রিয় থাকায় ক্রমাগত তীব্রতর হয়ে ভারতের শাসনভার এখন ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলের করতলগত। নির্বাচনের মাধ্যমে পরপর তিনবার ধর্মভিত্তিক বিজেপি দেশটির ক্ষমতায় আসীন। ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে তারা ক্ষমতায়। বাস্তবতা হচ্ছে বহু ভাষাভাষী ও সম্প্রদায়ের দেশ ভারতে হিন্দুরাষ্ট্র বাস্তবায়ন যে সম্ভব নয়, এই সত্যটি বিজেপি সরকার ভালো করেই জানে। প্রচারণাটা নির্ভেজাল ভোটের রাজনীতি মাত্র। তাই বলে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক নৃশংসতা কিন্তু থেমে নেই। বহুত্ববাদ পরিত্যাগে একক হিন্দুত্ববাদী অপতৎপরতা চলছে দেশজুড়ে। গো-রক্ষার নামে সাম্প্রদায়িক নৃশংস বর্বরতা অবিরাম ঘটে চলেছে। গো-হত্যা, গো-মাংস বহন ও রক্ষণের বানোয়াট অভিযোগে মানুষ হত্যার ঘটনাও ঘটেছে বিজেপির শাসনামলে। বিজেপি শাসিত অনেক রাজ্যে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গসহ যে সকল রাজ্যের ক্ষমতা বিজেপির নেই সে সকল রাজ্যের ওপর গো-হত্যা বন্ধের কড়া হুমকি দিয়ে আসছে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী উগ্রবাদীরা। ফ্যাসিবাদী শাসকেরা রাষ্ট্রের স্বাধীন সকল প্রতিষ্ঠানকে করতলগত করার সংস্কৃতি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র-শাসনে চিরকাল হয়ে এসেছে। বিজেপি সরকারও তার ব্যতিক্রম নয়।
মহাত্মা গান্ধি গো-রক্ষার জন্য নানাবিধ কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। খেলাফতের সঙ্গে চুক্তি করে অকপটে বলেছেন, মুসলমানদের ছুরির কবল থেকে গো-মাতাকে রক্ষায় তিনি ওই চুক্তি করেছিলেন। গো-রক্ষার প্রচার-প্রচারণায় সারা ভারত চষে বেড়িয়েছেন। গান্ধি অহিংসায় বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি বলেছেন, গো-রক্ষার নামে হিংসার আশ্রয় নেওয়া যাবে না। তিনি আরও বলেছেন, তিনি নিজে গো-সেবা করলেও, আমিষাশী মুসলমান ও খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ যারা গো-মাংস খায় তাঁদের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। একাজ অন্যায়। তিনি স্বীকার করতেন এবং বলেছেন, ভারতবর্ষ কেবল হিন্দুদের দেশ নয়। এদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্বতাকে সম্মান করতে হবে। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর হতে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করে চলেছে। অর্ডিন্যান্স পর্যন্ত জারি করেছে। যেটি ভারতের জাতিরজনক গান্ধির আদর্শ ও নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
আপাত দৃষ্টিতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সঙ্গে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস দলের মতপার্থক্য ভিন্ন বলেই মনে করা হয়। অনেকে কংগ্রেসকে ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবেও গণ্য করে। অথচ এই কংগ্রেস দলের শাসনামলেই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছিল। উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের বিপরীতে কংগ্রেস সরকার তখন মৌলবাদীদের ঘৃণিত অপকীর্তির তামাশা দেখেছিল মাত্র। স্বীয় কর্তব্য পালনে পুরোমাত্রায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল কংগ্রেস সরকার। সে-দায় বা অভিযোগ থেকে কংগ্রেসের অব্যাহতির সুযোগ নেই। বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে কেন্দ্র করে সহিংস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দায়ও কংগ্রেস সরকারের ওপরই বর্তায়। সে দায় কংগ্রেসেকে বহন করতেই হবে।
সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস প্রকাশ্যে অসম্প্রদায়িকতার মুখোশ এঁটে থাকলেও ভোটের রাজনীতিতে কংগ্রেসের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক হরীশ রাওয়াত প্রকাশ্যে বলেছিলেন, আগামী লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এলে অযোধ্যায় একটি বিশাল রামমন্দির নির্মাণ করবেন তাঁরা। রাওয়াত দাবি করেন, আগেরবারও যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখনও রামমন্দির নির্মাণের জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন তাঁরা। তিনি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রতি অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন, বিজেপি রামমন্দির বিষয়ে আন্তরিক নয়। রামমন্দির বিষয়ে তাদের অবস্থান কপট। বিজেপিতে অনৈতিক লোকে ভরা। অনৈতিক লোক পুরুষোত্তম রামের ভক্ত হতে পারেন না। তাঁর এই প্রতিশ্রুতি কংগ্রেস দলীয় কি না জিজ্ঞেস করা হলে হরীশ রাওয়াত বলেন, ‘রামমন্দির বিষয়ে আমার বক্তব্য গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারিত হয়েছে। কংগ্রেসের তরফে সেটির বিষয়ে কোনো আপত্তি করা হয়নি।’ ক্ষমতার রাজনীতির অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে বিজেপির সঙ্গে কংগ্রেসের পার্থক্য আর রইল কোথায়!
বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। জেনারেল জিয়ার সামরিক সরকার সেটা বাতিল করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি শাসনতন্ত্রের চার মূল স্তম্ভের দুটি সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধান থেকে বিদায় করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় অপর সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ প্রবর্তন করেছিলেন ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’। এরশাদ পরবর্তী অসামরিক শাসকেরা সেটার পরিবর্তন তো পরের কথা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পর্যন্ত দিয়েছেন। এমন কি সংবিধানের অসম্প্রদায়িক ধারা পালটে সাম্প্রদায়িক ধারাসমূহ সংবিধানভুক্ত পর্যন্ত করেছেন। একাত্তরের ঘাতক দল জামায়াতে ইসলাম এবং হেফাজতিদের প্রবল উত্থান ঘটেছে সরকারি মদতে। হেফাজত গণতান্ত্রিকতায় বিশ্বাস করে না। করে না নির্বাচনি ব্যবস্থায় শাসক বদলের ধারাও। তলোয়ার হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলই তাদের লক্ষ্য। হেফাজতের দাবির প্রেক্ষিতে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করে সাম্প্রদায়িক শিক্ষার নানা উপকরণ যুক্ত করা হয়েছে। হেফাজতিদের যেরূপ আশকারা দেওয়া হয়েছে শেখ হাসিনার শাসনামলে, অতীতে অমনটি দেখা যায়নি। আর বর্তমানে তো তাদের বাড়-বাড়ন্তের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
বুর্জোয়া রাজনীতি মূলত ক্ষমতারই রাজনীতি। ক্ষমতাই একমাত্র লক্ষ্য। ওই লক্ষ্য পূরণে হেন অপকীর্তি নেই যেটা করতে তাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা-সংকোচ হয়। ধর্মকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে ব্যবহার করতেও ছাড়ে না। মুখে অসাম্প্রদায়িকতার আওয়াজ তুললেও ক্ষমতার মোহে সবই জায়েজ করে নেয়। ক্ষমতা একমাত্র ক্ষমতার মোহেই তথাকথিত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতি নীতি-আদর্শের ধার ধারে না। কবি নজরুল ‘মানুষ’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘হায়রে ভজনালয় তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গায়ে স্বার্থের জয়’। বুর্জোয়া শাসকদের ক্ষেত্রে অমনটা অনায়াসে বলা যায়।
হিটলার, মুসোলিনি, ফ্রাঙ্কো এরা সবাই চরম ফ্যাসিবাদী। বিশ্বব্যবস্থাকে এরা বিপদাপন্ন করে ছেড়েছে। এদের নির্মূল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিকরা করতে পারেনি। করেছে কমিউনিস্টরাই, জোসেফ স্ট্যালিনের নেতৃত্বে। ভবিষ্যতে ওই দায়িত্ব কমিউনিস্টদেরই নিতে হবে। অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হবার নয়।
বৌদ্ধ ধর্মের মৌলিক ভিত্তিই হচ্ছে, জীব হত্যা মহাপাপ, অহিংস পরমধর্ম। গৌতম বুদ্ধ প্রদত্ত এই বাণী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য এবং ক্রিয়াশীল। সম্রাট অশোকের শাসনামলকে বৌদ্ধদের স্বর্ণযুগ বলা হয়। কলিঙ্গ যুদ্ধের গণহত্যার পর তীব্র অনুশোচনায় সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসারে সর্বাত্মক আত্মনিয়োগ করেন। নিজ পুত্রকে পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে শ্রীলঙ্কায় পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত-নিবেদিতপ্রাণ হয়েও অপরাপর ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অপর ধর্মাবলম্বীদের ওপর নানা কালা-কানুন আরোপসহ নির্যাতন-নিপীড়নেরও অসংখ্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন ধর্মমতের আগমনে এক ধর্মের অনুসারী অপর ধর্মানুসারীর প্রতি সহিষ্ণুতার নজির ইতিহাসে নেই বললেই চলে। নিজ ধর্ম অপর ধর্মের মানুষের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেবার অগণিত ঘটনাও ইতিহাস ভুক্ত। সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি-সামর্থ্যরে ওপর ভর করেই এ সকল অনাচার ধর্মমতের আগমনের পর হতেই চলে আসছে, আজ অবধি। মধ্যপ্রাচ্যেই সর্বাধিক এবং ভারতবর্ষে কয়েকটি ধর্মমতের আবির্ভাব ঘটেছে। আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কোনো মহাদেশেই ধর্মমতের আবির্ভাব ঘটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের এবং ভারতবর্ষের ধর্মমতগুলোই তারা গ্রহণ করেছে। একই মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাধিক ধর্মমতের আবির্ভাবের কারণে এক ধর্মমত অপর ধর্মমতের ওপর প্রভাব বিস্তারে অগণিত রক্তক্ষয়ী ঘটনা ক্রমাগত ঘটেছে এবং ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ, দাঙ্গা-হাঙ্গামায়, নৃশংসতায় প্রাণ দিতে হয়েছে অগণিত মানুষকে। এসকল যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ নামকরণে ধর্মরক্ষার তাগিদে অকাতরে নৃশংস ঘটনায় অংশ নিয়ে স্বধর্মের প্রসারে জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অপর ধর্মের অনুসারীদের ওপর। অথচ প্রত্যেক ধর্মমতই অপর ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ধর্মীয় আদেশ-নির্দেশ উপেক্ষা করে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের ওপর বর্বরোচিত আচরণ অব্যাহত রেখে এসেছে। বিশ্বজুড়ে তাদের নির্মমতার শিকার হতে হয়েছে এবং হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের। ধর্মীয় মানবিকতাকে উপেক্ষা করে ধর্মান্ধরা নিষ্ঠুর পাশবিকতা প্রদর্শনে কসুর করে না। অনায়াসে যেটিকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ বললে অত্যুক্তি হবে না। এই ফ্যাসিবাদের চারণক্ষেত্র এখন বিশ্বময়।
বৌদ্ধ ধর্মে অহিংস ও জীব হত্যা মহাপাপের কথা সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে। সে অর্থে আমরা জানতাম এবং মানতামও বৌদ্ধ ভিক্ষু হতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা অহিংস, শান্তিপ্রিয় এবং চরমভাবে নিরীহ। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। আমরা বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার এবং শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালে দেখতে পাব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রতি আমাদের প্রচলিত ধারণা কতটা ভ্রান্ত এবং ভুলে ভরা। মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরোচিত গণহত্যা চালিয়ে তাদেরকে দেশ ছাড়া করা হয়েছে, মাত্রাতিরিক্ত নৃশংস উপায়ে। রোহিঙ্গাদের ওপর সে দেশের সেনাবাহিনী, শান্তিরক্ষীবাহিনী, বৌদ্ধ-ভিক্ষু হতে সর্বস্তরের বৌদ্ধরা শামিল হয়েছে ভূমি থেকে উচ্ছেদে এবং নির্মম হত্যাযজ্ঞে। শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সুচিও এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ না করে পক্ষান্তরে ওই রোহিঙ্গা গণহত্যা এবং রোহিঙ্গাদের বিতাড়নকেই সমর্থন জুগিয়েছে। চিন এবং ভারতের মধ্যকার নানা টানপোড়েন থাকলেও তারা তাদের জাতীয় স্বার্থ বিবেচেনায় রোহিঙ্গা বিতাড়ন এবং গণহত্যায় মিয়ানমারকেই সমর্থন দিয়ে এসেছে। মিয়ানমারের বাণিজ্যিক বাজার একচেটিয়া দখলকারী চিন-ভারত মানবিকতা পরিহার করে জাতীয় স্বার্থ-রক্ষার তাগিদকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এক সময়ে সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন মিয়ানমার ওই চিন-ভারতের বলয়ে থাকলেও এখন মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল। গত কয়েক বছরে মিয়ানমারকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করার ক্ষেত্রে ওই দুই দেশ সামরিক সহায়তা দিয়ে এসেছে। এমন কি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সামরিক প্রশিক্ষণও দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের সামরিক বিশেষজ্ঞের দল। সামরিক শক্তিতে মিয়ানমার এতটাই এগিয়ে গেছে যে, রোহিঙ্গাদের নির্ভাবনায় বাংলাদেশে ঠেলে দেবার ধৃষ্টতা দেখাতে বিলম্ব করেনি। বাংলাদেশের সামরিক শক্তির তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী মিয়ানমার বাংলাদেশকে সে কারণেই তুচ্ছজ্ঞান করছে। বাংলাদেশকে তাদের তুলনায় দুর্বল রাষ্ট্র ভেবে রোহিঙ্গা প্রশ্নে অটল অবস্থান নিয়েছে। কেননা নিজেদের সামরিক শক্তিবৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের পাশে রয়েছে শক্তিধর চিন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের ন্যায় রাষ্ট্রসমূহ।
বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জাতিদের নিধন-বিতাড়ন সম্পন্ন হলেও অপর সংখ্যালঘু শান প্রদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর আগাগোড়া চাপ থাকলেও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর মিত্র রাষ্ট্রগুলোর কারণে খ্রিস্টানদের দেশছাড়া-গণহত্যার শিকারে পরিণত হতে হয়নি। তবে মিয়ানমারের খ্রিস্টানরাও মূলধারা থেকে বিচ্যুত। অনেক ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার থেকেও। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ব্যতীত অপরাপর ধর্মমতের ওপর রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ নৃশংসতার নজির রেখে চলেছে। পরমত সহিষ্ণুতার কোনো বালাই সেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বৌদ্ধ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ সেখানে চরম ক্রিয়াশীল।
শ্রীলঙ্কাও বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ। সেখানেও অপরাপর ধর্মমতের মানুষেরা নিরাপদে নেই। তুলনামূলক বিচারে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তারা অনেকটাই পূর্ণ নিরাপত্তায় নাগরিক অধিকার পেয়ে এসেছে। তামিল ভাষী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ব্রিটিশরা চা ও রাবার বাগানের দক্ষ শ্রমিক হিসেবে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্য থেকে নিয়ে এসেছিল। ব্রিটিশ শাসনাধীন শ্রীলঙ্কার জনগণ সেটি কখনো ভালো চোখে দেখেনি। ব্রিটিশদের বিদায়ের পর স্বাধীন শ্রীলঙ্কায় তামিলদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নাগরিক অধিকার বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার পর্যন্ত হরণ করা হয়। এতে বঞ্চিত তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভের দানা বাধে। বঞ্চনা থেকেই তামিল টাইগার নামক সশস্ত্র সংগঠন গড়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে নির্বিচারে তামিল গণহত্যার মধ্য দিয়ে।
শ্রীলঙ্কায় গির্জায় হামলার পর সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর নৃশংসতা নজির সৃষ্টি করে। মোট জনসংখ্যার ক্ষুদ্র অংশ মুসলিম সম্প্রদায় শ্রীলঙ্কায় পূর্ণ নাগরিক অধিকার-মর্যাদা কখনো পায়নি। মুসলিমদের ব্রাত্য হিসেবেই গণ্য করা হয়। ইস্টার সানডে উদ্যাপন কালে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের গির্জায় বোমা হামলার পর দেশটির মুসলিম সম্প্রদায় বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সম্মিলিত হামলার মুখে পড়ে। চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের। ওই বোমা হামলায় গির্জাসহ আটটি স্থানে আত্মঘাতী হামলায় ২৫৮ জন নিহত হয়। আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করে। আইএস-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং সৌদি আরব। আরব বিশ্বে ইজরায়েলের ক্রমাগত ভূমিদখল, হত্যা, গণহত্যার বিরুদ্ধে আইএস-এর ন্যূনতম ভূমিকা দেখা যায়নি। বিপরীতে মুসলিম সংখ্যাধিক্য দেশসমূহে আইএস-এর নৃশংস জঙ্গি তৎপরতা অব্যাহত ছিল। আইএস-এর তিন পৃষ্ঠপোষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং সৌদি আরব তাই নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তায় ছিল। আইএস ব্যবহৃত হয়েছে ওই তিন রাষ্ট্রের আদেশ-নির্দেশে। গির্জার ওই বোমা হামলার পর থেকে সন্ত্রাস দমনের জরুরি অবস্থা জারির পর শ্রীলঙ্কায় অগণিত মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর নির্বিচারে আটক, নির্যাতন, নিপীড়ন অব্যাহত গতিতে চলেছে। শ্রীলঙ্কার পুলিশের ভাষ্য মতে কয়েক হাজার মুসলিম নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের নামে চালিয়েছে নির্বিচারে শারীরিক নির্যাতন। শ্রীলঙ্কা সরকারের কর্তব্য ছিল প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা। নিরপরাধ সংখ্যালঘু মুসলিম নাগরিকদের ওপর ঢালাও নির্যাতন না করে তাদের জান-মালের রক্ষা করা। অথচ বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রীলঙ্কার সরকার ও ধর্মীয় সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর ক্রমাগত নির্যাতন-নিপীড়ন জারি রেখে দেশটির মুসলমান নাগরিকদের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে। নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচ এ বিষয়ে নানা প্রতিক্রিয়া জানালেও, শ্রীলঙ্কা সরকার ও বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের ক্রমাগত মুসলিমদের ওপর নৃশংসতা থেকে বিরত রাখা সম্ভব হয়নি।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশেও অভিন্ন অবস্থা বিরাজ করছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চলছে নিপীড়ন-নৃশংসতা। পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান এক্ষেত্রে তো উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী জঙ্গি তৎপরতার ক্ষেত্রে মুসলিম মৌলবাদীদের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে মৌলবাদী গোষ্ঠীর হীন তৎপরতা সারা বিশ্বে মুসলিম সম্প্রদায়কে লজ্জায় ফেলেছে। নিউজিল্যান্ডের ন্যায় শান্তিপ্রিয় দেশেও খ্রিস্ট মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা মসজিদে বোমা হামলা চালিয়ে নিরপরাধ মানুষ হত্যা সংঘটিত করেছে। মসজিদে ওই বোমা হামলাকে কেন্দ্র করে যদি মুসলিমরাও একই পথে হাঁটত তাহলে নিউজিল্যান্ডের জন্য সেটা হত ভয়াবহ পরিণতি। নিউজিল্যান্ড সরকারের কর্তব্য ছিল সংখ্যালঘুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি খ্রিস্ট জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতা লাভের পর হতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিনাশ ঘটেই চলেছে। বহুত্ববাদ ত্যাগ করে ভারতে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা দেশটিকে প্রকৃত অর্থে ভাঙনের মুখেই ঠেলে দেবে। সংখ্যালঘু অহিন্দুদের ওপর বৈরী-অমানবিক আচরণ অব্যাহত থাকলে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থান যে ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে!
ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত বিস্তারের পেছনে সাম্রাজ্যবাদ উসকানি দিচ্ছে, নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলে। ইউরোপ, আমেরিকায় চলছে শ্বেতাঙ্গ-খ্রিস্ট ধর্মীয়দের অনাচার সংখ্যালঘু ধর্মমতের এবং অভিবাসীদের ওপর। ভারতে চলছে হিন্দু জাতীয়তাবাদের নৃশংসতা, সংখ্যালঘু অপরাপর ধর্মমতের বিরুদ্ধে। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় একই ঘটনা ঘটে চলছে সংখ্যালঘু ধর্মমতের অনুসারীদের ওপর। বিশ্বের একমাত্র ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ইজরায়েলের নৃশংস তাণ্ডবে সারা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চলছে জায়নবাদী নির্মম হত্যাযজ্ঞ। এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ নির্মূল করা সম্ভব না হলে সেটা তীব্র আকার ধারণ করে সারা বিশ্বপরিস্থিতিকে কেবল অশান্ত নয়, চরম ভয়াবহতায় বিপন্ন করে তুলবে। যার থেকে দেশে দেশে বসবাসরত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন বিপন্ন ও ধ্বংসের পথে এগোবে। যার মাশুল গুনতে হবে সকল ধর্মমতের অনুসারীদের। কেননা সকল ধর্মের মানুষই বিভিন্ন দেশে রয়েছে। কোনো দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠে আবার কোনো দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে। ধর্মীয় অনুশাসন কোনোক্রমেই চলমান ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে অনুমোদন করে না। বরং পরমত সহিষ্ণুতার কথাই জোর দিয়ে বারংবার বলেছে। কিন্তু প্রবচন আছে, চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি। অবস্থাটা তেমনই।