সঞ্জীব দাস
বিদগ্ধ সাহিত্যিকেরাই বাগধারাগুলো ভাষায় আহরণ করেছেন বেশিরভাগ মাটির কাছাকাছি লোকেদের কথাবার্তা থেকে। এই জন্যে এগুলো সাধারণত মাটির রসে নিষিক্ত। লেখকদের মনে এই চেতনা না থাকলে অনেক সময় বাগধারার প্রয়োগ তাঁদের বিপদে ফেলে, শ্রীসুভাষ মুখোপাধ্যায়কেও ফেলেছে। তিনি ‘গতর নেবে গো, গতর’ ফেরিওয়ালার এই হাঁক হেঁকেই তাঁর বই শুরু করেছেন। কিন্তু গতর বেচা কি অভিধানসম্মত প্রয়োগ? ‘কম লেখাপড়া জানা মানুষদের কাছে’ মার্ক্সীয় অর্থনীতি পৌঁছে দেওয়ার ভার তিনি নিয়েছেন। তাঁরা নিশ্চয়ই কলকারখানা ও ক্ষেতখামারের মজুর এবং কৃষক। তাঁরা গতর বেচার কী মানে বোঝেন তা কি লেখক কোনদিন যাচাই করেছিলেন? আমরা খাঁটি বাংলায় অশ্লীল কথার উচ্চারণে লজ্জা বোধ করি। কিন্তু কথাটাকে খাঁটি সংস্কৃতে রূপান্তরিত করলে তখন তা উচ্চারণ করতে আমাদের আর বাধ বাধ ঠেকে না। বাংলা ভাষায় সংস্কৃত ভাষার ‘পণ্যাঙ্গনা’ কথাটার চলন আছে। তার মানে গণিকা। অঙ্গ থেকে অঙ্গনা কথা এসেছে। এর অর্থ অঙ্গ সৌষ্ঠবসম্পন্না নারী। এর সঙ্গে পণ্য যোগ হয়ে পণ্যাঙ্গনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এর মানে বিকৃত হয়ে হল গণিকা। অঙ্গনারা নিজেদের অঙ্গকে পণ্যে রূপান্তরিত করে যদি গণিকা হয়ে যায়, তবে সুভাষ মুখোপাধ্যায় গতরকে পণ্য করে তা বেচতে যান কোন সাহসে? তাঁর ও তাঁর বিদগ্ধ বন্ধুদের নিকটে সবিনয়ে প্রার্থনা জানাচ্ছি, তাঁরা একবার মাটির কাছাকাছি লোকদের, অর্থাৎ যাঁদের জন্যে বইটি লেখা হয়েছে তাঁদের ভিতরে গিয়ে জেনে আসুন তাঁরা গতর বেচার কী মানে বোঝেন।১
১৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৫৫ পশ্চিমবঙ্গ কমিটি
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি
—এই দীর্ঘ উক্তিটি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘ভূতের বেগার’ শীর্ষক গ্রন্থ সম্পর্কে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির তীক্ষ্ণ সমালোচনার সামান্য অংশ মাত্র। কার্ল মার্কসের ‘ওয়েজ লেবার এন্ড ক্যাপিটাল’ গ্রন্থের সারাৎসার সহজবোধ্য ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই গ্রন্থের রচনা। মার্কসীয় অর্থনীতির জটিল কথাগুলির এমন সহজশিল্পিত বয়ান বাংলা ভাষায় আর লেখা হয়েছে বলে মনে হয় না। অথচ অভিনন্দিত করা দূরে থাকুক, সেই দিন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্বের দ্বারা মর্মান্তিকভাবে তিরস্কৃত হয়েছিলেন সুভাষ। ‘গতর খাটানো’ শব্দবন্ধের অর্থ যে শ্রমদান একথা গ্রামের ছোটো-বড়ো সকলেই জানে। অথচ এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করার জন্য সেদিন ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় কবি-প্রাবন্ধিককে তীক্ষ্ণভাবে বিদ্ধ করা হয় । ‘ভূতের বেগার’ শিরোনাম নিয়েও জোটে লাঞ্ছনা-সমালোচনা। ‘ভূতের বেগার’ মানে যে শুধুমাত্র পণ্ডশ্রম নয়— একজন খাটছে আর তার ফল ভোগ করছে আর একজন— ভূতের বেগার শব্দবন্ধের এই গহন অর্থ ধরতে ব্যর্থ হন বিজ্ঞ নেতৃত্বমণ্ডলী। তাঁরা ভেবে নেন সর্বোপরি মার্কসের বস্তুবাদী অর্থনীতি ও দর্শনকে অলৌকিক তাৎপর্য দান করতেই লেখকের এই প্রয়াস। এ যে ভয়ানক অপরাধ। সুতরাং তাঁরা রে রে শব্দে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
একটু ভাবলে বোঝা যায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই গ্রন্থের ওপর কমিউনিস্ট পার্টি-নেতৃত্বের বিরাগের কারণ মার্কসবাদ সম্পর্কে তাঁদের মৌলবাদীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁরা মার্কসবাদকে যেভাবে বুঝেছেন ‘তাহাই একমাত্র সত্য’, লেনিন-স্টালিন যেভাবে মার্কসবাদের ভাষ্য ব্যাখ্যা করিয়াছেন (অন্তত নেতৃত্ব অক্ষম ইংরেজি অনুবাদের চশমার মধ্য দিয়ে যাহা বুঝিয়াছেন) ‘তাহাই অদ্বিতীয় সত্য’— এই গোঁড়ামি চালিত হয়েই সেদিন তাঁরা ‘ভূতের বেগার’-এর লেখককে বিদ্ধ করেন। কিন্তু ফল কী হল? সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘ভূতের বেগার’ কালজয়ী সৃষ্টির মর্যাদা পেল। আর সেই পরমবিজ্ঞ স্নবিশ নেতৃত্বকুল ইতিহাসের পাদটীকার অংশমাত্র হয়ে থাকলেন!
আমরা মর্মাহত হয়ে লক্ষ করি শুধু এ দেশে নয়, সারা বিশ্বজুড়েই কমিউনিস্ট পার্টিগুলিতে তাত্ত্বিক মৌলবাদ বারংবার অভূতপূর্ব চেহারা পেয়েছে। পার্টি নেতৃত্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য মার্কসবাদকে যেভাবে বোঝে সেই বোঝাটাই চূড়ান্ত। তার বাইরে গিয়ে চিন্তাভাবনা করলেই জুটেছে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ তকমা। স্রোতের প্রতিকূলে চলা সেই সদস্যকে একঘরে করে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, তাঁদের অনেকেরই ভাগ্যে নেমে এসেছে নির্মম পরিণতি। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটার সবচেয়ে বড়ো কারণ নেতৃত্বের এই মৌলবাদীসুলভ সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা। গোঁড়ামি।
অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। মার্কস থেকে লেনিন, মাও সে তুঙ চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে ছিলেন অসম্ভব উদার। মার্কসবাদীদের মধ্যে অনেকেই— যাঁদের পশ্চিমি মার্কসবাদী ধারার বর্গভুক্ত করা হয়— তাঁরা কিন্তু মার্কসবাদের প্রচলিত ব্যাখ্যানের বাইরে গিয়ে একেবারে সংস্কারমুক্তভাবে মার্কসবাদকে বুঝতে চেয়েছিলেন। তার অসম্পূর্ণ দিকগুলি সাহসিকতার সঙ্গে করেছিলেন চিহ্নিত। তাঁদের চিন্তাভাবনাকে গ্রহণ করলে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব সম্ভবত অত সহজে পতনের অতলে তলিয়ে যেত না। পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বামশাসন যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল, সরকার চলে যাওয়ার পর মাত্র এক দশকের মধ্যে প্রবল পরাক্রান্ত কমিউনিস্ট পার্টির গণভিত্তি যে কর্পূরের মতো উবে গেল তার কারণও নেতৃবর্গের মার্কসবাদ বোঝার ক্ষেত্রে গোঁড়ামি, নতুনভাবে স্বদেশের প্রেক্ষিতে মার্কসবাদকে বোঝা এবং সেইমতো প্রয়োগের ক্ষেত্রে শোচনীয় ব্যর্থতা। অনেক ক্ষেত্রে বিস্তৃত এবং গভীর পড়াশোনার অভাবও দায়ী।
এখন বিস্তৃতভাবে এই মৌলবাদের উৎসভূমি নিয়ে আলোচনা করা যাক। আমার আলোচনা মূলত কমিউনিস্ট মতাদর্শিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অনেক সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের মূল বুনিয়াদ মৌলবাদের মূলানুগত্যের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।
আমার মনে হয়, নির্ধারণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এই মৌলবাদের প্রথম এবং প্রধান উৎসভূমি। ইতিহাসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সনাতনী মার্কসবাদ চূড়ান্তভাবে যান্ত্রিক। এখানে পরপর কতকগুলো ধাপের কথা বলা হয় সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কের মতো। সিঁড়ির শুরুতে রয়েছে আদিম সাম্যবাদ। তারপর প্রথম সিঁড়িতে আছে প্রাচীন দাস ব্যবস্থা: তার ওপরে সামন্ততন্ত্র: তৃতীয় সিঁড়ি ধনতন্ত্র। সর্বশেষে আছে সাম্যবাদ। ছোটোবেলা থেকে দেখেছি পাড়ার জ্যাঠা-কাকা সম্পর্কের কমরেড থেকে, জেলা এমনকি রাজ্য কমিটির অনেক নেতা এই চেনা ছকটিকে সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করতেন। কেউ যদি কোনো মেধাবী প্রশ্ন করতেন, তবে জুটত তাঁদের অবজ্ঞা, উদ্ধত ধমকানি। প্রশ্ন হল ইতিহাস কেন, কোনোকিছুরই কি এমন সরল ব্যাখ্যা হয়? মার্কস তো নিজেই দেখেছেন শিল্পোন্নত দেশগুলিতে সাম্যবাদী বিপ্লব না হয়ে, বিপ্লব ঘটল সামন্ততান্ত্রিক রাশিয়ায়। তবে?
মার্কসবাদের দ্বিতীয় সমস্যা শ্রেণিকেন্দ্রিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। শ্রেণিসত্তার বাইরেও মানুষের আরও অনেকগুলি সত্তা আছে তা আমরা সকলেই জানি। যেমন সামাজিক সত্তা। যে সমাজে মানুষ বসবাস করে সেই সমাজের রীতিনীতি, প্রথা, সংস্কার তার ওপর অনপনেয় প্রভাব ফেলে। সেগুলিকে রাতারাতি জোর করে উৎপাটন করা যায় না। এগুলির বিশেষ চরিত্র ভালোভাবে বুঝতে হয়। সেই মতো প্রতিকারের ব্যবস্থাও ভাবতে হয়। এক্ষেত্রেও আমাদের দেশের উদাহরণ চলে আসবে। আমাদের দেশে হিন্দুদের মধ্যে বর্ণব্যবস্থা চালু আছে। বিশেষত উত্তরভারতে এর প্রবল প্রতাপ। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বৈশ্য এই তিন শ্রেণির মানুষের কাছে শূদ্ররা অস্পৃশ্য। আবার অর্থনৈতিক দিক থেকেও উক্ত তিন শ্রেণি বিশেষ সুবিধাভোগী। অধিকাংশ জমিজমা তাদেরই হস্তগোচর। অন্যদিকে শূদ্ররা উৎপাদক হলেও মোট দেশের মোট কৃষি জমির অতি সামান্য অংশ তাদের করায়ত্ত। বুঝতে অসুবিধা হয় না উত্তরভারতে কাস্ট-ই ক্লাস। এ দেশের নেতারা এই সত্য বুঝতে চাননি। আজকে দেখছি এর ফল কতটা বিষময় হয়েছে।
ধর্মের প্রশ্নে একশ্রেণির মার্কসবাদীদের গোঁড়ামি মার্কসবাদীদের অগ্রগতির মূলে অন্যতম বাধা। মার্কস বলে গেছেন ধর্ম জনগণের আফিম— এই আপ্তবাক্যের পূর্বাপর না বুঝে আগ-মার্কা কমিউনিস্ট নেতারা ধর্মকে নির্বাসনে পাঠাতে চান। কিন্ত, পারলেন কী? সোভিয়েত রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে কমিউনিস্ট শাসনের পর মসজিদগুলো আবার খুলে গেছে। মানুষ নামাজ পড়ছে। ক্রমশই ধর্মের আধিপত্য সেখানে বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গের কথা আর কী বলব? বিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্ন থেকেই এখানে বামপন্থী সংস্কৃতির অতি শক্তিশালী ধারা বহমান। ৩৪ বছরের বাম শাসনে সরকার এবং বামপন্থী পার্টিগুলি ধর্মের বিষয় থেকে এক ধরনের সচেতন দূরত্ব বজায় রেখেছিল। বাম শাসনে বিজেপি দু-একটি জায়গায় একটু ভালো ফল করলেও সারা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সেভাবে জানতও না আরএসএস বিজেপি খায় না মাথায় দেয়। কিন্তু বামপন্থী সরকারের পতনের মাত্র ১৪ বছরের মধ্যে আমরা দেখছি বিহার-উত্তরপ্রদেশের মতো ধর্ম এখানেও জাঁকিয়ে বসেছে। দল বেঁধে লোকে মহাকুম্ভে যাচ্ছে। তারকেশ্বরে শ্রাবণ মাসে এবং চৈত্র মাসের পূর্ণিমাতে ধর্মপ্রাণ মানুষে যেত। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে সারা বছর মানুষ যায়। শুধু হিন্দুস্তানি নয়। বাঙালিরাও। এই রাজ্যের মুসলমানদের মধ্যেও ধর্মীয় গোঁড়ামি ক্রমবর্ধমান। উত্তর ভারতীয়দের মতো নিরামিষাশী হওয়ার ধুম পড়েছে। এসব দেখে দুঃখ লাগে। ভাবি এতদিন তবে যে পরিবর্তন হয়েছিল তা শুধুই লোক দেখানো। কসমেটিক চেঞ্জ। ধর্মের আফিম নেশা ছাড়ানোর জন্য বলশেভিকরা যে কার্যক্রম গ্রহণ করেছিল, আপামর জনসাধারণকে শিক্ষিত করার যে ব্যবস্থা নিয়েছিল তার এখানে নিশ্চিতভাবেই বিপুল ঘাটতি ছিল। সেই রন্ধ্র পথ দিয়েই এই রাজ্যে জামাত এবং আরএসএস নামক দুই কালনাগিনীর প্রবেশ।
কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে মনে হয় এই ভাবনাতেও একদেশদর্শিতা আছে। ‘হিন্দুস্তানের মর্মে মর্মে ধর্ম’— এ কথা তো কবেই সুধীজন বলে গেছেন। তাই ধর্ম থেকে দেশের মানুষকে একেবারে বিযুক্ত করা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে মার্কসবাদীদের মুক্তমনা হতে হবে। যে ধর্ম উদার মানবিকতাবোধের কথা বলে, যে ধর্ম বিশ্বাস অন্যের ক্ষতি না করে তাকে বামপন্থীরা শত্রু বলে মনে করবে কেন? বরং শ্রেণি সংগ্রামের পথে, মানুষকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে ধর্মকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা ভাবা জরুরি। আজ থেকে বহু পূর্বে প্রয়াত সুকুমারী ভট্টাচার্য ‘ধর্ম এই সময়ে গ্রন্থে’ এই প্রয়োজনীয়তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখেছেন:
এখন বোধহয় সময় এসেছে যারা নিজেদের মার্কসবাদী বলে এবং কাজে, সাম্যবাদী সংগঠনে, আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে; তাদের শুধুমাত্র ধর্মে বিশ্বাসী বলেই ঠেলে দূরে না সরাবার। মার্কসের পরে মার্কসবাদও অপরিবর্তিত থাকেনি। ওইসব মত অবলম্বন করে দেশে দেশে বিপ্লবও সংঘটিত হয়েছে, কাজেই মার্কসবাদের মূল তত্ত্বটিকে অবিকৃত রেখে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তা যদি আন্দোলনের দ্বারা বিপ্লবের পথে এগোয়, তাহলে বোধহয় ওই পর্যন্ত ধর্মকে সহ্য করে তেমন মানুষদের সহযোদ্ধা বলে স্বীকার করলে সংগঠনের লাভ ছাড়া ক্ষতি হয় না।২
তাঁর আরও উপলব্ধি:
ধর্ম যখন শ্রেণিসংগ্রামকে বাধা দেয়, মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে তখনই তাকে সহ্য করা অন্যায়। কিন্তু আজকের ভারতবর্ষে ধর্মবিশ্বাসী মাত্রই শ্রেণিশত্রু বা সংগ্রামের শত্রু নয়। বহু লোকের কাছে ধর্ম একান্ত ব্যক্তিগত কিছু বিশ্বাস ও আচরণ, যার দ্বারা তারা কারও কোনো ক্ষতি করার কথা কল্পনাও করে না। এদের পর করে কী লাভ? এরা নিজেদের ধর্মবিশ্বাসকে যুক্তিবিচারের আওতার বাইরে রাখে ঠিকই, রাখুক না? যদি সে বিশ্বাস অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মানুষকে আঘাত না করে, গণসংগ্রামকে ব্যাহত না করে, বরং সংগ্রামীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এগোয়, তাহলে নাস্তিক মার্কসবাদীর কি সেই সহিষ্ণুতাটুকু থাকবে না তার ওই গোপন ঠাকুরঘরটুকুকে আঘাত না করার? যুক্তিবিচার দিয়ে ধর্মবিশ্বাসকে যাচাই করে না বলেই অনেক সময় নিজের অভিজ্ঞতাই তাদের বিশ্বাসে আঘাত হানে। আর নাও যদি হানে তো, সাম্যবাদী চেতনায় সে আর যাই হোক সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠবে না কখনও এবং এই কারণেই আমাদের সহযোদ্ধা থাকবে।৩
এরপর আসা যাক আমলাতান্ত্রিকতার প্রশ্নে। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পশ্চাতে দল ও সরকারের আমলাতান্ত্রিকতা বিশেষভাবে দায়ী ছিল এমনটাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে, এই দেশের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা রাজ্যের বামপন্থী সরকারের পতনের পশ্চাতেও এই বদগুণটি ভয়ংকরভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। গ্রামশি উপলব্ধি করেন ‘কেন্দ্রীভূত এই ব্যবস্থায় জন্ম নেয় আমলাতান্ত্রিকতা।’ পার্টির অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের ভাবনা সঠিকভাবে বিকশিত হতে পারে না। স্ট্যালিনের শাসনকালে ট্রটস্কি ও তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ এবং তার ফলে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙনের সম্ভাবনা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তিনি ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর পক্ষ থেকে কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্বকে একটি পত্র লেখেন। এই পত্রে সেই উদ্বেগ প্রাণবন্ত হয়ে আছে। পশ্চিমবাংলার প্রেক্ষিতে বিচার করলেও দেখা যায় এই রাজ্যের কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্যান্য বামদলগুলিকে আমলাতান্ত্রিকতা গ্রাস করেছিল। তলা থেকে সঠিক তথ্য তাই উপরে উঠে আসত না। কায়েমি স্বার্থসর্বস্ব স্থানীয় বা জেলা স্তরের মনসবদাররা ওপরে ভুল তথ্য পাঠাতেন। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম ট্রাজেডি ঘটতই না যদি না পার্টি আমলাতান্ত্রিক হয়ে পড়ত। এখনও সেই ব্যাধি কেটেছে বলে মনে হয় না। সাধারণ পাটিকর্মীদের আবেগ অনুভূতি, তাদের মতামত কতটাই বা উপর তলায় পৌঁছায়? যদিও বা পৌঁছায় নেতৃত্ব তাকে কতটা গুরুত্ব দেন? আদৌ দেন কী!
এই প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছি আসলে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের মধ্যে— কমবেশি সারা পৃথিবীতেই— কাজ করে এক ধরনের নির্ধারণবাদ। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পরে এই ব্যাধি লাতিন আমেরিকার দেশগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলেও ভারতীয় কমিউনিস্টরা পেরেছেন বলে মনে হয় না। মার্কসবাদ বিজ্ঞান, ইহা সর্বশক্তিমান, এরকম ধারণা আজও তাঁদের অধিকাংশের মনে শিকড়িত হয়ে আছে। গড্ডালিকা স্রোতে গা ভাসানো মার্কসবাদীদের মতে, মার্কসবাদ আর পাঁচটা বিজ্ঞানের মতো বিজ্ঞান। কিন্তু বিজ্ঞান তো স্থাণু, অচল-অটল কিছু নয়। কোনো বৈজ্ঞানিকের আবিষ্কার সত্য বলে অভিনন্দিত হয়েছে, পরবর্তীকালে তাঁর সেই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে। মার্কসবাদের মধ্যেও তো গতিশীলতা থাকার কথা। ১৮৪৮ সালের মার্কস-এঙ্গেলস হিসেবে যা ভেবেছেন সময়ের নিয়মে, আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যেও বদল আসার কথা। আশার কথা পশ্চিমি মার্কসবাদের প্রবক্তারা বহু আগে থেকেই এই যান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নতুন পথে মার্কসবাদকে প্রবাহিত করতে চেয়েছেন। ইতালীয় মার্কসবাদী গ্রামশির চিন্তনে এবং লেখায় এই যান্ত্রিকতা মুক্তির প্রথম বিস্তৃত সংহত প্রয়াস সূচিত হয়। তবে এর পূর্বে রোজা লুক্সেমবুর্গের লেখার মধ্যে প্রথামুক্তির এষণা প্রথম প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে দেখা যায়। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ম নিগড়কে নস্যাৎ করে স্বতঃস্ফূর্ততার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর লেখাপত্র (যা কিছু পাওয়া গেছে) থেকে বোঝা যায় একদেশদর্শিতা, নির্ধারণবাদ, পার্টিকেন্দ্রিকতাকে নস্যাৎ করেছেন। গুরুত্ব আরোপ করেছেন গণতান্ত্রিক স্বতঃস্ফূর্ততার উপর। উপরোক্ত ব্যাধি থেকে নিজেদের মুক্ত করতেই হবে। কাজে লাগাতে হবে বিকল্প চিন্তকদের ভাবনাচিন্তা। যেমন গ্রামশির ‘হেজিমনি তত্ত্ব’।৪ এ আসলে ক্ষমতাকেন্দ্রের দ্বারা কৃত যাবতীয় অনৈতিক কার্যাবলিকে বৈধতা দানের তত্ত্ব। গ্রামশি লক্ষ করেন, দেশের জনসাধারণের কাছে আধিপত্যকামী ফ্যাসিস্ট শক্তির যাবতীয় দানবিক কাজ আশ্চর্যভাবে ইতিবাচক হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। আর হচ্ছে বলেই বলপ্রয়োগ করে নয়, অধিকাংশ মানুষের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছেন মুসোলিনি। কিন্তু কীভাবে তাঁদের যাবতীয় অপকর্ম, প্রতিক্রিয়াশীল কর্মকাণ্ড জনসাধারণের চোখে বৈধতা পেল? তিনি দেখলেন এই বৈধতা প্রদানের কার্যক্রমটি অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে করেছে ক্ষমতাকেন্দ্রের তল্পিবাহক civil society। আমরা বুঝতে পারি জার্মানিতে হিটলারও এইভাবে সিভিল সোসাইটির সাহায্যে জনসম্মতির পথ ধরেই সে দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছেন। এই হেজিমনি ভাঙতে গ্রামশি পালটা হেজিমনির কথা বলেন। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব হবে? এর উত্তর হল, এই দায়িত্ব সংগঠিত করবে কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক কর্মীকুল। তারা পুরো সমাজের দখল নেবে। তাদের সৃষ্টিশীল রচনা, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র ইত্যাদির মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচি সম্পর্কে জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তুলবে, ধর্মান্ধতার বিপদ সম্পর্কে সচেতন করবে। বুর্জোয়া ক্ষমতা কেন্দ্র বিষাক্ত সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল তার থেকে জনসাধারণ মুক্তি পাবে। এবং ধীরে ধীরে প্রস্তুত হবে বিপ্লবের পরিসর।
আজকের দিনে বাংলা ও ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে গ্রামশির তত্ত্ব অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক নয় কি? এই দেশের বর্তমান শাসক একটিও গঠনমূলক কাজ করেছেন বলা যাবে না। বরং করে চলেছেন এমন কার্যক্রম যা জাতি হিসেবে আমাদের বাকি বিশ্বের কাছে হাস্যস্পদ করে তুলেছে। কে কী খাবে, কী পরবে তা ঠিক করে দিচ্ছে কোনো একটি দল বা গোষ্ঠী। তাদের বিরুদ্ধচরণ করলেই মরতে হতে পারে। রাজ্যজুড়ে একের পর এক স্কুল বন্ধ হচ্ছে। চাকুরির পরীক্ষা প্রায় হয় না। এইরকম অন্ধকার পরিস্থিতি দেখে মানুষের ক্ষুব্ধ হবার কথা। কিন্তু কোথায় কী! মানুষ তো সব মেনে নিচ্ছে। দল বেঁধে ভোট দিচ্ছে তাদের পক্ষে। জোরের মুখে নয়। স্বেচ্ছায়। এমনটা কীভাবে হল? এর কারণ হল, সুশীল সমাজ এবং প্রচার মাধ্যমকে শাসক নিজের পক্ষে আনতে পেরেছেন। প্রতিমুহূর্তে চলেছে শাসকের কার্যের সপক্ষে প্রচার। সমাজ সক্রিয়ভাবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে তাদের। প্রচার মাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের মগজধোলাই বেশ ভালোভাবেই করছে। তাই এই জনবিরোধী শক্তির জনসমর্থন পেতে অসুবিধে হচ্ছে না। এমতাবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলিকে পালটা হেজিমনি সৃষ্টির কথা ভাবতে হবে। নতুবা ক্ষমতায় ফেরত আসা, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বদলের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
মার্কসবাদীদের চতুর্থ ব্যর্থতা দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মার্কসবাদের মূলনীতির সালোক্যসাধনে শোচনীয় অপারগতা। মার্কসবাদীদের মৌলবাদীসুলভ অচলঅটল মানসিকতা এর জন্য দায়ী তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিষয়টা একটু বিস্তৃতভাবে বলি—
আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টির বয়স ১০০ বছর হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের বয়সও ১০০ বছর অতিক্রান্ত। আজকে সারা ভারত জুড়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র, এমনকী এই প্রগতিশীল পশ্চিমবঙ্গেও তার নেটওয়ার্ক এবং গণভিত্তি তুঙ্গস্পর্শী। আর বামপন্থীরা! তারা আজ কোথায়? রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ যা পারল, কমিউনিস্ট, বামপন্থীরা তা পারল না। কিন্তু কেন? এর মূল কারণ মার্কসবাদচর্চা ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দলগুলির দেশজ ঐতিহ্য এবং দেশীয় সংস্কৃতিকে প্রবলভাবে অবহেলার মনোভাব। আমাদের দেশে এই অবহেলা বড়ো বেশি প্রকট। বলা বাহুল্য এই অবহেলা দেশের অধিকাংশ মানুষ ভালো চোখে দেখেনি। বিশেষত সামন্ততান্ত্রিক শোষণে ক্লিষ্ট উত্তর ভারতের মানুষ— যাদের মধ্যে শ্রেণিগত কারণে কমিউনিস্ট পার্টির শক্ত ভিত্তি স্থাপন স্বাভাবিক ছিল— দেশবিরোধী, দেশীয় সংস্কৃতির বিরোধী এই বিবেচনায় তারা কমিউনিস্ট পার্টিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নেতৃবর্গ দেশজ সংস্কৃতিকে তাঁদের মতো করে লালন করেছেন। ফলে প্রতিক্রিয়াশীল হয়েও দেশের এক ব্যাপক অংশের মানুষের সমর্থন তাঁরা সহজেই ঘরে তুলতে পেরেছেন।
মার্কসবাদী চিন্তাবিদ শোভনলাল দত্তগুপ্ত তাঁর ‘আকালের ভাবনা’ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধের প্রায় শুরুতেই এদেশীয় মার্কসবাদীদের এই ব্যর্থতার উপর আলোকপাত করেছেন:
চীন ও ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি জনমানসে এক গভীর প্রভাব ফেলতে পারল, তৈরি করতে সক্ষম হল পার্টির এক যথার্থ গণভিত্তি, অথচ আমরা কেন এতদিনেও তা করে উঠতে পারলাম না এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মূলত একটা বিষয়কে স্পর্শ করা প্রয়োজন: সেটি হল মার্কসবাদের সঙ্গে ঐতিহ্যের সম্পর্কটি আমরা কীভাবে বিচার করব?৫
এই প্রশ্নের মধ্যে সম্ভবত সমাধানের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য— চৈতন্য, রবীন্দ্রনাথ এবং গান্ধিজির ভাবনার মধ্যেই রয়েছে মার্কসবাদের নবজন্মের সম্ভাবনা। দেশীয় ঐতিহ্যের কথাটি এদেশীয় কমিউনিস্টরা ভাবেননি এমনটা নয়। কেউ কেউ ভেবেছিলেন। কমিউনিস্টরা মনে করেন আমাদের ঐতিহ্যের যা কিছু গণমুখী, বৈপ্লবিক ও প্রগতিশীল এবং যা কিছু বস্তুতান্ত্রিক তারই উত্তরসূরি এদেশীয় কমিউনিস্টরা। তার মধ্যে আছে কৃষক বিদ্রোহ, গণসংগীত, লোকায়ত দর্শন, সুকান্ত নজরুল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের প্রগতিশীল সাহিত্য ইত্যাদি। কিন্তু তাঁদের এই নির্ণয়ের মধ্যে সুপ্ত থেকে গেছে এক অসম্পূর্ণতা। প্রাজ্ঞ মার্কসবাদী চিন্তক এই অসম্পূর্ণতার দিকটি চিহ্নিত করে একটি সংগত প্রশ্ন তুলেছেন:
রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ এই যে ঐতিহ্য, যাকে প্রথাগতভাবে জাতীয়তাবাদী আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে, যার অনেকটাই ভাববাদী চিন্তায় পুষ্ট কিন্তু সামন্ততন্ত্র বিরোধী বা বহুলাংশেই আধুনিক, সাবেকি মার্কসবাদী ভাবনায় তার স্থান কোথায়?৬
তিনি সঠিকভাবেই লক্ষ করেছেন, প্রায় একই ধরনের প্রবণতা ছিল বলশেভিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত প্রলেটকাল্টদের মধ্যে। তাঁরা মনে করতেন যে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে একমাত্র বিবেচ্য হল সে দেশের সংস্কৃতির যে প্রগতিশীল অংশ সেটাই। লেনিন সেদিন তাঁদের এই ভাবনাচিন্তাকে নস্যাৎ করে বলেছিলেন, বুর্জোয়া মানবতাবাদীর ঐতিহ্যের যথার্থ ধারক বাহক কমিউনিস্টরাই। তাঁদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা নয়, তাঁদের সমৃদ্ধ চিন্তা ও ইতিবাচক দিকগুলিকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই মার্কসবাদ সমৃদ্ধ হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি লিও তলস্তয়ের সাহিত্যকে অক্টোবর বিপ্লবের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। প্রথাগত মার্কসবাদীরা হেগেলকে ভাববাদী বলে পরিত্যাগ করেন। লেনিন কিন্তু স্পষ্ট জানিয়েছিলেন হেগেলের দর্শন না বুঝে মার্কসবাদের প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না।
শ্রীচৈতন্যদেব মধ্যযুগের বঙ্গদেশে আবির্ভূত হয়ে হিন্দু ধর্মের ভাঙন রোধ করার উদ্দেশ্যে নীচুতলার মানুষকে কাছে টেনেছিলেন। তিনি নীচুতলার মানুষকে যথাযথ সম্মান দিয়েছিলেন বলেই তারা দলে দলে তাঁর শিষ্য হয়েছিলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার সঙ্গে মার্কসের শ্রেণিহীন সমাজের তত্ত্বকে কি মিলিয়ে দেয়া খুব কঠিন? কিংবা বঙ্কিমচন্দ্র-বিবেকানন্দ-রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের সাম্যভাবনা! বিদেশি মনীষীদের নাম করে সাম্যবাদের তত্ত্ব ফেরি করতে গিয়ে এদেশীয় কমিউনিস্টরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা যদি তাঁদের পাশে বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথের সাম্যভাবনা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার করতে পারেন তবে সাম্যবাদ এদেশে মানুষের কাছে অনেক বেশি গ্রহণীয় হয়ে উঠবে। একইভাবে গ্রাম বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজের কাছে মার্কসবাদকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হলে তাদের ধর্মীয় আদর্শের সঙ্গে মার্কসবাদকে মেলাতে হবে। যদি তাদের কাছে প্রচার করা যায় যে সাম্যবাদের কথা মার্কস বলছেন সেই সাম্যবাদের কথা অনেক আগেই বলে গেছেন নবি হযরত মহম্মদ তবে তারা বিদেশি বুলি না ভেবে ধর্মের টানে মার্কসবাদকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করবে। কিন্তু এমনটা কি সত্যিই এদেশীয় মার্কসবাদীরা করবেন? অন্তত চেষ্টাটা।
অন্যদের কথা ছেড়েই দিলাম, আমাদের হাতের কাছেই তো রয়েছেন সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ। তিনি সমাজতন্ত্র সম্পর্কে, সার্বিকভাবে মানুষের মুক্তি সম্পর্কে যা ভেবেছেন সেই ভাবনাসূত্রগুলি কাজে লাগানোর কথা আজকে অনেক চিন্তাবিদ ভাবছেন। মার্কসবাদের যান্ত্রিকতা থেকে, অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্তির দিশা রবীন্দ্রনাথের দর্শনে আছে এমন কথা মননশীল ব্যক্তিদের অনেকের মুখে শোনা যাচ্ছে। প্রয়াত পরেশ চট্টোপাধ্যায়, অনুপ ধর, অঞ্জন চক্রবর্তী মার্কসবাদ এবং রবীন্দ্রদর্শনের সমন্বয় সাধনার উপর জোর দিয়েছেন। ভালোভাবে মার্কস ও রবীন্দ্রনাথ পড়লে দেখা যায় দু-জনেই মানুষের সার্বিক মুক্তির কথা বলেছেন। দু-জনের কাছেই ধনতন্ত্রের মূলনীতি ‘exploitation’। দু-জনেই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে মানুষের সভ্যতার পক্ষে মনে করেছেন বিপজ্জনক। দু-জনের ভাবনাতেই নারীমুক্তির প্রসঙ্গ এসেছে। মার্কসবাদের প্রয়োগের ক্ষেত্রে যান্ত্রিকতার অভিযোগ বারবার উঠেছে। তবে রবীন্দ্রনাথ নতুন সমাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজনীতিতে যান্ত্রিকতাকে দূরে ঠেলে কল্পনার গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে তাই ‘সোভিয়েতের নিয়মতান্ত্রিকতার তথা রাষ্ট্রনির্ধারিত সমাজ পরিচালনার প্রতি বিদ্রুপ তথা শ্লেষ’৭ বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
এখন প্রশ্ন হল এই গতিহারা জাহ্নবীকে কে দেখাবে পথ? সেই ভগীরথ কোথায়? কাল নিরবধি। শোষণ অত্যাচার যখন অভ্রভেদী হয়ে ওঠে তখনই মার্কসবাদ প্রাসঙ্গিকতা পায়। তবে তার জন্য দরকার হয় যুগনায়কের। লেনিন, মাও সে তুঙ। শোষিত, নিপীড়িত ভারতীয় সমাজ আজ তেমনই এক যুগনায়কের অপেক্ষায়।
উল্লেখপঞ্জি :
১. ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (পশ্চিমবঙ্গ কমিটি) : ‘ভূতের বেগার প্রসঙ্গে’, (স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশিত) সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘ভূতের বেগার’ গ্রন্থের “পরিশিষ্ট” অংশে সংযোজিত। প্রকাশক প্যাপিরাস, ২০২২, পৃষ্ঠা ১০৬
২. ভট্টাচার্য সুকুমারী : ‘ধর্ম : এই সময়ে’, চিরায়ত প্রকাশন, ২০১৯ পৃষ্ঠা ১০
৩. ঐ
৪. Gramsci Antonio : ‘Prison Notebooks’, page 57 (pdf)
৫. দত্তগুপ্ত শোভনলাল : ‘আকালের ভাবনা’, সেরিবান, পৃষ্ঠা ১৬
৬. ঐ
৭. ধর অনুপ, চক্রবর্তী অঞ্জন : ‘রাজনীতির ভূত-ভবিষ্যৎ’, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০২৩, পৃষ্ঠা ২৩২