দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়
“পর্বান্তর মানে অন্য পর্ব”— এই মানেতে থিতু থেকে যদি আমি আমার মননের ইতিহাসকে ক্রমিক, ধারাবাহিক, ইতিহাসের সাল-তারিখ ধরে সরলরৈখিক ভাবে ভাবতে বসি, তাহলে খুব মুশকিল হয়ে যায়। ব্যাকরণ বই বলে, এই “পর্বান্তর” নাকি নিত্য সমাস। পর্ব যদি বদলাতেই থাকে, তাহলে তা “নিত্য” হয় কী করে? বিষয়ীর মননে এক কালের ভেতরে সেপটে থাকে অন্য অনেক কাল। খ্রিস্টাব্দ বা অন্য কোনো অব্দের হিসেব সেখানে ব্যক্তির সত্তাতন্ত্রে এইভাবে এককালে বহুকালের (Synchrony in Diachrony বা উলটোটাও) উপস্থিতি-অনুপস্থিতি/স্মৃতি-বিস্মৃতির খেলায় কোথায় যেন হারিয়ে যায়। এই হারানো এবং না-হারানোর গপ্পোটাকেই বলা হয় “Genealogy”১, “History” নয়।
এই একক ব্যক্তিসত্তার মধ্যে কালের অণুক্রমে আকাল ধরে, নাকাল হয় ব্যক্তিসত্তা অপর-কৃত মগজধোলাইয়ে। তখনই তৈরি হয় মূল-মৌল-মৌলিকের নির্মনন অনুসন্ধান। দেরিদা যাকে বলেন “genealogical fantasy” বা কুলুজির খোয়াব। না, ভুল বললাম, মন আর অনুসন্ধিৎসু থাকে না, বরং গায়ের জোরেই বলে ফেলা যায় “আমার কব্জির ঘড়িটাই ঠিক চলছে, তোমারটা ভুল।” ফলত, যে-কোনো মতবাদই তখন হয়ে উঠতে পারে মৌলবাদ, যখন আমরা ‘অন্যান্য’ মননের পর্বান্তরগুলো আর খেয়াল করি না।
শুরু করা যাক আমার নিজস্ব মৌলবাদ দিয়ে। আমি “জাতে” নাস্তিক, এবং অজ্ঞেয়বাদীও বটে। এবার আমি বলে ফেললুম: “একগামী বিষমকামী পুনরুৎপাদক পরিবারই একমাত্র পরিবার।” এর ফলে বিভিন্ন কৌমের পরিবারের বহুত্বকে পাত্তাই দিলাম না। আমি নিজেকে “হিঁদু বামুন নই” বলে ঘোষণা করা সত্ত্বেও যখন বিভিন্ন সময়ে সার্ভে করতে আসা লোকজন আগে থাকতেই লিখে রাখেন আমি নাকি “High Caste Hindu Brahmin”, তখন আমি রেগে যাই। শাঁখা-পলা-সিঁদুর দেখলে খচে বোম হয়ে যাই। স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টে বিয়ে করবার সময় বামপন্থী রক্তীয়রা যখন আমায় চেপে ধরেন সিঁদুর-মালাবদল ইত্যাদি কম্ম করতে, তখন আমি চুপসে ছোটো হয়ে যাই। সেখান থেকে “হাগা পেয়েছে” বলে পালাতে পারি না। তাহলে আমিও কি মৌলবাদের খপ্পরে পড়ে যাচ্ছি না? হোরখেইমার ‘কর্তৃত্বব্যঞ্জক ব্যক্তিত্ব’ (Authoritarian Personality) নিয়ে কথা বলেছিলেন— এই ধরনের ব্যক্তিত্বের স্বলক্ষণগুলো চিহ্নিত করেছিলেন। আমার নিজের মৌলবাদী কর্তৃত্বব্যঞ্জক ব্যক্তিত্বকে যদি না চিহ্নিত করতে পারি, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আপুনার মুখ যদি আপুনি না দেখি, তাহলে অন্য মৌলবাদকে কি আমি নেতিবাচক সমালোচনা করতে পারি? ফুকো বলবেন:
The strategic adversary is fascism... the fascism in us all, in our heads and in our everyday behavior, the fascism that causes us to love power, to desire the very thing that dominates and exploits us. (নজরটান সংযোজিত)
আমি স্বয়ং “মূল-মৌল-মৌলিক”, origin-al-এর আধিবিদ্যক সন্ধান কি করি না? এই মৌলিকতা খোঁজার ভেতরে কি মৌলবাদ নেই? ধরা যাক যাঁরা বলেন “মৌলিক কবিতা” লিখেছেন, তাঁরা টি এস এলিয়টের এই জবানিকে কীভাবে দেখবেন?
Immature poets imitate; mature poets steal; bad poets deface what they take, and good poets make it into something better, or at least something different. The good poet welds his theft into a whole of feeling which is unique, utterly different from that from which it was torn. (নজরটান সংযোজিত)
এলিয়ট এখানে মৌলিকতার দাবিকেই একরকম অস্বীকার করছেন।
আমরা অনেক আগেই শ্রীমধুসূদনের কাছে এমন উক্তি পেয়ে গেছি:
নরাধম আছিল যে নর নরকুলে
চৌর্য্যে রত, হইল সে তোমার প্রসাদে,
মৃত্যুঞ্জয়, যথা মৃত্যুঞ্জয় উমাপতি!
হে বরদে, তব বরে চোর রত্নাকর
কাব্যরত্নাকর কবি! (নজরটান সংযোজিত)
আদতে দার্শনিক মনন তো হুমায়ুন কবীরের (কান্টকে নিয়ে কিতাবে) যে কথা মোতাবেক এক চিত্ত থেকে অন্য চিত্তে সঞ্চারিত হয় মাত্র। তাই দর্শন কেউ কাউকে কক্ষনো শেখাতে পারে না।
কালিদাস ভট্টাচার্য তাঁর ‘ভারতীয় সংস্কৃতি ও অনেকান্ত বেদান্ত’ (১৯৮২) কিতাবে “মৌলবাদ”-কে অন্য অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। মোট দু-টি (জড়বাদ এবং আধ্যাত্মবাদ) মৌলিক মতবাদের ছাতার তলায় ৩+৫=৮টি উপবিভাগের ওপর নির্ভর করে যে বিশ্বব্যাপী জ্ঞানচর্চা হয়েছে, তা এই দ্বিকোটিক (binary) “মৌল”-বাদের মধ্যে ধরে যাচ্ছে। এই ধরনের মানেতে আজকাল আমরা মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার করি না। ভট্টাচায্যি মশাই আদতে কি Foundationalism২-এর কথা বলছেন, Fundamentalism নয়? হ্যাঁ। জ্ঞানের দুটো স্তম্ভের তিনি যা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা Foundationalism-এর সমার্থক। এখানেও “পর্বান্তর” শব্দটি কুলুজির সাপেক্ষে ন-অন্য বা অনন্য হয়ে উঠল। অনেকগুলো সম্ভাবনার (ন+এক+অন্ত=অনেকান্ত) পন্থা বা মার্গ খুলে দিল।
এই সূত্রেই এক নাস্তিকের গপ্পো মনে পড়ল। এক নাস্তিকের বাড়িতে হঠাৎ এক কচ্ছপ ঢুকে পড়ে। নাস্তিক কাজে বেরোতে যাবেন, কিন্তু তাঁর প্রস্থানকে বাধা দেন “অপর” রক্তীয়রা। কেননা, অপরের মতে এই কচ্ছপ দেখে কোনো কাজে যাওয়া “অশুভ”। এই অপরের কথা “দুত্তেরি ছাই” বলে নাস্তিক ভদ্রলোক হাঁটা দেন। এরকম প্রতিদিনই চলতে থাকে। হঠাৎ কয়েকদিন ধরে দেখা গেল ওই নাস্তিক ভদ্রলোক বাড়ি থেকে আর বেরোচ্ছেন না। কারণটাও আবিষ্কার করা গেল। ওই কচ্ছপটা মারা গেছে, তাই নাস্তিক ভদ্রলোক কচ্ছপ দেখে বাইরে বেরোনোর দীর্ঘকালীন অভ্যেসের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন। ওটাই এখন তাঁর (কু-)সংস্কার। অর্থাৎ, নাস্তিকতাও একধরনের মৌলবাদে পরিণত হতে পারে: “মনের মধ্যে নিরবধি শিকল গড়ার কারখানা।/ একটা বাঁধন কাটে যদি বেড়ে ওঠে চারখানা।”
যেমন ধরা যাক, ২০১৯ সালে নত্রেদাম গির্জার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ডকিন্স-হিচেনস্পন্থী কিছু New Atheist-রা উল্লাসে ফেটে পড়েন। তাঁরা মনেও রাখেন না ঐ গির্জের স্থাপত্যের নান্দনিকতাকে। তথাকথিত ধর্মকে ঘিরে যে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকলার সৃষ্টি হয়েছে, এ কথা তো অনস্বীকার্য। আমি যেমন মন্দির-মসজিদ-গির্জে ইত্যাদিতে যাই শুধুমাত্র স্থাপত্য দেখার তাগিদে। যেমন ধরা যাক, বেলুড় মঠের স্থাপত্য। প্রবেশপথে মসজিদের ধাঁচা, মাঝখানটা ক্যাথিড্রালের আদলে তৈরি, আর গর্ভগৃহ হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের নিদর্শন। এমন সংশ্লেষণাত্মক (syncretic) ব্যাপার-স্যাপারগুলো আজকাল বড়ো চোখ এড়িয়ে যায়। আমরা কি মনে রাখি বিসমিল্লা খাঁ সাহেবের মামা আলি বকশ বিলায়তু বেনারসের বিশ্বনাথ মন্দিরের নহবতখানায় সানাই বাজাতেন? এমনকি সেই বিশ্বনাথের মন্দিরের কেন্দ্রীয় “Dome” সম্পূর্ণতই ইসলামি স্থাপত্যের নিদর্শন। গুজরাটের সিদ্ধা সম্প্রদায় একই সঙ্গে সরস্বতী পুজোও করে, আবার কোরানও পড়ে। আমার মনে পড়ে যায় বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের কথা, যিনি নিজে হিঁদু দেবমূর্তি পুজো করতেন। গাঁধিজির পৈতৃক বংশ ছিল জৈন ‘মোধো’ সম্প্রদায়ের অংশ, যেখানে দেবী অম্বা/মোধেশ্বরী-এর মূর্তিপূজা উপাসনা নাস্তিক জৈন চিন্তাধারার সঙ্গে একীভূত হয়েছিল। গাঁধি পরিবারের ‘গুরু’ বাচারজি স্বামী, এই জৈন মোধো আনেকান্ত ঐতিহ্যের অংশ ছিলেন। অন্যদিকে, গাঁধিজির মা পুতলিবাই প্রণামী বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অংশ ছিলেন, যেখানে কোরান, বাইবেল এবং গীতা পাশাপাশি পড়ার অভ্যাস ছিল। উস্তাদ বিসমিল্লা খানের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্রে উস্তাদজি বলছেন, সাতসুরের (বা বাইশ শ্রুতির) লীলেখেলা ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বসঙ্গীতে বহমান।
এবার আমি এক খোয়াবি মজলিসে ঢুকে পড়ি। জেগে বা ঘুমিয়ে দেখতে পাই দারাসুকো খ্রিস্টীয় পাদ্রিদের কাছ থেকে বাইবেলের পাঠ নিচ্ছেন, আবার পাশাপাশি তথাকথিত “হিঁদু” মুনি-ঋষিদের থেকে উপনিষদের পাঠ নিচ্ছেন এবং ফারসিতে অনুবাদও করছেন।
স্টেডিয়ামের ভেতর ঢুকে পড়লাম। আহা, কী অসাধারণ এক ক্যাচ নিলেন কিরমানি! মুগ্ধ করল আজাহারের কভার ড্রাইভ। এঁরা খেলোয়াড়, কিন্তু হঠাৎ চোখে পড়ল একটা ব্যানারে লেখা আছে: “কপিল আজাহার ভাই ভাই।” যা ছিল বিস্মৃত, তা স্মৃত হল। এঁদের তো খেলোয়াড় হিসেবেই ভেবেছি। কখনোই মনে হয়নি এঁদের জাত-পাত-ধম্মের কথা।
খেলা দেখছিলাম টিভিতে— সবান্ধবে। একটা বিজ্ঞাপন এলো। কোনো এক বোতল ঠান্ডা পানীয়ের জন্য বিনোদ কাম্বলি এবং সচীন টেন্ডুলকর পাঞ্জা লড়ছেন। আজাহার এই মওকায় সেই ঠান্ডা পানীয়টি তুলে ঢকঢক করে খেয়ে ফেললেন। এতো খেলোয়াড়দের নিজস্ব খুনশুটি— যা বিজ্ঞাপনের দৌলতে এই তিনজন খেলোয়াড় এবং বোতল— সব্বাই পণ্যে পরিণত হচ্ছেন।
আমার এমত ব্যাখ্যা টিকল না। এক সংঘী অদ্ভুত এক ব্যাখ্যা দিলেন, যা আমাদের কারোর মাথায় আসেনি। তিনি বললেন, “দেখোঃ হিঁদু দলিত বস্তিবাসী কাম্বলি আর হিঁদু উচ্চবর্ণীয় সচিন নিজেদের মধ্যে লড়াই করছেন। এই সুযোগে মুসলিম আজাহার সমস্ত মুসলমানের প্রতিনিধি হয়ে আখের গুছোচ্ছেন।”
এইভাবেই তৈরি করা হয় ইসলামোফোবিয়া। অথচ আমরা ভেবে দেখি না ধনপিপাসী হিঁদুত্ববাদীরা যা করেন, তার ঠিক উলটোটা করেন জাকাত নির্ভর ইসলামরা। ইসলামে টাকার সুদ নেওয়া “হারাম”। এর একটি বিশেষ নাম আছে: “রিবা”। এই কারণে দেখতে পাই ভারতবর্ষে শুধুমাত্র ইসলাম সম্প্রদায়ভুক্ত গ্রাহকদের ১৩০০৪৫২৪১৯৯৯৯৯.৯৮ টাকার সুদ ব্যাংকে আর এল-আই-সিতে পড়ে আছে। অন্য দিকে হিঁদুত্ববাদীদের খাতে Electoral Bonds, PM CARES Fund (আগমার্কা সরকারি, নাকি বেসরকারি?), পার্টি ফান্ড, স্বেচ্ছাকৃত ঋণখেলাপ ইত্যাদি মারফত এক বিপুল পরিমাণ টাকা ঢুকেই চলেছে। স্রেফ স্বেচ্ছাকৃত ঋণখেলাপ করেই প্রায় ৮৭,২৯৫ কোটি জনগণের টাকা মেরে দিয়ে পাখি হয়ে উড়ে যায়…এদের মধ্যে কেবল ২৬২৩ জন ঋণখেলাপী আজ প্রায় ১.৯৬ লক্ষ কোটি টাকা ডাকাতি করে পলাইছে। অরওয়েলিয় ভাষায় এদের ঋণ “write off” করবার নামে আদতে “waive off” করা হয়েছে।
স্বদেশী আন্দোলনের ক্ষেত্রে অনেকেই আজও জিজ্ঞেস করেন: ইসলামপন্থীদের এ আন্দোলনে ভূমিকা কি? তাঁরা মনে রাখেন না সংঘ পরিবারের কেউ স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা তো দুরস্ত, বরং ব্রিটিশদের সঙ্গে বারংবার সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের নাম স্মরণ করা যাক:
১। আজিমুল্লা খান “মাদারে বতন ভারত কি জয়” স্লোগানটি দেন।
২। আবিদ হাসান সাফরানি “জয় হিন্দ” স্লোগানটি প্রথম বলেন।
৩। “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানটি মৌলানা হাসরাত মোহানির, যা পরবর্তীতে জনপ্রিয় করেন নাস্তিক শহিদ-এ-আজম ভগৎ সিং।
৪। “সাইমন গো ব্যাক” এবং “ভারত ছোড়ো” স্লোগানদু-টি য়্যুসুফ মেহের আলির।
৫। “সারফারোসি কি তমন্না অব হামারে দিল মেঁ হ্যায়” গানটি লেখেন বিসমিল আজিমাবাদি।
৬। তরানা-এ-হিন্দঃ “সারে যাঁহা সে আচ্ছা” লেখেন মহম্মদ ইকবাল।
৭। সুরাইয়া তয়াবজি ভারতীয় ফ্ল্যাগের প্রাথমিক নকশা প্রস্তুত করেন।
এছাড়া আশফাকউল্লা খান, মৌলানা আজাদ, মৌলানা শউকত আলি, বদরুদ্দিন তয়াবজি, আসাফ আলি, খান আব্দুল গফফর খান (তাছাড়া নাম না জানা আরও বহু মানুষজন)– এঁদের কথা তো আমরা প্রত্যেকেই জেনেও জানি না।
এই কথাগুলো বললুম নির্মিত ইসলামোফোবিয়াকে তাড়ানোর তাগিদেই। মানুষ হিসেবে ইসলাম, হিঁদু বা অন্য কোনো ধর্মসম্প্রদায়ের লোক মানুষেরই স্বভাবগত আচরণ করেই থাকেন। অর্থাৎ কিনা, মানুষের রিপুদল যে-কোনো ধার্মিক সম্প্রদায়েই থাকতে পারে। ধরা যাক সিরিয়ার কথা। একই ইসলামপন্থীদের মধ্যে অজস্র বিভাজনের দৌলতে মারামারি কাটাকাটি চলছে। আবার জর্মানিতে অত্যাচারিত ইহুদীরা এখন প্যালেস্তাইনে অত্যাচারী হিসেবে ভূমিকা-বদলের (role-reversal) রক্তাক্ত খেলায় মেতেছেন। তালিবানরা মৌলবাদকে যে হিংস্রতা নিয়ে খ্যামতার খেলা খেলছেন, তা অবশ্যই নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। আশ্চর্য ব্যাপার, ভারতবর্ষের হিঁদুত্ববাদী সরকার/ পার্টি (সরকার, রাষ্ট্র, পার্টি, ব্যক্তিনাম আজকাল গুলিয়ে-মুলিয়ে একাক্কার হয়ে গেছে। এদের মধ্যে যেসব তফাত আছে, তা বেমালুম ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে!) ২০২৪ এবং ২০২৫-এর বাজেটে যথাক্রমে ২০০ কোটি এবং ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। তাহলে কি ধর্মীয় মৌলবাদ ছাড়াও অন্য কোনো খ্যামতার খেলা আছে? ব্যাপারটা আর-একটু পরে পাড়ব।
এখানে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে ১৯২৫-এ তৈরি হওয়া এক সংঘের ভূমিকা সম্পর্কে। আজ ১০০ বছর বাদে এই সংঘীদের আস্ফালনে যা ঘটে চলেছে, সেটাকে ধর্মীয় “সাম্প্রদায়িক” মৌলবাদ ছাড়া আর কী বলবো।
“সাম্প্রদায়িক”? দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় চালু যেসব শব্দ আছে, যেমন “পন্থা”, “মার্গ” ইত্যাদির মতোই “সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটিও খুব ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহার করা হত। যেমন, অক্ষয় কুমার দত্তের ভারতবর্ষীয় উপাসক “সম্প্রদায়” বইটাতে “সম্প্রদায়” শব্দটি কোনো নেতিবাচক অর্থ বহন করে না। তার ওপর “সাম্প্রদায়িক”-এর ইংরেজি করা হয় কম্যুনাল। আমার চেনা এক লেখক যখন ভারতীয় কম্যুনালিজমের ওপর একটি লেখা ব্রাজিলে পাঠান, তখন সেখান থেকে প্রশ্ন করা হয়: “কম্যুনাল” শব্দটাকে খারাপভাবে বলছেন কেন? কম্যুনাল মানে তো সমাজতন্ত্রী দর্শনে একরকমের কৌমনির্ভর মিলে-মিশে থাকা! তখন সেই লেখককে এই শব্দের অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক মানে বোঝাতে হয়। এই শব্দটি যখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এসে যায়, তখন যে-কোনো বিরোধীদের কাছে ধার্মিক রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত “সম্প্রদায়”৩ ভেন্ন মানে পায়। সেই ভক্তিময় রাষ্ট্র এই সেক্যুলার মাকুদের তখন বলেন: “অ্যান্টি-ন্যাশানাল”, “লিবারান্ডু”, “আর্বান নকশাল”, “টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং”, “ওক” ইত্যাদি। আবার সেকু-মাকুরা এঁদেরকে পালটা বলেন: চাড্ডি, তানাশাহ, জুমলাবাজ, ভাগোয়া, ধোকেবাজ ইত্যাদি।
সংঘ পরিবার যে আজকের মূল্যবোধ দিয়ে এক ‘সনাতন’-কে সাব্যস্ত করেছেন (আবার genealogy!), যেমন নেশন-স্টেটের আহৃত ধারণা, তাতে নির্মনন অ-দার্শনিকতা দেখতে পাই। তবে ব্যবসার জগতে এর “দাম” আছে।
এই যেমন সেদিন গেছিলুম এক “বৈদিক বিবাহে”। এখন এটার খুব চল হয়েছে (বাজার আছে)। মহিলা পুরোহিত এক-একজন এক-একভাবে এটা অনুষ্ঠিত করেন। এক পুরুতিনির দল নারীর বিয়ের সময় নারী যদি ঋতুস্রাবী হয়ে পড়ে, তখন তাঁরা সেই নারীকে “অসূচী” জ্ঞানে প্রায়শ্চিত্ত তথা শৌচকর্ম করান। আবার তারই সঙ্গে নারীর সম্প্রদান ক্রিয়াও করে থাকেন। মেয়েকে অন্যান্য দ্রব্য-সামগ্রীর মতো “মাল” হিসেবে মেয়ের বাপ জামাইয়ের হাতে কাম-চরিতার্থতার জন্য তুলে দিচ্ছেন। এইসব দেখে হাসিও পায়, কান্নাও পায়। নিয়ম আছে, বিয়ের সময় অরুন্ধতী-বশিষ্ঠ নামক যমজ তারাদের (Mizar এবং Alcor) মধ্যে অরুন্ধতীকে দেখে নিতে হয় বিবাহ অনুষ্ঠান চলবার সময়েই। কিন্তু বৈদিক, অবৈদিক যে-কোনো বিবাহ অনুষ্ঠানে ছাদনাতলা ছেড়ে ছাদে গিয়ে টেলিস্কোপে চোখ রেখে কেউই এই অরুন্ধতী নক্ষত্রকে দেখেন না। ওটা মন্ত্রোচ্চারণেই থেকে যায়। যদিবা টেলিস্কোপ নিয়ে এই কাণ্ড করা হয়, তাহলেও এই নক্ষত্র শহুরে আবহাওয়ায় দেখতে পাওয়া কষ্টসাধ্য, কারণ ধোঁয়াশায় ভরে গেছে মহাকাশ। হ্যালোজেন বৃষ্টিতে নীলিমায় নীল মহাকাশ আর দেখা যায় না। এই মানেহীনতার জায়গাতেই বারংবার গজিয়ে ওঠে মৌলবাদ।
খেয়াল করবেন পাঠক, আজকে বসে তিন হাজার বছর আগের বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান এই জেনিওলজিকেই সাব্যস্ত করে। যে যজমানিরা এই অনুষ্ঠান করেন, তাঁরা তথাকথিত “বৈদিক যুগ”-কেই সমকালে স্থাপন করেন এবং একেই “প্রগতি” বলে ঠাওরান। এটাই কি প্রগতির, নাকি প্রত্যাগতির পথ? সরলরৈখিক সময়জ্ঞান এখানে বিলুপ্ত।
এই বৈদিক বিবাহ প্রসঙ্গেই মনে পড়ল মেঘনাদ সাহার বিখ্যাত এক প্রবন্ধের কথা: “সবই ব্যাদে আছে”। তথাকথিত হিঁদুদের হিংস্র অস্পৃশ্যতা সাহামশাইকে সুঁড়ির ছেলে বলে পরিত্যাগ করলে কি হবে, এই সুঁড়িসন্তানই সংস্কৃত ভাষা গুলে খেয়েছেন। মেঘনাদ সাহা বিলেত থেকে Ionisation Equation নিয়ে কাজ করে ফেরার পর, এই তরুণ বিজ্ঞানীকে প্রশ্ন করা হয়: “অরে মেঘনাদ, তুই আর কি করলি?” মেঘনাদ সাহা যাই বলেন, ওই উকিল ভদ্দোরলোক সব কথাতেই বলেন: “সবই ব্যাদে আছে”। মেঘনাদ সাহা পরিপ্রশ্ন করেন: কোথায় আছে বলতে পারবেন কি? এ বিষয়ে সাহামশাইয়ের প্রবন্ধ থেকে কয়েকটা অংশ পড়ে নেওয়া যাক:


তাই হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে মনে রেখে বেদের কবিতাগুলোর রসাস্বাদন করতে চাইছি কেবল, কেননা মহামহোপাধ্যায় বলেছেন: বেদের সায়ন-কৃত সংকলন প্যালগ্রেভ গোল্ডেন ট্রেজারির মতোই একটা কিতাব মাত্র।
মেঘনাদ সাহার এই বয়ানগুলো পড়তে পড়তে হঠাৎ করেই মনে হল এই সুঁড়ির ছেলেটিই যথার্থ ‘ব্রাহ্মণ’। তাহলে কি আমি হিঁদুদের বিমারি, জাতপাত-ব্যবস্থাকে সমর্থন করছি? আজ্ঞে না। ব্রহ্মজ্ঞানকে আমি জ্ঞানশীর্ষ হিসেবে ধরছি এবং ব্রাহ্মণকে আমি প্রজ্ঞাবান মানুষ হিসেবে ধরে নিচ্ছি। একইসঙ্গে আমি হিঁদুদের মনুসংহিতা-নির্ভর জাত-পাত ব্যবস্থাকে তীব্র ঘেন্নায় “জয় ভীম” বলে এই মূহুর্তে নবযানী হয়ে উঠছি।
একটা গপ্পো মনে পড়ল। কিশোর সত্যকাম গিয়েছিলেন মহর্ষি গৌতমের কাছে ব্রহ্মবিদ্যা শিখতে। গৌতম তাঁর গোত্র জানতে চান। সত্যকাম তো সেটা জানেন না। মাকে জিজ্ঞেস করলেন। মা কইলেন,
যৌবনে দারিদ্র দুখে বহুপরিচর্যা করি পেয়েছিনু তোরে, জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে, গোত্র তব নাহি জানি তাত।
সত্যকাম পরের দিন ফের গৌতমের কাছে এসে মা জবালার কথাই পুনরাবৃত্ত করলেন। ছাত্রদের মধ্যে কেচ্ছাগন্ধী গুঞ্জন উঠল। কিন্তু,
…উঠিলা গৌতম ঋষি ছাড়িয়া আসন, বাহু মেলি বালকেরে করিয়া আলিঙ্গন কহিলেন, “অব্রাহ্মণ নহ তুমি তাত। তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত।
এই হল গিয়ে ছান্দ্যোগ্য-উপনিষদে জবালা-সত্যকাম কাহিনি।
এইখানেই মানবগোত্রে থিতু হয়ে (strategic essentialism হিসেবে) সহিষ্ণুতার রাজনীতির কথা পাড়ি। জৈনদের দর্শন অনেকান্তবাদে এই সহিষ্ণুতার নিদর্শন মিলবে। কেননা এখানে কাউকে হিংস্র বর্জনের নীতি নেই। আছে গ্রহণের নীতি। যাকে আমি আপাতত মেনে নিচ্ছি আমার যৌক্তিক কার্যক্রমে, তাকে আমি স্বীকৃতিগ্রহণ (temporary conditional commitment of selected hypothesis) করছি। অন্যদিকে যাকে আমি যৌক্তিকভাবে মেনে নিতে পারছি না, তাকে অস্বীকৃতিগ্রহণ (non-committal legitimate possibilities) করছি।
কিন্তু এই সহিষ্ণুতা কতদূর অবধি সহনশীল থাকবে? যাকে অসহ্য মনে হচ্ছে, তাকে যদি সহ্য করি, তাহলে তার মাথায় চড়ে বসবার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এখানেই আসে প্রতিরোধের ভূমিকা। এ যেন খাল কেটে কুমির আনা। প্লাতোকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একেই পপারসাহেব বলেছেন: “Paradox of Tolerance”৪।
কিন্তু কতটা সহ্য করব? সহ্যের তো একটা সীমা আছে।
সমকালেও দেখি বৈদিক তথা সনাতন (“most oldest”?!?) ধর্মের চূড়ান্ত বাড়বাড়ন্ত। চন্দ্রযান পাঠাতে তাই ঘটা করে নারকোল ফাটানো হচ্ছে; আই-আই-টি মাদ্রাজের ডিরেক্টর গোমূত্রকে “anti-bacterial” এবং “anti-fungal” হিসেবে প্রচার করছেন; কোথাকার এক জজসাহেব বলছেন ময়ূরের সংগম হয় চোখের ইশারায়; আমাদের বর্তমান আইনমন্ত্রী অর্জুন মেঘোয়াল করোনার সময় বলেন যে ভাবিজি পাঁপড় খেলে করোনা সেরে যায়; আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলছেন প্রাচীন ভারতে গণেশের প্লাস্টিক সার্জারির কথা, সেই প্রধানমন্ত্রীই আবার শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির বাড়ি গিয়ে গণপতি বাপ্পার পুজো করে ছবি এবং ভিডিও প্রচার করছেন; সেই প্রধান বিচারপতি তিন-চারমাস ধরে ধ্যান করে প্রভু শ্রীরামের দ্বারা প্রত্যাদিষ্ট হয়ে রাম মন্দিরের মতন একটা বিষয়ে রায় দিচ্ছেন; The Royal Society of Tropical Medicine & Hygiene থেকে প্রকাশিত যৌথভাবে “বৈজ্ঞানিক”-দের একটি লেখায় বলা হচ্ছে “Einsteinian Pain Waves”-এর কথা। প্রচুর গোহত্যার জন্য সেই গোরুদের অন্তিম কান্নায় পৃথ্বী এতটা ব্যথিত হচ্ছে, যে তা কাঁদিয়ে-কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি মহাকুম্ভের ব্যাপক গণ-হিস্টিরিয়া ভুলিয়ে দিচ্ছে গঙ্গার শোচনীয় অবস্থা তথা দূষিত জলের কথা। বরং দেখা যাচ্ছে যে রাম মন্দিরের প্রয়াত পূজারিকে সরযূর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।৫
সংবিধানে উল্লেখিত Secularism (যদিও বলি “সর্বধর্মসমভাব”, য়ুরোপীয় অর্থ কিন্তু “not religious, not spiritual”) এবং Article 51A(h)৬-এর বিস্মৃতি এখানেই গন্ডগোল পাকাচ্ছে।
মৌলবাদের এই জেনিয়োলজির আর্কেয়োলজি ঘাঁটতে গিয়ে গোমাতা তার দুটো শিং বাগিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে। আমার পেছনে শুধু দেওয়াল, দেওয়ালে লেপটে আছি আমি, গোমাতার দুই শিং-এর মাঝখানে। ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি। খলিফ উমর ইবন আল-খাত্তাব (৬৪২ খ্রিস্টাব্দ) আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি পোড়ানোর হুকুম দিয়ে বলেন যে আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির সমস্ত বই পোড়ানো উচিত কারণ: “either they contradict the Koran, in which case they are heresy, or they will agree with it, so they are superfluous.” এই “horns of dilemma”-য় আটকে গিয়ে দেখি আর-এক মৌলবাদ এসে হাজির হচ্ছে।
এমন মজলিস চলতে চলতেই সহিষ্ণুতা যখন অসম্ভব হয়ে ওঠে, তখন দেখি কবীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপরে আমায় শুধোলেন: “তুমি তো বাপু মুক্ত বাজারের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। আচ্ছা বলোতো, তোমরা আমার গানকে এমন বিকৃত করো কেন? “মোকো কাহাঁ ঢুন্ডেরে বন্দে”-র শেষ লাইন আমি বলেছিলুম “ম্যায় তো হুঁ শ্বাসও কি শ্বাস মেঁ”, তোমরা সেটাকে পালটে করে দিলে “ম্যায় তো হুঁ বিশ্বাস মেঁ”। আমাদের যুগকে নাম দিলে “ভক্তি”যুগ বলে। যদি আমার দোঁহাগুলো শোনো, সেখানে প্রেমের ঢাই আখর আছে। সেটাকে তোমরা যদি ‘ভক্তি’ হিসেবে ঠাওরাও, তাহলে তো মহা মুশকিল। প্রেম আর যুক্তি এই দুটোই কি একসঙ্গে থাকতে পারে না? আমাদের মতো দলিতদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন যিনি, সেই বাবাসাহেবের একটা কথা শোনো: “For in India, Bhakti or what may be called the path of devotion or hero-worship, plays a part in its politics unequalled in magnitude by the part it plays in the politics of any other country in the world. Bhakti in religion may be a road to the salvation of the soul. But in politics, Bhakti or hero-worship is a sure road to degradation and to eventual dictatorship.”
কবীর এই বাজার থেকে বেরিয়ে গেলেন, এবং মৃত্যুর ঠিক আগেই মণিকর্ণিকা ঘাটের পবিত্রতাকে লাথি মেরে চলে গেলেন মগহর।
কেয়া কাশী ক্যায় মগহর ঊষর জো পে হিরদয় বস মোরা জো কাশী তন তজে কবীরা রাম হি কৌন নিহোরা।
এই “রাম” হিঁদুত্ববাদীদের “রাম” নন, এ সুফি ঐতিহ্যের “রাম”।
লোকের ধারণা আছে, মণিকর্ণিকায় পুড়লে স্বর্গলাভ হয়। এই প্রস্থানপথ এসেছে যুক্তিধারার পথেই। একে শুধু “ভক্তি” বলে খাটো করা যায় না। এমনকি য়্যুরোপের ইতিহাসের হনুকরণ করে আঁধারময় “মধ্য” যুগবিভাগও করা যায় না।
কবীরকে আজকের পরিপ্রেক্ষিতে পড়তে হলে যে পঙ্ক্তিদ্বয় আমার মাথায় আসে, তা হল:
কবীরা খাড়া বাজার মেঁ, মাংগে সবকি খ্যার, না কাহুঁ সে দোস্তি, না কাহুঁ সে ব্যয়র!
আজকের মৌলবাদী সন্ত্রাস দেখে “দেখ কবীর রোয়া”। তাঁর বলা “বাজার”-কে আজকের মুক্ত বাজারে দাঁড়িয়ে এমন কথাই উচ্চারণ করতে হচ্ছে। কবীর কাঁদছেন। পণ্য সম্ভারে ভরে গেছে বিশ্ব। সোক্রাতিস এ মল, ও মল ঘুরতে ঘুরতে বলছেন: “এসব আমার কী প্রয়োজনে লাগবে, বলতে পার?” অন্যদিকে মোল্লা এবং পণ্ডিতরা কবীরের মতন “নীচু” জাতের লোককে বৈরী ভাবনায় বেগানা করে দিচ্ছে।
পণ্য কেনা-বেচা হয় একটি অসম চিহ্ন দিয়ে: টাকা। আমরা যখন বলি, ১ বোতল ঠান্ডা পানীয় = ৫০ টাকা, তখন এই “=” কীভাবে বসাচ্ছি? এর আবশ্যিক এবং পর্যাপ্ত শর্তগুলো কী কী? বণিকের পৃথিবীতে ব্যক্তিগত মালিকানা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে— ব্যক্তিগত পুঁজি-সম্পর্কের “মুক্ত” প্রবাহ অপর ৯৮% লোকের হৃদরোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। “বাঁদিকের বুকপকেটটা সামলাতে সামলাতে লোকটার ইহকাল-পরকাল গেলো”! নিসর্গকে ধরে নেওয়া হচ্ছে মাগনা। তার ফলে যুদ্ধাস্ত্র থেকে ওষুধ অবধি যা কিছু আছে, তা নিসর্গনাশক হয়ে উঠছে।
একেই আমরা বলব: “বাজারি মৌলবাদ” (Market Fundamentalism)। ধর্মীয় মৌলবাদ আদতে একটি মুখোশ। ওদিকে বিশ্বব্যাপী “বৃহৎ বাজার” মানব আর না-মানবকে use value থেকে exchange value-র ভেতরে পুরে ফেলছে। অর্থাৎ, ধর্মীয় মৌলবাদ প্রমুখন (foregrounding) করে, আড়ালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে (foreclose) বাজারি মৌলবাদকে। কেন এমনটা করা হচ্ছে? ধর্মীয় মৌলবাদ দিয়ে যদি দ্বন্দ্ব তৈরি করা যায়, তাহলে pre-debt-or canni-ballistic পুঁজিবাদের সুবিধে হয়, ধার দেওয়ার পরিমাণ বাড়তে থাকে। World Bank-International Monetary Fund-World Trade Organization নামক তিনটি সন্ত্রাসী সংস্থার লাভের গুড় পিঁপড়েতেও খেতে পায় না। এই টাকা-রূপক নির্ভর অর্থনীতির এইভাবেই বাড়বাড়ন্ত হতে থাকে। শকুনের মতো আমাদের ছিঁড়ে খায় শেয়ার বাজারের ষাঁড়-ভালুকেরা। এই ‘অর্থ’-কে নেতিকৃত করাই মানুষের তৈরি করা নিসর্গ-প্রলয়কালে সবচেয়ে বেশি জরুরি।
এক কথায় বলা যায়, কেনা-কেনা বাতিগ্রস্ত উপভোক্তা নির্মাণ করছে বিশ্বের কতিপয় অতিধনী ধনপতি সেঠরা। এই বাজারকে নেতিকৃত করব কীভাবে? নরখাদক, জংলি, অসভ্য, সুদখোর কতিপয় পুঁজিপতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই অবস্থা-ব্যবস্থাকে নেতিকৃত করে অন্য পর্ব বা পর্বান্তরে যাব কী করে?
এই গভীরতর psychosis-কে বোঝানোর জন্য আমি বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করে শেষ করছি। কলোনির প্রান্তিকতায় সাদা মানুষদের মৌলবাদ জ্ঞানতত্ত্বকেও ছেড়ে কথা কয় না:

কৃতজ্ঞতা : আখর বন্দ্যোপাধ্যায়
অন্তিম টীকা :
১ মিশেল ফুকোর কাছ থেকে এই পরিভাষাটা শেখা, যদিও নিৎসে এই শব্দবন্ধটির উদ্ভাবক। জ্ঞানের এই অনুক্রম সরলরেখায় চলে না। সত্য, উৎস খোঁজার আধিবিদ্যক বিমারিকে চিহ্নিত করে। “আজিকার যাহা ভালো”-কাল “যদি হয় তাহা কালো” বা উলটোটা, তাহলে “মূল্য”-আরোপের ফন্দিফিকিরগুলোকে সমঝে নিতে হয় জ্ঞানীয় প্রত্নতাত্ত্বিককে। এই genealogy-র পরিপ্রেক্ষিতে আদি-মধ্য-আধুনিক যুগ সরলরৈখিক ইতিহাসে চলে না, চলে মনোভঙ্গিমার ভিত্তিতে। একই ক্যালেন্ডারের কালে একাধিক জ্ঞানাণুর (epistemes) উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি থাকতে পারে।
২ একসময় ভাবা হয়েছিল জ্ঞানের উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে নির্ঘাত। সমুদ্রের তল অবশ্যই মিলে যাবে— “bedrock must be found”! য়ুলিয়াম জেমস তাঁর ব্যাবহারিক বা প্র্যাগমাটিক্ দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে এমনই ভাবতেন। আবার গণিতজ্ঞ হিলবার্ট সাহেব পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যাকে গণিতের মধ্যে ধরে ফেলবেন বলে ভাবছিলেন। ফিজিক্সের জগতেও ভাবা হল “Theory of Everything, final theory, ultimate theory, unified field theory, or master theory”-কথা। কিন্তু, এই রকম সর্বগ্রাসী আকরণ-তত্ত্বেরও ছ্যাঁদা বেরিয়ে গেল Russell’s Paradox আর Kurt Gödel-এর theorem-এর দৌলতে। আদতে ভিত-বিশ্বাসকে বিশ্বাস করে তৈরি হয় একবগ্গা মোনোলিথিক বাড়ির স্থাপত্য। তাই Axiom-এর ইস্কুলি পরিভাষা তৈরি হয় “স্বতঃসিদ্ধ”। এদিকে অমর্ত্য সেন আর অশোক রুদ্র মিলে স্বতত সিদ্ধের সিদ্ধির পথে বাগড়া দিয়ে বলেন প্রাক্সিদ্ধের কথা। আরে বাপু, প্রথমে (কোনটা প্রথম?) যেটা ধরে নিচ্ছি ঠেকো উপকল্প (ad hoc hypothesis) হিসেবে তা’ এই মুহূর্তে চুরমার হয়ে যেতে পারে— এই সম্যক-ভাবনার মধ্যেই আছে মৌলবাদকে উতরে যাওয়ার প্রয়াস।
৩ “সাম্প্রদায়িকতা” আর “মৌলবাদ”-এর তফাতটা খেয়াল রাখা জরুরি। কোনো সম্প্রদায় নিজেদের মোটামুটিভাবে চিহ্নিত করে “না” দিয়ে: “ওরা চারটে বে’ করে, আমরা করি না” (হায়রে, কৌলীন্যের ন্যক্কারজনক ইতিহাস!), “ওরা গরুর মাংস খায়, আমরা খাই না” (বৈদিক ঋষিরা এই গোমাংস বড়োই পছন্দ কোরতেন)… এই নেতিকরণের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয় সম্প্রদায়। অন্যদিকে মৌলবাদ যে-কোনো সত্যঘরের little box-এর ভেতর তৈরি হতে পারে।
৪ “Unlimited tolerance must lead to the disappearance of tolerance. If we extend unlimited tolerance even to those who are intolerant, if we are not prepared to defend a tolerant society against the onslaught of the intolerant, then the tolerant will be destroyed, and tolerance with them.— In this formulation, I do not imply, for instance, that we should always suppress the utterance of intolerant philosophies; as long as we can counter them by rational argument and keep them in check by public opinion, suppression would certainly be unwise. But we should claim the right to suppress them if necessary even by force; for it may easily turn out that they are not prepared to meet us on the level of rational argument, but begin by denouncing all argument; they may forbid their followers to listen to rational argument, because it is deceptive, and teach them to answer arguments by the use of their fists or pistols. We should therefore claim, in the name of tolerance, the right not to tolerate the intolerant.” ( The Open Society and Its Enemies-এর সপ্তম অধ্যায়ের নোট ৪ দেখুন। ২৯২ পাতা। Routledge Classics)
৫ আজকাল দেখছি সুনীল সহস্রবুধের মতন কেউ কেউ অ-“লৌকিক” বিদ্যার সাপেক্ষে “লোকবিদ্যা”কেই আপেক্ষিক গুরুত্বপ্রদান (relative importance) করছেন। রাজা-গজা-মন্ত্রী থেকে প্রজারা যে কাণ্ডকারখানা করছেন, তাতে ‘বিদ্যে’ ব্যাপারটা ভোগে চলে গেছে। যে নমুনাগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো “লোকবিদ্যা”, নাকি অ-“লোক”-বিদ্যা? এই ধরনের দ্বিকোটিকের মধ্যে আপেক্ষিক গুরুত্বপ্রদান বা কোনো একটিকে প্রিভিলেজ দেওয়ার মধ্যে মৌলবাদ লুকিয়ে আছে।
৬ “…to develop the scientific temper, humanism and the spirit of inquiry and reform.”